আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…..

3

জেড.এম. শামসুল  :
ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একুশে ও বাইশের প্রভাব তেইশে ফেব্রুয়ারী শহীদের স্মরণে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে পত্রিকাগুলো। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী ঢাকায় লাগাতার হরতাল পালিত হয়। শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। পাকিস্তানীরা বর্বরোচিত কায়দায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কার্ফু জারী করে।
সরকারী প্রেসনোটে আদেশ দেয়া হয় পরবর্তী আদেশ দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত আট ঘন্টার পরিবর্তে ৯ ঘন্টা কার্ফু থাকবে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর লোকরা শহরে পাহারার টহল জোরদার করতে থাকে। এদিন এম এফ হলের সামনে শহীদের স্মরণে জামায়াত ও জানাযা শেষে ফজলুল হক হলে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয় ছাত্র জনতা। এ সভায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উপস্থিত হয়ে বক্তব্যে ছাত্র-জনতাকে সর্বত্র শান্তি বজায় রাখার আদেশ দিয়ে, তাদের দাবী আদায়ের জন্য চেষ্টা করবেন বলে ঘোষণা দেন। এদিন ঢাকা জগন্নাথ হলে ছাত্রদের সভায় পূর্ব পাক মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের পদত্যাগ দাবী করা হয়। এদিন সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজ ছাত্রদের এক সভায় ছাত্ররা ঘোষণা দেয় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করা হয়। এদিন ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা এক সভায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিবাদ সভা করে। এ দিন তমদ্দুন মজলিশের সভায় একুশ ও বাইশে পাকিস্তানী বাহিনীর বরর্বোচিত হামলা গুলিবর্ষণের নিন্দা ও আন্দোলন তীব্রতর করার কর্মসূচী অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। এদিন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বিকালে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে এক সভায় ২৫ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত হরতাল, ধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। এছাড়া ভাষা আন্দোলনে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লিফলেট সহ প্রত্যেক ছাত্র নিজ নিজ এলাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এদিন আজিমপুর কলোনীতে মহিলাদের এক সভায় পাকিস্তানী বাহিনীর বরর্বোচিত হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করা হয় এবং আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত সহ মহিলারা আন্দোলন সংগ্রামের প্রতি একত্মতা ঘোষণা করেন। এদিন সিভিল লিবার্টি কমিটি গঠন করা হয়। সরকারের অমানবিক নির্যাতন আর বরর্বোচিত হত্যাকান্ডে দেশব্যাপী যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তাহা শৃংখলা ও শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত করার জন্যে তৎকালীন সমাজের কিছু উচ্চতর শ্রেণীর নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে সিভিল লিবার্টি কমিটি নামে একটি সংগঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। কমিটির প্রধান অফিস স্থাপিত হয় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বাসভবনে। এ কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন, এ কে এম ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানী, আব্দুল হাসিম, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, আতাউর রহমান খান, মোঃ আরিফ এমএনও, হামিদুল হক চৌধুরী, শামছুদ্দিন আহমদ, মির্জা গোলাম হাফিজ, কমরুদ্দিন আহমদ, আলী আহমদ খান, আনোয়ারা খাতুন, এমএনও প্রমুখ। এদিন থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আরো প্রকট আকার ধারণ করে। বিভিন্ন স্থানে ভাষা শহীদের স্মরণে সভা সমাবেশ অব্যাহত থাকে। এসব সভা সমাবেশে পাকিস্তান সরকারকে ধিক্কার সহ গণবিস্ফোরণের দিকে আন্দোলন এগুতে থাকে। এ কে এম ফজলুল হকের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ভাষা আন্দোলন তীব্র গতিতে চলতে থাকে। অব্যাহত আন্দোলনের ফলে ১৯৫৬ সালের দিকে পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের ফলে আন্দোলন সংগ্রাম স্মিমিত হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবিধানভূক্ত হওয়ার পরও বাংলা ভাষা বিরোধী চক্র বসে থাকেনি। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা প্রয়োগ এমনকি বাংলায় রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেনি। তারা সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাভাষা ও বাঙালি জাতিকে শাসন শোষণ চালাতে লাগলো। যাহা বাঙালি জাতি কখনও ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত ভুলতে পারেনি।