পুরাতন সংবাদ: July 6th, 2018

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের)
আইনের ৫নং ধারার ১নং উপধারায় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না করার দন্ড বর্ণনা করা হয়েছে। কোন সন্তান কর্তৃক ধারা ৩ এর যে কোন উপধারার বিধান কিংবা ৪নং বিধান লংঙ্ঘন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে বা উক্ত অর্থদন্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদন্ড ভোগের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের ৫নং-এর ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, কোন সন্তানের স্ত্রী বা ক্ষেত্র অনুযায়ী স্বামী কিংবা পুত্র কন্যা বা অন্য কোন নিকটাত্মীয়, পিতা-মাতা বা দাদাদাদী বা নানানানী ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করেন অথবা অসহযোগিতা করেন তিনিও অনুরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন বলে গণ্য হবে এবং উপধারা (১) এ উল্লিখিত দন্ডে দন্ডিত হবেন। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৫”।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন অনুযায়ী পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না দিলে অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকার অর্থদন্ড বা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শাস্তি প্রয়োগের দ্বারা অপরাধের জাগতিক প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে; কিন্তু তাতে পিতা-মাতার অসহায়ত্বের প্রতিবিধানের কোন ব্যবস্থা নেই।
ইসলামে পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে বড় পাপ ও কবীরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পিতা-মাতার অবাধ্যতার জন্য কোন শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। তবে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী শাস্তির বিধান প্রণয়ন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আলিমদের সমন্বয়ে গঠিত শরী‘আহ্ কাউন্সিল কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে তা প্রণয়নের পরামর্শ দিতে পারেন।
পিতা-মাতার অবাধ্য হলে তারা কষ্ট পাবেন। তাদের কষ্ট দেয়া হারাম। এজন্য তাদের বৈধ আদেশ যা শরী‘আহ্ পরিপন্থী নয় তা মান্য করা সন্তানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু তাদের আনুগত্য করতে গিয়ে যদি আল্লাহর অবাধ্যতার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তা পালন করা যাবে না।
আবু বকরা (রা.) বলেন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন: আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মকগুলো সম্পর্কে অবহিত করবো না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। উত্তরে সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন: আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ করা। তিনি হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন: এবং মিথ্যা বলা। তিনি এ কথাটি বারবার বলছিলেন। আমি মনে মনে বললাম, আহা! তিনি যদি ক্ষান্ত হতেন। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, হাদীস নং-৫৪৩৮”।
ইসালামে আনুগত্য প্রাপ্তির অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ আল্লাহর নির্দেশেরই আনুগত্য। তাই পিতা-মাতার অবাধ্যতা প্রকারান্তরে আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘনেরই নামান্তর। পিতা-মাতার বদদোয়া সন্তানের জন্য দুনিয়াতেই কার্যকর হয়ে যায়। আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেছেন: পিতা-মাতার আবাধ্যতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি দুনিয়াতে অন্যান্য পাপের চেয়ে দ্রুত অপরাধীর উপর কার্যকর হয়। পরকালের শাস্তি তো আছেই। ইমাম বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: উকুবাতি উক্কূকিল ওয়ালিদাইন, হাদীস নং-২৯, পৃ.৪৩”।
পিতা-মাতাকে কাঁদানোর অর্থ তাদের সাথে অন্যায় আচরণ করে তাদের মনে কষ্ট দিয়ে তাঁদের কাঁদানো। পবিত্র কুরআনে তাই তাঁদের সম্মুখে উহ্ শব্দটি উচ্চারণ করতে বারণ করা হয়েছে। তায়সালা (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি ইবনে উমার (রা.) কে বলতে শুনেছেন: পিতা-মাতাকে কাঁদানো তাদের অবাধ্যাচরণ ও কবীরা গুনাহ সমূহের শামিল। “ইমামা বুখারী, আলÑআদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: বুকা-ইল ওয়ালিদাইন, হাদীস নং-৩১, পৃ.৪৩”।
আইনের ৬নং ধারায় উল্লিখিত অপরাধকে আমলযোগ্য (ঈড়মহরুধনষব) জামিনযোগ্য (নধরষধহষব) এবং আপোষযোগ্য (ঈড়সঢ়ড়ঁহফধনষব) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইনের ৬নং ধারায় উক্ত অপরাধের আমলযোগ্যতা, জামিনযোগ্যতা ও আপোষযোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে। এ আইনের অধীন অপরাধ আমলযোগ্য (ঈড়হমহরুধনষব), জামিনযোগ্য (নধরষধনষব) ও আপোষযোগ্য (ঈড়সঢ়ড়ঁহফধনষব) হবে। এতে লক্ষণীয় যে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের বিষয়টি নমনীয়ভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আরো কিছুটা কঠোরতা আরোপ করা প্রয়োজন ছিল।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার কার্য পরিচালনার বিষয়ে ৭নং ধারার ১ উপধারায় বল হয়েছে ঈড়ফব ড়ভ ঈৎরসরহধষ চৎড়পবফঁৎব ১৮৯৮ (ধপঃ ড়ভ ১৮৯৮) এ যা কিছু থাকুক না কেন এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রাপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে। একই ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত কোন আদালত তা আমলে গ্রহণ করবে না। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৭”।
