টেকসই উন্নয়নে বহির্বিশ্বের অংশীদারিত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
টেকসই উন্নয়নের মূলনীতি : টেকসই উন্নয়ন মূলত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি’র মতো জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত একটি উন্নয়ন পরিক্রমা, যা ২০১৫ সালের পর এমডিজি-র স্থলে প্রতিস্থাপিত হয়। ৩-১৪ জুন ১৯৯২ ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০-২২ জুন ২০১২ অনুষ্ঠিত হয়। রিও+২০ (জরড়+২০) বা আর্থ সামিট ২০১২ (ঊধৎঃয ঝঁসসরঃ ২০১২) সম্মেলন, যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল বিশ্ব টেকসই উন্নয়ন সম্মেলন বা ডড়ৎষফ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঈড়হভবৎবহপবং (ডঝউঈ) এ সম্মেলনে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং (ঝউএং) গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক কনফারেন্স-এ (রিও+২০) ৭৯ জন সরকার প্রধানসহ ১৯১ টি জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করে। কনফারেন্স এর ফলাফল সংবলিত দলিল ‘দি ফিউচার উই ওয়ান্ট’ এ টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয় এবং কীভাবে তা অর্জন করা যায় সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়। ১ জানুয়ারী ২০১৬ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া এসডিজি (ঝউএঝ) র লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২০৩০ সাল। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য পুরোপুরি দূর করা এবং এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য নতুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের খসড়া রোডম্যাপ ২ আগষ্ট ২০১৫ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশ দীর্ঘ তিন বছরের আলোচনা পর্যালোচনা শেষে ১৭ টি লক্ষ্য সামনে রেখে ৩০ পৃষ্ঠার এ খসড়া গ্রহণ করে। এর নামকরণ করা হয় ঞৎধহংভড়ৎসরহম ড়ঁৎ ডড়ৎষফ: ঞযব ২০৩০ অমবহফধ ভড়ৎ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ. ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত টেকসই উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের শীর্ষ নেতারা চরম দারিদ্র্যমুক্ত পরিবেশ সুরক্ষিত ও নিরাপদে বসবাসে উপযোগী বিশ্ব তৈরির উপরিউক্ত এজেন্ডা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে। ২০৩০ লক্ষ্যভেদী টেকসই উন্নয়নের রোডম্যাপ প্রধান লক্ষ্য ১৭টি: সূচক ৪৭টি ও সহযোগী লক্ষ্য ১৬৯টি। নিম্নে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করা হলো:
বেকারত্বের মতো দিকগুলো থেকে সমাজের প্রত্যেকের সুরক্ষা, সকলের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। মৌলিক সেবাসমূহ তথা শ্রম, ভূমি প্রযুক্তিতে স্বল্প পুঁজির লোকদের সম সুযোগ নিশ্চিতকরণে এবং তাদের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য যেসব সামাজিক নীতিমালা সহায়তা করে সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্টন নিশ্চিত করা। প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্যকরভাবে বেড়ে উঠার জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা, ক্ষুধা দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুষ্টি বাড়ানো এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতির প্রচলন। সব বয়সী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনমান নিশ্চিত করা এবং মরণঘাতী রোগ থেকে মুক্তা থাকা। সবার জন্য ন্যায্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সকলের জন্য সব বয়সে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সব নারী ও বালিকার ক্ষমতায়ন করা। সবার জন্য পানি ও পয়ঃব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও তার টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল এবং যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল এবং যথোপযুক্ত কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা। অবকাঠামো নির্মাণ, সবার জন্য ও টেকসই শিল্পায়ন গড়ে তোলা এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা। দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তদেশীয় বৈষম্য হ্রাস করা, বিশেষ করে দ্রুত ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল ভোগের জন্য দরিদ্রদের সহায়তায় প্রদান করা। নগর ও মানব বসতির স্থানগুলো সবার জন্য, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হয়। টেকসই ভোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা প্যাটান নিশ্চিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। ভূপৃষ্টের জীবন পৃথিবীর ইকোসিষ্টেম সুরক্ষা পূর্ণবহাল করা এবং এর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা করা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয়রোধ করা এবং জীব বৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন বন্ধ করা। টেকসই উন্নয়নের জন্য শন্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তি মূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, সবার ন্যায়বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অংশীদারিত্ব বাস্তবায়ন কৌশলগুলো আরো কার্যকর করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব পুনর্জাগরিত করা।
