জকিগঞ্জের গ্রামে গঞ্জে জমে উঠেছে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা

16

জকিগঞ্জ থেকে সংবাদদাতা :
আমনের কাঁচা ধানের সাথে পাল্লা দিয়ে সীমান্ত ঘেঁষা সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে জমে উঠেছে ভোট উৎসব। গানে-গীতে সমর্থকরা পছন্দের প্রার্থীর গুনগান গেয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রামে গঞ্জে। চায়ের হোটেলগুলোতে শুরু হয়ে প্রার্থীদের নিয়ে বিশ্লেষণ। ভোটের আগে পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব কষতে শুরু করেছেন সাধারণ ভোটাররা। প্রতিদিন ভোরের কনকনে শীত উপেক্ষা করে প্রার্থী ও সমর্থকরা বাড়ী বাড়ী গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। প্রচার-প্রচারণায় দিন রাত ব্যস্ত সময় কাটছে প্রার্থীদের। গ্রামে, গ্রামে চলছে উঠান বৈঠক।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে ভোট যুদ্ধে রয়েছেন আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকে আলহাজ্ব হাফিজ আহমদ মজুমদার, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির আলহাজ্ব সেলিম উদ্দিন এমপি, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী জমিয়ত নেতা মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী প্রার্থী ফয়জুল মুনির চেীধুরী (সিংহ), ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী এম এ মতিন চৌধুরী (মিনার), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. শহিদ আহমদ চৌধুরী (হারিকেন), ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ’র মো. নুরুল আমিন (হাত পাখা), গণ ফোরাম’র মো. বাহার উদ্দিন আল রাজী (উদীয়মান সূর্য) প্রতীকে।
ভোটের মাঠ ঘুরে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টে একক প্রার্থী থাকলেও আওয়ামীলীগ প্রার্থী হাফিজ আহমদ মজুমদারের বিরুদ্ধে সিংহ প্রতীকে ভোটের মাঠে রয়েছেন ফয়জুল মুনির চৌধুরী। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থীর সাথে নেই আওয়ামীলীগ। জকিগঞ্জ-কানাইঘাট আওয়ামীলীগসহ অঙ্গ সংগঠন হাফিজ আহমদ মজুমদারকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ। বিদ্রোহী প্রার্থী ফয়জুল মুনির চৌধুরী ভোটের মাঠে কাবু করতে পারছেন না। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের একক প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক হলেও জোট শরিক জামায়াতের কোন নেতাকে তার পক্ষে মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছেনা। ক্বওমী ঘরানোর আলেম উলামারা মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ। জমিয়তের প্রার্থীর পক্ষে জামায়াত না আসলেও তেমন প্রভাব পড়বেনা বলে অনেকের ধারণা। আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ভোটারের কাছে অন্য দলীয় প্রার্থীদের কথাবার্তা নেই। তাদের নামটাও অনেক ভোটার জানেন না।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী আলহাজ্ব সেলিম উদ্দিন জকিগঞ্জ-কানাইঘাট জাতীয় পার্টির দ্বন্দ্বকে নিরসন করে নিয়েছেন। সোমবার রাতে সিলেটস্থ তার বাসায় জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাব্বির আহমদসহ অন্য বলয়ের নেতাকর্মীদেরকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। এ সময় জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাাশী সাবেক ছাত্রনেতা এম জাকির হোসেইনের সাথেও মোবাইলে কথা বলে সহযোগীতা চান এমপি সেলিম উদ্দিন। এতে জাতীয় পার্টির কোন্দল অনেকটা নিরসন হয়েছে। ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা লাঙ্গল প্রতীকের পক্ষে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে।
আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা জানান, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব প্রার্থীর চাইতে জনপ্রিয় প্রার্থী হাফিজ আহমদ মজুমদার। সাধারণ মানুষের কাছে নৌকার প্রার্থী হাফিজ আহমদ মজুমদারের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। জকিগঞ্জ-কানাইঘাটসহ বৃহত্তর সিলেটে তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাফিজ মজুমদার শিক্ষা ট্রাস্ট শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বিগত সময়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যে উন্নয়ন কর্মকান্ড করেছেন এ জন্য সকল মহলেই তিনি