পুরাতন সংবাদ: September 1st, 2018

খোকার প্রশ্ন

রেজাউল রেজা

গাছে কেন পাখির বাসা?
কিচিরমিচির কেন ডাক?
বনে কেন শিয়াল থাকে?
মাঝে মাঝে মারে হাঁক।

গরু কেন হাম্বা ডাকে?
বিড়াল কেন ডাকে মিউ?
টিকটিকিরা টিক টিক করে
কুকুর আবার করে ঘেউ!

পায়রা কেন বাকুম ডাকে?
সাপে কেন করে ফোঁস?
খোকার মনে অনেক প্রশ্ন
সবুজ কেন হয়না মোষ?

আলো নেই

আবু আফজাল সালেহ

চারিদিকে অন্ধকার…
সুড়ঙ্গপথমুখে আলোর দেখা নেই।
কাছের লোকগুলোয় বিশ্বাসঘাতক আজ,
যাকে ভালোবাসি- কাছে ডাকি
তার মন অন্যতে- আমাতে নেই,
মুখ আর মুখোশ এক হয়ে গেছে।

মুখে কথার তুবড়ি ফোটে,
মনে হয় তার মতো আপনজন আর নেই পৃথিবীতে…
কিন্তু পারলে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেবে!
সবকিছুর কী প্রমাণ থাকে?
বিবেক আর বিশ্বাস বলে কী কিছু থাকতে নেই!

 