আইনের ৭নং ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছৈ, কোন আদালত এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমলে গ্রহণ করবেন না। অর্থাৎ আইনী প্রতিকারের জন্য লিখিত অভিযোগের শর্তারোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পিতা-মাতার প্রতি অসদাচরণের অধিকাংশ পিতা-মাতা তা নীরবে সহ্য করেন বা মনোঃকষ্ট নিয়ে জীবন অতিবিহিত করেন। লিখিত অভিযোগ দায়ের করে আইনী প্রতিকার পাওয়ার মানসিকতা অধিকাংশ পিতা-মাতার থাকে না। সেক্ষেত্রে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের যেসব কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাতৃ ও শিশুদের খোঁজ খবর নেন, তাদেরকে প্রতি তিন মাস অন্তর নিজস্ব এলাকার প্রধানদের অবস্থা সস্পর্কে প্রতিবেদন দেয়ার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তা হলে সরকারের কাছে অতি সহজেই প্রবীণদের সার্বিক অবস্থার একটা রির্পোট সংগৃহীত হবে এবং সে মতে পদক্ষেপ ও প্রতিকার বিধান করতে সুবিধা হবে। তা ছাড়া ইউনিয়ন, পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার ও কাউন্সিলরদের এই দায়িত্বে নিয়োজিত করা যেতে পারে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে পারে।
আলোচ্য আইনে বিষয়টি আপোষ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনের ৮নং ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন প্রাপ্ত অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রমত, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর কিংবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট আদালত প্রেরণ করতে পারবে। ৮নং ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে, উক্ত আইনের অধীন কোন অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ প্রদান করবেন এবং বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন এবং এরূপ নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে। “পিতাÑমাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৮”। ৯নং ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।
আইনের ৮নং ধারার ১নং উপধারায় উক্ত বিষয়ে অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রমত সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর অথবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করার কথা বলা হয়েছে। এখানে চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র বা কাউন্সিলর একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলেও ‘অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তি’র বিষয়টি স্পষ্ট নয়। গ্রামের মোড়ল বা মাতব্বরগণ অনেক সময় গ্রামের সালিশ পরিচালনা করে থাকেন; কিন্তু তাদের যোগ্যতা, জ্ঞান, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পাওয়া যায়। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে তাদেরকে দায়িত্ব প্রদান করলে তারা কতটুকু সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি করতে পারবেন তা নিশ্চত নয়। তা ছাড়া আইনের ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, কোন অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে তা নিষ্পত্তি করবেন, যা আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত বলে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে আদালতের সমপর্যায়ের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
ইসলামের বিধান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পর ‘উলিল আমর’- এর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং তাদের আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:- হে ঈমানদারগণ! তোমার আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর তাদের তারপর যদি তোমার কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পণ কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর ও পরিণতির দিক থেকে উত্তম। “আল-কুরআন, ৪:৫৯”।
উলিল-আমর’ আভিধানিক অর্থে সে সমস্ত লোককে বলা হয়, যাদের হাতে কোন বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত থাকে। সে কারণেই ইবনে আব্বাস রা. মুজাহিদ ও হাসান বসরী রহ. প্রমুখ মুফাসসিরগণ আলিম ও ফকীহ সম্প্রদায়কে ‘উলিলÑআমর’ সাব্যস্ত করেছেন। তাঁদের হাতেই দীনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত। মুফাসসিরীনের অপর একদল, যাদের মধ্যে আবু হুরায়রা (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে কিরামও রয়েছেন, তারা বলেছেন যে, ‘উলিল-আমর’- এর অর্থ হচ্ছে, সে সমস্ত লোক যাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত। এছাড়া তফসীরে ইবনে কাসীর এবং তফসীরে মাযহারীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ শব্দটির দ্বারা (আলিম ও শাসক) উভয় শ্রেণীকেই বোঝায়। কারণ, নির্দেশ দানের বিষয়টি তাঁদের উভয়ের সাথেই সম্পর্কিত। “মুফতী মুহাম্মদ শাফী, তাফসীর মা‘আরেফুল ক্বোরআন, পৃ.২৬০”।
মাতা-পিতার ভরণÑপোষণ আইন, ২০১৩ পর্র্যালোচনায় বলা যায়, সন্তান ও পিতা-মাতার সম্পর্ক খুবই আন্তরিক ও গভীর। ধর্মীয় দিক থেকে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও সদাচরণ- এর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছৈ। আইনী প্রতিকারের মাধ্যমে শ্রদ্ধাবোধ, মর্যাদা ও সদাচরণ আদায় করার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। মূলত পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক এমন নয় যে, পিতা-মাতা তার ভরণ-পোষণ ও সদাচরণ প্রাপ্তি মামলা বা অভিযোগ দাখিল করে তা সন্তানের নিকট থেকে আদায় করবেন। বিষয়টি যতটুকু না আইনী তার চেয়ে অনেক বেশি নৈতিক ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত। বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে এমন আইন ছিল না। বর্তমান সমাজের অবক্ষয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের স্থলনের ফলে এ জাতীয় বিষয়ে আইন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে আইনটি প্রণয়ন করা হয়। সমাজের সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষার অনুশীলন ও চর্চা, নৈতিকতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধসহ চরিত্র বিরাজমান থাকলে এ আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হতো না। তাই পিতা মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, তাদের প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব এবং ইহকালীন ও পরকালীন প্রতিদান ও শাস্তি এবং সার্বিক মূল্যায়ন সমাজের প্রত্যেক স্তরে বিকাশ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি আইনটিকে আরো গঠনমূলক ও কার্যকর করার মাধ্যমে পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব বোধ সৃষ্টি করা সম্ভব।
