নারীর রূপসৌন্দর্য্যরে উৎপত্তি এবং বিকাশ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

পর্দা শব্দটি দীর্ঘকাল পর্যন্ত স্বয়ং মুসলমানদের জন্যেই অপরিচিত এবং অস্পষ্টবোধক ছিল। অবস্থা ও যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পর্দার বিভিন্ন অর্থ বের করা হয়। সুতরাং অনেক লোক বিভ্রান্তি বশতঃ পর্দার অর্থ বলতে নারীকে অন্ধকার ঘরে বসিয়ে রাখাকে বুঝিয়েছে, যেখান থেকে নারী যেন কোথাও আসতে বা যেতে না পারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ক্ষেত্রে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, বিয়ের পর মেয়েরা শুধু নিজের পিতৃগৃহ ছাড়া আর কোথাও যাতায়াত করতে পারতো না এবং স্বামীর গৃহ থেকেই শেষবারের মতো তার জানাযা বের হতো। এটাকে তারা তাদের পারিবারিক আভিজাত্যের প্রতীক মনে করতো এবং এটা ছিল তাদের কাছে বিশেষ প্রশংসনীয় বিষয়। এ ধরনের বিদঘুটে অবস্থায় নারী যদি কোন মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়তো তাহলে এমনকি ডাক্তারকে ও রুগিনীকে দেখার অনুমতি দেওয়া হতো না। কেবল মেয়ের পিতা, ভাই এবং শ্বশুর তাকে দেখার সুযোগ পেতো। এছাড়া রুগিনীকে কেউ দেখতেও পেত না, তা কেউ ডাক্তার হোক বা কোন নিকটাত্মীয়।
কোন কোন ক্ষেত্রে এই কড়াকড়ি কিছুটা কম ছিল। সেক্ষেত্রে মেয়ে নিকটাত্মীয়দের বাড়ী যাতায়াত করতে পারতো। তবে এই আসা যাওয়ার অনুমতি ছিল শুধু রাতের বেলায় কারণ তখন তার উপর পর-পুরুষের দৃষ্টি পড়ার আশঙ্কা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। আর ধনী পরিবারের মেয়েরা পালকি বা পশুচালিত যানবাহনে যাতায়াত করতো। কিন্তু এসব পালকি ও যানবাহনের দরজা জানালা খুব ভালো করে বন্ধ রাখা হতো। যদি দরজা জানালা না থাকতো তাহলে পুরো পালকি বা বাহনটিকে কাপড় দিয়ে মুড়ে দেওয়া হতো।
যাই হোক, পদব্রজে হোক বা যানবাহনে উভয় অবস্থাতেই নারীকে কড়া পর্দার বিশেষ ব্যবস্থা মেনে চলতে হতো। কাপড়ের উপর আরো কাপড় ঢেকে তার পুরো অস্তিত্বটাকে এমনভাবে ঢেকে দেওয়া হতো যে, আপাদমস্তক শরীরের সবকিছুই পুরু পর্দার অন্তরালে হারিয়ে যেতো এবং পর্দাটা এতই লম্বা হতো যে, তার একটি অংশ মাটিতেই লুটোপুটি খেতো। এই কঠোর পর্দা ব্যবস্থা আজও কোথাও কোথাও পরিলক্ষিত হয়। পর্দার এই স্ব-প্রবর্তিত ব্যবস্থা শহরের ও গ্রামের ধনী ও অভিজাত লোকদের একটি ফ্যাশনে পরিণত ছিল।
সুতরাং বিখ্যাত আধুনিকতাবাদী কাসেম আমীন বেগের মতো লোকেরা যখন নারী স্বাধীনতার পতাকা তোলেন তখন সমাজে পরিচালিত এ ধরনের কঠোর পর্দা ব্যবস্থারই সমালোচনা করে একে ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেন এবং এও বলেন, যে এটা ইসলামের নির্দেশিত মানবিক সাম্যের বিরোধী, কারণ এতে করে নারীর ব্যক্তিত্ব খর্ব হয়। এসব যুক্তির বুনিয়াদের উপর তাঁরা চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সমাজকে নিজেদের পক্ষে দলভুক্ত করেন।
