রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হউক

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা কী পরিস্থিতিতে, কেন দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, সে কথা কমবেশি সবার জানা। আন্তর্জাতিক মহলও এ ব্যাপারে অবহিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় মানবাধিকার সংস্থায় তাদের ওপর পরিচালিত নির্যাতন-নিপীড়নের বিভিন্ন ঘটনার নথি এবং ভিডিও রেকর্ড রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে তুলাতলী গ্রামের ঘটনা বেশি আলোচিত। ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট তুলাতলীতে হতাযজ্ঞ চালিয়েছিল মিয়ানমারের সেনারা। সেখানে যে কায়দায় নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের ঘটনা ঘটানো হয় তা অবর্ণনীয়। এমন নৃশংসতার নজির ইতিহাসে খুব কমই আছে। সম্প্রতি তুলাতলীর ওই ঘটনার বিবরণ আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) পেশ করেছে ব্রিটিশ আইনজীবীদের ফোরাম ‘গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্স’।
গত ১২ জুন আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বারে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পেশ করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ওপর বেশ কয়েক দশক ধরেই নিপীড়ন চলছে। গত আগস্টে তা নতুন মাত্রা পায়। তুলাতলী গ্রামের চার হাজার ৭০০ জন বাসিন্দার মধ্যে রাখাইন জনগোষ্ঠীর লোক ছিল মাত্র ৩৫০ জন। ২০১২ সালে রোহিঙ্গারা ভোটাধিকার হারালে সব কর্তৃত্ব চলে যায় রাখাইনদের হাতে। গ্রামপ্রধানও রাখাইনদের মধ্য থেকে করা হয়। ৩০ আগস্টের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কমপ্লায়েন্স বলেছে, গ্রামপ্রধানের কথায় নদীর পারে জমায়েত হয় রোহিঙ্গারা। সেখানে তাদের ওপর খুব কাছ থেকে গুলি ছোড়ে মিয়ানমারের সেনারা। কাউকে কাউকে ছুরিকাঘাত করা হয়, অনেককে লাঠিপেটা করা হয়। যারা সাঁতরে নদী পাড়ি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের ওপরও গুলি চালানো হয়েছিল। নারীদের পুরুষদের থেকে আলাদা করে বসানো হয়েছিল। তারা বাবা, স্বামী, ভাই ও সন্তানদের হত্যার দৃশ্য দেখতে বাধ্য হয়। নদীর পারে বড় গর্ত খুঁড়ে হতাহতদের ছুড়ে ফেলে মিয়ানমার বাহিনী। দাহ্যপদার্থ ঢেলে আর হেলিকপ্টার থেকে পেট্রলের ড্রাম ফেলে হতাহতদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মায়েদের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে সে আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়। কাউকে কাউকে নদীর পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়।
পুরুষ ও শিশুদের হত্যার পর রোহিঙ্গা নারীদের গ্রামে নিয়ে যায় মিয়ানমার বাহিনী। সেখানে তাদের গণধর্ষণ করা হয়, হত্যা করা হয়। অনেককে অজ্ঞান অবস্থায় ঘরে রেখে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তুলাতলী থেকে যারা প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে আসতে পেরেছে, তাদের কাছে এমন বিবরণ শোনেন গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের সদস্যরা। তাদের অনেকে দুদিন পর্যন্ত গ্রামের আশপাশে অপেক্ষা করেছিল কাউকে জীবিত পাওয়ার আশায়, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এ তথ্যও তারা জানায় যে নিরাপত্তা বাহিনী তুলাতলী ফিরে গিয়ে হত্যাযজ্ঞের সব আলামত ধ্বংস করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির আউশভিচে পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ, নৃশংসতার চেয়ে এ ঘটনা কম কিসে? এমন ঘটনা এখনো ঘটে, সেটাই পরম আশ্চর্যের বিষয়। কমপ্লায়েন্স বিশ্বাস করে, এজাতীয় গণহত্যা ঠেকাতেই আইসিসি গঠিত হয়েছে। আমরাও তা-ই মনে করি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, নিপীড়ন বন্ধ হবে না আইসিসি হস্তক্ষেপ না করলে। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আইসিসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমরা আশা করি।