ইতিহাস-ঐতিহ্যে বহমান জামেয়া

জুনাইদ কিয়ামপুরী

আজ থেকে চৌদ্দশো বছর পূর্বে স্কাইলাইটের আলোর মতো যে প্রক্ষেপ আছড়ে পড়েছিল পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, মানবতার মুক্তি ও জীবনের অভিজ্ঞান নিয়ে। আমরা কতটুকু পেয়েছি এর উত্তরাধিকার? কীভাবে পেলাম এর গর্বিত বহনাধিকার? সে-এক বর্ণাঢ্য ইতিহাস বটে। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম হয় পৃথিবীর বরপুত্র সৃষ্টির সেরা মহামানব মোহাম্মদে আরবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। ৪০ বছর বয়সে লাভ করলেন নবুওতী পয়গাম। হেরার নির্জনগুহায় ধ্যানমগ্ন বিশ্বনবী ঘোষিত হলো “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল লাযি খালাক”; পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। শুরু হলো আসমানি পয়গাম নাযিলের সিলসিলা। সুদীর্ঘ ২৩ বছর চলল এই ধারাক্রম। পূর্ণাঙ্গ হলো শ্রেষ্ঠ জ্ঞানগ্রন্থ আল-কোরআন।
কোরআনী জ্ঞানের আলোকচ্ছটায় আলোকিত হলো একটি কাফেলাÑ নাম সাহাবায়ে কিরাম। আসমানী ইলমের প্রথম উত্তরাধিকারী হলেন তারাই। নবীজির শহর মদিনাতুল মুনাওয়ারায় গড়ে ওঠলো ইলমের মারকাজ। সাহাবায়ে কেরাম হলেন ইলমে নববীর একক উত্তরাধিকারী। সমস্ত সাহাবা যতটুকু ইলম ধারণ করলেন, প্রখর মেধাবী নবীজির ছয়জন সাহাবি একাই সেই ইলম ধারণ করলেন, এর মধ্যে প্রধান গণনীয় হলেন দুজন। একজন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ; অপরজন হজরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু। হজরত আলী এবং ইবনে মাসউদ প্রশাসনিক কাজে চলে এলেন কুফায়। কুফা নগরী হয়ে ওঠল ইলম চর্চার প্রধানকেন্দ্র। মদিনার ইলম স্থানান্তরিত হলো কুফায়, কুফা থেকে বাগদাদে। এভাবে বাগদাদ থেকে বোখারা, বোখারা থেকে সমরকন্দ, স্থান থেকে স্থানে, দেশ থেকে দেশান্তরে ইলমের মারকায স্থানান্তরিত হতে থাকে। ভারতে মদিনার ইলম বহু আগেই প্রবেশ করেছিল। মুসলিম মোঘল সম্রাটের সুবাদে মুসলিম মনীষীরা ইলমের অন্বেষায় গোটা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন। মদিনা, ইয়ামেন, হিজায, বাগদাদ, বোখারা, সমরকন্দসহ বিভিন্ন দেশের শায়খদের কাছ থেকে ইলমের মণিমুক্তা আহরণ করে স্বদেশ আলোকিত করেছেন। মুজাদ্দিদে আলফে সানীর মাকতুবাত, শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভির তাসনীফাত, ফাতওয়ায়ে আলমগীরির সংকলন এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ১১১৪ হিজরীতে জন্ম হয় শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভির। নিজের জ্ঞান মেধা ও সাধনার বদৌলতে স্বীকৃত হলেন ভারতের সেরা পণ্ডিত হিসেবে। মদিনার আলিম শায়খ আবু তাহির মাদানীর কাছ থেকে হাদীসের ইলম আহরণ করে ফিরে এলেন ভারতে। দিল্লী শহর পরিণত হলো ইলমের মারকাযে। দিল্লী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক হিসেবে হাদীসের চর্চা ও গবেষণা শুরু করলেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শাহ আব্দুল আজীজ দেহলভি পিতার পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ইংরেজদের কালো থাবায় সেই ইলমচর্চা কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেল। নেমে এলো বর্বরতা, পাশবিকতার মর্মন্তুদ অবিচার। ১২৪৮ হিজরীতে জন্ম হলো হুজ্জাতুল ইসলাম ক্বাসিম নানুতভির। লর্ড ম্যাকেলের চ্যলেঞ্জ গ্রহণ করে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করলেন দারুল উলূম দেওবন্দ। যেদিন দেওবন্দ মাদরাসার গোড়াপত্তন হলো; সেদিন দুনিয়ার মানচিত্র এক নতুন রঙে বিচিত্রিত হলো। ইতিহাসবিদ সেদিন রচনা করলেন দুনিয়ার ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। রহমতের ফিরিশতা সেদিন গোলামী ও অজ্ঞতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ মজলুম ভারতবাসীর কানে পৌঁছে দিলেন আজাদী ভ্রাতৃত্ব, আর সাম্যের মহা-পয়গাম। সময়ের ঘূর্ণনে, কালের পরিক্রমায় সেই দারুল উলূম আজ বিশ্ব কাঁপানো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সেই দারুল উলূম দেওবন্দের একজন কৃতি ছাত্র ছিলেন মাওলানা সহুল উসমানী ভাগলপুরী (রহ.)