হাদীস সম্রাট ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল বুখারী

(১৯৪-২৫৬ হিজরী)
শাহিদ হাতিমী

দিনটি ছিল শুক্রবার। ক্যালেন্ডার অতিক্রম করছিল ১৯৪ হিজরীর ১৩ই শাওয়াল। বুখারা শহরে এক স্বর্ণশিশুর জন্ম হল। কে জানতো সেই শিশুই একদিন হয়ে ওঠবে জগতসেরা মনীষী? শিশুটির নাম রাখা হল মুহাম্মাদ। জানতো কি কেউ একদিন বুখারার ছোট্ট মুহাম্মাদের নাম নেবে বিশ^বাসী? তাঁর পরিচিতি হবে সূর্যের মতো বিস্তৃত? মানুষ সগৌরবে ডাকবে ইমাম বুখারী? হাদীসশাস্ত্রের সূর্যমানব ইমাম বুখারীর আসল নাম ছিল মুহাম্মাদ। তিনি পরিচিত ছিলেন আবু আবদুল্লাহ নামে। পিতার নাম ইসমাঈল, দাদার নাম ইবরাহীম, প্রপিতামহের নাম মুগীরা। তাঁর পূর্বপুরুষগণ পারস্যের অধিবাসী ছিলেন। প্রপিতামহ মুগীরা পারস্য হতে খোরাসানের বুখারা শহরে এসে বসবাস আরম্ভ করেন। ইমাম বুখারীর বাল্যকালেই তার পিতা মারা যান। তিনি মাতার নিকটই প্রতিপালিত হন। আহমদ নামে তার এক ভাই ছিলেন। ইমাম বুখারীর পিতাও আলেম-মুহাদ্দিস ছিলেন।
বাল্যকাল হতেই ইমাম বুখারীর উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত ছিল। বুখারী (রহ.) শৈশবে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তার মাতার সে কী পেরেশানী? আল্লাহর দরবারে দু’আ করতেন। একদিন তার মাতা ইবরাহীম (আ.) কে স্বপ্নে দেখলেন। তিনি বলছেন, তোমার কান্নাকাটির দরুন আল্লাহ তোমার ছেলের চক্ষু ভাল করে দিয়েছেন; নিদ্রাভঙ্গের পর স্বপ্নকে সত্যরূপে দেখতে পেলেন বুখারীর আম্মা।
ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেছেন-আমি লেখাপড়া আরম্ভ করার পর দশবছর বয়সে আমার অন্তর তাগদা দিল যে, আমি যেন হাদীস কণ্ঠস্থ করার জন্য তৎপর হই। তখন থেকেই আমি সবকিছু ছেড়ে হাদীস শিক্ষার প্রতি নিমগ্ন হলাম। হাদীস শিক্ষার জন্য সিরিয়া, মিশর, আল-জাযায়ের, বছরা, বাগদাদ, হেজাজ ইত্যাদি দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করলাম। ১৮ বৎসর বয়সে আমি বিধি গ্রন্থ সংকলনে ব্যাপৃত হই এবং মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) এর রওজা পাকের নিকটবর্তী স্থানে বসে হাদীসের সাক্ষ্যদাতা বা রাবীগণের জীবনেতিহাস রচনায় একখানা কিতাব সংকলন করি। ইমাম বুখারী (রহ.) ৫৬ বছর বয়সে নিশাপুর নামক স্থানে কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখানে তিনি হাদীসের দরস বা শিক্ষা দান করতেন। দেশময় সকল লোক তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠল; এতে তথাকার কোন কোন মানুষের মধ্যে একটি রেশারেশি ভাব উদিত হল। তখন তিনি নিশাপুর ত্যাগ করে বুখারার দিকে ফিরে আসলেন। দেশের জনগণ ইমামকে পুনরায় স্বদেশে পেয়ে আনন্দে আবেগে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তার সাথে রাজ্যের শাসনকর্তার মনোমালিন্যের সৃষ্টি হলো।
ঘটনা এই ছিল যে-খালেদ ইবনে আহমদ নামক বুখারার তৎকালিন শাসনকর্তা ইমাম বুখারীর নিকট সংবাদ পাঠালেন, স্বয়ং তিনি বা তার পুত্রদ্বয় ইমাম বুখারীর সংকলিত কিতাব অধ্যয়ন করতে চান। ইমাম বুখারী (রহ.) যেন সেই শাসনকর্তা-আমীরের বাসভবনে উপস্থিত হয়ে এ কাজ সমাধা করেন। কিন্তু বুখারী (রহ.) পরিষ্কার ভাষায় জানালেন-“দেখুন, আমি কখনও এলেমকে অপমাণিত ও হেয় প্রতিপন্ন করতে পারবো না। (লক্ষ লক্ষ গরীব জনসাধারণকে উপেক্ষা করে)” এ মহান রতœ ইলমকে আমীর-ওমারাদের দরোজার প্রত্যাশী বানাতে পারবো না। অতএব আমীর সাহেব যদি ইলমের প্রতি অনুরাগী ও আকৃষ্ট হয়ে থাকেন, তবে তিনি যেন আমার মসজিদ বা বাড়ীতে উপস্থিত হন। আর যদি তিনি আমার এ ব্যবস্থা অবলম্বনে অসন্তুষ্ট হন এবং আমার শিক্ষা দান কর্মসূচিতে বাধা প্রদানের ইচ্ছা করেন, তবে আমি সে বিষয়ে আদৌ শংকিত নই। কারণ, তার দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে যদি আমার এই কাজ বন্ধ হয়ে যায় তবে আমি কেয়ামতের দিন আলাহ তা’আলার নিকট এই বলে ক্ষমাগণ্য হতে পারবো যে, আমি স্বেচ্ছায় ইলমচর্চা- হাদিস শিখা বন্ধ করে দেই নি।
