প্রাথমিকে বইয়ের বোঝা কমান

0
2

প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের শিশুদের পাঠ্যসূচীর চেয়ে বেশি শিক্ষা কার্যক্রম চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণীর শিশুদের মাধ্যমিক স্তর, এমনকি ইন্টারমিডিয়েট স্তরের শিক্ষার্থীদের চেয়েও বেশি সময় শ্রেণীকক্ষে থাকতে হচ্ছে। ৩০ জানুয়ারি এক পরিপত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণী কার্যক্রমের নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়। এতে শ্রেণী কার্যক্রমের সময় আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন ছয়টি আবশ্যকীয় বিষয় পড়ানো হয়। বিষয়গুলো হলো- বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, প্রাথমিক বিজ্ঞান, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা। এছাড়াও সমাবেশ, কাব, স্কাউট, শরীরচর্চা, সঙ্গীত ও চারুকারু“শেখানো হয়। শ্রেণী শিক্ষকরাই বলছেন, প্রতিদিন একটানা এসব বিষয় শিশুর জন্য বোঝাস্বরূপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘শিশুদের শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেয়া উচিত না। তাদের পড়াশোনাটা তারা যেন খেলতে খেলতে, হাসতে হাসতে সুন্দরভাবে নিজের মতো করে নিয়ে পড়তে পারে সেই ব্যবস্থাটাই করা উচিত। আরও বেশি চাপ দিলে শিক্ষার ওপর আগ্রহটা কমে যাবে। একটা ভীতি সৃষ্টি হবে। সেই ভীতিটা যেন সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদের আমি অনুরোধ করব।’ গণসাক্ষরতা অভিযান পরিচালিত এডুকেশন ওয়াচের একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, অনেক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্দিষ্ট বইয়ের চেয়ে বাইরের প্রকাশকের বই পড়ানোর প্রতি বেশি আগ্রহী। শিশুদের বাড়তি বই পড়ানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ে। এমন অনেক বই আছে যা হয়ত ওই শ্রেণীর শিশুদের জন্য অপ্রয়োজনীয়; কিন্তু প্রকাশক ও শিক্ষকদের মধ্যকার অলিখিত বোঝাপড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের এসব বই কিনতে ও পড়তে হয়। এসব বাড়তি বই একদিকে অভিভাবকদের খরচের তালিকা লম্বা করছে, অন্যদিকে তা শিশুদের বইয়ের বোঝা বাড়াচ্ছে, বাড়াচ্ছে ব্যাগের বোঝাও।
এছাড়াও রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যারা অংশ নিয়ে থাকে সেইসব কোমলমতি শিশুর বয়স দশ-এগারোর মধ্যে। এই বয়সে একটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে তাদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ। আজকে আমরা যদি চিত্রকর, সঙ্গীতশিল্পী ও ফুটবল, ক্রিকেটের মতো খেলার সঙ্গে জড়িত সফল ব্যক্তিদের দিকে তাকাই এবং তাদের জীবনে বেড়ে ওঠা সম্পর্কে খোঁজখবর নিই তাহলে আমরা দেখব তারা শৈশবকাল থেকেই এ ধরনের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাদের ঝোঁক ছিল এসব বিষয়েই। তাই কোন্্ শিশুর কোন্্দেিক ঝোঁক এবং কিসে সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ও আগ্রহবোধ করে সেসব বিবেচনা করে তার শিক্ষাদান নির্ধারণ করা দরকার। শুধু শুধু পরীক্ষার বোঝা চাপালে শিশুর মানসিক বিকাশ রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেই তার জীবন ব্যর্থ- এমন ধারণাও জন্মে।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীতে সব ধরনের পরীক্ষা তুলে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। আর কালবিলম্ব নয়। শিশুদের ওপর থেকে বাড়তি বইয়ের বোঝা কমান। তার শৈশব ফিরিয়ে দিন। শিশুকালেই কাউকে পন্ডিত বানানোর দোহাই দেবেন না কেউ কর্তৃপক্ষের ওপর। এক সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরাও শিশুই ছিলেন। তাই সে কথা ভুলে শিশুদের কষ্টের কারণ হবেন না। আজকের শিশু বইয়ের বোঝায় যেন বেঁকে না যায়, মনের ওপর বাড়তি চাপ এসে মন রুদ্ধ না হয়ে যায়- সেদিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে।