বিভাগ: ইসলামের আলো

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আলী (রা.) বলেন: রসূলুল্লাহ্ (স.) বলেছেন- ‘‘যে সময় মানুষ ধন-সম্পদ সঞ্চয়ে মনোনিবেশ করিবে, দালান-কোঠা-ইমারত নির্মাণে উৎসাহিত থাকিবে এবং দরিদ্রদিগকে শত্র“র ন্যায় মনে করিবে, তখন আল্লাহ্ তাআলা জনসমাজে চারি প্রকার ‘বালা’ (আপদ-বিপদ) প্রেরণ করিবেন- (১) দুর্ভিক্ষ, (২) রাজশক্তির অত্যাচার (৩) বিচারকদের পক্ষপাতমূলক আচরণ, (৪) কাফের ও শত্র“দের দৌরাত্ম্য’’। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৯-১৪০’’। সমকালীন বিশ্বে আমরা এ দৃশ্য লক্ষ্য করছি। নিজের অধিকারে সামান্য যা কিছু জীবনোপকরণ আছে তাতেই যে সৎ প্রকৃতির দরিদ্র সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ্ তাআলা তাকে সবচেয়ে ভালবাসেন। আবুদ্দারদা (রা.) বলেছেন- ‘‘পার্থিব ধন-সম্পদের উন্নতি দেখিয়া যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট ও আনন্দিত হয় এবং প্রতি মুহূর্তে আয়ু ক্ষয় হইয়া যাইতেছে দেখিয়া চিন্তিত না হয়, তাহার বুদ্ধি বিকৃত হইয়াছে বলিতে হইবে। ইহার মধ্যে কি মঙ্গল থাকিতে পারে যে, পার্থিব ধন-সম্পদ তো বৃদ্ধি পাইতেছে এবং আয়ু প্রতি মুহূর্তে ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে।’’ ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১’’।
ইয়াহইয়া ইবনে মুআয বলেছেন- ‘‘মানুষ দরিদ্রতা ও অভাবকে যেমন ভয় করে, যদি দোযখকে তাহারা তেমন ভয় করিত, তবে দারিদ্র্যতা এবং দোজখ উভয় হইতেই তাহারা নির্ভয় হইতে পারিত। আর তাহারা দুনিয়া পাওয়ার জন্য যেরূপ কঠোর পরিশ্রম করিয়া থাকে, যদি বেহেশ্ত প্রাপ্তির জন্য তদ্রƒপ পরিশ্রম করিত, তবে তাহারা দুনিয়া ও বেহেশ্ত উভয়ই লাভ করিত’’। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪০’’।
এতে বুঝা যায়, পাপ-পুণ্য, দু:খ-দারিদ্র্য, অভাব-অনটন এবং বেহেশ্ত-দোযখ প্রাপ্তি সবই মানুষের কর্মফল-এ সব মানুষের নিয়তি নয়। ‘‘দারিদ্র্য কারোও নিয়তি বা বিধিলিপি আল-কুরআন এই ধরণের মতবাদ স্বীকার করে না। উপরন্তু ইসলামে আলস্য ও সন্ন্যাসবাদেরও কোন স্থান নেই’’। ‘‘হামিদ, মুহাম্মদ আব্দুল, ইসলামী অর্থনীতি: একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ, ঢাকা: সম্পাদনা: প্রফেসর শাহ্ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান, ২০০২, পৃ. ২৭৪’’। মহান আল্লাহ্ বলেন- ‘‘উহা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করিবে না, আর এই যে, মানুষ তাহাই পায় যাহা সে করে, আর এই যে, তাহার কর্ম অচিরেই দেখান হইবে- অত:পর তাহাকে দেওয়া হইবে পূর্ণ প্রতিদান। ‘‘আল-কুরআন, ৫৩:৩৮-৪১’’। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে মানুষ ইহকাল এবং পরকালে তার কর্মফলই ভোগ করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ ঃ উপরের আলোচনা থেকে এই কথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শায়িত করেছে বা ধন উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করেছে। শরীয়তের বিধিমতে ধন উপার্জন এবং ব্যয়ের উপর ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করে। যেমন, আমরা উপরে উল্লেখ করেছি। আল্লাহ্ বলেন- ‘‘আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তদ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে চাহিও না। আল্লাহ্ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৮:৭৭’’। আল্লাহ্ আরো বরেন: ‘‘আর সন্ন্যাসবাদ-ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিল। আমি উহাদের ইহার বিধান দেই নাই’’। ‘‘আল-কুরআন, ৫৭:২৭’’।
আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘শয়তান তোমাদিগকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ্ তোমাদিগকে তাঁহার ক্ষমা এবং অনুগ্রহের প্রতিশ্র“তি প্রদান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’’। ‘‘আল-কুরআন, ২:২৬৮’’। ‘‘যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা কর তবে আল্লাহ্ ইচ্ছা করিলে তাঁহার নিজ করুণায় তোমাদিগকে অভাবমুক্ত করিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’’। ‘‘আল-কুরআন, ৯:২৮’’। তাই আল্লাহ্ বলেন, ‘‘সালাত সমাপ্ত হইলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবে এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধান করিবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করিবে যাহাতে তোমরা সফলকাম হও’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬২:১০’’। সুতরাং তোমরা জীবনোপকরণ কামনা কর আল্লাহ্র নিকট এবং তাঁহারই ইবাদত কর ও তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তোমরা তাঁহারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হইবে’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৯:১৭’’। আল্লাহর নিকট এই প্রত্যাবর্তিত হওয়ার সাবধান বাণীর মধ্যেই লুক্কায়িত আছে ধন উপার্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান মেনে চলার নির্দেশ।
যে বিষয় মানুষকে আল্লাহ্ তাআলার স্মরণ ও ভালবাসা থেকে বিরত রাখে তা মন্দ ও জঘন্য। কোন কোন সময় দারিদ্র্য কারো কারো পক্ষে এতটাই অসহনীয় হয়ে পড়ে যে, সে আল্লাহর প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ে, যেমনটা অনেকের পক্ষে ধন-দৌলতের আধিক্যের কারণেও হয়। সুতরাং অভাব মোচনের পরিমাণ ধন একেবারে ধন শূণ্যতা থেকে ভাল। ‘‘এ কারণেই রসূলুল্লাহ (স.) আল্লাহ্ তাআলার কাছে দু’আ করতেন: ‘‘ইয়া আল্লাহ্! আমার বংশধর এবং উম্মতদিগকে অভাব মোচনের পরিমাণ অন্ন-বস্ত্র দান করিও’’। ‘‘ইমাম গাযালী, কিমিয়াযে সাআদাত প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪২’’। নবী করীম (স.) এরূপ প্রার্থনার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন: ‘‘দারিদ্র্য মানুষকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যায়’’। তিনি আরো বলেন, ‘‘হে আল্লাহ্! আমাকে দরিদ্রের জীবন দান কর। দরিদ্রের মতোই মৃত্যুবরণ করতে দাও এবং কিয়ামতে দরিদ্রের সাথেই পুনরুজ্জীবিত করো’’ (তিরমিযী), তিনি নিজের জন্য এ-ও প্রার্থনা করতেন ‘‘হে আল্লাহ্! আমি দারিদ্র্য, অভাব ও লাঞ্ছনা হতে তোমার পানাহ চাই’’ (বুখারী)। ‘‘হামিদ, মুহাম্মদ আব্দুল, ইসলামী অর্থনীতি: একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৩, ২৬৯’’। এর থেকে এই প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম দারিদ্র্যকে অপছন্দ করে ঠিকই কিন্তু দরিদ্রকে ভালবাসে।
ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ: উপরে পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণ সম্পর্কে সাক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আল-কুরআনের আলোকে মুসলিম সমাজে ধন বৈষম্য ও দারিদ্র্যের কারণ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করবো। এ প্রসঙ্গে দারিদ্র্যের যে কারণগুলোকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি, তার মধ্যে প্রধানত: ক. আল্লাহ্র বিধান থেকে বিচ্যুতি, খ. মানব সৃষ্ট সমস্যা, গ. সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতা, ঘ. সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন ব্যবস্থা, ঙ. ধনীক শ্রেণীর মানসিকতা, চ. দরিদ্র শ্রেণীর মানসিকতা, ছ. ক্ষমতার কেন্দ্রায়ণ ও সংহতকরণ, জ. রিবা ও ঝ. দুর্নীতির প্রভাব। আল্লাহ্র বিধান থেকে বিচ্যুতি: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তুমি কি দেখিয়াছ তাহাকে, যে দীনকে অস্বীকার করে? সে তো সে-ই, যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়াইয়া দেয় এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের, যাহারা তাহাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যাহারা লোক দেখানোর জন্য উহা করে এবং গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট-খাট সাহায্যদানে বিরত থাকে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১০৭”১-৭’’।
বর্তমান মুসলিম সমাজে আল্লাহ্র এ বাণীর যথার্থতা আমরা লক্ষ্য করে থাকি। লোক দেখানো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা যেমন, নামাজ, রোজা, হজ্ব ইত্যাদি অনেকেই পালন করে কিন্তু অর্থনৈতিক বিধিবিধানের পরিপূর্ণ আমল যা আল্লাহ্র ইবাদতেরই অঙ্গ তা তারা করে না। ফলে অভাবগ্রস্ত লোকেরা শরীয়ত মাফিক নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কোন প্রকার সামাজিক সহায়তা পায় না। যার ফালে দারিদ্র্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এর প্রতিকার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া অর্থনৈতিক শিক্ষা, যেমন উত্তরাধিকার আইন ও যাকাত ব্যবস্থার মত শরয়ী বিধানাবলীর যথাযথ বাস্তবায়ন করা। পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বলতে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন বুঝায় না, ব্যক্তি, আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যাবতীয় ইসলামী বিধি-বিধানের পরিপূর্ণ আমলও জরুরি।
মানব সৃষ্ট সমস্যা: আল্লাহ্ বলেন-‘‘আল্লাহ্ই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করিয়াছেন বাসপোযোগী এবং আকাশকে করিয়াছেন ছাদ এবং তিনি তোমাদের আকৃতি গঠন করিয়াছেন এবং তোমাদের আকৃতি করিয়াছেন সুন্দর এবং তোমাদিগকে দান করিয়াছেন উৎকৃষ্ট রিয্ক; তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্ কত মহান’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪০:৬৪’’। আল্লাহ্ আরো বলেন: ‘‘আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে, চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে তো রহিয়াছে নিদর্শন’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪৫:১৩’’।
আল্লাহ্ পৃথিবীতে প্রত্যেকেরই রিয্ক ও পার্থিব-পারলৌকিক কল্যাণ অর্জনের ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু মানুষ আল্লাহ্র বিধান লঙ্ঘন করে যাবতীয় পার্থিব সমস্যার সৃষ্টি করে ও পারলৌকিক কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত হয়। যেমন আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! পন্ডিত এবং সংসারবিরাগীদের মধ্যে অনেকেই লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করিয়া থাকে এবং লোককে আল্লাহ্র পথ হইতে নিবৃত্ত করে। আর যাহারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না উহাদিগকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে উহা উত্তপ্ত করা হইবে এবং উহা দ্বারা তাহাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হইবে। সেদিন বলা হইবে, ইহাই উহা যাহা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভুত করিতে। সুতরাং তোমরা যাহা পুঞ্জীভূত করিয়াছিলে তাহা আস্বাদন কর’’। ‘‘আল-কুরআন, ৯:৩৪-৩৫’’। সর্বসাধারণের জন্য মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদ মুষ্টিমেয় লোক কুক্ষিগত করার মাধ্যমে সৃষ্ট এহেন পার্থিব সমস্যা ইহকাল এবং পরকাল, উভয় কালের জন্যই মানুষের জন্য অকল্যাণকর।
সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতা: আল্লাহ্ সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতার ব্যাপারে বলেন: ‘‘সে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না এবং অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করিত না, অতএব এই দিন সেথায় তাহার কোন সৃহৃদ থাকিবে না এবং কোন খাদ্য থাকিবে না ক্ষত নিঃসৃত স্রাব ব্যতীত, যাহা অপরাধী ব্যতীত কেহ খাইবে না’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬৯:৩৩-৩৭’’। অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করা অর্থে এখানে বুঝানো হয়েছে, বিত্তশালীদের সম্পদ এমন ভাবে ব্যবহার করা যাতে কর্মহীন অভাবগ্রস্তরা কাজ করে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানসহ যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ পায়। অর্থনীতির ভাষায় বিত্তশালীরা তাদের সম্পদ অনুৎপাদনশীল কাজে বা ভোগ-বিলাসে ব্যয় না করে উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কাজে বিনিয়োগ করবে এবং অভাবগ্রস্তরা সেখানে জীবন যাপনের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এ না করলে সম্পদশালীদের জন্য পরকালে মর্মান্তিক শাস্তির বিধান রয়েছে; কারণ সম্পদশালীর সম্পদ জনহিতকর কাজে ব্যবহার করা ইবাদত্ তুল্য।
সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন ব্যবস্থা: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আল্লাহ্ জনপদবাসীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যাহা দিয়াছেন তাহা আল্লাহর, তাঁহার রাসূলের ‘‘এখানে রাসূল বলতে রাষ্ট্রকে বুঝানো হয়েছে। দেখুন, চরপশঃযধষষ, গড়যধসসবফ গধৎসধফঁশব. ‘ঞযব গবধহরহম ড়ভ ঞযব এষড়ৎরড়ঁং কড়ৎধহ’, খড়হফড়হ: ঢ়ঁনষরংযবফ নু ঃযব ঘবি অসবৎরপধহ খরনৎধৎু, ঘবি ণড়ঁৎ ধহফ ঞড়ৎধহঃড়, ঞযব ঘবি ঊহমষরংয খরনৎধৎু খরসরঃবফ, ১২ঃয চৎরহঃরহম, ভড়ড়ঃ হড়ঃব ২, ঢ়. ৩৯৩. রাসূলের স্বজনগণের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, যাহাতে তোমাদের মধ্যে যাহারা বিত্তবান কেবল তাহাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। রাসূল তোমাদিগকে যাহা দেন তাহা তোমরা গ্রহণ কর এবং যাহা হইতে তোমাদিগকে নিষেধ করেন তাহা হইতে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ্ তো শাস্তি দানে কঠোর’’ ‘‘আল-কুরআন, ৫৯:৭’’। আল্লাহ্ভীতি আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদ ব্যক্তি বিশেষের ন্যায়সঙ্গত ভোগ, ব্যয় ও জনসাধারণের মধ্যে ন্যায়ভিত্তিক সমবণ্টনের ও বিতরণের প্রধান নিয়ামক। কিন্তু সচরাচর লক্ষ্য করা যায় মানুষ- এমনকি মুসলিম সমাজও সম্পদ আহরণ, ভোগ, ব্যয় ও বণ্টনের ক্ষেত্রে আল্-কুরআন ও হাদিসের নিয়মাবলী সঠিকভাবে অনুসরণ করে না। এর ফলে সমাজে ও রাষ্ট্রে সম্পদের আয় ও বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্য দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজে ও রাষ্ট্রে সম্পদের আয়, ব্যয় ও বণ্টনের সুষম ও ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রায় সকল রাষ্ট্রই, মুসলিম রাষ্ট্রসহ, এ ব্যাপারে উদাসীন। ফলে এ ধরণের শরীয়ত বিরোধী বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থায় যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন করে।
ধনীক শ্রেণীর মানসিকতা: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যখন বিপদ তাহাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাহাকে স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ’’। আল-কুরআন, ৭০:২০-২১ ‘‘সম্পদশালীদের এই কৃপণতা তাদের সমাজ বিচ্ছিন্নতা ও সমাজ বিমুখতারই ফল। সম্পদ তারা না কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদনশীল বিনিয়োগের কাজে ব্যবহার করে, না বিত্তশালীদের উপর শরীয়া মোতাবেক সমাজের কোন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত জনগণের কল্যাণের ও হক্ আদায়ের কাজে ব্যবহার করে। এর শাস্তি যে ভয়ঙ্কর তা আল্লাহ্ বলেছেন: ‘‘জাহান্নাম সেই ব্যক্তিকে ডাকিবে, যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়াছিল ও মুখ ফিরাইয়া লইয়া ছিল। সে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করিয়া রাখিয়াছিল’’। ‘‘আল-কুরআন, ৭০:১৭-১৮’’। ধনীক শ্রেণীর এ মানসিকতার শরীয়ামুখী পরিবর্তন না হলে তাদের জন্য যে ভয়াবহ পরিণতি রয়েছে সে ব্যাপারেও আল্লাহ্ সতর্ক করেছেন: ‘‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও উহা বার বার গণনা করে; সে ধারণা করে যে, তাহার অর্থ তাহাকে অমর করিয়া রাখিবে; কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হইবে হুতাশায়; তুমি কি জান হুতামা কী? ইহা আল্লাহর প্রজ্বলিত হুতাশন, যাহা হৃদয়কে গ্রাস করিবে; নিশ্চয় ইহা উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিয়া রাখিবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১০৪-১-৯।’’ ইসলাম জনগণের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণে শরীয়া-সমাজমুখী মানসিকতায় বিশ্বাসী।
দরিদ্র শ্রেণীর মানসিকতা: আল্লাহ বলেন: ‘‘আর এই যে, মানুষ তাহাই পায় যাহা সে করে, আর এই যে, তাহার কর্ম অচিরেই দেখান হইবে-অতঃপর তাহাকে দেওয়া হইবে পূর্ণ প্রতিদান।’’ ‘‘আল-কুরআন, ৫৩:৩৯-৪১।’’ আল্লাহ্ আরো বলেন: ‘‘এবং তোমরা কর্ম করিতে থাক; আল্লাহ্ তো তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করিবেন এবং তাঁহার রাসূল ও মুমিনগণও করিবে’’। ‘‘আল-কুরআন, ৯:১০৫’’। আলস্য ও কর্মবিমুখতা দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলাম তাই মানুষকে পরিশ্রমের মাধ্যমে পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধণের চেষ্টা করে যাওয়ার তাগিদ দেয়। পরিশ্রম বিনা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ভাগ্য বিনির্মাণে অলসভাবে শুধু আল্লাহর উপর নির্ভশীলতার শিক্ষা ইসলাম দেয় না। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘এবং আল্লাহ্ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না উহারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৩:১১’’। সুতরাং দারিদ্র্য হতে আত্মরক্ষার জন্য বান্দার নিজ চেষ্টা ও কর্মের বিকল্প নেই। অবশ্য কর্মক্ষম অভাবী লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্রকে যেমন করতে হবে, যেমনটি করেছিলেন নবী করীম (স.) এক ভিক্ষুককে একটি কুঠার কেনার ব্যবস্থা করে দিয়ে তার জীবনধারণের জন্য বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করতে। ‘‘এ উদাহরণটি এখানে জনগণের জীবন ধারণের জন্য সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব পালনের রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।’’ তেমনি দরিদ্রলোককে আলস্য ও কর্মবিমুখতার মানসিকতাও ত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তুমি ধৈর্য ধারণ কর, কারণ নিশ্চয় (অসমাপ্ত)

শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামে দীক্ষিত করার বিধান

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর

ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম সাম্যের ধর্ম। সকল মত ও পথের মানুষ যেখানে খুঁজে পায় শান্তির আবাস। যেখানে নেই কোন ভেদাভেদ, নেই ফকির-রাজার বিভেদ, নেই হিংসা ও ক্লেশ। ইসলাম শক্তি দিয়ে নয়, ইসলাম ভালোবাসা দিয়ে উড়াতে চায় শান্তির বাতাস। আবার ইসলাম সেখানে উদার নয় যেখানে আছে হিংসা বিদ্বেষ আর অশান্তির দাবানল। যেখানে আছে জুলুম আর জালিমশাহীর কোপানল। ইসলাম কঠোর হস্তে দমন করতে চায় জুলুমের কালো থাবা, থামাতে চায় অশান্তির কালো ছায়া। আসুন জেনে নিই ইসলাম কোথায় শক্তি প্রয়োগ করতে চায় আর কোথায় উদার হতে চায়। কাকে শক্ত হাতে দমন করে তার হুকুম মানতে বাধ্য করে আর কাকে তার নিজের হাতে ছাড়তে চায়।
ইসলাম কোন অমুসলিমকে শক্তি প্রয়োগ করে ধর্মান্তরিত করতে চায় না :
ধর্ম হলো যার যার মনের একটি বিশ্বাসের ব্যাপার। যার সাথে জড়িত রয়েছে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি, আকাক্সক্ষা চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি। এটি জোর করে কাউকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আর ‘ইসলাম’ এমনই এই আকীদাগত এবং নৈতিক ও কর্মগত জীবনব্যবস্থা যা কারো ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। যেমন কাউকে ধরে এনে তার মাথায় জোর করে একটা বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়, এটা তেমন নয়৷ কারণ আল¬াহ তা’য়ালা হেদায়াত ও গোমরাহীকে, ইসলাম ও কুফরকে সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। বিধায় যিনি সজ্ঞানে জেনে শুনে-বুঝে সুজে ইসলামে দিক্ষিত হতে চায় তাকেই ইসলাম ঠাই দিতে চায়। আর আল্লাহ যাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন, যার বক্ষ খুলে দিবেন, যার অন্তর উজ্জ্বল হবে, যার চক্ষু দৃিষ্টমান হবে সে আপনা আপনিই ইসলামে দীক্ষিত হতে পাগলপ্রায় হয়ে যাবে, তাকে জোর করে ইসলামে দীক্ষিত করার প্রয়োজন হবে না। যেমন আল¬াহ তা’য়ালা বলেনঃ
﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ﴾
অর্থ : দীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই৷ ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেয়া হয়েছে৷ এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্ল¬াহর ওপর ঈমান আনে, সে এমন একটি মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ছিন্ন হবার নয়৷ আর আল্ল¬াহ সবকিছু শোনেন ও জানেন৷
অন্যদিকে রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেন : তোমরা অমুসলিমদেরকে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি করো না। নিশ্চয়ই বাতিল পথ হতে সৎপথের পার্থক্য পরিষ্কার হয়ে গেছে। (হাদীস সহীহ। তাফসীর তাবারী -৫/৪০৮/৫৮১২, সুনান আবূ দাউদ-৩/৫৮/২৬৮২, সুনান নাসাঈ।
একদা আনসারদের বানূ সালিম ইবনু আওফ গোত্রের মধ্যে হুসাইন নামক একজন লোক ছিলেন। তিনি নিজে মুসলিম হলেও তার দু’টি ছেলে ছিলো খ্রিষ্টান। একবার তিনি রাসূলুল্ল¬াহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) -এর নিকট আবেদন করেন যে, রাসূলুল্ল¬াহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) যদি তাঁকে অনুমতি দেন তাহলে ছেলে দু’টিকে তিনি জোরপূর্বক মুসলিম বানাবেন। কেননা তারা স্বেচ্ছায় মুসলিম হতে চায় না। তখন لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ বাকারা-২৮৬ নং আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এরূপ করতে তিনি নিষেধ করে দেন। (হাদীসটি য‘ঈফ। তাফসীর তাবারী -৫/৪০৯/৫৮১৭)
অতএব অমুসলিমদেরকে শক্তি দিয়ে নয় বরং তার কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ পৌছে দেওয়া এবং উত্তম আদর্শ দিয়ে তাদের মন জয় করাই হলো হলো একজন মুসলিমের দায়িত্ব। যখন তার কাছে ইসলামে উত্তম আদর্শগুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে, আল¬াহ যখন তার মনের সকল অসারতা দূর করে দিবেন তখন সে সকল বাধা ছিন্ন করে ইসলামের সুশিতল ছায়াই এমনিতেই আশ্রয় নিবে।
সমাজে যারা বিপর্যয় সৃষ্টি করে ইসলাম তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে চায়ঃ
উপরের আলোচনা দেখে কেউ যদি বলে এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, ইসলামে জিহাদের কোন প্রয়োজন নেই, শক্তি প্রয়োগের কোন দরকার নেই, যে যার মত চলবে, ইচ্ছে হলে ইসলাম মানবে, ইচ্ছে হলে তা মানবে না। আমি আমার স্বাধীন সত্বা নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারি। আমার স্বাধীনতায় ইসলাম কোন হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ভাল কিংবা খারাপ যে কাজই আমি করি না কেন ইসলাম সেখানে বাধা দিতে পারে না। তাহলে বলবো এ কথাটি হবে চরম ভ্রান্তমূলক বা অজ্ঞতাপ্রসূত কথা যা স্বাভাবিক জ্ঞান সম্পন্ন কোন লোক এ কথা বলতে পারে না। কারণ ইসলামে জিহাদ ও যুদ্ধের শিক্ষা মানুষকে ঈমান আনার ব্যাপারে বাধ্য করার জন্য দেয়া হয়নি বরং ইসলামে জিহাদ ও যুদ্ধ দেওয়া হয়েছে ফেৎনা-ফাসাদ দূর করার জন্য, সমাজকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাচাঁনোর জন্যে, জুলুমের হাত থেকে মজলুমকে বাঁচাবার জন্য এবং তাগুতি শক্তির দম্ভ চুরমার করে সেখানে শান্তি ও সাম্যের এক আবাসভূমি তৈরীর জন্য। একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করবে কি করবে না সেটা ব্যক্তির ইচ্ছার উপর হতে পারে। সেখানে ইসলাম কোন শক্তি প্রয়োগে বিশ্বাসী নয় কিন্তু তাই বলে কোন দুষ্টু লোক সমাজে ফাসাদ সৃষ্টি করবে, মানুষের জানমালের ক্ষতিসাধন করবে, মানুষের আব্রু সম্মানে আঘাত হানবে, ইসলামের স্বাভাবিক চলার গতিপথকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্র লিপ্ত থাকবে, যারা দ্বীনকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদের নির্মূল করতে সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে আর ইসলাম চুপ করে বসে থাকেবে সেটা কখোনই হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ইসলাম তাদের ষড়যন্ত্র ছিন্ন করতেই জিহাদের নির্দেশ দেয়। যেমন আল¬াহ তায়ালা দীপ্ত কন্ঠে বলেনঃ
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ﴾
অর্থাৎ যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে লড়াই করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার জন্য প্রচেষ্টা চালায়, তাদের শান্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলিবিদ্ধ করা হবে বা তাদের হাত পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে৷ অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে৷ দুনিয়ায় তাদের জন্য এ অপমান ও লাঞ্ছনা নির্ধারিত রয়েছে আর আখেরাতের রয়েছে তাদের জন্য এর চাইতেও বড় শান্তি। সূরা মায়েদা-৩৩।
কেননা ফেতনা-ফাসাদ আল্লাহ তা’য়ালা খুবই অপছন্দ করেন। অথচ কাফেররা ফাসাদের চিন্তাতেই ব্যস্ত থাকে। তাই আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেছেন,
(كُلَّمَا أَوْقَدُوا نَارًا لِّلْحَرْبِ أَطْفَأَهَا اللَّهُ ۚ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا ۚ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ) তারা (কাফেররা) যতবার যুদ্ধের আগুন জ্বালায় ততবারই আল্লাহ তা’য়ালা তা নিভিয়ে দেন৷ তারা জমিনে ফাসাদ করে বেড়ায় , কিন্তু আল্লাহ তাআলা ফাসাদ সৃষ্টিকারীদেরকে কখনো পছন্দ করেন না”। [সূরা আল-মায়িদাহ ৬৪]
এজন্য আল্লাহ ্ তা’আলা জিহাদের মাধ্যমে এসব দুষ্টু লোকের সৃষ্ট যাবতীয় অনাচার দূর করার জন্য মু’মিনদের নির্দেশ দেন। ইসলাম জিহাদ এবং যুদ্ধের অনুমতি দিলেও জিহাদের ময়দানে স্ত্রীলোক, শিশু, বৃদ্ধ এবং অচল ব্যক্তিদের হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। ইসলামের এ মহান কর্মপদ্ধতিতে প্রমান করে যে, ইসলাম জিহাদ ও যুদ্ধের দ্বারা মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করে না, বরং এর দ্বারা দুনিয়া থেকে অন্যায় অত্যাচার দূর করে ন্যায়-ইনসাফ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
**ইসলাম দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে মুসলিমদের উপর শক্তি প্রয়োগ করতে চায় :
কোন কোন নামধারী মুসলিম ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। তারা ইচ্ছা হলে তা পালন করে আবার ইচ্ছা হলে তা পরিহার করে। তারা মনে করে ইসলামের হুকুম-আহকাম পালন করার ক্ষেত্রে কোন “জোর-জবরদস্তি নেই” তাই তারা নিজেদের ইচ্ছামত বল্গাহীন জীবন-যাপন করতে চায়। তাদেরকে এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে যে, ইসলাম বলেছে যে, শুধুমাত্র যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদেরকে জোর করে ইসলামে আনা যাবে না। কিন্তু যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করে তারা ইসলামের প্রতিটি আইন ও যাবতীয় হুকুম-আহকাম বিশেষ করে আল্লাহর ফরজ বিধানগুলি মানতে তারা বাধ্য। সেখানে শুধু জোর-যবরদস্তিই নয় বরং শরীআত না মানার শান্তি ও ইসলামে নির্ধারিত রয়েছে। যেমন নামাজের ব্যপারে বিভিন্ন হাদীসের আলোকে আহলে সুন্নাত বিদ্বানগণের মধ্যে ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, এবং প্রাথমিক ও পরবর্তী যুগের প্রায় সকল ওলামায়ে-কেরামগণ এই মর্মে একমত হয়েছেন যে, ঐ ব্যক্তি ‘ফাসিক্ব’ এবং তাকে তওবা করতে হবে। যদি সে তওবা