উম্মুল মোমেনিনদের পর্দা :  সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, পুরো কোরআন শরীফে পর্দা সম্পর্কে একটিমাত্র আয়াত রয়েছে। আর এ আয়াত উম্মুল মোমেনিন অর্থাৎ প্রিয়নবীর (সা:) স্ত্রীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। এর পটভূমিতে রয়েছে সেই বিখ্যাত ঘটনা যা কোরআনের ব্যাখ্যাকাররা তাঁদের তফসীর গ্রন্থসমূহে উল্লেখ করেছেন। কোরআনের পর্দা সংক্রান্ত সেই আয়াতটি হচ্ছে- ‘হে ঈমানদারগণ! নবীর গৃহসমূহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো না, খাবার সময়ও উঁকি দিও না। তবে হ্যাঁ, তোমাদেরকে যদি খেতে ডাকা হয় তাহলে অবশ্যই আসবে। যখন খাবার খেয়ে নেবে তখন চলে যাবে। কথাবার্তায় লেগে থেকো না। তোমাদের এ সব ব্যবহার নবীকে দুঃখ দেয় কিন্তু তিনি লজ্জার কারণে কিছু বলেন না, আর আল্লাহ সত্যকথা বলতে লজ্জা করেন না। নবীর স্ত্রীদের কাছে যদি তোমাদের কিছু চাইতে হয় তাহলে পর্দার পেছন থেকে চেয়ে নিও। এটা তোমাদের এবং তাদের মনের পবিত্রতার জন্যে উত্তম পন্থা। তোমাদের জন্যে এটা কখনো বৈধ নয় যে, আল্লাহর রাসূলকে দুঃখ দেবে এবং তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীদের সাথে বিয়ে করাও বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে বিরাট পাপ। তোমরা কোন কথা প্রকাশ কর বা গোপন কর- আল্লাহ সব কথাই জানেন।” (আহ্যাব-৫৩)
এই আয়াতকেই পর্দার আয়াত বলা হয়। এই আয়াত অবতরণের অনেক আগেই শুধু ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ অনুধাবনের আলোকেই এবং আল্লাহর ওহীর সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই হযরত উমর উম্মুল মোমেনীনদের পর্দার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সুতরাং হযরত উমর একাধিকবার প্রিয়নবীর কাছে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ করেন যে, “ওগো আল্লাহর রাসূল (রা:)! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন যে তাঁরা যেন পর্দা করেন।” কিন্তু যেহেতু আইন প্রণয়নের ব্যাপারে তিনি স্বাধীন ছিলেন না, তাই তিনি এ ব্যাপারে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষা করেন। বোখারী-মুসলিমে হযরত আনাস বিন মালেকের বর্ণনা মওজুদ রয়েছে। তাতে রয়েছে, হযরত উমর প্রিয়নবীর সমীপে উপস্থিত হয়ে বললেন- “ওগো আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনার কাছে ভালমন্দ সব রকমের লোক আসে। হয়তো ভাল হবে, যদি আপনি আপনার লোক পবিত্র স্ত্রীদের পর্দা করার আদেশ দিয়ে দেন!” ‘সুতরাং এই পর্দার আয়াত নাজিল হয় এবং এর অবতরণ সেই প্রাতঃকালে হয় যেদিন প্রিয়নবী হযরত যয়নব বিনতে জায়েদকে বিয়ে করেন।
শুধু তাই নয়। অন্য এক বর্ণনা মোতাবেক হযরত উমর-এর অভিমত ছিল- এই পর্দা সে রকমের হবে যে, কেহ যেমন তাঁদের গৃহে যাবে না তেমনি তাঁরা নিজেরাও ঘর থেকে বেরুবেন না। এমনকি কেউ যেন তাঁদের দেখতে না পায়।
হাদীসের বর্ণনায় আরো একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তা হচ্ছে উম্মুল মো’মেনিন হযরত সাওদাহ বিনতে জামেয়া (রাঃ) এক রাতে নিজের কোন প্রয়োজনে পর্দা সহকারে বাইরে গিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে হযরত উমরের দৃষ্টি তাঁর উপর পড়ে। যেহেতু তিনি দীঘাকৃতির ছিলেন এজন্যে হযরত উমর তাঁকে চিনে নেন এবং বলেন; “খোদার শপথ হে সাওদা (রা:)! আপনি আমাদের দৃষ্টি থেকে লুকোতে পারেন না। দেখেই চেনা যায়, সুতরাং আপনি বাহিরে বের হবেন না।” একথা শুনে হযরত সাওদা (রা:) প্রিয়নবীর (সা:) কাছে উপস্থিত হন এবং পুরো ঘটনা খুলে বলেন- প্রিয়নবী (রা:) তখন হযরত আয়েশার গৃহে নৈশভোজ গ্রহণ করছিলেন। একথা শুনে প্রিয়নবী এলহামী অবস্থায় পড়েন এবং বলেন- “তোমাদের জন্যে এই অনুমতি রযেছে যে, তোমরা নিজেদের প্রয়োজনে বাইরে বেরুতে পারবো।” এই ঘটনা, ইমাম বোখারীর সহীহ হাদীস এবং তফসীরের বিভিন্ন গ্রন্থে যেমন তাবারী, ইবনে কাসীর এবং কুরতবীতে দেখা যেতে পারে। প্রামাণ্য দলিলের জন্যে ওসব গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করুন।)
হাফেয ইবনে হাযার ফতহুল বারীতে লিখেছেন- “পর্দার আয়াত অবতরণের পর হযরত উমর এ ব্যাপারে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন যে, পর্দাবৃতা কোন মহিলার ব্যক্তিত্ব যেন চেনা না যেতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করেন। তাঁকে এ ধরনের বাড়াবাড়ি করতে বারণ করে দেওয়া হয় এবং উম্মুল মো’মোনিনদেরকে নিজেদের প্রয়োজনে বাইরে বেরুবার অনুমতি দেওয়া হয় যেন তাঁরা কোন অসুবিধায় না পড়েন।” উপরের বিস্তারিত বিবরণ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, উম্মুল মো’মোনিনদের জন্যে যে ধরণের পর্দা ফরয করা হয়েছিল তা তাদের মুখমন্ডল এবং হাতের পর্দা ছিল। তা তাঁদের পর্দাবৃত ব্যক্তিত্বের পর্দা ছিল না।
বিখ্যাত ফকীহ্ কাজী আয়াম এ প্রসঙ্গে বলেন- “এ ব্যাপারে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে, উম্মুল মোমোনীনদের উপর যে ধরনের পর্দা করা ফরয করা হয়েছিল তাতে মুখমন্ডল ও হাত শামিল রয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রেও এসব খোলা রাখার অনুমতি ছিল না- তা স্বাস্থ্যের ব্যাপারই হোক বা অন্য কিছু।”
একই দেখাদেখি অভিজাত মহলের মহিলারাও নিজেদের জন্যেও সেই ধরনের পর্দা বেছে নেন যা আল্লাহ উম্মুল মোমেনিনদের জন্যে পছন্দ করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধু উত্তম ব্যবহার অনুসরণ করা। অতএব, প্রিয়নবীর (সা:) আমল থেকেই তার অনুসরণ চলছে। কিন্তু পরবর্তী যুগে পর্দার ব্যাপারে আরো অতিরিক্ত বিধিনিষেধ ও বাড়াবাড়ীর সমন্বয় ঘটে- যেমন আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। এভাবে পর্দার নামে কঠোর প্রথা সমাজে প্রচলিত হতে শুরু করে এবং এক শ্রেণীর লোক এটাকে তাদের পারিবারিক আভিজাত্যের অংশে পরিণত করে নেয়। এভাবে তাঁরা পর্দার ইসলামী উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকেই খর্ব করে। তাদের পর্দাটা ইসলামী না হয়ে একটা প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়ে গেছে। (সুতরাং কেউ বিয়ের পয়গাম দিয়েও নিজের হবু স্ত্রীকে দেখার অনুমতি পায় না। অথচ শরীয়তে তার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু শরীয়তের বিধানের দিকে তাদের দৃষ্টি কি থাকবে তারা তো সামাজিক প্রচলন নিয়েই বেশী মাথা ঘামায়।)
মুসলিম নারীর পর্দা : পর্দা মুসলিম নারীর সেই স্বতন্ত্র ভূষণ যা ইসলাম তার জন্যে নির্দ্ধারিত করেছে। ইসলাম পর্দার মাধ্যমে অন্ধকার যুগের অশ্লীলতা ও দেহপ্রদর্শনী প্রথার মূলোচ্ছেদ করেছে এবং পর্দাহীন সমাজে সৃষ্ট যাবতীয় বেলেল্লাপনা ও যৌন অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করে দেওয়ার কার্য্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এখানে ইসলামের মহৎ উদ্দেশ্য প্রমাণিত করার জন্যে এবং ইসলামী সমাজে নারীর মর্যাদা ও গুরুত্ব কার্যকরী করার জন্যে অন্ধকার যুগের কিছু ঘটনার উল্লেখ করা উচিত ছিল- যা থেকে এটা বুঝা যেতো যে, ইসলাম পর্দার ব্যবস্থা করে নারী জাতিকে কি দারুণ বিপর্যয় ও দুরবস্থা থেকে রক্ষা করেছে। এতে করে সে সব লোকদের মুখোশও উন্মোচিত হয়ে পড়তো যাঁরা নারীকে কেবল পাশবিক উল্লাসের সম্বল বলে মনে করে। কিন্তু সেসব ঘৃণ্য-জঘন্য-যৌন নোংরামীর বিস্তারিত বিবরণ পেশ করে আমরা আমাদের পাঠক-পাঠিকাদের পবিত্র মনকে তমসাচ্ছন্ন করতে চাই না। তবে অন্ধকার যুগের সামাজিক পরিবেশের একটা চিত্র তুলে ধরার জন্যে পবিত্র কোরআনে যে সব প্রয়োজনীয় আয়াত বর্ণিত হয়েছে তা অধ্যয়ন করার পরামর্শ আমরা অবশ্যই দেবো। পবিত্র-কোরআনের এসব আয়াতে অন্ধকার যুগের বিভিন্ন বদ-অভ্যাস, কুসংস্কার ও অশ্লীলতার নিন্দা ও সমালোচনা করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে প্রচলিত নোংরামীর জন্যে তাদের তিরস্কার ও ভৎর্সনা করা হয়েছে। সাথে সাথে এমন সব আইনবিধিও প্রণয়ন করা হয়েছে যার বাস্তবায়ন করে ঐসব অপরাধ প্রবণতা, নোংরামী ও অশ্লীলতা থেকে তারা মুক্তি পেতে পারে। এসব আয়াত অধ্যয়ন করলে বুঝা যাবে যে, অন্ধকার যুগে নারীর অবস্থা কত বেদনাদায়ক ছিল এবং ইসলাম কিভাবে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর আগে নারী ছিল শোষিতা, নিপীড়িতা, নির্যাতিতা। ইসলাম নারীকে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়ে অবনতির অতল তল থেকে উন্নতি ও মর্যাদার উচ্চতম পর্যায়ে এনে আসন দিয়েছে। ইসলাম নারীকে শিক্ষা দীক্ষায় ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সমুজ্জ্বল করে জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমনকি আধ্যাত্মিকভাবেও উচ্চতর মর্যাদা দান করেছে। আগে যেখানে নারীকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দিতেও সবাই অপ্রস্তুত ছিল, সেখানে ইসলামই শুধু তাকে পূর্ণ মানুষ বলে ঘোষণা করেছে এবং তাকে সেবা করা ও শ্রদ্ধা করাকে আল্লাহ ইবাদাতের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে।
নীচে আমরা ইসলামের এমন কিছু বিশেষ মূলনীতির উল্লেখ করবো যা সামষ্টিক ও মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে কোন সমাজের জন্যে অত্যন্ত মূল্যবান প্রমাণিত হবে।
(১) সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে যথার্থ সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইসলামের সব বিধি-বিধানে নারী-পুরুষ উভয়কে একই গুরুত্ব দিয়ে সম্বোধন করা হয়েছে। কোরআনে একদিকে যেমন বলা হয়েছে যে-“হে নবী! মুমিন নারীদের বলুন যে, তারা নিজেদের দৃষ্টি নীচে রাখবে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করবে।” সেখানে সাথে সাথে এও বলা হয়েছে যে- “হে নবী! মুমিন পুরুষদের বলুন যে, তারা নিজেদের দৃষ্টি নীচে রাখবে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করবে।” বলা বাহুল্য, পবিত্র কোরআনে নারী-পুরুষ উভয়কে একই বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিয়ে আহ্বান জানানো হয়েছে।
(২) ইসলাম, মন মগজের পরিচ্ছন্নতা, মানুষের আভ্যন্তরীণ অবস্থা গঠন, এবং সামাজিক পরিবেশকে অশ্লীলতা ও অপরাধ প্রবণতার যাবতীয় কার্যকলাপ থেকে মুক্ত করতে চায়। কারণ যাবতীয় পাপ, অপরাধ ও নোংরামীর উৎস মানুষের মন্দ কাজের সাথে সম্পৃক্ত। এক্ষেত্রে ইসলাম নারী ও পুরুষকে আলাদা আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না কারণ নারী ও পুরুষ উভয়ই সমাজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সুতরাং পবিত্র কোরআনে উভয়েরই সংশোধনের আইন জারী হয়েছে, যেমন আল্লাহ বলেছেন- “নবীর স্ত্রীদের নিকট হতে কিছু চাইতে হলে পর্দার আড়াল হ’তে চাও। তোমাদের ও তাঁদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটাই উত্তম পন্থা।” (আহযাব ঃ ৫৩)
এই আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে, নারী ও পুরুষ উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্য হচ্ছে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ের পরিশোধন করা। সুতরাং আয়াতের পরবর্তী বাক্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইসলামের আসল উদ্দেশ্য মানুষের হৃদয়কে সবরকমের কলুষতা থেকে মুক্ত রাখা এবং হৃদয়কে পুতঃ পবিত্র করে তোলা। ইমাম এই কোরআনী বাক্যের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন-“….এর অর্থ এই যে, চোখের মাধ্যমে পাপের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং দৃষ্টির উল্লেখ বিশেষভাবে এজন্যে করা হয়েছে যে, হৃদয়ের আবেগকে উত্তেজিত করার ক্ষেত্রে চোখ অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। পুরুষ হোক বা নারী- উভয়ই অতি সহজে ও অতি শিগগীর দৃষ্টির তীরে বিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মানুষ সব সময় নীচের দিকে দৃষ্টি রাখবে- উপরে তাকাবেই না! না তা নয়। যদি তাই হতো তাহলে এটা ভীষণ কষ্টকর হতো, কারণ মানুষ সমাজে থাকে, তাকে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে হয়। এখন যদি সব সময় নিচের দিকেই চেয়ে হাঁটতে হয় তাহলে নানারকম অসুবিধের সম্ভাবনা থাকে। তাই ইসলামের এই কথা যে “নীচের দিকে দৃষ্টি রেখো” তার আসল অর্থ হচ্ছে মনকে সেসব চিন্তা ও বাসনা থেকে মুক্ত রাখ যাতে মন কলুষ ভাবনায় জড়িয়ে পড়তে পারে। পবিত্র কোরআন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীকে এই শিক্ষা দেয় যে তারা যেন তাদের মন-মেজাজকে ভ্রান্ত বিষয়াবলিতে জড়িত না করে এমন সব কল্যাণমূলক কাজে মনোযোগ দেয় যাতে সমাজের উপকার ও উন্নতি হয়। তারা যেন এমন সব বিষয়াবলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে যাতে জীবনের উন্নত ও মহত্তম মূল্যবোধ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যায়, যেন নিজেকে নিজে চিনতে ও জানতে পারে। এসব বিষয় মানুষের সাহস ও উদ্যম বাড়ায়, চিন্তাকে সুদূর প্রসারী করে এবং হীন ও তুচ্ছ তৎপরতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। এসব আবেগ অনুভূতি নিয়ে ব্যক্তি যখন তার পরিবেশের দিকে তাকায় তখন তার মনে সাহস, উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনুভব করে। এরপর সে তুচ্ছ ব্যাপার সমূহের দিকে আকর্ষণ বোধ করে না। যেমন হঠাৎ কোন সুন্দরী রূপসী নারীর দিকে চোখ পড়লেও তার মনমেজাজ কোনরকম মন্দ ভাব জাগে না, সে তার দৃষ্টি ও চিন্তাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যেন কোন ব্যাপারটা কিছুই নয় এবং সে দেখা মাত্রই তার দৃষ্টিকে অন্যত্র ফিরিয়ে নেয়। একই অবস্থা একজন মো’মেনা নারীরও।
(৩) তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ইসলাম মানুষকে সৎ, পুতঃপবিত্র, নম্র ও ভদ্র করে গড়ে তোলে। অন্ধকার যুগে নরনারী যেমন অসংখ্য রকমের পাপাচার, কুপ্রথা ও কুকর্মে অভ্যস্থ ছিল তেমনি নৈতিক ও চারিত্রিকভাবেও তারা ছিল দেউলিয়া। সেই সমাজের নারী পুরুষ অবাধে অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত থাকতো।
