বিভাগ: ইসলামের আলো

মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল (সা.) নানাভাবে মানুষকে কাজ করায় উৎসাহ দিয়েছেন। ভিক্ষাবৃত্তির প্রতি অনীহা তৈরির জন্য রাসূল (সা.) বলেছেন, নিচের হাতের চেয়ে উপরের হাত উত্তম। ‘‘ ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায় : আয-যাকাত, অনুচ্ছেদ : লা সদাকতা ইল্লা আন যহরি গিনা, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ১৩৬১। আল্লাহ তা’আলার হুকুম আর আল্লাহর রাসূলের এ নির্দেশনা মেনে ব্যক্তি যদি স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে অনিবার্যরূপে তাঁর ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। এভাবে উন্নয়ন ঘটবে মানবের। অদক্ষ-অক্ষম বোঝার পরিবর্তে ব্যক্তি উন্নত সম্পদে পরিণত হবে।
কর্তব্য পালন : ইসলাম সাধারণভাবে সকল মানুষকে কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সকলের জন্য অর্পিত কর্তব্য পালন আবশ্যিক করেছে এবং এ ক্ষেত্রে যে কোন অবহেলাকে আল্লাহ তাআলার নিকট জবাবদিহিতার বিষয় বলে সতর্ক করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব, ইমাম বা নেতা, যিনি জনগণের ওপর দায়িত্ববান-তিনি তার অধীনদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন। আর ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল- সে তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী দায়িত্বশীল তার স্বামীর পরিবারের সদস্যদের ও সন্তান-সন্ততির। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর দাস ব্যক্তি তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল এবং সে এই সম্পদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কাজেই সতর্ক হও! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে (পরকালে আল্লাহর নিকট) জিজ্ঞাসিত হবে। ‘‘ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায় : আল-আহকাম, অনুচ্ছেদ : কাওলুল্লাহি তাআলা আতীউল্লাহ ওয়া আতীউর রসূলা ওয়া উলিল আমরি মিনকুম, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৬৭১৭’’। ইসলাম একান্তভাবে মানুষকে এ শিক্ষা দিয়েছে, কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।
আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন, যারা সরল-সঠিক পথে পরিচালিত হবে নিশ্চয় তারা তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই সঠিক পথে পরিচালিত হবে। আর যারা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হবে তারা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হবে তাদের নিজেদের ধ্বংসের জন্যই। কেউ কারো কাজের দায় বহন করবে না। আর আমি রাসূল পাঠিয়ে সতর্ক করা ছাড়া কাউকে শাস্তি দেই না। ‘ আল-কুরআন, ১৭ : ১৫’। ইসলামের এ নীতি একান্তভাবে দায়িত্ব সচেতন করে এবং দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। এ নীতি মানুষকে এমনভাবে ভাবতে শেখায় যে, কেউ অন্য কারো কবরে যাবে না। কেউ অন্য কারো কাজের জবাবদিহিতা করবে না। সাধারণভাবে কেউ অন্য কারো কাজের সুফল বা দায় ভোগ করবে না। বরং প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের সুফল বা কুফল ভোগ করতে হবে। এ শিক্ষার ফলে মানুষ নিজেকে দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে গড়ে তোলে। এটি তার ব্যক্তি সত্তার উন্নতি বিধান করে।
যোগ্যতা অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধি : ইসলাম মানুষে মানুষে মানবিক কোন ব্যবধান বা বৈষম্য স্বীকার করেনি। মানবিক মর্যাদায় সাধারণভাবে সকলকে সমান মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদান করেছে। মানুষের উৎস ও বিস্তার সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টি নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন সে ব্যক্তি থেকে তার জোড়া, আর তাদের দুজন থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য পুরুষ ও নারী। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অন্যের নিকট কিছু চাও। আর তোমরা আত্মীয়দের (হক আদায় ও সম্পর্ক অটুট রাখার) ব্যাপারে সতর্ক হও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। ‘ আল-কুরআন, ০৪ : ১’
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। ‘ আল-কুরআন, ৪৯ : ১৩’। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে মানবজাতি! সাবধান! নিশ্চয় তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতাও একজন। সতর্ক হও! কোন আরবের উপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোন কালোর উপর সাদার কিংবা সাদার উপর কালোর তাকওয়া ব্যতীত কোন মর্যাদা নেই। ‘ ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ২৩৪৮৯; হাদীসটির সনদ সহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদিছিছ সহীহাহ, রিয়াদ: মাকতাবাতুল মা’আরিফ, হাদীস নং- ২৭০০’।
সাধারণভাবে সকল মানুষকে এভাবে সমান ঘোষণার পর কুরআন ও হাদীসে মানুষের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের জন্য বিশেষ যোগ্যতা অর্জনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন। ‘ আল-কুরআন, ৪৯ : ১৩’
পরকালীন সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠি : নিঃসন্দেহে মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের সবচেয়ে বড় প্রেরণা এর পরকাল বিষয়ক মূল্যবোধ ও নীতিমালা। দুনিয়াতে একজন লোক যদি আর্থিক বা শারীরিক কিংবা সামাজিক দিক থেকে গ্রহণীয় হয় অথবা কেউ যদি সকল দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হয় তাহলে দুনিয়ার বিচারে লোকটির জীবন সফল হয়েছে বা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। কিন্তু আখিরাতে ব্যক্তির সফলতা নির্ভর করে একান্তভাবে ব্যক্তির সঠিক বিশ্বাস, সৎকর্ম, সৎচিন্তা ও সৎ জীবনযাপনের উপর। এর অর্থ হল ব্যক্তি যদি সমাজের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য বা সমাজে সম্মানিত হওয়ার জন্য এমন কোন কাজ করে ইসলামের দৃষ্টিতে যা সম্মানজনক নয় তাহলে আখিরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না। আবার বাহ্যত অসম্মানজনক বা নিপীড়নমূলক প্রমাণ হলেও আখিরাতে হয়তো কাজটি অত্যন্ত সম্মানের হতে পারে। এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দুনিয়ায় লাভ-লোকসানের বিবেচনা ছাড়া একজন মানুষ আখিরাতে সফল হওয়ার জন্য ভেতরে-বাহিরে সৎ জীবন-যাপন করার চেষ্টা করে। কাউকে দেখানোর কারো মনো:তুষ্টির আকাক্সক্ষা সে একেবারেই পোষণ করে না। সে দুনিয়াকে ততটুকুই গুরুত্ব প্রদান করে যতটুকু গুরুত্ব প্রদানের নির্দেশ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন : তোমরা কি আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অত্যন্ত কম। ‘ আল-কুরআন, ০৯ : ৩৮’। অন্যত্র তিনি বলেন, আখিরাত তো নিশ্চয় শ্রেষ্ঠতম পর্যায় এবং মর্যাদায় মহত্তম। ‘আল-কুরআন, ১৭ : ২১’। দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার্থে আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর, তবে তোমার দুনিয়ার অংশ ভুলে যেয়ো না। ‘ আল-কুরআন, ২৮ : ৭৭’
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে কেবল সৎকাজ করতেই উদ্বুদ্ধ করে না; বরং কাজটি একান্তভাবে আল্লাহ তাআলার জন্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে সৎকাজ করা হলে তা পুরস্কারযোগ্য হয় না। তাও শাস্তিযোগ্য আমলে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : কিয়ামাতের দিন মানুষের মধ্যে প্রথম যার বিচার হবে সে হবে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময়ে কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে- আমি তোমার পথে যুদ্ধ করেছি; এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এ জন্যে যুদ্ধ করেছো যেনো তোমাকে বীরপুরুষ বলা হয়। আর তা তোমাকে বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুড় করে টেনে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
দ্বিতীয়ত যার বিচার হবে সে হবে একজন আলিম। সে নিজে শিক্ষা লাভ করেছে, অপরকে তা শিখিয়েছে এবং কুরআন পড়েছে। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময় কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে, দুনিয়াতে আমি শিক্ষা লাভ করেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত করছি। আল্লাহ বলবেন- তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এ জন্যে জ্ঞান অর্জন করেছিলে যেনো তোমাকে জ্ঞানী বলা হয়। কুরআন মাজীদ এ জন্যে তেলাওয়াত করেছি যেনো তোমাকে কারী বলা হয়। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুড় করে টেনে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
তৃতীয়ত যার বিচার হবে সে হবে একজন সম্পদশালী ব্যক্তি। আল্লাহ তাকে সচ্ছল করেছেন এবং বিপুল সম্পদ দিয়েছেন। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময়ে কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে, যে পথে খরচ করলে তুমি খুশি হও, সে জাতীয় সব পথেই তোমার সন্তুষ্টির জন্য আমি খরচ করেছি। আল্লাহ বলবেনÑ তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমিতো এগুলো এ জন্যে করেছো যেনো তোমাকে দানবীর বলা হয়। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুড় করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। ‘‘ ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, তাহকীক : মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী, অধ্যায় : আল-ইমারাহ, অনুচ্ছেদ : মান কাতালা লির-রিয়াই ওয়াস সুমআতি ইসতাহাক্কান নার, বৈরূত : দারুল ইহইয়াইত তুরাছিল আরাবিয়্যি, খ. ৩, হাদীস নং- ১৯০৫’’। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সংক্ষেপে কিন্তু স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করেছেন, কাজেই ধ্বংস সেই সকল সালাত আদায়কারীর জন্য, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য সালাত আদায় করে। ‘আল-কুরআন, ১০৭:৪-৬’। বস্তুত আখিরাতে সফলতা লাভই মুমিনের মূল লক্ষ্য। এ কারণে ইসলামে বিশ্বাসী একজন লোক দুনিয়ার সকল কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেন। যে কারণে তার মধ্যে লোক দেখানোর বিষয়টি একেবারেই থাকে না। ফলে মানসিক দিক থেকে তিনি পরম উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হন। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ বা প্রেম তাকে কোনক্রমেই মন্দ কাজে নিয়োজিত করতে পারে না।
নৈতিক উন্নয়ন : নৈতিক উন্নয়ন ছাড়া যে কোন উন্নয়নই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি প্রেরিত হয়েছি সুমহান নৈতিক গুণাবলীর পূর্ণতা সাধনের জন্য। ‘‘ ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৮৯৫২। মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিছ সহীহাহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৪৫’’। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন কাজ অধিকাংশ লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি উত্তরে বলেছেন, কিয়ামাতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি হবে তা হল ‘তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র। ‘‘ ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান, অধ্যায় : আল-বির ওয়াস সিলা, অনুচ্ছেদ : হুসনুল খুলুক, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-২০০৪। হাদীসটির সনদ হাসান ; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ ওয়া যঈফ সুনানুত তিরমিযী, হাদীস নং-২০০৪’’। রাসূলুল্লাহ স. আরও বলেছেন, কিয়ামতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি হবে তা হল উত্তম চরিত্র। ‘‘ ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায় : আল-আদাব, অনুচ্ছেদ : ফী হুসনিল খুলুক, বৈরূত : দারুল কিতাবিল আরাবিয়্যি, তা.বি., খ. ৪, পৃ. ৪০০; হাদীস নং- ৪৮০১। হাদীসটির সনদ সহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ ওয়া যঈফ আবি দাউদ, হাদীস নং- ৪৭৯৯’’।
নাওয়াস ইবনে সামআন আল-আনসারী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘সুন্দর ব্যবহারই পুণ্য। ‘‘ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায় : আল-বির ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাব, অনুচ্ছেদ : তাফসীরুল বিররি ওয়াল ইছমি, প্রাগুক্ত, খ. ৪, হাদীস নং- ২৫৫৩’’। তিনি সত্যিকার ও পূর্ণ মুমিন হিসেবে সে ব্যক্তিকেই অভিহিত করেছেন যার চরিত্র সুন্দর। তিনি বলেছেন, চরিত্রের বিচারে যে উত্তম মুমিনদের মধ্যে সেই পূর্ণ ঈমানের অধিকারী। ‘‘ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায় : আস-সুন্নাহ, অনুচ্ছেদ : আদ-দলীলু আলা যিয়াদাতিল ঈমানি ওয়া নুকসানিহী, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৩৫৪; হাদীস নং- ৪৬৮৪। হাদীসটির সনদ হাসানসহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ ওয়া যঈফ সুনানি আবি দাউদ, হাদীস নং-৪৬৮২’’।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে ছিলাম। এমন সময় জনৈক আনসারী ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সালাম করলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ মুমিনদের মধ্যে সর্বোত্তম কে? তিনি জবাব দিলেন, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো সেই ব্যক্তি যার চরিত্র সর্বোত্তম। ‘‘ইমাম ইবনু মাযাহ, আস-সুনান, অধ্যায় : আয-যুহদ, অনুচ্ছেদ : যিকরুল মাওতি ওয়াল ইসতিদাদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৪২৫৯। হাদীসটির সনদ সহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিছ সহীহাহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১৩৮৪’’। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা মুমিনের অসংখ্য নৈতিক গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন : নিশ্চয় মুমিনগণ সফল, যারা তাদের সালাতে ভীত ও বিনয়ী, যারা নিজেদেরকে অর্থহীন কাজ থেকে বিরত রাখে, যারা যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে কর্মতৎপর হয় এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গ হিফাযত করে। ‘‘আল-কুরআন, ২৩: ১-৫’। বস্তুত ইসলাম যে বিষয়গুলোকে চরিত্রের সুন্দর দিক এবং অবশ্য অর্জনীয় গুণ হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলোকে আত্মার গুণ হিসেবে আত্মস্থ করা, নৈতিক বৈশিষ্ট্যের পরিণত করা এবং জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা গেলে স্বভাবতই মানুষ সম্পদে পরিণত হবে। যে সম্পদ দুনিয়ায় ব্যক্তির নিজের এবং অপরাপর সকলের কল্যাণ ও মুক্তি নিশ্চিত করবে। প্রসঙ্গত নৈতিক উন্নয়নে ইসলামের কিছু নির্দেশনা উল্লেখ করা যায়। যেমন,
১. কুরআন অধ্যয়ন : কুরআন হচ্ছে মুমিনের গাইড লাইন, জীবন বিধান। এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা মানুষের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছেন। সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলার জন্য সবার আগে তাই কুরআন অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। কুরআন অধ্যয়ন বলতে শুধু দেখে তেলাওয়াত বুঝায় না। বরং কুরআন অধ্যয়ন হলো এর মমার্থ, তাৎপর্য, তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করে পড়া। শুধু দেখে দেখে কুরআন তিলাওয়াত করলে চরিত্রের উপর তার সর্বব্যাপক প্রভাব পড়বে না। তাই সুন্দর চরিত্র গড়ে তুলতে হলে বুঝে কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে। বুঝে কুরআন তেলাওয়াত না করে শুধু দেখে তেলাওয়াত করলে সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু তাতে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য হল, কুরআনকে চরিত্রে পরিণত করা। যেমন আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর ইন্তিকালের পর সাহাবীগণ যখন তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আয়িশা (রা.) বিনা দ্বিধায় বলে দিলেন। অর্থাৎ তোমরা যে কুরআন পড় সে কুরআনই তাঁর চরিত্র। ‘‘ইমাম বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, তাহকীক : মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী, অধ্যায়: হুসনুল খুলুক, অনুচ্ছেদ: মান দাআল্লাহ আন ইউসিনা খুলুকাহু, বৈরূত: দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যাহ, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৯ হি./১৯৮৯ খ্রি., পৃ. ১১৬, হাদীস নং- ৩০৮। মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী হাদীসটির সনদ যঈফ বললেও মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী হাদীসটির সনদকে সহীহ লি-গাইরিবহ বলেছেন; সহীহ আল-আদাবুল মুফরাদ লিল ইমাম আল-বুখারী, আল-জুবাইল, সৌদি আরব: দারুস সিদ্দীক, ১৪২১ হি., হাদীস নং- ২৩৪/৩০৮’’। একজন ব্যক্তি যদি দাবি আদায় করে আল-কুরআন তিলাওয়াত করেন, তাহলে কুরআনই তাকে পথ দেখিয়ে দেবে। আর কুরআন মাজীদের শিক্ষা ব্যক্তির আত্মিক-আচরণিক ও বৈষয়িক উন্নতিতে সন্দেহাতীতভাবে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে।
২. হাদীস অধ্যয়ন : আল-কুরআনের ব্যাখা হলো হাদীস। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা যে কোনো হুকুমের মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সে মূলনীতি বাস্তবায়নের পথনির্দেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সা. নিজে থেকে কোনো কথা বা তত্ত্ব হাদীসের মাধ্যমে পেশ করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন। আর তিনি (মুহাম্মাদ সা.) নিজে প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। তাঁর নিকট প্রেরিত ওহী ছাড়া এগুলো আর কিছু নয়। ‘আল-কুরআন, ৫৩ : ৩-৪’’।
অন্যত্র সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়েছেন। রাসূল তোমাদেরকে যা দেন (অর্থাৎ যা করতে নির্দেশ দেন) তা গ্রহণ করো আর যা থেকে তিনি বিরত থাকতে বলেন, তা থেকে বিরত থাকো। ‘‘আল-কুরআন, ৫৯ : ৭’’। তাই কুরআন মাজীদের বিধি ও অনুশাসন সঠিকভাবে মেনে চলার জন্য হাদীস অধ্যয়ন করতে হবে। হাদীস অধ্যয়নও ব্যক্তির সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
৩. সত্য বলা : সত্য কথা বলা সুন্দর চরিত্রের শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ। সত্যবাদী হওয়া ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না। ইসলাম সত্য, বাকী সবকিছু মিথ্যা। এখন কেউ যদি সত্যকে ধারণ করে সে ধারণ করবে ইসলামকে। আর কেউ যদি মিথ্যা বলার অভ্যাস করে, সে অবশ্যই ইসলাম বর্জনকারী হবে। সত্য মানুষকে সততার পথে পরিচালিত করে, আর মিথ্যা পাপের পথে পরিচালিত করে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- নিশ্চয়ই সত্য মানুষকে সততার পথ দেখায়, আর সততা জান্নাতের পথ দেখায় এমনকি কোন ব্যক্তি সত্য বলতে বলতে আল্লাহর নিকট সিদ্দীক বা পরম সত্যবাদী হিসাবে লিখিত হয়, আর মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের পথ দেখায়, আর পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়, এমনকি কোন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে বলতে আল্লাহর নিকট কাযযাব বা চরম মিথ্যাবাদী হিসাবে লিখিত হয়। ‘‘ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায় : আল-আদাব, অনুচ্ছেদ: কাওলুল্লাহি তাআলা ইয়া আইয়ূহাল্লায়িনা আমানুত্তাকুল্লাহি ওয়া কুনু মাআস সহিকীন, ওয়ামা ইউনা আনিল কিযব, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৫৭৪৩’’। সত্যবাদীগণ আল্লাহ তাআলার পরম সন্তোষ ও সাফল্য লাভ করে থাকেন। যেমন, আল্লাহ বলেন, এটা তো সেদিন, যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যবাদিতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাত যার নিচ দিয়ে ঝর্ণাসমূহ বয়ে যায়, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটাই তো মহাসাফল্য। ‘আল-কুরআন, ০৫ : ১১৯’। সত্য বলার অভ্যাস মানুষের ব্যক্তিত্বকে এমন উন্নত করবে যে, সে সকলের বিশ্বাসভাজন হবে।
৪. সবর : সবর বা ধৈর্য ধারণ করা সুন্দর চরিত্রের একটি অনিবার্য দিক। ধৈর্যধারণ ছাড়া সুন্দর চরিত্র সার্থক ও অর্থবহ হয় না। সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হতে হলে তাই ধৈর্যের অনুশীলন করতে হবে। কুরআন মাজীদে এসেছে, আল্লাহ তা’আলা ভালোবাসেন ধৈর্যশীলদের। ‘আল-কুরআন, ০৩ : ১৪৬’। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন ধৈর্যশীলদের সাথে। ‘আল-কুরআন, ০২ : ১৫৩’।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সবর বা ধৈর্যের বিনিময় হলো জান্নাত। ‘‘ইমাম বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ : ফাযায়িল শাহরি রমাযান, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৩৬০৮। হাদীসটির সনদ মুনকার মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিয যঈফা ওয়াল মাওযূআহ… প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৮৭১’’। তিনি আরো বলেছেন, সবর বা ধৈর্য ঈমানের অর্ধাংশ। ‘‘ ইমাম বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ : ফিস সবরি আলাল মাসায়িব.. প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৯৭১৬। হাদীসটির সনদ মুনকার মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিয যঈফা… প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৪৯৯’’। ধৈর্যশীল মানুষ নিঃসন্দেহে অনন্য গুণের অধিকারী। মানবকে সম্পদে পরিণত করার অন্যতম মৌলিক এ গুণটি অর্ঝন করা ইসলাম মুমিনের জন্য আবশ্যিক করেছে।
৫. কৃতজ্ঞতা : আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নিআমাত দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার এ নিআমতসমূহের বিনিময়ে তাঁর আদেশ পালন করা হলো কৃতজ্ঞতা জানানো। আল্লাহ তাআলার আদেশ মেনে চললে মানুষ কোনো খারাপ কাজ করতে পারবে না। ফলে তার চরিত্র সুন্দর হবে। আল্লাহ তাঁর নিআমত আরো অধিক হারে শোকরকারীকে দান করবেন। যেমন তিনি বলেছেন, যদি তোমরা শোকর করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের নিআমত বাড়িয়ে দেববো। ‘ আল-কুরআন, ১৪ : ৭’। যারা আল্লাহ তাআলার নিআমতের শোকর করে তাদের পক্ষেই অন্যান্যদের উপকার স্বীকার করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব। কৃতজ্ঞ মানুষকে আল্লাহ তাআলা যেমন ভালোবাসেন তেমনি মানুষও কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য আরও কিছু করার আগ্রহ পোষণ করে থাকেন। ইসলামের শিক্ষা মানুষকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন অভ্যস্ত করে তোলে। এতে ব্যক্তি সর্বজনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠে।
৬. আমানত সুরক্ষা : মানুষের নৈতিক উন্নয়ন অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ আমানতদারিতা। আমানতদারিতা এক মহান নৈতিক গুণ। এ গুণ মানুষের কাছে মানুষকে বিশ্বাসভাজন ও ভালোবাসার পাত্র করে তোলে। মানুষ অবলীলায় তার কথা শোনে। তার কাছে তাদের সম্পদ এমনকি সম্মান পর্যন্ত আমানত রাখতে দ্বিধাবোধ করে না। ঈমান ও আমানতদারিতা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই। ‘‘ইমাম বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ : ফিল ঈফা-ই বিল উকূদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৪৩৫৪; হাদীসটির সনদ সহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৩০০৪’’। আল্লাহ তাআলা আমানত সুরক্ষাকে ফরয করেছেন। কুরআন মাজীদে এসেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে। ‘আল-কুরআন, ০৪ : ৫৮’। মানবসম্পদ উন্নয়নে গৃহীত বিপুল কর্মসূচি, বিস্তারিত কর্মশালা দিয়ে ব্যক্তির ভেতর আমানতদারিতা তৈরির নিরন্তর চেষ্টা পরিচালনা করতে দেখা যায়। অথচ ঈমান ও ইসলামের শিক্ষা ব্যক্তিকে আখিরাতে জবাবদিহিতার চেতনায় স্বভাবতই আমানতদার করে তোলে।
৭. ওয়াদা পালন : ওয়াদা এক ধরনের আমানত। কাউকে কথা দিলে তা রাখতে হয়। ওয়াদা করলে তা পালন করতে হয়। আল্লাহ তাআলা ওয়াদালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না। তিনি ওয়াদা পালনের আদেশ দিয়ে বলেন, মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো। ‘আল-কুরআন, ০৫ : ০১’। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে ওয়াদা রক্ষা করেছেন। তাঁর সাহাবীগণ এ ব্যাপারে তাঁকে পুরোপুুরি অনুসরণ করেছেন। ওয়াদা পালন প্রতিশ্র“তি রক্ষা মানবিক উন্নয়নের অন্যতম দৃষ্টান্ত। ঈমান আনার সাথে সাথে ব্যক্তি প্রতিশ্র“তি পালনেও প্রত্যয় গ্রহণ করে।
৮. হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকা : সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হওয়ার প্রধান উপায় হলো হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করা। হিংসা, অহঙ্কার, ঘৃণা, নিজেকে বড় এবং অন্যকে নীচ মনে করার হীনমানসিকতা সুন্দর চরিত্রের সম্পূর্ণ বিরোধী বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) হিংসা-অহঙ্কারকে পুণ্য ধ্বংসের কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা আগুন যেমন কাঠ ভস্মীভূত করে, হিংসা-বিদ্বেষও তেমনি সৎ আমল নষ্ট করে। ‘‘ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায়: আল-আদাব, অনুচ্ছেদ : আল-হাসাদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৪৯০৫। হাদীসটির সনদ যঈফ; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিয যঈফা….. প্রাগুক্ত, হাদীস নং-১৯০২’’। হিংসা-বিদ্বেষ মানবিক গুণ বিরোধী। এটি মানুষকে দাম্ভিক করে। এমন ব্যক্তি কোন কাজে সফল হতে পারে না। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাই হিংসা-বিদ্বেষ থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত করার কথা বলা হয়ে থাকে। ঈমান এমন একটি অনন্য প্রশিক্ষণ, যা মানুষকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে রেখে সকলের নিকট প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় করে তোলে।
৯. ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা : মানবসম্পদ ধ্বংসের ক্ষেত্রে ধূমপান ও মাদকাসক্তির কুপ্রভাব অত্যন্ত কার্যকর। ইসলাম তাই ধূমপান ও মাদকাসক্তি ত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছে। ধূমপানে অর্থ-সম্পদের অপচয় হয়, ব্যক্তির নিজের ও অন্যের ক্ষতি হয়। আল্লাহ তাআলা এসবই হারাম ঘোষণা করে বলেছেন: আর কোনোক্রমেই অপচয় করবে না। ‘ আল-কুরআন, ১৭ : ২৬’। নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। ‘ আল-কুরআন, ০২ : ১৯৫’।
অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা মাদক সেবনকে সরাসরি হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর অবশ্যই শয়তানের অপবিত্র ও ঘৃণ্য কাজের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই তোমরা তা বর্জন করো, তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে। ‘ আল-কুরআন, ০৫ : ৯০’। বিভিন্ন সংস্থা এবং দেশ এমনকি আন্তর্জাতিক নানা সংঘ ধূমপান ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও তেমন কোন সুফল অর্জন করতে পারেনি। ফলে এর ক্ষতি থেকে মানবজাতিকে সঠিকভাবে রক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অথচ ইসলামের ঘোষণা ও শিক্ষা এক্ষেত্রে মুমিনকে ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে প্রকৃতার্থেই দূরে রাখতে সক্ষম।
১০. কথা ও কাজে মিল রাখা : কথায়-কাজে মিল রাখা সুন্দর চরিত্র অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা কথা-কাজের অমিলকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা করো না? আল্লাহর নিকট এটা অত্যন্ত অপ্রিয় যে, তোমরা যা বলো তা করো না। ‘ আল-কুরআন, ০৬ : ২-৩’। মানবসম্পদের প্রকৃত উন্নয়ন সাধনের জন্য কথা ও কাজের মিল থাকা আবশ্যক। কারণ কথা ও কাজের বৈপরীত্ব থাকলে মানুষকে প্রকৃত মানুষ বলা চলে না। এমন মানুষকে কেউ ভালোবাসে না। বিশ্বাসও করে না। কথা ও কাজের মিল প্রতিষ্ঠাকে ঈমানে অনিবার্য শর্ত করে দিয়ে ইসলামে মানবসম্পদ উন্নয়নের ঈমানী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
উপসংহার : বস্তুত মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন, মানবিক ও নৈতিক গুণে বিভূষিত হওয়া, মানুষকে আত্মিক ও বাহ্যিক দিক থেকে সত্যিকার গুণ ও আচরণে সমৃদ্ধ সম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত সকল চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সে কারণে তথাকথিত সভ্য সমাজে, অফিসে, দেশে, পরিবারে মানুষের কাছে মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মানুষই মানুষের সম্পদ, সম্মান ও জীবনের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। মানুষের আচরণ স্বার্থপরতা, হীনতা ও পাশবিকতায় ভরে ওঠেছে। এ অবস্থা নির্মূল করে মানুষকে সত্যিকারার্থে সম্পদে পরিণত করার জন্য ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার অনুশীলন অনিবার্যÑআলোচ্য নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য, প্রমাণ ও বিশ্লেষণ এ বিষয়টির অবিসংবাদিত প্রমাণ। এ কারণে মানবসম্পদের চিরস্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুশীলন অনিবার্য।
লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিষ্ট ও সাহিত্যিক। (সমাপ্ত)

