সব মানার পক্ষে নন শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা

9

কাজিরবাজার ডেস্ক :
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া শর্তানুযায়ী রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তনসহ কিছু বিষয় চূড়ান্ত হয়েছে। অন্যান্য শর্তের মধ্যে রয়েছে- অর্থনীতিতে ভর্তুকির বোঝা কমানো, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, ব্যাংকের ঋণের সুদের উপরিসীমা কয়েকটি খাতে বৃদ্ধি, সরকারের ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, অর্থনৈতিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। মোটাদাগে ভর্তুকি কমিয়ে আনা ও আর্থিক খাতে সংস্কার চায় আইএমএফ। তবে ইতোমধ্যে আর্থিক খাতে অনেক শর্ত বা সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে।
তবে এই ঋণ পেতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সব শর্ত মানার পক্ষে নন দেশের শীর্ষ স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, ভর্তুকি প্রত্যাহার ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে আইএমএফ যেসব শর্ত দিচ্ছে এগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। এসব বিষয়ে আলোচনা করতে আজ বুধবার বেলা ২টায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে বৈঠকে বসবে আইএমএফের প্রতিনিধি দল। বিকাল চারটায় যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মিশন শেষ হবে সংস্থাটির।
আইএমএফে বাংলাদেশের কোটা অনুযায়ী ৫৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে সরকার চেয়েছে কম। চলতি বছরের ২৪ জুলাই লেনদেনে ভারসাম্য, বাজেট সহায়তা ও অবকাঠামো খাতের জন্য ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে আইএমএফের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বোর্ড সভার এক ফাঁকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেই বৈঠকে ঋণ পাওয়ার বিষয়টি মৌখিকভাবে আশ্বাস পাওয়া যায়। ওই ঋণের ব্যাপারে আলোচনা করতে আইএমএফের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ২৬ অক্টোবর ঢাকায় আসে। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিএআরসি), পেট্রোবাংলা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছে প্রতিনিধি দলটি।
ওইসব বৈঠকে আইএমএফ দেশের সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হয়ে কিছু শর্ত বা সংস্কার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। যেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও একটি প্রতিবেদন তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে আইএমএফের কোন কোন শর্ত মানা সম্ভব এবং কীভাবে সে বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। ঋণ পেতে হলে কোন শর্ত কতদিনে বাস্তবায়ন করবে তার অঙ্গীকার চায় আইএমএফ। মিশন শেষ করে তারা ওয়াশিংটনে ফিরে গিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা তাদের প্রধান কার্যালয়ের উচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে। এর আলোকে নির্বাহী বোর্ডের সভা হবে। ওই সভায় ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত হবে।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, ‘আইএমএফের সব শর্ত মানা উচিত হবে না। তবে কিছু শর্ত তো নিজস্ব উদ্যোগেই বাস্তবায়ন করা উচিত। শুধু যে আইএমএফ বলছে এ কারণেই নয়। আইএমএফের শর্তে ভর্তুকি একেবারে সব খাতেই তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। কিছু খাতে দিতে হবে। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ যেসব সেবা পায় সেগুলোতে ভর্তুকি দিতে হবে। তবে ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে হবে। একই খাতে বেশিদিন ভর্তুকি দেওয়া ঠিক হবে না বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র জানায়, আইএমএফের ঋণ পেতে সরকার তাদের প্রধান শর্তগুলো আলোচনা শুরুর আগেই বাস্তবায়ন করেছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে ৪৯-৫২ শতাংশ। সার ও গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। ভর্তুকি কমানোই হচ্ছে আইএমএফের প্রধান শর্ত। এসব ক্ষেত্রে দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানো হয়েছে। এর আগে গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও সচিবদের বৈঠক করে ভর্তুকি বাজেটে বরাদ্দ অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
এর মাধ্যমেও বার্তা দেওয়া হয়েছে সরকার ভর্তুকি খুব বেশি বাড়াবে না। সূত্র জানায়, এবার আইএমএফ অর্থনীতির তিনটি মৌলিক সূচক নিয়ে জোর আপত্তি তুলেছে। এগুলো নিয়ে তাদের আগেও আপত্তি ছিল। এগুলো হচ্ছে, রিজার্ভের নিট হিসাব প্রকাশ, জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা, খেলাপি ঋণের নীতিমালায় ছাড় বন্ধ করা। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে পরিসংখ্যান ব্যুরো কাজ করছে।
এটি এখনই করা সম্ভব নয়। রিজার্ভ পদ্ধতির হিসাবের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, তারা এখনই রিজার্ভের দুটি হিসাব করে। এর মধ্যে একটি গ্রস ও অপরটি নিট। এখন গ্রস হিসাবটি প্রকাশ করা হয়, নিট হিসাবটি প্রকাশ করা হয় না। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট হিসাব করতে কোনো আপত্তি নেই। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানের করতে বলেছে আইএমএফ। বর্তমানে কোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় শেষ হওয়ার পর থেকে ৬ মাস পরে তা খেলাপি করা হয়।
আন্তর্জাতিক মানে তা তিন মাস করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, করোনার কারণে এ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। করোনার প্রভাবের পর বৈশ্বিক মন্দার কারণে এ খাতে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এর প্রভাব কেটে গেলে তা তুলে নেওয়া হবে। আগে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানেই ছিল। ২০২০ সালে তা শিথিল করা হয়। ডলারের বিনিময় হার ইতোমধ্যেই বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আইএমএফের তিনটি প্রধান শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ ঋণের উপরিভাগ সুদের হার বাড়ানোর ব্যাপারে যে শর্ত দিয়েছে তা আপাতত মেনে নেওয়া হতে পারে। বর্তমানে ঋণের হার উপরিভাগের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের পাশাপাশি কয়েকটি খাতে ১২ শতাংশে করার চিন্তা ভাবনা রয়েছে। তবে সব খাতের জন্য না হলেও কয়েকটি খাতের জন্য বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
আইএমএফের বাংলাদেশের কিছু পণ্য আমদানিতে শুল্ক হার কমানোর ব্যাপারে প্রস্তাবে সরকারের পক্ষ থেকে নমনীয় মনোভাব দেখানো হয়েছে। বর্তমান ট্যারিফ হার বেশি বলে মনে করছে আইএমএফ। রাজস্ব বাড়াতে করের আওতা একদিকে যেমন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তেমনি করের হার বৃদ্ধির কথাও এসেছে আইএমএফের কাছ থেকে। এই দুটো ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি উঠেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পুঁজিবাজার সংস্কার আর্থিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারের ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারটিও আর্থিক খাতের আরও একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। যে কারণে আইএমএফের এই শর্ত নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তেমন কোনো আপত্তি উঠেনি। বরং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই কার্যক্রম চলমান। সূত্র জানায়, আইএমএফের আরও একটি প্রধান শর্ত হচ্ছে, রাজস্ব আয় বাড়ানো। বর্তমানে বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে। আইএমএফ এটিকে ১৪ শতাংশে উন্নীত করতে বলেছে। এজন্য বিভিন্ন খাতে করহার বাড়াতে হবে। এদিকে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কমাতে বলেছে। এ বিষয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়।