৫৫ হাজার রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব পাওয়ার তদন্ত চলছে

6

কাজিরবাজার ডেস্ক :
বাংলাদেশে অবৈধভাবে ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়ে তদন্ত চলছে। এর মধ্যে তদন্তে প্রায় ১ হাজার রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। ভুয়া নাম, পরিচয়, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন কিংবা পাসপোর্ট দেখিয়ে নাগরিকত্ব নিয়েছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক মামলা হয়েছে, যা তদন্তনাধীন। রোহিঙ্গাদের নাগরিত্ব পাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থা। নাগরিকত্ব দেয়ার পেছনে যেসব কারিগর জড়িত তাদের খুঁজে বের করে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে গত ৪ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে। এসব শিশুও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দাবি করতে পারে বলে এমন আশঙ্কা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনের ফাঁকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচ্চ পর্যায়ের এক আলোচনায় অতি জরুরী ভিত্তিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার পর রোহিঙ্গা সঙ্কট প্রশ্নে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে ৫৫ হাজারকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান। অনেক মামলাও হয়েছে। অবৈধ নাগরিকত্ব পাওয়া সবাইকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এটি চিহ্নিত হলে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই রোহিঙ্গারাই আজ বিভিন্ন কৌশলে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যাচ্ছেন। ভোটার তালিকায়ও উঠছে তাদের নাম। অনেকে আবার টাকার বিনিময়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করে পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশে। সেখানে গিয়ে নানা অপকর্মের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনের লোকজনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তা না হলে ভুয়া নাম, পরিচয় দেখিয়ে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন কিংবা পাসপোর্ট করা সম্ভব নয়। এরা দেশের শত্রু। এ বিষয়ে আরও মামলা হবে। পাসপোর্ট সংক্রান্ত ১৩ মামলা হয়েছে, বাতিল হচ্ছে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট। শুধু বিদেশ নয়, দেশের মধ্যেও তারা নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণের মতো কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। ফলে কক্সবাজার জেলাসহ আশপাশের অঞ্চলে একধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় বাংলাদেশীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগে বলা হয়েছে, টাকার বিনিময়ে সংঘবদ্ধ একটি দালাল চক্র রোহিঙ্গাদের জন্ম নিবন্ধন, চেয়ারম্যানের সনদসহ পাসপোর্ট এমনকি তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে সহায়তা করছে। ওই চক্রের সহযোগিতায় বাংলাদেশী নাগরিকত্ব নেয়া ৮৯৭ রোহিঙ্গার জাতীয় পরিচয়পত্র রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে এসেছে। অর্ধশত রোহিঙ্গাসহ ১০৬ জনকে আসামি করে ইতোমধ্যে ১৮টি মামলা দায়ের করেছে দুদক। দুর্নীতি দমন কমিশনের-দুদকের চট্টগ্রাম অফিসের প্রাথমিক তদন্তে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পেছনে জেলা নির্বাচন কমিশনের অফিস, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে গত বছর বাংলাদেশী পাসপোর্টসহ তিন রোহিঙ্গাকে আটক করে চট্টগ্রাম পুলিশ। তারা জানায়, টাকা দিলেই মেলে বাংলাদেশী পাসপোর্ট।
২০১৭ সালে মিয়ানমারে নিজ দেশের সেনাবাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এর আগে থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা আছেন ৪ লাখের মতো। সরকারী হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। নানা কৌশলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করছে। সর্বশেষ কক্সবাজার সদরের ইসলামাবাদ ইউনিয়নে দুই শতাধিক রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এমন অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধানে নামে দুদক। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, নির্বাচন কমিশনের কয়েকটি ল্যাপটপ ব্যবহার করে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ব্যক্তিকে অবৈধভাবে ভোটার বানানো হয়েছে। যাদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা। ওই ঘটনায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কক্সবাজারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রায় ১০৬ জনকে আসামি করে মোট ১৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। বাংলাদেশী নাগরিকত্ব নেয়া ৮৯৭ রোহিঙ্গার জাতীয় পরিচয়পত্র রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে এসেছে। প্রাথমিক তদন্তে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পেছনে জেলা নির্বাচন কমিশনের অফিস, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের-দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি তদন্তাধীন। এখনও নাগরিকত্ব পাওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করা যায়নি। ফলে তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি ঝুলে আছে। তবে তদন্ত পর্যায়ে ৮৯৭ রোহিঙ্গার নাম এবং তাদের ঠিকানাসহ একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকায় দেখা যায়, কক্সবাজার সদর উপজেলার ৩নং ইসলামাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের টেকপাড়ার ছয় রোহিঙ্গা, সিকদার পাড়ার পাঁচ, পশ্চিম বোয়ালখালির পাঁচ, পূর্ব বোয়ালখালির ৬২, পূর্ব ইউছুপেরখিলের ১২, পাহাশিয়াখালির দুজন, ইউছুপেরখিলের দুজন, হরিপুরের ২৯ জন, খোদাইবাড়ির ১৮ জন, আউলিয়াবাদের ৩৮৬ জন, ছৈইম্মা ঘোনার সাতজন, বর্মাপাড়ার ১৩ জন, পশ্চিম গজালিয়ার ১৫৯ জন, থানার পশ্চিমে একজন, বামবাগানের সাতজন, ছফুরার বাড়ির দুজন, খুশির শিয়ারের চারজন, মাস্টার পাড়ার তিনজন, কারাচি পাহাড়ের ১৭ জন, ধোয়াশিয়ার একজন, গজ্জন বাগিচার একজন, ওয়াহেদর পাড়ার পাঁচজন, মধ্যম গজালিয়ার ৬০ জন, পূর্ব গজালিয়ার ৮৪ জন এবং গজালিয়ার দুজন রোহিঙ্গা রয়েছেন। এসব রোহিঙ্গা পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই বাংলাদেশী নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে একই পরিবারের পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ১২ সদস্যও রয়েছেন। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী নাগরিকত্ব দেয়ার কারিগর কারা তাদেরও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলাচ্ছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা।
গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ আছে, তাদের বিরুদ্ধেই তদন্ত চলছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গারাও রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) তৈরির কাজে ব্যবহৃত সাতটি ল্যাপটপ চুরি হয়। মূলত, সেখান থেকেই ঘটনার সূত্রপাত।