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি”

21-February-Ekushey-Wallpaper-rootsbd.com-13গোলজার আহমদ হেলাল

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারী, আমি কি ভূলিতে পারি”-প্রতি বছর আমাদের মাঝে একুশ বারে বারে ঘুরে আসে। একুশ আমাদের মনের চেতনা, হৃদয়ের উপলব্দি ও জাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম চি‎হ্ন। মায়ের ভাষা মুখের ভাষার জন্য সংগ্রাম আমাদেরকে সব সময় উদ্দিপ্ত করে। একুশ না আট ফালগুন এ বিতর্কে না জড়িয়ে জাতির জাতীয় সমৃদ্ধ এ চেতনাকে আমরা লালন করি এবং এর আলোকে বিকশিত করি নতুন প্রজন্মকে।
মহান একুশে ফেব্র“য়ারী বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় (জবফ-ষবঃঃবৎ-ফধু)দিন। ১৯৫২ সালের এদিনে আমাদের মাতৃভাষার অস্তিত্বকে ঠিকিয়ে রাখার জন্য রমনার রক্তিম কৃষ্ণচূড়া আর লক্ষ লক্ষ পলাশকে সাক্ষী রেখে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে বাংলা মায়ের দামাল ছেলরা ঢাকার পিচঢালা কালো রাজপথকে রক্তে রঞ্জিত করেছিল। শুধু মায়ের ভাষার জন্য সংগ্রাম হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম ঘটনা বিরল। আমাদের স্বাধীনতার রক্তিম সকালে পৌঁছাতে যে চেতনা সবচেয়ে বেশী কাজ করেছে তা হলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনা।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করেছিল। তখন আমাদের বাংলাদেশ পরিচিত ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে। শুরু থেকেই পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠি পূর্বাঞ্চলের প্রতি বৈষম্যের  সৃষ্টি করে। তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যে প্রতিয়মান হয় যে পূর্বাঞ্চল পশ্চিমাদের জন্য একটি মাথাব্যথা। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলেন প্রথম গভর্নর জেনারেল। তিনি ১৯৪৮সালের মার্চ মাসে একবার ঢাকা সফরে এলেন। ২১ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক বিরাট জনসভায় তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে মর্যাদা দেওয়ার ইংগিত দিলেন। এক দু’দিন পর ২৪মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা করলেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এ ঘোষণা শোনার পরই এদেশের তরুণ ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিবাদ জানাতে শুরু করলো। মূলত ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সূচনা এখান থেকেই।
ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ১৯০১ সালের রংপুরের প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, ১৯১৮ সালে বিশ্ব ভারতী সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে মাওলানা আকরাম খাঁ, ১৯৪৫সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাকে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানানো হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনে নিবেদিত ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১ অক্টোবর তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক মনোনীত হন অধ্যাপক এ এস এম নুরুল হক ভূঁইয়া। ১৯৪৮ সালে গণ পরিষদে লিয়াকত আলী (প্রধানমন্ত্রী) ও খাজা নাজিমুদ্দিন (মুখ্য মন্ত্রী) এর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১ সালে দেশব্যাপী হরতাল, ধর্মঘট ও প্রচন্ড প্রতিবাদের ঝড় উঠে। সর্বাত্মক বিক্ষোভ আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ডাকসুর তৎকালীন জিএস গোলাম আযম সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের ঢাকার পল্টনের জনসভায় ঘোষনা করে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এর প্রতিবাদে ঢাকায় ৪ঠা ফেব্র“য়ারী পালিত হয় ছাত্র ধর্মঘট। এ জন্য ১১ই ফেব্র“য়ারী প্রস্তুতি দিবস এবং ২১শে ফেব্র“য়ারী দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হলো। এই সিদ্ধান্ত বানচালের উদ্দেশ্যে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ২০শে ফেব্র“য়ারী বিকেলে টানা ৩০দিনের ১৪৪ধারা জারি করে। ২১শে ফেব্র“য়ারী সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে আমতলায় এক বিরাট ছাত্র সমাবেশে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমীন। ২১শে ফেব্র“য়ারী মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা ১৪৪ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করল। বিকাল ৩.৩০টার সময় আকস্মাৎ পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে মিছিলের উপর গুলি চালাল। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার আরও নাম না জানা অনেকে। পরে তাদের লাশ নিয়ে শোভাযাত্রা বের হলে তাতেও গুলি চলে। সেখানে শহীদ হন শফিউর রহমান। এ হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মিছিলে গুলি বর্ষন ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২শে ফেব্র“য়ারী সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। এমতাবস্থায় পশ্চিমা শাষকগোষ্ঠী আন্দোলনকে আর কোনভাবেই বন্ধ করতে পারলেন না। দাবী মেনে নিতে হলো-বাংলার আপামর ছাত্রজনতার। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করলো। পুলিশের গুলিতে যে স্থানে ভাষা সৈনিকেরা শহীদ হয়েছিলেন সেখানে গড়ে উঠলো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এই মিনারটি উদ্বোধন করেছিলেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক শাখা ‘ইউনেস্কো’ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত প্যারিস বৈঠকে অমর শহীদ দিবস একুশে ফেব্র“য়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের একটি বিশিষ্ট অর্জন আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃতি লাভ করলো এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের উজ্জল অধ্যায়টি বিশ্ব ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হলো। ফলে ২০০০সাল থেকে বিশ্বের ১৮৮টি রাষ্ট্রে মাতৃভাষার দাবিতে সংগ্রামকৃত পূর্ব বাংলার দামাল ছেলেদের কথা উচ্চারিত হচ্ছে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে সেই সব তরুণদের অবদানের কথা।
ঢাকার শহীদ মিনার এখন শুধু ঢাকার নয়, এই শহীদ মিনার এখন সারা বিশ্বের হয়ে উঠেছে নতুন নতুন সংগ্রামের পবিত্র স্মারক, বিজয়ের প্রতীক, অনুপ্রেরণার উৎস। মাতৃভাষা দিবসটি এখন শুধু বিশ্বের ২৫ কোটি বাংলা ভাষীর অমূল্য সম্পদ নয়, প্রায় ৬০০কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক, সংগ্রামী চেতনার স্মারক।
একুশে ফেব্র“য়ারী পূর্ব বাংলায় যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এখনো যে সব জনপদে মাতৃভাষার দাবীতে সংখ্যাহীন তরুণ-তরুনীরা সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন-বিশেষ করে বিশ্বায়নের এই কালে ২১শে ফেব্র“য়ারী তাদেরকে কোন অন্যায়ের নিকট মাথা না নোয়ানোর প্রত্যয়রূপে জাগ্রত রাখবে। একুশের ইতিহাস মূলত সাধারণ ছাত্রজনতার ইতিহাস। দেশের চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবীরা তাদের যুক্তিবাদী সৃজনশীল লেখনী দ্বারা সমাজ জীবনে এর ক্ষেত্র রচনা করেন। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে ‘২১শে ফেব্র“য়ারী কোনো বিশেষ দিন, ক্ষণ বা তিথি নয়, একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস। এ ইতিহাস অগ্নিগর্ভ। যে সজীব ‘লাভা ¯্রাবক আগ্নেয়গিরি’ কখনও অন্তর্দাহে গর্জন করছে, আবার কখনো চারিদিকে অগ্নি ছড়াচ্ছে। সত্যিই এ ইতিহাস মৃত নয়, একেবারে জীবন্ত।’ ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু মাতৃভাষাকে ঠিকিয়ে রাখার আন্দোলনই ছিল না; তা ছিল আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র নস্যাতের এক আপোষহীন সংগ্রাম। সত্যিকার অর্থে বাঙালির জাতীয়তাবোধ এবং স্বাধিকার চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকেই। সেই ভাষা আন্দোলনে বিজয়ী বাঙালি জাতি রক্তক্ষয়ী বহু আন্দোলনের ধাপ পেরিয়ে ১৯৭১ সালে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে পেরেছে।
আজ স্বাধীনতার চুয়াল্লিশটি বসন্ত অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বাঙালি জাতির স্বাধিকার ও নিজস্ব স্বকীয়তা-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভীনদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসী থাবার কবলে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মেধা ও চরিত্রকে নষ্ট করার অসম্ভব পাঁয়তারা চলছে। তবে আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও স্বকীয়তার ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম কোমলমতি শিশু কিশোরদের মেধাও প্রতিভার বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। যা আজ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। দেশের তরুণ বুদ্ধিজীবী, খ্যাতিমান সাংবাদিক, কলামিস্ট ও লেখকরা সর্বোপরি দলমত নির্বিশেষে সকল মহল এগিয়ে আসলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সুন্দর, সাবলীল দেশ গঠন করা সম্ভব। পাশাপাশি আমাদের গণমাধ্যম সংস্কৃতি যেন ভীনদেশীদের কবলে লীন না হয়। আর এটাই হোক আমাদের এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

ইন্টারনেটে মাতৃভাষার ব্যবহার ও আমরা

99037192.vtPoS0QI.DhakaJan08029আতিকুর রহমান নগরী

আমি বাঙালি, কারণ আমার বাপ-দাদারা ছিলেন বাঙালি। এ হিসেবে বলতে বাঙালি হওয়ার সৌভাগ্যটা আমি মৌরসি সূত্রে পেয়েছি। জন্মের পর থেকে আমরা আমাদের মায়ের মুখে যে ভাষা শুনে আসছি, সেটাই আমাদের মাতৃভাষা। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমরা নিজের মায়ের মতো করেই মাতৃভাষাকে অনেক ভালবাসি, অনেক শ্রদ্ধা ও ভক্তি করি। মাতৃভাষার জন্য একমাত্র বাংলা মায়ের সাহসি ছেলেরাই লড়াই করেছেন, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাঙ্গালিসমাজে বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে বলতে গেলে বাঙ্গালি মুসলমানের আত্ম-অম্বেষায় যে ভাষা চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তার সূত্র ধরেই বিভাগোত্তর পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকাতে ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে এ নিয়ে আন্দোলন হয় কচ্ছপ গতিতে এবং ১৯৫২ সনের একুশে ফেব্র“য়ারিতে তা বিরাট আকার ধারণ করে (৮-ই ফাল্গুন, ১৩৫৯)। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাতৃভাষাকে বিশেষভাবে সম্মান জানানোর জন্য একটি দিবস রয়েছে। বাঙালির সে দিনটি হলো ২১ ফেব্র“য়ারি আর সে কাক্সিক্ষত ভাষা হলো বাংলা। ভাষা আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে আমরা ভাষাসৈনিক বলি। ভাষা শহীদদের নিয়ে আমাদের একটি গান আছে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্র“য়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?”। জনসংখ্যার দিক দিয়ে আমাদের বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম ও বৃহত্তম ভাষা । ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বর্তমানে বাংলাদেশ-পঁশ্চিমবঙ্গসহ প্রায় ২৫ কোটিরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। বাঙালির মাতৃভাষার এই আত্মত্যাগের ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৯৯৯ সনের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ ২১ শে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই প্রস্তাবের ভিত্তিকেই প্যারিসে ১৯৯৯ সনের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে ভাষার জন্য এই বিরাট আত্মত্যাগের ঘটনাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এরপর থেকেই বিশ্বের ১৮৮টি দেশ ২১শে ফেব্র“য়ারিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। আজও আমাদের এই অর্জন বিশেষ সম্মানের সাথে পালিত হয়ে আসছে।
সময়ের পরিবর্তনে সবকিছুতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে। খাতা-ডায়েরি’র পরিবর্তে ট্যাব-নোটবুক, প্যাড হাতে আসতে শুরু করেছে তাই কাগজ-কলমের ব্যবহার অনেকাংশে কমতে লেগেছে। কোনো কিছুর প্রয়োজন দেখা দিলে সবজান্তা গুগলে সার্চ করে বের করে জরুরত মেটাই। এক কথায় তথ্য-প্রযুক্তির উপর ভর করে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।  মূলত একটি সমন্বিত প্রযুক্তি যা আমাদের যোগাযোগ, মোবাইল, অডিও ভিডিও, কম্পিউটিং সম্প্রচার সহ আরো বহুবিদ কাজের সমষ্টি। তথ্য প্রযুক্তির সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার দিনদিন বাড়ছে। দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে যে অগ্রগতি হয়েছে এর সুফল আর্থসামাজিক খাতে বিলিয়ে দিতে হবে। তথ্য ও প্রযুক্তির ছোঁয়া পৃথিবীর সকল দেশেই বিদ্যমান; বাংলাদেশও এ থেকে পিছিয়ে নেই দিনদিন তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েই যাচ্ছে। সরকার দেশে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ২০১০ সালের ৩০ জুন তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা অন্তর্ভূক্ত করতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশনাল সদস্যপদ লাভ করে আমাদের দেশ।
বাংলাদেশ একটি ছোট্ট এবং জনবহুল দেশ। এদেশে অধিকাংশ লোক অল্পশিক্ষিত হওয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ফলাফল বা অবদান সম্পর্কে খুব একটা অবগত নন তারা। মূলত তথ্য ও প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় যেগুলো প্রায়ই ইংরেজী দিয়ে লেখা থাকে। তাই বাংলাদেশের মতো সাধারণ মানুষদের বুঝতে সমস্যা হয়। তাই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার ও সাধারণ জনগণকে তথ্য প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করাতে হলে অবশ্যই একে সাধারণ মানুষের কাজে সহযবোধ্য করতে হবে। সে লক্ষে এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ মাতৃভাষার অন্তর্ভূক্তি দরকার।
অপরদিকে তথ্য ও প্রযুক্তির অবদান ইংরেজীর পাশাপাশি এখন বাংলাতেই সম্ভব হচ্ছে। কম্পিউটারে বাংলা ভাষা নানাভাবে লেখা যায়। কেউ বিজয়, কেউ অভ্রু, আবার কেউবা অন্য কোন কি-বোর্ড লে-আউট ব্যবহার করে বাংলা লিখছেন। অনলাইনে বাংলা ভাষাতে ই-বুক ও পত্র-পত্রিকা প্রকাশ, গবেষণা, ওয়েবসাইট নির্মাণ, তথ্য ও ছবি অনুসন্ধান, ই-মেইল আদান-প্রদান, ব্লগিং ইত্যাদি করা যাচ্ছে। মোবাইলফোনগুলোতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা যুক্ত করায় অল্পশিক্ষিত, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুরসহ সবাই মাতৃভাষা বুঝতে ও চাইলেই সহজে ব্যবহার করতে পারছেন। ফলে উন্নত দেশগুলোর ন্যায় বাংলাদেশের সাধারণ জনগণও এখন সহজেই কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি ব্যবহার করছেন এবং উন্নত দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টাও করছেন। এইতো কিছুদিন আগে বাংলাদেশের বাজারে আসে ঋরৎবভড়ী ঙঝ। সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে যা সম্পূর্ণ বাংলায় এমনভাবে লোকালাইজ করেছে যা পৃথিবীর সব ভাষাকেই মাতৃভাষায় উপস্থাপন করে যার দরুণ বিশ্ব এখন বাঙ্গালির হাতের মুঠোয় চলে এসছে। আর তাদের লক্ষ্য যেহেতু সাধারণ মানুষ, গ্রাম অঞ্চলের গায়ের ঘাম পায়ে ফেলে খেটে খাওয়া মানুষ। কারণ গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, অল্পশিক্ষিত মানুষেরা আমাদের মাতৃভাষাকেই সহজে বুঝতে পারে। আর তাই ঋরৎবভড়ী ঙঝ -এর সর্বত্ব শুদ্ধ বাংলাদেশি মাতৃভাষা বাংলা পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন বেশ কিছু নিবেদিত মজিলিয়ান বাহিনী। আর তাদের পরিশ্রমের জন্য-ই ঋরৎবভড়ী ঙঝ ফোন বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ডিভাইসটিতে পাওয়া যাচ্ছে বিল্ট-ইন বাংলা কিবোর্ড ও পরিপূর্ণ শুদ্ধ বাংলা ভাষা।
ইন্টারনেটে আমার ভাষা : পৃথিবীর কোন ভাষা টিকে থাকবে− গুটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে এ প্রশ্নের উত্তরটা ছিল সহজ। বলা হতো, সেসব ভাষাই টিকে থাকবে, যেগুলোর লিখিত রূপ আছে। যে ভাষাগুলো কেবল ‘কথাবার্তায়’ চলে, তা পরিবর্তন হয়ে একসময় অজানায় পাড়ি জমাবে। ছাপাখানা আবিষ্ককারের পর, ব্যাপারটা অনেকখানি পাল্টে গেল। তখন বোঝা গেল, ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন তার ‘মুদ্রণরূপ’। পরের ইতিহাস অনেক দ্রুত এগিয়েছে। যে ভাষাগুলো তাদের অক্ষরের ছাপ পায়নি, সিসাতে তারা হারিয়ে যেতে শুরু করল। বলা যায়, ভাষার ওপর প্রযুক্তির ছড়ি ঘোরানো সেই থেকে। এরপর টাইপরাইটার, ফটোটাইপ সেটি ক্রমশ উন্নত প্রযুক্তি! আসতে শুরু করলো। বিশ শতকের দিকে কম্পিউটার, কম্পিউটারের নিজের ভাষা কিন্তু সহজ−জলবৎ তরলং, কেবল ‘১’ আর ‘০’। তার সে ভাষা মানুষ ‘সেভাবে’ বোঝে না, তাই তৈরি করা হলো নিয়মকানুন, অনুবাদক। আমাদের ভাষাকে কম্পিউটারের ভাষায় প্রকাশের জন্য একটা মোর্সকোডের মতো ম্যাপ বানানো হলো (মোর্সকোড হলো ড্যাশ আর ডটের মাধ্যমে ইংরেজি বর্ণমালা বোঝানোর সংকেতলিপি। টেলিগ্রাফে ব্যবহৃত হয়)। সেটির একটি গালভরা নামও হলো−আসকি (অঝঈওও)। এগুলো কিন্তু মুশকিল নয়, বরং প্রযুক্তির ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ। শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ এই পৃথিবীর সবখানে এক সাথে হয়নি। ফলে কম্পিউটার নামের যন্ত্রটির বিকাশের সাথে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের সবাই ছিলেন ইংরেজি ভাষাভাষী। ফলে তাঁরা কেবল তাঁদের ভাষার (ইংরেজি) কথা ভেবে যাবতীয় কল-কব্জা, নীতিমালা বানিয়েছেন। কম্পিউটারের ব্যাপারটা এমন দ্রুত গতিতে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। অন্য ভাষী লোকেরা তাদের মতো করে, নিজ ভাষায় ব্যবহার করতে চাইল। কম্পিউটারবিদেরা পড়লেন মহাবিপাকে কারণ, সব তো বানানো হয়েছে ইংরেজিকে কেন্দ্র করে। ‘যত মুশকিল তত আসান’ কাজে সবাই রাস্তাও বের করে ফেললেন। দুটো রাস্তা−প্রথমটিও ইংরেজির সঙ্গে সহাবস্থান, আশু করণীয় হিসেবে। অর্থাৎ ‘আসকি’র ইংরেজি ছাড়া অংশগুলো নিজেদের ভাষার জন্য ব্যবহার করা, একটি মধ্যবর্তী প্রক্রিয়া ব্যবহার করা ইত্যাদি। ফলে ইংরেজি কম্পিউটারে জাপানি, আরবি এমনকি বাংলা ভাষায় কাজ করা সহজ হয়ে গেল। এ কাজটা করার সময় কয়েকটি জাতি প্রথমেই ম্যাপের ব্যাপারে একমত হয়েছে। যেমন ভারতীয়রা, তারা আসকি থেকে ইসকি (ওঝঈওও) বানিয়ে নিয়ে সবাই সেটা মেনে চলেছে। আবার অনেক দেশে আসকির খালি জায়গাগুলো ‘যে যেমন খুশি’ তেমনই ব্যবহার করেছে। যেমন− আমরা। ফলে আমরা কম্পিউটারে বাংলা লিখতে পারলাম বটে, তবে আমার লেখা আর আপনার কম্পিউটারে ‘পড়া’ যায় না! এভাবে কম্পিউটারে ভাষার ‘স্থানীয়’ সমাধানের পাশাপাশি কাজ হলো ‘আন্তর্জাতিক’ সমাধানের। ফলাফল হিসেবে পাওয়া গেল ‘ইউনিকোড’−বলা যায়, ‘আসকিরই শতপুত্র’। আসকিতে ছিল মোটে ২৫৬টি সংকেত। ইউনিকোডে হলো ৬৫ হাজারেরও বেশি! অর্থাৎ কি না পৃথিবীতে যত ভাষা চালু আছে, তার যত প্রতীক আছে, সবই সেখানে রাখা যাবে (ম্যাপিং)।
পৃথিবীর আর দশটি ভাষার মতো আমার মায়ের ভাষাও ঢুকে গেল ইউনিকোডে। অর্থাৎ ইউনিকোডে নির্ধারিত হয়ে গেল বাংলা ভাষার ‘ক’-কে কম্পিউটার কোন সংকেত হিসেবে চিনবে। যে সফটওয়্যারগুলো ইউনিকোড মেনে চলে তাদের বেলায় সব ‘ক’ একই সংকেতে চেনা যাবে। অর্থাৎ আমার আর আপনার কম্পিউটারে বাংলা লেখার পদ্ধতি যদি ইউনিকোড সমর্থিত হয়, তাহলে কারও কোনো বিভ্রান্তি হবে না!। এভাবে আমাদের কম্পিউটারে বাংলা লেখার একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার আন্তর্জাতিক সমাধান হয়ে গেল। এখন সেটা মেনে নিলেই হয়। ইতিমধ্যে দেশে ও দেশের বাইরের অগুনতি বাংলাপ্রেমি তাদের চেষ্টা ও অধ্যবসায়ে ইউনিকোডে বাংলা লেখার নানা উপকরণ হাজির করে ফেলেছে। ফলে ধীরে ধীরে হলেও কম্পিউটারে বাংলা ভাষা একটা প্রমিতমানের দিকে এগুতে শুরু করল। তবে ইউনিকোডে বাংলার এই প্রচলন কেবল যে লেখালেখির সমস্যার সমাধান করেছে, তা কিন্তু নয়। আগে যেহেতু আমরা কেবল কম্পিউটারে লেখালেখি বা হিসাব-নিকাশ করতাম, সেহেতু আমাদের সব ‘বাংলা সমাধান’ ছিল প্রোগ্রাম-নির্ভর। ইউনিকোড এসে আমাদের প্রোগ্রাম-নির্ভরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। অর্থাৎ এখন আপনার কম্পিউটারে যদি ইউনিকোড সমর্থিত বাংলা চালু থাকে, তাহলে আপনি বাংলায় যেমন লেখালেখি বা হিসাব করতে পারবেন তা-ই নয়, আপনি পারবেন আপনার মায়ের ভাষায় ই-মেইল লিখতে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস লাইনটি বাংলায় লিখতে, ওয়েবসাইটটি বাংলায় সাজাতে, দিনপঞ্জি বাংলার লিখতে কিংবা বাংলাতেই তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদান করতে! বলা যায়, একবারেই সব সমস্যার সমাধান। ইউনিকোডের প্রচলনে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগের যতটা বিকাশ আমরা গত কয়েক বছরে দেখেছি, সরকারি ক্ষেত্রে ততটা দেখা যায়নি। তবে ২০০৮ সালে ভোটার তালিকা করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রবলভাবে সরকারি কর্মকান্ডকে ইউনিকোডে ফিরিয়ে নিয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় তথ্যভান্ডারটি (ডেটাবেইস) বাংলা ভাষায়, ইউনিকোডেই হয়েছে। সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে পাওয়া গেছে ‘নিকস’ নামের একগুচ্ছ বাংলা ফন্ট এবং পুরোনো দলিল-দস্তাবেজ ইউনিকোডে রূপান্তরের জন্য রূপান্তরক (কনভার্টার)। শুনেছি এবারের বইমেলায় একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে ইউনিকোডে, নিকস ফন্টে। কাজেই শুরুর প্রশ্নের একটা উত্তর আমরা পেয়ে যাচ্ছি। ইউনিকোডে সমর্থিত হলে একটি ভাষা টিকে যাবে কম্পিউটার জগতে এবং এর পাশাপাশি বস্তু জগতেও। তবে খটকা একটা থেকেই যাচ্ছে। কেবল ইউনিকোডে ম্যাপিং, কি-বোর্ড আর সফটওয়্যার থাকলেই সাইবার জগতে বাংলা ভাষা টিকে যাবে? উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের দ্বিতীয় দুনিয়া, ইন্টারনেটে। উনিশ শতকের সত্তরের দশকের শেষভাগে গবেষণাকাজের সহযোগিতার জন্য যে নেটওয়ার্কের জন, ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের জোয়ারে সেটি এখন ঢুকে পড়েছে আমাদের ঘরেও। ইন্টারনেটের এক বিশাল জাল ক্রমেই মানব জাতিকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলছে সাইবার জগতের সুত্রে। সেই ইন্টারনেটেই তাহলে টিকে থাকতে হবে ভাষাকে! কেমন করে?
ইন্টারনেটে কেন মানুষ ঢোকে? সহজ জবাব তথ্য খুঁজতে, জানতে। এখন পর্যন্ত ইন্টারনেটে যা কিছু পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগ ঠিক করে বললে ৮০-৯০ শতাংশ হলো ইংরেজি ভাষায়। ফলে ইংরেজি না জানলে সেখান থেকে কিছু বের করে আনা মুশকিল। আমাদের মতো দেশগুলোর তাতে আবার সমস্যা (আসকির মতো)! এখন আমাদের দুটো পথ। নিজের মায়ের মুখে ইংরেজি ভাষা বসিয়ে দেওয়া, প্রথমটা। অনেকেই আছে যারা এই মতবাদে বিশ্বাসী। গ্লোবাল ভিলেজের দোহাই দিয়ে তারা আমাদের ভাষা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিতে চায়। তবে আমরা তা কখনোই চাই না। ১৯৫২ সালে যে কারণে মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছি, ঠিক সে কারণেই আমরা ইন্টারনেটে মায়ের ভাষা চায়। বায়ান্ন’র সঙ্গে পার্থক্য হলো, তখন আমাদের ‘চাওয়ার’ দিন ছিল, এখন আমাদের ‘করার’ দিন। ইন্টারনেটে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার সব উপকরণই আমাদের আছে। দেশে এমনকি গড়ে উঠেছে স্বেচ্ছাসেবকদের এক বড় বাহিনীও। অনেকেই হয়তো জানে, ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় তথ্যভান্ডার বাংলা উইকিপিডিয়া। গড়ে তুলেছে একদল স্বেচ্ছাসেবী। রয়েছে বাংলা ভাষায় দিনপঞ্জি লেখার অনেক সাইট। বেশ কিছু ওয়েবসাইট এখন সম্পুর্ণ বাংলায়! এসবই আমাদের ভাষায় পতাকা উড়িয়েছে ইন্টারনেটে। তবে সেটিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার সরকারি-বেসরকারি, স্বেচ্ছাসেবী, পারিশ্রমিক ভিত্তিক সব ধরনের উদ্যোগ। বাংলা ভাষার সব সেরা সম্পদ, যা ইতিমধ্যে পাবলিক ডোমেইনে চলে এসেছে, সেগুলোকে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করা যায়। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মীর মশাররফ হোসেন, বেগম রোকেয়াসহ সব মনীষীর সৃষ্টিকর্ম ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হোক। সরকারের কাছে গচ্ছিত মহান মুক্তিযুদ্ধের সব ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ, ছবি, চলচ্চিত্রকে জনগণের সম্পদ (পাবলিক ডোমেইন) হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলো ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হোক। সরকারি পাঠ্যপুস্তকগুলোও ছড়িয়ে দেওয়া হোক সাইবার জগতে। সব সরকারি ওয়েবসাইটে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করে, বাংলা ভাষায় যেন ক্রেডিটকার্ডের লেনদেন করা যায়, এর আয়োজনও করা হোক। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা এও জানি, ইন্টারনেটে আমার মায়ের ভাষাকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইটা করতে হবে, বদলে দেওয়ার প্রত্যাশী তরুণ প্রজন্মকে বাংলা ভাষায় ই-মেইল লিখে (রোমান হরফে নয়) তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদান করে। তাই মৌরসি সূত্রে বাঙ্গালি না হয়ে ভাষাশহীদদের রক্তসূত্রে বাঙালি হওয়ার নযির স্থাপনে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। অতএব আসুন, ফেসবুক-টুইটার, ট্যাঙ্গো-বাইবার, হুয়াটসআপ, ওয়েব-ব্লগসহ ইন্টারনেট দুনিয়ার সবস্থানে সক্রিয় হয়ে নিজ মাতৃভাষা বাংলার প্রেম বুকে লালন করে অনুপম আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সংগ্রাম অব্যাহত রাখি অনাদর্শ আর পরাশক্তির  বিরুদ্ধে। তাতেই বাড়বে বদলে দেয়ার শক্তি। ইতিহাস পরিবর্তনের জন্য রুখে দাঁড়াতে হয়েছে তরুণদেরই। কখনো কলম হাতে লিখনির মাধ্যমে আবার কখনো অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে। এখন সেটা করতে হবে ইউনিকোড সমর্থিত কিবোর্ডে ঝুঁকে,তথ্য-প্রযুক্তি,ইন্টারনেট তথা সাইবারজগতে। করতে হবে কাজ মনের আনন্দে, বাংলামায়ের দামাল ছেলেদের ভূমিকায় উত্তির্ণ হয়ে দিনবদলের প্রত্যাশায়!

ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই একাত্তরে স্বাধীনতা

5465508548_28cf77fb53এডভোকেট জিয়াউর রহিম শাহিন

হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম একটি গর্বিত জাতির উত্তরাধিকার হিসাবে শত বছরের কাক্সিক্ষত বহুল প্রত্যাশিত স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে ভাষা আন্দোলনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অযুত শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের শস্য শ্যামলা সুন্দর এ বসুন্ধরা। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের সমারোহে এ যেন শান্তির এক ফোয়ারা। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানকে রূপান্তরিত করে বাংলাদেশে। ১৭৫৭ সনের পলাশীর পরাজয়, ১৮৫৭ সনের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ১৯০৫ সনের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ১৯২০-২২ সনের খেলাফত আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন জাতীয় জাগরণে প্রধান ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে ১৯৪২ সনের কুইট ইন্ডিয়া এবং ক্রমাগত হিন্দু মুসলিম বৈষম্য তৎকালীন রাজনৈতিক ধারাকে পরিবর্তিত করে বৃটিশ উপনিবেশিক শোষক গোষ্টির নাগপাশ থেকে ৪৭’র ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগষ্ট স্বাধীন ভারতের সৃষ্টি হয়। ৪৭ পরবর্তী এ অঞ্চলে সুকৌশলে বাংলা ভাষার উপর চললো নানাবিধ আক্রমন। অতঃপর উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুগভীর চক্রান্তের বিরুদ্ধে ফুসে উঠলো এ ভূখন্ডের আবালবৃদ্ধ বনিতা। পশ্চিম পাকিস্তানের পরিকল্পিত উপনিবেশিক আগ্রাসন ও স্বেচ্ছাচারিতার হিংস্র থাবা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির লক্ষ্যে ভাষা আন্দোলন একটি মাইল ষ্টোন। বৌদ্ধ ধর্মাশ্রিত চর্যাপদ গুলোতে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রকৃত পক্ষে বাংলা ভাষার চর্চা শুরু হয় ত্রয়োদশ শতকে বঙ্গে মুসলিম বিজয়ের পর থেকেই। আর এ জন্যই মধ্যযুগকে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়। চল্লি¬শের দশকে উর্দুতে কথা বলাটা অনেকের কাছে ছিল বেশ গর্বের আর এ কারনেই মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম অনেকটা উস্মা প্রকাশ করেই বলেছিলেন, “যেজন বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গ বানী / সেজন জন্ম কাহার নির্ণয় ন জানি”।
ইংরেজদের শাসন শোষণ নির্যাতন পরবর্তী পশ্চিমাদের বিমাতা সুলভ আচরণে এ অঞ্চলের সচেতন জনগোষ্ঠির মাঝে ক্রমেই প্রতিবাদের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানিরা পিচঢালা রাজপথের দুর্বার আন্দোলনে নেমে আসতে বাধ্য হলো। বাংলা ভাষার দাবিতে ঐতিহ্যবাহী সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে সিলেটে সর্ব প্রথম সুধী সমাবেশ হয় ৪৭ সনের ৯ নভেম্বর। আর এই হিসাবে বাংলা ভাষার আন্দোলনে সিলেটই পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্ব প্রথম সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত আন্দোলন শুরু হয় সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে ১৯৪৭ সনের শেষের দিকে। উর্দ্দু, এক মাত্র উর্দ্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপিয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে পূর্ব বাংলা ছাত্র সমাজ ১৯৪৮ সনের ১১ মার্চ প্রদেশ ব্যাপী ধর্মঘট আহবান করে। আন্দোলনের মাত্রা তীব্রতর হতে থাকলে ৪৮ সনের ২১ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষনা দেন টৎফঁ ধহফ ড়হষু টৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ. এ ঘোষনার সাথে সাথেই পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের গতিতে ভিন্নরূপ পরিলক্ষিত হলো। পশ্চিমাদের দমন পীড়নে চারিদিকে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের ঝড় বইতে লাগলো- আন্দোলনের তীব্র লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। কালো ধোয়ায় আচ্ছাদিত ঢাকার পাললিক জমিনে ভাষার দাবীতে গঠিত হলো সর্বদলীয় কমিটি- এ ছিল একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
বায়ান্নের ২১শে ফেব্র“য়ারী বা ৮ ফাল্গুন। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারী আমি কি ভুলিতে পারি” হৃদয় স্পর্শী গানটি আলোড়িত করে গোটা জনপদের শিশু থেকে বৃদ্ধকে। আনন্দ এবং প্রাপ্তির উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত এ জনপদের ছাত্র জনতা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই” শ্লোগানে মুখরিত ঢাকার রাজপথ। বাংলা ভাষার প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা জানিয়ে বিক্ষোভে বিক্ষোভে একাকার যেন সকলেই। স্বৈরাচারী জালিমশাহী নির্বিচারে গুলি চালালে মৃত্যুকে স্বাগত জানান-সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ বাংলার সম্ভাবনাময় দামাল সন্তানেরা। বায়ান্নের রাজপথের শ্রেষ্ঠ বীর সেনানীদের আত্মত্যাগ আর বিদ্রোহী সৈনিকদের কাফেলা থেকে উচ্চারিত বজ্রকন্ঠে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হলো-পশ্চিমাদের ক্ষমতার মসনদে ভূমিকম্প সৃষ্টি করলো। সত্য, সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় আলোর কাছে পশ্চিমারা শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরন করতে বাধ্য হলো। ৫৬ সনে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পেল। ৫২’র ৮ ফাল্গুনের আত্মত্যাগ অমর অক্ষয় আর এতে অবগাহন করে রাষ্ট্রীয় জীবনে আমরা খুঁজে পাই তৃষ্ণার তৃপ্তি। ২১ ফেব্র“য়ারী মহান শহীদ দিবসে আমরা খুঁজে পাই আমাদের শেকড়কে। মূলতঃ এ ঐতিহাসিক এবং প্রাচুর্য মন্ডিত দিনটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য নতুন আঙ্গিকে ভিন্নরূপে বার বার অনুপ্রাণিত করে লক্ষ কোটি জনতাকে। ঐতিহাসিক ফাল্গুন বা ফেব্র“য়ারী মাসটি আমাদের মাঝে ফিরে আসে বার বার। বর্ষ পরিক্রমায় একুশ তার নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের শিরায় শিরায় নিত্য বহমান। শহীদ দিবস চির ভাস্বর, চির অম্লান। একুশ একটি সার্বজনীন বিপ্ল¬বী চেতনা। একুশ সংগ্রামী চেতনায় উদীপ্ত এক উজ্জ্বল অবিস্মরণীয় দিন। ৮ ফাল্গুনের সোনালী সকালের কৃষ্ণ চুড়ার পলাশ রাঙা রক্তমাখা বিজয়ই ঐক্যের দুর্ভেদ্য প্রাচীর সৃষ্টি করে আমাদের ইস্পাত কঠিন শপথে বলিয়ান রেখে পর্যায় ক্রমে আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম করেছে। ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে এমন জাতীর অস্তিত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন সারা পৃথিবীতে বিস্ময় সৃষ্টি করে প্রমাণ করেছে আমরাই বীরের জাতী। আমাদের জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল ভাষা আন্দোলনের পরেই। ভাষা আন্দোলন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলেও এর সুদূর প্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের বর্ণিল রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ম্যাগনাকার্টা।
বায়ান্নের ইতিহাস ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ, অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। আমাদের রক্তাক্ত সংস্কৃতির আভিজাত্য ও মৌলিক চেতনাকে অস্তিত্বহীন করার চক্রান্ত অব্যাহত আছে। বাংলা ভাষার প্রধান শত্র“ হচ্ছে পুঁজিবাদ। আমাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি যাতে ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের কবলে চলে না যায় সেদিকে কড়া নজর রাখতেই হবে। বায়ান্নের চেতনায় আজও আমরা সমৃদ্ধ হতে পারিনি। দেশে এখনো সম্প্রীতির পূর্ণ সেতুবন্ধন রচিত হয়নি। স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ প্রাপ্তি যেন সুদূর পরাহত। সবুজ শ্যামল এ দেশের চারদিকে আজ লাশ আর বারুদের গন্ধ। গণমাধ্যম অবরুদ্ধ, রক্তেভেজা গণতন্ত্র বিপন্ন-মানবতা ভুলূণ্ঠিত। হীনস্বার্থ চরিতার্থে মহান সংবিধান আজ ক্ষত বিক্ষত। শেয়ার বাজার, হলমার্ক, কুইকরেন্টাল, রেলের কালোবিড়াল কেলেষ্কারী বিশেষতঃ পদ্মা সেতুর দুর্নীতি বিশ্বের দরবারে দেশের মান মর্যাদ কে বেশ ক্ষুন্ন করেছে। গণদাবিতে রাজপথ ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। ২০১৪ সনের ৫ জানুয়ারী অনুষ্টিত জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হন। মূলতঃ প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত আছে। গণগ্রেফতার, পিপার  ¯েপ্র, বার্ণ ইউনিটের করুণ আর্তনাদ, পেট্রোল বোমায় মানুষ হত্যা, বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড সহ বিভিন্ন ভাবে মানুষ হত্যায় নিষ্ঠুরর ও নির্মম চলমান রাজনৈতিক অবস্থায় বাংলাদেশতো বটেই বহিবিশ্বেও আমাদের মান মর্যাদা চরম ভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। কন্ঠশিল্পী হায়দার হোসেন বেশ কিছুদিন যাবত গেয়েই যাচ্ছেন, তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি। বহির্বিশ্বে ও আমাদের গরিয়ান ইতিহাস ঐতিহ্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। দেশের স্বার্থে জাতীয় পর্যায়ে জাতীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ে ঐক্যের বড়ই প্রয়োজন। সাহিত্য এবং সংস্কৃতির মূলই মানুষের জীবনাচার। মানুষ সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজের পরিচয় তুলে ধরে সততার সাথে, বিকাশ ঘটায় সুন্দর ভাবে- শ¬ীলতার মাত্রায়। পবিত্র ইসলাম ধর্মে রয়েছে ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনা। সালাম বরকতদের তাজা প্রাণ উৎস্বর্গের পর দীর্ঘ ছয় দশক অতিবাহিত হওয়ার পর ও প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের সর্বত্র এখনো বাংলা ভাষা প্রচলনের সুব্যবস্থা হয়নি, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হয়নি যা নিতান্তই দুঃখজনক। বিভিন্ন স্থরে বাংলার উপরে ইংরেজী ও হিন্দির প্রাধান্য বিস্তারের অপচেষ্টা অনেকটা স্পষ্ট। ৮ ফাল্গুনকে ২১ ফেব্র“য়ারীতে বিলীন করার মানষিকতার পরিবর্তন আনা অত্যাবশ্যক। অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে এবং সত্য তথা অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে- লাল সবুজের রক্তিম পতাকা খচিত বাংলাদেশে যুগে যুগে সত্যের জয়গান গেয়ে গেয়েই আত্মাহুতি দিচ্ছেন অসংখ্য বীর সেনানীরা তথাপি শির নীচু করেননি কখনো। বায়ান্নের শহীদদের হৃদয়ের সুপ্ত ভাষনাকে চিন্তায়, কর্মে বাস্তবে রূপায়িত করতেই আমরা অঙ্গিকারাবদ্ধ। বায়ান্নের শহীদদের রক্তের বদৌলতেই একাত্তরের মহান স্বাধীনতা। একাত্তরের মহান স্বাধীনতাই আমাদের গর্ব, এ জাতির  অহংকার। দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সর্বোপরি গণতন্ত্র রক্ষায় ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিরোধী  সকল অশোভ শক্তিকে ৫২’র চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রূখতে হবে সাহসিকতার সাথে। জালেম, জুলুম, অপশাসন, মানবতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ঈমান, আক্বিদা ইত্যাদি সর্ম্পকে আলোক প্রত্যাশি প্রতিটি মানুষের কাছে ৫২ এবং একাত্তরের চেতনা অনুকরনীয়। আর এ জন্যই বলি- “প্রভূ হে, তোমার রাজ্যে অসত্যের দ্রুত লয় হোক/ সভ্যতার নব সূর্য জুড়াক তৃষিত দুটি চোখ”।
ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই মহান স্বাধীনতার শুভ সুচনা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। সে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৭ সনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হলে বাংলাদেশ নামের ভূখন্ডটি পূর্ব পাকিস্তান হিসাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়। এ ছিল আরেক সুদূর প্রসারী ঐতিহাসিক বিজয়। ৪৭’র বিভক্তিই ক্রমান্বয়ে আমাদেরকে ৫২’র অগ্নিঝড়া স্মৃতিময় দিনের দিকে ধাবিত করে। ৫২’র একুশে ফেব্র“য়ারীতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই ২২ ফেব্র“য়ারী সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান, আব্দুল আউয়াল, আব্দুর রহিম প্রমুখ। ২৩ ফেব্র“য়ারী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সাঈদ হায়দরের নকশা মোতাবেক ১১ ফুট দৈর্ঘ্যরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ২৪ ফেব্র“য়ারী শহীদ শফিউরের গর্বিত মাতা ঐ শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের বাহিরে যত শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে তাতে প্রবাসী সিলেটবাসীর অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বে ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্থান তৃতীয়তে। অন্যান্য ভাষা জাতীসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা পেলেও বাংলা ভাষা কেন জাতিসংঘে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা পাবে না? বাংলাকে আজ জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়া অপরিহার্য।
বাংলাদেশ। সবুজ শ্যামলীমায় ভরপুর অপরূপ বৈচিত্র্যের এ জনপদ সত্যিই আল্লাহর অপার দান। লাখো লাখো শহীদের শাহাদতের বদৌলতেই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের এই প্রানোধ্যান। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের সমারোহে এ যেন জীবন্ত শান্তির এক ফোয়াড়া। ওলি আউলিয়াদের পদচারনায় ওহীরহ পল্লবে এবং পাখিদের কল্লোলে স্বর্গের সন্নিবেশে ধন্য আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান শওকতের সহিত ভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আপামর জনগণের দৃঢ় প্রত্যাশায় ৯৯ সনের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ১৮৯ জাতী সমন্বয়ে গঠিত জাতী সংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ শে ফেব্র“য়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় যা বাংলাদেশকে বিশ্বের ইতিহাসে নতুন ভাবে গৌরবান্বিত করেছে। পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়েছে। অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বে ২১ শে ফেব্র“য়ারী শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আজ দেশ বিদেশের অসংখ্য মানুষের আন্দোলন সংগ্রামের সুতিকাগার হিসাবেই পরিগণিত হচ্ছে। মাতৃভাষাকে ভালবাসার মাধ্যমেই দেশপ্রেম শুরু হয়। বাংলা ভাষা তথা বাংলাদেশের সব কিছুকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে হবে। আর এ কথাটি আজ কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীর কন্ঠে ফুটে উঠেছে এভাবে,
আমি বাংলার গান গাই/ আমি বাংলায় গান গাই
আমি আমার আমাকে/ চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।

মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

ম ানুষ মহান আল্লাহর সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি। এই মানুষকে কেন্দ্র করেই সমগ্র সৃষ্টিজগতের সকল আয়োজন। আধুনিককালে মানুষের জীবন কীভাবে আরো ফলপ্রসূ করা যায় তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ এই মানুষের উন্নয়ন সাধন করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত করতে হলে প্রয়োজন যথার্থ কৌশল প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন। আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র জীবনব্যবস্থা ইসলাম মানবসম্পদ উন্নয়নে কী কী নির্দেশনা দিয়েছে তা এই প্রবন্ধে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিচয়, এ ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা বাস্তবায়নে জ্ঞান অর্জন, জীবিকা অর্জন, স্বনির্ভরতা অর্জন, কর্তব্য পালন, যোগ্যতা অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইসলামের গুরুত্বারোপ ও কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা আরোপ বিষয়ে অত্র প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে পরকালীন চেতনা ও নৈতিকতার গুরুত্বকে দলীলসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রবন্ধের শেষাংশে নৈতিক উন্নয়নে ইসলামের নির্দেশনাসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধটি মূলত কুরআন ও হাদীসের বর্ণনাভিত্তিক একটি প্রাথমিক উপস্থাপনা।
মানবসম্পদ উন্নয়ন আধুনিক উন্নয়ন চিন্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ ধারণা। বিশ শতকের শেষ দশকে এ ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। বর্তমানে উন্নয়ন চিন্তার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন ধারণাটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে এবং সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা অন্য যে উন্নয়নের কথাই বলা হোক, সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মানবসম্পদ। একে ঘিরে এবং এর জন্যই সকল উন্নয়ন প্রচেষ্টা। টেকসই উন্নয়ন, সমন্বিত উন্নয়ন ধারণা, সামগ্রিক উন্নতি বা সর্বাত্মক সুষম উন্নয়ন, সকল ক্ষেত্রে মানুষের সুখ-সুবিধাই মূল বিবেচ্য হয়ে থাকে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া প্রাকৃতিক, নৈসর্গিক বা পরিবেশগত কোনো সুবিধা গ্রহণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। বর্তমাান উন্নয়ন ধারায় প্রথমে তাই মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণকে আবশ্যিক বলে গণ্য করা হয়। ইসলাম গোড়া থেকেই মানবসম্পদ উন্নয়নকে সামগ্রিক উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম মানবকে সত্যিকারার্থে শ্রেষ্ঠতম সম্পদ বলে ঘোষণা করেছে এবং এর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিধি-ব্যবস্থাসমূহ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় মানব সম্পদ উন্নয়ন ধারণাটির বিকাশ ও বিস্তারে যে পরিমাণ গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে এবং গুরুত্ব প্রদানের প্রেক্ষাপটে যে ফল লাভ হচ্ছে তা নিতান্তই অপ্রতুল। এতে মানুষের বৈষয়িক উন্নয়ন কিছুটা হয়তো হচ্ছে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও ভালোবাসা বস্তুগত অর্জনের কাছে প্রতিনিয়ত মার খেয়ে যাচ্ছে। মানবিক বিপর্যয়ের চালচিত্র প্রতিদিনই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ পাচ্ছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়ন ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এমতাবস্থায় মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের ভূমিকা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন একান্ত আবশ্যক। এ বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন মানবসম্পদ উন্নয়নে আধুনিক প্রচেষ্টার ব্যর্থতা এবং সফলভাবে মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ নির্দেশ করবে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিচিতি : উন্নয়ন একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া, যা সমগ্র সমাজকে অন্তর্ভূক্ত করে। এতে একটি সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ভৌত কাঠামো, পাশাপাশি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ব্যবস্থা ও জীবন ধারণা পদ্ধতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়। “উবাবষড়ঢ়সবহঃ রং ভঁহফধসবহঃধষষু ধ ঢ়ৎড়পবংং ড়ভ পযধহমব ঃযধঃ রহাড়ষাবং ঃযব যিড়ষব ংড়পরবঃু – রঃং বপড়হড়সরপ, ংড়পরড়- পঁষঃঁৎধষ, ঢ়ড়ষরঃরপধষ ধহফ ঢ়যুংরপধষ ংঃৎঁপঃঁৎবং ধং বিষষ ধং ঃযব াধষঁব ংুংঃবস ধহফ ধিু ড়ভ ষরভব ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব”- ক. ঈ. অষবীধহফবৎ, উরসবহংরড়হং ধহফ ওহফরপধঃড়ৎং ড়ভ উবাবষড়ঢ়, ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়বসহঃ, ঠড়ষ.১২ (৩)- ঘওজউ, ঐুফবৎধনধফ, ওহফরধ, ১৯৯৩, ঢ়.২৫৭”
উন্নয়ন একটি ব্যাপক ধারণা, যা একটি সমাজকে বর্তমান অবস্থান থেকে অধিকতর কাম্য অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিচালিত করে এবং এই কাম্য লক্ষটি নির্ধারিত হয় ঐ সমাজের জনগণের ইতিহাস অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হতে। ‘‘মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিপ্রেক্ষিতে আমলাতন্ত্রের একটি পর্যালোচনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৬৮, অক্টোবর ২০০০, পৃ. ৫৫’’।  উন্নয়নের মূল কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। এটি একটি পথ মাত্র, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। যে উন্নয়নে মানুষের জীবন উন্নত হয় না বা যাতে মানুষের অংশগ্রহণ থাকে না, সে উন্নয়ন উন্নয়নই নয়। এ বোধই মানবসম্পদ উন্নয়ন ধারণার জনক, যার মূল কথা মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। ‘সেলিম জাহান, অর্থনীতির কড়চা, ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৬, পৃ. ১০’’।
উন্নয়ন সম্পর্কিত নতুন এ ধারণাটির উদ্ভবের ফলে মানবিক দিকটি যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করে। বৈশ্বিকরণ প্রক্রিয়া জোরেসোরে উচ্চারিত হওয়ার সময়ও স্থিতিশীল ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের সাথে মানব উন্নয়নকে আবশ্যিকভাবে যুক্ত করা হয়। কারণ মানব উন্নয়ন ধারণা সৃষ্টিশীলতা ও বিকাশকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। ‘‘এজাজুল হক চৌধুরী, মানবিক উন্নয়ন, ঢাকা: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ১৯৯৯, পৃ. ১১’’। মানব উন্নয়ন ব্যাপক জনগণের পছন্দ ভিত্তিক একটি প্রক্রিয়া। এটি মানব সক্ষমতার উপর ভিত্তিশীল (জনগণের বিনিয়োগের মাধ্যমে) এবং এসব সক্ষমতা সমভাবে ব্যবহৃত হয় (আয় এবং কর্মপ্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অংশগ্রহণমুখী পরিস্থিতির উন্নয়ন সাধন। ”ঐঁসধহ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ধং ধ ঢ়ৎড়পবংং ড়ভ বহষধৎমরহম ঢ়বড়ঢ়ষব’ং পযড়রপব. ওঃ ঢ়ষধপবফ বয়ঁধষ বসঢ়যধংরং ড়হ ঃযব ভড়ৎসধঃরড়হ ড়ভ যঁসধহ পধঢ়ধনরষরঃরবং (ঃযৎড়ঁময রহাবংঃরহম রহ ঢ়বড়ঢ়ষব) ধহফ ড়হ ঃযব ঁংব ড়ভ ঃযড়ংব পধঢ়ধনরষরঃরবং (ঃযৎড়ঁময পৎবধঃরহম ধ ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধঃড়ৎু ভড়ৎ রহপড়সব ধহফ বসঢ়ষড়ুসবহঃ মৎড়ঃিয.”–টঘঊঝ ঈউ ভড়ৎ অংরধ ধহফ ঃযব চধপরভরপ, টঘউচ, ঝড়পরড়-ঈঁষঃঁৎধষ ওসঢ়ধপঃ ড়ভ ঐঁসধহ জবংপড়ৎবং ওহঃবৎঢ়ৎবঃ, ১৯৯৪, ঢ়৮” মানব উন্নয়ন ধারণাটি বহুমাত্রিক ধারণার সমষ্টি। এর মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক, সর্বোপরি জীবনমান উন্নয়নকে বুঝায়।
১৯৯০ সলে ইউএনডিপি-র ‘টহরঃবফ ঘধঃরড়হং উবাবষড়ঢ়সবহঃ চৎড়মৎধসসব’ রিপোর্টে বলা হয়, মানব উন্নয়ন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, যা সমগ্র সম্পদের সম্প্রসারণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করে। ”ঐঁসধহ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ঢ়ৎড়পবংং ভধংপরহধঃরহম রং ঃযব বহঃরৎব ংঢ়বপঃৎঁস ঃযৎড়ঁময যিরপয যঁসধহ পধঢ়ধনরষরঃরবং ধৎব বীঢ়ধহফবফ ধহফ ঁঃরষরুবফ.”–টঘউচ জবঢ়ড়ৎঃ, ১৯৯০.” ১৯৯১ সালে মানব উন্নয়নের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নির্দিষ্ট হয়। এগুলো হলো মানুষের উন্নয়ন, মানুষের ধারা উন্নয়ন এবং মানুষের জন্য উন্নয়ন। মানুষের উন্নয়ন হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সামাজিক কল্যাণে বিনিয়োগ করা। উন্নয়নের পূর্ণ অংশগ্রহণ ও প্রয়োগ হলো মানুষের দ্বারা উন্নয়ন আর মানুষের দ্বারা উন্নয়ন হলো প্রতিটি মানুষের চাহিদা, আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। ”ধ) উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব যিরপব রহপষঁফবং রহাবংঃসবহঃ রহ বফঁপধঃরড়হ, যবধষঃয, হঁঃৎরঃরড়হ ধহফ ংড়পরধষ বিষষ নবরহম ধং ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, ন) উবাবষড়ঢ়সবহঃ নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব যিরপয রসঢ়ষরবং ভঁষষ ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধঃড়ৎু ফবাবষড়ঢ়সবহঃ. প) উবাবষড়ঢ়সবহঃ ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব যিরপয ংঢ়বপরভরবং বাবৎুড়হব’ং হববফং ধহফ ঢ়ৎড়ারফবং রহপড়সব ধহফ বসঢ়ষড়ুসবহঃ ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃরবং ভড়ৎ ধষষ.–টঘউচ জবঢ়ড়ৎঃ, ১৯৯১.” ১৯৯২ সালে হিউম্যান ডেভেলাপমেন্ট ইনডেক্স বা মানব উন্নয়ন সূচক নির্ধারিত হয়। সংক্ষেপে একে বলে এইচডিআই, এগুলোর মধ্যে জীবনের দীর্ঘ স্থায়িত্ব, দক্ষতা উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বা সরকারি ও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে আত্মকর্মসংস্থান অন্যতম। ”ঐঁসধহ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ওহফবী (ঐউও)–ধ) খড়হমবারঃু ড়ভ ষরভব (ন) কহড়ষিবফমব ৎবষধঃবফ ঃড় ফবাবষড়ঢ় ড়ভ ংশরশষষং ধহফ (প) ঝবষভ বসঢ়ষড়ুসবহঃ ড়ৎ ভড়ৎসধষ বসঢ়ষড়ুসবহঃ রহ ধ ঢ়ঁনষরপ ড়ৎ ঢ়ৎরাধঃব বহঃবৎঢ়ৎরংব.–টঘউচ জবঢ়ড়ৎঃ, ১৯৯২”
সাধারণ কথায়, মানবসম্পদ উন্নয়নকে বলা হয়, চবড়ঢ়ষব ঈবহঃৎব উবাবষড়ঢ়সবহঃ অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যবস্থা হবে সম্পূর্ণ মানবকেন্দ্রিক; মানুষ নিজেরা নিজেদের দৈহিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটাবে এবং নিজেরাই তার ফল ভোগ করবে। ‘‘ড. মোঃ নুরুল ইসলাম, মানব সম্পদ উন্নয়ন, ঢাকা: তাসমিয়া পাবলিকেশন্স, ২০১০, পৃ. ১২৩’’ শিক্ষাবিদ-গবেষকগণের কেউ কেউ মানবসম্পদ উন্নয়নকে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেখেছেন যা কর্ম-কৃতিত্ব (ঔড়ন চবৎভড়ৎসধহপব) বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা বলেছেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো কর্ম-কৃতিত্ব উন্নয়ন বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে সংগঠিত শিক্ষা অভিজ্ঞতা। ”ঐঁসধহ জবংড়ঁৎপব উবাবষড়ঢ়সবহঃ (ঐজউ) ধং ড়ৎমধহরুবফ ষবধৎহরহম বীঢ়বৎরবহপব রহ ধ ফবভরহরঃব ঃরসব ঢ়বৎরড়ফ ঃড় রহপৎবধংব ঃযব ঢ়ড়ংংরনরষরঃু ড়ভ রসঢ়ৎড়ারহম লড়ন ঢ়বৎভড়ৎসধহপব মৎড়ঃিয.”–খবড়হধৎফ ঘড়নষবৎ রহ জধভরয়ঁষ ওংষধস, ”ঐঁসধহ জবংড়ঁৎপব উবাবষড়ঢ়সবহঃ রহ জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ রহ ইধহমষধফবংয, উযধশধ : ঘধঃরড়হধষ ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ খড়পধষ এড়াবৎসবহঃ ১৯৯০, ঢ়৭০”
মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের পদক্ষেপসমূহ : ইসলামে মানব উন্নয়ন আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মূল বিষয়। ”ঐঁসধহ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ৎবসধরহং ঃযব শবু রংংঁব ড়ভ ংড়পরড়-বপড়হড়সরপ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ”–গড়যধসসধফ ঝড়ষধরসধহ ঞধহফধষ, ঝড়পরড়-ঊপড়হড়সরপ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ধহফ ঐঁসধহ ডবষভধৎব, উবাবষড়ঢ়সবহঃ ্ ঐঁসধহ ডবষভধৎব, জধলংযধযর, ২০০০, ঢ়২.” কুরআন মাজীদের মৌলিক বিষয় হলো মুসলিমের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য মানব উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গঠন। এ উন্নয়নের জন্য ইসলাম মানুষের দৈহিক আকৃতিতে মানুষ হওয়ার সাথে সাথে মানবিক ঔদার্য ও মানসিক সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়ার উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। ইসলাম ঘোষণা করেছে, আল্লাহ তা’য়ালার সৃষ্টি হিসেবে মানুষ সম্মানিত এবং শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তা’লাই মানুষকে এ শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি বানিয়েছেন’। ‘‘আল-কুরআন, ০৬ : ১৬৫,
তিনি অন্যত্র বলেছেন: নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি, তাদেরকে স্থলভাগে ও সাগরে চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে পবিত্র জীবিকা দিয়েছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। ‘‘আল-কুরআন, ১৭ : ৭০’’। তবে মানুষের এ শ্রেষ্ঠত্বকে আল্লাহ তা’য়ালা স্থায়ী ও অক্ষয় করে দেননি। বরং মানুষের আচরণিক ও আত্মিক উন্নয়ন করা ও না করার উপর এর ভিত্তি স্থাপন করেছেন। কেউ যদি আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশনা মেনে নিজের আচরণ ও মানসিকতা উন্নত করে তাহলে সে তার শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণœ রাখতে পারবে। আর যদি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় তাহলে নীচ থেকে নীচতর স্তরে নেমে যাবে। ‘‘আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেছেন: নিশ্চয় আমি মানুষকে সুন্দরতম করে সৃষ্টি করেছি। এরপর আমি তাকে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দিয়েছি’’। ‘আল-কুরআন, ৯৫ : ৪-৫’। মানুষের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণœ রাখার পথ হিসেবে আচরণিক ও আত্মিক উন্নয়ন অনিবার্য করে ইসলামে মানবসম্পদ উন্নয়ন চেষ্টা নৈতিকভাবে সকলের জন্য বিধিবদ্ধ উপায়ে আবশ্যিক করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আবশ্যিক হয়েছে জ্ঞান অর্জন, হালাল জীবিকা উপার্জন ও গ্রহণ, স্বনির্ভরতা অর্জন, কর্তব্য পালন, যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ, আখিরাতে সফলতা- ব্যর্থতাকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ এবং বিশেষভাবে নৈতিক উন্নয়ন।
জ্ঞান অর্জন : মুমিন হওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জনকে ইসলাম প্রথম শর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ তাআলা প্রথম মানুষ আদম আ. কে সৃষ্টির পর সবার আগে বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান দান করেছেন এবং এ জ্ঞানের পরীক্ষাতেই আদম আ. এর মাধ্যমে ফেরেশতাদের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। কুরআন মজীদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহ আদমকে প্রতিটি বিষয়ের নাম শেখালেন। এরপর তা ফেরেশতাদের সামনে পেশ করলেন এবং বললেন, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে আমাদের এগুলোর নামসমূহ জানাও।’ ফেরেশতাগণ বললেন, আপনি মহাপবিত্র। আপনি আমাদের যা শেখান, তা ছাড়া আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি মহাজ্ঞানী, মহা প্রজ্ঞাময়।’ আল্লাহ বললেন,‘হে আদম! তুমি তাদেরকে বিষয়গুলোর নাম জানিয়ে দাও।’এরপর যখন আদম তাদেরকে বিষয়গুলোর নাম জানিয়ে দিলেন, আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নিশ্চয় আমি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর অদৃশ্য সম্পর্কে জানি? আর আমি খুব ভালভাবেই জানি যা তোমরা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ। যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ছাড়া সকলেই সিজদা করল। ইবলীস অবাধ্য হল ও অহঙ্কার করল এবং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। ’আল-কুরআন, ০২ : ৩১-৩৪’
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন রিসালাত লাভ করলেন তখন তাঁর উপর প্রথম যে ওহী নাযিল হল তাও জ্ঞানার্জন বিষয়ক। হিরাগুহায় ধ্যানমগ্ন রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম ওহী লাভ করলেন, পড়–ন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন; যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত হতে। পড়–ন এবং আপনার প্রতিপালক মহাসম্মানিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন তা, যা সে জানত না। ‘ আল-কুরআন, ৯৬ : ১-৫’। জ্ঞানকে মর্যাদা ও কল্যাণের বাহন বর্ণনা করে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।” ‘আল-কুরআন, ৫৮ : ১১’। অন্যত্র বলা হয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমাত দান করেন। আর যাকে হিকমাত দেয়া হয় তাকে বিপুল কল্যাণ দান করা হয়। আর জ্ঞানীরা ছাড়া কেউ তো উপদেশ গ্রহণ করে না। ‘ আল-কুরআন, ০২ : ২৬৯’। আল্লাহ তাআলা সাধারণভাবে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণারও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অতএব হে চক্ষুষ্মান মানুষেরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। ‘আল-কুরআন, ৫৯ : ২’।
জ্ঞানের প্রতি আল্লাহ তাআলার এমন গুরুত্বারোপের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.) জ্ঞান অর্জনকে ফরয ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রতিজন মুসলিমের উপর ফরজ। ‘‘ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, তাহকীক : মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী, অধ্যায়: ইফতিতাহুল কিতাব ফিল ঈমান ওয়া ফাযায়িলুস সাহাবাহ ওয়াল ইলম, অনুচ্ছেদ : ফাযলুল উলামা-ই ওয়াল হাছছি আলা তলাবিল ইলম, বৈরূত : দারুল ফিকর, তা-বি, হাদীস নং-২২৪; হাদীসটির উল্লিখিত অংশটুকু সনদ সহীহ; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ ওয়া যঈফ সুনানু ইবনু মাযাহ, হাদীস নংÑ ২২৪’’।
জ্ঞানীকে তিনি নবী-রাসূলগণের উত্তরসূরী আখ্যায়িত করে বলেছেন, আলিমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ উত্তরাধিকার হিসেবে দীনার বা দিরহাম রেখে যাননি। তারা উত্তরাধিকার রেখে গেছেন শুধু জ্ঞান। তাই যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করেছে সে অর্জন করেছে উত্তরাধিকারের পুরো অংশ। ‘‘ ইমাম আত-তিরমিযী, আস-সুনান, তাহকীক : আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির ও অন্যান্য,অধ্যায় : আল- ইলম, অনুচ্ছেদ : মা জাআ ফী ফাযলিল ফিকহি আলাল ইবাদাহ, বৈরূত :দারু ইহইয়াই তুরাছিল আরাবী, তা.বি, হাদীস নং- ২৬৮২; হাদীসটির সনদ সহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ ওয়া যঈফ সুনানুত তিরমিযী, হাদীস নং- ২৬৮২’’। জ্ঞানার্জনের কাজকে তিনি আল্লাহর পথে জিহাদের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণে বের হয়েছে, সে আল্লাহর পথে রয়েছে, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে। ‘‘ইমাম আত-তিরমিযী, আস-সুনান, অধ্যায় : আল-ইলম, অনুচ্ছেদ : ফাযলু তলাবিল ইলম, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ২৬৪৭; হাদীসটির সনদ যঈফ; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল- আলবানী, সহীহ ওয়া যঈফ সুনানুত তিরমিযী, হাদীস নং- ২৬৪৭’’। এভাবে ইসলাম জ্ঞানার্জন ও গবেষণার কাজকে বাধ্যতামূলক রেখে মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এতে এমন বিধান রাখা হয় যে, একজন মানুষ মুসলিম হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষিত হতে হয়। শিক্ষিত হওয়া ছাড়া মুসলিম হওয়ার বিষয়টি বিধিগতভাবে অসম্ভব বলে গণ্য হয়।
জীবিকা অর্জন : আল্লাহ তাআলার ইবাদত যেমন ফরয, ইসলামে জীবিকা উপার্জনকে তেমন ফরয করা হয়েছে। কুরআন মাজীদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এরপর যখন সালাত আদায় শেষ হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করবে এবং আল্লাহর বেশি বেশি যিকর করবে, এতে তোমরা সফল হবে। ‘আল-কুরআন, ৬২ : ১০’। আবার জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রেও হালা-হারামের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এমন প্রবলভাবে যে, ইবাদত কবুল হবে কি না, ব্যক্তি জান্নাতে যাবে কি না তা একান্তভাবে জীবিকা উপার্জনের পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে। ফলে ইসলামে একজন ব্যক্তি কেবল জীবিকাই উপার্জন করে না বরং হালাল উপায় অবলম্বন করে বৈধভাবে জীবিকা উপার্জন করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হালাল উপার্জন অন্বেষণ করা ফরযের পরে ফরজ। ‘‘ইমাম আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ : ফী হুকুকিল আওলাদি….., বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪১০ হি., হাদীস নং- ৮৭৪১; হাদীসটির সনদ মুনকার এবং যঈফ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিয যঈফাহ ওয়াল মাওযূআহ ওয়া আছারুহাস সায়্যি ফিল উম্মাহ, রিয়াদ : দারুল মা’আরিফ, ১৪১২হি./ ১৯৯২ খ্রি. খ. ১৪, পৃ. ৩৪৮; হাদীস নং- ৬৬৪৫, ৩৮২৬’’। অর্থাৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরজ।
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, তোমরা উত্তম ও পবিত্র বস্তু আহার করো, যা আমি তোমাদের জীবিকারূপে দিয়েছি এবং কৃতজ্ঞতা আদায় করো আল্লাহর, যদি তোমরা একান্তই তাঁর ইবাদাত করো। ‘ আল-কুরআন, ০২ : ১৭২’। আল্লাহর রাসূল (সা.) এ প্রেক্ষাপটেই বলেছেন, হারাম সম্পদে তৈরি গোশত ও রক্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং হারাম সম্পদে তৈরি প্রতি টুকরো গোশত ও প্রতি ফোটা রক্তের জন্যে নরকই যথোপযুক্ত আবাস। ‘‘ ইমাম আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ : ফী তীবিল মাত’আমি ওয়াল মালবাস ওয়া ইজতিনাবিল হারামি ওয়া ইত্তিকা-ইশ শুবহাত, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৫৭৬২; হাদীসটির সনদ সহীহ লি-গাইরিহী মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, রিয়াদ : মাকতাবাতুল মা’আরিফ, ৫ম সংস্করণ, খ. ২, পৃ. ১৫০; হাদীস নং- ১৭২৯’’।
স্বনির্ভরতা অর্জন : ইসলামে কেউ কারো গলগ্রহ হয়ে থাকাকে সমর্থন করা হয়নি। ব্যক্তি নিজে উপার্জন করবে, নিজের আয়ের উপর নির্ভর করবে। অন্য কারো আয়ে ভাগ বসাবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) সুষ্পষ্টভাবে বলেছেন, পবিত্রতম উপার্জন হলো মানুষের নিজের হাতের পরিশ্রম এবং প্রত্যেক বিশুদ্ধ ব্যবসায় (এর উপার্জন)। ‘‘আলাউদ্দিন আল-মুত্তাকী, আল-হিন্দী, কানযুল উম্মাল, অধ্যায় : আল-বুয়ূ, অনুচ্ছেদ: ফী ফাযায়িলিল কাসবিল হালাল, বৈরূত: মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ১৯৮৯খ্রি., হাদীস নং-৯১৯৬; হাদীসটির সনদ সহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, আস-সিলসিলাতুল আহদাসিস সহীহাহ, রিয়াদ : মাকতাবাতুল মা’আরিফ, খ. ২, পৃ. ১৫৯; হাদীস নং- ৬০৭’’। স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য কাজ করতে হলে কেউ যেন তাতে দ্বিধা না করে, লজ্জিতবোধ না করে তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলামের শ্রম ও শ্রমিককে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। নানাভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা শ্রম পছন্দ করেন। শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে তিনি বলেছেন, যারা তোমাদের কাজ করে জীবিকা উপার্জন করে, সে শ্রমিক তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তাই যাদের কাছে এমন লোক আছে তাদেরকে যেন তা-ই খেতে দেয় যা তারা নিজেরা খায়, তাদেরকে যেন তা-ই পরতে দেয়, যা তারা নিজেরা পরে। তোমরা তাদেরকে তাদের সামর্থ্যরে বাইরে কোনো কাজ করতে বাধ্য করবে না। যদি তাদেরকে তোমরা কোনো কঠিন কাজ করতে দাও, তা হলে তোমরা তাদের সহযোগিতা করবে। ‘‘ইমাম আল-বুখারী,আস সহীহ, অধ্যায় : আল-ঈমান, অনুচ্ছেদ : আল-মাআসী মিন আমরিল জাহিলিয়্যাহ ওয়ালা ইউকফারু সহিবুহা বি-ইরতিকাবিহা বিশ-শিরক, বৈরূত: দারু ইবনি কাছীর, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৭হি./১৯৮৭খ্রি. হাদীস নং-৩০’’।
শ্রমিককে যেন তার প্রাপ্য মজুরির জন্য নিয়োগকর্তার পেছনে ঘুরতে না হয় এবং শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিয়ে নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকের মধ্যে যেন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তা নিশ্চিত করার জন্য আল্লাহর রাসূল সা. নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিককে তার ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও। ‘‘ইমাম ইবনু মাযাহ, আস-সুনান,অধ্যায়: আর-রূহুন, অনুচ্ছেদ : আজরিল উজারা, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-২৪৪৩। হাদীসটির সনদ সহীহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ ওয়া যঈফ সুনানু ইবনি মাজাহ্, হাদীসনং- ২৪৪৩’’। অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে রাফি’ ইবনু খাদীজ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে একদা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন প্রকারের উপার্জন উত্তম ও পবিত্রতম? তিনি বলেছেন, ব্যক্তির নিজের শ্রমের উপার্জন ও সৎ ব্যবসায়লব্ধ মুনাফা। ‘‘ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ, তাহীক : শুঅন্ব আল-আরনাউত, বৈরূত : মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪২০হি./১৯৯৯খ্রি. খ. ২৮, হাদীস নং-১৭২৬৫’’। হাদীসটির সনদ সহীহ গাইরিহী; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ১৬৮৮।        (চলবে)

কেমন হবে আপনার সন্তান ॥ ননীর পুতুল নয়, হোক সোনার মানুষ

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

সন্তান খোদার তরফ থেকে মা-বাবার জন্য এক স্পেশাল নেয়ামত। পৃথিবীর সব মা-বাবারা সন্তানকে ভালোবাসেন। হর হামেশা স্নেহের চাদর দিয়ে আবৃত করে রাখেন। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য যার পর নাই কষ্ট করেন। সব গ্লানি হাসি মুখে বরণ করে থাকেন মা-বাবারা। সন্তানের আকাশসম চাওয়া-পাওয়া পূরণেও তারা হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে দ্বিদ্বাবোধ করেন না। অলটাইম সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান প্রত্যেক মা-বাবারা। তবে বিবেকের চেয়ে আবেগের মাত্রা যখন বেড়ে যায়, তখনই তাদের আদুরে সন্তান মা-বাবার জন্য কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ননীর পুতুল নয়, সোনার মানুষ যেন হয় প্রতিটি সন্তান। তাই এ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণে প্রত্যেক মা-বাবাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
স্বভাবগতভাবে শিশুরা ইসলামী স্বভাবের ওপরই জন্ম নেয়। কিন্তু বাবা মা বা পরিবারের সদস্যরা যদি ইসলাম থেকে বিচ্যুত থাকে, অনৈসলামী ধ্যান-ধারণা ও চাল-চলনের অধিকারী হয়ে থাকে, তবে শিশু সন্তানরা তাদের সেই ধ্যান-ধারণা ও চাল-চলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে বাবা মা এবং পরিবারের  সদস্যরা যদি ঈমানের অনুসারী হয়, আল্লাহর পথের পথিক হয়, তাহলে তাঁদের সন্তানরা তাদের থেকে ঈমান এবং ইসলামি শিক্ষাই লাভ করবে। সন্তান ঈমানের পথেই তাদের অনুসরণ করবে এমন বাবা মাকেই আল-কোরআন সুসংবাদ দিচ্ছে ‘যারা ঈমান এনেছে আর তাদের সন্তানরাও ঈমানের সাথে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সেসব সন্তানকে (জান্নাতে) তাদের সাথে একত্র করে দেবো আর তাদের আমলের কোনো কমতি আমি করবো না।’ (সূরাহ্ আত্ তূর, ২১)
সুতরাং বাবা-মাকে অন্যান্য দায়িত্ব কর্তব্য পালনের সাথে সাথে সন্তানের আমল-আকিদা ও নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রতি সর্বশেষ নজর দিতে হবে। কাজেই পিতা-মাতাকে সন্তানের ব্যাপারে হুঁশিয়ার হতে হবে। কেননা, সন্তান-সন্ততি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। যেমন-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা জেনে রাখ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ফেতনা বিশেষ। আর কেবল আল্লাহর নিকটই বিরাট পুরস্কার রয়েছে।’ (৮নং সূরাহ্ আল আনফাল, ২৮)
কাজেই সন্তানদের মানুষ করার ব্যাপারে পিতা-মাতাকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।
মুসলিম পরিবারে পিতাই প্রধান অভিভাবক। তাই পরিবারের সকল দায়-দায়িত্ব অভিভাবক হিসেবে তাঁর ওপরই ন্যস্ত মূলত মুসলিম পরিবার পিতার ভূমিকা সর্বাধিক কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি।
১. আযান ধ্বনি শোনানো : শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই শিশুর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত ধ্বনি শোনান। অর্থাৎ আল্লাহর প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। হাদীসে এসেছে, হযরত আবু রাফে (রা.) বলেন,  ফাতেমা (রা.) যখন হুসাইন (রা.) কে প্রসব করলেন, তখন নবী কারীম (সা.) কে তাঁর কানে আযান শোনাতে আমি দেখেছি। (মুসতাদরাকে হাকিম ৪৮২৭)
২. নাম রাখা ও আকীকা করানো : সন্তান জন্মের পর ১ম কিংবা ৭ম দিবসে ইসলাম সম্মত নাম নির্বাচিত করা ও সামর্থ্য অনুযায়ী আকীকা করা। ছেলে সন্তানের সমায়মতো খৎনা করানো। এ মর্মে মহানবী (সা.) এর ঘোষণা, ‘প্রত্যেক নবজাত শিশু তার আকিকার নিকট বন্দি, তার জন্মের সপ্তম দিনে তার নামে পশু জবাই করতে হবে, তার মাথার চুল মুণ্ডন করা হবে এবং নাম রাখতে হবে।’ (ইবনে মাজাহ্ হাঃ ৩১৬৫)
আর আকীকার নিয়ম হলো ছেলে শিশুর জন্য দুটো ছাগল এবং মেয়ে শিশুর জন্য একটি ছাগল জবাই দ্বারাই যথেষ্ট হবে।
৩. পরিচর্যা ও লালন-পালন : হৃদয় নিংড়ানো ঐকান্তিক দরদ, ভালোবাসা ও স্নেহ মমতার কোমল পরশে সন্তানদেরকে অতি যতœ সহকারে প্রতিপালন করা। এ মর্মে আল্লাহর ঘোষণা-‘সন্তান ও জননীর ভরণ- পোষণের ভার পিতার ওপরই ন্যস্ত।’ (২নং সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্, ২৩৩) সন্তানের অধিকার হচ্ছে, অন্ন-বস্ত্র ও তার বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে যতদিন না সে নিজে রোজগারের সমর্থ হবে। আর এটা না করলে গুনাহগার হবে। নবী কারীম (সা.) বলেন, ‘যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কারো ওপর ন্যস্ত থাকে। সে যদি তা যথাযথভাবে পালন না করে তাদের ধ্বংস করে, তাহলে এতেই তার বড় গুনাহ হবে।’ (সুনান নাসায়ী)
অপর এক হাদীসে নবী কারীম (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তি যে অর্থ  ব্যয় করে, তার মধ্য সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে সেটি যা সে ব্যয় করে তার পরিবারবর্গের জন্য।’ (সহীহ মুসলিম ৯৯৪)
৪. জীবনের নিরাপত্তা ও বিকাশ : শিশুসন্তান মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত এবং তাঁর পন্ড হতে পিতা-মাতার নিকট রক্ষতি আমানত। তাই সন্তানের জীবনের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, রোগ মুক্ত রাখা, স্বাস্থ্যবানরূপে গড়ে তোলা এবং জীবনের উন্নতি ও বিকাশকল্পে পিতাকে যথোপযুক্ত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
৫. শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দান : সুসন্তান হচ্ছে- জান্নাত বাগিচার পুষ্পতুল্য। শিশুরাই হচ্ছে উম্মাহর প্রস্ফূটিত ফুল- মানবতার ভবিষ্যৎ। সুতরাং সন্তানের সুশিক্ষাই মুসলিম পিতার সর্বপ্রধান কর্তব্য।
“কারো সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তার জন্য একটি উত্তম নাম রাখবে ও আদব-কায়দা শিক্ষা দেবে। (বায়হাকী ৮২৯৯)
পিতা সন্তানকে সুশিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কোনো দান করতে পারে না। (তিরমিযী হাঃ ১৯৫২)
সাত বছর বয়স হলে তোমরা সন্তানকে সালাতের আদেশ কর। দশ বছর বয়সে প্রয়োজনে শাস্তি দিয়ে সালাত আদায় করাও এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও। (আবূ দাঊদ হাঃ ৪৯৫)
আল্লাহর নবী (সা.) আরো বলেন:
তোমাদের সন্তানদের সম্মান কর এবং তাদের ভালো স্বভাব চরিত্র শিক্ষা দাও। (ইবনু মাজাহ ৩৬৭১)
৬. বিবাহ দেওয়া : সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে পিতা তার বিবাহের ব্যবস্থা করবেন। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন- “সন্তান প্রাপ্ত বয়সে উপনীত হলে বিবাহ দিবে, অন্যথায় কোন পাপে লিপ্ত হলে পিতা দায়ী হবে।”
৭.  বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত কন্যাকে সাদরে গ্রহণ : কোন কারণে কন্যা যদি স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্তা হয় কিংবা বিধবা বা অসহায় অবস্থায় পড়ে তাকে সাদরে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা-আশ্রয় ও ভরণ-পোষণ করবেন। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে যে, “কন্যা যদি তোমার নিকট অসহায় হয়ে ফিরে আসে তবে তার জন্য খরচ করাই তোমার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সদকা।” (ইবনে মাজাহ)
৮.  সন্তানের কল্যাণ কামনা করা : পিতা সর্বদা সন্তানের কল্যাণকামী হবেন এবং তাদের সৎপথে চালাবেন। তাদের জন্য দুআ করবেন। মহানবী (সা.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তোমার সন্তানদের কখনো বদ দু‘আ করো না।’ (সহীহ মুসলিম৩০০৯) মহান আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন, ‘হে প্রভু! তুমি আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানাও। প্রভু দুআ কবুল কর।’ (১৪নং সূরা ইব্রাহীম,৪০)
৯. আদব-কায়দা ও সৌজন্য শিক্ষা : সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সন্তানকে প্রথম থেকে আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়াও মা-বাবার কর্তব্য। মহানবী (সা.) বলেছেন: “সন্তানকে সুশিক্ষা বা আদব-আখলাক শিক্ষা দান করাই সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার।”
১০. ধর্মের পথে পরিচালনা : সন্তানকে ধর্মের পথে, সৎ, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে পরিচালনা করা পিতার অন্যতম কর্তব্য। লুকমান ছিলেন একজন আর্দশ পিতা। তাই তিনি তার পুত্রকে যেভাবে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য উপদেশ ও নির্দেশ দিয়েছিলেন- প্রত্যেক আর্দশবান পিতাকে ঠিক ঐভাবে ধর্মের পথে সন্তানকে পরিচালিত করতে হবে। যেমন পবিত্র কুরআনে বিষয়টি এভাবে এসেছে, ‘হে পুত্র আমার, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই এটি সাহসিকতার কাজ।’ (৩১নং সূরাহ্ আল লুকমান ১৭) মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমার সন্তানকে ৭ বছর বয়সের সময় সালাতের আদেশ দেবে এবং ১০ বছর বয়সের সময় প্রয়োজনে মারবে। (আবূ দাঊদ)
১১. শিরক থেকে দূরে রাখা : সন্তানকে তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং যাবতীয় শিরক থেকে দূরে রাখা পিতার দায়িত্ব। হযরত লুকমান (আ.) যেভাবে তাঁর সন্তানকে শিরকমুক্ত থাকার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনিভাবে সকল পিতার ভূমিকা হওয়া উচিত।  লুকমান (আ) বলেছিলেন আল্লাহর বাণী-‘‘হে বৎস! আল্লাহর সাথে শিরক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মারাত্মক জুলুম।’’ (সূরাহ্ আল লুকমান, ১৩)
১২. বিলাসিতামুক্ত মুক্ত জীবনে অভ্যস্ত করা : সন্তানকে কষ্টসহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। কেননা, সন্তানকে প্রথম থেকে বিলাসিতা ও অলসপ্রবণ করে গড়ে তোলা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হতে পারে। কাজেই মা-বাবাকে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
১৩. বদ-দুআ না করা : মানবশিশু আল্লাহর নেয়ামত। কাজেই কখনো তাদের জন্য বদ দুআ করা উচিত নয়। সন্তান কোনো অন্যায় আচরণ করলে তা শুধরে দেয়াই হচ্ছে মা-বাবার কর্তব্য। তাদের প্রতি বদ দুআ বা অভিশাপ না দেয়ার ব্যাপারে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমার সন্তানদেরকে বদ দুআ করোনা।’ (সহীহ মুসলিম, ৩০০৯)
বরং সবসময় এ দুআই তাদের জন্য করতে হবে যে, ‘‘হে প্রভু আমাদের! তুমি তোমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তান দান কর- যারা আমাদের মনে তৃপ্তি দান করবে। আর আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতৃস্থানীয় বানাও।’’ (সূরা আল ফুরকান,৭৪)
১৪. সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষাদান : সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষার হাতে খড়ি মায়ের ওপরই ন্যস্ত। যেহেতু শিশুরা মায়ের সান্নিধ্যে বেশি থাকে এবং মায়ের সাথে প্রথম কথা বলতে শুরু করে। তাই মাতাই হলেন শিশুর প্রধান তদারক ও গুরু। মায়ের আচরণ, তাঁর কথাবার্তা এমনকি চাল-চলন সবকিছু শিশুর অনুসরণ করে তাই মাকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। শিশুর এ স্তরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় মাতা-পিতা উভয়কেই ইসলামী আদর্শে আদর্শবান হতে হবে এবং শিশুকে সে মোতাবেক গড়ে তুলতে হবে।
১৫. পিতৃহীন সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা : পিতার সাথে মাতাও সন্তানকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সম্ভাব্য সব রকমের সহযোগিতা করবেন। আর দুর্ভাগ্যবশত যদি পিতা মারা যান, তবে মাতাকে এককভাবে এ গুরু-দায়িত্ব পালন করতে হবে। এরূপ ত্যাগ তিতিক্ষা ও গুরু-দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে মহান আল্লাহ মাকে অফুরন্ত পুরস্কার প্রদান করবেন। এমন কি রোজ হাশরে ওই মা মহানবীর (সা.) পাশাপাশি অবস্থান করবেন বলে হাদীসে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।
১৬. পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত করা : সুস্থ-সবল সন্তান গড়ে তোলার জন্য সন্তানের পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দিতে হবে। নিজেকে ও পরিবেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মাকেই সন্তানের পরিষ্কার পরিচছন্নতার সবক দিতে হবে। নিজেদের ঘর-দরজা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।  সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা মায়ের দায়িত্ব। আল কুরআনে এসেছে, ‘‘বলুন! আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেমন সৌন্দর্যমণ্ডিত বস্তু সৃষ্টি করেছেন, কে তা হারাম করে দিতে পারে।’’ (সূরাআল আরাফ,৩২)
১৭. মানসিক গঠন : শিশুর মানসিক বিকাশে মায়ের ভূমিকা সীমাহীন। মা তার সন্তানের মন-মানসিকতা গড়ে তুলতে পারেন। মায়ের উন্নত চিন্তা, রুচি, ভাষা, ভাবধারা, আদব-কায়দা, তাহজিব-তমদ্দুন-কৃষ্টি-সভ্যতা, ঐতিহ্য, আচার-আচরণ ইত্যাদি শিশুর মন-মানস গড়ে তোলার সহায়ক হয়। কাজেই মাকে শিশুর মানসিক গঠন ও বিকাশে উত্তম ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের মধ্যে উন্নত মানসিকতা সৃষ্টি করবেন। সবসময় সন্তানদেরকে আশাবাদী করবেন। কোনো ব্যাপারে নিরাশ হতে দেবেন না। নিয়মিত জান্নাত ও জাহান্নামের জীবন্ত চিত্র তাদের সামনে তুলে ধরবেন। এতে তাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম পরকালের মুক্তি ও পুরস্কারকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। তাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করে তুলবেন। কখনো যেনো তাদের আত্মসম্মানবোধে আঘাত না লাগে, সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন। বৈধ সীমা পর্যন্ত তাদের মানসিক প্রবণতাকে উৎসাহিত করবেন। তাদেরকে পরিকল্পিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে গড়ে তুলবেন। অপসংস্কৃতিক সয়লাব থেকে বেঁচে থাকার মতো তাদেরকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করবেন। তাদের মধ্যে বীরত্ব, দৃঢ়তা অবলম্বনের শিক্ষা দেবেন। এমনভাবে সঠিক জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে স্থির করে দেবেন যাতে আজীবন তারা এর ওপর অটল-অবিচল থাকে। তাদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সৃষ্টি করবেন
১৮. ব্যবহারিক শিক্ষা : দৈনন্দিন অনেক কাজ আছে যা মা শিশুকে সহজে শেখাতে পারেন। নিজেদের ব্যবহৃত কাপড়-চোপড় গোছানো, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, অজু-গোসল করে পাক-সাফ হওয়া ইত্যদি বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিতে পারেন। বিশেষ করে মেয়ে সন্তানকে গৃহস্থালী কাজ-কর্মে অভ্যস্ত করে তোলা, রান্না-বান্না ও অন্যান্য কাজের শিক্ষা দিয়ে সুনিপুণ গৃহিনী করে গড়ে তুলতে পারেন।
১৯. তত্ত্বাবধান : একজন আদর্শ মাতার সবচেয়ে বড় কর্তব্য হচ্ছে তার সন্তানদের তত্ত্বাবধান করা, সন্তানদেরকে সু-মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। মাকেই মমতাময়ীর ভূমিকা নিয়ে সন্তানকে উত্তমরূপে গড়ে তুলতে পারেন। কেননা, ইসলাম মাকে গৃহের দায়িত্বশীলরূপে স্থির করেছে। হাদীসে এসেছে :
আর স্ত্রীরা তার স্বামীর এবং পরিবার পরিজন ও সন্তানদের তত্ত্বাবধায়ক। কাজেই সেও তার দায়িত্ব সামলাতে জিজ্ঞাসিত হবেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং-৭১৩৮)
২০. সবার হাসি-কান্নার সাথি বানানো : আপনার সন্তান যেন হয় সমাজের সব মানুষের হাসি-কান্নার সাথি। শুধু সুখ সাগরে ভেসে শোকার্ত না হয়ে মাঝে মধ্যে তাকে কোর্ট পাড়া, রেল স্টেশন, ডাস্টবিন আর লোকালয় কিংবা গাছতলায় গরীব-দুঃখি জীর্ণ-শীর্ণ থাকা বস্ত্রহীন বা অর্ধনগ্ন শুয়ে মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র দেখান। তাদের প্রতি দয়াদর্শনের সবক দেয়ার চেষ্টা করুন। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যারা মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করে না, আল্লাহ তাআলাও তাঁর প্রতি অনুগ্রহ দেখান না।
২১. বড়দের শ্রদ্ধা করার তালিম দেয়া : বেশক সব মা-বাবারাই বড়দের শ্রদ্ধা করার তালিম দিয়ে থাকেন। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে বড় দ্বারা সমাজে যাদের কোনো ভ্যালু নেই এমন বড়ই বুঝানো হয়েছে। আপনি সমাজের বড় মাপের লোক দু’চার জন কাজের বুয়া বা কাজের লোক সর্বদা প্রস্তুত থাকে আপনার হুকুম তামিল করার জন্য। অথবা রাস্তার পাশে রিকশা-সিএনজি, টমটম ইত্যাদি গাড়ী নিয়ে বসে আছে যে জন তাদের প্রতি কীরূপ ব্যবহার করবে আপনার সন্তান। এটা আপনাকে বলে দিতে হবে। নয়তো বা আপনার সন্তানের ভদ্রতার সীমা থাকবে শুধু আত্মীয়-স্বজন আর মা-বাবার রিলেটিভদের মধ্যে।
সুস্থ পরিবার ও সমাজ গঠনে ইসলাম
সমাজের প্রাণকেন্দ্র হল পরিবার। ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার শুধু একটি উত্তম সামাজিক প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং একটি পবিত্র সংস্থা। পরিবারের সুখ, শান্তি এবং পারস্পরিক সম্পর্ক ছাড়াও রয়েছে একটি আইনগত ও সামাজিক দিক। নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রকৃষ্ট ক্ষেত্র হল পরিবার। সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। পবিত্র আল কোরআনে পারিবারিক সদস্যদের মুহসিনীন বা প্রাচীর ঘেরা দুর্গে অবস্থানকারী সুরক্ষিত লোকজনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ইসলামে পরিবার শুধু স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের পরিসর আরও ব্যাপক। নিকটাত্মীয়স্বজনও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, দয়া, করুণা এবং সহানুভূতি তো আছেই, বাড়তি দায়িত্বশীলতার প্রশ্নও জড়িত। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পূর্ণ সহযোগিতা ও স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধনের ওপর নির্ভর করে পারিবারিক জীবনের সুখ-শান্তি ও সর্বাঙ্গীন উন্নতি; স্বামী-স্ত্রী নিজ নিজ কর্তব্য পালন করে চললে পারিবারিক পরিবেশ অনেকাংশে সুখ ও শান্তিতে ভরে ওঠে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় পরিবারই হল মানুষ গড়ার মূল কেন্দ্র এবং সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি। এ জন্য পরিবার গড়ার ব্যাপারে ইসলাম বিশেষভাবে যতœবান হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। তাই আসুন উপরোল্লেখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণে আমরা সবাই সচেষ্ট হই। আল্লাহ আমাদের সবার সহায় হোন।  আমিন।

বিভিন্ন ধর্মের সংস্কৃতিতে ভোজ উৎসব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

ধর্মের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তিতে আনন্দঘন পরিবেশে খাবার-দাবারের আয়োজন। এ আয়োজনে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা পিছিয়ে নেই। তাদের বড় উৎসবের অন্যতম হলো বড়দিনের আয়োজন। ২৫ ডিসেম্বর ‘বড়দিন’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের খ্রিস্টান সম্প্রদায় আনন্দে মেতে ওঠে এবং ব্যাপক ভোজনের আয়োজন করা হয়। অ্যাভেজনলিক খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুসারে প্রতি শনিবার প্রার্থনার শেষে ভোজের আয়োজন করার রেওয়াজ আছে। বড়দিনের পরের দিন অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর বক্সিং ডে-তেও অনেকেই ঘরে অবস্থান করেন এবং বিত্তবানরা তাদের আনন্দ সমাজের গরিবদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন। এ উপলক্ষেও সামাজিকভাবে খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয়। কোনো কোনো উপদল জিসাসের ক্রোসিফাইড হওয়ার দিনকে স্মরণ করে ডিনারের আয়োজন করে থাকেন। খ্রিস্টপ্রধান দেশে হলোইন ডেসহ খ্রিস্ট ধর্মবিশ্বাসী গৃহে সন্তানের জন্ম ও মৃত্যুর পরও ধর্মীয় নিয়মানুসারে বিভিন্ন আচারের আয়োজন করা হয়।
বলা হয়ে থাকে, হিন্দু ধর্মে ‘বারো মাসে তের পার্বণ’। সন্তান জন্মের পর পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হলেও বাচ্চার মুখে খাবার দেয়ার সময় অন্নপ্রাসন অনুষ্ঠান সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে হিন্দুধর্মে প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মে এবং গরীবদের অন্নদানের ব্যবস্থা এবং মন্দির ও আশ্রমে বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে ধর্মীয়ভাবে খাবারের আয়োজন করা হয়। মৃতদেহের শেষকৃত্যের পর বিদায়ী আত্মার শান্তির জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়। অবতার মনুর মতে, ‘খাদ্য সর্বদাই প্রার্থনার ন্যায়। কেননা এটা শক্তি ও চেতনা দেয়, এর প্রতি অভক্তি সব কিছু নষ্ট করে।’ অবশ্য হিন্দু সমাজে একটি বড় অংশ ভেজিটেরিয়ান হওয়ায় পারিবারিক ও সামাজিক ভোজের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। ভেজিটেরিয়ানদের মতে, ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত কোনো প্রাণী হত্যায় তোমাকে ব্যবহার করো না, মানুষ, প্রাণী কিংবা অন্য যে কোনো কিছু হোক।’
বৌদ্ধ বিশ্বাসে সামাজিকতায় খাবারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। উপমহাদেশের প্রাচীনত্বের উত্তরাধিকারী ও মহামতি বৌদ্ধের প্রবর্তিত ধর্মটির ধর্মীয় আচার অনেকটাই মঙ্ক-এর নেতৃত্বে সম্পন্ন হয়। সন্ন্যাসবাদ ও প্রাণী হত্যাকে নিরুৎসাহিতকারী এ ধর্মের অনুসারীরা অনেকটাই ভেজিটারিয়ান। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রতিদিন তাদের নিজের এবং আশ্রমের জন্য অনুসারীদের কাছ থেকে নিজ ইচ্ছায় ভক্তিসহকারে স্বত্বত্যাগী দান গ্রহণ করেন, যা দিয়ে আশ্রমে জমায়েত ভিক্ষু, ধর্মানুসারীসহ সবাই তাদের প্রয়োজনীয় আহার সম্পন্ন করেন। অবশ্য বিভিন্ন উপদল ও ধারায় বিশ্বাসীরা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে কাজটি সম্পন্ন করেন। জাপানি মঙ্করা নির্দিষ্ট সময়ে ঃধশঁযধঃংঁ আবেদনের মাধ্যমে, আবার বর্তমানের অনেক দেশেই ফড়হধঃরড়হ আবেদন করেন। সারা বছরই বিভিন্ন পর্বে ও অনুষ্ঠানাদিতে খাবারের ব্যবস্থা থাকে, এসব পর্ব অবশ্য দল, উপদল অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন। মহায়ানা ও দেরাবাদা ধারার অনুসারীদের অনেকেই ভোজের সময় রসুন, পেঁয়াজ ও ঝাঁঝ জাতীয় ‘পঞ্চ ঝাঁঝ’ পরিত্যাগ করেন। আর খাবারের পূর্বে পাঁচটি বিষয় দৃঢ়চিত্তে স্মরণ করেন। ১. খাবার যিনি দিয়েছেন ২. খাবারের ব্যাপারে ধ্যানগত চুক্তির দৃষ্টি ৩. আত্মিক ধ্যান, যা হিংসা, ক্রোধ ও প্রবঞ্চনা থেকে রক্ষা করে ৪. উত্তম খাবার, যা শরীর ও মনকে পবিত্র করে এবং ৫. জীবনধারায় ধর্মীয় চেতনা অব্যাহত রাখা।
বিয়েশাদি উপলক্ষে আমাদের সমাজে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে। তার মধ্যে একমাত্র বিবাহবন্ধন সমাপনান্তে পাত্রের পক্ষ থেকে ওলিমা নামক যে অনুষ্ঠানটি করা হয়, তা সরাসরি ইসলামী সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে। ওলিমার অনুষ্ঠানটি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভোজ অনুষ্ঠান। রাসূলুল্লাহ (সা.) হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের (রা.) বিবাহের খবর জানতে পেরে তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি একটি বকরি দিয়ে হলেও ওলিমা করো।’ (বোখারি, মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের বিবাহেও ওলিমা করেছেন। জয়নব (রা.) এর সঙ্গে সম্পাদিত বিবাহে তিনি একটি বকরি জবাই করে ওলিমা করেছিলেন।
দাম্পত্য জীবনে নতুন সন্তানের আগমনে কোরবানির মতো কোনো পশু জবাই করে আকিকা নামক অনুষ্ঠান তো সন্তানের নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী রীতি। এক্ষেত্রে ভোজ অনুষ্ঠানটি একটি উত্তম কাজ, পালনীয় সুন্নত।
খাৎনা উপলক্ষে কেউ যদি মেহমানদারির আয়োজন করে, তা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবন থেকে প্রাপ্ত না হলেও অধিকাংশ মাজহাবের ইমাম কর্তৃক সমর্থিত। অনুরূপ কোনো বিশেষ সফর থেকে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক মেহমান ভোজের ব্যবস্থা করার কথা বর্ণিত আছে। আর শিক্ষাগত কোনো স্তরে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে কখনও কখনও যে মেহমান খাওয়ানোর রীতি দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগে এরূপ অনুষ্ঠান ছিল কোরআন হিফজ করার ক্ষেত্রে। তখন কারও সন্তান কোরআন হিফজ করলে সামর্থ্যানুযায়ী বকরি জবাই করে মেহমানদারির আয়োজন করা হতো। এছাড়া কোনোরূপ সুসংবাদে, খুশির প্রেক্ষাপটে এবং শুভ সূচনায় মেহমানদারির আয়োজনও ইসলাম সমর্থিত। মূলত ইসলামে যেসব ভোজ অনুষ্ঠানের প্রতি উৎসাহ বা অনুমতি দিয়েছে, তার প্রতিটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যই হলো সজ্জনদের সঙ্গে আনন্দের ভাগাভাগি করা। বিবাহোত্তর যে অনুষ্ঠানকে আমরা ওলিমা বলি তার তাৎপর্যগত অর্থও তাই। এজন্য আরব সমাজে সব ধরনের ভোজ অনুষ্ঠানকে ঢালাওভাবে ওলিমা বলে। কমিউনিটি সেন্টারের নামকে মারকাজুল ওলায়েম বলে।
এজন্য কোনো ব্যক্তির মৃত্যু উপলক্ষে বিয়েবাড়ির আয়োজনের মতো কোনো অনুষ্ঠান ইসলামে উৎসাহিত করা হয়নি। কেবল সওয়াবের আমল হিসেবে মিসকিনদের আহার করানো বা কিছু মেহমানকে কোনো কোনো সময় আপ্যায়ন করার বিধান রয়েছে। তা দোয়া বা কোরআন খতমের মতো আমলের সঙ্গে না করা ভালো। কারণ এক্ষেত্রে আমলের বিনিময়ে খাদ্যদান কিংবা গ্রহণের ব্যাপারটা সরাসরি প্রকাশ পায় বা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাস্তবে দেখা যায়, মৃত ব্যক্তির জন্য কোনো আমলের আয়োজনের সঙ্গে কোনোরূপ আহারের আয়োজন না থাকলে লোক সমাগমেও দৈন্যতা প্রকাশ পায়।
এবার আসা যাক অনুষ্ঠান আয়োজনের বিধান সম্পর্কে। এক্ষেত্রে ইসলাম কতগুলো নীতিমালা বেঁধে দিয়েছে, যার মধ্যে নেতিবাচক দিকে রয়েছে অপচয়, বাহুল্য, রেওয়াজ-রুসুম ও লৌকিকতা বর্জন। এর প্রতিটি বিষয়ে ইসলামে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ অপচয়ের কথা বলা যায়, অপচয়কারীকে কোরআনে সূরা আম্বিয়ায় শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। এছাড়া গান বা রঙ্গ-রসের আসর, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মেয়েদের সৌন্দর্য প্রদর্শন, ছেলেমেয়েদের উচ্ছৃঙ্খলতা ও বেহায়া-বেহেল্লাপনাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বলা বাহুল্য, নৈতিক অবক্ষয়ের যেসব কর্মকান্ড সমাজে বাসা বাঁধে, এ ধরনের অনুষ্ঠান থেকেই বেশিরভাগ ক্ষেতে তার সূত্রপাত ঘটে থাকে। অনুরূপভাবে মদের মতো কোনো হারাম উপাদান বা সুদ-ঘুষের মতো কোনো অবৈধ উপার্জনের উপাদানের মাধ্যমে আয়োজিত ভোজ ব্যবস্থাও ইসলামে সর্বৈব নিষিদ্ধ। ধনী-গরীবের তারতম্য তা যে কোনো উপায়ে হোক না কেন, ইসলাম তা সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি বাণীতে বলা হয়েছে, নিকৃষ্টতম ভোজ হলো যেখানে দরিদ্রদের পরিহার করা হয়। (বোখারি, মুসলিম)।
অপরদিকে ইতিবাচক দিকে রয়েছে, মেহমানদারিতে মেহমানদের সম্মান রক্ষা করা। হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে সে যেন মেহমানকে সম্মান করে। সুতরাং মেহমান খানায় মেহমানদের জন্য সাধ্যানুযায়ী সম্মানজনক খাবারের আয়োজন করা যাতে তৃপ্তির কারণে আনন্দের প্রতিফলন ঘটে।
অনুরূপ আমন্ত্রিত মেহমানদের ক্ষেত্রেও ইসলামের সুস্পষ্ট বিধানের মধ্যে রয়েছে, বিবাহোত্তর ওলিমার দাওয়াতে কোনোরূপ ওজর বা বেশরিয়তি কাজের আশঙ্কা না থাকলে দাওয়াত রক্ষা করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পক্ষ থেকে অনেক শক্ত বাণী রয়েছে, এর মধ্যে একটি হলো যে ওলিমার দাওয়াত পেয়ে উপস্থিত হলো না, সে আল্লাহ ও রাসূলের নাফরমানি করল। (বোখারি)। এমনকি রোজা আদায় অবস্থায় হলেও উপস্থিত হয়ে দোয়া করে আসতে হবে। আর নফল রোজা হলে রোজা ভেঙে দেয়াকে উত্তম গণ্য করা হয়েছে। দাওয়াত পেলে যেমন রক্ষা আবশ্যক, তেমনি বিনা দাওয়াতে হাজির হওয়াও গর্হিত। আবার মেহমানকে যেমন ভালো খাওয়ানোর মাধ্যমে খুশি করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি ভালোভাবে তৃপ্তিসহ খেয়েও মেজবানকে আনন্দ দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তবে কোনোভাবে মেজবানকে বেকায়দায় ফেলা, তাচ্ছিল্য প্রকাশ পায় বা বিরক্তির কারণ হয় এমন আচারণ করা থেকেও নিবৃত্ত থাকতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে হজরত জয়নব (রা.) এর সঙ্গে বিবাহ উপলক্ষে রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক আয়োজিত ওলিমা প্রসঙ্গে আল কোরআনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে ঈমানদাররা! নবীগৃহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো না, খাবার সময়ের অপেক্ষায়ও থেকো না। হ্যাঁ, যদি তোমাদের খাবার জন্য ডাকা হয়, তাহলে অবশ্যই এসো কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলে চলে যাও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। তোমাদের এসব আচরণ নবীকে কষ্ট দেয় কিন্তু তিনি লজ্জায় কিছু বলেন না এবং আল্লাহ হক কথা বলতে লজ্জা করেন না।’ (সূরা আহজাব : ৫৩)।
জয়নব (রা.) এর বিবাহের ওলিমা : রাসূল (সা.) যখন জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.) কে বিবাহ করেন, তখন তিনি ওলিমা অনুষ্ঠান করেন। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, নবী (সা.) রুটি ও গোশত দ্বারা জয়নব বিনতে জাহাশের ওলিমা করেন। আমাকে খাওয়ার জন্য লোকজনকে ডাকতে পাঠানো হলো, এরপর একদল করে লোক আসে ও খাওয়া-দাওয়া করে বের হয়ে যায়। আমি লোকজন ডাকতে থাকি, এমনকি আর কোনো লোক ডাকতে বাকি ছিল না। (বোখারি)।
সাফিয়া (রা.) এর বিবাহোত্তর ওলিমা : রাসূল (সা.) সাফিয়া (রা.) এর বিবাহের পরও ওলিমা করেন। আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) খায়বর ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থানে তিন রাত অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সাফিয়া (রা.) এর সঙ্গে বাসর করেন। অতঃপর আমি মুসলমানদের তার ওলিমা অনুষ্ঠানে ডাকি। এ ওলিমাতে কোনো রুটি বা গোশত ছিল না। বরং দস্তরখানা বিছানোর নির্দেশ দেয়া হলো। অতঃপর তিনি দস্তরখানায় খেজুর, পনির ও মাখন রাখলেন। এগুলো দিয়ে তার এ ওলিমা হলো। (বোখারি : ৫০৮৫)।
জাবের (রা.) এর বাড়িতে : জাবের (রা.) বলেন, খন্দক যুদ্ধের সময় আমি রাসূল (সা.) এর কাছে এলাম এবং তাকে চুপিসারে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আমরা একটা ছোট ছাগল জবাই করেছি এবং সামান্য পরিমাণ যবের রুটি তৈরি করেছি। আপনারা কিছু লোক আসুন। তখন নবী (সা.) যুদ্ধরত উপস্থিত সব সাহাবিকে ডাকলেন, তারা সংখ্যায় ছিলেন ১ হাজার। তারা সবাই তৃপ্তি সহকারে খেলেন। (বোখারি : ৪১০২)।
আবু তালহার বাড়িতে : আবু তালহা (রা.) রাসূল (সা.) কে দাওয়াত করলেন। রাসূল (সা.) এর সঙ্গে ৭০ বা ৮০ জন সাহাবি ছিলেন। তিনি সবাইকে নিয়ে তার বাড়িতে গেলেন। ১০ জন করে লোক বাড়িতে প্রবেশ করলেন এবং খাওয়া সেরে চলে যেতে লাগলেন। এভাবে সবাই তৃপ্তি সহকারে খেলেন। (বোখারি : ৩৫৭৮)।
খায়বর যুদ্ধের সময় : সুয়াইদ ইবনে নোমান (রা.) বলেন, আমরা খায়বার অভিমুখে রওনা হলাম। এরপর সাহাবা নামক স্থানে পৌঁছলাম। রাসূল (সা.) খাবার নিয়ে আসতে বললেন। তখন তাঁর সামনে শুধু ছাতু পেশ করা হলো। এরপর আমরা তা খেলাম। (বোখারি : ৫৩৮৪)।
আবু শুয়াইব (রা.) এর বাড়িতে : আনসার সাহাবি আবু শুয়াইবের গোশত বিক্রেতা গোলাম খাবারের আয়োজন করলেন এবং রাসূল (সা.) সহ পাঁচজনকে দাওয়াত করলেন। (বোখারি : ৫৫৩৪)।
ইহুদি মহিলার দাওয়াত : খায়বরের এক ইহুদি মহিলা বিষ মিশিয়ে একটি ছাগল ভুনা করল। এরপর তা রাসূল (সা.) কে হাদিয়া দিল। রাসূল (সা.) এবং কয়েকজন সাহাবি তা খেলেন। (আবু দাউদ : ৪৫১০)।
তাবুক যুদ্ধের সময় : তাবুক যুদ্ধের দিন সাহাবারা প্রচন্ড ক্ষুধার্ত হলেন। ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি লোকদের তাদের অবশিষ্ট খাবার আনতে বলুন। এরপর আল্লাহর কাছে বরকতের জন্য দোয়া করুন। রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, তখন তিনি একটি দস্তরখানা বিছাতে বললেন। এরপর লোকরা তাদের অবশিষ্ট খাবার আনল। এরপর রাসূল (সা.) বরকতের দোয়া করলেন। তারা সবাই পরিতৃপ্তি সহকারে খেল ও তাদের পাত্র ভরে নিল। (মুসলিম : ৪৫)।
এক মৃত সাহাবির বাড়িতে : এক আনসার সাহাবি বলেন, আমরা রাসূল (সা.) এর সঙ্গে এক জানাজায় গেলাম। জানাজা শেষে মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি দাওয়াত করল। তিনি দাওয়াত কবুল করলেন। আমরা তার সঙ্গে ছিলাম। এরপর খাবার নিয়ে আসা হলো। তখন তিনি খাবারে হাত দিলেন। এরপর লোকজনও হাত দিল। লোকরা খেল। কিন্তু আমরা রাসূল (সা.) কে দেখলাম তিনি একটি লোকমাই মুখে চিবাচ্ছেন। তিনি বললেন, আমার মনে হচ্ছে এটা এমন এক ছাগলের গোশত যা তার মনিবের অনুমতি ছাড়াই নেয়া হয়েছে। এরপর ঘটনার সত্যতা পেলে রাসূল (সা.) বললেন, এ খাবার বন্দিদের খাওয়াও। (আবু দাউদ : ৩৩৩২)।
আনসারি সাহাবির বাড়িতে : রাসূল (সা.), আবু বকর, ওমর (রা.) তিনজনে ক্ষুধার্ত অবস্থায় এক আনসারি সাহাবির বাড়িতে গেলেন। সাহাবি তখন বাড়িতে ছিলেন না। সাহাবির স্ত্রী তাদের স্বাগত জানালেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, অমুক (সাহাবি) কোথায়? স্ত্রী বললেন, তিনি আমাদের জন্য পানি আনতে গেছেন। এমন সময় আনসারি এলেন। তিনি রাসূল (সা.) ও তার সঙ্গীদের দেখে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! আজ আমার থেকে সম্মানিত মেহমান কারও নেই। তিনি একটি খেজুরের কাঁদি আনলেন এবং বললেন, আপনারা এগুলো খান এবং ছুরি নিলেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন, দুধাল ছাগল থেকে বিরত থাকবে। এরপর আনসারি ছাগল জবেহ করলেন। তারা ছাগলের গোশত ও খেজুর খেলেন এবং পানি পান করলেন। যখন পরিতৃপ্ত হলেন তখন রাসূল (সা.) আবু বকর ও ওমরকে বললেন, ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই এ নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (মুসলিম : ২০৩৮)। ইসলামিক দৃষ্টিতে খানাপিনা শুরু এবং শেষে নিম্নলিখিত কার্যাদি বাংলায় আলোচনা করা হলো-
* খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলবে : ওমর ইবনে আবু সালামাহ (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমাকে বললেন বিসমিল্লাহ বলো এবং ডান হাতে খাও। (বোখারি : ৫৩৭৬)।
* শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে : আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন কেউ খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে সে যেন বলে বিসমিল্লাহি আউয়ালাহু ওয়া আখিরাহু খাওয়ার শুরু ও শেষ সর্বাবস্থায় আল্লাহর নাম। (আবু দাউদ : ৩৭৬৭)।
* খাওয়া শেষ করে বলবে : আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) যখন খাওয়া শেষ করতেন তখন বলতেন আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আতয়ামানা ওয়া সাকানা ওয়া জায়ালানা মুসলিমিন সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের পানাহার করিয়েছেন এবং আমাদের মুসলমান বানিয়েছেন। (আবু দাউদ : ৩৮৫০)।
* দুধ পানের সময় বলবে : ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন তোমাদের কাউকে দুধ পান করতে দেয়া হলে সে যেন বলে আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিহি ওয়া জিদনা মিনহু হে আল্লাহ! আমাদের জন্য দুধে বরকত দান করুন এবং আমাদের দুধ বাড়িয়ে দিন। (আবু দাউদ : ৩৭৩০)।
* খাবার সামনে এলে বলবে : আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিমা রাজাকতানা ওয়াকিনা আজাবান্নার হে আল্লাহ! আপনি আমাদের যে রিজিক দান করেছেন তাতে বরকত দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। (তাফসিরে ছায়ালাবি)।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা:)’র কৌশল

