ফাঁদে পা দেবে না বিএনপি

Untitled-81কাজিরবাজার ডেস্ক :
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট যখন চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার কথা ভাবছে, তখন বিষয়টি নিয়ে সরকারেরও টনক নড়েছে। সূত্রমতে, বিএনপির আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়টিকে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছে না সরকার। তাই বিএনপি যাতে আন্দোলনে যেতে না পারে, সেজন্য সরকার নতুন ছক হিসেবে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সরকারের এই ফাঁদে কোনোভাবেই পা রাখতে চাইছে না দলটি। তাই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিষয়ে না ভেবে মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচনের দাবিকে সামনে করে জানুয়ারি থেকেই বৃহত্তর আন্দোলনের পথেই এগুচ্ছে দলটি। দলীয় সূত্রমতে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের যাওয়ার আন্দোলনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আন্দোলন বিষয়ে নতুন সব পরিকল্পনার ব্যাপারেও আশাবাদী বিএনপি প্রধান। তাই এবারের আন্দোলনকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।
আন্দোলন বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘বিএনপি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে লাগাতার আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে।’ তিনি জানান, ‘বিএনপিপন্থি বিভিন্ন পেশাজীবী একটি নয়া প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলবেন। এ আন্দোলনকে গতিশীল করতে সরকারি কর্মকর্তারা যুক্ত হতে পারেন। তাই ঢাকা সিটি করপোরেশন নয়, আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনই আদায় করা করা হবে।’ জানা গেছে, ৫ জানুয়ারি টার্গেট করে বিএনপি নতুন বছরের শুরু থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। ডিসেম্বর মাসে চলমান কর্মসূচিকে সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যেতে চান খালেদা জিয়া। এবারের আন্দোলনে তাই খালেদা জিয়া নিজেই রাজপথের আন্দোলনে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি কুমিল্লার জনসভায় তা আরও স্পষ্ট করেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। আর তাই আগের সব ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন করে আন্দোলন শুরুর বিষয়ে অনেক কিছু ভাবছে দলটি।
এদিকে আন্দোলনের ব্যাপারে বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ওই সমাবেশের অনুমতি না দিলে হরতাল ডাকা হতে পারে। আর ওই হরতালের মধ্য দিয়েই কঠোর আন্দোলনের দিকে এগুবে বিএনপি, যা প্রয়োজনে তীব্রতর হতে পারে।’
এ বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘সরকার বিএনপির আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে বিভিন্ন সময় যেসব ফাঁদ পেতেছে, এবার সেরকম কোনো ফাঁদে পা ফেলতে চায় না তারা। আন্দোলনে মাঠে এবার তারা দৃঢ়তার সঙ্গে সব প্রতিরোধের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। আন্দোলনের পথে কোনো বাধা এলে তা কঠোর হাতে মোকাবিলা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির প্রত্যেক নেতাকর্মীর মধ্যে এখন চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। দলীয় চেয়ারপারসনের নির্দেশে এবার দলের প্রত্যেক নেতাকর্মী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বেনÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এবার সরকারের কোনো ফাঁদই বিএনপিকে আন্দোলন থেকে বিমুখ করতে পারবে না।’
সূত্রমতে সরকার মূলত বিএনপির আন্দোলনকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতেই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। তাই সরকার আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেওয়ার কথা ভাবছে। কিন্তু সেদিকে কর্ণপাত করতে আগ্রহী নয় দলটি। তাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচন তাদের চলমান আন্দোলনের কোনো ইস্যু নয় বরং জাতীয় নির্বাচনই মূল টার্গেট। তাই এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবছে না দলটি।
এদিকে হঠাৎ গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ডিসিসি নির্বাচনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সরকার নিজেদের বৈধতার জন্য সব ধরনের অপকৌশল গ্রহণ করেছে। আর এখন আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) নির্বাচনের কথা বলছে।’ অতীতেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের আন্দোলন বন্ধ করা যায়নিÑ এমন দাবি করে ডিসিসি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন ওই নির্বাচন আসবে, তখন দলীয় সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
উল্লেখ্য, গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দেওয়ার পর নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এদিকে ঢাকা সিটি নির্বাচন হলে তাতে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি-না জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, ‘দলীয়ভাবে যদি সিদ্ধান্ত হয়, তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যেতেও পারে বিএনপি। কেননা, বিএনপির সঙ্গে জনগণ আছে; তাই নির্বাচনে অংশ নিলে বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। এর প্রমাণস্বরূপ তিনি বলেন, দেশের বিগত অন্যান্য বিভাগে হয়ে যাওয়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছেন এবং উপজেলা নির্বাচনগুলোতেও সে চিত্র দেশের মানুষ দেখেছে। তাই বিএনপি যে কোনো নির্বাচনেই বিজয়ী হবে।’
তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি যদি নির্বাচনে (ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে) অংশগ্রহণ করে, তবে সেক্ষেত্রে তাদের দলে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীও রয়েছেন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেনÑ দলের মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন আহমেদ, কারাবন্দি বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু এবং উত্তর সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন যুবদল সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ আরও বেশ ক’জন নেতা।
এদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি-না, সে বিষয় জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাঁরা যাবেন কি-না, সে বিষয়ে দলীয়ভাবে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা অবশ্যই গণমাধ্যমকে অবহিত করা হবে। তবে এ মুহূর্তে বিএনপির মূল আন্দোলনের বিষয় হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। তাই সে নির্বাচন আদায় করতে এবং জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’