রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান

মিয়ানমারে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। নারী, শিশুসহ প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অত্যন্ত কষ্টকর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশ তার সাধ্যমতো রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও অসহায় রোহিঙ্গাদের বাঁচিয়ে রাখতে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) মিয়ানমারের কাছে জানতে চেয়েছেন, কোন প্রেক্ষাপটে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির ওপর আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার সম্পর্কেও মিয়ানমারকে অভিমত জানাতে বলা হয়েছে। এ জন্য ২৭ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১-এর বিচারক ও প্রসিকিউটরদের ‘স্ট্যাটাস কনফারেন্সে’ গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মিয়ানমারকে এসব জানাতে বলা হয়।
শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা বংশপরম্পরায় মিয়ানমারে বসবাস করলেও প্রায় চার দশক আগে মিয়ানমার তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। এর পর থেকেই তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে দেশটির সামরিক বাহিনী। এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৯৭৮, ১৯৯২ ও ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। প্রথম দিকে কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত নিলেও পরবর্তীকালে তাদের ফেরত না নেওয়ার জন্য মিয়ানমার নানা রকম কৌশল করতে থাকে। গত বছর রোহিঙ্গাদের ওপর বড় ধরনের হামলা শুরু হলে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই হামলাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের প্রকৃষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে দেখছে। অনেক বিশ্বনেতা একে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজনমত এই জঘন্য হামলার উপযুক্ত বিচার চায়। সেভাবেই আইসিসির সামনে বিষয়টি উপস্থাপিত হয় এবং আইসিসি বিচারপূর্ব প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে থাকে। এখানে কিছু সমস্যাও রয়েছে। বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য হলেও মিয়ানমার তা নয়। তাই প্রশ্ন উঠেছে, আইসিসি মিয়ানমারের ওপর বিচারিক এখতিয়ার রাখে কি না। এ ব্যাপারে মিয়ানমারের অভিমত আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। আদালত যদি মনে করেন যে তাঁর সদস্য দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সদস্য নয় এমন দেশের ক্ষেত্রেও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যাবে, তাহলে সেটি হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ এবং বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। অনুরূপ বর্বরতায় সদস্য নয় এমন যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে আইসিসির বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে।
বিশ্বমানবতার স্বার্থেই গণহত্যা বা জাতিগত নিধনযজ্ঞের মতো প্রতিটি ঘটনা বিচারের আওতায় আসা জরুরি, তা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন। মিয়ানমার যা করেছে, সারা পৃথিবীর কাছেই তা এখন স্পষ্ট। আমরা আশা করি, এ ব্যাপারে আইসিসি সঠিক পথেই এগিয়ে যাবে।