করে নামাজ আদায় শুরু না করে, তবে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড। আর ইমাম আবু হানীফা (রহ.) মতে, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং নামাজ আদায় না করা পর্যন্ত জেলখানায় আবদ্ধ রাখতে হবে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন, ঐ ব্যক্তিকে নামাজের জন্য ডাকার পরেও যদি সে ইনকার করে ও বলে যে ‘আমি নামাজ আদায় করব না’ এবং এইভাবে ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায় তখন তাকে কঠোর শাস্তি ওয়াজিব। অবশ্যই এরূপ শাস্তিদানের দায়িত্ব হ’ল ইসলামী সরকারের। শুধু তাই নয় প্রয়োজনে তাদের সাথে যুদ্ধ করে তাদেরকে দ্বীনের যাবতীয় আইন মানতে বাধ্য করানো অন্যান্য মুসলিমদের উপর ওয়াজিব। (তাফসীরে আবু বকর যাকারীয়া) যেমনটি সিদ্দিকে আকবর আবু বকর রাদিয়াল¬াহু আনহুর খেলাফত কালে যাকাত প্রদানে অনীহাকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার দ্বীন সঠিকভাবে বুঝার তৌফিক দান করুন এবং সকল ধরনের ফেতনা-ফাসাদ হতে দূরে থাকার পথকে সহজ করে দিন আমিন।

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ঙ. বিবাহ করা: সাহাল তাস্তীরা, সুফ্ইয়ান ইবনে উয়াইনাহ্ প্রমুখের মতে বিবাহের সাথে বৈরাগ্য বা অবৈরাগ্যের কোন সংস্রব নেই। এর প্রমাণ রসূলুল্লাহ্ (স.) ছিলেন মানব জাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ‘যাহিদ’ এবং তিনি ছিলেন সমগ্র জগদ্বাসীর মহান শিক্ষক। তা সত্ত্বেও তিনি স্ত্রী গ্রহণ করা পছন্দ করতেন ও তাঁদেরকে খুব ভালবাসতেন। বিয়ের ফলে বংশ রক্ষা এবং আল্লাহ্র বান্দা ও নবী করীম (স.) এর উম্মত সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পথ প্রশস্ত ও মানুষ হিসেবে নিজেকে পবিত্র রাখা সম্ভব হয়। নবী করীম (স.) বিয়ের বহু ফযীলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ‘‘তোমরা প্রেমময়ী, অধিক সন্তানসম্ভবা নারীকে বিয়ে করবে। কারণ আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মতের উপর গর্ব করবো’’। ‘‘দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৭, এই গ্রন্থে হাদিসটি আবু দাউদ শরীফ, খ. ১, পৃ. ২৯৬।’’ তিনি আরো বলেন: ‘‘যে ব্যক্তি পূত: পবিত্র অবস্থায় আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ করতে চায় সে যেন স্বাধীন নারীর প্রণয়বদ্ধ হয়। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৮, এই গ্রন্থে হাদিসটি ইবনে মাজা, পৃ. ১৩৫ থেকে উদ্ধৃত’’। আমি নামাজ আদায় করি, ঘুমাই, রোজা রাখি আবার ইফতারও করি এবং নারীদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে আমার দলভুক্ত নয়’’। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৯।’’ এ ছাড়াও রসূলুল্লাহ (স.) ঘোষণা করেন: ‘‘যখন তুমি বিয়ে করলে তখন অর্ধেক দীন পূর্ণ করলে; এর অর্থ হলো, বিয়ে মানুষকে যৌনতা, ব্যভিচার, সমকাম থেকে ফিরিয়ে রাখে, যা এ পৃথিবীর অর্ধেক পাপ’’। ‘‘নায়েক, ডা. জাকির. লেকচার সমগ্র, ঢাকা: সিদ্দিকীয়া পাবলিকেশন্স, ২০১০, পৃ. ৪২৪’’। অত:পর অবশিষ্ট অর্ধেকের জন্য সে যেন আল্লাহকে ভয় করে। ‘‘দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৯, এই গ্রন্থে হাদিসটি মিশকাত শরীফ, খ. ২. পৃ. ২৬৮ থেকে উদ্ধৃত’’। বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহ্রও তাগিদ আছে: ‘‘তোমাদের মধ্যে যাহারা ‘আয়্যিম’ তাহাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যাহারা সৎ তাদেরও’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৪:৩২’’। আল্লাহ্ আরো বলেন: ‘‘আর তাঁহার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রহিয়াছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন তোমাদের সংগিনীদিগকে যাহাতে তোমরা উহাদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রহিয়াছে’’। আল-কুরআন, ৩০:২১’’। ইমাম গাযালী (র.) এর মতে, বিয়ে করলে যদি স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আল্লাহ্ তাআলাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে এমন ব্যক্তির পক্ষে বিয়ে না করাই ভাল। কিন্তু বিয়ে না করলে ঐ ব্যক্তির যদি ব্যভিচারে বা এ জাতীয় গুরুতর পাপে লিপ্ত হওয়ার ভয় আছে বলে মনে হয়, তবে এ পরিস্থিতিতে ‘যুহদ’-এর পরিচয় হল তার পক্ষে এমন অনাকর্ষনীয়া গুণবতী সক্ষম নারীকে বিয়ে করা যে তাকে দৈহিকভাবে পরিতৃপ্ত ও ব্যভিচার মুক্ত রেখে একাগ্র মনে আল্লাহ্র ইবাদতে সহায়তা করবে’’। ‘‘ইমাম গাযালী, কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, খ. ৪ পৃ. ১৭৬’’।
চ. ঐশ্বর্য ও মান-সম্মান: ধনৈশ্বর্য ও মান-সম্মান, এ দু’টির লোভ সংসার জীবনে বিষের মতো ক্ষতিকর ও মারাত্মক; তবে এ দু’টি থেকে একান্ত প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্রহণ করা বিষ অপহারক মহৌষধের মতো কাজ করে এবং ঐ পরিমাণ ধন ও মান সাংসারিক ভোগবিলাসের মধ্যে গণ্য হয় না। একান্ত প্রয়োজনীয় পরিমাণ ধন ও মান আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে পারলৌকিক হিতকর বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য। তবে পুণ্যার্জনের লক্ষ্যে দান খয়রাতের সময় আল্লাহ্ নিজের নিতান্ত প্রয়োজনের দিকেও লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেন: ‘‘তুমি তোমার হস্ত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখ না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না, তা হলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে।’’ ‘‘আল-কুরআন, ১৭:২৯’’।
আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদিগকে আল্লাহ্র স্মরণে উদাসীন না করে, যাহারা উদাসীন হইবে তাহারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’’ ‘‘আল-কুরআন, ৬৩:৯’’। নবী করীম (স.) বলেন: ‘‘যাহাকে আল্লাহ্ তাআলা দয়া করিয়া ইসলামের পথ দেখাইয়াছেন এবং অভাব মোচনের পরিমাণ ধন দান করিয়াছেন, আর সে ব্যক্তিও উহাতে পরিতৃপ্ত রহিয়াছে-এমন ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান’’। ‘‘ইমাম গাযালী, কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৬৪’’।
‘যুহদ’ প্রসঙ্গের সারার্থ: মানুষ পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাস ও লোভনীয় বিষয়াদির চিন্তা ও আকর্ষণ হতে নিজের মনকে মুক্ত করে নির্লিপ্ত ও নির্বিকার হওয়ার অভ্যাস করলে, পরিণামে সে এমন সৌভাগ্য লাভ করতে পারে যে, ইহলোক ত্যাগ করে পরলোক গমন কালে তার মন দুনিয়ার দিকে আকৃষ্ট থাকবে না এবং দুনিয়ার মায়ায় এর প্রতি বার বার ফিরে ফিরে তাকাবে না। যে ব্যক্তি দুনিয়াকে নিজ শান্তি ও আরাম-আয়েশের স্থায়ী আবাস মনে করে, সে ব্যক্তিই দুনিয়া ছেড়ে যাবার কালে দুনিয়ার প্রতি ফিরে ফিরে তাকায়। দেহের বন্ধনের কারণে দেহ সেখানে থেকে যেতে চায়, আর মৃত্যুকালে আক্ষেপ করে বলে- ‘জীবন এত ছোট কেনে’!
