২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আবরার হত্যা মামলার চার্জশীট ্ ১১ জন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত

8

কাজিরবাজার ডেস্ক :
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় পঁচিশ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বুধবার দুপুরে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ডিবি পুলিশ চার্জশীট পাঠায়। অভিযুক্তদের মধ্যে ১১ জন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। বাকিরা অন্যভাবে জড়িত। অভিযুক্ত ২৫ জনের মধ্যে ২১ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে। যার মধ্যে ১৬ জন এজাহারনামীয় আসামি। এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় আরও ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। চার আসামি পলাতক আছে। চার জনের মধ্যে তিনজন মামলার এজাহারনামীয় আসামি। এজাহারের বাইরে মাত্র একজন।
শিবির সন্দেহ, বড় ভাইদের সব সময় সালাম না দেয়া, আসামিদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। হত্যকারীরা রাজনৈতিক পরিচয়কে নিজেদের রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্রদের সঙ্গে অছাত্রের মতো আচরণ করত। বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া আসামিরা ডেকে নিয়ে মারধর শুরু করলে একপর্যায়ে আবরারের মৃত্যু হয়।
সঠিক ও নির্ভুল চার্জশীট দাখিল করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে বলেও মন্ত্রী জানিয়েছেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আবরার হত্যা মামলার বিচার হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। যেমনটা আবরারের পিতা দাবি করেছেন।
বুধবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ মনিরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন, ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম, ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার মাসুদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়।
হত্যার স্কেচ ভিডিও দেখাল পুলিশ : আবরারকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার একটি স্কেচ ভিডিও তৈরি করেছে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ভিডিওতে আসামিদের কার কি ভূমিকা ছিল তা দেখানো হয়েছে। আসামি ও সাক্ষীদের দেয়া তথ্য মোতাবেক স্কেচ ভিডিওটি তৈরি করা হয়।
প্রায় আড়াই মিনিটের ভিডিওটিতে প্রথমে আবরারের প্রিয় বুয়েট ক্যাম্পাস ও তার শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর রুমটি দেখানো হয়। হলের করিডোরে আবরারের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে তার বড় ভাইকে (ছাত্রলীগের বড় ভাই) জানাচ্ছেন তার এক রুমমেট। ৪ অক্টোবর আবরারের বিষয়ে হলের ক্যান্টিনে মিটিং করে অভিযুক্তরা। এর পরপরই হলের গেস্টরুমে মিটিংয়ে বসে তারা আবরারকে নিয়ে আলোচনা করে। ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বড় ভাইয়ের নির্দেশে কয়েকজন আবরারকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিয়ে যায়। সেদিন আবরারকে তার ল্যাপটপ ও মোবাইলসহ ২০১১ নম্বর রুমে যেতে বলা হয়। সে গেলে, ওই রুমে তাকে ফ্লোরে বসিয়ে একটি পক্ষ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। হলের কেউ বিতর্কিত ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত কি না? তা জানতে চাওয়া হয়। আরেকপক্ষ তার ল্যাপটপ ও মোবাইল চেক করতে থাকে।
এ সময় হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করা হয়। যন্ত্রণায় ফ্লোরে বমি ও প্রসাব করে দেন আবরার। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ২০১১ থেকে ২০০৫ নম্বর রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০০৫ নম্বর রুমে তিনি আরও অসুস্থ হলে রুম থেকে বের করে তাকে সিঁড়ির পাশে শুয়ে রাখা হয়। দীর্ঘক্ষণ সেখানে পড়ে থাকার পর বুয়েটের চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর একে একে হত্যাকারীদের গ্রেফতারের চিত্র দেখানো হয়।
মনিরুল ইসলামের বক্তব্য : আদালত সাক্ষ্য হিসেবে এ ধরনের ভিডিও সাধারণত গ্রহণ করে না। তারপরেও আদালত যদি অনুমতি দেয়, আমরা তা জমা দেব। আবরারকে হত্যার নানা কারণের বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, কেউ আসামিদের সঙ্গে দ্বিমত করলে, সব সময় সালাম না দিলে, তাদের সামনে কারণে অকারণে হাসলে ওইসব ছাত্র আসামিরা ডেকে নিয়ে নির্যাতন করত। অভিযুক্তরা র‌্যাগিংয়ের নামে নতুনদের আতঙ্কিত করে এসব কাজ করত। যদিও এসব বিষয়ে তাদের কাছে আগে কোন অভিযোগ আসেনি। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, একজনকে সালাম না দেয়ায় তাকে বেধড়ক পিটিয়েছিল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা। র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে অভ্যস্ততার অংশ হিসেবেই আবরার হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে মনিটরিং করলে এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত। এটা তাদেরই মনিটর করার কথা।
ঘটনার দিন আবরারকে ডেকে নেয়ার পর রাত দশটা থেকে তার ওপর নির্যাতন শুরু করে আসামিরা। অনেক সময় ধরে তাকে পিটিয়েছিল। রাত তিনটা নাগাদ চিকিৎসক আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন। খানিকটা আগে তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে আবরার মারা নাও যেত পারত।
