আওয়ামীলীগের বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ॥ আ’লীগ ক্ষমতায় আসলে উন্নয়ন হয় আর বিএনপি আসলে শুরু হয় হাহাকার

সিন্টু রঞ্জন চন্দ :
আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি ধ্বংসাত্মক রাজনীতি বিশ্বাস করে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশের উন্নয়ন হয়, বিএনপি আসলে শুরু হয় হাহাকার। আমরা গাছ লাগাই বিএনপি জামায়ত জোট গাছ কাটে, রাস্তা বানালে রাস্তা কাটে। বিএনপি উন্নয়নে নয় ধ্বংসের রাজনীতি করে, আওয়ামী লীগ ভাগ্য উন্নয়নের রাজনীতি করে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নগরীর ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে সিলেট মহানগর ও জেলা আওয়ামীলীগের আয়োজিত জনসভায় প্রায় ৩৫ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। তিনি বক্তব্যের শুরুতে সিলেটের হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, আব্দুস সামাদ আজাদ, শাহ্ এম এস কিবরিয়া, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও দেওয়ান ফরিদ গাজীসহ প্রয়াত বর্ষিয়ান নেতা ও জগতজ্যোতিকে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপিসহ সবাই দেশের উন্নয়নের চেয়ে তাদের নিজেদের উন্নয়ন করেছে। ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে আওয়ামীলীগ উন্নয়ন করেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে নেতাকর্মীদের হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। ক্লিন হার্ট অপারেশনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। ২০১৪ ও ১৫ সালে রাজনীতির নামে দেশে বিএনপি-জামায়ত জোট জ্বালাও পোড়াও করেছে। তারা ইসলামের নামে মসজিদ ও কোরআন শরীফ পুড়িয়েছে। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের চিন্তা-চেতনা আর ওদের (বিএনপি-জামায়াত) চিন্তা-চেতনায় তফাৎ কোথায়, তা আপনারাই বুঝতে পারবেন। যারা এতিমের টাকা মেরে খায়, যারা জনগণকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে, যারা মানুষ সেজে ধ্বংস করতে জানে, দেশকে ধ্বংস করতে জানে, বাংলাদেশকে ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে তারা কীভাবে একটা দেশের উন্নতি করবে? যারা নিজেদের ভিক্ষুক হিসেবে অন্যের কাছে হাত পেতে চলতে চায়। আমরা ৪৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নয়ন বাড়িয়েছি।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট লুৎফুর রহমানের সভাপতিত্বে ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিনের যৌথ সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ইমরান আহমদ চৌধুরী এমপি, মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এমপি, সাবেক এমপি সৈয়দা জেবুন্নেসা হক, সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান, হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু জাহের এমপি, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নেসার আহমেদ, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, কৃষিলীগ সভাপতি মোতাহের হোসেন মোল্লা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, যুব মহিলা লীগ সভানেত্রী নাজমা আক্তার, যুব লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল হক আতিক, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন, স্বাচিবের মহাসচিব ডা. মুরশেদ আহমদ চৌধুরী, শ্রমিকলীগ সভাপতি এজাজুল হক, মহানগর কৃষকলীগের সভাপতি মুমিন চৌধুরী, মহানগর শ্রমিকলীগ সভাপতি এম শাহরিয়ার কবির, মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শাহানারা বেগম, জেলা মহিলা লীগের সভাপতি রুবি ফাতেমা ইসলাম, জেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামিম আহমদ, যুব মহিলা লীগ নেত্রী জিন্নাত আলম, মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক আলম খান মুক্তি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিলেট মহানগরের সভাপতি আফতাব হোসেন খান, মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম তুষার। এছাড়া আওয়ামীলীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ উন্নত হবে, সমৃদ্ধশালী হবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের সুনাম হয়। বিএনপি জোট ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ তিরস্কৃত হয়। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ হয়ে যায় তাদের মূল কাজ। এই বাংলাদেশকে উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আপনারা একবার চিন্তা করে দেখুন, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ যদি পুনরায় ক্ষমতায় না আসতো, উন্নতি হতো না। উন্নয়নের ছোঁয়া আপনারা পেতেন না, দেশবাসী পেতো না। কারণ লুটেরা এলে লুটপাট করে খেতো আর সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ চালাতো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে বলেই আজ দেশের উন্নয়ন হয়েছে। তিনি বলেন, এই সিলেটে বিএনপি যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাতে অনেক নেতাকর্মী আমরা হারিয়েছি। সিলেটে কোনও না কোনও দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকতো। বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে তাদের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে।