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
খ. মদীনার সনদ : কাফির-মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় স্থায়ীভাবে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে মদীনায় বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মালম্বী বিশেষত ইয়াহুদীদের সাথে তিনি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন, যা ইতিহাসে মদীনার সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গধফরহধ) নামে খ্যাত। “নুরুল ইসলাম মানিক সম্পাদিত, সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম, প্রবন্ধকার: ড. মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ ও মোহাম্মদ আতীকুর রহমান, প্রবন্ধ: সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামের ভূমিকা, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৫, পৃ. ১১৪।” নবী করীম (সা.) এর পক্ষ থেকে কুরাইশী, মদীনাবাসী, তাদের অধীনস্থ এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্টদের এবং জিহাদে অংশগ্রহণকারী মু‘মিন ও মুসলিমদের মধ্যে সম্পাদিত এ অঙ্গীকারনামায় সন্ত্রাস প্রতিরোধক যে ধারাগুলো ছিলো তা নিম্নরূপ:  ১। যারা বাড়াবাড়ি করবে, সকল সত্যনিষ্ঠ মুসলিম তাদের বিরোধিতা করবে। ঈমানদারদের মধ্যে যারা জুলুম অত্যাচার, পাপ, দাঙ্গা-হাঙ্গমা বা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে, সকল মু‘মিন তাদের বিরোধিতা করবে। ২। মু‘মিনরা সম্মিলিতভাবে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে থাকবে। অন্যায়কারী কোন মু‘মিনের সন্তান হলেও এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না। ৩। কোন ব্যক্তি যদি কোন মু‘মিনকে হত্যা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এর পরিবর্তে তার কাছ থেকে কিসাস আদায় করা হবে। অর্থাৎ হত্যার অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তাকেও হত্যা করা হবে। তবে যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে হত্যাকারী ক্ষতিপূরণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে কিসাস করা হবে না। ৪। কোন হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী বা বিদ’আতীকে সাহায্য করা মু‘মিনের জন্য বৈধ বিবেচিত হবে না। অশান্তি সৃষ্টিকারী কোন ব্যক্তিকে কেউ আশ্রয় দিতে পারবে না। যদি কেউ আশ্রয় দেয় বা সাহায্য করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। ইহলৌকিক জীবনে তার ফরয ও নফল ইবাদাত কোনটাই কবুল হবে না। “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৬-১৯৭”
গ. সন্ত্রাসীদের শাস্তিদান : সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা.) সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। কারণ তিনি জানতেন সন্ত্রাসকে অঙ্কুরেই নির্মূল করা না হলে তা ক্রমেই সমাজ-রাষ্ট্র ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌছবে। তখন ইচ্ছা হলেই তা আর নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যেমন অবস্থা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। তাই দূরদর্শী বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে সন্ত্রাসকে সমূলেই নির্মূল করেছিলেন। নিম্নের ঘটনাটি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: “উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে) মদীনায় এলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী (সা.) তাদেরকে (সদকার) উটের নিকট যাওয়ার এবং পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। অতঃপর তারা যখন (উটের পেশাব ও দুধ পান করে) সুস্থ হলো তখন নবী (সা.) এর রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এ সংবাদ দিনের প্রথম ভাগেই (তাঁর নিকট) এসে পৌছল। তারপর তিনি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বাড়লে তাদেরকে পাকড়াও করে আনা হলো। অতঃপর তাঁর আদেশে তাদের হাত পা কেটে দেয়া হলো। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুটিয়ে দেয়া হলো এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদের নিক্ষেপ করা হলো। এমতাবস্থায় তারা পানি প্রার্থনা করছিল কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। আবূ কিলাবাহ (র.) বলেন, এরা চুরি করেছিল, হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, ঈমান আনার পর কুফরী করেছিল এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল”। “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আল-উযূ, অনুচ্ছেদ: আবওয়াবুল ইবিলি ওয়াদ- দাওয়াব্বি ওয়াল-গানামী ওয়া মারাবিযিহা,প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২১।”
ঘ. সন্ত্রাসীদের উৎখাতকরণ : দেশ থেকে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাস নির্মূলের প্রয়োজনে মহানবী (সা.) কখনও সন্ত্রাসীদেরকে গোষ্ঠীসহ উৎখাত করেছিলেন। ইয়াহুদী গোত্র বানূ নাযীর মহানবী (সা.) কে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পর মহানবী (সা.) তাদেরকে তাদের আবাসস্থল থেকে উৎখাত করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মদীনাকে সন্ত্রাসমুক্ত করেন। ঘটনাটির বিবরণ হলো: “সাহাবী আমর ইবনে উমায়্যা আদ-দামরী (রা.) বানূ ‘আমিরের দু’জন লোককে ভুলবশত শত্র“পক্ষ মনে করে হত্যা করেন। প্রকৃত ব্যাপার হল, বানূ ‘আমিরের সাথে মহানবী (সা.) এর মৈত্রীচুক্তি ছিল। ফলে মহানবী (সা.) তাদেরকে ‘রক্তপণ’ দিতে মনস্থ করেন। আর এ কাজে সহযোগিতা ও মধ্যস্থতা করার জন্য তিনি ইয়াহুদীদের সবচেয়ে বড় গোত্র বানূ নাযিরের নিকট যান। তাদের ব্যবসা ছিল মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে উপকণ্ঠে। বানূ ‘আমিরের সাথে বানূ নাযীরেরও মৈত্রীচুক্তি ছিল। বানূ নাযিরের লোকজন মহানবী (সা.) কে দেখে আনন্দ প্রকাশ করে বরং তাঁর সাথে প্রথমত খুবই ভাল ব্যবহার করে। তারা এ ব্যাপারে তাঁকে সহযোগিতার পূর্ণ আশ্বাস দেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। মহানবী (সা.) তাদের একটি দেয়াল ঘেঁষে বসে ছিলেন, তাঁর সাথে আবূ বকর, ওমর ও আলী (রা.) প্রমুখ দশজন সাহাবীও ছিলেন। বানূ নাযীরের লোকজন নিজেদের মধ্যে সলা-পরামর্শ করতে লাগলেন যে, এমন মোক্ষম সুযোগ আমরা আর কখনো পাব না। আমাদের কেউ যদি ঘরের ছাদে উঠে তাঁর মাথার উপর একটি ভারী পাথর ছেড়ে দেয় তাবে আমরা চিরতরে তার হাত থেকে নি®কৃতি পাব। আমার ইবন জাহহাশ ইবন কা’ব নামে তাদের এক লোক বলল, আমি এ কাজের জন্য প্রস্তুত। এই বলে সে ঠিকই মহানবী (সা.) এর উপর পাথর ছেড়ে দেয়ার জন্য সবার অলক্ষ্যে ঘরের ছাদে উঠে গেল। তখনই মহান আল্লাহ মহানবী (সা.) কে ওহী মারফত এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানবী (সা.) সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং কাউকে কিছু না বলে সোজা মদীনায় চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা সাহাবীগণও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। অতঃপর মদীনা থেকে আগত এক ব্যক্তিকে পেয়ে তাকে মহানবী (সা.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলল, আমি তাঁকে মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। অতঃপর তাঁরা মদীনায় এসে মহানবী (সা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি তাদেরকে ইয়াহুদীদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানালেন এবং সকলকে রণপ্রস্তুতি নিয়ে তাদের মোকাবিলা করার জন্য বের হবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) কে মদীনার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে তিনি সেনা সমভিব্যবহারে বানু নাযীরের বসতিতে পৌঁছেন। সেখানে পৌঁছে তিনি তাদেরকে চর্তুদিকে থেকে অবরোধ করেন। ছয়দিন অবরোধ করার পর তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য তাদের খেজুর গাছ কেটে ফেলেন এবং বাগান জ্বালিয়ে দেন।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আত-তাফসীর, অনুচ্ছেদ : মাকতা’তুম মিন লিনাতিন, প্রাগুক্ত, খ.৪, পৃ. ১৪৭৯।” তখন মহানবী (সা.) এর সমর্থনে আয়াত নাযিল হয়। “তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ এবং যেগুলো কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; তা  এজন্য যে, আল্লাহ পাপচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন”। “আল-কোরআন, ৫৯: ০৫।”
মূলত সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে যুদ্ধকৌশল হিসাবে এ ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। অবশেষে বানূ নাযীরের মনে মহান আল্লাহ ভীতির সঞ্চার করে দিলেন। তারা নিজেদেরই প্রস্তাব দিয়ে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবার পথ বেছে নিল। অন্যত্র গিয়ে যাতে তারা আবার সন্ত্রাস করতে না পারে সেজন্য মহানবী (সা.) তাদেরকে সাথে করে অস্ত্র নিয়ে যেতে দেন নি। শুধুমাত্র নিজেদের উটের পিঠে করে যে পরিমাণ মালপত্র নেয়া যায় সে পরিমাণই নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এ আদেশ এত কঠোর ছিল যে, তিলতিল করে গড়ে তোলা নিজেদের ঘরবাড়ি তাদের নিজেদের হাতেই ভেঙ্গে ফেলতে হল। আর তার যতটুকু পারা যায় ততটুকু সাথে নিয়ে অবশিষ্ট আসবাবপত্র ছেড়ে যেতে হল। তাদের কতক খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করে, আর কতক চলে যায় সিরিয়ায়। ফলে মদীনা মুনাওয়ারা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অভিশপ্ত ইয়াহুদীদের এ গোত্রটির কুটির ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের হাত থেকে রেহাই পায়।
ঙ. সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান : সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহানবী (সা.) প্রয়োজন হলেই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আভিযান পরিচালনা করতেন। এমনই একটি অভিযান তিনি তৃতীয় হিজরীর আউয়াল মাসে মদীনার নিকটবর্তী যু’আমর নামক স্থানে মুসলিমদের পরাজিত ও নি:শেষ করার দৃঢ় সংকল্পে একত্রিত বনী ছা’লাবা এবং বনী মুহারিব গোত্রদ্বয়ের এক বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু সন্ত্রাসীরা মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদে ছত্রভঙ্গ হয়ে আশেপাশে পাহাড়গুলোতে আত্মগোপন করে। রাসূল (সা.) তাঁর অভিযান অব্যাহত রাখেন এবং সৈন্যবাহিনীসহ সন্ত্রাসীদের অবস্থানস্থল পর্যন্ত গমন করেন এবং কিছু দিন সেখানে অতিবাহিত করে মদীনায় ফিরে আসেন। অধ্যাপক “এ.টি.এম. মুছলেহ উদ্দীণ ও অন্যান্য সম্পাদিত, সীরাত বিশ্বকোষ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৩, খ. ৬, পৃ. ৪৭৫-৪৭৬:” “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৭”
এই অভিযানের পর পরই মুহারিব গোত্র সন্ত্রাসের পথ পরিহার করে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে চলে এসেছিল। তবে ছা’লাবা গোত্র এর পরও কিছু দিন ধরে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ অব্যাহত রাখে। এর ফল হিসাবে ৬২৬-৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে আরো ৫টি অভিযান প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যাতুর রিকার বিরুদ্ধে মহানবী (সা.) এর নেতৃত্ব পরিচালিত অভিযান। পঞ্চম হিজরীর মুহাররম মাসে পরিচালিত এই অভিযান যাতুর রিকাহ গোত্রের অবাধ্যতামূলক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে এক বিরাট নিবৃত্তকারী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরপর থেকে মহানবী (সা.) এর বিরুদ্ধে ছা’লাবার তীব্র বিরোধিতার অবসান ঘটে। এবং সপ্তম হিজরীর শেষ নাগাদ ছা’লাবা গোত্রের মধ্যে ইসলামের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিলো। ড. মুহাম্মদ ইয়াসীন মাযহার সিদ্দিকী, রাসূল (সা.) এর সরকার কাঠামো, অনুবাদ, “মুহাম্মদ ইবরাহীম ভূঁইয়া, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৪, পৃ. ৩০-৩১”
এভাবে মহানবী (সা.) তাঁর সমগ্র মাদানী জীবনে দেশী ও বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাত থেকে সমসাময়িক মদীনা কেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্রের এবং পরবর্তীকালের সমগ্র আর উপদ্বীপকে সন্ত্রাসমুক্ত করে সন্ত্রাস নির্মূলে বিশ্ববাসীর সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে যান। সন্ত্রাস নির্মূলে তাঁর কার্যক্রমের উপর আত্মবিশ্বাস থেকে তিনি ঘোষণা দিয়ে যান যে, এমন একদিন আসবে যেদিন একজন আরোহী একাকী সানআ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে এবং সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে (কোন সন্ত্রাসীকে) ভয় পাবে না।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী অধ্যায়: ফাযায়িলুস সাহাবা, অনুচ্ছেদ: মা লাকিয়ান নাবিয়্যি স. ওয়া আসাহাবুহু মিনাল মুশরিকীনা বি মাক্কাতা, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৩৯৮”
এ প্রবন্ধে সন্ত্রাস প্রতিরোধে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা ও রাসূল সা. এর কার্যক্রম বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক সাম্য ও অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় সহনশীলতা বৃদ্ধি, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি রোধ, আদর্শ সমাজ গঠন, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। আর ইসলামী দন্ডবিধি প্রতিষ্ঠা সন্ত্রাসসহ যে কোন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বর্তমান সৌদি আরব। সেখানে ইসলামী দন্ডবিধি কার্যকর থাকায় অপরাধের হার সারাবিশ্বের চেয়ে অনেক নিচে। “মোহাম্মাদ আলী মনসুর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস, ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক ল‘রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার, ২০১০, পৃ:২০”
উপসংহার : বিশ্ববাসী ইসলামের ব্যাপক আবেদন থাকা সত্ত্বেও হিংসা ও স্বভাবজাত শত্র“তাবশত অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা বিশেষ করে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা ইসলাম ও মুসলিমদের নামে অন্যান্য নানা কুৎসা রটাচ্ছে। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ইসলাম ও এর অনুসারীরা ইসলাম বিরোধীর নিকট থেকে যেসব ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে বর্তমান সন্ত্রাসকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টাও সেসবের অন্যতম। একদিকে ইহুদী-খ্রিষ্টান- পৌত্তলিকদের ষড়যন্ত্র অপরদিকে জন্মগতভাবে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি, এ দুয়ে মিলে ইসলাম আজ পৃথিবীতে ভুলবোঝা ধর্মে” (ঞযব গরংঁহফবৎংঃড়ড়ফ জবষরমরড়হ) পরিণত হয়েছে, মেযনটি বলেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ মুহাম্মদ কুত র.। ”গঁযধসসধফ  ছঁঃয, ওংষধস-ঞযব গরংঁহফবৎংঃড়ড়ফ জবষরমরড়হ, কঁধিরঃ: ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ওংষধসরপ ঋবফধৎধঃরড়হ ড়ভ ঝঃঁফবহঃ ঙৎমধহরুধঃরড়হং, ১৪০১ অ.ঐ./১৯৮১ অউ. তবে আশার কথা, মুসলিমরা এখন ধীরে ধীরে তাদের অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করার চেষ্টা শুরু করেছে। সন্ত্রাসের সাথে যে ইসলামের কোন রকম সম্পর্ক নেই সে কথা উপযুক্ত আলোচনায় কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়েছে। ইসলামের অবস্থান কোরআন, হাদীস ও রাসূল (সা.) এর জীবনাদর্শে চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে। কোরআন, হাদীস ও রাসূল (সা.) এর জীবনাদর্শ দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে ইসলামের সাথে সন্ত্রাসের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং চরম বিরোধী। শান্তিকে বিঘিœত করে এমন কোন কর্মকান্ডকে ইসলাম সমর্থন করে না, উপরন্তু বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের চিরন্তন নীতি। ইসলাম স্বভাবগত কারণেই কখনো সন্ত্রাসে বা বিশ্বশান্তি নষ্ট করে এমন কর্মে উৎসাহ, সমর্থন, অনুমোদন দেয় না। মুসলিম কখনো সন্ত্রাসী হতে পারে না। তাছাড়া গুটিকতক তথাকথিত মুসলিমের কর্মবিচার করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ধর্ম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধিন ইসলামকে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃকক্ত করা কখনোই  উচিত নয়।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট, পাঠানপাড়া (খান বাড়ি), কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১।                          (সমাপ্ত)

পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে মানবতাবাদ : একটি পর্যালোচনা

আফতাব চৌধুরী

মানবতাবাদ বর্তমান বিশ্বে এক বহুচর্চিত বিষয়। সমগ্র বিশ্বজুড়ে আজ মানবতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত। মানবাধিকার সংস্থাসমূহ বোধ হয় পৃথিবীর সকল দেশে নিজেদের জাল বিস্তার করে আছে। কিন্তু তবুও পদে পদে মানবতা লুণ্ঠিত, অবহেলিত, অপমানিত।
এখন প্রশ্ন হল মানবতা কী ? মানবতাবাদই বা কী ? আর মানবাধিকার বলতে কী ধরনের অধিকারকে বোঝায়? কেন বিশ্বজুড়ে বারবার মানবতা লুন্ঠিত হচ্ছে? বর্তমান বিশ্বে ধর্মের তো খরা চলছে না, বরং বলা যায় বাড়বাড়ন্ত। তবুও হত্যা, অপহরণ, লুন্ঠন, ব্যভিচার, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গোষ্ঠী সংঘর্ষ, সন্ত্রাসী আক্রমণ, কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতিতে সর্বত্র দুর্নীতি ইত্যাদি অমানবিক কর্মকান্ড অব্যাহত থাকায় মানবতাবাদে বিশ্বাসী মানুষের আজ নাভিশ্বাস উঠছে।
মানবতা হলো মানুষের বিশেষ গুণাবলী যার সুবাদে মানুষ, পশুপক্ষী ও অন্যান্য ইতর প্রাণীসমূহ থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরিচিত। মানুষ হিসেবে জন্ম হলেই যে কোনও ব্যক্তি মানবিক গুণসম্পন্ন নাও হতে পারে। কারণ মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করার জন্য যে অধ্যবসায়ের প্রয়োজন, তা হয়ত সঠিকভাবে অনেকের ভাগ্যে জোটে না। সাধারণত মানবতা বলতে আমরা বুঝি এক মানুষের প্রতি আরেক মানুষের সহানূভূতি, সহমর্মিতা, বিপদে আপদে একজন আরেকজনের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করা, দীন-দুঃখী, বিকলাঙ্গদের সাধ্যমত সাহায্য করা ইত্যাদি। এককথায় মানুষের প্রতি মানুষের থাকা দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করা। অন্য মানুষের সুখে নিজেকে সুখী মনে করা এবং দুঃখে দুঃখী অনুভব করা।
তবে বর্তমান বস্তুতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়, মানবতা তথা মনুষ্যত্বের বিষয়টি মানুষের চিন্তা, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। অনেকের মতে এটা আল্লাহ অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে না। মানবাধিকার হল সেসব অধিকার, যা মানুষ হিসেবে জন্মসূত্রে তার প্রাপ্য। একজন ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তির কাছে নৈতিকতা বিষয়টি সুনির্দিষ্ট হলেও একজন নাস্তিকের কাছে নৈতিকতার মূল্যবোধ আপেক্ষিক। তার কাছে মানবতাবাদ হলো একটি ধারণা বা মতবাদ যা মানুষকে শেখায় যে মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির স্বীকৃতি মানবিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায় এমন যে কোনও ব্যবস্থা অমানবিক। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় বিধান বা নৈতিকতা নয়, মানবিক বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত যুক্তিই ন্যায়ের মানদন্ড। কোনও ধর্মগ্রন্থের শিক্ষা বা ধর্মীয় বিধান এখানে গৌণ। আধুনিক মানবতাবাদের প্রবক্তাদের ধারণা যে, কোনও দৈবশক্তির সাহায্যের প্রয়োজন নেই; কারণ মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই ঠিক করে নিতে পারে।
পৃথিবীর সব মহামানব তাদের সারাজীবন ধরে মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং সকল পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহে মানবজাতিকে মানবতার শিক্ষাপ্রদান করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র ক্বোরআনের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। ক্বোরআন আল্লাহর বাণী। এটা মানব রচিত কোন গ্রন্থ নয়। তাই ক্বোরআনে মানবিক শিক্ষায় ভুল থাকতে পারে না। বরং মানুষের বোঝার ভুল হতে পারে বলে মুসলমানদের বিশ্বাস। ক্বোরআন ঘোষণা করেছে যে, মানুষ সৃষ্টির সেরা এবং তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়েছে। আর দেওয়া হয়েছে জ্ঞান, বিবেক বা বুদ্ধি যা অন্য প্রাণীদের নেই। ক্বোরআন এমন একটি ধর্মগ্রন্থ যা সমস্ত মানবজাতিকে সিরাতুল মসতাক্কিম অর্থাৎ সুপথ প্রদশনের জন্য বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। অতএব পবিত্র ক্বোরআন হলো বিশ্ব মানবের জন্য ঐশী ও সর্বশেষ সংবিধান। ক্বোরআনে মানবতাবাদ হলো একটি বিশাল ব্যাপার যা এ ক্ষুদ্র পরিসরে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই শুধু কিছু মুখ্য বিষয়ে এ আলোচনা সীমিত রাখা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
পবিত্র ক্বোরআন বলে, সমগ্র মানবজাতি এক আত্মা থেকে সৃষ্ট। সবাই আদমের সন্তান। তবে মহান আল্লাহ তাঁর সেরা সৃষ্টি মানুষের মধ্যে বিভিন্ন গোত্র বা বংশ সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তারা একে অপরকে চিনতে পারে। কিন্তু মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণায় এ সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে মানুষে মানুষে বিভেদের প্রাচীর খাড়া করেছে। আজ ধর্ম, জাতি, ভাষা, বর্ণ ইত্যাদি ভেদাভেদ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করছে হানাহানি, একাংশ মানুষ হয়েছে মানুষের শত্র“। ধর্মের নামে অধর্মের বাহাদুরি এখন এক স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মানুষে মানুষে হিংসা, বিদ্বেষ বোধহয় অনেক সময় পশুদেরও লজ্জা দেয়। উগ্র সাম্প্রদায়িকতা যখন তার বিষদাঁত বের করে, তখন মানবসমাজে নেমে আসে নরকের বিভীষিকা।
ক্বোরআন এমন একটি ধর্মগ্রন্থ যা দীপ্তকন্ঠে ঘোষণা করছে যে সমগ্র মানবমন্ডলী একই পুরুষ আদম ও একই নাবী হাওয়া (ইভ) থেকে জাত। অর্থাৎ জগতের সমস্ত মানুষ একই বংশোদ্ভূত। এ মর্মে পবিত্র ক্বোরআনের বাণী, ‘হে মানুষেরা তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের ভয় কর-যিনি তোমাদের একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তদীয় সহধর্মিণী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উভয় হতে বহু নরনারী বিস্তৃত করেছেন; এবং সেই আল্লাহকে ভয় কর, যিনি তোমাদিগকে পরস্পর সন্বন্ধযুক্ত ও ঘনিষ্ঠতর করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের তত্ত্বাবধানকারী ’ (০:০১)।’ পরবর্তীকালে মানুষ যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন মানুষেরই সুবিধার্থে তাদের বিভিন্ন দল-গোত্রে বিভক্ত করে দেওয়া হল। এ সম্পর্কে পবিত্র ক্বোরআন বলছে, ‘হে মানুষেরা! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী লোক থেকে এবং তোমাদের পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে ওপরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিক ন্যায়দর্শী’(৪৯:১৩)। আবার ক্বোরআন বলছে, ‘এবং ইহা ও তাঁর নিদর্শন যে, তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং তোমাদের বিভিন্ন ভাষা ও তোমাদের বর্ণসমূহ সৃষ্টি করেছেন, নিশ্চয়ই ইহাতে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে (৩০:২২)।
আগেই উল্লেখ করেছি যে ক্বোরআন ঘোষণা করেছে যে সমগ্র মানব জাতি এক আত্মা থেকে সৃষ্ট। অতএব বিশ্বমানব এক জাতি। দেশ-মহাদেশ, সাদা-কালো, দীর্ঘ-বেঁেট, সুন্দর-অসুন্দরের, দুর্বল-সবলের বালাই নেই, সবাই আপন, কারণ সবাই এ ধরায় আল্লাহর প্রতিনিধি। এ পৃথিবীতে আল্লাহর কাছে সবাই সমান। কেননা সবাই তাঁরই সৃষ্টি। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, সৎ-অসৎ, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ ইত্যাদি যে কোনও পার্থক্য নির্বিশেষে সবার উপর তাঁর করুণা বর্ষিত হয়। কারণ তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু ‘রাহমানির রাহিম’। সবার জন্য আলো, বায়ু, পানি এবং সুন্দর ধরণীতে কারও প্রতি আল্লাহর কার্পণ্য বা বৈষম্য নেই।
পবিত্র ক্বোরআন বিশ্ব মানবের জন্য পথ প্রদর্শক। ক্বোরআন দেখায় ‘সিরাতুল মুসতাকিম’ অর্থাৎ ইহকালের সাফল্য ও পরকালের মুক্তির সহজ সরল পথ। মহাগ্রন্থ ক্বোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচার ও সৎকার্য করতে এবং আত্মীয়-স্বজনদিগকে দান করতে আদেশ করেছেন এবং অশ্লীলতা ও দুষ্কার্য এবং বিদ্রোহিতা (অত্যাচার) হতে নিষেধ করেছেন। তিনি উপদেশ প্রদান করেছেন যেন তোমরা স্মরণ কর (১৬:৯০)।’
ক্বোরআন আরও ঘোষণা করেছে, ‘ আর তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করো না তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে। আর সদ্ব্যবহার কর পিতামাতার সঙ্গে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে, এতিমদের সঙ্গে, ভিক্ষুকদের সঙ্গে, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে, সঙ্গীসাথী ও পথচারীর সঙ্গে এবং তোমাদের অধিকারভূক্ত দাসদাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই , আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, আত্মগর্বিত ব্যক্তিকে (০৪:৩৬)।’ সর্বাবস্থায় ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়েছে পবিত্র ক্বোরআন। এ মর্মে ক্বোরআনে ঘোষণা, ‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানকারী সুবিচার প্রতিষ্ঠাতা হও এবং কোনও সম্প্রদায়ের শত্র“তাহেতু তোমরা সুবিচারের অন্যথা করিও না; তোমরা সুবিচার কর, উহা ধর্মভীরুতার নিকটবর্তী, এবং আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা যাহা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরিজ্ঞাত আছেন (০৫:০৮)।’
ইসলাম ধর্ম, মানব ধর্ম, চিরকালীন ধর্ম। পৃথিবীর আদি মানব হজরত আদম ছিলেন আল্লাহর বান্দা, এক অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসক। হজরত মোহাম্মদ সর্বশেষ নবী, ক্বোরআন শেষ ও চূড়ান্ত ঐশীবাণী। হাদিস শাস্ত্র মতে এ পৃথিবীতে আল্লাহ এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী প্রেরণ করেছেন। জগতে এমন কোনও জাতি নেই, যার প্রতি কোনও নবী প্রেরিত হন নাই। পবিত্র ক্বোরআনে মাত্র পঁচিশজন নবীর নামোল্লেখ থাকলেও মুসলমানদের আল্লাহ প্রেরিত সব নবীর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মে জোর জবরদস্তির কোনও স্থান নেই। ক্বোরআন ঘোষণা করেছে, ‘ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই (০২: ২৫৬)।’ ক্বোরআন আরও ঘোষণা করছে, ‘(হে মোহাম্মদ) তুমি জ্ঞান ও সৎ উপদেশ দ্বারা তোমার প্রতিপালকের পথে (মানুষকে) আহ্বান কর এবং তাহাদের সহিত সদ্ভাবে আলোচনা কর। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক পরিজ্ঞাত আছেন যে, কে তাহার পথ হইতে বিভ্রান্ত হইয়াছে এবং তিনি সুপথগামীদিগকেও পরিজ্ঞাত আছেন’ (১৬:১২৫)। ‘নিশ্চয় ইহা সদুপদেশ ; অতএব যাহার ইচ্ছা সে স্বীয় প্রতিপালকের দিকে পথ পরিগ্রহণ করবে (৭৩ : ১৯)।
আল্লাহ কারও প্রতি অবিচার করেন না। পাপ-পুণ্যের বিচার হবে পরকালে কেয়ামতের মাঠে এবং সেখানে দেওয়া হবে পুরস্কার বা শাস্তি যার যেটা প্রাপ্য। এ মরজগৎ মুক্তাঞ্চল। এ পৃথিবীতে যারা তাঁর অবাধ্য থাকবে অর্থাৎ নিজ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে তাঁর আদেশ নিষেধ অমান্য করবে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালে সুবিচার ও উপযুক্ত শাস্তি। কিন্তু ইহকালে আল্লাহ তাদের শাস্তি না দিয়ে শুধরানোর সুযোগ দেবেন। আর যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে সৎকর্ম করে তাদের জন্য পরকালে রয়েছে উপহার অর্থাৎ স্বর্গোদ্যান যার নিম্নদেশে স্্েরাতস্বিনী প্রবাহিত।
অনেকে হয়ত বলতে পারেন যে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ক্বোরআন অনেক অমানবিক বিধান প্রবর্তন করছে। যেমন চুরির শাস্তি হাত কাটা ধর্ষণের শাস্তি বেত্রাঘাত করা বা পাথর বর্ষণে হত্যা করা ইত্যাদি। কিন্তু এটা এতো সরল নয় যে চোরকে ধরেই তার হাত কেটে ফেলবেন আর ধর্ষককে ধরেই শাস্তি দেবেন। কারণ অপরাধীর বিচার হতে হবে নির্দিষ্ট বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে। অতঃপর বিচারে দোষী প্রমাণিত হলেই তবে শাস্তি কার্যকর করবে দেশের প্রশাসন এবং যার হাত (বাম) কাটা যাবে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে দেশের সরকার। আর এটা হলো শাস্তির সর্বোচ্চ সীমা। অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তিও কম বেশি হতে পারে। সেভাবে বিচারে দোষী প্রমাণিত হলেই তবে ধর্ষকের শাস্তি হবে। কারণ ধর্ষিতা কি ইসলামি বিধান মেনে তার দেহকে উপযুক্ত পোশাকে সুরক্ষিত রেখেছেন? না আজকালের একাংশ উচ্ছৃঙ্খল নারীর মতো-‘আমাদের দেহ, আমার অধিকার’ বলে অর্ধ উলঙ্গ থেকে ধর্ষকের মতো নরপশুকে প্রলুব্ধ করেছেন? এভাবে এসবে জড়িয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। পবিত্র ক্বোরআনের অনিন্দ্যসুন্দর বিধান মেনে চললে চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার, ধর্ষণের মতো অপরাধ যে ঘটবে না, এটা হলফ করে বলা যায়। ক্বোরআনের মতো মহাগ্রন্থের মানবিক শিক্ষার প্রতি অবহেলা সব ধরনের অপরাধের মূল কারণ বললে বোধহয় ভুল হবে না।
ক্বোরআনের শিক্ষা নিয়ে আরবরা সারা বিশ্বকে পথ প্রদর্শন করেছিল। তাই আরবের ইসলামি সভ্যতাকে আধুনিক সভ্যতার বুনিয়াদ বলা হয়। ইসলামের সুমহান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আরবরা তাদের দেশ থেকে ক্রীতদাস প্রথা মুছে ফেলেছে। ধনী-গরিব বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ধনীদের জন্য যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করেছে ক্বোরআন। মানুষে মানুষে পার্থক্য মুছে দিতে ইসলাম ধনী-গরিব, আমির-ফকির, রাজা-প্রজা, জ্ঞানী-মুর্খ, উচ্চ-নীচ; প্রভু-ভৃত্য সবাই কাঁেধ কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে নামাজ পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছে মানব ধর্ম ইসলাম। আল্লাহর সামনে সবাই সমান, সবাই তাঁর বান্দা, সেখানে সকল বিভেদের রেখা মুছে যায় মানবতার মহান শিক্ষায় । বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে অনারবদের উপর আরবদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর উপর সাদার কোনও প্রভুত্ব হতে পারে না।
অনেকে ভাবেন ক্বোরআনে জেহাদের কথা বলা হয়েছে যেটা নাকি অমানবিক। আসলে এসব তাদের ভ্রান্ত-ধারণা। কারণ তারা জেহাদ ও সন্ত্রাসবাদকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন অজ্ঞাতবশত। জেহাদ মানে অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার জন্য অবিরত সংগ্রাম করে যাওয়া; সেটা ব্যক্তিগত জীবনে, সামাজিক জীবনে এমনকী রাষ্ট্রীয় জীবনেও হতে পারে। নিজের মান-সম্মান প্রাণ ধর্ম ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নাম জেহাদ। নিরপরাধ মানুষ হত্যার নাম জেহাদ নয়। ইসলামে শুধু মানুষ নয় বিনা কারণে একটি পিপীলিকা হত্যা করাও নিষিদ্ধ, একজন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিতে হত্যা করার মতো সমান অপরাধ বলে গেছে পবিত্র ক্বোরআন আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে।
মক্কার ইসলাম বিদ্বেষীদের দ্বারা অকথ্য অত্যাচারের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণরক্ষার্থে আল্লাহর নির্দেশে গোপনে মদিনাতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আল্লাহর রসুল। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে অস্ত্র হাতে নেননি। অতঃপর, যখন মক্কার শত্র“তা মদিনায় গিয়েও তাকে বার বার আক্রমণ করছিল, তখন বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার্থে জেহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন মহানবী মোহাম্মদ (সঃ)। আর এ সময়ের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি ঐশীবাণী অবতীর্ণ হয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে।
বর্তমানে একাংশ ক্বোরআনবিদ্বেষী এগুলোর অপব্যাখ্যা করে ক্বোরআন ও মুসলমানদের বদনাম করার অপচেষ্টা করেন বললে বোধহয় ভুল হবে না। কিছু মানুষ রয়েছেন যারা ক্বোরআনকে খুব ভয় করেন। কারণ ক্বোরআনকে মানলে চুরি করা যাবে না, সুদ খাওয়া যাবে না, মদ খাওয়া যাবে না, জুয়া খেলা যাবে না, সমকামী হওয়া যাবে না, লিভ টুগেদার করা যাবে না, অবৈধ প্রেম করা যাবে না। সর্বোপরি কোন ধরনের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করা যাবে না। তাই ক্বোরআন সেকেলে, আধুনিতাবিরোধী ; অতএব এ যুগে অচল, পরিত্যাজ্য। এভাবে একাংশ মানুষ ধর্মের সুমহান শিক্ষাকে ব্রাত্য মনে করে প্রবৃত্তির দাসত্ব করে মানবসমাজে বয়ে আনছেন অসভ্যতার তমসাচ্ছন্ন কালো রাত্রি। তাই, আজ চতুর্দিকে দুনীর্তির জয় জয়কার।
তবে সুখের কথা আজকাল অনেক লোককে বলতে শোনা যায় যে একাংশ মানুষে মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলতে চললেও মনুষ্যত্ববোধের এখনও অপমৃত্যু ঘটেনি। মানে এ ধরণীতে মানবতা নামক সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ এখনও একেবারে লোপ পায়নি। তবে মানবতার অপমৃত্যু যেভাবে ঘনিয়ে আসছে, নিকট ভবিষ্যতে হয়তো মানবজগৎ আলোড়ন করে আসবে এক মহাপ্রলয়, যার পরিণামে মনবতাবাদ বিরোধী শক্তিসমূহ এ ধরণী থেকে একেবারে মুছে যাবে অথবা এ ধরায় আয়ু নিঃশেষ হয়ে আসছে, মহাপ্রলয় সন্নিকটে। কিন্তু না আমরা মানুষ আশাবাদী। আমাদের এ সুন্দর ভুবন এত তাড়াতাড়ি ধ্বংস হবে না। কারণ মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা এখানে হ্রাস পেলেও মানবতাবাদী মানুষের সংখ্যা এখনও একদম ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কোটি কোটি মানুষের বাসস্থান এ গ্রহে এখনও কোটি কোটি মানুষ মানবতার পূজারী। তাদের কাছে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই।’

সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা:)’র কৌশল

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এরূপ করতে নিষেধ করেছেন।” “ইমাম ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, রিয়াদ: দারুত ত্বায়্যিবাহ লিন নাশরি ওয়াত তাওযী’, ১৯৯৯, খ. ৩, পৃ. ৪২৯”
ইমাম কুরতুবী (র.) বলেন, স্বল্প-বিস্তর যতটুকুই হোক শান্তি স্থাপনের পর আল্লাহ পৃথিবীতে কম বা বেশি যাই হোক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন।” “ইমাম কুরতুবী, আল-জামি’ লি-আহকামিল কুরআন, রিয়াদ: দারু ‘আলামিল কুতুব, ২০০৩, খ.৭, পৃ. ২২৬”
অনর্থ বিপর্যয় সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হতে নিষেধ করে আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যাহা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না, আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।” “আল-কুরআন, ২৮: ৭৭”
৪। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করো না।” “আল-কুরআন, ৬: ১৫১, ১৭: ৩৩” আদম সন্তানকে সম্মানিত ঘোষণা করে আল্লাহ বলেন: “আমি তো আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদেরকে উত্তম রিয্ক দান করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” “আল-কুরআন ১৭:৭০” এত মর্যাদাবান ও অনুগ্রহপুষ্ট শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী সমগ্র মানবজাতির কোন এক সদস্যের প্রাণহানি ঘটানোকে সমগ্র মানবজাতির প্রাণহানী ঘটানোর সাথে তুলনা করে আল্লাহ বলেন: “এই কারণেই বনী ইসরাঈলের প্রতি এই বিধান দিলাম যে, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা ব্যতীত কেউ কাউকেও হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করল।” “আল-কুরআন, ৫: ৩২” অন্য আয়াতে আল্লাহ ইচ্ছাকৃত কোন মু‘মিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত (অভিশাপ) করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” “আল-কুরআন, ৪: ৯৩”
৫। সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য অর্জনে আত্মঘাতি হামলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই হামলার মাধ্যমে সন্ত্রাসী তার নিজের জীবনকে ধ্বংস করে ফেলে। অথচ আল-কুরআনে নিজেকে ধ্বংস করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মঘাতি হামলা আত্মহত্যার শামিল, আর উভয়ই স্পষ্ট হারাম। আল্লাহ বলেন: “নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কর না। তোমরা সৎকাজ কর, আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণ লোকেদের ভালোবাসেন।” “আল-কুরআন, ২: ১৯৫।”
এভাবে আল-কুরআনুল কারীমে অসংখ্য আয়াতে অন্যায়ভাবে মানব হত্যা, আহত করা, আত্মহত্যা করা, অন্যের সম্পদ লুট করা, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা, বিশৃঙ্খলা ঘটানোসহ সন্ত্রাসের বিভিন্ন রূপ, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট, পরিণাম, প্রতিরোধ, শাস্তি সম্পর্কে নির্দেশনা এসেছে। এসব আয়াতের ব্যাখ্যা হিসাবে রাসূল (সা.) এর হাদীসে এ প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে আল-হাদীসের নির্দেশনা ঃ সন্ত্রাস প্রতিরোধে আল-কুরআনে বর্ণিত নির্দেশনার আলোকে আল-হাদীসেও ব্যাপক নির্দেশনা এসেছে। প্রাসঙ্গিক কারণে কিছু হাদীস নিম্নে পেশ করা হলো-
১। রাসূল (সা.) বলেন: “বিবাহিতা ব্যভিচারী, হত্যার বদলে হত্যা এবং দ্বীন (ইসলাম) ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অপরাধ ব্যতীত ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল’ এ সাক্ষ্য দানকারী কোন অমুসলিমের রক্ত বৈধ নয়।” “ইমাম বুখারী সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আদদিয়াত, অনুচ্ছেদ: কওলুল্লাহ তা’আলা “ইন্নান নাফসা বিন নাফসি… হুম যালিমুন (আল- মায়িদাহ-৪৫), প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ২৫২১”২। সন্ত্রাস অর্থই হচ্ছে ত্রাস, ভয় আতঙ্ক সৃষ্টি করা, অন্যকে আতংকিত করা। কিন্তু আল-হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোন মুসলিমকে আতংকিত করা বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেন: “কোন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিম ভাইকে আতংকিত বা সন্ত্রস্ত করা বৈধ নয়।“ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায়: আল আদাব, অনুচ্ছেদ: মাই ইয়াখুযুশ শাইআ‘আলাল মিযাহি,প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৪৫৮”
৩। সন্ত্রাস একটি অন্যায় কর্ম। যে কোন অন্যায় কর্ম দেখে তা প্রতিরোধ করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। সাধ্যানুযায়ী প্রতিরোধ প্রচেষ্টা পরিচালিত করার নির্দেশনা প্রদান করে রাসূল (সা.) বলেন: “তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি অন্যায় করতে দেখবে, সে যেন তাঁকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি সম্ভব না হয় তাহলে কথা দ্বারা প্রতিবাদ করবে, তাও সম্ভব না হলে অন্তর দ্বারা প্রতিবাদ করবে। এটিই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।” “ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: আল ঈমান, অনুচ্ছেদ: বায়ানু কওলিন নাহয়ি আনিল মুনকারি মিনাল ঈমান…. ওয়াজিবানে, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৬৯”
সন্ত্রাস সম্পর্কে উল্লেখিত আলোচনা থেকে স্পষ্টতই প্রমাণ হয় যে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ইসলাম সমর্থনেতো করেই না, বরং তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যারা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে কিংবা ভীতি প্রদর্শন করে তারা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নয়। তারা ইসলামের তথা কুরআন ও হাদীসের রীতিনীতি ও নির্দেশনাকে বিসর্জন দিয়েছে। তেমনি বর্তমানে যারা ধর্মের নামে বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা করে নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে এবং বিভিন্ন ধরণের হুমকি দিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে তারা মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। তাদেরকে ইসলামী দলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে তাদের কোনো সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমরা সৎ ও তাকওয়াভিত্তিক কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।” আল-কুরআন, ৫:২ বরং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে রাসূল (সা.) এর কার্যক্রম ঃ মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে অশান্ত ও বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে শান্তি, শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ : “আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণা করেছি।” “আল-কুরআন, ২১: ১০৭।” এজন্য তিনি সর্বদাই বিশ্বে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতন ও তৎপর ছিলেন এবং সন্ত্রাস, অন্যায়, অনাচার, অত্যাচার প্রতিরোধে সমগ্র জীবন বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। রাসূল (সা.) একদিকে ছিলেন শান্তি স্থাপনকারীদের জন্য সুসংবাদদানকারী অপরদিকে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের জন্য ছিলেন সতর্কবাণী। আল্লাহ বলেন: “হে নবী! আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।” “আল-কুরআন, ৩৩: ৪৫-৪৬”
উজ্জ্বল প্রদীপরূপী রাসূল (সা.) তাঁর সমগ্র জীবনে যে আদর্শ বাস্তবায়িত করেছেন, তা অনুসরণের মাধ্যমে আজো পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আদর্শ অনুকরণীয় হিসেবে রাসূল সা. কেই গ্রহণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূল (সা.) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” “আল-কুরআন, ৩৩: ২১”
সামাজিক বন্ধনহীন পরিস্থিতি, অস্থির ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ, বলগাহীন নেতৃত্ব, শঠতা, প্রবঞ্চনা, হত্যা, লুটতরাজ প্রভৃতি অকল্যাণকর কার্যকরণের ফলশ্র“তিতে আরবের গোত্রে গোত্রে কলহ বিবাদ, যুদ্ধ বিগ্রহ সর্বত্র স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। মানুষের শান্তিময় জীবন মারাত্মকভাবে লংঘিত হতে থাকলে জনসাধারণ এই অশান্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। উদ্বিগ্ন মানুষের উদ্বেগকে দূর করার জন্য রাসূল (সা.) যে কার্যক্রমসমূহ গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে সর্বপ্রথম দূর করার জন্য রাসূল (সা.) যে কার্যক্রমসমূহ গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে সর্বপ্রথম ছিল “হিলফুল ফুযুল” নামক চুক্তি সম্পাদন। রাসূল (সা.) এর বয়স যখন ১৫ বছর, “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর- রাহীকুল মাখতুম, অনু. “খাদিজা আখতার রেজায়ী, ঢাকা: আল কোরআন একাডেমী লন্ডন (পরিবেশিত), ১৯৯৯, পৃ. ৭৫” এই যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী হাশিম সম্প্রদায়ের নেতা আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র জুবাইরের প্রস্তাবে মক্কার আব্দুল্লাহ ইবনে জাদ’আনের বাসভবনে বনী হাশিম, বনী যুহরা, বনী তাঈম, বনী মুত্তালিব, বনী আসাদ গোত্রের সকললে সম্মিলিতভাবে অন্যায়, অত্যাচার, সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে ঐকমত্যে উপনীত হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। মুহাম্মাদ সা. এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেন। চুক্তিটিকে ইতিহাসে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে অভিহিত করা হয়। “মো. আব্দুল কাসেম, মানবশ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মাদ (সা.) রাজশাহী: “মোসা. হোসনে আরা বেগম, ২০০৫, পৃ. ৬৭” “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬” এই চুক্তিতে আবদ্ধ গোত্রসমূহ যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার সারমর্ম হলো:
১। আমরা দেশের অশান্তি দূর করার নিমিত্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করব। ২। বিদেশী লোকদের ধন-প্রাণ ও মান-সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। ৩। দরিদ্র ও অসহায় লোকদের সহায়তা করতে আমরা কখনই কুণ্ঠিত হবো না। ৪। অত্যাচারী ও তার অত্যাচারকে দমাতে ও ব্যাহত করতে এবং দুর্বল দেশবাসীদেরকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করব। “মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা-চরিত, ঢাকা: কাকলী প্রকাশনী, নবম মুদ্রণ, ২০১০, পৃ. ১৮৮” এই প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী হিলফুল ফুযুলের সদস্যগণ বহুদিন যাবৎ কাজ করতে থাকেন। এই সেবা- সংঘের প্রচেষ্টায় দেশের অত্যাচার অবিচার বহুলাংশ হ্রাস পেলো, রাস্তাঘাট নিরাপদ হয়ে উঠল। রাসূল (সা.)-এর প্রতিষ্ঠিত হিলফুল ফুযুল সংঘ ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ইসলামের আগমনের পর এই সেবা সংঘ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ল। কারণ, সকল প্রকার অন্যায়, অমঙ্গল ও পাপের মূলোৎপাটন করার এবং সর্বাধিক ন্যায়, মঙ্গল ও পুণ্য সাধনের দায়িত্ব নিয়ে যখন ‘ইসলাম’ আত্মপ্রকাশ করল তখন আর উক্ত সেবাসংঘের কোন প্রয়োজনই রইল না। “শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ তাফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, সম্পাদনা: ড. এ.এইচ. এম মুজতবা হোছাইন, ঢাকা: ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, ২০০৯, পৃ. ২০১।”
সন্ত্রাস প্রতিরোধে তরুণ বয়সে মুহাম্মদ (সা.) যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার বাস্তবায়ন তার সমগ্র জীবনে পরিলক্ষিত হয়। তিনি নবুওয়াত পাওয়ার পরেও এই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলেননি। তিনি নবুওয়াত প্রাপ্তির পর কোন একদিন বলেন: “আজও যদি কোন উৎপীড়িত ব্যক্তি “হে ফুযুল প্রতিজ্ঞার ব্যক্তিবর্গ’ বলে ডাক দেয়, আমি অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেব। কারণ, ইসলাম এসেছে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং উৎপীড়িত, অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে। “মোহাম্মদ আকরম খাঁ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৮” এভাবে মহানবী (সা.) মক্কানগরী থেকে অন্যায়, অত্যাচার ও সন্ত্রাস দূর করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সন্ত্রাস প্রতিরোধের আদর্শ রেখে গিয়েছেন।
রাসূল (সা.) নবুওয়াত লাভের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অহীভিত্তিক ফর্মূলা অনুযায়ী বিশ্বকে গড়ে তোলার জন্য সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস কোন সাফল্যজনক পদ্ধতি হতে পারে না। বিশেষ করে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে-যেমনটি মহানবী (সা.) এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবে হয়েছিল, তাহলে সন্ত্রাস নির্মূলে সন্ত্রাসী নির্মূলের নির্বুদ্ধিতাগত নীতির ফলে পুরো সমাজটাকেই প্রায় নির্মূল করে ফেলতে হবে। আবার সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকলে সন্ত্রাস ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। উভয় অবস্থায়েই সমাজের সর্বনাশ অনিবার্য। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে মধ্যপন্থা গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে তথায় শান্তি স্থাপনের চেষ্টায় মহানবী (সা.) তাঁর সমগ্র নবুওয়াতী জীবন ব্যয় করেছিলেন। সন্ত্রাস প্রতিরোধ বা নির্মূলে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদক্ষেপ অগণিত। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো- ক. বাই’আতে আকাবা ঃ নবুওয়াতের দ্বাদশ বছর হজ্ব উপলক্ষে মক্কায় আগত লোকদের মধ্যে ১২ জন রাসূল (সা.) এর সাথে আকাবা নামক স্থানে সাক্ষাৎ করলে তারা তাঁর নিকট ইসলাম গ্রহণপূর্বক অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করার অঙ্গীকার করলেন। এই অঙ্গীকার গ্রহণ অনুষ্ঠানকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। “ইবনে হিশাম, সীরাতে ইবনে হিশাম, অনু. আকরাম ফারুক, ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ২০০৩, পৃ. ১১৫” এই বাইআতে সাহাবাগণ যে বিষয়গুলোর উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তার বিবরণ দিয়ে বাই’আতের অন্যতম সদস্য উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) বলেন : “আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার (শরীক) করবো না, চুরি-ডাকাতি করবো না, ব্যভিচার করবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবো না এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর অবাধ্যতা করবো না। অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন: “এসব অঙ্গীকার পূরণ করলে তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। আর এর কোন একটি ভঙ্গ করলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইচ্ছে করলে মাফ করে দিবেন, ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দিবেন। “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: ফাযায়িলুস সাহাবা, অনুচ্ছেদ: উফুদুল আনসার ইলান নাবিয়্যি (সা.) বি মাক্কাতা ওয়া বাই’আতুল আকাবা, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৪১৩” এই প্রতিজ্ঞার বিষয়াবলীর সবগুলোই প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে সর্বপ্রথম তার সাহাবাদেরকে সকল সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, যার ফলে পরবর্তীকালে মক্কা-মদীনাসহ সমগ্র ইসলামী বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল হয়েছিলো।                                                   (চলবে)