আল্লাহ তা’আলার ইবাদতের পরপরই পিতা মাতার প্রতি সদ্ব্যব্যহারের প্রতি পবিত্র কুরআনে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পিতা মাতার মাধ্যমেই মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে এ কারণে সন্তানের জীবনে পিতা মাতার অবদান অতুলনীয়। হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক আদায়ের পর বান্দার হকের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বান্দার হকের মধ্যে পিতা মাতার হক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পিতা মাতার মর্যাদা অনেক উঁচু, যা পবিত্র কুরআনের বর্ণনা থেকে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। কেননা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি পিতা মাতার অধিকারের বিষয়ে বলা হয়েছে এবং আল্লাহ তা’আলার কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পিতা মাতার মর্যাদা ও সদাচরণের বিষয়ে আলোচনা করা হলো:
পিতা মাতার প্রতি আচরণ ও ব্যবহারে বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা;য়ালা বলেন: তোমার রব ফয়সালা করে দিয়েছেন তোমরা তাঁর ইবাদত ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত কর না, পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার কর। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদেরকে “উহ” পর্যন্তও বল না এবং তাদেরকে ধমকের জবাব দিও না বরং তাদের সাথে সম্মান ও মর্যাদার সাথে কথা বল। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাক এবং দু’আ করতে থাকো এই বলে “ হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর,যেমন তারা (দয়া, মায়া, মমতা সহকারে) শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন। আল কুরআনুল কারীমের উপরোক্ত আয়াত দুটি থেকে এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
প্রথমত, আল্লাহ তা’আলার হক আদায়ের পর মানুষের উপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো পিতা মাতার প্রতি সদাচরণ করা। কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহর একত্বের পর সর্বপ্রথম নির্দেশই পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার এর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। (অসমাপ্ত)

কোটা সংস্কার

রাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবস্থায় পরিচয় ও অবস্থানের নিরিখে নাগরিকদের জন্য কোটার ব্যবস্থা রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্র-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সুযোগ নিশ্চিত করা। আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো যেখানে রয়েছে সেখানে কোটা কোথাও নাম ভিন্ন হতে পারে—ব্যবস্থা রয়েছে। অগ্রসর বা সংখ্যাগুরু কোনো পক্ষের জন্য কিঞ্চিৎ বঞ্চনামূলক হলেও সমাজের ও রাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য এ ব্যবস্থা কল্যাণজনক। এ কথাও মনে রাখা উচিত, কোটা পদ্ধতির অপপ্রয়োগও হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এর বহু নজির রয়েছে, রয়েছে অন্য দেশেও। তাই সময়ে সময়ে সংস্কার করে ব্যবস্থাটিকে সচল রাখা উচিত। কেননা সংস্কারহীনতা অচলায়তন সৃষ্টি করে। এতে নাগরিকের যত না লাভ তার চেয়ে অনেক বেশি লাভ স্বার্থান্বেষী মহলের।
স্বার্থান্বেষী মহলের লাভের কারবারের অনেক দৃষ্টান্ত এ দেশে রয়েছে। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার অপব্যবহার তারা করেছে। সামরিক শাসনামলে এবং বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা পাননি, এ নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। ভুয়া সনদ ব্যবহার করে প্রচুর অমুক্তিযোদ্ধাও এ সুবিধা নিয়েছেন বা তাঁদের দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা বা তাঁদের উত্তরাধিকারীরা এখনো যে খুব সুবিধা পাচ্ছেন তা নয়। আওয়ামী লীগ সরকার তাঁদের মর্যাদা রক্ষা ও ভাতাপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করেছে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। তবে এখনো এ কোটার সুবিধা অনৈতিকভাবে কেউ নিচ্ছেন না তা নয়। বেশ বড় পদের আমলারা পদোন্নতির জন্য, সরকারের কৃপা পাওয়ার জন্য ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করেছেন এ কথা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যান্য কোটার অপব্যবহারের চেষ্টাও করা হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে এবং কর্মসংস্থানের তাগিদে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়। এ নিয়ে অপ্রীতিকর অনেক ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্যে-স্লোগানে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিষয়টি বেশি উচ্চারিত হওয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেকের কাছে ভিন্ন বার্তা পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কারের ঘোষণা বেশ আগেই দিয়েছেন; ছাত্রদের আশ্বস্ত করেছেন কিন্তু আমলাতন্ত্র তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে সময়মতো পদক্ষেপ না নিয়ে। অবশেষে একটি কমিটি হয়েছে। তারা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক, সেটাই চাই।