জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ

বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ রয়েছে চরম ঝুঁকিতে, তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। অথচ সরকার, দাতা দেশ ও সংস্থা কর্তৃক বরাদ্দ তহবিল নিয়ে বছরের পর বছর ধরে এ খাতে চলছে প্রায় অবাধ লুটপাট, তহবিল তছরুপ, ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি সর্বোপরি সমন্বয়হীনতা। জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সরকার গত আট বছরে বরাদ্দ দিয়েছে আট হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাস্তবে সুফল মিলেছে সামান্যই। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটি) থেকে বিভিন্ন জেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ৪৫০টির মতো প্রকল্প। সরেজমিন অনুসন্ধানে অধিকাংশের হদিস পাওয়া যায়নি। জলবায়ু তহবিলের টাকায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে সাইনবোর্ড টাঙানো বাধ্যতামূলক হলেও প্রায় কোথাও এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর বাইরে জলবায়ু তহবিলের টাকা ব্যবহার নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী বিবেচনায় অনুমোদন, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকির এলাকায় প্রকল্প বরাদ্দ, আদৌ কোন নজরদারি না থাকা, অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তন, নিম্নমানের কাজ, অযথা মেয়াদ বাড়ানো ইত্যাদি তো আছেই। বিসিসিটির নিজস্ব লোকবল মাত্র ৭০ জন। এর মধ্যে শূন্যপদের সংখ্যা ১২টি। সীমিত জনবল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সর্বত্র নজরদারি সম্ভব নয়। এর বাইরেও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যয়ন বিভাগ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পগুলোর নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও বাস্তবে এর অগ্রগতি নেই বললেই চলে। প্রকল্প এলাকার জনপ্রতিনিধি ও মানুষজনের মতে, নিয়মিত নজরদারি ও মনিটরিংয়ের কথা তাদের জানা নেই। ফলে যথেচ্ছ লুটপাট চলছেই।
আগামীতে দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ তীব্র খরার পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়া ও জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এ্যারোনটিকস এ্যান্ড স্পেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা) ও ন্যাশনাল ওসেনিক এ্যান্ড এ্যাটমোসফেরিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) ক্লাইমেট ডাটা সেন্টার চলতি বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থা দুটির মতে, উষ্ণমন্ডলীয় সমুদ্রস্রোত এল নিনোর প্রভাবে এবার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তাপমাত্রা বাড়বে, যা ৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা খরাকবলিত হতে পারে। ফলে পানির অভাবে কৃষি জমি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। ফলে ধান উৎপাদন হবে ব্যাহত। দেখা দেবে সুপেয় পানির অভাব।
বাংলাদেশ অবশ্য এ বিষয়ে সজাগ ও সচেতন। প্রধানমন্ত্রী গত বছর ওয়ান প্ল্যানেট সামিটে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় অভিন্ন প্রচেষ্টা নির্ধারণের লক্ষ্য এগিয়ে নিতে সরকারী-বেসরকারী অর্থায়নের কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই সম্মেলন। ২০১৫ সালে বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ঐকমত্যে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুই বছরের মাথায় বৈশ্বিক তহবিলের বর্তমান অবস্থা এবং তা বাড়িয়ে তোলার লক্ষ্যে উন্নত দেশগুলোর দেয়া প্রতিশ্র“তি পূরণের তাগিদ দিয়ে শেষ হয়।
ঋণদাতা সংস্থাটি সাগর পৃষ্ঠের বাড়ন্ত উচ্চতা থেকে সুরক্ষায় ১৫০টি উন্নয়নশীল শহরের যথাযথ অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা দেবে। তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের চট্টগ্রামও। এটি একটি আশাব্যঞ্জক খবর বৈকি। সে অবস্থায় জলবায়ু তহবিলের অর্থ ব্যয়ে লুটপাট তথা নয়-ছয় কাম্য নয় কোন অবস্থাতেই।