অন্ধকার যুগের অসংখ্য কুপ্রথার মধ্যে একটি ছিল নারীদের সৌন্দর্য্য ও দেহপ্রদর্শনীর প্রথা। তারা পথ চলতে গিয়ে রূপের প্রদর্শনী করতো, কখনো চপলা, কখনো চঞ্চলা, কখনো থমকে থমকে, কখনো থেকে থেকে বিভিন্ন রকমের কসরৎ ও অভিনয় করে পথ চলতো। আর এভাবে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তারা লোকদের ব্যভিচারের জন্য উস্কাতো। ইসলাম অন্ধকার যুগের এই কুপ্রথা ও অশ্লীলতাকে উচ্ছেদ করে ঘোষণা করে যে- ‘বর্বর যুগের রূপচর্চা ও দেহপ্রদর্শনী করে ঘোরাফেরা করো না।” (আহযাব-৪)
অর্থাৎ তাদের আদেশ দেওয়া হলো যে, ইসলাম আবির্ভাবের আগে যেভাবে তোমরা রূপচর্চা ও প্রদর্শনীর যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দাও। প্রথমতঃ তোমরা বিনা দরকারে ঘর থেকেই বের হয়ো না। আর যদি দরকারবশতঃ বেরুতেই হয় তাহলেই এভাবে বের হবে যেন মর্যাদা ও শালীনতা ক্ষুণœ না হয়। আর তার উপায় হচ্ছে এই যে, তোমরা নিজেদের উপর চাদর ঢেকে পর্দা করা যেন মনে হয় যে তোমরা পুতঃপবিত্র এবং সভ্রান্ত মহিলা। যেমন আল্লাহ বলেছেন- “হে নবী! নিজের স্ত্রীদের এবং মেয়েদের এবং মুসলমান নারীদের বলে দাও যে, ‘তারা যেন নিজেদের উপর নিজেদের চাদরের ঘোমটা টেনে দেয়।’ এই ব্যবস্থায় একথা অধিকতর প্রত্যাশাযোগ্য যে, তাদের চিনে নেওয়া যাবে এবং তাদের বিরক্ত করা হবে না।” (আহযাব- ৫৯)
উল্লেখযোগ্য যে, চাদর এবং ঘোমটা টানার অর্থ এই হবে যে, নারীর সব গোপন অঙ্গ তাতে ঢাকা পড়ে যাবে। এ ব্যাপারে ইবনে কাসীর আকরামার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে- এর অর্থ হচ্ছে এমন চাদর যা তার মাথা, চুল এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ঢেকে নেয়। অন্ধকার যুগে আরেক নোংরামীর উল্লেখ করে ইবনে কাসীর বলেন- “রাত্রিবেলা শহরের গুন্ডা প্রকৃতির লোকেরা বিভিন্নস্থানে ওৎ পেতে বসে থাকতো এবং যাতায়াত কারিনী নারীদের উত্যক্ত করতো। কিন্তু কোন মহিলা যদি পর্দায় থাকতো তাহলে তাকে কোন রকমের বিরক্ত না করে নিরাপদে চলে যেতে দিতো।”
উপরের আয়াতের পরই এই নীচের আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এতে অসৎ লোকদের উদ্দেশ্য কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলা হয় যে, তারা যদি তাদের মন্দ কার্যকলাপ পরিত্যাগ না করে তাহলে তাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ বলেন- “যদি মুনাফেকরা এবং ওসব লোকেরা যাদের মনে মন্দ প্রবণতা রয়েছে এবং ওরা যারা মদীনায় উত্তেজনাকর গুজব ছড়াচ্ছে নিজেদের কার্যকলাপ থেকে যদি বিরত না হয় তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে তোমাদের দাঁড় করিয়ে দেবো, এর পর তারা এই শহরে খুব করেই তোমাদের সাথে অবস্থান করতে পারবে। তাদের উপর সব দিক থেকে অভিশাপের বৃষ্টি পড়বে, যেখানেই যাবে ধরা পড়বে এবং শোচনীয়ভাবে মারা পড়বে। (আহযাব- ৬০-৬১)
এই আয়াতে আল্লাহতাআলা উভয় শ্রেণীর অপরাধের মান একই রকম বর্ণনা করেছেন এবং তাদের জন্যে একই রকম শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। সাধারণতঃ নারীদের সাথে নোংরা আচরণকারীদের অপরাধ রাজনৈতিক চক্রান্তকারীদের অপরাধের তুলনায় অনেক হাল্কা মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে উভয় ধরনের অপরাধ একই শাস্তির আওতায় পড়ে এবং দুটি অপরাধই সমানভাবে জঘন্য। এক ধরনের লোক রাজনৈতিক বিশৃংখলার মাধ্যমে দেশ ও সরকারের ক্ষতি করলে অন্য ধরনের লোকেরা তার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের গোড়ায় কুঠারাঘাত হানে। (চলবে)