যেদিন আবরারকে হত্যা করা হয় : চলতি বছরের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭তম ব্যাচের ইলেকট্রিক এ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বীকে। ওইদিন রাত তিনটার দিকে শেরেবাংলা হলের দ্বিতীয় তলার থেকে আবরারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানায়, আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আবরারের পিতা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজার মডেল থানায় ১৯ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এজাহারনামীয় গ্রেফতারকৃত চার্জশীটভুক্ত আসামিরা : ঘটনার পর পরই গ্রেফতার হওয়া বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ১৩তম ব্যাচের ছাত্র মেহেদী হাসান রাসেল (২৪)। ছাত্রলীগের বুয়েটের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বুয়েটের ১৫তম ব্যাচের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অনিক সরকার। ছাত্রলীগের উপ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক, ১৬তম ব্যাচের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ইফতি মোশাররফ সকাল। মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, মুনতাসির আলম জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, মুজাহিদুর রহমান, মুহতাসিম ফুয়াদ, মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মাজেদুল ইসলাম, শামীম বিল্লাহ, মোয়াজ আবু হুরায়রা ও এ এস এম নাজমুস সাদাত।
এজাহার বহির্ভূত গ্রেফতারকৃত চার্জশীটভুক্ত আসামিরা : ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না (বুয়েটের মেকানিক্যাল, তৃতীয় বর্ষের ছাত্র)। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা। বুয়েটের ওয়াটার রিসোসের্স বিভাগের ১৬তম ব্যাচের ছাত্র মোঃ মিজানুর রহমান ওরফে মিজান। বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র শামসুল আরেফিন রাফাত। এছাড়া রয়েছে এস এম মাহমুদ সেতু।
পলাতক আসামিরা : জিসান, তানিন ও মোর্শেদ এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি। আর এজাহার বহির্ভূত একমাত্র পলাতক আসামি রাফি।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী : আবরার হত্যায় অনিক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, মনিরুজ্জামান মনির, এস এম নাজমুস সাদাত ও খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভির আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়।
মোট সাক্ষী ৩৩ জন : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম জানান, আবরার হত্যা মামলায় মোট ৩৩ জন সাক্ষী রয়েছেন। এদের মধ্যে তদন্তকারী সংস্থা ডিবির কাছে ১৬১ ধারায় ৩১ জন সাক্ষী দিয়েছেন। বাকি দুই সাক্ষী আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী দিয়েছেন।
দ্রুত চার্জশীট দাখিল করায় আবরারের পিতার সন্তোষ : নিহত আবরারের বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কে। তার পিতা ও মামলা বাদী বরকত উল্লাহ একটি এনজিওতে কর্মকত। চার্জশীট দাখিল করার পর তিনি সাংবাদিকদের কাছে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি মামলাটির বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার দাবি করেছেন। তিনি ছেলে হত্যার ঘটনায় আইনী লড়াই চালিয়ে যেতে ব্যক্তিগত পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ করার কথা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি সরকারের সহযোগিতা আশা করেছেন।
জড়িত ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত ১১ জন : আবরার হত্যার পর গত ৭ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ১১ জন ছাত্রলীগ নেতাকে বহিষ্কার করে। বহিষ্কৃতরা হচ্ছে, বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-দফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, মুনতাসির আল জেমি (সদস্য), এহতেসামুল রাব্বি তানিম (সদস্য) ও মুজাহিদুর রহমান (সদস্য)। এরা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে।
ছাত্রলীগের তরফ থেকেও ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এগারো জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছে আদালত : আবরার হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আসামি ১৮ নবেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। বুধবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান প্রতিবেদন জমা না দেয়ায় ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কায়সারুল ইসলাম প্রতিবেদন জমার জন্য পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত তারিখে চার্জশীটটি আমলে নেয়ার কথা আছে আদালতের।
দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে আবরার হত্যা মামলার বিচার-আইনমন্ত্রী : আবরার হত্যা মামলার বিচার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে করার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক। তিনি বলেন, সব আইনী বাধ্যবাধকতা শেষ করে আবরার হত্যা মামলার দ্রুতবিচার করা হবে। আসামি সোমবারের মধ্যে প্রসিকিউশন টিমকে এ মামলা গ্রহণ করতে বলা হবে। মামলাটি বিচারিক আদালতে আসার পর পরই যেন কার্যক্রম শুরু করা যায়, এজন্য একটা প্রসিকিউশন টিম ঠিক করে রাখা হয়েছে। পলাতক আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য একটা আদেশ হবে। আদেশ মোতাবেক হাজির না হলে, পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু হবে। পলাতকরা আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে তাদের পলাতক দেখিয়ে বিচার কাজ শেষ করা হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে এবং জনগণের চাওয়া অনুযায়ী এ হত্যাকাণ্ডের বিচার যথাসময়ে করা হবে। জনগণ যখন চেয়েছে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে। আবরারের ক্ষেত্রেও সেই প্রক্রিয়া চলছে।