আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…..

জেড.এম. শামসুল :
১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষার আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ঘোষণা করেন পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও অখন্ডতার স্বার্থে একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা দরকার। আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হতে চলেছে। আর কোন ভাষা নহে। তবে এটা যথাসময়ে হবে। তিনি বাংলাকে অন্যতম ভাষা করার দাবী নাকচ করে দেন। এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন কর্মসূচী দিতে থাকেন। আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। এদিকে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন প্রথম গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ১১ মার্চের হরতালকে সফল করতে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবানে সভা সমাবেশ অব্যাহত থাকে। ১০ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’র হরতাল প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে পূর্ব বাংলায় হরতাল পালিত হয়। সর্বাত্মক হরতালে নেতৃত্ব দেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ। ১১ মার্চের হরতাল ছিল ভাষা আন্দোলনের অব্যাহত ধারা। হরতাল চলাকালীন সময়ে অনেক ভাষা আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন। ১১ মার্চের হরতাল চলাকালীন সময়ে আটককৃত নেতৃবৃন্দকে মুক্তির দাবীতে ১২ মার্চ ধর্মঘট পালন করা হয়। ১৪ মার্চ ঢাকায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অব্যাহত ধর্মঘটের প্রেক্ষিতে ছাত্র জনতা সম্মিলিত আন্দোলন তীব্রতর হতে দেখে তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রদেরকে গ্রেফতার করে। ১৯ মার্চ কায়েদে আজম মোঃ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলায় প্রথম সফরে আসেন এবং ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ মার্চ অব্যাহত ছাত্র ধর্মঘট প্রত্যক্ষ করে তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আপোষ করে বিষয়টি মিটমাট করার উদ্যোগ নেয়। এদিন ১৫ মার্চ সরকারের সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। খাজা নাজিম উদ্দিনের দু’দফা বৈঠকের পর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৮ দফা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরে সম্মত হয়। চুক্তি বাস্তবায়নসহ আটক ছাত্র নেতাদের মুক্তির দাবীতে ১৭ মার্চ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট আহবান করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমাবেশ মিছিল মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সভা সমাবেশে বক্তারা পূর্ববঙ্গের গণপরিষদ থেকে সকল সদস্যকে পদত্যাগ করার আহবান জানান। ১৯৪৮ সালের ২২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ জিন্নাহর সাথে এক বৈঠক করেন। নেতৃবৃন্দ ২৩ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবীসহ ৭ দফা দাবীর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। কিন্তু জিন্নাহ এসব দাবীর প্রতি কোন প্রকার তোয়াক্কা না করে ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে পাকিস্তানের শত্র“ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ২৩ মার্চ বাংলার বাঘ হিসাবে খ্যাত এ.কে.এম ফজলুল হক জিন্নাহর এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং এক বিবৃতিতে বলেন, কায়েদে আজম জিন্নাহ প্রতিহিংসামূলক, স্বৈরাচারী, সরকারী ভাষা কি হবে তাহা গভর্ণর জেনারেলের কাজ নহে, জনসাধারণ তাহা ঠিক করবেন। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাপনী অনুষ্ঠানে একই কথা বলায় জিন্নাহর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন ছাত্র শিক্ষক সকলেই। ঐদিন সভাস্থলে ছাত্ররা চিৎকার করে না না বলে প্রতিবাদ করে। এ সভায় ছাত্ররা “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “উর্দু ভাষা মানি না মানব না” বলে শ্লোগান দিতে থাকে। জিন্নাহর একগুঁয়েমির কারণে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’র সাথে আলোচনায় ঐক্যমত হয়নি। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। যাহা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারী পর্যন্ত চলে।