রেলপথের উন্নয়ন হোক

0
68

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বিদ্যমান সড়ক-মহাসড়কের পাশাপাশি রেল ও নৌপথের ওপর সমধিক গুরুত্বারোপ করে বিপুল আশার সঞ্চার করেছেন জনমনে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর প্রধানত জোর দেয়া হয় দেশের সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্ষতবিক্ষত একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সে সময়ে হয়ত এর আবশ্যকতা ছিল। আর তাই গত কয়েক বছরে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে এক সুবিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক। তাই বলে সড়কপথে ভোগান্তিও কিছু কম নেই কোন অংশে। সড়ক বিশেষ করে মহাসড়কগুলো এক একটা মৃত্যুফাঁদ। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। হতাহতের ঘটনাও ঘটছে বিস্তর। সড়কে মৃত্যুহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম। এর নানা কারণের মধ্যে যা উল্লেখযোগ্য তা হলো দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যথেষ্ট পরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব প্রকট। তদুপরি রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ জরাজীর্ণ যানবাহন, অদক্ষ চালক, হেল্পার ইত্যাদি। যানবাহনগুলোতে লোডও কম নয়, যা সহজেই উপলব্ধি করা যায় দুই ঈদ ও অন্যান্য উৎসব উপলক্ষে।
এক সময় বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিচিতি নদীমাতৃক বলে ঠাঁই পেলেও এখন বোধ হয় তা বলা চলে না। কালের বিবর্তনে অধিকাংশ নদ-নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। অন্তত নাব্য হারিয়েছে। এর জন্য প্রকৃতির চেয়ে অবশ্য মানুষের অবিমৃষ্যকারিতাই দায়ী সর্বাধিক। প্রায় নিয়মিত দখল-দূষণে অধিকাংশ নদীই মৃতপ্রায়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রমত্তা পদ্মার অবস্থাও ভাল নয়। সে অবস্থায় বর্তমানে দেশের নৌ-চলাচল ব্যবস্থা ও নৌযোগাযোগ অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। অথচ মানুষের চলাচল ও মালামাল পরিবহনের জন্য নৌপথ এবং নৌযান একটি অত্যন্ত স্বল্পব্যয়ের নিরাপদ যোগাযোগের উপায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্তে নৌপথে কিছু ঝুঁকি থাকলেও এর চেয়ে আরামপ্রদ ও নিরাপদ ভ্রমণের বিকল্প নেই।
সে তুলনায় রেলপথ এবং রেলভ্রমণ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আরামপ্রদ। একদা যাত্রীসাধারণের কাছে রেলভ্রমণ অত্যন্ত আদরণীয় ও পছন্দনীয় ছিল। তবে দুঃখজনক হলো স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলোর অমনোযোগ ও অবহেলা এবং সড়ক পরিবহন ও যানবাহন মালিক সমিতির চাপে, সর্বোপরি রাজনৈতিক কারণেও বটে রেলপথের পরিবর্তে অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয় সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নে। এতে একশ্রেণীর আমলা-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারের প্রায় অবাধ লুটপাট ও দুর্নীতির সুযোগ ঘটে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো স্বয়ং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী দেশের মহাসড়কগুলোকে তুলনা করেছেন ছেঁড়া কাঁথার সঙ্গে, মাত্র ছয় মাসের মধ্যে যার আয়ু শেষ হয়। রেলেও যে দুর্নীতি নেই বা হয় না তা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে এটা সত্যি যে, সড়কপথের তুলনায় এতদিন অবহেলিত ছিল রেলপথ। অথচ জনসংখ্যা বিবেচনায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেলপথই হতে পারে বাংলাদেশের যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের সাশ্রয়ী, দ্রুতগামী, নিরাপদ ও আরামপ্রদ মাধ্যম। তবে এর জন্য দেশব্যাপী রেলওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে সর্বাগ্রে। সর্বত্র গড়ে তুলতে হবে আপ এ্যান্ড ডাউন ডাবল লাইন, তা সে ব্রড গেজ বা মিটার গেজ যা-ই হোক না কেন। বর্তমানে রেল ইঞ্জিন ও বগি এসে থাকে প্রধানত ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। প্রয়োজনে দোতলা ট্রেন আনা যেতে পারে ইউরোপ থেকে। বিদ্যুত উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বনির্ভর। সেই প্রেক্ষাপটে আমদানিনির্ভর ডিজেলের পরিবর্তে দেশব্যাপী বৈদ্যুতিক রেল চালু করার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।