শরৎ এলো

নুশরাত রুমু

ষড়ঋতুর পালাবদল
এবার শরৎ এলো
সূর্যি মামা খুব সকালে
রোদের ঝিলিক দিলো।

কাশের বনে যাই হারিয়ে
সুনীল আকাশ হাসে
শিউলি ফুলে মন জাগিয়ে
শিশির ঘুমায় ঘাসে।

মেঘ ভেসে যায় দূর অজানায়
শিমুল তুলোর মত
ধানের ক্ষেতে ঢেউয়ের সাথে
ভাবনা আসে শত।

জোছনা রাতে স্নিগ্ধ সমীর
হিমেল পরশ ছাড়ে
পাকা তালের সুবাস পেয়ে
রসনায় মন কাড়ে।

সবুজ পাতার দেশ

কাব্য কবির

সবুজ পাতার দেশ
খাগড়াছড়ি, রাঙামাটির
রূপের নেই তো শেষ।

সবুজ পাতার ফাঁকে বসে
দোয়েল,শ্যামা ডাকে
পাখির ডাকে মুগ্ধ হয়ে
প্রজাপতি থাকে।

পাহাড়ের ঐ ঝর্ণাগুলো
দেখতে লাগে বেশ,
পাহাড়ের ঐ রমণীদের
দীঘল কালো কেশ।

পাহাড়ের ঐ রাস্তাগুলো
এঁকে বেঁকে চলে,
এসব দেখে উদাস মনে
মিষ্টি কথা বলে।

সবুজ পাতা মন মাতায়
দেয় অপরূপ হাসি,
সবুজ পাতার দেশটাকেই
আমি ভালোবাসি।

খোকা যাবে

মো. আরিফ হোসেন

খোকা যাবে নানার বাড়ি
রাত পোহাবে যখন
সবার মতো পরবে গায়ে
নতুন জামা তখন।

মায়ের হাতে হাতটা রেখে
চড়বে ঘোড়ার গাড়ি,
গল্প এবং শোলক বলে
পথটা দিবে পাড়ি।

নানার সাথে মিলেমিশে
খেলবে কত খেলা,
আনন্দ ও মিষ্টি কথায়
কাটবে শুধু বেলা।

অদম্য স্বত:স্ফূর্ত বীর

খালেদ উদ-দীন

একবার এক আড্ডায় কথা প্রসঙ্গে মহম্মদ আশরাফ আলীর (মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নিজে যুদ্ধও করেছেন, সাবেক সাংসদ) কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন বঙ্গবীর ওসমানী সাহেবকে ব্যতিক্রমী যুদ্ধনেতা বলা হয়ে থাকে? বা তাঁর যুদ্ধকৌশলে এমনকী ছিল যা আপনাদের চমকে দিয়েছিল? এই প্রশ্ন শুনে তাঁর চোখ চকচক করে ওঠে। এক অপার আহ­াদ এসে চেহারায় মূর্তিমান হয়। একটু চেয়ার টেনে সোজা হয়ে বসেন। তারপর জনাব আশরাফ আলী বলতে শুরু করেন এভাবে-‘একবার ভাবুন তো, একটা প্রশিক্ষিত বিশাল শক্তিধর সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার মতো কোনও শক্তি আমাদের ছিল? না ছিল তেমন কোনও অস্ত্র। নিয়মিত বাহিনীর অল্প কয়েকজন আর কিছু আবেগী তরুণ; যাদের কেবল মনোবল ছাড়া সঙ্গে আর কিছু ছিল না। একদম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া প্রথম দিন থেকেই আমাদের লড়াই শুরু করতে হয়েছে। সে অবস্থায় তীক্ষè বুদ্ধিস¤পূর্ণ ওসমানী সাহেব কৌশলী হলেন। তিনি যে কৌশলগুলো একে একে ব্যবহার করতে লাগলেন তার প্রত্যেকটিই ছিল চমকপ্রদ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল দক্ষ এবং সংখ্যায় অনেক বেশি। এই বিবেচনায় ওসমানীর রণকৌশল ছিল প্রথমে শত্র“কে নিজেদের ছাউনিতে আটকে রাখা এবং তাদের যোগাযোগের সব মাধ্যম হতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। যেমন, ছোটো ছোটো কালভার্ডগুলো এবং কোথাও স¤পূর্ণ ব্রিজ ভেঙে কৃত্রিমভাবে খরপাতা দিয়ে ব্রিজের আদলে আটকে রাখা হত। পাকিস্তানি বাহিনী এগুলো একদম আঁচ করতে পারতো না। ফলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে অনেকে হতাহত হত। পুনরায় এসব রাস্তা দিয়ে চলাচলের কোনও সাহস করত না। আবার নদী পারাপারের সাঁকোও মধ্যখানে এভাবে ভেঙে রাখা এবং অনেক নদীতে যেখানে সাঁতরানো ছাড়া কোনও উপায় থাকতো না, সেখানে সাঁতরানো পথে পানির নিচে ধারালো বাঁশ বা গাছের খুঁটি পুঁতে রাখা। এসব গুপ্তকৌশলে পাকিস্তানী বাহিনী হকচকিয়ে যেত। প্রথম প্রথম এই কৌশলগুলো খুব কাজে লেগেছিল। মে মাস পর্যন্ত এইসব পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মে মাসের পর তাঁর মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমসংখক সৈন্য নিয়ে শত্র“কে ছাউনিতে আটকে রাখা গেলেও ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এ বিষয়টি তিনি সরকারকে জানিয়ে যুদ্ধের কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। প্রাক্তন ইপিআর এর বাঙালি সদস্য, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ বাহিনী ও যুবকদের নিয়ে একটি গণবাহিনী বা গেরিলাবাহিনী গঠন করেন।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মহম্মদ আশরাফ আলীর কাছে আরও জানতে চেয়েছিলাম যে, আপনার স্মৃতিতে থাকা অসংখ্য ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে খুশির একটা ঘটনা বলুন? স্মৃতির ফ্রিজারে তাঁর উঁকি দেয় অসংখ্য বীরত্বগাথা। বলেন, ‘যুদ্ধদিনে তখন উত্তেজনাপূর্ণ অপারেশন চলছিল একের পর এক। একবার এক সম্মুখযুদ্ধে আমাদের তিন থেকে চারশ বাঙালি অফিসার শহিদ হন। আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। তখন জেনারেল ওসমানীর যুদ্ধকৌশল অনুসারে যোদ্ধারা কমলপুর পাহাড়ে পাঞ্জাবীদের ক্যা¤েপ আক্রমণ করে নিজেদের আত্মগোপন করে রাখে। কৌশলটি না-বোঝে এক ক্যা¤েপর পাঞ্জাবীরা অন্য ক্যা¤েপর পাঞ্জাবীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে অনেক পাঞ্জাবী হতাহত হয়। আজও ঘটনাটি যখন মনে পড়ে ওসমানী সাহেবের এই কৌশলের কথা মনে করে হাসি।’
মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। অদম্য স্বত:স্ফূর্ত এই বীর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯১৮ সালের ১ সেপটেম্বর। পৈতৃকবাড়ি সিলেট জেলার ওসমানীনগর থানার দয়ামিরে। বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান। মা জোবেদা খাতুন। তাঁর বাবা তৎকালীন আসামের সুনামগঞ্জ সদর মহকুমায় সাব-ডিভিশনাল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখানেই জন্ম হয় ওসমানীর। বাবার চাকুরি সূত্রে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। জন্মের কিছুদিন পর তাঁরা বদলি হয়ে চলে যান ভারতের গুয়াহাটিতে। আর সেখানেই শুরু হয় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। তিনি খুব মেধাবী ছিলেন। ১৯৩২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ ভারতীয় মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন কমিশন প্রাপ্ত অফিসার হিসেবে। ১৯৪১ সালে ক্যাপটেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। তৎকালীন তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর ছিলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সেই তিনি এক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হয়ে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে বার্মা রণাঙ্গনে তাঁকে এক ব্যাটালিয়ন সেনার নেতৃত্ব দিতে হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নেন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিহস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীর এই সাহসী বীর ১৯৬৭ সালে অবসরগ্রহণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৭০ সালে। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম বৃহত্তম নির্বাচনি এলাকা সিলেটের গোলাপগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ থেকে বিপুল ভোটে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা তখন ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। চলতে থাকে নানান আলোচনা। বাঙালিরা সহিষ্ণু হতে থাকে। মিছিল মিটিংয়ে উত্তপ্ত হতে থাকে বাংলার প্রান্তর। সামগ্রিক বিষয়াদির ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ করছিলেন ওসমানী। এক সাক্ষাৎকারে ওসমানী জানান, ‘যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তেলো’-বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণের অন্তরালে ছিল একটি সুচিন্তিত রণকৌশল। বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সৈনিকদের কাছে ছিল বিরাট তাৎপর্যময়। বস্তুত এই আহ্বানকে তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করেন।’ সাত মার্চের ভাষণের সময়ই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার কথা ঠিক করে ফেলেছিলেন মনে মনে। তিনি শুধু সুযোগ খুঁজছিলেন, এখানেও আমরা তাঁর সুক্ষ্ম রণকৌশল টের পাই। তিনি কাউকে মনের কথা জানতে দেননি। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণে ঠিক বলেছিলেন, ‘তোমোদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’
