রামাদান মাসের ফযীলত আদায়ে সঠিক নিয়ম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এখানে আমাদের মৌলিক সমস্যা হয় দুটি বিষয়ের ঈমানের ক্ষেত্রে, একটা হলো আল্লাহ তা’য়ালার ক্ষেত্রে, আরেকটা হলো তাক্বদীরের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিম আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ও তাক্বদীরের প্রতি ঈমানের মর্মার্থ বুঝেন না বা জানেন না। অমুসলিমদেরও আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস আছে। একজন অমুসলিমকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনাকে সৃষ্টি করেছেন কে? উত্তরে তিনি যে নামেই বলুক, তিনি কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালাকেই বুঝাবেন। তাহলে তিনিও আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন। তাহলে ঐ ব্যক্তি ঈমানদার না কেন? আমরা তাকে মু’মিন বলি না কেন? তাই বুঝা গেল তাদের ঈমান আর আমাদের ঈমান এক জিনিস না। তাদের ঈমান হলো আল্লাহ তা’য়ালা আছেন এটা তারা বিশ্বাস করেন, কিন্তু আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করি তাওহীদের ভিত্তিতে। তাদের ও আমাদের আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমানের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো তাওহীদ। আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করি একত্ববাদের ভিত্তিতে, আর তারা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন বহুত্ববাদের ভিত্তিতে। যেমন হিন্দু সমাজ আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন, পাশাপাশি সরস্বতীর, দুর্গার, শ্রীকৃষ্ণের, কালির, ইত্যাদিসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও মা’বুদের পূজা করেন। কিন্তু আমরা এ সবগুলোকে বাদ দিয়ে খালেছভাবে কেবল আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করি। সূরা ফতিহার ৪ নং আয়াতে নামাযের প্রতি রাকাতে সে ঘোষণাই আমরা দিই, “(হে আল্লাহ) আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য চাই”, তাদের ও আমাদের মাঝে ঈমানের পার্থক্য হলো এই জায়গায়। এজন্যে নবী (সাঃ) আরেকটি হাদিসে বলেনঃ “ইসলাম ৫টি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তন্মধ্যে প্রথমটি হলো আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া সত্যিকারের আর কোন মা’বুদ নাই এবং মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহ তা’য়ালার রাসূল”। তাই এই স্বীকৃতিটা দিতে হবে তাওহীদের ভিত্তিতে, আল্লাহ তা’য়ালার একত্ববাদের ভিত্তিতে, শিরক মুক্ত হয়ে, তাঁর কোন শরীক নেই এই ভিত্তিতে।
একজন হিন্দু যেমন বিশ্বাস করেন আল্লাহ তা’য়ালা সমস্ত জ্ঞানের মালিক, কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালা নিজে জ্ঞান বন্টন করেন না, স্বরস্বতিকে দায়িত্ব দিয়েছেন জ্ঞান বন্টন করার জন্যে। সুতরাং জ্ঞান পাবার জন্যে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সরাসরি যাওয়ার দরকার নেই, সরস্বতির কাছে গেলেই জ্ঞান পাওয়া যাবে। তাই হিন্দুরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বাদ দিয়ে সরস্বতির পূজা করেন জ্ঞান লাভ করার জন্যে। তারা বিশ্বাস করেন সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেন আল্লাহ তা’য়ালা, কিন্তু সম্পদ দিবার ক্ষমতা আল্লাহ তা’য়ালা দুর্গাকে দিয়েছেন। তাই তারা আল্লাহ তা’য়ালাকে বাদ দিয়ে দুর্গার পূজা করেন সম্পদ লাভের জন্যে। এভাবে তাদের বিশ্বাস বিভিন্ন দেব-দেবীকে বিভিন্ন ক্ষমতা ও দায়িত্ব আল্লাহ তা’য়ালা দিয়েছেন যার কারণে তারা সে সকল দেব দেবীর পূজা করেন। এসব দেব-দেবী কিন্তু কোন খারাপ মানুষের নামে দেব দেবী না, হয় কোন ফেরেশতার নামে, হয় কোন নবী রাসূলের নামে, হয় কোন অলী আওলিয়ার নামে। এ রকম মূর্তির ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু দায়িত্ব তাদেরকে দেয়া হয়েছে সুতরাং এদেরকে ধরলে, এদের পূজা করলে, এদের কাছে গেলে ঐ সকল জিনিস পাওয়া যাবে।
