মহামারী ভাইরাস যুগে যুগে কালে কালে ॥ প্লেগ স্প্যানিশ ফ্লু থেকে কোভিড ১৯

6

কাজিরবাজার ডেস্ক :
এমনকি খালি চোখে দেখা যায় না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ভাইরাস। অথচ কী কান্ড! গোটা পৃথিবীর দখল এখন তার হাতে। হ্যাঁ, করোনাভাইরাসের কথাই বলছি। আজকের পৃথিবী এই ভাইরাসের কাছে কী যে অসহায়। গতকাল পর্যন্ত গোটা বিশ্বে মোট মারা গেছে ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ২১৫ জন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে, আহা, তাকানো যায় না। যেন মৃত্যু উপত্যকা। বাংলাদেশও স্বস্তিতে নেই। গত বছর শুরু হওয়া করোনা এখনও দাপট দেখিয়ে চলেছে। কিন্তু প্রাণঘাতী ভাইরাসের দাপট বা মহামারী কিন্তু এবারই প্রথম দেখছে না বিশ্ব। এ ইতিহাস অনেক অনেক পুরনো। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহুবার মহামারীর দেখা মিলেছে। কখনও হানা দিয়েছে প্লেগ বা কালো মৃত্যু। কখনও প্রাণ কেড়ে নিয়েছে স্প্যানিশ ফ্ল্যু বা ইবোলা। আরও কত কত রোগ ব্যাধি নির্বিচারে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে!
কালো মৃত্যুর ইতিহাসটি আগে ঘেঁটে দেখা যাক। তার আগে বলি, কালো মৃত্যু মানে, প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু। বহুকাল আগে পৃথিবীতে হানা দিয়েছিল এই রোগ। দুর্বিসহ করে তুলেছিল মানুষের জীবন। কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। রোগটি নিয়ে পরে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। গবেষণা ও তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যাচ্ছে, ১৩৪৬-১৩৫৩ সালের মধ্যে ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশে বিপুল প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সংখ্যায় বললে, ৭৫ থেকে ২০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয় তখন। এখানে ওখানে মানুষ মরে পড়েছিল। কে কাকে বাঁচাবে? কার সৎকার কে করবে? প্লেগের উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায় বলে ধারণা। ক্রমে তা ইউরোপের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বাহক, অনেকেই জানেন, ইঁদুর। বণিকদের জাহাজে লুকিয়ে বসবাস করা কালো ইঁদুর ও এ জাতীয় আরেকটি ক্ষুদ্র প্রাণী কালো মৃত্যু ইউরোপে বহন করে নিয়ে যায়। ইউরোপের মোট জনসংখ্যার ৩০ থেকে ৬০ ভাগ মানুষ সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। মহামারীর কারণে ১৪শ’ শতাব্দীতে বিশ্বের জনসংখ্যা ৪৫০ মিলিয়ন থেকে ৩৫০-৩৭৫ মিলিয়নে নেমে আসে।
একইভাবে নাস্তানাবুদ করেছিল স্প্যানিশ ফ্লু। ১৯১৮ সালে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোলের তথ্য বলছে, রোগটিকে বহন করে নিয়ে আসে ‘এইচ ওয়ান এন ওয়ান’ নামক ভাইরাস। রোগের উদ্ভব উত্তর আমেরিকায়। উত্তর আমেরিকা বলে ধারণা করা হয়। ক্রমে তা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে ভাইরাস সংক্রান্ত খবরে বিভিন্ন দেশ বিধিনিষেধ আরোপ করে। ব্যতিক্রম ছিল স্পেন। স্পেনের সংবাদমাধ্যমে এ খবর নির্বিঘ্নে প্রচারিত হয়। এ কারণেই ভাইরাসের নাম স্প্যানিশ ফ্লু। ১৯১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছিল ৫০ কোটি মানুষ। মাত্র এক বছরের মাথায়, সে সময়ের তথ্য বলছে, ৫ কোটির বেশি মানুষের করুণ মৃত্যু হয়। এ কারণে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে পরিচিতি পায় স্প্যানিশ ফ্ল্যু। সংক্রমণ ঠেকাতে আজ যেমন মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক, তখনও তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। করোনাকালের মতোই নিষিদ্ধ বা অনুৎসাহিত করা হতো অধিক মানুষের সমাবেশ। আমরা এখন ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দটির সঙ্গে বিশেষ পরিচিত। শত বছর আগেও শোনা গেছে এ শব্দ। কোয়ারান্টাইনে ছিলেন স্প্যানিশ ফ্ল্যু আক্রান্তরাও।
ইবোলাও কেড়ে নিয়েছিল বহু মানুষের প্রাণ। যতদূর তথ্য, ১৯৭৬ সালে হানা দেয় এ ভাইরাস। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ইবোলা মহামারীতে আফ্রিকার পশ্চিমাংশের দেশগুলোতে ১১ হাজার ৩৩৩ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ২০১৯ সালে গণতান্ত্রীক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে একই ভাইরাসে ২ হাজার ৯০৯ জন আক্রান্ত হয়। প্রাণ হারায় ১ হাজার ৯৫৩ জন। এছাড়াও গুটিবসন্তের কথা আসতে পারে। এ দেশে রোগটি জোরেশোরে হানা দিয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, গত শতকে শুধু এ রোগে মারা যায় প্রায় ৩০ কোটি মানুষ।
আরও বেশ কিছু রোগব্যাধি ও মহামারীর কথা ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। সবগুলোই নানাভাবে মানুষকে নাস্তানাবুদ করেছে। পৃথিবীর জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। কিন্তু শেষতক জয় হয়েছে মানুষেরই। এক সময় মানুষ ঠিকই পরাস্ত করেছে রোগব্যাধিকে। একদিকে প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়েছে, অন্যদিকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে শত্রুকে রুখে দিয়েছে মানুষ। এভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ফিরেছে স্বাভাবিক জীবনে।
এই যেমন, গুটিবসন্ত আজ আর নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে হার মেনে বিদায় নিয়েছে। ১৮ শতকের শেষভাগে ১৭৯৬ সালেই গুটি বসন্তের প্রথম টিকা আবিষ্কৃত হয়েছিল। আবিষ্কার করেন এডওয়ার্ড জেনার। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম সফল টিকা। দূর হয়েছে প্লেগও। রোগটি এখন কোথাও আছে বলে জানা যায় না। ১৮৯০ -এর দশকে মানুষই উদ্ভাবন করে প্লেগের ভ্যাকসিন। ক্রমে রোগটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়। ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্যও আছে চিকিৎসা। দ্রুত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হলে এ ভাইরাসের আক্রমণে মৃত্যু হয় না।
সব মিলিয়ে ইতিহাসটি কিন্তু হতাশার নয়। বর্তমানে বিজ্ঞান বহু বহু দূর এগিয়ে গেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাফল্য আকাশ ছোঁয়া। রোগব্যাধির উৎস সন্ধান ও প্রতিষেধক আবিষ্কারে চলছে অহর্নিশ গবেষণা। আর তাই এবার সবচেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাওয়া হয়েছে করোনাভাইরাসের টিকা। প্রায় সব দেশেই টিকাদান কার্যক্রম চলছে। খুব আশা, অচিরেই দূর হবে কোভিড ১৯।
‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ সেই জেগে ওঠার অপেক্ষায় এখন মানুষ।