ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পর্যটন, ঈদের লম্বা ছুটিতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা

3

কাজিরবাজার ডেস্ক :
ঈদ ঘিরে বিপুল সম্ভাবনায় জমে উঠছে পর্যটন শিল্প। করোনার তান্ডবে দু’বছরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকা পর্যটনে এবারই প্রথম দেখা দিয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর উজ্জ্বল সম্ভাবনা। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করেই এই ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু, যা আগামী দু’বছরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে যাবে আগের রূপে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাত দেশী-বিদেশী পর্যটক বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে, একদিকে করোনা তা-বের দরুন দু’বছর সবকিছু বন্ধ থাকা। অন্যদিকে, দীর্ঘ ৯ দিনের ছুটি পাওয়া। মূলত এবার রোজা ৩০টি হলে ঈদ হবে ৩ মে মঙ্গলবার। ফলে ঈদের ছুটি ২ মে থেকে শুরু হয়ে শেষ হবে ৪ মে বুধবার। অন্যদিকে, ১ মে রবিবার শ্রমিক দিবসে সরকারী ছুটি। আর আগের দিন ৩০ এপ্রিল শনিবার, ২৯ এপ্রিল শুক্রবার। ফলে ২৯ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত টানা ৬ দিনের ছুটি। অন্যদিকে, ঈদের ছুটির পর ৫ মে বৃহস্পতিবার। তারপর ৬ ও ৭ মে পডবে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে চাকরিজীবীরা ৫ মে একদিন ছুটি পেলে মোট ৯ দিন ছুটি কাটাতে পারবেন ঈদে। এটাই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যটনখাত চাঙ্গার।
দেশের সরকারী-বেসরকারী খাতের পর্যটন শিল্পসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত দু’বছর করোনায় যে সর্বনাশ ঘটেছে- তা ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু হয়েছে চলতি রমজানেই। কোথাও ঠাঁই নেই। দেশে-বিদেশে ঈদের ছুটিকে কাজে লাগানোর জন্য ভ্রমণকেই শীর্ষে রেখেছেন বিপুলসংখ্যক লোক। নিন্ম, মধ্য বিত্ত থেকে শুরু করে বিত্তবান- সব শ্রেণীর ভ্রমণপিপাসুরাই এই ঈদেই ঘর থেকে বের হবেন দু’পা ফেলতে। কি দেশ, কি বিদেশ, যার যেখানে সামর্থ্য সেখানেই ছুটছেন তারা। শুধু সরকারী হিসেবেই দেখা গেছে- এই ঈদেই ৮ থেকে ৯ লাখ মানুষ ছুটে যাবেন দেশের বাইরে। এর মধ্যে শুধু ভারতে যাওয়ার জন্যই ভিসা নিয়েছেন পাঁচ লাখ লোক। ভারত ছাড়া মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, দুবাই ও তুরস্কে ঈদের ছুটি কাটানোর জন্য আরও অন্তত তিন লাখ লোক ভিসা নিয়েছেন। তারা অন্তত এক সপ্তাহ দেশের বাইরে কাটানোর পরিকল্পনা করে রেখেছেন। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জমে উঠেছে অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত। কক্সবাজারের কোন হোটেল-মোটেলে নেই কোন সিট। তিল ধারনের ঠাঁই নেই পর্যটন-নগরীতে। একই অবস্থা এয়ারলাইন্সগুলোতে। কোন এয়ারেই টিকেট নেই ঈদের আগে-পরের দুদিনের।
অভ্যন্তরীণ দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াত বাড়ছে পর্যটকদের। সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার ও সাগরকন্যা কুয়াকাটায় পর্যটকদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। রাঙ্গামাটি আর বান্দরবানসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থানও মুখরিত হয়ে উঠছে। হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউসে খালি রুম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। পর্যটকদের জমজমাট উপস্থিতিতে ব্যবসা জমে উঠছে। অভ্যন্তরীণ পর্যটক এরই মধ্যে অনেক বেড়েছে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটাতে অন্যান্য সময়ের তুলনায় পর্যটক এখন অনেক বেশি। ফলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পর্যটন খাত।
