আসামে বাঙালি নাগরিকত্ব

95

ভারতের আসাম রাজ্য প্রায়ই বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মূলত বাঙালি তথা বাংলাভাষী অধিবাসীদের সূত্রে। অহমিয়া জাত্যভিমান-প্রসূত ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযানও পরিচালিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। কখনো এসবে জড়িত ছিল অহমিয়া জনগোষ্ঠী, কখনো রাজ্য সরকার, কখনো উভয়ে। রক্তপাতের ঘটনাও ঘটেছে। ভাষাকেন্দ্রিক বিরোধও ঘটেছে। রাজ্য সরকারের অহমিয়া ভাষাকে আসাম রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলন হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১১ জন বাঙালি। বাঙালি তথা বাংলাভাষীদের সঙ্গে বৈরী আচরণ এর পরও অনেকবার হয়েছে। এ আচরণের পক্ষে সংশ্লিষ্টদের যুক্তি হলো বাঙালিরা অভিবাসী, তারা আসামের বা অহমিয়া জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তায় বাধা সৃষ্টি করছে। এসব অজুহাতে দশক দেড়েক আগে গণহারে পুশব্যাকের ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল।
এবার সমস্যা দেখা দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে। ‘অবৈধ বিদেশি’ চিহ্নিত করতে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার হালনাগাদ ‘জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি)’-এর চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে আসাম রাজ্য সরকার। এতে রাজ্যের ৪০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। নিজ ভূখণ্ডে তারা ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে পড়েছে এ দাবি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। এর পরও নিশ্চিন্ত থাকার উপায় যে নেই, সে কথা সবাই বোঝে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাদপড়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশি নয়। বাংলাদেশ তাদের ফিরিয়ে নিতে পারবে না। ভারত অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, এনআরসি নিয়ে তারা এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা হয়।
সমস্যার কিছু কারণ তার পরও থেকে যাচ্ছে। ভারতের একজন বিশেষজ্ঞের অভিমত, আসামে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি যারা, তাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার খুব একটা ভাবেনি। এখন পর্যন্ত সরকারি নীতি খুবই অস্পষ্ট। বাদপড়াদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে পরে ধীরে ধীরে ‘ন্যাচারালাইজেশন’-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়া হতে পারে। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এমনও হতে পারে, তাদের ধীরে ধীরে অন্যান্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে এ সমস্যার চাপ একা আসামকে সামলাতে না হয়। অবশ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী এনআরসি প্রকাশের পরই রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার কথা বলেছেন। আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, যারা বাদ পড়েছে, তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। এটি খসড়া তালিকা। তারা আবারও আবেদন করার সুযোগ পাবে।
রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকার বাদপড়া লোকদের নিয়ে যা বলেছে, তা বাহ্যত স্বস্তিদায়ক। কিন্তু ঐতিহাসিক যে নজির রয়েছে তাতে আশঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে। রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে জাত্যভিমান রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারে যাঁরা আছেন তাঁদের কারো কারো অতীতের বক্তব্য ভরসাযোগ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশ সরকার এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বেচালের বড় ঝাপটা প্রথমে বাংলাদেশের ওপরই পড়বে।