শাসনকর্তা আমীর এ নিতান্ত স্বাভাবিক ঘটনার দ্বারা সুফল লাভ না করে কুফলের দিকেই অগ্রসর হলেন এবং শুধু নিজেই নয়, বরং বুখারাবাসীরদের দুর্ভাগ্য টেনে আনলেন। তিনি ইমাম বুখারীর এ ন্যায় সঙ্গত উত্তরে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন, এমনকি বিভিন্ন ছলাকলার আশ্রয় গ্রহণ করে বুখারী (রহ.) কে দেশ ত্যাগে বাধ্য করলেন।
হাদীসে কুদসীতে আছে-আল্লাহর ঘোষণা, ‘‘যে ব্যক্তি আমার কোন প্রিয় পাত্রের সহিত শত্র“তা পোষণ করে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করি” এখানে ঠিক তাই হলো-ইমাম বুখারীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই কিছু দিনের মধ্যে আল্লাহর অভিশাপে পতিত হল। কিন্তু ইমাম বুখারী (রহ.) আর দেশে রইলেন না। তিনি বুখারা হতে বাইকান্ধা নামক স্থানে চলে গেলেন। এ সময় সমরকন্দের লোকেরা ইমাম বুখারীকে সমরকন্দ আগমনের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানালেন। সে মতে তিনি সমরকন্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু কররেন। এমতাবস্থায় সংবাদ পেলেন যে, তার আগমন সম্পর্কে সমরকন্দবাসীদের মধ্যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ সংবাদে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত হলেন এবং যাত্রা ভঙ্গ করে দিলেন।
ইমাম বুখারী (রহ.) উল্লিখিত ঘটনা সমূহে ব্যথিত হয়ে দুনিয়ার প্রতি ভিতশ্রদ্ধরূপে একদা তাহাজ্জুদ নামাযের পর এই বলে আল্লাহ তা’আলাকে ডাকলেন-“হে আল্লাহ! এই সুপ্রশস্ত জগৎ আমার জন্য সঙ্কীর্ণ হয়ে উঠেছে, অতএব হে প্রভু! তুমি আমাকে আপন কোলে উঠিয়ে নাও।” আল্লাহ তা’আলা স্বীয় মাহবুব ইমাম বুখারীর এ ডাক ব্যর্থ হতে দিলেন না। তার আবদার পূরণ করা হলো। এক মাসের মধ্যেই হাদীস শাস্ত্রের এই দীপ্ত সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়ে গেল।
আবদুল ওয়াহেদ ইবনে আদম নামক এক বিশিষ্ট ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন-এক রাত্রে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি স্বীয় সাহাবীগণের এক জামাত সহ একস্থানে অপেক্ষমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে সালাম করে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈলের অপেক্ষা করছি। স্বপ্ন বর্ণনাকারী বলেন, কিছু দিন পরে যখন আমি ইমাম বুখারীর মৃত্যু সংবাদ পেলাম তখন হিসাব করে দেখলাম, আমি যে সময় স্বপ্ন দেখেছিলাম ঠিক সে সময়ই ইমাম বুখারীর মৃত্যু হয়েছিল। এ স্বপ্নের দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইমাম বুখারীর পবিত্র আত্মা ইহকাল ত্যাগ করে পরকালের অতিথি হলে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীগণকে নিয়ে এই অতিথির অভ্যর্থনা করেন। হাদীসে আছে-হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-যে ব্যক্তি স্বপ্নে আমাকে দেখে, সে বস্তুত: আমাকেই দেখে থাকে, কেননা শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না।
