আন্দোলনে ঢোকা তৃতীয় পক্ষ মানুষ না – প্রধানমন্ত্রী

কাজিরবাজার ডেস্ক :
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়েছে জানিয়ে তাদেরকে তুলে নিতে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, এরা যা খুশি করতে পারে।
শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মধ্যে শনিবার চারজনকে হত্যা ও চারজনকে ধর্ষণের গুজব তুলে তুলকালামের পরদিন রবিবার গণভবনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এই সতর্কতা দেন। ১০টি জেলায় ৩০০ ইউনিয়নের অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ উদ্বোধন করতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তৃতীয় শক্তি মানুষ নয়, এরা পারে না এমন কিছু নেই। যেহেতু আমি আমার আপনজন হারিয়েছি এই ব্যথা, কষ্ট আমি জানি।’
‘সে জন্যই আমার আহ্বান, সে জন্যই আমার এই শঙ্কা। সে জন্যই বাবা মায়ের কাছে অনুরোধ করব, শিক্ষকদের কাছে অনুরোধ করব, আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের তারা যেন আর ব্যবহৃত হতে না দেয়। তারা লেখাপড়া শিখবে, স্কুলে যাবে, কলেজে যাবে পড়াশোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে পড়াশোনা করবে।’
গত ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পরদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে ছাত্ররা। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে মতলবি মহলের সুযোগ নেয়ার চেষ্টার বিষয়ে সতর্কতা দেয়া হয়।
এর মধ্যে আন্দোলনের সুযোগে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে নওমি নামে এক যুবকের কথোপকথনের রেকর্ড প্রচার হয়েছে ফেসবুকেই। আটকও হয়েছেন ওই যুবক। মামলা হয়েছে আমির খসরুর বিরুদ্ধে।
বছরের এই সময়ে স্কুল ড্রেসের চাহিদা না থাকলেও গত কয়েকদিন ধরেই ব্যাপকভাবে স্কুলে ড্রেস বিক্রির তথ্য জানাচ্ছেন বিক্রেতারা। তৈরি হচ্ছে লেমিনেটেড পরিচয়পত্রও।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর ভেতরে তৃতীয় পক্ষ চলে এসেছে। গাউছিয়া মার্কেট থেকে স্কুলের ইউনিফর্ম বিক্রি বেড়ে গেছে হঠাৎ করে, পলাশীতে আইডি কার্ড তৈরি হচ্ছে। এগুলো কারা করছে?’
‘এরা কি আদৌ ছাত্র? কখনও মুখে কাপড় বেঁধে, কখনও হেলমেট বেঁধে, কখনও নানা চেহারায় একেকজনের মুখে ঢুকে যাচ্ছে।’
আমীর খসরু ও নওমির মধ্যে হওয়া অডিও রেকর্ড নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘ঢাকার বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসেছে এখানে। তাদের কাজ কী? সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করা। যখনই এটা দেখলাম, তখনই আমি আতঙ্কিত এই শিশুদের নিয়ে।’
‘যারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারতে পারে, যারা অনিক, হৃদয় (বিএনপির আন্দোলনের সময় পেট্রল বোমায় দগ্ধ) এদের মতো মেধাবী ছাত্রদের পড়াশোনার পথ বন্ধ করে দিতে পারে, তারা কী না পারে এ দেশে?’
‘তারা কী না করতে পারে?’ : আন্দোলনকে উস্কে দিতে শনিবার চারজনকে হত্যা চারজনকে ধর্ষণের গুজব ছড়ানোর কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘যারা এগুলো করতে পারে, তারা কোমলমতি শিশুদের কোনো আঘাত করবে না বা কোনো ক্ষতি করবে না, তার নিশ্চয়তা কী?’
‘যারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারতে পারে তারা তাদের স্বার্থের জন্য যেকোনো পথে যেতে পারে। নইলে ছোট শিশুকেও তো তারা আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে, তার ওপর পেট্রল বোমা মেরেছে।’
‘যেকোনো ভয়াবহ অবস্থা তারা করতে পারে’ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সে জন্য আমি সমস্ত অভিভাবক পিতামাতাকে অনুরোধ করব, আপনারা আপানাদের শিশুদেরকে আপনারা ঘরে রাখেন, আপনাদের ছেলে মেয়েদেরকে আপনারা ঘরে রাখুন।’
ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা যা করতে চেয়েছে তাতে কেউ বাধা দেয়নি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যখন তৃতীয় পক্ষ মাঠে নেমেছে, যেকোনো একটা অঘটন যদি ঘটে, তার দায় দায়িত্ব কে নেবে?’