আবু সুলাইমান দারানী (র.) এর কাছে এক লোক জিজ্ঞেস করেছিল আল্লাহ্ তাআলা যে বলেন: ‘‘সেদিন উপকৃত হইবে কেবল সে, যে আল্লাহ্র নিকট আসিবে বিশুদ্ধ (সালীম) অন্তঃকরণ লইয়া’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৬:৮৯’’। কেমন অন্ত:করণ বা হৃদয়কে ‘সালীম’ হৃদয় বলা যাইবে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘যে হৃদয়ে আল্লাহ্ তাআলা ভিন্ন অন্য কোন পদার্থের স্থান নাই, সে হৃদয়কে ’সালীম’ ও সুস্থ হৃদয় বলা যাইবে।’’ ‘‘ইমাম গাযালী, কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৬৬’’।
এই যেখানে ‘যুহদ’-এর পার্থিব জগতের জীবন দর্শন সেখানে বলদর্পী পাশ্চাত্যের পার্থিব জগতের বস্তুগত সাফল্যের নিরিখে গড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের বস্তুগত-দর্শন সকল যুগের জন্যই নেহায়েতই বালখিল্য এবং অচল। বস্তুবাদী পাশ্চাত্যের প্রভাবে আজকের বাস্তবতায় হয়তো এ জীবন অকল্পনীয়, তবে এই হলো আদর্শ জীবন, যেমন অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাজারে আদর্শ অকল্পনীয় ‘পূর্ণ-প্রতিযোগিতা’-অবাস্তব হলেও যার আলোচনা আমরা করি। ‘যুহদ’ ব্যক্তিগণ দরিদ্র নন, তাঁদের অবস্থান দারিদ্র্য বিষয়ক আলোচনার ঊর্ধ্বে; কারণ যাঁর স্বভাবে মহত্ত্ব আছে দারিদ্র্য তাঁকে দরিদ্র করতে পারে না।
বস্তুগতভাবে দরিদ্র: ইসলামী পরিভাষায় বস্তুগতভাবে দরিদ্র সেই ব্যক্তি, যার নিজের নানাবিধ পার্থিব অভাব মোচনের মত অর্থ-সম্পদ নেই এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ-সম্পদ উপার্জনের সামর্থ্যও নেই। তবে দারিদ্র্যের ব্যাপক অর্থ বুঝতে হলে, ধনী কে তা আগে বুঝতে হবে। ধনী তিনিই যাঁর কোন কিছুর অভাব নেই এবং যিনি কারো মুখাপেক্ষীও নন। এই অর্থে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ ধনী নন। মানব, দানব, ফেরেশ্তা, শয়তান বা আর যা কিছু সৃষ্টি জগতে বিদ্যমান, তাদের কারোই নিজ অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব তাদের নিজ ক্ষমতা বলে হয়নি এবং সে সব তাদের আয়ত্তেও নেই। তারা সবাই পরমুখাপেক্ষী এবং দরিদ্র। আল্লাহ্ বলেন- ‘‘আল্লাহ্ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪৭:৩৮।’’ ‘‘এবং তাঁহার সমতুল্য কেহই নাই’’। ‘‘আল-কুরআন, ১১২:৪’’। ‘‘তোমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, দয়াশীল। তিনি ইচ্ছা করিলে তোমাদিগকে অপসারিত করিতে এবং তোমাদের পরে যাহাকে ইচ্ছা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করিতে পারেন, যেমন তোমাদিগকে তিনি অন্য এক সম্প্রদায়ের বংশ হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬:১৩৩’’। আয়াতটিতে ‘গণীমত’ অর্থাৎ ধনীর ভাবার্থ এই বুঝানো হয়েছে যে, ‘‘যিনি ইচ্ছা করিলে পৃথিবীস্থ সমস্ত কিছুই ধ্বংস করিয়া দিয়া তদস্থলে যাহা ইচ্ছা তাহাই সৃজন করিতে পারেন। ইহাতে বুঝা যাইতেছে, একমাত্র আল্লাহ্ তাআলা ভিন্ন যাবতীয় সৃষ্ট পদার্থই ফকির’’ ‘‘ইমাম গাযালী, কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৩৪-১৩৫’’। অর্থাৎ দরিদ্র-পার্থিব ধন-সম্পদ যার যাই থাক না কেন। মানুষ পার্থিব জীবনে বহুবিধ অভাবের সম্মুখীন। ধন-সম্পদের অভাবও তাদের একটি। অন্যান্য যাবতীয় পদার্থের অভাব যেমন দারিদ্র, অর্থ-সম্পদের অভাবও তেমন দারিদ্র্য।
দু’কারণে মানুষ নির্ধন হয়: প্রথমত, কোন ব্যক্তি হয়তো স্বেচ্ছায় ধন ত্যাগ করে-এ প্রকার ব্যক্তি ‘যাহিদ’ এর পর্যায়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, কোন ব্যক্তির হয়তো ধন হাতে আসে না-এ প্রকার লোক ফকির বা দরিদ্র। বস্তুতঃ ধন-সম্পদে অভাবী লোকই দরিদ্র। এ প্রকার অভাবী লোক তিন শ্রেণীর হতে পারে: (১) ধন নেই, কিন্তু ধন উপার্জনের জন্য যারপর নাই তৎপর-এরা লোভী শ্রেণীর দরিদ্র। (২) যে দরিদ্র ব্যক্তি রিক্ত হস্ত হওয়া সত্ত্বেও ধন লাভের স্পৃহাকে সম্পূর্ণ দমন করে ফেলেছে, কেউ দান করলেও গ্রহণ করে না এবং ধন হাতে রাখাকে সর্বান্তকরণে ঘৃণা করে-এ ব্যক্তি ‘যাহিদ’। এঁদের বিষয়ে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। (৩) যে দরিদ্র ব্যক্তি ধন উপার্জনের জন্য চেষ্টা করে না, কিন্তু চেষ্টা বিনা ধন হাতে এলে তা ফেলে দেয় না, কেউ দান করলে গ্রহণ করে কিন্তু না দিলেও সন্তুষ্ট থাকে-এ ব্যক্তি আপন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট দরিদ্র। শরীয়তের বিধান মতে সকল শ্রেণীর দরিদ্র লোকই দারিদ্র্যের সুফল ভোগ করবে, এমন কি লোভী দরিদ্র হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও যদি ধন লাভে বঞ্চিত হয়ে দরিদ্র থেকে যায় সে-ও দারিদ্র্যের সুফল ভোগ করবে। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৬।’’
দারিদ্র্যের ফযীলত: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরগণের জন্য’’। আল্লাহ্ তা’আলার কাছে ফকির বা দরিদ্রদের মর্যাদা এত উচ্চ যে, তিনি এই আয়াতে দরিদ্রদেরকে মুহাজিরদের অগ্রবর্তী করেছেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি নিজের দরিদ্র অবস্থার প্রতি এতটাই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত যে, কেউ কিছু দিলেও তা গ্রহণ করে না এবং ধন-সম্পদকে ঘৃণা করে, এ সব লোক ধনী লোকের পাঁচ শত বছর আগে বেহেশতে যাবে। আর যারা ধনোপার্জনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও ধনী হতে পারেনি, এই শ্রেণীর লোভী দরিদ্রলোক সৎভাবে মৃত্যুবরণ করলে ধনী লোকের চল্লিশ বছর আগে বেহেশতে যাবে। ‘‘রসূলুল্লাহ্ স. বলেছেন: আমার প্রিয় দুইটি পেশা আছে, যে ব্যক্তি উক্ত পেশাদ্বয়কে ভালবাসে সে যেন আমাকেই ভালবাসে। আমার সেই পেশা দুইটির একটি দরিদ্রতা, অপরটি জিহাদ’’। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৬-১৩৭’’।
নবী করীম স.-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ্ যা বলেন তার সারমর্ম এই: ‘‘হে মুহাম্মদ! আপনি দুনিয়া এবং দুনিয়াদারদের পার্থিব সৌন্দর্যের প্রতি নজর দেবেন না; এই পার্থিব সম্পদ তাদের বিপদের কারণ হবে। আল্লাহ্ তাআলার কাছে আপনার জন্য যা রক্ষিত আছে তা অতি উৎকৃষ্ট ও চিরস্থায়ী’’। ‘‘আল-কুরআন, ২০:১৩১’’।