গালেব ইবনে জিব্রিল নামক খরতঙ্গ গ্রামবাসী ইমাম বুখারী (রহ.) যার আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন, তিনি বর্ণনা করেছেন-ইমাম বুখারীকে কবরের মধ্যে রাখা মাত্রই কবরের চতুস্পার্শ্বে মেশকের ন্যায় সুঘ্রাণ ও সুবাস ছড়াতে লাগল এবং ঐ সুবাস বহুদিন স্থায়ী ছিল। দেশ-বিদেশের লোক জিয়ারতের জন্য এসে তথাকার মাটি নেওয়া আরম্ভ করল। অবশেষে ঐ কবরকে মজবুত বেষ্টনী দ্বারা রক্ষা করতে হলো।
ইমাম বুখারী (রহ.) স্বয়ং বর্ণনা করেছেন, যৌবনের প্রারম্ভে একদা স্বপ্নে দেখলাম-আমি একটি পাখা হাতে নিয়ে হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট দাঁড়িয়ে আছি এবং ঐ পাখার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে মশা মাছি ইত্যাদি তাড়িয়ে দিচ্ছি। ভাল একজন তা’বীর বর্ণনাকারীর নিকট এ স্বপ্ন ব্যক্ত করলে তিনি আমাকে বললেন-তুমি এমন কোন কাজ করবে যদ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি মৌজু’ বা জাল ও মিথ্যা হাদীসের সম্বন্ধ করার মূল উৎপাটিত হয়ে যাবে। এ কথা শুনে আমার মনে প্রেরণা জাগল যে, আমি এমন এক কিতাব লিখব যার মধ্যে সন্দেহমুক্ত সহীহ হাদীস থাকবে। যে হাদীস সম্বন্ধে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ থাকবে তা গ্রহণ করবো না। এরূপ মনস্ত করে আমি পবিত্র মক্কা শরীফের মসজিদে হারামে বসে এ কিতাব লিখতে আরম্ভ করি।
তিনি আরও বর্ণনা করেছেন, আমি এ কিতাবের মধ্যে প্রতিটি হাদীস এতটুকু সতর্কতার সাথে গ্রহণ করেছি যে, আল্লাহ প্রদত্ত স্বীয় ক্ষমতা, জ্ঞান, ইলম ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রতিটি হাদীসকে সূক্ষরূপে বাছাই ও পরখ করে নেয়ার পরেও প্রত্যেকটি হাদীস লেখার পূর্বে গোছল করতঃ দু’রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহ তা’আলার নিকট এস্তেখারা করার পর যখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে এই হাদীসটি সন্দেহের লেশহীন ও সহীহ, তখনই আমি একে আমার এ কতাবের অন্তর্ভূক্ত করেছি; এর পূর্বে নয়। এ েিকতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ পবিত্র মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) এর রওজা পাকের নিকটবর্তী বসে সাজিয়েছি এবং প্রতিটি পরিচ্ছেদ লিখতে দু দু রাকাত নামায পড়েছি। এরূপে আমি স্বীয় কন্ঠস্থ ছয় লক্ষ হাদীস হতে বেছে ষোল বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ কিতাবটি সংকলন করেছি-এ আশায় অনুপ্রাণিত হয়ে যে, আমি যেন এ কিতাবকে নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারি।
নজম ইবনে ফোজাইল নামক বিশিষ্ট মোহাদ্দেস বর্ণনা করেছেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম-হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় রওজা শরীফ হতে বাইরে এসেছেন এবং বুখারী রহ. তার পিছনে হাঁটছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) যে যে স্থানে পা রেখে হাটছেন ইমাম বুখারী (রহ.) ঠিক ঐ স্থানে পা রেখে হাঁটছেন। বুখারা নিবাসী আবু হাতেম নামক বিশিষ্ট ব্যক্তিও এরূপ স্বপ্ন দেখেছেন বলে বর্ণনা আছে।
ইমাম বুখারী (রহ.)’র একজন বিশিষ্ট শার্গেদ বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে স্বপ্নে দেখলাম, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমি আরজ করলাম, মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈলের নিকট যাচ্ছি। হযরত (সা.) বললেন, তাকে আমার সালাম বলবে।
২৫৬ হিজরী ১লা শাওয়াল শনিবার (শুক্রবার দিবাগত রাতে) সমরকান্দের অন্তর্গত খরতঙ্গ নামক গ্রামে ইহজগত হতে বিদায় গ্রহণ করেন। পরদিন (ঈদের দিন) জোহরের নামাযান্তে সেই গ্রামেই সমাহিত হন। তার বয়স তখন ১৩ দিন কম ৬২ বছর ছিল। মৃত্যুকালে তিনি কোন পুত্র সন্তান রেখে যান নি।