১৮ আসন নিয়ে আ’লীগ-জাপায় টানাটানি

52

কাজিরবাজার ডেস্ক :
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেসব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে, তার ১৭টি চাইছে জোটের আলোচনায় থাকা শরিক জাতীয় পার্টি (জাপা)। ফাঁকা রাখা আরেকটি আসন আওয়ামী লীগ অন্য একটি দলকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও সেখানেও প্রার্থী দিতে চাইছে জাপা।
আসন নিয়ে মতভেদের অবসান না হওয়ায় জোটের প্রার্থী তালিকা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
জাতীয় পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য সুনীল শুভ রায় বলেন, ‘মহাজোটের কাছে আমরা আমাদের মতো আসন দাবি করেছি। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। আশা করছি, প্রতীক বরাদ্দের আগেই আসন নিয়ে মতভেদের অবসান হবে।’
জাতীয় পার্টি প্রথমে ১০০টি আসন চেয়েছিল। পরে সেটি কমিয়ে ৭৬টি করা হয়, এরপর নামে ৫১টিতে। পরে সেখান থেকেও ছাড় দিয়ে ৪৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে তারা।
তবে এই ৪৭টি আসনের ১৭টিতে আওয়ামী লীগও প্রার্থী দিয়েছে। আবার একটি আসন ইসলামী ঐক্যজোটকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রার্থিতা নিয়ে এই মতভেদে ক্ষোভ আছে খোদ জাতীয় পার্টিতে। আর মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তোপের মুখে জবাব দিতে না পেরে দলের মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার তালিকা ঘোষণা করতে পারেননি সংবাদ সম্মেলন করেও। পরে গণমাধ্যমকে মেইল করে দেওয়া হয় সেই তালিকা।
গত রবিবার আওয়ামী লীগ যেসব আসনে মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে তার মধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এবং মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের আসনও রয়েছে।
ঢাকা-১৭ আসন চাইছেন এরশাদ। ২০০৮ সালে এখানে তিনি মহাজোটের প্রার্থী হয়ে জেতেন। তবে এবার আওয়ামী লীগ এই আসনে প্রার্থী করেছে আকবর হোসেন পাঠান (নায়ক ফারুক)-কে।
রওশন এরশাদ মনোনয়নপত্র তুলেছেন ময়মনসিংহ-৭ আসন থেকে। ২০১৪ সালে আসনটি আওয়ামী লীগ দেয় জাতীয় পার্টিকে। জেতেন এম এ হান্নান। আসনটি রবিবার ফাঁকা রাখলেও পরদিন রুহুল আমিন মাদানীকে দেয় আওয়ামী লীগ। একই দিন রওশনের নামে কেনা হয় মনোনয়নের চিঠি।
জাপার মহাসচিব হাওলাদারের পটুয়াখালী-১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে শাহজাহান মিয়াকে। ২০১৪ সালে এখানে নৌকার প্রার্থী ছিল না, যদিও আগের নির্বাচনে জেতেন শাহজাহান।
জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম-৯ আসনে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। এবার সেখানে দলটি প্রার্থী করেছে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে।
এই আসনটির বদলে বাবলুকে কক্সবাজার-৩ আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা হয়েছে দুই দলের আলোচনায়। তবে সেখানেও বর্তমান সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন।
২০১৪ সালে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেওয়া ময়মনসিংহ-৫ আসনে এবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছে ২০০৮ সালে জয়ী কে এম খালেদ বাবুকে। তবে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদকে এখানে প্রার্থী করেছে।
কুমিল্লা-২ আসনে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদ সদস্য আমির হোসেন ভূঁইয়াকে প্রার্থী করেছে। তিনি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে জেতেন। তবে এবার ক্ষমতাসীন দল সেখানে মনোনয়ন দিয়েছে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সেলিনা আহম্মেদ মেরীকে।
খুলনা-১ আসন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। সেখানে এবার নৌকা পেয়েছেন গত দুই নির্বাচনের বিজয়ী পঞ্চানন বিশ্বাস। তবে জাতীয় পার্টি সেখানে লাঙ্গল প্রতীক দিয়েছে সুনীল শুভ রায়কে।
আওয়ামী লীগের দখলে থাকা বরিশাল-২ এবার নিজেদের করতে চাইছে জাতীয় পার্টি। বর্তমান সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস সেখানে নৌকা পেলেও লাঙ্গল নিয়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা)-কে।
রবিবার আওয়ামী লীগ হবিগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী না দিয়ে ফাঁকা রাখে। ধারণা করা হচ্ছিল এটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে সোমবার সেখানে মনোনয়নের চিঠি পান গাজী মো. শাহনেওয়াজ মিল্লাত। তিনি আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর ছেলে। তবে জাতীয় পার্টি এখানে প্রার্থী করেছে আতিকুর রহমানকে।
