কওমি সনদের স্বীকৃতির আইন মন্ত্রী সভায় অনুমোদন

0
12

কাজিরবাজার ডেস্ক :
কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে দাওরায়ে হাদিসকে সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্সের সমমান স্বীকৃতি দিতে আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রী সভা।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রী সভা বৈঠকে এই আইনের খসড়ায় অনুমোদন দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।
বৈঠক শেষে সচিব ব্রিফিং করেন সচিবালয়ে। তিনি বলেন, ‘আগে থেকেই হয়ে (কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে) আসছে, সেটাকে আইনি কাঠামোতে নিয়ে আসা হচ্ছে।’
সচিব জানান, এখন সারা দেশে ছয়টি বোর্ড কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করলেও সেটিকে একটি শিক্ষা বোর্ড করা হবে।
এই বোর্ডের কেন্দ্রীয় কর্াালয় থাকবে ঢাকায়। চেয়ারম্যান চাইলে কমিটির সদস্য নির্ধারণ করতে পারবেন। তবে কমিটি ১৫ সদস্যের বেশি থাকবেন না। এতে সরকারি প্রতিনিধি থাকবে না।
কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি এই মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি। আর এই দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়ার পর ১৯৯৯ সাল বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট করে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রীক রাজনৈতিক দল ইসলামী ঐক্যজোট।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ধর্মভিত্তিক এই দলগুলোর আক্বিদাগত ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও কেবল এই ইস্যুতে তারা ‘শত্রুর’ সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি হয়। তবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এই স্বীকৃতির বাস্তবায়ন হয়নি।
তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় কওমি আলেমদের গুরু আহমেদ শাহ শফিকে প্রধান করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। তবে সে সময় নিজেদের মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ শক্তির বিরোধিতায় সেটা আর আগায়নি।
তবে ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন গণভবনে উপস্থিত ছিলেন আহমেদ শাহ শফিও যিনি হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠনের আমির।
এর দুই দিন পর কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতি দিয়ে আদেশ জারি করে সরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) উচ্চপর্যায়ের আলেমদের সঙ্গে দফায় দফায় বসে এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘কওমি মাদরাসার ১৫ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মূল ধারায় নিয়ে আসতে এই আইনটি করা হয়েছে।’
এই আইনের আগে যেসব সনদ দেয়া হয়েছে, সেগুলোও তা এই আইনের আওতায় গৃহীত হবে বলেও জানান সচিব।
আইনে যা আছে : সচিব জানান, বলা হয়েছে, ‘কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে এবং দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিগুলোকে ভিত্তি করে এই সমমান দেয়া হলো।’
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই সমমান দেয়ার লক্ষ্যে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারাসিল আরাবিয়া- বেফাক সভাপতি হিসেবে পদাধিকার বলে আল্লামা আহমেদ শাহ শফীর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটি সনদবিষয়ক যাবতীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বিবেচিত হবে। এদের তত্ত্বাবধানে নিবন্ধিত মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের সনদ মাস্টার্সের সমমান বিবেচিত হবে।
এই কমিটির অধীনে ও তত্ত্বাবধানে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা হবে। পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল এবং সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক উপ-কমিটি গঠন করতে পারবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়গুলো অবহিত করবে কমিটি। এই কমিটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে।
হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয় : কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্তে হয়নি। ২০০৯ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী আলেমদের সঙ্গে যে আলোচনার সূত্রপাত করেন, সেটি ২০১০ সালে গ্রহণ করা শিক্ষানীতিতেও স্থান পায়।
সে সময়ই কওমি শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালে কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নে আল্লামা শফীর নেতৃত্বে কমিশন গঠন করে সরকার। ১৭ সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটিতে সদস্য সচিব ছিলেন গওহারডাঙ্গা মাদরাসার মহাপরিচালক মুফতি রুহুল আমীন।
কওমি মাদরাসা মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ মাদরাসার আলোকে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থা। এখানে কোরআন-হাদিসের মূলধারার শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার কওমি মাদ্রাসা রয়েছে।
এতদিন স্বীকৃতি না থাকায় কওমি মাদ্রাসার সদনধারীরা সরকারি, বেসরকারি কোনো চাকরিতে যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন না। এখন তারা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবেন।
অবশ্য এ বিষয়ে নতুন আইন পাস হওয়ার আগেই গত মার্চে ১০১০ জন কওমি আলেমকে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (ষষ্ঠ পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
দাওরায়ে হাদিস কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর। কওমি শিক্ষায় ছয়টি স্তর রয়েছে। এগুলো হলো: ইবতেদাইয়্যাহ (প্রাথমিক), মুতাওয়াসসিতাহ (নিম্নমাধ্যমিক), সানাবিয়্যাহ আম্মাহ (মাধ্যমিক), সানাবিয়্যাহ খাসসাহ (উচ্চ মাধ্যমিক), মারহালাতুল ফজিলত (স্নাতক), মারহালাতুত তাকমিল বা দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান)।