নিজস্ব প্রতিবেদক: আর মাত্র ১১ দিন। আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জোর প্রচেষ্টাতে নির্বাচনী প্রচারগা এখন তুঙ্গে, সিলেট শহর সহ প্রতিটি পৌড়া, মহল্লার দেওয়ালে দেওয়ালে ঝুলছে প্রার্থীদের পোস্টার। কিন্তু এই উৎসবমুখরতার আড়ালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজ করছে এক চরম অনিশ্চয়তা ও ধমধমে নীরবতা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর বর্জনের মুখে এবারের নির্বাচন রূপ নিয়েছে একতরফা সমীকরণে। দেশের সাধারণ ভোটদের বড় অংশের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নেই, সেখানে ভোটের দিন আসলে কী হতে যাচ্ছে?
প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে না আসায় নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মহলে ‘অংশগ্রহণমূলক’ ও ‘প্রতিযোগিতাপূর্ণ’ দেখানোর জন্য এক অভিনব কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এবার দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি দলেরই প্রভাবশালী নেতাদের ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে নির্বাচনী মাঠের লড়াইটি এখন মূলত নৌকা বনাম আওয়ামী লীগেরই ‘বিরোধী’ বা ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীদের মধ্যে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রতিযোগিতার এক ছদ্মবেশ মাত্র। সাধারণ মানুষ একে দেখছে নিজদের ঘরের ভেতরের কোন্দল হিসেবে। অনেক এলাকায় ক্ষমতাসীনদের এই ডামি প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে মূল বিরোধী পক্ষই মাঠে নেই, সেখানে এই অভ্যন্তরীণ মারামারি ও কৃত্রিম প্রতিযোগিতা দিয়ে ভোটদের কতটুকু কেন্দ্রে টানা যাবে?
গত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকে দেশজুড়ে বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর যে ক্র্যাকডাউন বা গণগ্রেপ্তার শুরু হয়েছিল, তা নির্বাচনের ১১ দিন আগেও অব্যাহত রয়েছে। সিলেট সহ সারা দেশের বিএনপির শীর্ষ নেতা সহ হাজার হাজার কর্মী এখন কারাবন্দী। দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন বর্জনোর ডাক দিয়ে লিফলেট বিতরণ এবং লাগাতার হরতাল-অবরোধের কর্মসূচী দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে এই রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা রুখতে এবং ‘শান্তি-শৃঙ্খলা’ বজায় রাখার যুক্তিতে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির কঠোর উঠল চলছে। তবে এই নিরাপত্তার তেড়েজোড়ে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির চেয়ে এক ধরনের ‘ভয়ের আবহ’ বেশি তৈরি করছে। এবারের নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ নজরবিহীন। মার্কিন ভিসানীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মিত কড়া নজরদারির কারণে সরকার একটি সংঘাতহীন ও মেটামুটি গ্রহণযোগ্য ভোটের উপস্থিতির নির্বাচন দেখাতে মরিয়া। কিন্তু প্রধান বিরোধী জোটের অনুপস্থিতিতে ভোটদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সিলেট শহরের অনেক সাধারণ ভোটদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার চেয়ে ঘরে থাকাকেই নিরাপদ মনে করছেন।
আগামী ৭ জানুয়ারির ভোটের ফলাফল কী হবে, তা দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকই কমবেশি আন্দাজ করতে পারছেন। তবে বড় সংশয়টি নির্বাচন-পরবর্তী সময় নিয়ে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষকে বাইরে রেখে গঠিত হতে যাওয়া নতুন সংসদ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট কতটা সামাল দিতে পারবে, তা চরম অনিশ্চিত। ভোটের আর মাত্র ১১ দিন বাকি। মাঠের এই কৃত্রিম উৎসব শেষ পর্যন্ত ভোটদের মন গলাতে পারে কি না, নাকি ৭ জানুয়ারি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার নাম হয়ে থাকবে—তা দেখার জন্য পুরো দেশ এখন অপেক্ষা করছে।