। ১৯১৭-১৮ সালের মাঝা-মাঝি সময়ে তিনি সরকারী আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার সুবাদে সিলেটে আসেন। তখনকার সময়ে সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসা বিখ্যাত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ছিল।
১৯১৩ সালের এক শুভক্ষণে সিলেট শহরের উপকন্ঠে কানিশাইল গ্রামে অনুষ্ঠিত তদানিন্তন সিলেট জেলার মুসলিম মৎসজীবী সমাজের এক সভায় উপস্থিত হয়ে বিশিষ্ট সমাজপতি ও শিক্ষাবিদ খান বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ সি, আই, ই, (কাপ্তান মিয়া) হযরত শাহজালাল (রহ.) এর পবিত্র সিলেট নগরীতে একটি উচ্চাঙ্গের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্যে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানালেন, উপস্থিত ব্যবসায়ীগণ তাতে এমনভাবে সাড়া দিলেন যে, তাদের একদিনের চাঁদার টাকায়ই বিশাল মাদরাসা কম্পাউন্ড, টিনের অর্ধপাকাঘর দরজা পাঠকক্ষসমূহের জন্যে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র মসজিদ ও বিশাল খেলার মাঠের ইন্তেজাম হয়ে যায়। সৈয়দ আব্দুল মজিদ সাহেবের দৌহিত্র বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আবু সালেহ রচিত ‘বিস্মৃত কাপ্তান’ পুস্তকে এর বিবরণ রয়েছে। খান বাহাদুর সাহেব ছিলেন আসামের শিক্ষামন্ত্রী, তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাদরাসাটি পরিচালনার দায়িত্ব আসাম প্রদেশের সরকার গ্রহণ করে। ১৯৩৭ সালে শায়খুল উলামা আবু নসর ওহীদ যখন আসাম প্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী, তখন তাঁর উদ্যোগে এ-মাদরাসায় টাইটেল ক্লাস খোলা হয়। সিলেটের অপর সমাজসেবী শেখঘাটের জিতু মিয়া সাহেব তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল কাদিরের নামে কাদেরিয়া বৃত্তি নামে একটি বৃত্তি চালু করেন। এভাবে গোটা উপমহাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানরূপে পূর্ণ একটি শতাব্দি ধরে এবং গোটা পূর্বভারতে ইসলামের আলো বিকিরণ করে চলে। গত শতাব্দির যে-সব পণ্ডিতাগ্রগণ্য ব্যক্তি এ মাদরাসায় অধ্যাপনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে মাওলানা সহুল উসমানী ভাগলপুরী, মাওলানা আব্দুল আজিজ পেশওয়ারী, মাওলানা শেরযামান হাজারভী, প্রিন্সিপাল রাহরুল উলূম মাওলানা মোহাম্মদ হুসাইন হুসাইন নিজপাঢী সিলেটি, ফখরুল মুহাদ্দিসিন মাওলানা ফৈয়াজ আলী (যিনি আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (র.) এর উস্তাদ) বিখ্যাত মানতেকি আলিম মাওলানা হাসান রেজা, ঢাকা আলিয়া মাদরাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য সচিব মাওলানা ইয়াকুব শরিফ, বিখ্যাত আরবি কবি মাওলানা আব্দুল্লাহ নদভী, মাওলানা মোহাম্মদ মোশাহিদ বাইমপুরী (র.) সহ আরো অনেক। এ মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভ করে যারা খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলাম সাহেব, বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, বহুগ্রন্থপ্রণেতা, কোলকাতা আলিয়া মাদরাসার প্রাক্তন হেড