“লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখর মিনা” ॥ আজ পবিত্র হজ্ব

কাজিরবাজার ডেস্ক :
আজ সোমবার; পবিত্র হজ্ব। লাখ লাখ হজ্বযাত্রী আজ মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে যাবেন। মিনায় ফজরের নামাজ আদায় করেই লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক ধ্বনিতে হজ্বযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে গিয়ে নিজ নিজ খিমায় তশরিফ নেবেন। এখানেই দিনভর এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকবেন তাঁরা। আল্লাহর অশেষ রহমতের ময়দান আরাফাতে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করার নামই হজ্ব। এর আগে-পরে আনুষঙ্গিক কাজ করার মাধ্যমে হজ্বের পরিপূর্ণতা দেয়া হয়। গতকাল (রবিবার) মিনার মাঠে দিনভর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল ছিলেন সব হজ্বযাত্রী।
এ সম্পর্কে বৃহস্পতিবার মিনার মাঠ থেকে হজ পরিদফতরের পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে হজ পালনের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। সোমবার বাদ ফজর হজ্বযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে সমবেত হবেন। তাঁদের বহন করার জন্য রয়েছে বিশেষ ট্রেন সার্ভিস। রয়েছে বাসের ব্যবস্থাও। মিনা থেকে আরাফাতের দূরত্ব বেশি না হওয়ায় অনেকে হেঁটেও রওনা হবেন। তবে বাংলাদেশী হজ্বযাত্রীদের বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে দেয়া হয়েছে। কিছু হজ্বযাত্রী ভিড় এড়াতে মসজিদে নামিরাহর কাছে অবস্থান করার জন্য ফজরের নামাজের আগেই রাত তিনটার দিকে মিনার মাঠ থেকে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
আরাফাতের অবস্থান সম্পর্কে হাদিস শরীফে বলা আছে- হজ্বের মোট ফরজ কাজ হচ্ছে ৩টি। ইহরাম বাঁধা, ৯ জিলহজ্ব নির্দিষ্ট সময়ে উকুফে আরাফায় অবস্থান করা ও কাবাঘরে তাওয়াফ করা।
রবিবার মিনায় ছিল ২০ লক্ষাধিক হজ্বযাত্রীর মিলনমেলা। এ বছর সারাবিশ্ব থেকে ২০ লাখ হজ্বযাত্রী এবং সৌদি আরবের নিজস্ব প্রায় ২ লাখ হজ্বযাত্রী হজ্ব আদায় করবেন। তারা সবাই মিনার মাঠে গতকাল এবাদত-বন্দেগীতে ব্যস্ত ছিলেন। লাখ লাখ হজ্বযাত্রী সাদা তাঁবুতে পাশাপাশি অবস্থান করেন। অগ্নি দুর্ঘটনা এড়াতে এ বছরও মিনার মাঠে রান্না করে খাবার তৈরির কোন ব্যবস্থা নেই। এসব হজ্বযাত্রীর সব খাবারই আসছে বাইরে থেকে।
ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক হজ্বের প্রধান রুকন উকুফে আরাফায় অবস্থান করাটা ফরজ। তাই আজ মিনার মাঠে ফজরের নামাজের পর পরই হজ্বযাত্রীরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তামাম জিন্দেগীর গুনাহ মাফ করার একান্ত বাসনা নিয়ে রওনা দেবেন আরাফাত অভিমুখে। এখানে জোহরের ওয়াক্ত থেকে শুরু হবে উকুফের সময়। এদিন যোহরের ওয়াক্ত থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে ব্যক্তি আরাফায় উপস্থিত হবেন তাঁর জন্য সূর্যাস্ত পর্যন্ত উকুফ করা ওয়াজিব। কেউ সূর্যাস্তের পূর্বে পৌঁছতে না পারলে আগত রাতের সুবেহ সাদিক পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে কিছুক্ষণ অবস্থান করলেও উকুফের ফরজ আদায় হয়ে যাবে। হাদিস মোতাবেক আরাফায় পৌঁছে উকুফের আগে গোসল করা সুন্নত। অনেকে গোসল না করে শুধু অজু করেই সামান্য খাবার খেয়ে নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন।
আরাফাতের মাঠে আজকের করণীয় হচ্ছে আরাফার কেন্দ্রবিন্দু মসজিদে নামিরার জামায়াতে অংশগ্রহণ করা। ইমামের পেছনে এক সঙ্গে একই আজানে যোহর ও আছর আদায় করতে হয়। কিন্তু মসজিদে নামিরায় জায়গা সঙ্কুলান না হওয়ায় নিজ নিজ খিমায় বা তাঁবুতে যোহর ও আছর আলাদা পড়ার নিয়ম। তবে এ নিয়ে মতবিরোধও রয়েছে। নিজের তাঁবুতে যদি কেউ মসজিদে নামিরার জামায়াতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যোহর ও আছর একত্রে পড়তে চান, সেটাও সহীহ্ হয়ে যায়। এ নিয়ে বিবাদে না জড়ানোই শ্রেয় বলে মনে করেন মসজিদে নামিরার খতিব।
হাদিস অনুযায়ী উকুফে আরাফায় অন্যতম করণীয় হচ্ছে দোয়া-মোনাজাত করা। এখানে দোয়া কবুল হওয়ার ওয়াদা রয়েছে। তাই পূর্ণ একীনের সঙ্গে দোয়া করতে হয়। উত্তম হচ্ছে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে একেবারে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া করা। এত দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো কঠিন হওয়ায় প্রয়োজনে বসে বিশ্রাম নিয়ে আবার দাঁড়িয়ে দোয়া শুরু করা যেতে পারে।
হাদিসে রয়েছে- আরাফাতের ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকার পর একজন হজ্বযাত্রীর আসল হজ্ব হয়ে যায়। সূর্যাস্তের পর সবাই হাজী হিসেবে গণ্য হবেন। আরাফাত ময়দান থেকে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাজ না পড়েই মুজদালিফার দিকে সব হাজি রওনা হবেন।
আরাফা বা হজ্বের দিনটি মুসলমানদের জন্য সারা বছরের সেরা দিন। এটি বিশ্ব মুসলমানের মহাসম্মিলনের দিন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আরাফার দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন; যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এদিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, ‘তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দাগণ আমার কাছে কী চায়?’
