ব্যাটিং ব্যর্থতায় ম্লান বোলিং সাফল্য

4

স্পোর্টস ডেস্ক :
দিনটা উজ্জ্বলতায় ভরপুর হতে পারত বাংলাদেশের জন্য। আগের দুদিনের চেয়ে সাগরিকায় তৃতীয় দিন সূর্যের আলো ঝুলে থাকল বেশি সময় ধরেই। কিন্তু দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় বোলিং সাফল্যে উজ্জ্বল বাংলাদেশ ম্রীয়মান হয়েছে শেষাংশে ব্যাটারদের চরম ব্যর্থতায়। পাকিস্তানের বিপক্ষে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে চলমান প্রথম টেস্টে তৃতীয় দিন পর এখনও ৮৩ রানে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯ রানে ৪ টপঅর্ডার ফিরে যাওয়ায় স্বস্তি নেই। সফরকারী পাকিস্তান পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় ইনিংসে নামা ব্যাটিং ধসে ম্যাচের ২ দিন বাকি থাকায় নিরাপদে নেই বাংলাদেশ। সুরক্ষার জন্য আজ চতুর্থ দিন দরকার দুর্দান্ত ব্যাটিং নৈপুণ্য। আশাবাদী তাইজুল ইসলামও দাবি করেছেন ঘুরে দাঁড়াবেন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন। অথচ বিনা উইকেটে ১৪৫ রান নিয়ে খেলতে নেমে তাইজুলের ঘূর্ণিতে দিশেহারা পাকরা মাত্র ২৮৬ রানেই গুটিয়ে যায়। বাংলাদেশী হিসেবে পাকদের বিপক্ষে সেরা বোলিং নৈপুণ্য দেখিয়ে ৭ উইকেট নেন তাইজুল। ৪৪ রানের লিডে এগিয়ে থাকার আনন্দটা মাটি করেছেন দ্বিতীয় ইনিংসে শাহীন শাহ আফ্রিদির গতি ঝড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটাররা ব্যর্থ হয়ে।
বোলিং লাইনআপে মাত্র ৪ বোলার এবং ব্যাটিং স্বর্গে পরিণত হওয়া সাগরিকার উইকেটে ঝড় তোলা কঠিন হবে সেটা পরিষ্কার হয়ে যায় দ্বিতীয় দিন। কারণ দুই পাক ওপেনার আবিদ আলী ও আব্দুল্লাহ শফিক আঠার মতো লেগে ছিলেন উইকেটে। দুই সেশনে ৫৭ ওভার ব্যাট করে হতাশা উপহার দেন তারা বাংলাদেশী বোলারদের। ম্যাচের প্রথম দিনও বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম ও লিটন কুমার দাস টানা দুই সেশন উইকেটে অপরাজেয় থেকে হতাশ করেন পাকিস্তানী বোলারদের। তাই তৃতীয় দিন বাংলাদেশের ধারহীন বোলিংয়ে আহামরি কিছু করে ফেলাটা ছিল অমূলক চিন্তা। সেটা হয়েছে তাইজুলের অবিশ্বাস্য বোলিংয়ে। একাই ৭ উইকেট নিয়েছেন তিনি। তৃতীয় দিনের সকালের শীতল পরিবেশ গরম করে তোলেন তিনি প্রথম ওভারের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বলেই দুই উইকেট তুলে নিয়ে। শফিক ৫২ ও আজহার আলী ০ রানে সাজঘরে ফেরেন। সেই ধস আর থামেনি। বলটি দিয়ে আগের দিন ৫৭ ওভার খেলা হয়েছে। আর পুরনো বলে স্পিনটাই কার্যকর। তাই সকালের আর্দ্রতার মধ্যেও তাইজুল বোলিং শুরু করেছেন। পাকদের প্রথম ইনিংসের ৮৮তম ওভারে নতুন বল নেয় বাংলাদেশ। সেটি ছিল লাঞ্চ বিরতির ঠিক আগের ওভার। সেই ওভারটিও তাইজুল করেন। লাঞ্চ বিরতিতে স্বস্তি নিয়েই বাংলাদেশ মাঠ ছাড়ে। কারণ ৩১ ওভারে মাত্র ৫৮ রান তুলতেই ৪ উইকেট খুঁইয়েছে পাকরা। ৪ উইকেটে ২০৩ রান থেকে বাকি ৮৩ রানে আরও ৬ উইকেট হারিয়েছে তারা। এর মধ্যে শুধু তাইজুল একাই নিয়েছেন আরও ৪টি। প্রথম সেশনের ৩টিসহ মোট ৭ উইকেট ১১৬ রান দিয়ে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এর আগে বাংলাদেশের এক ইনিংসে সেরা ব্যক্তিগত বোলিং ছিল ২০১১ সালে মিরপুরে সাকিব আল হাসানের (৬/৮২)। এবার সেরার কৃতিত্বটা দখলে নেন তাইজুল।
পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসে ব্যতিক্রম ছিলেন শতরানের অপেক্ষায় থাকা আবিদ। তিনি ক্যারিয়ারের চতুর্থ শতক পেয়ে যান। আগের দিন ৯৩ রানে অপরাজিত ছিলেন, এদিন যোগ করেন সবমিলিয়ে আরও ৪০ রান। দলের বিপর্যস্ত পরিস্থিতির কারণে আরও ১০৮ বল মোকাবেলা করতে হয়েছে তাকে। ২৮২ বলে ১২ চার, ২ ছক্কায় ১৩৩ রানে তিনিও তাইজুলের এলবিডব্লিউর শিকার হয়েছেন। পরের দিকে ফাহিম আশরাফ বিরক্তি ছড়িয়েছেন এবং বাংলাদেশের লিড কমিয়েছেন ৮০ বলে ৩ চার, ১ ছক্কায় ৩৮ রান করে। তাকেও শিকার করে স্বস্তি ফেরান তাইজুল।
দিনশেষে স্বস্তিটা থাকেনি। পুলকিত বাংলাদেশ দল এখন শঙ্কিত। সাদমান ইসলাম ১, নাজমুল হোসেন শান্ত ০ ও মুমিনুল হক ০ রানে ফিরে যাওয়াতে বিপর্যস্তই হয়েছে তারা। ডানহাতি পেসার শাহীনের সাইক্লোনে ৩ উইকেট খুঁইয়েছে বাংলাদেশ যার মধ্যে আছেন কিছুটা ভাল খেলতে থাকা ওপেনার সাইফ হাসান ও বাকি দুই শীর্ষ ব্যাটার। সাইফ এদিন ১৮ রান করেছেন। এখন আবারও বাংলাদেশকে রক্ষার দায়িত্বটা অভিজ্ঞ মুশফিকের কাঁধেই। তিনি ১২ রানে অপরাজিত আছেন। স্বল্প পরিসরের ক্রিকেটে দীর্ঘ ব্যর্থতার রেশ কাটিয়ে ইতোমধ্যেই সাগরিকার রাজা হয়েছেন তিনি। আর এখন দ্বিতীয় ইনিংসে এই রানের মাধ্যমে তিনি হয়ে গেছেন টেস্ট ক্রিকেটে দেশেরই রাজা। দেশের পক্ষে সর্বাধিক ৭৬ টেস্ট খেলা মুশফিকের রান এখন সবচেয়ে বেশি ৪৭৯৯। আর তামিম ইকবাল ৬৪ টেস্টে ৪৭৮৮ রান নিয়ে এখন দ্বিতীয় অবস্থানে। সাগরিকায় সর্বাধিক ১২৯৭ ও দেশের মাটিতে সর্বাধিক ২৬৮৫ রানের মালিক মুশফিকের ব্যাটেই ভরসা করছে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ৪৯ রানেই ৪ উইকেট হারানোর পর লিটন কুমার দাসকে নিয়ে মুশফিক ২০৬ রানের জুটি গড়ে দলকে বড় ইনিংস পাইয়ে দেন। এবারও তার দিকেই তাকিয়ে বাংলাদেশ। ম্যাচশেষে তাইজুল নিজেই বললেন, ‘আসলে জিনিসটা হতাশার মতো নিলে হবে না। হতাশ হচ্ছি না। আপনি দেখবেন ক্রিকেট খেলাটাই এমন। কেউতো আর ইচ্ছে করে আউট হতে চায় না। প্রথম ইনিংসেও দেখেছেন আমাদের ৪টা উইকেট দ্রুত পড়ে গিয়েছিল। তারপরও আমরা আল্লাহর রহমতে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলাম। দ্বিতীয় ইনিংসেও আমরা এমনটাই আশা করছি ঘুরে দাঁড়ানোর।’
এখনও সাগরিকা টেস্টে বাকি ২ দিন। আজ ব্যাটিংয়ে বড় ইনিংস গড়তে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের জন্য দুর্গতিই অপেক্ষা করছে। ঘূর্ণিঝড় শাহীনের শঙ্কায় এবার বিশ্বকাপ অভিযানে ওমান যেতে বিলম্ব হয়েছে বাংলাদেশের। এবার সাইক্লোন হয়ে এসেছেন ব্যক্তি শাহীন। ডানহাতি এই পেসারের গতি আর বাউন্সের তোপে বিপর্যস্ত হয়েছে টপঅর্ডাররা। আজ সকালের সেশনে আরও বিধ্বংসী রূপেই হাজির হবেন তিনি। ম্যাচের ৩ দিনের প্রথম সেশনে প্রচুর উইকেট পড়েছে- বাংলাদেশ প্রথম ও দ্বিতীয় দিন প্রথম সেশনে হারিয়েছে ৪ ও ৬ উইকেট। আর তৃতীয় দিন পাকরা হারিয়েছে ৪ উইকেট। তবে বাংলাদেশের প্রথম সেশনে ভুগতে হয়েছে পাক পেসারদের সামনে। আজও সেই পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশী ব্যাটারদের। মোকাবেলা করতে হবে ভয়ঙ্কর ঝড়ে পরিণত হওয়া শাহীন ছাড়াও প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারি হাসান আলী ও দারুণ বোলিং করা ফাহিম আশরাফের পেস। সেজন্য বাংলাদেশের হয়ে লড়াই চালানোর মতো ব্যাটার আছেন মুশফিক, ইয়াসির ও মেহেদি হাসান মিরাজ। আজ সকালটাই হয়তো বলে দেবে ম্যাচে বাংলাদেশের ভাগ্যটা কোন্ দিকে যাবে।