মাওলানা, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রাক্তন সভাপতি, মাওলানা তাহির কোম্পানিগঞ্জী, আসাম প্রদেশ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ও আসাম প্রাদেশিক পরিষদের পাঁচবারের পার্লামেন্ট সদস্য হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী। আসাম শ্রেষ্ঠ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র বাঁশকান্দি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মাওলানা আহমদ আলী, সিলেট শাহজালাল দরগাহ মসজিদের ৫৮ বছরের ইমাম ও খতিব এবং জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, মাওলানা আকবর আলী (র.), বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ, অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল মান্নান, দরগাহে হযরত শাহজালাল (র.) এর ভূতপূর্ব মুতাওয়াল্লী, বিশিষ্ট লেখক এ. জেড. আব্দুল্লাহ, বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য এনামুল হক চৌধুরী, সিলেট কাজির বাজার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান, জেদ্দাস্থ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের প্রাক্তন কন্সালট্যান্ট, বিখ্যাত লেখক গবেষক হাফিজ মাওলানা মুরতাহিনাবাল্লাহ জাসির, ইষ্ট লন্ডন জামে মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতীব হাফিজ মাওলানা আবু সাঈদ, ঢাকা তিব্বিয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা ইব্রাহিম আলী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক ষ্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ডক্টর আবু সাঈদ আব্দুল্লাহসহ অনেক খ্যাতিমান আলিম ও শিক্ষাবিদ এ মাদরাসা থেকে শিক্ষা অর্জন করেছেন। জ্ঞানের এই তীর্থ ভূমিতে মাওলানা সহুল উসমানীর সংযোগ ছিল একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। হাদিস ও ফেক্বাহ শাস্ত্রে এবং মাকুলাত বিষয়ের পাণ্ডিত্যে তখনকার বিদ্বৎসমাজে মাওলানা সহুল উসমানী ছিলেন প্রধান গণনীয় ব্যক্তি। ১৯১৭/১৮ সালের দিকে তিনি সিলেটে আসেন। কিন্তু সিলেটে তাঁর এই প্রথমবারের আগমন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বছরখানেক সময় তিনি সিলেটে অবস্থান করেন। এই সামান্য সময়ের প্রচেষ্টায় সিলেটের সারস্বতসমাজে যে পরিবর্তন সূচিত হয়; তা রীতিমতো বিস্ময়কর। মাওলানা সহুল উসমানীর বিদ্যাভিলাষী মনোভাব আর গুণপনার কারণে সিলেটের শিক্ষিত সমাজ দলে-দলে তাঁর সান্নিধ্যে আসতে থাকেন। তাঁর উন্নত চরিত্র, অগাধ পাণ্ডিত্য, চুম্বকের মতো মানুষকে আকর্ষণ করতে থাকে। গোটা শহর ভেঙ্গে মধুমক্ষিকার মতো মানুষ ছুটে আসতে থাকে তাঁর দরবারে। সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি একজন জ্ঞানবোদ্ধা, পণ্ডিতপ্রবর, ধীমান কাণ্ডারী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। সমাজের উচ্চ শিক্ষিত, ধর্মানুরাগী, সত্যসন্ধানী, সুধী ও কুশলিরা তাঁর চারপাশে জড়ো হতেন পরম মমতায়। মানুষের অফুরান শ্রদ্ধা আর অকৃত্রিম ভালোবাসায় তিনি এতই মুগ্ধ-মথিত হলেন যে, চাকুরির সুবাদে একাধিকবার সিলেটে আসতে তিনি সামান্যতম কুন্ঠা করেননি। সিলেটের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর হৃদয়ের গভীর টান তাঁকে বারবার এখানে আসতে প্রলুব্ধ করে। বছররাধিক কাল এখানে অধ্যাপনা করে যখন তিনি পাটনা যেতে চাইলেন, তখন প্রিন্সিপাল আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ সাহেব তাঁকে বারংবার বারণ করলেন, বললেন, ‘‘জনসাধারণ ক্রমান্বয়ে আপনার প্রতি আসক্ত হতে চলেছে। কিছুদিন পর গোটা আসাম আপনার পদতলে চলে আসবে। আপনি সিলেটে থেকে যান।’’ কিন্তু চাকুরিগত সুবিধা এবং পরিবারের সদস্যদের পীড়াপীড়ির কারণে তিনি সিলেট ছেড়ে পাটনা চলে যান। তাঁর চলে যাবার পর সিলেটবাসী হযরত মাদানী (র.) এর নিকট চিঠি লিখলেন, আমরা আপনার কাছে হাদিস পড়তে চাই। দয়া করে আপনি সিলেটে এসে আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করুন। যেহেতু হযরত মাদানী (র.) পূর্বে কখনো সিলেটে আসেননি; তাই হযরত মাওলানা সহুল উছমানী সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন, সিলেট শহরটি কেমন? পরিবেশ কীরকম? মানুষের অবস্থা কী? উত্তরে মাওলানা সহুল উছমানী লিখলেন; “আমি যাবার পূর্বে সিলেটের অবস্থা ভালো ছিল না, সিলেটবাসী দেওবন্দি আলিমদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন। আল্লাহর ফজলে এখন অবস্থা বিলকুল পাল্টে গেছে। পরিবেশ অনুকূল, জমিন উর্বর হয়ে আছে। আপনি গিয়ে বীজ বপন করুন।”
উত্তর পেয়ে হযরত মাদানী (র.) সিলেটে চলে এলেন। সিলেটে থাকাবস্থায় হযরত মাদানী (র.) এর ইলমি ঝরনাধারায় সিলেটের মাটি ও মানুষ যুগের পর যুগ সিক্ত হতে থাকে।
হযরত মাওলানা সহুল উসমানীর সাহচর্য যাদেরকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে, তারা হলেন: সৈয়দ জামিলুল হক সাহেব সৈয়দপুরী, প্রোফেসর মজদুদ্দিন সাহেব ফুলবাড়ী, বেগম সিরাজুন নেসা রশিদ চৌধুরী, মাস্টার তজম্মুল হুসাইন সাহেব, সৈয়দ নসীর আলী ডেপুটি কমিশনার, সৈয়দ তাফাজ্জাল হুসাইন (শিক্ষক, সিলেট আলীয়া মাদরাসা), মাওলানা লুতফুল হক চৌধুরী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাজের সাধারণ লোক ছাড়াও বিশেষ ব্যক্তিবর্গ মাওলানা সহুল উসমানীর সান্নিধ্যপ্রত্যাশী ছিলেন। বিশেষত: উকিল, বিচারক, ইংরেজী শিক্ষিত ও সমাজের উঁচু শ্রেণীর ব্যক্তিগণ তাঁর সান্নিধ্যপ্রার্থী ছিলেন। ফলে তিনি সর্বত্র ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারে ব্রতী হলেন। এ লক্ষ্যে তিনি দুটো কর্মসূচি গ্রহণ করলেন। প্রতি শুক্রবারে সুরমা নদীর তীরে ডাকবাংলার অপজিট পার্শ্বে শাহী মসজিদে একটি ইসলামি মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো, সে মাহফিলে হিন্দু মুসলমান সকলেই অংশগ্রহণ করতেন। মাওলানা সহুল উসমানী (র.) সে মাহফিলে উচ্চাঙ্গের বয়ান পেশ করতেন। প্রথমদিন আকিদা বিষয়ক আলোচনার দ্বারা মাহফিল শুরু করেন। বয়ান এতই জ্ঞানগর্ভ ছিল যে, কয়েক বৈঠকের পর মাওলানা আব্দুল মুসাওয়ির সাহেব যিনি সিলেটের প্রসিদ্ধ আলিম হিসেবে পরিচিত ছিলেন, বিস্ময়বিমুগ্ধ হয়ে বলে ওঠলেন, আকিদা কি জিনিস? সত্যিকার অর্থে আজ বুঝতে পারলাম, কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর সে বয়ানগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়নি কিংবা সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যদি সংরক্ষিত হতো, তবে আজ নতুন প্রজন্মের জন্যে তা জ্ঞানের অমূল্য রতœভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হতো। দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল, ঐতিহাসিক দরগাহ মসজিদে জিহাদ বিষয়ে আলোচনা করা। যেহেতু ইংরেজ রাজত্ব ছিল, তাই সিলেট আলীয়া মাদরাসায় কিতাবুল জিহাদ পড়ানো হত না। এ অধ্যায়টি পাঠ্যসূচির বাইরে ছিল। তিনি দরগাহ মসজিদে ফজরের নামাজের পর কিতাবুল জিহাদের দরস আরম্ভ করেন। মাদরাসা শিক্ষার্থী ছাত্র ছাড়াও সাধারণ শিক্ষিত, সুধীজনেরা এ দরসে উপস্থিত হতেন। মূলত এখান থেকেই জামেয়া প্রতিষ্ঠার সূচনা। এটা সেই সময়কার কথা, যখন সিলেট আলিয়া মাদরাসা সবেমাত্র কৈশোরকাল অতিক্রম করছে। আজ যে প্রতিষ্ঠান গোটা বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে তুলেছে সেই জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম মাদরাসাটি তখনও প্রতিষ্ঠা হয়নি। মাওলানা সহুল উসমানীর চতুর্পার্শ্বে বসে যারা জিহাদের  ফাযায়িল ও মাসায়িল শুনেছেন, দ্বীন সংরক্ষণের সবক নিয়েছেন, তাদের দ্বারা যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যে প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে, পরবর্তীতে এই প্রেক্ষাপটই মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক প্রমাণিত হয়। মূলত মাওলানা সহুল উসমানী দীর্ঘদিন পানি সেচ করে জমিনকে চাষাবাদ উপযোগী, উর্বর করে তুলেছিলেন, পরবর্তীতে তাঁর স্বহস্তে গড়া ছাত্র, মাওলানা আকবর আলী (র.) সেই জমিনে বীজ বপন করে এটিকে ফসলে-ফলনে ভরপুর করে তুলেন।
১৯৪৭ সালের সামান্য আগে মাওলানা সহুল উছমানীর পরামর্শে মাওলানা আকবার আলী রহ.-কে দরগাহ মসজিদের ইমাম নিয়োগ করা হয়। ইমামতির দায়িত্ব নেওয়ার কিছু দিন পর মাওলানা আকবর আলী রহ. তাঁর উস্তাদের অনুকরণে নামাজের পর মসজিদে দরসে কুরআন চালু করেন। তবে তা কেবল জিহাদের আয়াত ও হাদিসের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখেন নি; কেননা জিহাদের সেই বিশেষ প্রেক্ষাপট এখন আর নেই। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠি অনেক আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এখন প্রয়োজন মুসলমানদের আত্মগঠন ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের, ধর্ম বিষয়ক গভীর জ্ঞান আহরণের, তাই তিনি দ্বীনি বিষয়ক বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা মানুষের কাছে পেশ করতে লাগলেন। ক্বোরআনী আলোয় মানুষের হৃদয় যখন প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠল। মানুষের অন্তরে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রবিষ্ট হলো, তখন কুরআনপ্রেমিক জনতা একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার তাগিদ অনুভব করলেন। মানুষের স্বগত তামান্না পরিপূরণে ইমাম সাহেব ‘মাদরাসায়ে তালিমুল ক্বোরআন’ নামে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে সেই তালিমুল কুরআন প্রতিষ্ঠানটি ক্রমান্বয়ে বড় হতে হতে আজকের জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। জামেয়া যখন তার জাগরণী পয়গাম নিয়ে গোটা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে, তখন জামেয়ার কিছু হিতাকাঙ্খী ভাইয়েরা অভিযোগের আঙুল তুলে বলছেন, জামেয়ার একাডেমিক ও প্রশাসনিক কারিকুলাম উন্নত বটে; তবে জিহাদের ব্যাপারে, বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে জামেয়ার চিরায়ত নি®প্রভ ভূমিকা জামেয়ার সামুহিক উজ্জ্বলতাকে ম্লান করে রেখেছে। তাদের এমনতর অনুযোগের জবাবে আমরা বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই যে, জিহাদের মহান সবকের উপর ভিত্তি করে যে প্রতিষ্ঠানের পটভূমিকা তৈরি হয়েছে, জিহাদের সবক পঠন-পাঠনে যে জামেয়ার ভিত্তি রচিত হয়েছে, সেই জামেয়া জিহাদি তৎপরতায়, বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামমুখরতায় নিস্তরঙ্গ থেকে যাবে, তা কেবল উন্নাসিকতাই নয় বরং তাঁর শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার নামান্তর। তালিম-তাবলিগ আল-জিহাদের মূলমন্ত্রে উজ্জ্বীবিত হয়ে জামেয়া আজও অগ্রসরমান। কে না জানে জামেয়ার তালিমি তারাক্কির কথা? কে অস্বীকার করবে এর তাবলিগি নেজামের কথা? আর জিহাদ? বারুদের উত্তাপকে অস্বীকার করা যেতে পারে, এটমের বিস্ফোরণ অগ্রাহ্য করা যেতে পারে কিন্তু জামেয়ার জিহাদি জাগরণ কখনো অস্বীকার করা যাবে না। জামেয়ার জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত যত খালিস ইসলামি আন্দোলন হয়েছে, বাতিলের বিরুদ্ধে যত অরাজনৈতিক সংগ্রাম হয়েছে, তাতে জামেয়া কেবল অংশগ্রহণই করেনি; বরং সম্মুখপানে নেতৃত্ব দিয়েছে। অতীত তার প্রমাণ। সেই চেতনা আজও বহমান। নিম্নে এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি।
