তানিয়া ও মামুনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী প্রদান ॥ স্ত্রীকে অপরাধ জগতে জিম্মী রাখায় মা-ছেলেকে খুন করা হয়

স্টাফ রিপোর্টার :
নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়ায় স্ত্রীকে অপরাধ জগতে জিম্মী রাখায় মা-ছেলে খুন হওয়ার লোমহর্ষক এমন বর্ণনা দিয়ে আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন গ্রেফতার হওয়া তানিয়া আক্তার ও তার স্বামী ইউসুফ মামুন দম্পতি। গত সোমবার রাত ৯ টা থেকে গভীর রাত ১ টা পর্যন্ত সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (তৃতীয়) আদালতে প্রায় ৪ ঘন্টা এভাবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন তারা। আদালতের বিচারক হরিদাস কুমার তার খাসকামরায় তাদের এ জবানবন্দী রেকর্ড করেন। পরে আদালত তাদেরকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
তানিয়াকে অন্ধকার জগত থেকে ফেরাতে না পারার আক্রোশ থেকেই রোকেয়া বেগম ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনকে হত্যা করে স্বামী-স্ত্রী। তানিয়া তার অন্ধকার জগত থেকে ফেরার কথা বলে মামুনকে। মামুনও বেশ কয়েকবার তানিয়ার রক্ষক রোকেয়া বেগমের সাথে যোগাযোগ করে। এরপরও ব্যর্থ হয় সে। অনেকটা বাধ্য করা হয় তানিয়াকে অন্ধকার জগতে থাকতে। রোকেয়ার কারণে স্ত্রীকে ভালো পথে ফেরাতে না পেরে ক্ষীপ্ত হয়ে উঠেন মামুন। নিজেরা বাঁচতে, মামুন ও তানিয়া দু’জনই মিলেই রোকেয়া বেগমের স্বপরিবারে হত্যা করার পরিকল্পনা নেয়। সেই আক্রোশ থেকে গত ৩০ মার্চ খাবারের সাথে ঘুমের ঔষধ দিয়ে অচেতন করা হয় রোকেয়া বেগম, তার ছেলে এসএসসি ফল প্রত্যাশী রবিউল ইসলাম রোকন ও পাঁচ বছরের শিশু রাইসাকে। গতকাল মঙ্গলবার সিলেট পিবিআই কার্যালয়ে আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে সিলেট পিবিআই’র বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল করীম মল্লিক এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, তানিয়াকে অনেকটা অন্ধকার জগতে রাখার জন্য জিম্মী করে রাখে নিহত রোকেয়া। নারী ব্যবসার সাথে রোকেয়া মাদক ব্যবসায়ও জড়িত। রোকেয়াও ছিলেন অন্ধকার জগতের একজন পুরাতন বাসিন্দা। বড় অংকের টাকার বিনীময়ে তানিয়াকে সিলেটের নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজের ছেলেদের কাছেও ৫ দিনের জন্য তাকে ভাড়া দেন রোকেয়া। পিবিআই’র কাছে এমন তথ্য জানায় গ্রেপ্তারকৃত তানিয়া আক্তার। তানিয়া আক্তার ২ বছর আগে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে আসেন। এখানেই পরিচয় হয় রোকেয়া বেগমের সাথে। পরে তানিয়াকে তার বাসায় নিয়ে আসেন রোকেয়া। পাশাপাশি দেখা হয় মামুনের সাথেও। পরে রোকেয়া বেগম কুমিল্লা থেকে আসা তানিয়াকে বোন বানিয়ে সিলেটে রেখে দেন। এদিকে, মামুনের সাথেও তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এর কয়েক দিন পরই মামুনের সাথে তানিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী আলাদা আলাদা বসবাস করতেন। এদিকে রোকেয়া তানিয়াকে নিষিদ্ধ পথে নামান। এরপর থেকে শুরু হয় তানিয়ার অন্ধকার জগতের পথচলা। তানিয়ার অন্ধকার জগতে পথচলার কথা তখনও জানতেন না মামুন। প্রায় এক বছর পূর্বে তারা দুজনই কোর্ট ম্যারেজ (বিয়ে) করেন। তানিয়াকে রোকেয়া বেগম অনেকটা জিম্মী করেই নিজের কাছে রাখেন। এমনকি তানিয়াকে অনেকটা বাধ্য করে নারী ব্যবসা করাতেন রোকেয়া। তার বাসায় প্রতিদিন বিকেল থেকে কৌশলে গিয়ে পুরুষ ও নারীরা যাতায়াত করতেন। স্থানীয় কয়েকজন বখাটে স্বভাবের ছেলেদেরকে ম্যানেজ করে নারী ও মাদকের ব্যবসা করতেন রোকেয়া। শুধু তাই নয় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তানিয়াকে সিলেটের বিভিন্ন উচ্চ বিলাসী আবসিক হোটেলে ভাড়াও দিতেন। তানিয়া ও মামুন তারা দুজনই দুজনকে খুব বেশী ভালোবাসত। তানিয়াকে অন্ধকার জগত থেকে না ফেরাতে পারার আক্রোশ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা নেয় মামুন। আর রোকেয়া ও তার ছেলে রোকনের শরীরে নিজেই ছুরি চালায় মামুন।
বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল করিম মল্লিক আরও জানান-রোকেয়া বেগম নারী ও মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি নিজেও মাদক সেবন করতেন। রোকেয়া ও পুলিশের কাছে রিমান্ডে থাকা নাজমুল ইসলাম দুজনই ছিল ঘনিষ্ট বন্ধু। ঘটনার প্রায় দেড় মাস আগে রোকেয়া বেগমকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিল নাজমুল কিন্তু রোকেয়া তার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে অন্যত্র বিয়ে করার চেষ্টায় ছিলেন বলে তানিয়া আদালতকে জানায়। জীবিত উদ্ধার হওয়া রোকেয়া বেগমের পাঁচ বছয়ের মেয়ে রাইসা তানিয়াকে মা বলে ডাকত। তাই তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা না করে তাকে হত্যার উদ্দেশে ঘুমের ঔষধ খাওয়ায় এবং গলা চেপে ধরা হয়েছিল। রাইসা মারা গেছে এমন ধারণায় তারা রাতেই ওই বাসা ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছোরা কোথায় ফেলে যায় সেই তথ্য তারা দিতে পারেনি। এরপর রাতেই বাসে করে কুমিল্লায় চলে যায় তানিয়া। আর সিলেট থেকে ঘটনার সার্বিক খোঁজখবর নিতে তাকে তানিয়ার স্বামী মামুন।