আসরের আযানের পর বিরতী দিয়ে শেখ হাসিনা আরো বলেন, বিএনপি সারা দেশের প্রায় ১৪/১৫টি শহরে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড, হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, জনগণের সম্পদ ধ্বংস করেছে। তারা দুর্নীতি, লুটপাট করেছে। বিএনপি ধ্বংস করতে জানে, সৃষ্টি করতে জানে না। চলন্ত বাসে আগুন দিয়েছে, রেল গাড়িতে আগুন দিয়েছে। ৫’শ মানুষকে হত্যা করেছে। জীবন-জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি এই কয় বছরে হাজার হাজার গাড়ি পুড়িয়েছে। এই ধরনের আন্দোলন আমরা কখনোই দেখিনি। আন্দোলন জনগণের জন্য, জনগণের দাবি আদায়ের জন্য। যখন জনগণ প্রতিরোধ করেছে, তখন তারা থমকে দাঁড়িয়েছে। দেশের ভাবমূর্তি তারা ধ্বংস করেছে। এ সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করে দেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৮ হাজার ৪০০ পোস্ট অফিসকে আমরা ডিজিটাল সেন্টারে পরিণত করেছি। যেন মানুষ ঘরে বসে সেবা পায়। এই সিলেটে একটা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে দিচ্ছি, যেন এখানে বসেই পড়ালেখা করে আপনারা বড় চিকিৎসক হতে পারেন। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন, প্রতিটি মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না। আমরা সেই স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের হতদরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যশস্যর ব্যবস্থা করি। প্রবাসীদের জন্য ৩টি ব্যাংকের পারমিশন দেওয়া হয়েছে। আমরা বিভিন্নভাবে এই দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে সবার হাতে মোবাইল ফোন আছে? কে দিয়েছে এই মোবাইল ফোন? আমরা আওয়ামী লীগ সরকার। কম্পিউটারের ওপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহার করে প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আট কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। চা না হলে আমাদের চলে না। সেই চা’র উৎপাদন বৃদ্ধি করার পাশাপাশি শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করছি। সিলেট থেকেই যেন নিলাম হয়, সেই ব্যবস্থা করছি। প্রত্যেকটি এলাকায় আমরা বিশেষ অঞ্চল করে দিচ্ছি। সিলেটে আমরা বিশেষ অঞ্চল করে দিচ্ছি। যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশিরা অগ্রাধিকার পাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নৌকা স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। নৌকা উন্নয়নের পথ দেখায়। চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে আমরা আপনাদের কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চাই। তিনি বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে কাজ শুরু করেছি। এই নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেছি সিলেট থেকে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে ৫ বছরে আমরা পদার্পণ করেছি। সামনে নির্বাচন। নৌকা মার্কায় আপনারা ভোট দিয়েছিলেন। আজ বাংলার গ্রামে গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। তিনি বলেন, আপনাদের কাছে আমাদের আহ্বান, আপনারা অতীতে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন। এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা পেয়েছে। এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, সম্মান পেয়েছে। আমরা এই দেশে কোনও অন্যায়-অবিচারকে বরদাস্ত করবো না। কোনও জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের স্থান বাংলার মাটিতে হবে না।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি : বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ঘোড়ায় চড়ে দেশ এগিয়ে চলছে। আরেকটি টার্ম এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেশে দারিদ্রতা থাকবে না। অর্থমন্ত্রী এ সময় বলেন, আমরা যখন ক্ষমতায় এসেছি তখন ৩০ শতাংশ ছিল দারিদ্রতার হার। তার থেকে ৯ শতাংশ লোককে আমরা দারিদ্রতা থেকে মুক্তি দিয়েছি। ৯২ হাজার কোটি বাজেট নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। বর্তমানে ৪ লক্ষ দুইশ কোটি টাকার উপরে দাঁড়িয়েছে বাজেটের আকার। আমরা জনকল্যাণ ও মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করছি। আমরা শহর ও গ্রামের পার্থক্য দূর করার চেষ্টা করছি। এখন গ্রামগুলোতে শহরের সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে। তাকে দুইবার নির্বাচিত করে টানা ৯ বছর কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সিলেটবাসীকে অভিনন্দন জানান অর্থমন্ত্রী। সিলেটকে আধ্যাত্মিক শহর উল্লেখ করে এটিকে উন্নয়নমূলক শহরে পরিণত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান আবুল মাল আবদুল মুহিত।
