মিরাবাজারে মা-ছেলে খুন ॥ উদ্ধার হওয়া শিশু পুলিশ হেফাজতে

স্টাফ রিপোর্টার :
নগরীর মিরাবাজার খারপাড়া এলাকায় একটি পরিবারের মা ও ছেলেকে খুন করে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল রবিবার বেলা ১১ টার দিকে খবর পেয়ে ‘মিতালী ১৫/জে’ নম্বর বাসা থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এরমধ্যে গলাকাটা ও শরীরের বিভিন্নস্থানে ছুরিকাঘাত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মা রোকেয়া বেগমের লাশ। ওই বাসা থেকে রাইসা নামে ৫ বছরের একটি শিশুকন্যাকেও উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হচ্ছেন- সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানার কলকলিয়া গ্রামের প্যারালাইজড রোগে আক্রান্ত হেলাল আহমদের স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৪৫) ও ছেলে রবিউল ইসলাম রোকন (১৭)। তারা তিনতলা ওই বাসার নিচতলায় ভাড়া থাকতেন। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, গত শুক্রবার রাতেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে রাইসা পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করার খবর পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, গতকাল রবিবার দুপুরে নগরীর মিরাবাজার খারপাড়ার বাসা থেকে মা ও ছেলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মহিলার মোবাইল ফোনটি গত শুক্রবার থেকে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এরপর গতকাল রবিবার নিহত রোকেয়ার ভগ্নিপতি ফারুক মিয়া এসে বাসার কারো সাড়া শব্দ না পেয়ে বাসার মালিককে অবহিত করেন। এরপর স্থানীয় কাউন্সিলর দিনার খান হাসু ও পুলিশের সহযোগিতায় ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে দু’জনের লাশ পাওয়া যায়।
নিহত রোকেয়ার ভাই জাকির জানান, মাসখানেক আগে থেকেই রোকেয়া তাকে জানিয়েছিলেন যে, এই বাসায় তার বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হচ্ছে। এই বাসা বদলানো প্রয়োজন। রোকেয়ার স্বামী হেলাল আহমদের সাথে তার বনিবনা হচ্ছিল না। তাই তিনি ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতেন। এর আগে গত রমজান মাসে হেলাল আহমদ স্ট্রোক করার পর তার পরিবারের সাথে জল্লারপাড়ের একটি বাসায় বসবাস করছেন।
নিহত রোকেয়ার ভগ্নিপতি ফারুক মিয়া বলেন, সর্বশেষ শুক্রবার সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওইদিনই তাদের হত্যা করা হয়েছে। এজন্য লাশ কিছুটা পচন ধরেছে। তিনি আরো বলেন, নগরীতে রোকেয়ার একটি পার্লার আছে। তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজড রোগে অসুস্থ। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছেলে রোকন এবার নগরীর শাহজালাল জামেয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তিনি বলেন- প্রায় এক বছরে আগে কে বা কারা ওই বাড়িতে ঢুকে রোকেয়াকে মারধর করছিল। পরে স্থানীয় কাউন্সিলরের মধ্যস্থতায় ঘটনাটি মীমাংসা হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ওই বাসার মালিক সালমান হোসেন জানান, তারা বছরখানেক আগে এই বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠেছিলেন। ওই নারী একটি বিউটি পার্লারে কাজ করতেন এবং তার ছেলে মীরাবাজারের একটি মাদ্রাসায় পড়তো। বাসার অন্য ভাড়াটিয়ারা এ ঘটনার কিছুই টের পাননি। তবে সকালে রোকেয়ার ভগ্নিপতি ফারুক মিয়া এসে বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে পুলিশকে জানিয়েছেন। এরপর লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। দ্ইু রুমে দু’জনের লাশ পাওয়া যান। এদিকে ঘটনার পর থেকে ওই বাসার গৃহকর্মী তানিয়াকে (১৬) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গৃহকর্মী তানিয়ার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। নগরীর বারুতখানা এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গৌছুল হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে লাশ দু’টি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ওসমানী হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গত শুক্রবার রাতেই পরিকল্পিতভাবে মা-ছেলেকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইম সিন এসে পৌঁছেছে। এসএমপি কমিশনার গোলাম কিবরিয়াও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পরিতোষ ঘোষ জানিয়েছেন, রোকেয়া ও তার দুই ছেলে মেয়েকেই মারতে চেয়েছিল ঘাতকরা। উদ্ধার করা শিশুটিকেও হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু, সে সময় সে অজ্ঞান হয়ে পড়ায় হত্যাকারীরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে যায়। উদ্ধার করা শিশুটিরও শ্বাসরোধ করা হয়েছিল, পরে তার জ্ঞান ফিরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিরাবাজার খারপাড়ায় মা-ছেলেকে ব্যবসায়িক কিংবা পূর্ব শক্রতার কারণে হত্যা করা হয়েছে। তাদেরকে ছুরিকাঘাতের পাশাপাশি শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, পুলিশ এরই মধ্যে হত্যার কিছু উৎস পেয়েছে। তবে, এসব বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, হত্যাকারীরা অনেক সময় নিয়ে এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। যে কারণে কেউ বিষয়টি টের পায়নি। তিনি আরো জানান, গত শুক্রবার রাতেই এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে তারা ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে পুলিশ নিহত রোকেয়ার বাড়ি থেকে তার ব্যবহৃত কম্পিউটারটি জব্দ করে ও জীবিত উদ্ধার করা রাইসাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। অপরদিকে প্রক্ষাঘাতগ্রস্থ অবস্থায় স্বামী হেলাল আহমদ অপর স্ত্রী পান্না বেগম ও তাদের ৯ বছরের একটি পুত্র সন্তানকে নিয়ে নগরীর বারুতখানা এলাকার উত্তোরন ৫০ নং বাসায় ভাড়া থাকেন। গতকাল রবিবার বিকেলে ওই বাসায় গিয়ে পান্না বেগমের সাথে কথা হলে তাদের সাথে রোকেয়া বেগমের কোন যোগাযোগ নেই বলে জানান তিনি।