পর্যটন খাতের অন্যতম অংশীদার দেশের এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কেমন রমরমা তাদের ব্যবসা। রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্স বিমান, বেসরকারী ইউএস বাংলা ও নভো এয়ারে যাত্রীর চাপ বেড়েছে অনেক। শুধু ঈদের দিন থেকে দেশের কক্সবাজার, কুয়াকাটাসহ অন্যান্য এলাকার চাপ পড়েছে আকাশপথেও। বিমান জানিয়েছে, এয়ারলাইন্সটি আগে যেখানে ছোট এয়ারক্রাফট ব্যবহার করত, এখন সেখান থেকে সুপরিসর মডেলের প্লেন অপারেট করতে হচ্ছে। যে কারণে বিমানের টিকেট মোটামুটি এখনও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ইউএস বাংলা ও নভো এয়ারের ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আগামী ২ থেকে ৭ মে পর্যন্ত ৯০ শতাংশ টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। ইউএস বাংলার মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঈদে কক্সবাজারের টিকেট প্রায় সব বিক্রি হয়ে গেছে। চাহিদার বিপরীতে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। ফলে ফ্রিকোয়েন্সিও বাড়াতে হতে পারে।
টোয়াব (ট্যুর অপারেটর্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সূত্রে জানা গেছে, একদিকে করোনা নিয়ন্ত্রণে চলে আসায়, অন্যদিকে টানা ৯ দিনের ছুটির ফাঁদে মানুষ একটি লম্বা সময় হাতে পেয়েছে ভ্রমণ কিংবা ঘোরার। যে কারণে এবার একটু ভিন্ন চিত্র দেখা যাবে। কক্সবাজারসহ অন্যান্য ট্যুরিস্ট জোনের হোটেল-মোটেলগুলোর বুকিং প্রায় শেষের পথে।
জানতে চাইলে পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আলী কদর দৈনিক বলেন, কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলো আগের চেয়ে ভাল। যদিও আমার হাতে ঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই- তবুও বলতে পারছি এখন আগের তুলনায় পর্যটক বাড়ছে।
পর্যটন কর্পোরেশনের অপর একজন মহাব্যবস্থাপক বলেন, করোনাকালেও অপ্রত্যাশিতভাবে ভাল যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত। অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচলও বেড়ে যাওয়ায় পর্যটক বেড়েছে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। আগের চেয়ে বড় বড় উড়োজাহাজ দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী যাতায়াত করছে। এটা কেউ আশা করেনি। এই চাহিদা কাজে লাগিয়ে পর্যটনের নতুন নতুন স্থান উন্নয়ন করতে হবে, যেখানে পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, ঈদকে কেন্দ্র করে যেভাবে চাঙ্গা হয়েছে, তাতে আগামী দু’বছরের মধ্যেই আগের মতোই ঘুরে দাঁড়াবে পর্যটন খাত। এটা বিশাল প্রাপ্তি হবে গোটা দেশের জন্য। এই ঈদেই যে পর্যটন জমে গেছে- তার বড় লক্ষণ দেশ-বিদেশের পর্যটন নগরীর হোটেল-মোটেলে আসন ও এয়ারলাইন্সগুলোর টিকেট সঙ্কট। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে টিকেটের ৯০ ভাগই শেষ হয়ে গেছে বিমান, ইউএস বাংলা ও নভোএয়ারের।
টোয়াব সভাপতি রাফিউজ্জামান বলেছেন, দীর্ঘদিন পর খুলে দেয়ায় ভিড় বাড়তে শুরু করেছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। কঠোর বিধিনিষেধে বন্ধ থাকায় আর্থিক অনটনে পড়লেও এখন নতুন উদ্যমে কাজ করছেন এ খাতের পেশাজীবীরা। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলে ঠাঁই নেই বললেই চলে। একইভাবে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের ঘোরাফেরা বেড়েছে। তবে করোনা সংক্রমণের হার কমে এলেও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে সচেতন থাকার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।