এক. জামেয়ার একজন শায়খুল হাদিস ছিলেন মাওলানা আব্দুল হান্নান (র.)। ১৯৭৩ ঈসায়ীতে তিনি জামেয়ার মুফতি হিসেবে যোগদান করেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন ইসলামি আন্দোলনের সংগ্রামী নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিরক-বিদাত রিজভি ফিতনার সফল মোকাবিলা করেছেন। তর্কযুদ্ধ বা মুনাজারার চ্যালেঞ্জে বেদাতিরা যতবারই মোকাবিলার দুঃসাহস দেখিয়েছে, ততবারই তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। ১২ ফেব্র“য়ারী ১৯৭৬ ঈসায়ী মোতাবেক ৪ঠা চৈত্র হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জের শিবপাশা গ্রামের বিতর্ক সভা থেকে রেজভিদের পলায়ন এরই উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
১৯৭৬ ঈসায়ীতে নরওয়েজীয় গির্জার পক্ষ থেকে উচ্চ শিক্ষিত ছোট একটি খ্রিস্টধর্ম প্রচারক দল বিভিন্ন কলেজে “বর্তমান খ্রিস্টধর্ম সঠিক, ইসলাম মিথ্যা, মুহাম্মদ ভণ্ড” (নাউযুবিল্লাহ) ইত্যাদি শ্লোগান প্রচার করতে থাকে। এক পর্যায়ে সিলেটের এম. সি কলেজে এসব প্রচারকালে কলেজের প্রফেসর বিখ্যাত কবি আফজাল চৌধুরীর সঙ্গে দুটি ধর্মের সত্যতা নিরূপণের জন্যে তারা তর্কযুদ্ধের সম্মতি জ্ঞাপন করে। কবি সাহেব তর্কযুদ্ধের জন্য সিলেটের আলিমগণের শরণাপন্ন হন। শ্রদ্ধেয় আলিমগণ সর্বসম্মতিক্রমে তর্কবিদ হিসেবে মুফতি আব্দুল হান্নান (রহ.)-কে মনোনীত করেন। নির্ধারিত  তারিখে নয়াসড়ক গির্জায় বিতর্ক শুরু হয়, সন্ধ্যালগ্ন থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত মুফতি আব্দুল হান্নান (রহ.) বিতর্ক যুদ্ধ চালিয়ে যান, (দুভাষী হিসেবে কবি আফজাল চৌধুরী সাহায্য করেন) যুক্তি ও প্রামাণ্য দলিল দ্বারা ইসলামের সত্যতা ও বর্তমান খ্রিস্টধর্মের ভ্রান্ততা প্রমাণিত ও ঘোষিত হতে থাকে। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ ধর্ম প্রচারকগণ নিরুত্তর হয়ে এই বলে সভা মুলতবী ঘোষণা করে যে, আরো বর্ধিত পরিসরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে বড় আকারের বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হবে। মুফতি সাহেব ও অধ্যাপক সাহেব সাদরে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। দিন তারিখ নির্দিষ্ট হয়, স্থান নির্ধারিত হয় প্রাক্তন জিন্নাহ হল বর্তমান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে। কিন্তু পরে পাদ্রীগণ তাদের প্রস্তাবিত বিতর্কসভায় অংশগ্রহণে টালবাহানা শুরু করে। ফলে আর বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়নি। এই ঘটনার পর বৃহত্তর সিলেটে আজ পর্যন্ত পাদ্রীরা তর্কযুদ্ধ বা মুনাজারার সাহস দেখায়নি”।
দুই. জামেয়ার আরেক শায়খুল হাদীস খতীব মাওলানা উবায়দুল হক (রহ.)। গোটা বাংলাদেশ কাঁপানো বীরকন্ঠ। খতমে নবুওয়ত বা কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবোন্মুখ জনতার প্রধান রাহবর ছিলেন তিনি। বিশ্বনবীর ব্যঙ্গকার্টুন অঙ্কনকারী বেয়াদব সাংবাদিক তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে জনতার ক্ষোভানল থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
