১০ দিনের মাথায় দু’দফা ভূমিকম্পে আবার কেঁপে উঠলো সিলেট ॥ বিভিন্ন ভবনে ফাটল ॥ ভূমিকম্পনের উৎপত্তিস্থল জালালপুর ॥ ভূমিকম্প মোকাবেলায় মহড়া

17

স্টাফ রিপোর্টার :
১০ দিনের মাথায় আবারও দু’দফা ভূমিকম্পে পুরো সিলেট কেঁপে উঠেছে। এ ধরণের ঘনঘন ভূমিকম্পনের ফলে সর্বশ্রেণীর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন পুরাতন ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২৯ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে ৩.৮ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর ১ মিনিট আগে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। গতকালের ভূমিকম্পের ঊৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কাদিপুর বা আশপাশ এলাকা। এর আগে সোমবার সকাল ১১টায় ভূমিকম্প মোকাবেলায় সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের মাঠে ভূমিকম্প মোকাবেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর করণীয় বিষয়ে এক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ২৯ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে ৩.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝাঁকুনির সময় চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন মার্কেট দোকানপাট ও শপিংমলের দোকানগুলোর সাটারের শব্দ শোনা যায়। বাসা ও অফিসে থাকা মানুষজন ঘর ছেড়ে আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অফিস সিলেট থেকে বলা হচ্ছে, তাদের রেকর্ডে দুটি ভূমিকম্পের একটি পাওয়া গেছে।
আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, সন্ধ্যা ৬টা ২৯ মিনিটে ৩১ ঢাকা থেকে ১৮৮ কিলোমিটার নর্থইস্টে অর্থাৎ সিলেটের আশেপাশে কোথাও এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি।
এরআগে গত ২৯ মে সকাল ১০টা থেকে বেলা দুইটার মধ্যে সিলেটে অন্তত ৮টি ভূকম্পন অনুভূত হয়। পরদিন ভোরে আরো ৩টি ভূমিকম্প হয়। যার সবগুলোর কেন্দ্রস্থল সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকায়। ২৯ মে ভূমিকম্পের পর থেকেই সিলেট জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্পের আগে বা পরে এমন ছোট ছোট ভূকম্পন অনুভূত হয়। ফলে ভূমিকম্পের ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে পরিচিত সিলেটে বড় ধরণের ভূমিকম্পের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৯ মে ভূমিকম্পের পর সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ৭টি বহুতল বিপনী বিতান ১০ দিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নগরীর বহুতল ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনীয় কী না তা জরিপ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান জানান, সিলেটে প্রায় ৭০ হাজার হোল্ডিং আছে। এরমধ্যে ৭ তলার উপরে ভবন আছে অন্তত ৪শ’ টি। সিটি করপোরেশনের হিসেবের বাইরেও আরও অনেক বহুতল ভবন আছে। ২০১৬ সালে সর্বশেষ সিলেটের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর ব্যাপারে জরিপ চালানো হয়েছিলো। এতে ৩২টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত ২৯ মের ভূমিকম্পের পর এই ভবনগুলোর মধ্যে ৭টি বাণিজ্যিক ভবন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আমাদের পক্ষে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। তবে যে ভবনগুলো ভূমিকম্পসহনীয় নয় সেগুলোর সামনে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানিয়ে দেবো।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের ভূকম্পন ইউনিটের ইনচার্জ ও ভূকম্পন বিশেষজ্ঞ মো. মমিনুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, সিলেট অনেক আগে থেকেই ভূকম্পন এলাকা হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, বড় ভূকম্পন হওয়ার আগে পরপর ছোট ছোট অনেক বেশি ভূকম্পন হয়ে থাকে। সিলেটে যে ছোট ছোট ভূকম্পন হয়েছে তার সময় ব্যবধান অনেক বেশি হয়ে গেছে। এ হিসেবে বড় ভূমিকম্পন হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কমে গেছে। কেননা, যখন ছোট ছোট ভূমিকম্পন অল্প সময়ে অনেক বেশিবার হবে তখন বড় ভূকম্পন হওয়ার শঙ্কা বেশি থাকে।
সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের উত্তরে ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল হলো পূর্বে বার্মিজ প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেটের ডাউকি অঞ্চলে রয়েছে এমন ফল্ট। আর ‘সাবডাকশন জোন’ সমুদ্র তলদেশের এমন এলাকা যেখানে দুটি টেকটনিক প্লেট মুখোমুখি অবস্থানে থাকে এবং প্লেট দুটো পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। এমন অবস্থায় একটি টেকটনিক প্লেট আরেকটি নিচে চলে গেলে সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প।
রাজা জিসি হাই স্কুলের ভবনে ফাটল : সিলেট নগরীর বন্দরবাজারস্থ প্রাচীন বিদ্যাপিট রাজা জিসি হাই স্কুলের নতুন একটি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। ওই ভবনের নাম ‘কামরান ভবন’। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় নগরীতে ৩.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে এ ফাটল দেখা দিয়েছে বলে জানান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মুমিন।
তিনি জানান, ১৮৮৬ সালে রাজা জিসি হাই স্কুল স্থাপিত হয়। এ বিদ্যালয়ে ২০০৬ সালে একটি ভবন নির্মিত হয়। এসময় ওই ভবনের নিচ তলা পাকাকরণ হয়। আর ২০১৭ সালের দিকে দ্বিতীয় তলার কাজ সম্পন্ন হয়। গতকালের ভূমিকম্পে ওই ভবনের প্রত্যেকটা রুমে ফাটল দেখা দিয়েছে। এমনকি রুমের ভীমেও দেখা দিয়েছে ফাটল। বিদ্যালয় খোলার পূর্বে ভবন মেরামত করার দাবি জানান প্রধান শিক্ষক মো. মুমিন।
এদিকে নগরীর জিন্দাবাজারের মিলেনিয়াম মার্কেটটি হেলেপড়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্প মোকাবেলায় মহড়া: সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের মাঠে ভূমিকম্প মোকাবেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর করণীয় বিষয়ে এক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল ১১টায় এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সংগঠনের সেচ্চাসেবীদের নিয়ে মহড়া অনুষ্ঠানের শুরুতে দেখানো হয় কিভাবে ভূমিকম্পে আগুন লাগে, কিভাবে মানুষ বহুতল ভবনে আটকে পড়ে, এই সময়ে কিভাবে তাদের উদ্ধার করা হয়। আহতদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা ও হাসপাতালে ভর্তি, বহুতল ভবন থেকে রশি দিয়ে বেয়ে মানুষদের নামানো, মই বেয়ে আটকে পড়া মানুষ নামানোসহ অত্যাধুনিক রেকার দিয়ে সুউচ্চ ভবনের ছাদ থেকে উদ্ধার করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মহড়া দেখানো হয়েছে। সিলিন্ডার গ্যাস থেকে আগুনের সূত্রপাত বা কোন বস্তু বা ভবনে আগুন ধরলে কিভাবে আগুন নেভাতে হয় তাও মহড়াতে দেখানো হয়েছে।
মহড়া অনুষ্ঠানটি শুরু থেকে প্রত্যক্ষ করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম। এ সময় সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের বিভিন্ন পযার্য়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ফায়ারসার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সিলেট আঞ্চলিক উপপরিচালক আনিসুর রহমান, সহকারী পরিচালক শহিদুল ইসলাম ভূইয়া, উপসহকারী পরিচালক শওকত আলী জোয়ারদার, ইন্সপেক্টর আতিকুর রহমান, সিনিয়র স্টেশন অফিসার হুমায়ুন কার্ণাইন, অফিসার মহসিন আহমদ, মিজানুর রহমান, যীশু দেব, জালাল আহমদ, সিলেট আরবান কমিউনিটি ভলান্টিয়ার গ্রুপের সভাপতি এড. মোঃ জাহিদ সরওয়ার সবুজ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম জুয়েল, আব্দুল হাছিব, সুলতান মোঃ সাব্বির, আমীন তাহমিদ, আব্দুল্লাহ মোঃ আদিল মোঃ খালেদ আহমদ, শরীফা আক্তার লিমা শায়লা আক্তার এলি, সালিক আহমদ, মোঃ রাসেদ আহমদ রাসু সহ শতাধিক ভলান্টিয়ার অংশ নেন। মহড়া অনুষ্ঠানটি মাইক হাতে নিয়ে পরিচালনা করেন ইন্সপেক্টর আতিকুর রহমান ও ইকুইপমেন্টগুলোর বর্ণনা পরিচয় করিয়ে দেন অফিসার যীশু দেব।