‘সে জন্য আপনাদেরকে সতর্ক করতে চাই, আপনারা দয়া আপনাদের ছেলেমেয়েদেরকে স্কুলে নেয়ার ব্যবস্থা করুন, তাদের পড়াশোনায় ব্যস্ত করুন, পড়াশোনা তাদের দায়িত্ব।’
নিজেও শিক্ষার্থীদেরকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘তোমরা অনেকেই আমার নাতিপুতির বয়সী। তোমার পড়াশোনায় মনযোগ দাও, যার যার স্কুলে ফিরে যাও, পড়াশোনা কর।’
নিজ নিজ এলাকায শিশুদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে দেশবাসীকেও অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘নইলে অগ্নি সন্ত্রাসকারীরা যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারে।’
‘শিশুরা আরও ভালোভাবে দেশ গড়বে’ : আজকের শিশুরা ভবিষ্যতে আরও ভালো দেশ গড়তে পারবে বলে মনে করে প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আমার পক্ষে অনেক কঠিন ছিল। এত জঞ্জাল জমে গিয়েছিল ২১ বছরে। সেগুলো সাফ করে করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এর পরের ধাপে তারা আসবে। তারা আরও সুন্দরভাবে দেশটা গড়ে তুলবে।’
‘সে জন্য জীবনে ডিসিপ্লিন সরকার, নিয়মানুবর্তিতা দরকার, বয়স্কদের সম্মান করা, শিক্ষকদের সম্মান করা, বাবা মাকে সম্মান করা এটা শিখতে হবে।’
দুর্ঘটনা কমাতে উদ্যোগ আছে : সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কী কী উদ্যোগ নেয়া আছে, সেগুলোও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
‘আমরা ড্রাইভারদের ট্রেইনিং দেয়া শুরু করেছি। এমনকি এটাও বলেছি হেলপারদের ট্রেইনিং দিতে হবে। হাইওয়ের পাশে যেন ড্রাইভারদের বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকে, সেই নির্দেশনাও কিন্তু দিয়েছি।’
ট্রাফিক আইন চালকদেরকে যেমন মানতে হবে, তেমনি পথচারীদেরকেও মানতে হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
‘যত্রতত্র হঠাৎ দৌড়, এমন কোনো ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে দৃষ্টি দেয়, আমরা বারবার সে অনুরোধ জানিয়েছি। ইতিমধ্যে আমি নির্দেশও দিয়েছি আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে, স্কুল থেকেই তাদের ট্রাফিক রুল শেখাতে হবে।’
মহাসড়কে পথচারী পারাপারে আন্ডারপাস অথবা ওভারপাস করে দেয়া হবে জানিয়ে সেগুলো ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘রাস্তায় দৌড় মারবেন, তারপর অ্যাক্সিডেন্ট হলে কার দোষ?’
প্রত্যেকটা স্কুলে রাস্তা পারপারে ট্রাফিক পুলিশ থাকবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছুটির সময় রাস্তা পারাপারের সুব্যবস্থা করে দেবে।’
‘আমাদের ছোট বাচ্চারা অনেক করেছে, খুব ভালো কথা। কিন্তু এখন তাদের আর দেখার দরকার নেই। তারা যদি কেউ ভলান্টিয়ার সার্ভিস দিতে চায়, পুলিশকে বলেছি, তাদেরকে কাজে লাগানো পারি। যারা ভলান্টিয়ার সার্ভিস দিতে চায়, সেটা ছাত্রই হোক, আর শিক্ষকই হোক তারাও দিতে পারে বাচ্চাদের রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা করতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, মহাসড়কের পাশে রিক্সা, ভ্যানসহ ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা রাস্তা করে দেয়া হয়েছ। তবে এর সবই সময়সাপেক্ষ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রেইনিং তো এক দিনে হয় না, আন্ডারপাস ও ওভারপাস তো এক দিনে তৈরি হয় না।’
সড়ক পরিবহন আইনে নীতিগত অনুমোদন দিয়ে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আবার কেবিনেটে আসবে। চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে পার্লামেন্টে তোলা হবে।’
তাদের সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারা পছন্দ হয় না : দেশের কিছু কিছু পত্রপত্রিকার সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। অভিযোগ করেন, এই সুযোগ তারাও নিতে চাইছে। বলেন, ‘সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারা তাদের পছন্দ হয় না। তারা সব সময় চায় একটা অন্য কিছু ঘটুক। তারা মনে করে তাদের নাকি গুরুত্ব বাড়ে। তারা মন্ত্রী হতে পারে, পতাকা পায়।’
‘এই ধরনের আকাঙ্ক্ষা অনেকেরই আছে। যাদের এই আকাঙ্ক্ষা, তারা নির্বাচন করতে পারে, জনগণের কাছে যেতে পারে, সংগঠন করতে পারে। নির্বাচিত হয়ে তারা সরকারে আসুক আমার কোনো আপত্তি নেই।’
‘কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, বা এই ধরনের মিথ্যাচার করে করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার কী অধিকার কাদের আছে?’
সরকারও কারও মুখ বন্ধ করেনি জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে শত শত পত্রিকা, যা খুশি তাই লিখে যাচ্ছে। প্রাইভেট চ্যানেলগুলোতে মধ্যে টক শোতে যত খুশি, যত রকমের সমালোচনা তারা করে যাচ্ছে।’