জাতীয় পার্টি গাইবান্ধা-৩ আসনে প্রার্থী করেছে দিলারা খন্দকারকে। যদিও সেখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন ইউনুস আলী সরকার। তিনি সেখানে বর্তমান সংসদ সদস্য।
গাইবান্ধা-৫ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য ফজলে রাব্বী মিয়াকেই নৌকা দেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় পার্টি সেখানে দাঁড় করিয়েছে এইচ এম গোলাম শহীদকে।
রাজশাহী-৫ আসনে আওয়ামী লীগ প্রতীক দিয়েছে মনসুর রহমানকে। সেখানে জাতীয় পার্টি দাঁড় করাতে চাইছে আবুল হোসেনকে।
সাতক্ষীরা-২ আসনে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত, সেখানে ভোটে লড়বেন বর্তমান সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি। তবে জাতীয় পার্টি সেখানে দাঁড় করিয়েছে আজাহার হোসেনকে।
কুষ্টিয়া-১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে সরোয়ার জাহান বাদশাকে। সেখানে দলটির আরেক নেতা আফাজ উদ্দিন সরকারের সমর্থকেরা মনোনয়ন পাল্টানোর দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ করছেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টি আবার সেখানে প্রার্থী করতে চাইছে শাহরিয়ার জামিলকে।
নাটোর-১ আসনে নৌকা পেয়েছেন শহীদুল ইসলাম বকুল। সেখানে লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টি প্রার্থী করতে চাইছে আবু তালহাকে।
দিনাজপুর-৬ আসন আওয়ামী লীগ রেখেছে বর্তমান সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের জন্য। সেখানে জাতীয় পার্টি দেলোয়ার হোসেনকে প্রার্থী করেছে।
কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ জাকির হোসেনকে প্রার্থী করে বাকি তিনটি জাতীয় পার্টির জন্য ফাঁকা রেখেছে। তবে জাকিরের বদলে সেখানে আশরাফ উদ দৌলাকে প্রার্থী করতে চায় এরশাদের দল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি আওয়ামী লীগ দিতে চাইছে ইসলামী ঐক্যজোটের আবুল হাসানাত আমিনীকে। এই আসনে ২০০৮ ও ২০১৪ সালে ছাড় দেওয়া হয় জাতীয় পার্টিকে। দলটি সেখানে রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
নোয়াখালী-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছে এইচ এম ইব্রাহীমকে। তবে জাতীয় পার্টি তার জোটের শরিক আবু নাসের ওয়াহেদ ফারুককে (ইসলামি জোট) সেখানে প্রার্থী করতে চায়।
যেসব আসন নিয়ে মতভেদ নেই
তবে ২৯টি আসন জাতীয় পার্টির পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। এর মধ্যে রংপুর বিভাগের আসনগুলো হলো: রংপুর-১ মসিউর রহমান রাঙ্গা, রংপুর-৩ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, গাইবান্ধা-১ শামীম হায়দার পাটোয়ারী, কুড়িগ্রাম-১ এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, কুড়িগ্রাম-২ পনির উদ্দিন আহমেদ, কুড়িগ্রাম-৩ আক্কাস আলী সরকার, নীলফামারী-৩ রানা মোহাম্মদ সোহেল/ফারুক কাদের, নীলফামারী-৪ শওকত চৌধুরী বা আদেলুর আদেল, লালমনিরহাট-৩ জি এম কাদের।
রাজশাহী বিভাগে জাতীয় পার্টির নিশ্চিত আসনগুলো হলো: বগুড়া-২ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, বগুড়া-৩ নুরুল ইসলাম তালুকদার, বগুড়া-৬ নুরুল ইসলাম ওমর, বগুড়া-৭ আলতাফ আলী।
ঢাকা বিভাগে জাতীয় পার্টির নিশ্চিত আসনগুলো হলো: ঢাকা-৪ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, ঢাকা-৬ কাজী ফিরোজ রশীদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ লিয়াকত হোসেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ সেলিম ওসমান, কিশোরগঞ্জ-৩ মুজিবুল হক চুন্নু।
ময়মনসিংহ বিভাগে জাতীয় পর্টির নিশ্চিত আসনগুলো হলো: ময়মনসিংহ-৪ রওশন এরশাদ, ময়মনসিংহ-৮ ফখরুল ইমাম।
বরিশাল বিভাগে জাতীয় পার্টির নিশ্চিত আসনগুলো হলো: বরিশাল-৬ নাসরিন জাহান, পিরোজপুর-৩ রুস্তম আলী ফরাজী।
সিলেট বিভাগে জাতীয় পার্টির নিশ্চিত আসনগুলো হলো: সিলেট-২ ইয়াহহিয়া চৌধুরী, সিলেট-৫ সেলিম উদ্দিন ও সুনামগঞ্জ-৪ পীর ফজলুর রহমান মেজবাহ।
চট্টগ্রাম বিভাগে জাতীয় পার্টির যেসব আসন নিয়ে সংশয় নেই, সেগুলো হলো: চট্টগ্রাম-৫ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কুমিল্লা-৮ নুরুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর-২ মো. নোমান, ফেনী-৩ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
আ.লীগের ফাঁকা রাখা এক আসনে প্রার্থী দেয়নি জাপা
আওয়ামী লীগ যে কয়টি আসন ফাঁকা রেখেছে তার একটি জামালপুর-২। সেখানে জাতীয় পার্টি এবার প্রার্থী দিতে চায় বলে প্রচার ছিল। কিন্তু দলটির প্রার্থী তালিকায় সেখানে কাউকে রাখা হয়নি।
জাতীয় পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য সুনীল শুভ রায় বলেন, ‘জামালপুর-২ আসনে মোস্তফা আল মাহমুদের ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা কম।’