দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আলী (রা.) বলেন: রসূলুল্লাহ্ (স.) বলেছেন- ‘‘যে সময় মানুষ ধন-সম্পদ সঞ্চয়ে মনোনিবেশ করিবে, দালান-কোঠা-ইমারত নির্মাণে উৎসাহিত থাকিবে এবং দরিদ্রদিগকে শত্র“র ন্যায় মনে করিবে, তখন আল্লাহ্ তাআলা জনসমাজে চারি প্রকার ‘বালা’ (আপদ-বিপদ) প্রেরণ করিবেন- (১) দুর্ভিক্ষ, (২) রাজশক্তির অত্যাচার (৩) বিচারকদের পক্ষপাতমূলক আচরণ, (৪) কাফের ও শত্র“দের দৌরাত্ম্য’’। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৯-১৪০’’। সমকালীন বিশ্বে আমরা এ দৃশ্য লক্ষ্য করছি। নিজের অধিকারে সামান্য যা কিছু জীবনোপকরণ আছে তাতেই যে সৎ প্রকৃতির দরিদ্র সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ্ তাআলা তাকে সবচেয়ে ভালবাসেন। আবুদ্দারদা (রা.) বলেছেন- ‘‘পার্থিব ধন-সম্পদের উন্নতি দেখিয়া যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট ও আনন্দিত হয় এবং প্রতি মুহূর্তে আয়ু ক্ষয় হইয়া যাইতেছে দেখিয়া চিন্তিত না হয়, তাহার বুদ্ধি বিকৃত হইয়াছে বলিতে হইবে। ইহার মধ্যে কি মঙ্গল থাকিতে পারে যে, পার্থিব ধন-সম্পদ তো বৃদ্ধি পাইতেছে এবং আয়ু প্রতি মুহূর্তে ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে।’’ ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১’’।
ইয়াহইয়া ইবনে মুআয বলেছেন- ‘‘মানুষ দরিদ্রতা ও অভাবকে যেমন ভয় করে, যদি দোযখকে তাহারা তেমন ভয় করিত, তবে দারিদ্র্যতা এবং দোজখ উভয় হইতেই তাহারা নির্ভয় হইতে পারিত। আর তাহারা দুনিয়া পাওয়ার জন্য যেরূপ কঠোর পরিশ্রম করিয়া থাকে, যদি বেহেশ্ত প্রাপ্তির জন্য তদ্রƒপ পরিশ্রম করিত, তবে তাহারা দুনিয়া ও বেহেশ্ত উভয়ই লাভ করিত’’। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪০’’।
এতে বুঝা যায়, পাপ-পুণ্য, দু:খ-দারিদ্র্য, অভাব-অনটন এবং বেহেশ্ত-দোযখ প্রাপ্তি সবই মানুষের কর্মফল-এ সব মানুষের নিয়তি নয়। ‘‘দারিদ্র্য কারোও নিয়তি বা বিধিলিপি আল-কুরআন এই ধরণের মতবাদ স্বীকার করে না। উপরন্তু ইসলামে আলস্য ও সন্ন্যাসবাদেরও কোন স্থান নেই’’। ‘‘হামিদ, মুহাম্মদ আব্দুল, ইসলামী অর্থনীতি: একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ, ঢাকা: সম্পাদনা: প্রফেসর শাহ্ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান, ২০০২, পৃ. ২৭৪’’। মহান আল্লাহ্ বলেন- ‘‘উহা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করিবে না, আর এই যে, মানুষ তাহাই পায় যাহা সে করে, আর এই যে, তাহার কর্ম অচিরেই দেখান হইবে- অত:পর তাহাকে দেওয়া হইবে পূর্ণ প্রতিদান। ‘‘আল-কুরআন, ৫৩:৩৮-৪১’’। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে মানুষ ইহকাল এবং পরকালে তার কর্মফলই ভোগ করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ ঃ উপরের আলোচনা থেকে এই কথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শায়িত করেছে বা ধন উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করেছে। শরীয়তের বিধিমতে ধন উপার্জন এবং ব্যয়ের উপর ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করে। যেমন, আমরা উপরে উল্লেখ করেছি। আল্লাহ্ বলেন- ‘‘আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তদ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে চাহিও না। আল্লাহ্ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৮:৭৭’’। আল্লাহ্ আরো বরেন: ‘‘আর সন্ন্যাসবাদ-ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিল। আমি উহাদের ইহার বিধান দেই নাই’’। ‘‘আল-কুরআন, ৫৭:২৭’’।
আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘শয়তান তোমাদিগকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ্ তোমাদিগকে তাঁহার ক্ষমা এবং অনুগ্রহের প্রতিশ্র“তি প্রদান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’’। ‘‘আল-কুরআন, ২:২৬৮’’। ‘‘যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা কর তবে আল্লাহ্ ইচ্ছা করিলে তাঁহার নিজ করুণায় তোমাদিগকে অভাবমুক্ত করিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’’। ‘‘আল-কুরআন, ৯:২৮’’। তাই আল্লাহ্ বলেন, ‘‘সালাত সমাপ্ত হইলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবে এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধান করিবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করিবে যাহাতে তোমরা সফলকাম হও’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬২:১০’’। সুতরাং তোমরা জীবনোপকরণ কামনা কর আল্লাহ্র নিকট এবং তাঁহারই ইবাদত কর ও তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তোমরা তাঁহারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হইবে’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৯:১৭’’। আল্লাহর নিকট এই প্রত্যাবর্তিত হওয়ার সাবধান বাণীর মধ্যেই লুক্কায়িত আছে ধন উপার্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান মেনে চলার নির্দেশ।
যে বিষয় মানুষকে আল্লাহ্ তাআলার স্মরণ ও ভালবাসা থেকে বিরত রাখে তা মন্দ ও জঘন্য। কোন কোন সময় দারিদ্র্য কারো কারো পক্ষে এতটাই অসহনীয় হয়ে পড়ে যে, সে আল্লাহর প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ে, যেমনটা অনেকের পক্ষে ধন-দৌলতের আধিক্যের কারণেও হয়। সুতরাং অভাব মোচনের পরিমাণ ধন একেবারে ধন শূণ্যতা থেকে ভাল। ‘‘এ কারণেই রসূলুল্লাহ (স.) আল্লাহ্ তাআলার কাছে দু’আ করতেন: ‘‘ইয়া আল্লাহ্! আমার বংশধর এবং উম্মতদিগকে অভাব মোচনের পরিমাণ অন্ন-বস্ত্র দান করিও’’। ‘‘ইমাম গাযালী, কিমিয়াযে সাআদাত প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪২’’। নবী করীম (স.) এরূপ প্রার্থনার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন: ‘‘দারিদ্র্য মানুষকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যায়’’। তিনি আরো বলেন, ‘‘হে আল্লাহ্! আমাকে দরিদ্রের জীবন দান কর। দরিদ্রের মতোই মৃত্যুবরণ করতে দাও এবং কিয়ামতে দরিদ্রের সাথেই পুনরুজ্জীবিত করো’’ (তিরমিযী), তিনি নিজের জন্য এ-ও প্রার্থনা করতেন ‘‘হে আল্লাহ্! আমি দারিদ্র্য, অভাব ও লাঞ্ছনা হতে তোমার পানাহ চাই’’ (বুখারী)। ‘‘হামিদ, মুহাম্মদ আব্দুল, ইসলামী অর্থনীতি: একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৩, ২৬৯’’। এর থেকে এই প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম দারিদ্র্যকে অপছন্দ করে ঠিকই কিন্তু দরিদ্রকে ভালবাসে।
ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ: উপরে পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণ সম্পর্কে সাক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আল-কুরআনের আলোকে মুসলিম সমাজে ধন বৈষম্য ও দারিদ্র্যের কারণ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করবো। এ প্রসঙ্গে দারিদ্র্যের যে কারণগুলোকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি, তার মধ্যে প্রধানত: ক. আল্লাহ্র বিধান থেকে বিচ্যুতি, খ. মানব সৃষ্ট সমস্যা, গ. সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতা, ঘ. সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন ব্যবস্থা, ঙ. ধনীক শ্রেণীর মানসিকতা, চ. দরিদ্র শ্রেণীর মানসিকতা, ছ. ক্ষমতার কেন্দ্রায়ণ ও সংহতকরণ, জ. রিবা ও ঝ. দুর্নীতির প্রভাব। আল্লাহ্র বিধান থেকে বিচ্যুতি: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তুমি কি দেখিয়াছ তাহাকে, যে দীনকে অস্বীকার করে? সে তো সে-ই, যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়াইয়া দেয় এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের, যাহারা তাহাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যাহারা লোক দেখানোর জন্য উহা করে এবং গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট-খাট সাহায্যদানে বিরত থাকে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১০৭”১-৭’’।
বর্তমান মুসলিম সমাজে আল্লাহ্র এ বাণীর যথার্থতা আমরা লক্ষ্য করে থাকি। লোক দেখানো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা যেমন, নামাজ, রোজা, হজ্ব ইত্যাদি অনেকেই পালন করে কিন্তু অর্থনৈতিক বিধিবিধানের পরিপূর্ণ আমল যা আল্লাহ্র ইবাদতেরই অঙ্গ তা তারা করে না। ফলে অভাবগ্রস্ত লোকেরা শরীয়ত মাফিক নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কোন প্রকার সামাজিক সহায়তা পায় না। যার ফালে দারিদ্র্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এর প্রতিকার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া অর্থনৈতিক শিক্ষা, যেমন উত্তরাধিকার আইন ও যাকাত ব্যবস্থার মত শরয়ী বিধানাবলীর যথাযথ বাস্তবায়ন করা। পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বলতে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন বুঝায় না, ব্যক্তি, আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যাবতীয় ইসলামী বিধি-বিধানের পরিপূর্ণ আমলও জরুরি।
মানব সৃষ্ট সমস্যা: আল্লাহ্ বলেন-‘‘আল্লাহ্ই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করিয়াছেন বাসপোযোগী এবং আকাশকে করিয়াছেন ছাদ এবং তিনি তোমাদের আকৃতি গঠন করিয়াছেন এবং তোমাদের আকৃতি করিয়াছেন সুন্দর এবং তোমাদিগকে দান করিয়াছেন উৎকৃষ্ট রিয্ক; তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্ কত মহান’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪০:৬৪’’। আল্লাহ্ আরো বলেন: ‘‘আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে, চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে তো রহিয়াছে নিদর্শন’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪৫:১৩’’।
আল্লাহ্ পৃথিবীতে প্রত্যেকেরই রিয্ক ও পার্থিব-পারলৌকিক কল্যাণ অর্জনের ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু মানুষ আল্লাহ্র বিধান লঙ্ঘন করে যাবতীয় পার্থিব সমস্যার সৃষ্টি করে ও পারলৌকিক কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত হয়। যেমন আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! পন্ডিত এবং সংসারবিরাগীদের মধ্যে অনেকেই লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করিয়া থাকে এবং লোককে আল্লাহ্র পথ হইতে নিবৃত্ত করে। আর যাহারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না উহাদিগকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে উহা উত্তপ্ত করা হইবে এবং উহা দ্বারা তাহাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হইবে। সেদিন বলা হইবে, ইহাই উহা যাহা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভুত করিতে। সুতরাং তোমরা যাহা পুঞ্জীভূত করিয়াছিলে তাহা আস্বাদন কর’’। ‘‘আল-কুরআন, ৯:৩৪-৩৫’’। সর্বসাধারণের জন্য মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদ মুষ্টিমেয় লোক কুক্ষিগত করার মাধ্যমে সৃষ্ট এহেন পার্থিব সমস্যা ইহকাল এবং পরকাল, উভয় কালের জন্যই মানুষের জন্য অকল্যাণকর।
সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতা: আল্লাহ্ সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতার ব্যাপারে বলেন: ‘‘সে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না এবং অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করিত না, অতএব এই দিন সেথায় তাহার কোন সৃহৃদ থাকিবে না এবং কোন খাদ্য থাকিবে না ক্ষত নিঃসৃত স্রাব ব্যতীত, যাহা অপরাধী ব্যতীত কেহ খাইবে না’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬৯:৩৩-৩৭’’। অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করা অর্থে এখানে বুঝানো হয়েছে, বিত্তশালীদের সম্পদ এমন ভাবে ব্যবহার করা যাতে কর্মহীন অভাবগ্রস্তরা কাজ করে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানসহ যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ পায়। অর্থনীতির ভাষায় বিত্তশালীরা তাদের সম্পদ অনুৎপাদনশীল কাজে বা ভোগ-বিলাসে ব্যয় না করে উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কাজে বিনিয়োগ করবে এবং অভাবগ্রস্তরা সেখানে জীবন যাপনের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এ না করলে সম্পদশালীদের জন্য পরকালে মর্মান্তিক শাস্তির বিধান রয়েছে; কারণ সম্পদশালীর সম্পদ জনহিতকর কাজে ব্যবহার করা ইবাদত্ তুল্য।
সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন ব্যবস্থা: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আল্লাহ্ জনপদবাসীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যাহা দিয়াছেন তাহা আল্লাহর, তাঁহার রাসূলের ‘‘এখানে রাসূল বলতে রাষ্ট্রকে বুঝানো হয়েছে। দেখুন, চরপশঃযধষষ, গড়যধসসবফ গধৎসধফঁশব. ‘ঞযব গবধহরহম ড়ভ ঞযব এষড়ৎরড়ঁং কড়ৎধহ’, খড়হফড়হ: ঢ়ঁনষরংযবফ নু ঃযব ঘবি অসবৎরপধহ খরনৎধৎু, ঘবি ণড়ঁৎ ধহফ ঞড়ৎধহঃড়, ঞযব ঘবি ঊহমষরংয খরনৎধৎু খরসরঃবফ, ১২ঃয চৎরহঃরহম, ভড়ড়ঃ হড়ঃব ২, ঢ়. ৩৯৩. রাসূলের স্বজনগণের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, যাহাতে তোমাদের মধ্যে যাহারা বিত্তবান কেবল তাহাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। রাসূল তোমাদিগকে যাহা দেন তাহা তোমরা গ্রহণ কর এবং যাহা হইতে তোমাদিগকে নিষেধ করেন তাহা হইতে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ্ তো শাস্তি দানে কঠোর’’ ‘‘আল-কুরআন, ৫৯:৭’’। আল্লাহ্ভীতি আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদ ব্যক্তি বিশেষের ন্যায়সঙ্গত ভোগ, ব্যয় ও জনসাধারণের মধ্যে ন্যায়ভিত্তিক সমবণ্টনের ও বিতরণের প্রধান নিয়ামক। কিন্তু সচরাচর লক্ষ্য করা যায় মানুষ- এমনকি মুসলিম সমাজও সম্পদ আহরণ, ভোগ, ব্যয় ও বণ্টনের ক্ষেত্রে আল্-কুরআন ও হাদিসের নিয়মাবলী সঠিকভাবে অনুসরণ করে না। এর ফলে সমাজে ও রাষ্ট্রে সম্পদের আয় ও বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্য দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজে ও রাষ্ট্রে সম্পদের আয়, ব্যয় ও বণ্টনের সুষম ও ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রায় সকল রাষ্ট্রই, মুসলিম রাষ্ট্রসহ, এ ব্যাপারে উদাসীন। ফলে এ ধরণের শরীয়ত বিরোধী বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থায় যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন করে।
