প্রধানমন্ত্রীর সতর্কতা

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনসহ বহু আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগের অনেক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। আবার সাম্প্রতিককালে সেই ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর আদর্শবিমুখ, অনৈতিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জনমনে অসন্তোষেরও কারণ হয়েছে। ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টির কোনো ঘটনা বরদাশত করা হবে না। তিনি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করার এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা নিয়ে কাজ করারও আহ্বান জানান। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ছাত্রলীগের রাজনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সময়োপযোগী একটি বার্তা।
নিকট অতীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খুনাখুনি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো অনেক ঘটনাই ঘটেছে। কিছু ঘটনায় ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে এবং অনেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হয়েছে। ফলে কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে বাড়াবাড়ি করার যে প্রবণতা দেখা যেত, তা অনেকটাই কমে এসেছে। তার পরও প্রধানমন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারি ধ্বংসাত্মক প্রবণতা থেকে ছাত্রলীগকর্মীদের পরিপূর্ণভাবে বিরত রাখবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। ছাত্রলীগ বিরত হলে অন্যদেরও সাহস হবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় লিপ্ত হওয়ার। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা চাই শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাক। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রতি নির্দেশ দেওয়া আছে, ভাঙচুরকারীরা যে দলেরই হোক, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারাও ছাড় পাবে না।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ বজায় না থাকলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর তাতে অভিভাবকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, সর্বোপরি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক দশক ধরে দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। এমন কোনো দিন ছিল না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমাবাজি-গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। শিক্ষকরাও রক্ষা পাচ্ছিলেন না সেসব সন্ত্রাস থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু হলে বাইরে থেকে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে জিম্মি করার এবং মুক্তিপণ আদায় করার ঘটনাও ঘটেছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট চরমে উঠেছিল। আজ সেসব মারামারি-হানাহানি থেকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকটাই মুক্ত। সেশনজটও নেই বললেই চলে। তার পরও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি-শৃৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে অনেক কিছুই করার আছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় সেই প্রত্যয়ই ফুটে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তোমাদের ভবিষ্যৎ কিভাবে আরো ভালো হবে, সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। নীতিমালা হচ্ছে। তোমাদের কাজ হলো শিক্ষায় মনোনিবেশ করা।’ আমরাও চাই, প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী সব কাজ হবে এবং শিক্ষাঙ্গন হয়ে উঠবে বিদ্যাচর্চার অন্যতম পীঠস্থান।