তাই এদিন বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগীতে মনোনিবেশ করা অপরিহার্য। আরাফার দিনে আমরা নিচের আমলগুলো করতে পারি-
এক. রোজা রাখা। নবী করিম (সা.) বলেন, আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তিনি এ রোজা দ্বারা পূর্ববর্তী এক বছরের এবং পরবর্তী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন। তবে আরাফার ময়দানে অবস্থানকারী হাজিরা এদিন রোজা রাখবেন না।
দুই. বেশি বেশি দোয়া ও এস্তেগফার পড়া। এদিনে দোয়া ও তওবা কবুলের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। নবী করীম (স.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে উত্তম দোয়া হলো আরাফাহ দিবসের দোয়া। আর সর্বশ্রেষ্ঠ কথা যা আমি বলি ও নবীগণ বলেছেন, তাহলো-উচ্চারণ ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আ’লা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির। অর্থ: ‘আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন মাবুদ নেই। তিনি একক তার কোন শরিক নেই। রাজত্ব তারই আর সকল প্রশংসা তারই প্রাপ্য এবং তিনি সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।’
তিন. জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা।
চার. কুরআন তিলাওয়াত।
পাঁচ. মহানবীর প্রতি বেশি বেশি সলাত ও সালাম পাঠানো।
ছয়. যাবতীয় হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা।
মুজদালিফার আমল : আরাফাত থেকে এসে ৯ জিলহজ্ব দিবাগত রাতে মুজদালিফায় অবস্থান করা সুন্নতে মুআককাদা। এদিন মাগরিব ও এশার নামাজ এক আজান ও এক ইকামতে মুজদালিফায় একত্রে পড়তে হবে। তবে অতিশয় বৃদ্ধ, নিতান্ত দুর্বল কিংবা অধিক পীড়িত রোগীর জন্য মুজদালিফায় অবস্থান না করে আরাফা থেকে সোজা মিনায় চলে যাওয়ার অনুমতি আছে। এ রাতে ঘুমানো ও আরাম করাই প্রধান আমল। কেননা মুসলিম শরীফের এক হাদিসে আছে, রাসূল (স.) এ রাতে এশা পড়ে শুয়ে গেছেন। যেন সুবেহ সাদিকের পর উকুফের সময় দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকা যায়। তবে বর্তমানে দেখা যায়, মুজদালিফায় হাজিরা সারা রাতই বিছানায় সজাগ অবস্থায় শুয়ে থাকেন। এ ছাড়া এখান থেকেই সংগ্রহ করতে হয় কঙ্কর। এসব কঙ্কর মারতে হবে মিনার মাঠের জামারায়। মুজদালিফায় ফজর নামাজ শেষে শনিবার দশই জিলহজ্ব সব হাজি একত্রে রওনা দেবেন ফের মিনার মাঠে। এদিন শুধু বড় শয়তানের ওপর কঙ্কর মারতে হয়। হজ্বের ইহরাম বাঁধার পর থেকেই এ পর্যন্ত সবচেয়ে উত্তম জিকির তালবিয়া পড়া এখানেই শেষ করতে হয়।
কঙ্কর বা পাথর মারার নিয়ম হচ্ছে ১০ জিলহজ্ব সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্য ঢলে পড়া পর্যন্ত অর্থাৎ জোহরের সময়ের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পাথর মারা উত্তম। তবে অসুস্থ ব্যক্তিরা সূর্যাস্ত পর্যন্ত পাথর মারতে পারেন। তাও সম্ভব না হলে অন্য কেউ বদলি পাথর মারাও জায়েজ আছে। পাথর মারার পর তামাত্তু ও কিরান হাজিদের জন্য কোরবানি দেয়া ওয়াজিব। মিনার মাঠেই কোরবানির সুবন্দোবস্ত রয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের হাজিরা সরকারী ও ব্যক্তিগতভাবে কোরবানি দিতে পারেন। কোরবানির পরই হাজিরা মাথা মুন্ডন করে হালাল হয়ে যান। এর পর আবার তাঁরা যাবেন মক্কা শরীফে। পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করা ফরজ। তার পরের কাজটি সাফা মারওয়া সাতবার সায়ী করা ওয়াজিব। রাতে আবার হাজিরা ফিরে এসে মিনার মাঠে পর পর আরও ৩ দিন অবস্থান করে শয়তানকে পাথর মারার মধ্য দিয়ে শেষ করবেন ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ্ব।