খোশ আমদেদ মাহে রমজান

কাজিরবাজার ডেস্ক :
পবিত্র মাহে রমজানের আজ ২০ তম দিবস। পবিত্র মাহে রমজানের ত্রিশ দিনের প্রতি দশ দিন একেকটি মুমিন মুসলমানের জন্য বড় নেয়ামতস্বরূপ। ১ম দশদিন রহমত, ২য় দশদিন মাগফিরাত ও ৩য় দশদিন নাজাতের। প্রিয় নবী হযরত করেছেন এ মাসের প্রথম দশক রহমতের, মাঝের দশক মাগফিরাতের বা মার্জনার এবং শেষের দশদিন দোযখ থেকে নাজাত বা মুক্তির। নাজাতের দশদিন তথা শেষ দশদিন সর্বাধিক ফজিলতসম্পন্ন। এই দশদিনের মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর অশেষ নেয়ামত ও করুণার রজনি লাইলাতুল ক্বদর। তজরীদ নামক গ্রন্থে হযরত আয়েশার (রাদি.) উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, যখন রমজান মাসের শেষ দশদিন আরম্ভ হতো তখন রাসূলে খোদা (স.) স্বয়ং জেগে থাকতেন, পরিবার-পরিজনদের জাগিয়ে রাখতেন, রাতভর জেগে থেকে ইবাদত-বন্দেগী করতেন; কদরের রাত্রি তালাশ করতেন, যে রাত হাজার রাতের চেয়েও উত্তম।
হুজুরে করীম (স.) রমজানের শেষ দশদিনে ইতিকাফে থাকতেন। উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য তাই ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ আলাল কিফায়া। বুখারী ও মুসলিম শরীফে উম্মুল মু’মেনীন হযরত আয়েশা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, অর্থাৎ মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ নবী করীম (স.) কে ওফাত দান করার আগ পর্যন্ত তিনি নিয়মিতভাবে শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন। তারপর তার পবিত্র ইস্ত্রিগণ ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফ হচ্ছে পবিত্র রমজান মাসের সামগ্রিক কল্যাণ ও বরকত লাভের জন্য একটি বলিষ্ঠ সহায়ক শক্তি। রমজানের প্রথম অংশে কোন কারণে যদি পূর্ণ প্রশান্তি, স্থিরচিত্ততা, চিন্তা ও হৃদয়ের একাগ্রতা এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন ও তার রহমতের দরোজায় পড়ে থাকার সৌভাগ্য অর্জিত না হয়, সে অপূরণীয় ক্ষতি ও আফসোস পুষিয়ে দিতে করুণাময়ের পক্ষ থেকে উত্তম ব্যবস্থা হলো ইতিকাফ।
মহানবী হযরত মুহম্মদ (স.) খালিস নিয়তে ইতিকাফ পালনের সাওয়াবকে এক হাদিসে হজ্ব ও ওমরার পুণ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। (সুবহানাল্লাহ)। তাৎপর্য ও ফযিলতের কথা বিবেচনা করে মহানবী আজীবন রমজানে ইতিকাফ পালন করেছেন এবং উম্মতের জন্য সুন্নত ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। পরবর্তীতে তার আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরাম (রাদি.) নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করে আশেকে রাসূল ও ইত্তিবায়ে সুন্নাহর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এরপর থেকে উম্মাহর দ্বীনদার মানুষগণ ব্যাপকভাবে তা পালন করে আসছে। ছোটকালে আমরাও মহল্লার মসজিদে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ময়মুরব্বিকে ইতিকাফ গ্রহণ করতে দেখতাম। কিন্তু এ স্বল্পকালের ব্যবধানে বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে মানুষের মনমানসিকতায়। এখন মসজিদে মসজিদে একজন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মুতাকিফ বা ইতিকাফ করনেওয়ালা পাওয়াও মুশকিল। এটি রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়। আজকের ধর্মপ্রাণ মুরব্বি শ্রেণীর উচিত, আমাদের মহান পূর্বসূরিদের ঐতিহ্যময় সাধনার পথে নিজেদের অবগাহন করা, নিজেদের সম্পৃক্ত করা এ ধারাবাহিক সুন্নতে নববী, সুন্নতে আসহাব ও সুন্নতে সালফেসালেহীনের সঙ্গে।
আসলে ঐতিহ্যজ্ঞান ও ঐতিহ্য সচেতনতা বড় কথা। আজকে আমাদের সমাজে খোদাভীতিও আছে, ধর্মকর্ম পালনের মানসিকতাও আছে, নেই শুধু ইমান ও আমলের শাখাগুলো চেনার পর্যাপ্ত জ্ঞান। দেশ ও জাতির আলেম-ওলামাদের উচিত, নিজেরা পালন করে এবং অন্যদের উৎসাহিত করে সমাজে আবার ইতিকাফের মর্যাদা ও আগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। কুপ্রবৃত্তি দমন ও চরিত্র সুনিয়ন্ত্রিতকরণের জন্য ইতিকাফ একটি বলিষ্ঠ ওয়াসিলা। কারণ মসজিদ এমন এক শান্ত শীতল পূত স্নিগ্ধ জায়গা যেখানে মানুষ কখন কুচিন্তা মাথায় রাখতে চায় না। মসজিদে থাকা ও শোয়া অনেক ওলামায়ে কেরাম জায়েজ মনে করেন না। কিন্তু শরীয়ত শুধু ইতিকাফের সময় তা উদারভাবে অনুমোদনপূর্বক উৎসাহিত করে। সুতরাং, এ সুযোগ কাজে লাগানো দরকার। এখানে আসলেই তো আপনার মাঝে নির্জন বাস, কবর জীবনের কথা, নীরব নিস্তব্ধ এক আখেরী মঞ্জিলের কথা ভাবার ফুরসৎ হয়।
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম লিখেছেন: ইতিকাফের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে গায়রুল্লাহর মোহনীয় বেড়াজাল থেকে মুক্তি লাভ করে আল্লাহর সঙ্গে পরিপূর্ণ ও গভীর প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপন। রমজানের পবিত্র মাসে নির্জন বাস ও ইতিকাফের মাধ্যমে হৃদয় ও আত্মার এমন অভাবনীয় উৎকর্ষ সাধিত হয় যে, মানুষের হৃদয়ে তখন আল্লাহর যিকির ও তার প্রতি গভীর প্রেম ছাড়া অন্যকিছু স্থান পায় না। …(যাদুল মায়াদ: পৃঃ ১৮৭)।
পরিশেষে আমরা বলব ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া। অর্থাৎ এটি নিয়মিত সামাজিক সুন্নত, মহল্লার কেউ কেউ পালন করলে সবাই অন্তত এর সওয়াবের ভাগি হয় এবং দায় থেকে মুক্তি পায়। আর যদি মহল্লার কারো পক্ষ থেকে তা পালিত না হয় তাহলে গোটা মহল্লাবাসী এর জন্য দায়ী ও গুনাহগার হয়ে থাকে। এ জন্য কাউকে বলেকয়ে হলেও তা আদায়ের ব্যবস্থা নিন। যারা স্বেচ্ছায় কিংবা সামাজিক অর্পিত দায়িত্ব নিয়ে ইতিকাফ করেন তারা গোটা সমাজের, গোটা মহল্লার মেহমান। তাদের প্রতি কোন কার্পণ্য নয়, অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সকলের সহানুভূতি পরায়ন হওয়া উচিত। হুজুরে করীম (স.) ইরশাদ করেছেন : শেষ ভাল যার সব ভাল তার। রহমতের প্রথম দশদিনের পর আসে মাগফিরাতের দশদিন, এই বিশদিনের ইবাদতের পর আসে নাজাতের দশ দিনের শেষ সুযোগ। এ সময় কঠোর সাধনার মাধ্যমে পবিত্র রমজানের পরিসমাপ্তিতে রয়েছে মুমিন জীবনের পরম সার্থকতা।