কমলগঞ্জের মঙ্গলপুরে রাজা হরিনারায়ণ দীঘি পর্যটকদের আকর্ষিত করছে

11

পিন্টু দেবনাথ কমলগঞ্জ থেকে :
প্রায় ৪ শত বছরের পুরাতন এক রাজপরিবার। অর্থ-বিত্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেছে ইতিহাস। তবে যে জিনিসটি আজও টিকে আছে তা হল ” রাজা হরিনারায়ন দীঘি”। আজ রাজা হরিনারায়ণ নেই। তবে রয়ে গেছে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত এই দীঘিটি। দীঘিটির যে কোন এক পাশে রাজার প্রাসাদ ছিল। তবে এখন প্রাসাদের কোনো চিহ্নই বর্তমান নেই। দীঘিটি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের মঙ্গলপুর গ্রামে অবস্থিত।
রাজা হরিনারায়ণ রায় ছিলেন খুবই ন্যায়পরায়ণ শাসক। তার রাজত্বকালে রাজ্যে খাবার অভাব দেখা দেয়। খাবারে অভাবে প্রজাদের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এই অভাব থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে ১৫৮০ থেকে ১৬০০ সালের কোন এক সময়ে রাজা প্রাসাদের সামনে একটি দিঘী খনন করেন। দীঘি খননের কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও দীঘিতে পানি না উঠায় রাজা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। পরে দীঘির ভেতরে একটি কূপ খনন করান তিনি। তারপরও দীঘিতে পানি ওঠেনি। এরই মধ্যে রাজার ঘর আলো করে তার এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। হঠাৎ একদিন রাজা স্বপ্ন দেখেন, তার সহধর্মিণী ভানুমতি দিঘীর মধ্যে খনন করা কূপে শুদ্ধদেহে এক কলস জল ঢাললে দীঘিতে জল উঠবে।
পরের দিনই রাজা রাণীকে স্বপ্নের বিষয়টি বলেন। রাজার আদেশ মতো রাণী ভানুমতি একটি মাটির কলস দিয়ে পানি ঢালতেই কূপ থেকে গমগম করে পানি উঠতে শুরু করে। আর সেই পানির স্রোতে রাণী ভানুমতি সেখান থেকে আর উঠে আসতে পারেননি দিঘীতেই ডুবে যান। অনেক খোঁজার পরও তাকে আর পাওয়া যায়নি।
দিঘীতে জল উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সহধর্মিণীকে হারিয়ে রাজা হরিনারায়ণ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। রাণীর শোকে কাতর রাজা হরিনারায়ণ রাজ্যসভায় আর মন দিতে পারেননি। ক্রমেই রাজ্যের সব কিছু বিলীন হয়ে যায়। কালক্রমে রাজার সব কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও কালের সাক্ষী হিসাবে এখনও দীঘিটি এলাকার মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করে চলেছে।
দীঘির দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য ও শান্ত, নিবিড় পরিবেশ মানুষকে আকৃষ্ট করে। এই দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক দীঘিটি দেখতে প্রতিদিনই এখানে পর্যটকরা ভীড় করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখন পর্যটকে ভরপুর থাকে।
৩৬০ শতক আয়তনের দীঘিতে বর্তমানে মাছ চাষ করা হচ্ছে। শীত মৌসুমে এখানে অতিথি পাখির আগমন ঘটে। দীঘির প্রায় তিন দিকে রয়েছে ছায়াদানকারী গাছ। প্রতিদিন বিকেলে আগত পর্যটকরা এসব ছায়াদানকারী গাছের গোড়ায় বসে দীঘির সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
এখন এ দিঘি কমলগঞ্জের পর্যটন শিল্পকেও সমৃদ্ধ করছে। এদিকে দীঘির সৌন্দর্য রক্ষাকল্পে সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন পর্যটকদের জন্য বসার স্থান ও ঘর তৈরি করছে।
দীঘিতে আসার রাস্তাটি পাকাকরণ প্রয়োজন এবং আরো রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে পর্যটকদের আকর্ষিত করবে।
চারিদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মঙ্গলপুর গ্রামের ভিতরে থাকা ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত রাজা হরিনারায়ণ দীঘি পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করছে। স্বচ্ছ জলে মাছের খেলায় পড়ন্ত বিকেলে এবং পশ্চিমা আকাশে অস্ত যাওয়া ডুবন্ত সূর্য দেখতে আপনিও স্বপরিবারে ছুটে আসতে পারেন রাজা হরিনারায়ণ দীঘিতে।