নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বিপর্যস্ত নারী

8

কাজিরবাজার ডেস্ক :
২১ বছর আগে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পোলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন পূর্ণিমা রাণী। নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছিল তাকে। প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পরে পূর্ণিমা লড়াই চালিয়ে স্রোতের বিপরীতে হেঁটে সহিংসতার শিকার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজ করেছেন বটে, কিন্তু সহিংসতা কমেনি।
২০১৪ সাল। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলার একটি গ্রামে একটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাড়ায় হামলার ঘটনায় অন্তত দুই নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ আসে। সংসদ নির্বাচনের দুই দিন পর এই ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে একধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। যেদিকেই যান না কেন, মৌলবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নিপীড়নের জন্য অস্ত্র শান দিতে থাকে। ফলে ভোট না দিলে হেরে সহিংসতা ঘটায়, আর ভোট দিলে জিতে গিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য সহিংসতা ঘটায়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, ১৯৯৬, ২০০১, ২০১৪, ২০১৮ প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক পরের বছরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টা আগের বছরের তুলনায় বেশি। কেবল ২০০৮এর নির্বাচনের পরে ব্যতিক্রম দেখা যায়। ১৯৯৬ এর নির্বাচনের বছরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২১৪টি, পরের বছরে ৫৫৪টি; ২০০১ সালে ধর্ষণের ঘটনা ৫৬৬টি হলেও পরের বছরে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৯১টিতে। ২০১৪ সালে নির্বাচনের বছরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৫৪৫টি, পরের বছরে এ সংখ্যা ছিল ৬৯০। ২০১৮ সালে নির্বাচনের বছরে ধর্ষণের ঘটনা ৫৫৬টি, পরের বছরে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৭টিতে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করে। হাইকোর্ট এক আদেশে নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশ দেন। এক বছরের বেশি সময় তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিল সরকারকে ৫ খ-ের ১ হাজার ১০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। প্রতিবেদনে দোষীদের চিহ্নিত করা এবং নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের নির্দেশনা চেয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ হাইকোর্টে আরেকটি রিট দায়ের করলে আদালতের নির্দেশ মোতাবেক প্রতিবেদন গত বছরের ১ এপ্রিল গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
তদন্ত কমিশনের ওই প্রতিবেদনে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ঢাকায় ২৭৬টি, চট্টগ্রামে ৪৯৭টি, সিলেটে ১৭টি, খুলনায় ৪৭৮টি, রাজশাহীতে ১৭০টি এবং বরিশালে সর্বাধিক ২ হাজার ২২৭টি ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯২টি হত্যা, ১৮৪টি ধর্ষণ-সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনারও উল্লেখ আছে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সংগঠক রানা দাশগুপ্ত নব্বইয়ের নির্বাচন সময়ের প্রচারণার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সেসময় বিএনপি নির্বাচনি প্রচারণায় এমনকিছু সেøাগান তুললো, যা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত। এমনকি তারা এসব দেয়াল লিখনও করলো। এরফলে নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি হলো। যখন তারা নির্বাচনে জয় পেলো, বিজয় মিছিলেও সাম্প্রদায়িক উপস্থিতি দেখা গেলো। বিএনপির দুস্কৃতিকারীরা সেসময় হিন্দু এলাকাগুলোতে ঝাপিয়ে পড়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরির উদ্দেশ্যে। যখন কোন এলাকা আক্রমণ করা হয়, তখন আত্মরক্ষায় পুরুষরা এলাকা ছেড়ে পালায়, মেয়েরা থাকে এবং ধর্ষণের শিকার হয়। এক এলাকায় ধর্ষণের ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের দেশত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়।
ধর্ষণ চেষ্টা
বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে জিতুক আর হারুক, এই ঘটনাগুলো ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় সংখ্যালঘু এলাকায় ত্রাস সৃষ্টিতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মূলত যাতে করে তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। এধরনের অনেক ঘটনা লিপিবদ্ধ হয় না, কারণ মেয়েরা মুখ খুলতে চায় না এবং পারিবারিকভাবে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।’
রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্নও হয়েছে। ধর্ষণ বুঝতে সামাজিক বাস্তবতা বুঝতে হবে উল্লেখ করে উই ক্যানের সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ‘ক্ষমতাবান গোষ্ঠী তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য হাতিয়ার হিসেবে ধর্ষণকে কাজে লাগায়। কোনও পরিবারকে কোনঠাসা করা, জমির মালিকানা দ্বন্দ্ব সবকিছুতেই পরিবারকে হেনস্তা করতে নারীকে ‘অপমান’ করাটাই জরুরি বলে একধরনের ধারণা কাজ করে। ফলে নির্বাচনে হেরে গেলে নারীকে ধর্ষণ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে।’
নির্বাচনের পরের বছরের এই পরিস্থিতি বিষয়ে জানতে চাইলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নূর খান লিটন বলেন, ‘সমাজের দুর্বৃত্তশ্রেণি নির্বাচনের নানা কর্মকা-ে যুক্ত হয় এবং নিজেদের ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করে বলে হার-জিতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরবর্তী সময়ে প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা জাগে।’
২০০৮ সালে নির্বাচনের পরে ধর্ষণ বা অন্য সহিংসতার খবর তুলনামূলক কম পাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে ২০০৭-২০০৮ এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের সার্বিক পরিস্থিতিটা। তখন হঠাৎ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় টাকার বস্তা কুড়িয়ে পাওয়া যাচ্ছিলো, গাড়ি ফেলে রেখে যাচ্ছিলো, কারণ অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছিল। সেটা পরবর্তী সময়ে ওই বছরজুড়েই অব্যাহত ছিল।’