প্রশংসিত। ব্যক্তি হাফিজ আহমদ মজুমদারকে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ভালোবাসে। এতে তার প্রতীকের ভোট বাড়বে। আলহাজ্ব হাফিজ আহমদ মজুমদার অবহেলিত এ আসনের স্বাস্থ্য সেবায়ও ব্যাপক ভূমিকা রেয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় তাঁর অর্থায়নে সায়লা স্মৃতি হাসপাতাল স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছে। হাওর এলাকাসহ অনুন্নত এলাকায় মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে শিক্ষার আলো বিস্তার করেছেন হাফিজ আহমদ মজুমদার। হাফিজ আহমদ মজুমদার অন্য প্রার্থীদের চাইতে দ্বিগুন ভোট পেয়ে নির্বাচিত হবেন। তিনি নির্বাচিত হলে এলাকায় বিরাজমান সকল সমস্যা সমাধান করতে পারবেন। আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারবে না। জকিগঞ্জ-কানাইঘাট নৌকার ঘাটি। নৌকার বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ কখনো বিজয়ী হতে পারবেনা।
এদিকে, এ আসনটি মহাজোটের হিসেব নিকেশের বাইরে থাকায় লাঙ্গল প্রতীকে লড়ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বর্তমান এমপি সেলিম উদ্দিন। বিগত নির্বাচনে সেলিম উদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এবার তিনি মহাজোটের চূড়ান্ত প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু শেষ সময়ে আসনটি মহাজোট উন্মুক্ত ঘোষণা করায় এককভাবে ভোটে নেমেছেন সেলিম উদ্দিন। ভোটের মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে নামার আগে তিনি দলীয় কোন্দল মিটাতে ব্যস্ত সময় পর করেন। অবশেষে তিনি জাতীয় পার্টির কোন্দল মিটিয়ে এক প্লাটফর্মে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁর পক্ষে কাজ করবে।
জাতীয় পার্টি নেতাকর্মীরা জানান, জকিগঞ্জ-কানাইঘাটে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন এমপি সেলিম। তিনি জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের ভোট পেয়ে আবারো নির্বাচিত হবেন। উন্নয়নের জন্য এমপি সেলিম উদ্দিনের কোন বিকল্প নেই। জকিগঞ্জ-কানাইঘাটে জাতীয় পার্টির বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এতে বিজয় নিশ্চিত।
অপরদিকে, বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জমিয়ত নেতা মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ধানের শীষ প্রতীক ভাগিয়ে এনে চমক সৃষ্টি করেছেন। এ আসনে চ্যালেঞ্জের মুখে তিনি এবার জামায়াতকে হাটিয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারীর নির্বাচনে সর্বশেষ ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ৪ দলীয় জোট গঠনের কারণে আসনটিতে জামায়াত নেতা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী দাড়ি পাল্লা প্রতীকে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন। এরমধ্যে ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত নেতা মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে হাফিজ আহমদ মজুমদারের কাছে ৩১ হাজার ৬৩ ভোটে পরাজিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও এ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থীরা জোটের মনোনয়ন চেয়ে পাননি। ২৩ বছর পর এবার বিএনপি থেকে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছিলেন জেলা বিএনপির সহ সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন। কিন্তু জামায়াত ও জমিয়ত তার পিছু ছাড়েনি। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ও জমিয়তের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের কাছে ধানের শীষ চেয়ে বসে। এতে কপাল পুড়ে বিএনপি নেতা মামুনুর রশিদ মামুনের। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট জামায়াতের প্রার্থীকে আউট করে জমিয়তের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে ধানের শীষের চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছে। এতে জামায়াতে চাপা কান্না বিরাজ করছে।
বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের সমর্থকরা জানান, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। এ আসনে বিএনপি ছাড়াও ক্বওমী ঘরানো বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে দিয়ে ক্বওমী ঘরানো ভোটগুলো ধানের শীষে আনা সম্ভব। এ কারণে ধানের শীষ প্রতীকের বিজয় অনেকটা সুনিশ্চিত বলে তাদের দাবী।