কর্মসূচি নেই, ‘গণহত্যা’ দাবী করে বিবৃতিতে হেফাজতের ৫ মে স্মরণ

কাজিরবাজার ডেস্ক :
পাঁচ বছর আগে রাজধানীর শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান, দিনভর সংঘর্ষ এবং রাতে উচ্ছেদের দিনটি এবার নীরবেই পালন করল কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রীক সংগঠনটি।
রাজধানী তো বটেই হেফাজতের শীর্ষ নেতারা যে মাদ্রাসায় থাকেন, সেই হাটহাজারীতেও কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। তবে দিন শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে দেয়া হয়েছে গণমাধ্যমে।
সংগঠনের আমির আহমদ শাহ শফী ও মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর নামে যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, পাঁচ বছর আগে আজকের দিনে তাদের কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে শাপলা চত্বর থেকে নেতা-কর্মীদেরকে উচ্ছেদে ইতিহাসের ‘বর্বরোচিত গণহত্যা’ চালানো হয়েছে।
২০১৩ সালের আজকের দিনটি ছিল উৎকণ্ঠাময়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে ‘নাস্তিকদের’ আন্দোলন আখ্যা দিয়ে তাদের ফাঁসির দাবিসহ ১৩ দফা দাবিতে সেদিন শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় হেফাজত কর্মীরা।
দিনভর পল্টন, ফকিরাপুলসহ আশেপাশের এলাকায় সেদিন চলে তাণ্ডব। পুলিশের সঙ্গে দিনভর সংঘর্ষে প্রাণ হারায় আট জন।
রাতে বেশ কয়েকটি মরদেহ নিয়ে রাখা হয় শাপলা চত্বরের পাশে। আর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া হেফাজতের পক্ষে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেন।
১৩ দফা দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতে সরকার পতনের কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তবে সেদিন বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ ইসলামী ঐক্যজোটের যে নেতারা হেফাজতের নেতা ছিলেন, তারা ওই রাতে সরকার পতনের ডাক তোলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় হেফাজতের আমির শাপলা চত্বরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন। তিনি সেখানে গিয়ে হেফাজত কর্মীদেরকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাবেন, এমনটাই ছিল ঘোষণা। তবে তার গাড়ি সেদিন পলাশীর মোড় থেকে ঘুড়িয়ে নেয়া হয়।
রাতে হেফাজত কর্মীদের উচ্ছেদে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি মিলে চালানো হয় যৌথ অভিযান।
এর আগেই কর্মীদেরকে রেখে হেফাজত নেতারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আর অভিযানের মুখে হতভম্ভ হয়ে হেফাজত কর্মীরা দুই হাত তুলে শাপলা চত্বর ছেড়ে যান।
তখন এই অভিযানে হাজার হাজার নেতা-কর্মী নিহতের দাবি তুলে হেফাজত। আর পরদিন নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারায় আরও বেশ কয়েকজন।
তখন হেফাজত কথিত নিহতদের তালিকা দেয়ার কথাও বলেছিল। কিন্তু তালিকা আর দিতে পারেনি তারা।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার যে সময় ৬২ জন নিহতের তালিকা দিলেও পরে তা ভুয়া প্রমাণ হয়। এই তালিকার অনেকেই ছিলেন জীবিত। আর অভিযানের আগে দিনভর এবং ৬ মে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে নিহতদের নাম যোগ করে অধিকারের ওই তালিকা বানানো হয়েছিল। এই ভুয়া তালিকা তৈরি করে জনমনে অসন্তোষ তৈরির অভিযোগে মামলা এখনও চলছে।
হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও এর প্রায় সব নেতাদেরই রাজনৈতিক পরিচয় আছে। আর তাদের প্রায় সবাই সে সময় বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল। তবে ২০১৬ সালে ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপির জোট ত্যাগ করার পর হেফাজতের সঙ্গেও বিএনপির পরোক্ষ সম্পর্ক বলতে গেলে শেষ হয়ে যায়। কারণ, এই ঐক্যজোটের নেতারাই মূলত হেফাজতের নিয়ন্ত্রক।
আর ২০১৬ সালের পর থেকেই হেফাজত ৫ মের কর্মসূচি ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে থাকে। আর পাঁচ বছরের মাথায় তারা বিবৃতি দিয়েই দিনটি স্মরণ করল।
প্রমাণ দিতে না পারলেও গণহত্যার দাবি : কথিত হাজার হাজার মানুষকে হত্যার দাবি তোলার পর কারও নাম দিতে না পারলেও পাঁচ বছর পরের বিবৃতিতেও সেই রাতে বর্বরোচিত হত্যার দাবি করা হয়েছে হেফাজতের বিবৃতিতে।
আল্লামা শফি ও বাবুনগরী তাদের বিবৃতিতে সেই দিনের ঘটনার আগের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করে বলেন, ‘সারাদিন অবরোধে অবস্থান নেয়া হেফাজত কর্মীরা যখন ক্ষুধা, পিপাসায় ক্লান্ত শরীরে হাহাকার তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের জন্য সরবরাহকৃত খাবার ও পানির গাড়ি বন্ধ করে দেয়।’
‘সন্ধ্যা থেকেই রাস্তার লাইট বন্ধ করে, মতিঝিলের আশেপাশের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অন্ধকার তৈরি করে ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে নিরস্ত্র ঈমানদার নবীজী (সা.) এর সৈনিকদের ওপর।’
ওই রাতে শাপলা চত্বরে একজনও নিহত হয়নি বলে জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তবে হেফাজত তার বিবৃতিতে বলে, ‘এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড হালাকু খান, চেঙ্গিস খানের নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে।’
শাপলা চত্ত্বরের অভিযানকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনীর বর্বরতার চেয়েও ভয়াবহও দাবি করেছে হেফাজত।
‘২০১৩ সালের ৫ মের শাপলা চত্বরের গণহত্যায় চালিয়ে যৌথ বাহিনী ইতিহাসে এক নতুন কারবালা সৃষ্টি করেছে।’
১৩ দফা দাবি পূরণ না হওয়ার কথা জানিয়ে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানায় হেফাজত।
‘শাপলা চত্বরের শহীদদের’ বিচার বাংলার একদিন হবে বলেও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
হেফাজতের ১৩ দফা দাবিতে সোচ্চার হওয়ার প্রেক্ষাপটও বর্ণনা করা হয় বিবৃতিতে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদরে ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়, ‘২০১৩ সালে কতিপয় নাস্তিক আল্লাহ, রাসূল, পবিত্র কুরআন-হাদিস অবমাননা এবং ইসলামের প্রতীক সমূহের ওপর জঘন্যতম আক্রমণ করে ইসলাম, মুসলমান ও আলেম-ওলামাদের হেয়প্রতিপন্ন করার হীন চেষ্টা চালিয়েছে।’
‘হরদম মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে জাতিকে বিভক্ত করার অপতৎপরতা চালিয়েছে। তখনই এদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে হেফাজতে ইসলাম ৫ মে রাজধানী ঢাকা অবরোধ করেছিল।’