পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে মানবতাবাদ : একটি পর্যালোচনা

আফতাব চৌধুরী

মানবতাবাদ বর্তমান বিশ্বে এক বহুচর্চিত বিষয়। সমগ্র বিশ্বজুড়ে আজ মানবতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত। মানবাধিকার সংস্থাসমূহ বোধ হয় পৃথিবীর সকল দেশে নিজেদের জাল বিস্তার করে আছে। কিন্তু তবুও পদে পদে মানবতা লুণ্ঠিত, অবহেলিত, অপমানিত।
এখন প্রশ্ন হল মানবতা কী ? মানবতাবাদই বা কী ? আর মানবাধিকার বলতে কী ধরনের অধিকারকে বোঝায়? কেন বিশ্বজুড়ে বারবার মানবতা লুন্ঠিত হচ্ছে? বর্তমান বিশ্বে ধর্মের তো খরা চলছে না, বরং বলা যায় বাড়বাড়ন্ত। তবুও হত্যা, অপহরণ, লুন্ঠন, ব্যভিচার, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গোষ্ঠী সংঘর্ষ, সন্ত্রাসী আক্রমণ, কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতিতে সর্বত্র দুর্নীতি ইত্যাদি অমানবিক কর্মকান্ড অব্যাহত থাকায় মানবতাবাদে বিশ্বাসী মানুষের আজ নাভিশ্বাস উঠছে।
মানবতা হলো মানুষের বিশেষ গুণাবলী যার সুবাদে মানুষ, পশুপক্ষী ও অন্যান্য ইতর প্রাণীসমূহ থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরিচিত। মানুষ হিসেবে জন্ম হলেই যে কোনও ব্যক্তি মানবিক গুণসম্পন্ন নাও হতে পারে। কারণ মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করার জন্য যে অধ্যবসায়ের প্রয়োজন, তা হয়ত সঠিকভাবে অনেকের ভাগ্যে জোটে না। সাধারণত মানবতা বলতে আমরা বুঝি এক মানুষের প্রতি আরেক মানুষের সহানূভূতি, সহমর্মিতা, বিপদে আপদে একজন আরেকজনের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করা, দীন-দুঃখী, বিকলাঙ্গদের সাধ্যমত সাহায্য করা ইত্যাদি। এককথায় মানুষের প্রতি মানুষের থাকা দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করা। অন্য মানুষের সুখে নিজেকে সুখী মনে করা এবং দুঃখে দুঃখী অনুভব করা।
তবে বর্তমান বস্তুতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়, মানবতা তথা মনুষ্যত্বের বিষয়টি মানুষের চিন্তা, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। অনেকের মতে এটা আল্লাহ অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে না। মানবাধিকার হল সেসব অধিকার, যা মানুষ হিসেবে জন্মসূত্রে তার প্রাপ্য। একজন ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তির কাছে নৈতিকতা বিষয়টি সুনির্দিষ্ট হলেও একজন নাস্তিকের কাছে নৈতিকতার মূল্যবোধ আপেক্ষিক। তার কাছে মানবতাবাদ হলো একটি ধারণা বা মতবাদ যা মানুষকে শেখায় যে মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির স্বীকৃতি মানবিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায় এমন যে কোনও ব্যবস্থা অমানবিক। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় বিধান বা নৈতিকতা নয়, মানবিক বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত যুক্তিই ন্যায়ের মানদন্ড। কোনও ধর্মগ্রন্থের শিক্ষা বা ধর্মীয় বিধান এখানে গৌণ। আধুনিক মানবতাবাদের প্রবক্তাদের ধারণা যে, কোনও দৈবশক্তির সাহায্যের প্রয়োজন নেই; কারণ মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই ঠিক করে নিতে পারে।
পৃথিবীর সব মহামানব তাদের সারাজীবন ধরে মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং সকল পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহে মানবজাতিকে মানবতার শিক্ষাপ্রদান করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র ক্বোরআনের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। ক্বোরআন আল্লাহর বাণী। এটা মানব রচিত কোন গ্রন্থ নয়। তাই ক্বোরআনে মানবিক শিক্ষায় ভুল থাকতে পারে না। বরং মানুষের বোঝার ভুল হতে পারে বলে মুসলমানদের বিশ্বাস। ক্বোরআন ঘোষণা করেছে যে, মানুষ সৃষ্টির সেরা এবং তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়েছে। আর দেওয়া হয়েছে জ্ঞান, বিবেক বা বুদ্ধি যা অন্য প্রাণীদের নেই। ক্বোরআন এমন একটি ধর্মগ্রন্থ যা সমস্ত মানবজাতিকে সিরাতুল মসতাক্কিম অর্থাৎ সুপথ প্রদশনের জন্য বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। অতএব পবিত্র ক্বোরআন হলো বিশ্ব মানবের জন্য ঐশী ও সর্বশেষ সংবিধান। ক্বোরআনে মানবতাবাদ হলো একটি বিশাল ব্যাপার যা এ ক্ষুদ্র পরিসরে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই শুধু কিছু মুখ্য বিষয়ে এ আলোচনা সীমিত রাখা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
পবিত্র ক্বোরআন বলে, সমগ্র মানবজাতি এক আত্মা থেকে সৃষ্ট। সবাই আদমের সন্তান। তবে মহান আল্লাহ তাঁর সেরা সৃষ্টি মানুষের মধ্যে বিভিন্ন গোত্র বা বংশ সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তারা একে অপরকে চিনতে পারে। কিন্তু মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণায় এ সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে মানুষে মানুষে বিভেদের প্রাচীর খাড়া করেছে। আজ ধর্ম, জাতি, ভাষা, বর্ণ ইত্যাদি ভেদাভেদ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করছে হানাহানি, একাংশ মানুষ হয়েছে মানুষের শত্র“। ধর্মের নামে অধর্মের বাহাদুরি এখন এক স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মানুষে মানুষে হিংসা, বিদ্বেষ বোধহয় অনেক সময় পশুদেরও লজ্জা দেয়। উগ্র সাম্প্রদায়িকতা যখন তার বিষদাঁত বের করে, তখন মানবসমাজে নেমে আসে নরকের বিভীষিকা।
ক্বোরআন এমন একটি ধর্মগ্রন্থ যা দীপ্তকন্ঠে ঘোষণা করছে যে সমগ্র মানবমন্ডলী একই পুরুষ আদম ও একই নাবী হাওয়া (ইভ) থেকে জাত। অর্থাৎ জগতের সমস্ত মানুষ একই বংশোদ্ভূত। এ মর্মে পবিত্র ক্বোরআনের বাণী, ‘হে মানুষেরা তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের ভয় কর-যিনি তোমাদের একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তদীয় সহধর্মিণী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উভয় হতে বহু নরনারী বিস্তৃত করেছেন; এবং সেই আল্লাহকে ভয় কর, যিনি তোমাদিগকে পরস্পর সন্বন্ধযুক্ত ও ঘনিষ্ঠতর করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের তত্ত্বাবধানকারী ’ (০:০১)।’ পরবর্তীকালে মানুষ যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন মানুষেরই সুবিধার্থে তাদের বিভিন্ন দল-গোত্রে বিভক্ত করে দেওয়া হল। এ সম্পর্কে পবিত্র ক্বোরআন বলছে, ‘হে মানুষেরা! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী লোক থেকে এবং তোমাদের পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে ওপরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিক ন্যায়দর্শী’(৪৯:১৩)। আবার ক্বোরআন বলছে, ‘এবং ইহা ও তাঁর নিদর্শন যে, তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং তোমাদের বিভিন্ন ভাষা ও তোমাদের বর্ণসমূহ সৃষ্টি করেছেন, নিশ্চয়ই ইহাতে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে (৩০:২২)।
আগেই উল্লেখ করেছি যে ক্বোরআন ঘোষণা করেছে যে সমগ্র মানব জাতি এক আত্মা থেকে সৃষ্ট। অতএব বিশ্বমানব এক জাতি। দেশ-মহাদেশ, সাদা-কালো, দীর্ঘ-বেঁেট, সুন্দর-অসুন্দরের, দুর্বল-সবলের বালাই নেই, সবাই আপন, কারণ সবাই এ ধরায় আল্লাহর প্রতিনিধি। এ পৃথিবীতে আল্লাহর কাছে সবাই সমান। কেননা সবাই তাঁরই সৃষ্টি। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, সৎ-অসৎ, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ ইত্যাদি যে কোনও পার্থক্য নির্বিশেষে সবার উপর তাঁর করুণা বর্ষিত হয়। কারণ তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু ‘রাহমানির রাহিম’। সবার জন্য আলো, বায়ু, পানি এবং সুন্দর ধরণীতে কারও প্রতি আল্লাহর কার্পণ্য বা বৈষম্য নেই।
পবিত্র ক্বোরআন বিশ্ব মানবের জন্য পথ প্রদর্শক। ক্বোরআন দেখায় ‘সিরাতুল মুসতাকিম’ অর্থাৎ ইহকালের সাফল্য ও পরকালের মুক্তির সহজ সরল পথ। মহাগ্রন্থ ক্বোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচার ও সৎকার্য করতে এবং আত্মীয়-স্বজনদিগকে দান করতে আদেশ করেছেন এবং অশ্লীলতা ও দুষ্কার্য এবং বিদ্রোহিতা (অত্যাচার) হতে নিষেধ করেছেন। তিনি উপদেশ প্রদান করেছেন যেন তোমরা স্মরণ কর (১৬:৯০)।’
ক্বোরআন আরও ঘোষণা করেছে, ‘ আর তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করো না তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে। আর সদ্ব্যবহার কর পিতামাতার সঙ্গে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে, এতিমদের সঙ্গে, ভিক্ষুকদের সঙ্গে, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে, সঙ্গীসাথী ও পথচারীর সঙ্গে এবং তোমাদের অধিকারভূক্ত দাসদাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই , আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, আত্মগর্বিত ব্যক্তিকে (০৪:৩৬)।’ সর্বাবস্থায় ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়েছে পবিত্র ক্বোরআন। এ মর্মে ক্বোরআনে ঘোষণা, ‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানকারী সুবিচার প্রতিষ্ঠাতা হও এবং কোনও সম্প্রদায়ের শত্র“তাহেতু তোমরা সুবিচারের অন্যথা করিও না; তোমরা সুবিচার কর, উহা ধর্মভীরুতার নিকটবর্তী, এবং আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা যাহা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরিজ্ঞাত আছেন (০৫:০৮)।’
ইসলাম ধর্ম, মানব ধর্ম, চিরকালীন ধর্ম। পৃথিবীর আদি মানব হজরত আদম ছিলেন আল্লাহর বান্দা, এক অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসক। হজরত মোহাম্মদ সর্বশেষ নবী, ক্বোরআন শেষ ও চূড়ান্ত ঐশীবাণী। হাদিস শাস্ত্র মতে এ পৃথিবীতে আল্লাহ এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী প্রেরণ করেছেন। জগতে এমন কোনও জাতি নেই, যার প্রতি কোনও নবী প্রেরিত হন নাই। পবিত্র ক্বোরআনে মাত্র পঁচিশজন নবীর নামোল্লেখ থাকলেও মুসলমানদের আল্লাহ প্রেরিত সব নবীর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মে জোর জবরদস্তির কোনও স্থান নেই। ক্বোরআন ঘোষণা করেছে, ‘ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই (০২: ২৫৬)।’ ক্বোরআন আরও ঘোষণা করছে, ‘(হে মোহাম্মদ) তুমি জ্ঞান ও সৎ উপদেশ দ্বারা তোমার প্রতিপালকের পথে (মানুষকে) আহ্বান কর এবং তাহাদের সহিত সদ্ভাবে আলোচনা কর। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক পরিজ্ঞাত আছেন যে, কে তাহার পথ হইতে বিভ্রান্ত হইয়াছে এবং তিনি সুপথগামীদিগকেও পরিজ্ঞাত আছেন’ (১৬:১২৫)। ‘নিশ্চয় ইহা সদুপদেশ ; অতএব যাহার ইচ্ছা সে স্বীয় প্রতিপালকের দিকে পথ পরিগ্রহণ করবে (৭৩ : ১৯)।
আল্লাহ কারও প্রতি অবিচার করেন না। পাপ-পুণ্যের বিচার হবে পরকালে কেয়ামতের মাঠে এবং সেখানে দেওয়া হবে পুরস্কার বা শাস্তি যার যেটা প্রাপ্য। এ মরজগৎ মুক্তাঞ্চল। এ পৃথিবীতে যারা তাঁর অবাধ্য থাকবে অর্থাৎ নিজ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে তাঁর আদেশ নিষেধ অমান্য করবে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালে সুবিচার ও উপযুক্ত শাস্তি। কিন্তু ইহকালে আল্লাহ তাদের শাস্তি না দিয়ে শুধরানোর সুযোগ দেবেন। আর যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে সৎকর্ম করে তাদের জন্য পরকালে রয়েছে উপহার অর্থাৎ স্বর্গোদ্যান যার নিম্নদেশে স্্েরাতস্বিনী প্রবাহিত।
অনেকে হয়ত বলতে পারেন যে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ক্বোরআন অনেক অমানবিক বিধান প্রবর্তন করছে। যেমন চুরির শাস্তি হাত কাটা ধর্ষণের শাস্তি বেত্রাঘাত করা বা পাথর বর্ষণে হত্যা করা ইত্যাদি। কিন্তু এটা এতো সরল নয় যে চোরকে ধরেই তার হাত কেটে ফেলবেন আর ধর্ষককে ধরেই শাস্তি দেবেন। কারণ অপরাধীর বিচার হতে হবে নির্দিষ্ট বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে। অতঃপর বিচারে দোষী প্রমাণিত হলেই তবে শাস্তি কার্যকর করবে দেশের প্রশাসন এবং যার হাত (বাম) কাটা যাবে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে দেশের সরকার। আর এটা হলো শাস্তির সর্বোচ্চ সীমা। অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তিও কম বেশি হতে পারে। সেভাবে বিচারে দোষী প্রমাণিত হলেই তবে ধর্ষকের শাস্তি হবে। কারণ ধর্ষিতা কি ইসলামি বিধান মেনে তার দেহকে উপযুক্ত পোশাকে সুরক্ষিত রেখেছেন? না আজকালের একাংশ উচ্ছৃঙ্খল নারীর মতো-‘আমাদের দেহ, আমার অধিকার’ বলে অর্ধ উলঙ্গ থেকে ধর্ষকের মতো নরপশুকে প্রলুব্ধ করেছেন? এভাবে এসবে জড়িয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। পবিত্র ক্বোরআনের অনিন্দ্যসুন্দর বিধান মেনে চললে চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার, ধর্ষণের মতো অপরাধ যে ঘটবে না, এটা হলফ করে বলা যায়। ক্বোরআনের মতো মহাগ্রন্থের মানবিক শিক্ষার প্রতি অবহেলা সব ধরনের অপরাধের মূল কারণ বললে বোধহয় ভুল হবে না।
ক্বোরআনের শিক্ষা নিয়ে আরবরা সারা বিশ্বকে পথ প্রদর্শন করেছিল। তাই আরবের ইসলামি সভ্যতাকে আধুনিক সভ্যতার বুনিয়াদ বলা হয়। ইসলামের সুমহান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আরবরা তাদের দেশ থেকে ক্রীতদাস প্রথা মুছে ফেলেছে। ধনী-গরিব বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ধনীদের জন্য যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করেছে ক্বোরআন। মানুষে মানুষে পার্থক্য মুছে দিতে ইসলাম ধনী-গরিব, আমির-ফকির, রাজা-প্রজা, জ্ঞানী-মুর্খ, উচ্চ-নীচ; প্রভু-ভৃত্য সবাই কাঁেধ কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে নামাজ পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছে মানব ধর্ম ইসলাম। আল্লাহর সামনে সবাই সমান, সবাই তাঁর বান্দা, সেখানে সকল বিভেদের রেখা মুছে যায় মানবতার মহান শিক্ষায় । বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে অনারবদের উপর আরবদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর উপর সাদার কোনও প্রভুত্ব হতে পারে না।
