মৌলভীবাজারে পানিবন্দী দেড় লাখ মানুষ

মৌলভীবাজার থেকে সংবাদদাতা :
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের তিনটি স্থান এবং কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের সাতটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ৫০-৬০ হাজার পরিবারের বাড়িঘর তলিয়ে গেছে এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম এ খবর নিশ্চিত করেন।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, মনু নদীর বাঁধ ভেঙে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের তেলিবিল, চাতলা ব্রিজ এলাকা, নিশ্চিন্তপুর, বিজিবি চেকপোস্ট এলাকা, পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বেলেরতল, রাজাপুর, কলিরকোনা, টিলাগাও ইউনিয়নের বলিয়ার, মিয়ারপাড়া, সন্ধাবাজার, খন্দকার গ্রাম, তাজপুর, ডরিতাজপুর, শাহজাদপুর, বাগৃহাল ও লহরাজপুর গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়েছে।
কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ছয়ফুল আলম জানান, মাতাবপুর, মাদানগর, চক রণচাপ, হাসিমপুর, বাড়ইগাও ও মন্দিরাসহ ৬-৭টি স্থানে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকরণচাপ বাড়ইগাও ও মাদানগরে মনু নদীর বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া, সাধনপুর, কাউকাপন, বাশউরী ও নোয়াগাঁও এলাকার নদী তীরবর্তী পরিবারগুলোর ঘরবাড়িতে পানি উঠায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। এদিকে মাতাবপুর, বাড়ইগাও ও তুকলী এলাকায় বাঁধ উপচে সমতলে পানি প্রবেশ করেছে।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো.গোলাম রাব্বি বলেন, কুলাউড়ার ৩০টি গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ২৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১২-১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। জেলা প্রশাসন থেকে ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর উপজেলা পরিষদ থেকে শরীফপুর ইউনিয়নে ৫০০ পেকেট শুকনা খাবার, টিলাগাঁও ইউনিয়নে ২০০ পেকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।’
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র আরও জানায়, ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর, ইসলাসপুর ইউনিয়নের হেরেঙ্গা বাজার, বনগাঁও, কেওয়ালীঘাট, শ্রীপুর, মখাবিল এলাকাসহ প্রায় ২০টির বেশি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
সূত্র জানায়, আজ (বুধবার) দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কমলগঞ্জ পৌরসভা ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের ১২৫টি পরিবারের মাঝে জরুরি ভিত্তিতে ১০ কেজি করে জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে।
কমলগঞ্জ মুন্সীবাজার ইউপির চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব তরফদার জানান, ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে করিমপুর ও সুরানন্দপুর এলাকার প্রায় ৮০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক হেক্টর আউশ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাফিলাতির কারণে যথাসময়ে ধলাই নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত না করায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।’
কমলগঞ্জের আদমপুর ইউপির চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন জানান, ধলাই নদীর সাতটি স্থানে ভাঙনের ফলে ঘোড়ামারা, খেওয়ানিঘাট, কান্দিগাঁও, বন্দরগাঁও, মধ্যভাগ, হেরেঙ্গাবাজার গ্রামের একহাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নদীর পানি এখনও বাড়ছে।’
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘মনু নদীর পানি বিপদসীমার ১৭৭ সেন্টিমিটার এবং ধলাই নদীর পানি ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আশা করি, কাল থেকে পানি কমতে শুরু করবে। ধলাই নদীর পানি তো এত সময় থাকার কথা নয়। যদি পানি দ্রুত না নামে, তাহলে বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে যাবে।’ মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের তিনটি ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের সাতটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, জেলায় মোট ১১৫ মেট্রিক টন চাল ও দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এগুলো প্রত্যেক উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা বিতরণ করবেন। জেলার ৫০-৬০ হাজার পরিবারের বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। এতে দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি।’