আহত প্রেম

॥ আবু মালিহা ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
শিশিরের পড়াশুনা ভালোই চলছে। বাবার নিয়মিত যাওয়া আসা এবং তার প্রতি তদারকী কোন কিছুতেই কমতি নেই মিসির আলীর। এভাবেই পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত গড়ালো। রেজাল্ট খারাপ নয়। এত ধকল সয়ে যে এগিয়ে যাচ্ছে বাবা মা এতেই খুশি। তার মনোযোগিতাও কম নয়। যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ভাল রেজাল্ট করার জন্য। সাথে দু’চারজন ভাল বন্ধুও জুটেছে। তার মত শান্ত এবং ধীরস্থির। দুষ্টুমি বা খুব উশৃঙ্খলতা নেই ওদের মধ্যে।
শিশিরের বাবা গ্রামের ছেলে হলে কী হবে ওর মধ্যে মায়া-মমতা ও সৎ প্রতিবেশী সুলভ মনোভাব বেজায় রকম। ঝগড়াঝাটি তো দূরের কথা কারো সাথে কটু কথা পর্যন্ত বলেনা। এমনই সজ্জন ব্যক্তি মিসির আলী। গ্রামে এজন্য সবাই তাকে ভালোবাসে। তারই ছেলে শিশির। এমন সৎ স্বভাবের বাবার ছেলে তো শিশির এমনই হবে। শান্ত শিষ্ট এবং ভদ্র আচরণে তার জুড়ি নেই। ক্লাসে সব ছেলেদের সাথে তার সদ্ভাব। কারো সাথে কোনো মনোমালিন্য বা কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয় না। সে জন্য সব শিক্ষকদের দৃষ্টিও তার দিকে। যে কোন কাজের জন্য সবাই তাকে ডাকে। কথায় কাজে এমনই তার ভাল আচরণ।
মাও তার ছেলের জন্য প্রাণান্ত। একটুখানি চোখের আড়াল হতে দেননা। একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার যত চিন্তা। ছেলে কী খাবে, কী কাপড় পরবে এসব নিয়ে ছেলেকে অনেক কথা বলেন। ছেলের মন খুশি থাকলে মা যে খুশি হন। ছেলেও মায়ের মন বুঝে, সে মাকে খুশি রাখার জন্য মায়ের অনেক কথায় সায় দেয়। মা তখন আদর করে তাকে চুমু দিয়ে বলেন, এই তো আমার লক্ষ্মী ছেলে কতই না ভালো ছেলে … তোমার পড়াশুনা আরো ভাল করলে দূরে আরো ভাল স্কুলে পড়তে দিব। তুমি তখন আরো বড় হবে। মায়ের এমন আশা জাগা নিয়া কথা শুনে ছেলের প্রাণ-মন উদ্বেল হয়ে উঠে। মায়ের আশা পূরণ করতে সেও উৎসাহী হয়ে ওঠে। বাবা তার হাল চাষ করে প্রতি বৎসর যে খোরাকী পান তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলে যায়। আপাতত কোন অসুবিধা হচ্ছে না।
সে বার বন্যায় অনেক কৃষি ফসল ধংস হয়ে যাওয়ায় পরিবারে কিছু টানাপোড়ন ছিল। এবার তেমন অসুবিধা হচ্ছেনা- তবে বাড়তি সংরক্ষণ তেমন কিছু নেই। মাঝে মধ্যে অসুবিধায় পড়লে যে তাৎক্ষণিক যোগাড় করা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়বে। বাজার দর আস্তে আস্তে ঊর্ধ্বমুখী। এবারের ফসল তোলাও খুব একটা ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে না। তবুও আশায় বুক বেঁধে আছে। গাঙের ধারে নিচু এলাকায় বোরো ধান যদি ঠিক মতো উঠে তবে হয়তো কোনো রকমে চলে যাবে। ধানের কচি শীষ জেগেছে। মোটামুটি ফলন ভাল হবে বলে আশা করছে। কারণ এটিই একমাত্র ধান ক্ষেত- মিসির আলীর বিঘা দুই জমির ফসল দিয়ে ৯ মাসের মতো খাওয়া পরা চলে যায়। বাকী ৩ মাস আয় রোজগারের মত একটা করতেই হয়, নইলে সংবৎসর চলেনা। পাশাপাশি ছেলে বড় হচ্ছে স্কুলে উপরের দিকে উঠছে। পড়াশুনার খরচ বেড়ে যাওয়া সেই চিন্তা করতেই হয়। তবুও ছেলের পড়াশুনা থামানো যাবেনা। তিনি ছেলেকে যে করেই হোক কলেজ পাশ দেওয়াতেই চান। ছেলে ভাল চাকরী করবে এবং বাবার মতো এমন গাধার খাটনি আর খাটতে হবে না- সেই আকাক্সক্ষা তার। ছেলে মানুষ হবে এলাকার জন্য কাজ করবে, সমাজের মানুষকে ভাল কাজে উৎসাহিত করবে এবং শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর করবে। এক কথায় সমাজ দরদী যাকে বলে ….।
এদিকে শিশিরের স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। স্কুল প্রায় ১৫ দিনের ছুটি। বাড়ীতে সবাই কম বেশী আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে। কারণ ডিসেম্বরের শেষ দিকে ফলাফল ঘোষণা করবেন প্রধান শিক্ষক। যেন এক ঈদের দিন। সেই দিনের অপেক্ষায় সবাই থাকে। হাসি আনন্দ আর অশ্র“ বিসর্জনের দিন। ফলাফলের ভিত্তিতে এই পরিবেশ। এমন অম্লমধুর পরিবেশ প্রতিটি ছাত্র জীবনেই ঘটে থাকে। শিক্ষা জীবনের এটাই চিরন্তন রূপ। আমাদের বেলাতেও এরূপ ছিল। এটা বলাই বাহুল্য। (অসমাপ্ত)