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী : বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বাতাস দিয়ে নৌকা চালান বলে মন্তব্য করেছেন। জনসভায় মতিয়া চৌধুরী বলেন, সরকার গঠনের ৪৯তম দিনের মধ্যে ঢাকায় বিডিআর বিদ্রোহ হয়। সেই দিনের ঘটনায় সরকার তছনছ হয়ে যেতে পারতো, সবার দোয়ায় ও প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে এই বিডিআর বাহিনীকে সুশৃঙ্খল বিজিবি বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড তুলে ধরে মতিয়া চৌধুরী বলেন, আমরা প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই দিতে পেরেছি। বাংলাদেশের আশেপাশের কোন দেশই এখন পর্যন্ত বিনামূল্যে এতোগুলো বই দিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে এবং হবে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন সাঈদী চান্দে গেছে বইলা বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তছনছ করেছে বিএনপি জামায়াত। জঙ্গি সন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করে ‘ইসলাম কি বলে সুইসাইডের কথা?’ এমন প্রশ্ন রেখে কৃষিমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিরা সুইসাইড ভেস্ট পরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে। এতো কিছুর পরো শেখ হাসিনা এগিয়ে যাচ্ছেন। জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য খালেদা জিয়া চিঠি দিয়েছে বলে জানান মতিয়া চৌধুরী। গতবছরে সিলেট সুনামগঞ্জ হবিগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের বন্যায় ফসলহানির কারণে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল তাতে জ্ঞান পাপীরা মনে করেছিলেন দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিবে। কিন্তু খাদ্য সংকট দেখা দেয়নি। জ্ঞান পাপী উল্লেখ করে শকুনের দোয়ায় গরু মরে না বলে উদ্বৃতি দেন কৃষিমন্ত্রী। সমাবেশে খাদ্য শস্যের দাম কমে আসছে বলেও জানান তিনি।
আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের : বলেছেন, সিলেটের জনগণ কেমন আছো? কিতা খবর ভালা নি? আমরা সব ভালা আছি। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কুশলাদি জানতে চেয়ে সিলেটবাসীকে চমকে দিলেন তিনি। এ সময় তিনি উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে স্ব-ভঙ্গিমায় প্রশ্ন রাখেন, বিদ্যুৎ পাইছেন, রাস্তা পাইছেন রাস্তা ? এ সময় তিনি সিলেটে শতভাগ বিদ্যুৎ সেবার আওতায় আনা হয়েছে বলে জানান। সিলেটে ১৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের কাজ শুরু হচ্ছে। ৬২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট-কোম্পানিগঞ্জ রাস্তা তৈরি হচ্ছে বলে জানান ওবায়দুল কাদের। এ সময় তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব আছে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক তৈরি করার। চায়না কোম্পানির সাথে কিছু ঝামেলা হওয়ায় এখনো কাজ শুরুতে বিলম্ব হয়েছে, সেই সমস্যা সমাধান হয়েছে। ১৭ কোটি মানুষের ১৪ কোটি মোবাইল ফোন আছে জানিয়ে প্রশ্ন রাখেন, এই সুবিধা কে দিয়েছে? বছরের প্রথম দিন বই উৎসব হয়। খালেদা বই দিয়েছে? বিদ্যুৎ দিয়েছে ? খালেদা জিয়া অন্ধকারে রেখে দিয়েছিল। এখন সিলেট আলোকিত হয়েছে। সব বিশ্ব নায়কদের মধ্যে শেখ হাসিনা স্বীকৃতি পেয়েছেন। আপনারা কি শেখ হাসিনাকে ভোট দিবেন? নাকি ৫ বারের দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন খালেদা জিয়াকে ভোট দিবেন? উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে এমন প্রশ্নও রাখেন কাদের। সিলেটবাসীকে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান সড়ক ও সেতুমন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, দেশ ছিলো চরম দরিদ্র। প্রধানমন্ত্রী মাত্র ৯ বছরে দেশকে উন্নতির পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন উদাহরণ হিসাবে কাজ করছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সারা বাংলাদেশের মধ্যে সিলেট একসময় শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে ছিলো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাত্র ৯ বছরে সারা দেশের ন্যায় সিলেট শিক্ষার ক্ষেত্রে সমতায় ফিরেছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এখন দেশের সকল উপজেলায় সরকারি স্কুল চালু হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি স্কুলের সকল শিক্ষার্থী বিনামূল্যে বই পাচ্ছে। নুরুল ইসলাম নাহিদ নিজের নির্বাচনী এলাকা গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলার বাসিন্দাদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গোলাপগাঞ্জ-বিয়ানীবাজার-চারখাই সড়কের কাজের উদ্বোধন আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করেছেন। শীঘ্রই কাজ শুরু হবে। সুতরাং আপনারা হতাশ হবেন না।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আব্দুল মোমেন : বলেছেন, শেখ হাসিনা গরিবের বন্ধু। সরকারের এই মেয়াদে তিনি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। মোমেন বলেন, পৃথিবীতে দুটি দেশ আছে যারা দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করেছিলো। এই দুটি দেশ হচ্ছে চীন ও বাংলাদেশ। এই দুটি দেশই এখন উন্নত। সিলেটে এখন বিদ্যুৎ সমস্যা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় সিলেটে বিদ্যুৎ সমস্যা ছিলো। কিন্তু এখন তা নেই। কিছুদিন আগে সিলেট-১ আসনের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। এছাড়াও তিনি তার বক্তব্যে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিসর আরো বর্ধিত হচ্ছে বলে জানান।
বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান : বলেছেন, আজকের এই জনসভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এই জনসমদ্র শুধু আলিয়া মাদ্রাসাতেই নয়, পুরো সিলেটেই তৈরি হয়েছে। তার কারণ শেখ হাসিনা সিলেটে এসেছেন। দু:খ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কামরান বলেন, ২০০৩ সালে আমি সিটি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে সে সময় কাজ করতে দেয়া হয়নি। সে সময় জেলা পরিষদকে দিয়ে সিটিতে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে কামরান বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে নগরীর উন্নয়নের জন্য ৫১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি খাল উন্নয়ন বাবদ ২৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি বিগত ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে আমাকে একটি টাকাও দেয়া হয়নি। উপস্থিত সকলকে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য হাত তুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দেখিয়ে দেয়ার আহবান জানান তিনি।
সংসদ সদস্য হয়ে জনগণের সেবা করতে চাই জানিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেছেন, ৫০ বছর ধরে রাজনীতিতে আছি। একটিবার জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি হয়ে জনগণের সেবা করতে চাই। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথম রাজনৈতিক প্রচারণা সিলেট থেকে শুরু করেন। এবারও তাই করছেন। সেই সাথে সিলেটের ১৯টি আসন নৌকা প্রতীকে জয়লাভ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন প্রধানমন্ত্রী: সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভা শেষে জনসভাস্থল ত্যাগ করে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের পথে যাত্রা করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টা ১ মিনিটে তিনি জনসভাস্থলে পৌঁছে ৩৫টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। এরপর বেলা ৪টা ৪৭ মিনিটের দিকে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে জনসভাস্থল ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিকেল ৫টা ২৬ মিনিটের সময় বিমানযোগে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর সফরসঙ্গীরাও সিলেট ছেড়েছেন বলে বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছেন। এর আগে বেলা পৌনে ১১টার দিকে সিলেটে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার জিয়ারত করেন তিনি। এসময় সেখানে কোরআন তেলাওয়াত করেন শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা জিয়ারতে অংশ নেন। এরপর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহপরাণ (র.) ও বেলা সাড়ে ১২টায় হযরত গাজী বোরহান উদ্দিন (রহ.) এর মাজারও জিয়ারত করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, তৌফিক-ই-এলাহী, আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, সংসদ সদস্য শেখ হেলাল, সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় সদস্য গোলাম কবির রব্বানি চিনু, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা।
সিলেটের জাতীয় নেতাদের স্মরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী: বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে দুর্দিনে খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সিলেটের অনেক খ্যাতিমান নেতা। আঞ্চলিক রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে তাদের সমান দাপট ছিল। কেউবা বর্হিবিশ্বে ছড়িয়েছেন সিলেটের সুনাম। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের এসব নেতারা আজ বেঁচে নেই। বেঁচে আছে তাদের কৃতকর্ম। সিলেটের উন্নয়নে তাদের ব্যাপক অবদান ছিল। এ কারণে প্রয়াত ত্যাগী নেতাদের স্মরণ করলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, সাবেক স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ্ এম এস কিবরিয়া, দেওয়ান ফরিদ গাজী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ প্রয়াত নেতাদের এবং জগতজ্যোতিকে স্মরণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাদের অবদানের কথা তুলে ধরেন।
জামায়াতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে র‌্যালি: সিলেটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমনকে কেন্দ্র করে নগরীর শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শিক্ষার্থী ও কয়েকজন শিক্ষক মিলে পুণ্যভূমি সিলেটে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে একটি র‌্যালি বের করেন।
প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিলেট আগমন উপলক্ষে মঙ্গলবার শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে সিলেটে স্বাগত জানিয়ে একটি র‌্যালি বের করা হয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে।
প্রতিষ্ঠানটি জামায়াতের কিনা জানতে চাইলে তারা বলেন, সিলেটে জামায়াতের বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি অন্যতম। এখানকার অধিকাংশ শিক্ষক জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরকেও শিবিরের রাজনীতি করার জন্য একটি পক্ষ কাজ করে।