নবী করীম (স.) বলেছেন: ‘‘আমাকে বেহেশ্ত দেখান হইয়াছিল। দেখিলাম-বেহেশ্তবাসীদের অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণীর লোক। দোযখও আমাকে দেখান হইয়াছিল। তথায় দেখিলাম, অধিকাংশ দোযখীই ধনী শ্রেণীর লোক। আমি বেহেশ্তে স্ত্রীলোকদের সংখ্যা খুব অল্প দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম: স্ত্রীলোকরা কোথায়? উত্তর আসিল: দুইটি রঙ্গিন পদার্থ অর্থাৎ স্বর্ণ এবং যাফরান তাহাদিগকে বেহেশ্ত হইতে বঞ্চিত রাখিয়াছে’’। ‘‘ইমাম গাযালী, কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৮’’। নবী করীম (স.) আরো বলেন: ‘‘আল্লাহ্ তাআলা যখন মানুষকে অতিমাত্রায় ভালবাসেন, তখন তাদের উপর নানাবিধ বিপদ-আপদ চাপাইয়া দেন। আর যাহাদিগকে পূর্ণমাত্রায় অত্যন্ত ভালবাসেন তাহাদিগকে ‘একতেনা’ করেন। সাহাবীগণ ‘একতেনা’ শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিয়াছিলেন: ‘কাহারও ধন-সম্পদ সমূলে বিনষ্ট করিয়া দেওয়া এবং পরিজনকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করিয়া ফেলাকে ‘একতেনা’ বলা হয়’’। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৯’’। (অসমাপ্ত)

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
“ফলকথা সংসারের মোহ হইতে হৃদয়ের আকর্ষণ ছিন্ন করতঃ উহা হইতে সম্পূর্ণ অনাসক্ত ও নির্লিপ্ত থাকাই বৈরাগ্যের লক্ষণ। অর্থাৎ সংসারের অন্বেষণে ব্যস্তও হইয়া পড়িবে না কিংবা সংসার ত্যাগ করিয়া জঙ্গলের দিকে পলায়নও করিবে না; সংসারের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া সর্বদা সর্বক্ষেত্রে উহার প্রতিকূল আচরণও করিবে না কিংবা সন্ধিসুলভ মনোভাব লইয়া সংসারের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশিয়াও থাকিবে না। সংসারকে লোভনীয় জ্ঞানে ভালও বাসিবে না কিংবা বর্জনীয় জ্ঞানে শক্রুও মনে করিবে না”। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭” এ পৃথিবীর জীবন যাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বনই করাই শ্রেয়। আল্লাহ্ বলেন: “এইভাবে আমি তোমাদিগকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে”। “আল-কুরআন, ২:১৪৩”
‘যাহিদ’ ব্যক্তিগণ শুধু শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম বস্তুই পরিহার করে চলেন না, আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের জন্য এমন কি হালাল বস্তু ভোগেও নিরাসক্ত হন। ইহকালে তাঁদের জীবনে “ৎবষরমরড়ঁং সড়ঃরাবং ধৎব সড়ৎব রহঃবহংব ঃযধহ বপড়হড়সরপ” “গধৎংযধষষ, অষভৎবফ, চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ ঊপড়হড়সরপং, খড়ফহড়হ: ঊরমযঃ ঊফরঃরড়হ, ঞযব ঊহমষরংয খধহমঁধমব ইড়ড়শ ঝড়পরবঃু ধহফ গধপসরষষধহ ্ ঈড় খঃফ, ১৯৬২, ঢ়.ষ.” এবং মানুষের অর্থনৈতিক জীবনাচরণের পাশ্চাত্যের সনাতন অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা এখানে অচল। পার্থিব জীবনের প্রতি ‘যাহিদ’-এর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে যেয়ে ইমাম গাযালী (র.) বলেন:
“মানব জাতি সংসাররূপ জেলখানায় আসিয়া বন্দী হইয়া পড়িয়াছে। এই জেলখানায় আপদ-বিপদ ও দুঃখ-কষ্টের অন্ত নাই। মানব জাতিকে এই বন্দীখানায় অবস্থানকালে অসংখ্য বিপদ-আপদ ভোগ করিতে হয়। উক্ত বিপদরাশির মধ্যে জীবন যাপনের জন্য মানবজাতি বিশেষ করিয়া ছয় প্রকার দ্রব্যের মুখাপেক্ষী হইয়া থাকে। (ক) অন্ন বা আহার্যদ্রব্য, (খ) বস্ত্র; (গ) বাসগৃহ, (ঘ) গৃহের আসবাবপত্র, (ঙ) পতœী, (চ) ঐশ্বর্য ও সম্মান। সাংসারিক জীবনের এই ষড়বিধ পদার্থ মানবজাতির জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয় ও একান্ত আবশ্যকীয়”। “ইমাম গাযালী, কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৭”।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে জীবনধারণের এ পার্থিব তালিকা সর্বজনীন; কিন্তু সর্বজনীন এ বিষয়গুলোর ব্যবহারগত দৃষ্টিভঙ্গি একজন ‘যাহিদ’ অপরাপর সাধারণ মানুষ, যাদের অর্থনৈতিক জীবন ব্যাখ্যায় সনাতন অর্থনীতিকে বলা হয়: “ঊপড়হড়সরপং রং ধ ংঃঁফু ড়ভ সধহশরহফ রহ ঃযব ড়ৎফরহধৎু নঁংরহবংং ড়ভ ষরভব; রঃ বীধসরহবং ঃযধঃ ঢ়ধৎঃ ড়ভ রহফরারফঁধষ ধহফ ংড়পরধষ ধপঃরড়হ যিরপয রং সড়ংঃ পষড়ংবষু পড়হহবপঃবফ রিঃয ঃযব ধঃঃধরহসবহঃ ধহফ রিঃয ঃযব ঁংব ড়ভ ঃযব সধঃবৎরধষ ৎবয়ঁরংরঃবং ড়ভ বিষষনবরহম” “গধৎংযধষষ, অষভৎবফ, চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ ঊপড়হড়সরপং, ও ন ও ফ, ঢ়. ষ.” এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পার্থিব জীবনে জীবনধারণের এ সর্বজনীন তালিকা একজন ‘যাহিদ’ কিভাবে ব্যবহার করেন এবং কোন দৃষ্টিতে দেখেন তা বিশ্লেষণ করলেই সাধারণ সংসারি মানুষ থেকে ‘যাহিদ’-এর পার্থক্য বুঝা যাবে “ইমাম গাযালী, কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৭-১৭৭”।
ক. অন্ন বা আহার্য দ্রব্য: আহার্য দ্রব্যের মধ্যে যারা চাল, গমের আটা, ময়দা, সুজি, চিকন চাউলের অন্ন আহার করে তারা সংসার বিরাগী নয়; তারা শরীরসেবী এবং আরামপ্রিয় বলে আখ্যায়িত। যে ব্যক্তি যত নিচুমানের খাদ্যে পরিতৃপ্ত থাকেন তিনি ততোধিক ‘যাহিদ’ বা সংসার বিরাগী। ‘যাহিদ’ ব্যক্তির আহার্য দ্রব্যের পরিমাণের তিনটি স্তর নির্ধারিত। কমের মধ্যে দৈনিক আনুমানিক এক পোয়া। মধ্যম, পরিমাণ দৈনিক অর্ধ সের এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ এক সের। এর মধ্যে যাঁরা সর্বোচ্চ পরিমাণ আহার্য গ্রহণ করেন, তারা সাধারণ পর্যায়ের ‘যাহিদ’। কিন্তু যারা এ সর্বোচ্চ পরিমাণের ঊর্ধ্বে আহার করেন, তারা উদরসেবী ও আরামপ্রিয়- ‘যাহিদ’ নন।
‘যাহিদ’ কি পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য সঞ্চয় করে রাখতে পারে তাও নির্ধারিত। এক বেলার খাদ্য সঞ্চয়ে রাখা উন্নত শ্রেণীর ‘যাহিদ’ বা পরহেযগারীর পরিচায়ক; এর অধিক খাদ্য সঞ্চয়কারী উন্নতস্তরের ‘যাহিদ’ নয়। ত্রিশ থেকে চল্লিশ দিনের খাদ্য যে সংগ্রহে রাখে সে মধ্যম শ্রেণীর ‘যাহিদ’। আর সর্বনিচু পর্যায়ের ‘যাহ্দি’ এক বছরের আহার সঞ্চয়ে রাখা। এক বছরের অধিক কালের জন্য খাদ্য সঞ্চয়কারী ‘যাহ্দি’ নয় কারণ সে এক বছরের অধিক কাল বাঁচার আশা রাখে।
