রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন

প্রাণভয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে সত্যিকার অর্থেই বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ। শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে দেশটির সরকার, বিশেষ করে সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছিল। গত বছর ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী স্রোতের মতো আসতে থাকে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে বর্বরোচিত হামলা শুরু করে, তা বিশ্ব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ঘটনার নিন্দা করেছে। জাতিসংঘ একে ‘জাতিগত নিধনে’র প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনেক বিশ্বনেতা একে গণহত্যা বলেছেন। বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তেমন ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সম্প্রতি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে উঠেছে বিষয়টি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি একটি রুল চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মিয়ানমার থেকে যেভাবে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে বিতাড়িত করা হয়েছে, তার বিচার করার এখতিয়ার হেগের আদালতের আছে কি না। আইসিসি এই বিচার করার এখতিয়ার রাখে এমন রুল পাওয়া গেলে রোহিঙ্গা বিতাড়নের ঘটনার তদন্ত করার পথ তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করার পথ খুলবে।
গত বছরের আগস্ট মাস থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে তা যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জেনেভা কনভেনশন ও জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা বলতে সমষ্টির বিনাশ ও বিনাশের অভিপ্রায়কে বোঝায়। এই গণহত্যা বলতে বোঝায় এমন কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয় এবং এ সংক্রান্ত অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজল্যুশন ২৬০(৩) গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধ করতে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। সংজ্ঞা অনুযায়ী, গণহত্যা শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ ক্ষেত্রে জাতিগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মগত নিধনের উদ্দেশ্যে যদি একটি লোককেও হত্যা করা হয় সেটাও গণহত্যা। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে তা সত্যিকার অর্থেই মানবতাবিরোধী অপরাধ।
এখন বাংলাদেশকে এই অপরাধের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখাও প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে রেখে পদক্ষেপ নিতে হবে।