জানতে চাইলে বিআইএইচএ সভাপতি এইচ এম হাকিম আলী সম্প্রতি বলেন, এখন মনে হচ্ছে সবই ভালর দিকে যাচ্ছে। ক্রমশই পর্যটক বাড়ছে। স্থানীয় পর্যটকরা ঘুরতে বের হচ্ছেন। নতুন নতুন রিসোর্টও হচ্ছে। ফলে এক ধরনের চাঙ্গাভাব দেখছি। কিন্তু তারকা হোটেলগুলোর কোন উন্নতি হয়নি। দেশের যে সব পর্যটক এতদিন বিদেশে ঘুরতেন, তারা এখন স্থানীয় দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে বেরুহচ্ছেন। এটা আমাদের পর্যটনশিল্পে ইতিবাচক দিক। তিনি পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে বলেন, আগামী তিন বছরের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ চাই। করোনা সঙ্কট কেটে গেলে বিদেশী গণমাধ্যমে প্রচার চালাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের আহ্বান জানাই।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাতে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। পাশাপাশি দেশকে আরও বেশি করে তুলে ধরার সুযোগ তৈরিও হয়েছে। জাতিসংঘের পর্যটনবিষয়ক সংস্থা ইউএনডব্লিউটিও। সম্প্রতি সংস্থাটির কমিশন ফর সাউথ এশিয়ায় (সিএসএ) ২০২১-২৩ মেয়াদে ভাইস চেয়ার নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ। এর প্রেক্ষাপটে নড়েচড়ে বসেছে এ খাতের নীতিনির্ধারকরাও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান ও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের সমাগম বৃদ্ধি পাওয়ায় সে সব এলাকার হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন মিলিয়ে সব ব্যবসায়ই যেন এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে করোনার কারণে বিদেশ ভ্রমণের ঝামেলা থাকায় পর্যটক তথা ভ্রমণপিপাসুরা দেশের ভেতরেই ঘুরতে যাচ্ছেন।
টোয়াব সূত্রে জানা গেছে, করোনার আগে প্রতিবছর গড়ে ৫০ থেকে ৬০ লাখ পর্যটক দেশের বিভিন্ন স্পটে ভ্রমণ করেন। তবে এবার করোনার কারণে পর্যটন ব্যবসা থমকে যায়। বর্তমানে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসায় সব খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে আবার জমতে শুরু করেছে এই খাতের ব্যবসা। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে দুই সপ্তাহ ধরে চলছে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে নানা ধরনের মূল্যছাড়ের অফার।
জানতে চাইলে টোয়াব সভাপতি মোঃ রাফেউজ্জামান বলেন, এটা ভাল লক্ষণ। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে যেভাবে হোটেল-মোটেল ও বিমানের টিকেট সঙ্কট দেখা দিয়েছে- তা তো ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ঘরে বসে থেকে হাঁপিয়ে উঠছিল। সবকিছু খুলে দেয়ায় তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিংবা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের বুকিং দেখলেই তা বোঝা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা মহামারীর কারণে গত বছর কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে জনসমাগম ছয় মাস বন্ধ ছিল। এবারও তা প্রায় চার মাস বন্ধ থাকে। জীবিকা নিয়ে বিপাকে পড়েন পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে জীবিকানির্বাহ করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। পর্যটকরা না থাকলে অনেক সমস্যা হয় ব্যবসা চালাতে। সব বন্ধ করে বসে থাকতে হয়। এখন আগের থেকে বিক্রি অনেক বেড়েছে। অনেকদিন পর আবার ব্যবসা ভাল হচ্ছে। মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। এখন আর সেই অবস্থা নেই। সাগর পাড়ে ভাড়ায় কাজ করা ফটোগ্রাফার আর বিভিন্ন রাইডের ব্যবসায়ীরাও মানবেতর জীবন শেষে স্বপ্ন দেখছেন সচ্ছলতার। এরই মধ্যে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে শুরু করছে সাগর পাড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেলগুলো।