ছাতক-দোয়ারায় দু’দিনে ১২ জনের প্রাণহানি

আতিকুর রহমান মাহমুদ ছাতক থেকে :
মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হয়েছে সুনামগঞ্জ। মাত্র একদিনের ব্যবধানে প্রাণ গেল ১২ জনের। কান্নায় ভেঙে পড়ছে নিহতের আত্মীয় স্বজন। বাড়িতে পরিণত হয়েছে শোকের মাতম। বেপরোয়াদের কারনেই শুরু হয়েছে সড়কে লাশের মিছিল। দিন যত যাচ্ছে লাশের সংখ্যা বাড়ছে। তবুও দায়িত্বের পরিবর্তন আসেনি চালকদের। বেপরোয়া এই চালকদের দায়িত্বহীনতার কারণেই সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ উঠেছে চালকদের অসর্তকতার কারণেই এমন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। গেল বৃহস্পতিবার সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ দেন দোয়ারাবাজারের বরসহ একই পরিবারের ৭জন। এই আহাজারি যেতে না যেতেই গেল শনিবার সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ দেন আরো ৫জন। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে নিহত হন একই পরিবারের ৭জন। আর সিলেট সুনামগঞ্জ মহাসড়কে প্রাণ দেন একই উপজেলার ৫জন। এ যেন ধারাবাহিক পর্যায়ক্রম চলছে। এই পর্যায়ক্রম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চালকের সঠিক নির্দেশনার প্রয়োজন। না হয় অন্যথায় শুরু হবে সড়ক পথে মৃত্যুর দোয়ার। অদক্ষ ও বেপরোয়া ট্রাক চালকদের এ অবহেলায় পর পর দু’টি দুর্ঘটনা ঘটে গেল সড়ক পথে। নিহতের পাশাপাশি আহত হয়ে জীবনের পঙ্গুত্ববরণ করছেন আরো অনেকেই। প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যদের কান্নায় শোক বাতাস বইছে এলাকায়। তবে স্থানীয়রা বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানান। অভিযোগ উঠেছে, সড়কের লাইসেন্স বিহীন কিছু অদক্ষ চালকরা চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার, চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানোর কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার পর এসব ঘাতকদের আর খোঁজে পাওয়া পায় না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় পার পেয়ে যাচ্ছে এসব চালক নামের ঘাতকরা।
জানা যায়, শনিবার বেলা ৩টার দিকে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের গোবিন্দগঞ্জ সাদা ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে ছাতকগামী ট্রাক বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহি সিএনজি অটো-রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটো-রিকশাকে ধাক্কা দিলে ৮জন যাত্রী আহত হয়। এদের মধ্যে গুরুতর আহত মুজাম্মেল হোসেন (৪৩), শামছুল ইসলাম (৮০), আবদুস সালাম (৫০), মুক্তার হোসেন (২৮) ও শফিকুল ইসলাম (৩০) কে স্থানীয়রা উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ৫জনকে মৃত ঘোষণা করেন। মারা যাওয়া চার জনের মধ্যে একজন ব্যাটারিচালিত অটো-রিক্সার যাত্রী ও অপর চারজন সিএনজি অটো-রিক্সার যাত্রী বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। আহত রিক্সা চালক যুবায়ের, শিশু নাফি ও কলেজ ছাত্রী নওশিন নামের তিনজনকে স্থানীয় ভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সিলেট থেকে ছাতকগামী রফিকুল ইসলাম ফেনুর ট্রাক (নং-ঢাকা মেট্রো-ট ১৩-০৭৫৯) ও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে সিলেটগামী সিএনজি (নং-সুনামগঞ্জ-থ ১১-০৪০২) এবং ব্যাটারিচালিত অপর অটোরিক্সাকে সড়কের ডান পার্শ্বে গিয়ে ধাক্কা দেয়। এতে ব্যাটারি চালিত অটো-রিক্সা ও সিএনজি অটো-রিক্সা চালকসহ সকল যাত্রী আহত হয়। নিহতরা হলেন, রিকশার যাত্রী ছাতক উপজেলার সদর ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামের আবদুর রউফের পুত্র মুজাম্মেল হোসেন (৪৩), সিএনজি অটো-রিক্সার যাত্রী জামালগঞ্জ উপজেলার আবদুল জলিলের পুত্র শামছুল ইসলাম (৮০), আবদুস সালাম (৫০), চালক মুক্তার হোসেন (২৮) ও শফিকুল ইসলাম (৩০)। এ ব্যাপারে সড়কের হাইওয়ে পুলিশের এএসআই শরিফ মাহমুদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, জামালগঞ্জ থেকে সিলেটগামী সিএনজি অটো-রিক্সায় চালকসহ ৪ব্যক্তি ছিল। ধারণা করা হচ্ছে শামছুল ও আবদুল সালাম নামের দু’জন যাত্রীকে রিজার্ভ নিয়ে এসেছিলেন মুক্তার। আর চালক মুক্তারের সাথে এসেছিলেন শফিকুল। তারা সবাই মারা গেছেন। তিনি অরো বলেন, গোবিন্দগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে ব্যাটারি চালিত অটো-রিকশা যোগে স্থানীয় এক আত্মীয়র বাড়িতে যাওয়ার পথে ওই ট্রাকের ধাক্কায় মারা যান মোজাম্মেল হোসেন (৪৩)। সে ছাতক উপজেলার সদর ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামের আবদুর রঊফের পুত্র। শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় ও রবিবার সকালে লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রবিবার লাশগুলো দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে ২৬ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মুকিরগাও গ্রাম থেকে বিয়ে করার উদ্দ্যেশ্যে নোয়াখালী যাওয়ার পথে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর থানার গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের বটেরতল এলাকায় বরসহ যাত্রীবাহী নোহা গাড়িটি পৌছা মাত্র বিপরীত দিক থেকে দ্রুত গতির মালবাহী ট্রাক নোহার মুখোমুখি সংঘর্ষে বর, নারী-শিশুসহ একই পরিবারের ৭জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মুকির গাও গ্রামের মৃত জমির আলীর ছেলে হাফেজ আনসার আলী (বর) (২৬), তার আপন ভাই (গাড়ি চালক) আমীর আলী (৩৫) ও আরব আলী (২০), ভগ্নিপতি ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের মিরাস আলী (৩৫)। বরের নিকাটাত্মীয়র স্ত্রী তিন সন্তানের জননী পারভীন আক্তার (২৭) ও তার শিশু কন্যা জাহানারা বেগম (৫), ফুফাতো ভাই আনফর আলী (২৬) মারা যান।
জানা যায়, নিহত বর হাফিজ আনসার আলী নোয়াখালির একজি মসজিদে প্রায় তিন বছর ধরে ইমামতি করে আসছিলেন। সেই সুবাধে আনছার আলীর বিয়ে টিকটাক হয় সেখানে। তার দুই ভাই আগেই গিয়েছিলেন কনের বাড়িতে শাড়ি-গহনা নিয়ে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রওয়ানা হয়ে রাতে সেখানে পৌঁছে পরের দিন শুক্রবার বিয়ের দিন ধার্য্য ছিল। সেই আসা আর পুরন হলোনা তাদের। বিয়ে বাড়ি পৌঁছার আগেই ঘাটক ট্রাক কেড়ে নিলো বরসহ ৭জানের প্রাণ। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টায় নিজ বাড়িতে জানাযা শেষে দু’জনের লাশ, গাড়ি চালক আমীর আলী মৌলভী বাজারের শ্রীমঙ্গলে, ভগ্নিপতি মিরাস আলী কে ছাতকের মির্জাপুরে, পারভীন আক্তার ও তার শিশু কন্যা জাহানারা বেগমের লাশ পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামে দাফন করা হয়েছে।