২৫ মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরে ওনমানী সে রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য। কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে ছুটে এসেছিলেন। কিছু আলাপ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তারপরই আবার দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনিই ছিলেন নেতৃত্বস্থানীয় সর্বশেষ ব্যক্তি, যিনি সবার পরে এ বাড়ি ছেড়েছিলেন। তারপর কোথায় কোথায় গা ঢাকা দিয়েছিলেন এই বীর সেনা, সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানতো না। পরে জানা যায়, ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাতেই ছিলেন ওসমানী। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বছর চারেক আগে অবসর নেওয়া ওসমানীর সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতা স¤পর্কে পাকিস্তান সরকার অবগত ছিল। তাই ওই রাতেই ওসমানীকে হত্যার চেষ্টায় হন্যে হয়ে খোঁজে। কিন্তু একেবারেই ভাগ্যগুণে অনেকটা অলৌকিভাবে প্রাণে বেঁচে যান ওসমানী। ঢাকা থেকে তিনি পালিয়েছিলেন ২৯ মার্চ। এর আগে চারদিন ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফাঁকা বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। খানসেনারা তাঁর খুঁজে ধানমন্ডির বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। ২৯ মার্চে নদীপথে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধরত ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যোগ দেন। শুরু হয় ওসমানীর জীবনের নতুন এক অধ্যায়।
১১ এপ্রিল ১৯৭১ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের উল্লেখ করে এম এ জি ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। ওইদিন গঠিত মুজিবনগর সরকারে ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি।
ওসমানীর নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এক একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয়সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি কাজ সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন ওসমানী। মুক্তিসংগ্রামে তাঁর হাতে কোনও নৌবাহিনী ছিল না। নিয়মিত নৌবাহিনীর কিছু অফিসার যারা তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন তাঁদেরকে নিয়ে এবং কিছু সংখ্যক গেরিলা যুবক নিয়ে একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করেন। আগষ্টের মাঝামাঝিতে তাঁরা নদীপথে শত্রুর চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেন। নৌবাহিনী গঠনের ফলে একটা বড়ো ধরনের সংকটের অবসান হলেও দেশ স্বাধীন হবার আগে আরও একটা সংকট ওসমানী অনুভব করেন। সেটা হচ্ছে তাঁর হাতে কোনও বিমানবাহিনী ছিল না। শেষের দিকে দুটি হেলিকপ্টার, একটি অটার ও একটি ডাকোটা নিয়ে ছোট্ট একটি বিমানবাহী গঠন করেছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নিজ দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগ করে তিনি মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করেন। তিনি দিক নির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণা দান করে গেরিলাযোদ্ধাদের এবং প্রয়োজনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণও করতেন। পাকবাহিনী পরাজিত হতে বাধ্য হয়। বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সূর্য দেখতে পায়। অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে।
জেনারেল ওসমানী অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল সফর করে জাতির বিজয়কে ত্বরান্বিত করায় জাতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে ‘বঙ্গবীর’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই আতœসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। কেন অনুপস্থিত ছিলেন এমন বিতর্কের জবাব তিনি দিয়েছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানী উপস্থিত না থাকার কারণ ছিল আর্মি প্রোটোকল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজী। এরা দুজনই ছিলেন আঞ্চলিক প্রধান। অন্যদিকে ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান। তাই সেনাবাহিনীর প্রটোকল রক্ষার্থে কোনও সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধানের সঙ্গে তিনি কোনও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন না।
স্বাধীন দেশে ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ওসমানীকে। তাঁর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন, সর্বস্তরের জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল তাঁকে চার তারকাযুক্ত জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে জেনারেল পদটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক বাহিনী থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশগঠনের কাজে নিজেকে জড়িয়ে নেন।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হন। তাঁকে মন্ত্রিসভায় ‘ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জীবনের সব অভিজ্ঞতা নিয়ে নেমে পড়লেন দেশ গঠনের কাজে। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি সংসদসদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আবার ১৯৭৫ সালেই যখন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন সে সময় ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডের পরেই পদত্যাগ করেন।
১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী ওসমানী শৈশব থেকেই রুটিন বাঁধা জীবনযাপন করতেন। তিনি আদর্শ দেশপ্রেম ও মূল্যবোধের ছিলেন এক অনন্য প্রতীক। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে তাঁর ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। জীবনে কারও সঙ্গে তিনি কখনও আপোশ করেননি। অতি সাধারণ জীবন, সাধারণ জামা-কাপড়, সাধারণ সৈনিকের খাবার, সেনাবাহিনী থেকে বরাদ্দকৃত আসবাবই ব্যবহার করে এসেছেন বার বার। তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে বেশ কয়েকবার পদত্যাগও করেন। যখন কোনও বিষয়ে তিনি মতের মিল খুঁজে পাননি, পদত্যাগ করেছেন। এমনি কঠোর আর দৃঢ় মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর জীবনে তেমন কোনও ব্যর্থতা নেই। যখন যে কাজে হাত দিয়েছেন, সফলতা ছিনিয়ে এনেছেন। কখনও কোনও পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হননি। এক সফল জীবনের অধিকারী ছিলেন এই অদম্য স্বত:স্ফূর্ত বীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী।