জাতীয় টেইসই উন্নয়ন কৌশলপত্র : ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (ঘঊঈ) এক সভায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিবেশ নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রথমবারে মতো ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র (ঘধঃরড়হধষ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঝঃৎধঃবমু-ঘঝউঝ) নামের একটি উন্নয়ন দলিল অনুমোদন দেয়া হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অবস্থিক জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন শীর্ষক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব সদস্য এ ধরণের টেকসই উন্নয়ন কৌশল অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এ কৌশল গ্রহণ করেছে। এ কৌশলপত্রের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১০-২০২১ সাল পর্যন্ত। দেশের উন্নয়ন যাতে স্থিতিশীল হয় সে জন্য এ কৌশলপত্র একটি রোডম্যাপ। কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য টেসকই উন্নয়ন। এতে দেশের সব খাতের সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
উৎপাদনশীল সম্পদের দীর্ঘস্থায়ী টেকসহিতা চ্যালেঞ্জার সমাধানসহ কৌশলপত্রে বিবৃত রূপকল্প অর্জনের জন্য এন এসডিএস (২০১০-২০২১) তিনটি পারস্পরিভাবে সম্পৃক্ত ক্ষেত্রসহ পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অব্যহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অগ্রাধিকার মূলক খতগুলোর উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। যে তিনটি পারস্পরিকভাবে যুক্ত বিষয়াবলি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকাগুলো টেকসই উন্নয়নে সহায়তা দান করবে সেগুলো হলো, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, ও জলাবায়ূ, সুশাসন এবং জেন্ডার। কৌশলগত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য শীর্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করবে টেকসই উন্নয়ন পরিবীক্ষণ পরিষদ (এসডিএমসি)।
অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি : পরিবেশগত টেকসহিত্বের প্রশ্নে কোন আপস ছাড়াই মধ্যম আয়ের মর্যাদায় অর্থনীতির রূপান্তরসহ উন্নতর জীবন মান দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন ও কর্মসৃজন নিশ্চিত করার জন্য ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধিতে প্রধান উন্নয়ন কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। অবকাঠামো কর্মসূচি, মানব সম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং তথ্য প্রযুুক্তিতে সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এবং বিনিয়োগ প্রণোদনা বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নসহ পিপিপি প্রবর্ধনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে, শিক্ষা ও দক্ষতা শিক্ষণের মানসহ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বৈদেশিক কর্ম সংস্থানের প্রসার, জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি প্রবর্ধনের মাধ্যমে অব্যাহত ও ত্বরান্বিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
অগ্রাধিকারমূলক খাত সমূহের উন্নয়ন : দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারমূলক খাতসমূহের মধ্যে রয়েছে, কৃষি শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন ও মানব সম্পদ উন্নয়ন। এ খাতগুলোর জন্য সুপারিশকৃত কৌশল অর্থনীতিকে সঠিক নির্দেশনা দানের উপর জোর দেয়া হয়েছে, কেননা এ খাতগুলোই আগামীতে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি থাকবে এবং দেশের টেসকই উন্নয়নে সহায়তা করবে।
নগর পরিবেশ : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যেহেতু দ্রুত নগরায়ন অপ্রতিরোধ্য, সুতরাং টেকসই নগর উন্নয়নের ওপর নানাদিক থেকেই দেশের টেকসই উন্নয়ন নির্ভরশীল। এই অংশে নগরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে পাঁচটি প্রধান বিষয়ে সমাধান অন্বেষন করা হয়েছে। সেগুলো হলো, নগর,গৃহায়ন , পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, দূষণ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিবহন এবং নগর ঝুঁকি হ্রাস।
সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা : টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে সকল নাগরিকের অনুকূলে মানসম্মত ও নূন্যতম মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবার অধিকার এবং সেই সাথে সেবা ও ইউলিটি সেবা তাদের জন্য সহজলভ্য করা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী, নারীদের অগ্রগতি ও অধিকার, শিশুদের অগ্রগতি ও অধিকার, বয়োবৃদ্ধ এবং অসমর্থ মানুষের জন্য বিশেষ সেবা দান, কর্মসংস্থানের সুযোগের বিস্তৃতি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও সুবিধাবলিতে অ্যাকসেস বৃদ্ধি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এগুলো সামাজিক উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বস্তুত সামাজিক উন্নয়ন টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিসমূহের অন্যতম।
পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা : এই কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত এলাকার প্রাথমিক উদ্দেশ্যবলির অন্যতম হলো, প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহারসমূহ এর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন যথাযথ গুরুত্ব দান সহ মানব, ইকোসিষ্টেম ও সম্পদের জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, পানি সম্পদ, বন ও জীববৈচিত্র্য ভূমি ও মাটি উপকূলীয় ও সামুদ্রিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিক দূযোর্গ ও জলবায়ূ পরিবর্তন এর আওতাভূক্ত।
পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এলাকা : জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্রের কৌশলগত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে সহায়তা দিতে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত এই এলাকাগুলি হলো, সুশাসন, জেন্ডার, এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, ও জলবায়ু পরিবর্তন। এটি প্রতীয়মান হয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা উপেক্ষা করে সামগ্রিক ভাবে টেসই উন্নয়ন কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়। (অসমাপ্ত)