করোনার আফ্রিকান ধরনে নতুন আতঙ্ক, সতর্ক অবস্থানে সরকার ॥ আফ্রিকার সঙ্গে সব যোগাযোগ স্থগিত করা হচ্ছে ॥ বিমানবন্দর, স্থলবন্দরসহ দেশের সকল প্রবেশপথে স্ক্রিনিং জোরদার

4

কাজিরবাজার ডেস্ক :
করোনা সংক্রমণে যখন সাফল্যের পথে দেশ তখনই এলো এক আতঙ্কের খবর। আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশে শনাক্ত হয়েছে করোনার ভয়ঙ্কর এক নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘ওমিক্রন’। এটিকে খুবই ‘এগ্রেসিভ’ ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করছেন বিশ্বের খ্যাতিমান বিজ্ঞানীরা। তাই এই ভয়ঙ্কর ভ্যারিয়েন্টটির বাংলাদেশে প্রবেশ রোধে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে সরকার। আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যাত্রী পরিবহন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বিমানবন্দরের প্রবেশ পথে বাড়ানো হচ্ছে স্ক্রিনিংয়ে নজরদারি। সব মিলিয়ে কোনভাবেই যেন করোনার এই মারাত্মক ভ্যারিয়েন্টটি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। ওমিক্রন ঠেকাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যেকোন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একসঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী।
করোনার এই আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, নতুন ভ্যারিয়েন্টটি খুবই ‘এগ্রেসিভ’। আমরা এই ভ্যারিয়েন্টের বিষয়ে অবগত রয়েছি। আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থগিত করা হচ্ছে। সকল বিমানবন্দর, স্থলবন্দর বা দেশের সকল প্রবেশ পথে স্ক্রিনিং আরও জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সারাদেশে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে ও মুখে মাস্ক পরতে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ এ্যাসেম্বলি সেকেন্ড স্পেশাল সেশন’এ অংশ নিতে শনিবার সকালে যাত্রাকালে এক অডিও বার্তায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী জাহিদ মালেক। এসময় তিনি, ভাইরাসটি নিয়ে বেশি আতঙ্কিত না হয়ে দেশবাসীকে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানান। বিশ্বের আক্রান্ত অন্যান্য জায়গা থেকেও যারা আসবে তাদের বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনভাবেই স্ক্রিনিং ছাড়া যেন আক্রান্ত দেশের কোন ব্যক্তি দেশে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের প্রবেশ রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেয়া সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মোঃ মাহবুব আলী। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মোঃ মাহবুব আলী বলেন, করোনা প্রতিরোধে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে এটি নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের পথে দেশ। সংক্রমণ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। কমেছে মৃত্যুহার। তবে যেহেতু নতুন একটি ভ্যারিয়েন্ট বিশ্বের অন্যান্য দেশে শনাক্ত হয়েছে তাই আমাদেরও সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। এটি যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে সেই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আমরাও কাজ করব। এর আগে গত শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ আফ্রিকা ও বতসোয়ানায় শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের এই নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে জরুরী বৈঠক ডাকে। বৈঠকে নতুন ভেরিয়েন্টটির নামকরণ করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনার নতুন ধরনের নাম রাখা হয়েছে ‘ওমিক্রন’। প্রাথমিকভাবে এটিকে বি.১.১.৫২৯ নামে ডাকা হচ্ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ধরনটিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
ডব্লিউএইচও’র এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বি.১.১.৫২৯ ধরনকে উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যায়িত করছে। এটার নতুন নাম দেয়া হয়েছে ওমিক্রন। প্রাথমিকভাবে হাতে আসা তথ্য বলছে, এই ধরনটির মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ নতুন করে বিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে।
নতুন শনাক্ত হওয়া ধরনটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ধরনটির সংক্রমণের ক্ষমতা এবং শারীরিক জটিলতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন এনেছে কিনা তা এ সময়ের মধ্যে খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি করোনার প্রচলিত চিকিৎসা ও টিকার ওপর কোন প্রভাব পড়বে কিনা তা জানার চেষ্টা করা হবে।
বিশ্বের প্রচারমাধ্যমগুলোতে বলা হয়, এখন পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও বতসোয়ানা, ইসরাইল ও হংকংয়ে করোনার নতুন ধরনটির সন্ধান মিলেছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বেলজিয়ামে এখন পর্যন্ত একজনের শরীরে শনাক্ত হয়েছে ধরনটি। এদিকে ওমিক্রন শনাক্তের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন করে ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে ফ্লাইট চলাচলের ওপর জরুরীভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা এনেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো। এর পরপরই একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। আফ্রিকার ছয়টি দেশ থেকে বিমান চলাচলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাজ্যও।
এদিকে দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ শনাক্ত হওয়ার পর বহু দেশের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা স্থানীয় সময় শনিবার দেশটির ন্যাশনাল করোনাভাইরাস কমান্ড কাউন্সিলের (এনসিসিসি) সঙ্গে জরুরী বৈঠকে বসেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে, করোনার নতুন ধরন ঠেকাতে দেশটিতে আবারও কঠোর লকডাউন জারির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সিরিল রামাফোসা।
ইউরোপের দেশগুলোতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটে চলছে করোনার চতুর্থ ঢেউ। এরই মধ্যে শনাক্ত হলো ওমিক্রন। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান কি হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ প্রবলেন, করোনার যেকোন ভ্যারিয়েন্ট মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধিই সর্বোচ্চ কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তারপর রয়েছে টিকা। আমাদের দেশে টিকাদান কর্মসূচী চলছে। দেশের অনেক মানুষ ইতোমধ্যে টিকার আওতায় চলে এসেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মানতেও এখন মানুষজন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তবুও আশঙ্কা থেকেই যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের দেশগুলোতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপট আমরা দেখছি। যদিও তাদের থেকে আমাদের করোনা পরিস্থিতি ভাল রয়েছে। তবুও সতর্কতার বিকল্প নেই। অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের যথাযথ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আমরা ডেল্টা বা ওমিক্রন করোনার যেকোন ভ্যারিয়েন্ট মোকাবেলায় সক্ষম হব।
একই কথা বলেন ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডাঃ আয়েশা আক্তার। বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং জোরদার করা জরুরী উল্লেখ করে প্রতিনি বলেন, বিমানবন্দরে যেসব রোগী করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন তাদের তো আলাদা নজরদারিতে রাখাই হয়। তারপরও যদি ওমিক্রন শনাক্ত হওয়া কোন দেশ থেকে কেউ করোনা আক্রান্ত হয়ে দেশে আসেন তাদের জন্য বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা করোনার সংক্রমণ কমে গেলেও আমাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে যে উদাসীনতা তৈরি হয়েছে তা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এমনিতেই শীত আসন্ন। শীত সামনে রেখে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা একটা থেকেই যায়। তার ওপর যদি ওমিক্রনের ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়ে তাহলে তা মারাত্মক রূপ নিতে হবে। তাই সবাইকে এখনই সচেতন হতে হবে।