তিন. মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরী। জামেয়ার সাবেক মুহাদ্দিস। দরগাহ মাদরাসায় থাকাকালীন তিনি ক্বোরআনী আইন সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি ছিলেন। নারীনীতি বিরোধী আন্দোলন, ফাতওয়া বিরোধী আন্দোলনে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব গোটা আলিমসমাজকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল। সিলেট সিটি পয়েন্টে ৫০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটিয়েছিলেন তিনি।
চার. মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী। জামেয়ার বর্তমান শায়খুল হাদীস ও সদর মুদারিরস। ব্লগে মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদে বিশ্বকাঁপানো যে আন্দোলন রচিত হয়, মাওলানা মুহিব্বুল হক সেই আন্দোলনের সিলেট জেলার আমীর পদে সমাসীন।
পাঁচ. মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া। জামেয়ার কীর্তিমান ফাযিল। বিরল প্রতিভাধর আলিম। জামেয়ার বর্তমান কর্ণধার ও মুহতামিম। খ্রিস্টবাদের বিরুদ্ধে বই লিখেছেন। বাতিলের মুখোশ উন্মোচন করে সত্যের আলো প্রকাশ করেছেন। মিডিয়ার অশুভ প্রচারণায় মাযহাব যখন সন্ধিগ্ধ, ইমাম আবু হানিফা রহ.’র যথার্থ উত্তরসূরী হিসেবে একাই এক মিছিল হয়ে লড়ে যাচ্ছেন।
মোট কথা, ইসলাম ও মুসলমান যখনই আক্রান্ত হয়েছে, নিরপেক্ষ-নির্ভেজাল ইসলামী আন্দোলনের ডাক এসেছে, শাহজালালের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে জামেয়ার সন্তানরা সেই আন্দেলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে সামান্যতম পিছপা হয়নি। তবে হ্যা! যে আন্দোলন রাজনীতির গ্যাড়াকলে সন্ধিগ্ধ হয়েছে; কিংবা স্বার্থসিদ্ধির সংক্রমণে সংক্রমিত হয়েছে। সেই আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেওয়া জামেয়া  শ্রেয় মনে করেছে।
যে ভাবে প্রতিষ্ঠা হলো জামেয়া:
আরবের বুকে যখন ইসলামের প্রথম সূর্য উদিত হয়, তখন ইসলামের নব প্রভাতের মৃদু সমীরণের পরশ নিতে আবালবৃদ্ধবনিতা রাসুলে আকরাম (স.)-এর দরবারে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতে থাকেন। রহমতে দু-জাহান রাসুলুলল্লাহ (স.) আল্লাহ প্রদত্ত ইলমের অমীয়সুধা তৃষ্ণার্থ সাহাবাগণের মাঝে বিলিয়ে দিতে থাকেন। গঠিত হয় ‘আসহাবে সুফফার’ মাদরাসা। হুবহু এরই যেনো পুনরাবৃত্তি ঘটল এই জামেয়ার বেলায়। জাহেলিয়্যাতের ঘনঘোর অন্ধকারে আবদ্ধ মুক্তিকামী মানুষ যখন দ্বীনের সুশীতল হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য উদগ্রীব। তখন মুক্তির দিশারী আরিফবিল্লাহ হজরত মাওলানা আকবর আলী (র.) ইলমেওহির জ্ঞান মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে মনস্থ করেন। হজরত ইমাম সাহেব নামাজের পর মুসল্লিদের ‘তরজমায়ে কোরআন’ শুনানো শুরু করেন। মুসল্লিদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। বয়স্ক ও বালক বালিকারা ইসলামি শিক্ষা গ্রহণের জন্য ইমাম সাহেবের খেদমতে জড়ো হতে থাকেন, ক্রমান্বয়ে মেট্রিকের ছাত্ররাও তাঁর কাছে কোরআন শরিফ পড়া আরম্ভ করে। দরগাহ মহল্লার মানুষের চাহিদা ও আগ্রহে শিশু কিশোররাও আসতে থাকে দ্বীনের সার্বিক জ্ঞান আহরণের জন্য। এভাবেই চলতে থাকে দীর্ঘদিন।