নির্বাচনে ইভিএম

স্থানীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন তথা ইভিএম পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে; ফল সন্তোষজনক। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহারের কথা কয়েকবার তুলেছে নির্বাচন কমিশন। ক্ষমতাসীন দল এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও অন্যান্য দলের, বিশেষ করে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি না হলে ইভিএম নয়, এ কথাই বলেছিল কমিশন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। এখন আবার তোড়জোড় শুরু করেছে কমিশন, যাতে ইভিএমের বিষয়টি নির্বাচনী আইনে (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আরপিও) অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আরপিও সংশোধনের উদ্দেশ্যেই বসেছিল নির্বাচন কমিশন।
ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন হতে পারে। সে বিষয়ক প্রস্তুতির মধ্যেই ইভিএম ব্যবহারের জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচনী আইনে সংশোধনী আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এ উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। তারা শুরু থেকেই ইভিএম-বিরোধী। ভোট চুরির জন্য ইভিএম ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দলটির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য এ দাবি করেছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার তাঁরা মানবেন না। আরপিও সংশোধনের চেষ্টা তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিপরীত অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। তারা বরাবর ইভিএমের পক্ষে। দলটির সাধারণ সম্পাদক এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
আগামী নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তো রয়েছেই, খোদ কমিশনেই মতভেদ রয়েছে। ইভিএম ব্যবহার নিয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছেন একজন নির্বাচন কমিশনার। আরপিও সংশোধন প্রস্তাববিষয়ক সভা শুরুর আধাঘণ্টার মাথায় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সভা ছেড়ে চলে যান। পরে কর্মচারীর মাধ্যমে তাঁর আপত্তিপত্র (নোট অব ডিসেন্ট) কমিশনে পাঠান। তাঁর অভিমত, স্থানীয় নির্বাচনে ধীরে ধীরে ইভিএম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটা ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধন সমর্থনযোগ্য নয়। রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং দক্ষ জনবলের অভাবের কথা তিনি আপত্তিপত্রে উল্লেখ করেছেন।
এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ২০১০ সালে ইভিএম চালু করেছিল স্থানীয় নির্বাচনে। তখন বলা হয়েছিল, ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়ানো হবে। এতে অর্থ ও সময়ের সাশ্রয় হবে। ফলও দ্রুত পাওয়া যাবে। ২০১৩ সালের পর এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান কমিশন নতুন করে উদ্যোগ নেয়। তবে জাতীয় পর্যায়ে ইভিএমের ব্যবহার এখনো হয়নি। প্রযুক্তির যুগে প্রযুক্তিকে দূরে ঠেলে রাখা বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। তবে এর সঙ্গে রাজনীতি জড়িত থাকলে আপত্তি-অনাপত্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে বৈকি। এ প্রযুক্তি নয়ছয় করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন ধারণা আমাদের মতো অনেক দেশেই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পক্ষ-বিপক্ষের অভিমত ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।