অনেকে ভাবেন ক্বোরআনে জেহাদের কথা বলা হয়েছে যেটা নাকি অমানবিক। আসলে এসব তাদের ভ্রান্ত-ধারণা। কারণ তারা জেহাদ ও সন্ত্রাসবাদকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন অজ্ঞাতবশত। জেহাদ মানে অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার জন্য অবিরত সংগ্রাম করে যাওয়া; সেটা ব্যক্তিগত জীবনে, সামাজিক জীবনে এমনকী রাষ্ট্রীয় জীবনেও হতে পারে। নিজের মান-সম্মান প্রাণ ধর্ম ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নাম জেহাদ। নিরপরাধ মানুষ হত্যার নাম জেহাদ নয়। ইসলামে শুধু মানুষ নয় বিনা কারণে একটি পিপীলিকা হত্যা করাও নিষিদ্ধ, একজন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিতে হত্যা করার মতো সমান অপরাধ বলে গেছে পবিত্র ক্বোরআন আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে।
মক্কার ইসলাম বিদ্বেষীদের দ্বারা অকথ্য অত্যাচারের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণরক্ষার্থে আল্লাহর নির্দেশে গোপনে মদিনাতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আল্লাহর রসুল। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে অস্ত্র হাতে নেননি। অতঃপর, যখন মক্কার শত্র“তা মদিনায় গিয়েও তাকে বার বার আক্রমণ করছিল, তখন বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার্থে জেহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন মহানবী মোহাম্মদ (সঃ)। আর এ সময়ের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি ঐশীবাণী অবতীর্ণ হয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে।
বর্তমানে একাংশ ক্বোরআনবিদ্বেষী এগুলোর অপব্যাখ্যা করে ক্বোরআন ও মুসলমানদের বদনাম করার অপচেষ্টা করেন বললে বোধহয় ভুল হবে না। কিছু মানুষ রয়েছেন যারা ক্বোরআনকে খুব ভয় করেন। কারণ ক্বোরআনকে মানলে চুরি করা যাবে না, সুদ খাওয়া যাবে না, মদ খাওয়া যাবে না, জুয়া খেলা যাবে না, সমকামী হওয়া যাবে না, লিভ টুগেদার করা যাবে না, অবৈধ প্রেম করা যাবে না। সর্বোপরি কোন ধরনের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করা যাবে না। তাই ক্বোরআন সেকেলে, আধুনিতাবিরোধী ; অতএব এ যুগে অচল, পরিত্যাজ্য। এভাবে একাংশ মানুষ ধর্মের সুমহান শিক্ষাকে ব্রাত্য মনে করে প্রবৃত্তির দাসত্ব করে মানবসমাজে বয়ে আনছেন অসভ্যতার তমসাচ্ছন্ন কালো রাত্রি। তাই, আজ চতুর্দিকে দুনীর্তির জয় জয়কার।
তবে সুখের কথা আজকাল অনেক লোককে বলতে শোনা যায় যে একাংশ মানুষে মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলতে চললেও মনুষ্যত্ববোধের এখনও অপমৃত্যু ঘটেনি। মানে এ ধরণীতে মানবতা নামক সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ এখনও একেবারে লোপ পায়নি। তবে মানবতার অপমৃত্যু যেভাবে ঘনিয়ে আসছে, নিকট ভবিষ্যতে হয়তো মানবজগৎ আলোড়ন করে আসবে এক মহাপ্রলয়, যার পরিণামে মনবতাবাদ বিরোধী শক্তিসমূহ এ ধরণী থেকে একেবারে মুছে যাবে অথবা এ ধরায় আয়ু নিঃশেষ হয়ে আসছে, মহাপ্রলয় সন্নিকটে। কিন্তু না আমরা মানুষ আশাবাদী। আমাদের এ সুন্দর ভুবন এত তাড়াতাড়ি ধ্বংস হবে না। কারণ মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা এখানে হ্রাস পেলেও মানবতাবাদী মানুষের সংখ্যা এখনও একদম ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কোটি কোটি মানুষের বাসস্থান এ গ্রহে এখনও কোটি কোটি মানুষ মানবতার পূজারী। তাদের কাছে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই।’