একইভাবে আমরা মুসলিম সমাজেও দেখি কিছু মুসলিম বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু তাঁর নবী রাসূল (সাঃ) কে দিয়েছেন, কিছু অলী আউলিয়াদেরকে দিয়েছেন, কিছু বিশেষ বিশেষ বান্দাদেরকে দিয়েছেন, কিছু ফেরেশতাদেরকে দিয়েছেন, কিছু জিবরাঈলকে দিয়েছেন, কিছু মালাকুল মাউতকে দিয়েছেন ইত্যাদি। এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ শিরক যেটা ঐ হিন্দু সমাজের বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়। তাই কোন জায়গায় যদি শুনা যায় যে, এখানে আল্লাহ তা’য়ালার একজন অলীর কবর আছে, শুধু তাই না কুকুর একটা জবাই করে যদি কবর দিয়ে লিখে দেয়া হয় অমুক শাহ্ এর মাজার, অমুক আউলিয়ার মাজার, তখন মুসলিমেরা ওখানে টাকা ফালাচ্ছে, তারপর নজর-নেওয়াজ, মান্নত, গরু, ছাগল, খাসী, ইত্যাদি নিয়ে দৌড়া-দৌড়ি শুরু করে দেয়। কেন দৌড়াচ্ছে? মূল উদ্দেশ্য হলো ঐ কবরে যে কুকুর, যে মানুষ, যে অলী শায়িত আছেন ঐ কবরওয়ালাকে ঐ মানুষটাকে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, নাউযুবিল্লাহ। তাই সেখানে টাকা-পয়সা, গরু-ছাগল, মান্নত করলে ঐ কবরওয়ালা আমাকে দিতে পারবেন। সে মরার পরও কবরে বসে বসে এগুলো ঈড়হঃৎড়ষ করছেন, আল্লাহ তা’য়ালার নিয়ে সে বসে আছেন। একজন হিন্দুর যে মানের ঈমান, ঠিক একই মানের ঈমান হয়ে গেছে আমাদের কিছু মুসলিমের। তাহলে এ আক্বীদার অধিকারী, এ বিশ্বাসের অধিকারী মুসলিম রামাদান মাসে যত রোজা, যত তারাবীহ্, যত লাইলাতুল ক্বদর পালন করুক না কেন নবী (সাঃ) বলেন, এ রকম মুসলিম কোন ধরনের ফায়দা, কোন ধরনের সাওয়াব পাবেন না। এজন্যেই নবী (সাঃ) হাদিসে শর্ত দিয়েছেন ঈমান ও এহতেছাবের। আগে ঈমান ঠিক করতে হবে। রোজার চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব বেশী। রোজার কারণে যদি কেউ জাহান্নামে যায়, সে জাহান্নামে স্থায়ীভাবে থাকবে না, এক সময় জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর তিনি জান্নাতে যাবেন। কিন্তু ঈমানের কারণে যদি জাহান্নামে যায় তাহলে এ লোক জান্নাতে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরের চেয়ে ও ঈমানের গুরুত্ব বেশী। তাই আগে ঈমান শিখতে হবে, ঈমান জানতে হবে।
মক্কায় রাসূল (সাঃ) যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতেন আবু জেহেল, আবু লাহাবেরাও আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করতো। কিন্তু তারা বিশ্বাস করতো আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু কিছু মানুষকে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালার ঘরে তাওয়াফ করার সময় আমরা বলি, “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাকা।” আল্লাহ তা’য়ালা এই তালবিয়্যাহ আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু সহীহ মুসলিমে এসেছে মক্কার মুশরেকেরা, আবু জেহেল, আবু লাহাবেরা যখন আল্লাহ তা’য়ালার ঘর তাওয়াফ করতো তখন তারা বলতো “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা ইল্লা শারিকান হুয়া লাকা তামলিকুহু ওমা মালাকা” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তোমার ঘরে আমরা হাজির। তোমার সাথে কোন শরীক নাই, তবে ঐ সমস্ত শরীক আছে যাদেরকে তুমি নিজেই ক্ষমতাবান বানিয়েছ”। মক্কার কাফের-মুশরেকরাও কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁর সাথে আরো কয়েকজনকে শরীক করে নিয়েছেন। তাদের মতে, আমরা কিন্তু কোন শরীক বানাই নাই, আমাদের কোন দোষ নাই, আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই তাদেরকে শরীক বানিয়েছেন, তাঁর কিছু ক্ষমতা, কিছু কার্যকলাপ পরিচালনা করার জন্যে তাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এ রকম বিশ্বাস ওয়ালা মুসলিম রামাদান মাসে সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদত করলে কোন ফায়দা হবে না। কেননা নবী (সাঃ) শর্ত দিয়েছেন ঈমান ও এহতেছাব। এজন্যে ঈমানের সাথে কোন শিরক মিশ্রিত রাখা যাবে না, র্শিক থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সূরা আন্ নিসার ৪৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। র্শিক ছাড়া অন্যান্য পাপ আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছা করলে যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহ তা’য়ালার সাথে শিরক করে সে অবশ্যই মহা পাপ রচনা করে”। সূরা আল মায়েদায় আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার সাথে কাউকে শরীক করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম”। আল্লাহ তা’য়ালার স্পষ্ট ঘোষণা শিরক করলে সে গুনাহ আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না । শিরক বাদে যত গুনাহই হোক আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। (অসমাপ্ত)