ধনীক শ্রেণীর মানসিকতা: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যখন বিপদ তাহাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাহাকে স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ’’। আল-কুরআন, ৭০:২০-২১ ‘‘সম্পদশালীদের এই কৃপণতা তাদের সমাজ বিচ্ছিন্নতা ও সমাজ বিমুখতারই ফল। সম্পদ তারা না কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদনশীল বিনিয়োগের কাজে ব্যবহার করে, না বিত্তশালীদের উপর শরীয়া মোতাবেক সমাজের কোন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত জনগণের কল্যাণের ও হক্ আদায়ের কাজে ব্যবহার করে। এর শাস্তি যে ভয়ঙ্কর তা আল্লাহ্ বলেছেন: ‘‘জাহান্নাম সেই ব্যক্তিকে ডাকিবে, যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়াছিল ও মুখ ফিরাইয়া লইয়া ছিল। সে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করিয়া রাখিয়াছিল’’। ‘‘আল-কুরআন, ৭০:১৭-১৮’’। ধনীক শ্রেণীর এ মানসিকতার শরীয়ামুখী পরিবর্তন না হলে তাদের জন্য যে ভয়াবহ পরিণতি রয়েছে সে ব্যাপারেও আল্লাহ্ সতর্ক করেছেন: ‘‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও উহা বার বার গণনা করে; সে ধারণা করে যে, তাহার অর্থ তাহাকে অমর করিয়া রাখিবে; কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হইবে হুতাশায়; তুমি কি জান হুতামা কী? ইহা আল্লাহর প্রজ্বলিত হুতাশন, যাহা হৃদয়কে গ্রাস করিবে; নিশ্চয় ইহা উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিয়া রাখিবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১০৪-১-৯।’’ ইসলাম জনগণের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণে শরীয়া-সমাজমুখী মানসিকতায় বিশ্বাসী।
দরিদ্র শ্রেণীর মানসিকতা: আল্লাহ বলেন: ‘‘আর এই যে, মানুষ তাহাই পায় যাহা সে করে, আর এই যে, তাহার কর্ম অচিরেই দেখান হইবে-অতঃপর তাহাকে দেওয়া হইবে পূর্ণ প্রতিদান।’’ ‘‘আল-কুরআন, ৫৩:৩৯-৪১।’’ আল্লাহ্ আরো বলেন: ‘‘এবং তোমরা কর্ম করিতে থাক; আল্লাহ্ তো তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করিবেন এবং তাঁহার রাসূল ও মুমিনগণও করিবে’’। ‘‘আল-কুরআন, ৯:১০৫’’। আলস্য ও কর্মবিমুখতা দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলাম তাই মানুষকে পরিশ্রমের মাধ্যমে পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধণের চেষ্টা করে যাওয়ার তাগিদ দেয়। পরিশ্রম বিনা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ভাগ্য বিনির্মাণে অলসভাবে শুধু আল্লাহর উপর নির্ভশীলতার শিক্ষা ইসলাম দেয় না। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘এবং আল্লাহ্ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না উহারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৩:১১’’। সুতরাং দারিদ্র্য হতে আত্মরক্ষার জন্য বান্দার নিজ চেষ্টা ও কর্মের বিকল্প নেই। অবশ্য কর্মক্ষম অভাবী লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্রকে যেমন করতে হবে, যেমনটি করেছিলেন নবী করীম (স.) এক ভিক্ষুককে একটি কুঠার কেনার ব্যবস্থা করে দিয়ে তার জীবনধারণের জন্য বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করতে। ‘‘এ উদাহরণটি এখানে জনগণের জীবন ধারণের জন্য সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব পালনের রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।’’ তেমনি দরিদ্রলোককে আলস্য ও কর্মবিমুখতার মানসিকতাও ত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তুমি ধৈর্য ধারণ কর, কারণ নিশ্চয় (অসমাপ্ত)