অতঃপর যখন খলিফায়ে হাকিমুল উম্মত, মুফতিয়ে আজম, মুফতি শফি (রহ.) সিলেট সফরে আগমন করেন। তখন হজরত ইমাম সাহেবকে একটি মক্তব বা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শ ও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘আরিফ বিল্লাহ রাহবরে তরিকত ইমাম আকবর আলী (রহ.) মাজারের দক্ষিণপার্শ্বে ১৯৬১ সনের ৭ নভেম্বর মোতাবেক ১৩৮১ হিজরির ১৮ জামাদাউল উলা একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন ‘মাদরাসায়ে তালিমুল কোরআন দরগাহে হজরত শাহজালাল (র.)’। যা আজকের এই জামেয়া। তালিম তাবলিগের গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত মুসলিম উম্মাহর সেরা সন্তান ইমাম আকবর আলী (র.) তাঁর নিষ্ঠাপূর্ণ অক্লান্ত পরিশ্রমের বদৌলতেই সেদিনকার সেই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটি আজ তাঁর মিশন নিয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছে। কালের ঝুড়ি থেকে পঞ্চান্নটি বসন্ত ঝরে পড়েছে। হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে অনেক বন্ধুর পথ মাড়িয়ে আজ বহু দূর এগিয়ে এসেছে এই জামেয়া। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বহুদেশে পৌঁছে গেছে তাঁর জাগরণী পয়গাম। বলতে দ্বিধা নেই ‘জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম’ কোনও গতানুগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, একটি দ্বীনি আন্দোলন। একটি নীরব বিপ্লব। এ ক্ষুদ্র পরিসরে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। কয়েকটি মূল পয়েন্টের ওপর অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো ইনশা আল্লাহ।
জামেয়া প্রতিষ্ঠায় যারা সার্বিক সহযোগিতা করেন:
পৃথিবীর বুকে যে কোনও প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পেছনে কারও সহযোগিতা, কারও অবদান থাকে, তেমনই এই জামেয়া প্রতিষ্ঠার পেছনেও একদল নিবেদিতপ্রাণ নিরলস কর্মবীর মানুষের অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে যারা সর্বাগ্রে, তারা হলেন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট হাজি আরশাদ আলী সাহেব ও তাঁর ছাত্র দরগাহ শরিফের প্রাক্তন প্রভাবশালী মুতাওয়াল্লি এ জেড আব্দুল্লাহ সাহেব ও দরগাহ মসজিদের প্রাক্তন ইমাম ছাঈদ আলী কাছারী সাহেব। হাজী আরশাদ আলী সাহেবের সুপারিশে সরেকওম এ জেড আবদুল্লাহ সাহেব মাদরাসার জায়গা করে দেন। তাঁদের নাম অনুচ্চারণে জামেয়ার ইতিহাস রচনা অলিক কল্পনা বৈ কিছু নয়।
জামেয়ার নাম প্রসঙ্গ:
জামেয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল ‘মাদরাসায়ে তালিমুল কোরআন দরগাহে হজরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট’। জামেয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আর পশ্চাতে ফিরে তাকাতে হয়নি। যদিও এটা সত্য যে, প্রত্যেক উৎকৃষ্ট কাজের সূচনাতে বাধা-বিপত্তির উদ্ভব ঘটে। এ সব প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতা, চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে অগ্রসর হতে হয়। তেমনই এই জামেয়াও প্রতিকূলতার হিমালয় ডিঙিয়ে অনেক বাধার বিয়াবান পেরিয়ে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হতে থাকে তাঁর লক্ষ্যপানে। জামেয়ার এই উন্নততর রূপ শিক্ষার সফলতা ও ব্যাপকতার কারণে প্রয়োজন পড়ে নাম পরিবর্তনের। অতঃপর ১৯৭৫ ঈসায়ী সনে যখন খলিফায়ে থানভী ক্বারী তৈয়্যিব (রহ.) সিলেট আগমন করেন। তখন তিনি রাসুলে করিম (স.)-এর হাদিস : ‘ইন্নামা আনা ক্বাসিমুন ওয়াল্লাহু ইউতি’ অর্থাৎ আমি হলাম জ্ঞান বিতরণকারী আর মহান আল্লাহ হলেন এর দাতা, এর দিকে লক্ষ্য রেখে এর নাম রাখেন মাদরাসায়ে ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ হজরত শাহজালাল (রহ.)। এর আরও কিছুদিন পরে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হলে মাদরাসা শব্দের স্থলে ‘জামেয়া’ শব্দ সংযোজন করা হয়।
লেখক : শিক্ষক, জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ, রাইটার এন্ড টকার বাংলাদেশ বেতার সিলেট।