“রসূলুল্লাহ্ (স.) নিজের পরিবারবর্গের জন্য এক বছরের খাদ্য সঞ্চয়পূর্বক তাঁহাদের হাতে সমর্পণ করিতেন। কেননা, তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করিতে পরিতেন না। কিন্তু তিনি নিজের জন্য রাত্রির আহার্যও দিবসে সংগ্রহ করিয়া রাখিতেন না”। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৮” রুটি বা অন্নের সাথে সিরকা বা শাক নিতান্ত নিচু মানের ব্যঞ্জন বলে তা উন্নত শ্রেণীর ‘যাহিদ’-এর খাদ্য। তৈল বা তৈল-পক্ক দ্রব্য মধ্যম শ্রেণীর ব্যঞ্জন। গোশত উৎকৃষ্ট শ্রেণীর ব্যঞ্জন এবং প্রবৃত্তির লোভনীয় খাদ্য যা অবিরত খেলে যাহিদ-এর উচ্চমান বিনষ্ট হয়। সপ্তাহে দুই একবার গোশত খাওয়া যেতে পারে। ‘যাহিদ’ ব্যক্তির পক্ষে দিন ও রাতের মধ্যে এক বেলার বেশি আহার করা সঙ্গত নয়। এক দিনে দু’বার আহার করলে যাহিদ-এর মান ধরে রাখা যায় না। ‘যুহ্দ’ বিষয়ে সম্যক্ ধারণা লাভের জন্য নবী করীম (স.) ও তাঁর সাহাবাদের জীবন প্রণালী অনুসরণই যথেষ্ট। আয়েশা রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ্ (স.) এর পারিবারিক জীবনের অবস্থা কখনও কখনও এমন হইত যে, ক্রমাগত চল্লিশ দিন ধরিয়া তৈলের অভাবে তাঁহার গৃহে রাত্রিকালে প্রদীপ জ্বলিত না এবং খোরমা ও পানি ব্যতীত অন্যবিধ কোন পাকান খাদ্য আহার করিতে পাওয়া যাইত না। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৮”
খ. পরিধেয় বস্ত্র: ‘যাহিদ’ ব্যক্তিকে কেবল একান্ত প্রয়োজনীয় পরিধেয় বস্ত্রেই পরিতৃপ্ত থাকতে হয়, এর বেশী নয়। সাধারণ শ্রেণীর ‘যাহিদ’-এর জন্য দু’টি লম্বা পিরহান, একটি টুপি, এক জোড়া জুতা এবং এর সাথে দু’টি পায়জামা ও একটি পাগড়িই যথেষ্ট।
“রসূলুল্লাহ্ (স.) এর ইন্তিকালের পর আয়েশা (রা.) একখানা সূতীর মোটা তহ্বন্দ ও একখানি পশমী কম্বল বাহির করিয়া বলিয়াছিলেন-‘ইহাই রসূলুল্লাহ্ (স.) এর সাকুল্য পোশাক” “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৯” হাদীসে উল্লেখ আছেÑ “যে ব্যক্তি জাঁকজমক ও আড়ম্বরপূর্ণ পরিচ্ছদ পরিধান করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ্ তাআলার উদ্দেশ্যে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনে তদ্রƒপ পরিচ্ছদ পরিধান না করিয়া দীন-হীন পোশাক পরিধান করে, তবে তৎপরিবর্তে তাহাকে পরকালে বেহেশতের বিচিত্র কারুকার্যময় সুন্দর পোশাক ইয়াকুত প্রস্তর নির্মিত নৌকার মধ্যে বোঝাই করিয়া দান করা আল্লাহ্র উপর তাহার প্রাপ্য দাবিরূপে অবধারিত হইয়া পড়ে”। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৯”
গ. বাসগৃহ: ঝড়-বৃষ্টি ও শীত-গ্রীষ্ম থেকে আত্মরক্ষার জন্য বাসগৃহের প্রয়োজন হলেও সেটা এমন অস্থায়ী হওয়া উচিত যেন এই অস্থায়ী সংসারে যুহদ অবলম্বনে তা বাধার কারণ না হয়। যাহিদ ব্যক্তির জন্য বাড়ি অনাবশ্যক উঁচু বা প্রশস্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ হলে তাঁরা জাহিদ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত থাকবেন না। মূলত, কেবল ঝড়-বৃষ্টি ও শীত-গ্রীষ্ম হতে আত্মরক্ষার জন্যই নিবাস নির্মিত হবে, ধনৈশ্বর্য ও জাঁকজমকের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের জন্য নয়। হাসান (রা.) বলেছেন- রসূলুল্লাহ্ (স.) এর বাসগৃহগুলো এতটা উচ্চ ছিল যে, একজন মানুষ মেঝের উপর দাঁড়াইয়া হাত উঁচু করিলে গৃহগুলোর ছাদ স্পর্শ করিতে পারিত”। ‘‘প্রাগুক্ত পৃ.১৭২’’ “যে ব্যক্তি আবশ্যকের অতিরিক্ত গৃহ নির্মাণ করিবে-কিয়ামতের দিন তাহাকে আদেশ করা হইবে, এই গৃহ মাথায় লইয়া দাঁড়াও। কিন্তু শীত-গ্রীষ্ম হইতে আত্মরক্ষার জন্য যত বড় গৃহের একান্ত প্রয়োজন তত বড় গৃহ নির্মাণ করিলে শাস্তি ভোগ করিতে হইবে না। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭২”
ঘ. গৃহের আসবাবপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য: ‘যাহিদ’ হিসেবে ঈসা (আ.) এর জীবন ধারণ পদ্ধতিই সর্বোত্তম। তিনি সঙ্গে একটি চিরুনি ও একটি পান-পাত্র রাখতেন। একদিন এক ব্যক্তিকে হাতের আঙ্গুল দিয়ে দাড়ি আঁচড়াতে এবং অঞ্জলি ভরে পানি পান করতে দেখে চিরুনি ও পানপাত্রটি বর্জন করেন। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩।’’ নবী করীম (স.) একটি চামড়ার তৈরি খোলের ভেতর খেজুর গাছের সরু আঁশ ভর্তি বালিশ ও একটি পশমী কম্বল রাখতেন। পশমী কম্বলটি দু’ভাঁজ করে তাঁর শয্যা রচনা হতো। একদিন নবী করীম (স.) এর পাঁজরে খেজুর পাতার তৈরী চাটাইয়ের দাগ অঙ্কিত দেখে উমর (রা.) কাঁদতে কাঁদতে বললেন, রোম দেশের ‘কায়সার’ এবং পারস্য দেশের ‘কিসরা’ উপাধিধারী কাফের বাদশাহ্গণ আল্লাহ্র শত্র“ হয়েও তাঁর প্রদত্ত ভুরি ভুরি নেয়ামতের মধ্যে ডুবে রয়েছে। আর আপনি আল্লাহ্ তাআলার বন্ধু এবং তাঁর প্রেরিত রসূল হয়েও এমন কঠিন দু:খ-কষ্ট ভোগ করছেন। তখন নবী করীম (স.) উমর (রা.) কে সান্ত্বনা দিবার জন্য বললেন: উমর! তুমি কি একথা শুনে সন্তুষ্ট হবে না যে, তাদের ভাগ্যে শুধু এই নশ্বর পৃথিবীর ধন-সম্পদই রয়েছে। আর আমাদের জন্য অবধারিত রয়েছে আখিরাতের অনুপম ও চিরস্থায়ী সম্পদ’’। ‘‘প্রাগুক্ত’’ এখানে আলী (রা.) এর একটি অমর উক্তি স্মরণীয়; তিনি বলেন: ‘‘মহা-প্রতাপাম্বিত প্রভু আমাদের ব্যাপারে ভাগ-বণ্টনের যে ফায়সালা করেছেন তাতে আমরা তুষ্ট। তিনি আমাদের জন্য রেখেছেন ইল্ম আর শত্র“দেরকে দিয়েছেন সম্পদ’’। ‘‘মান্নান, অধ্যাপক মাওলানা আবদুল ও অন্যান্য সম্পাদিত, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০০, পৃ. ১৮৯।’’
‘‘হেমস প্রদেশের শাসনকর্তা উমায়র ইবনে সা’দ উমর ইবনুল-খাত্তাব রা.-এর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলে তিনি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: তোমার ব্যক্তিগত ভান্ডারে পার্থিব আসবাবপত্র কি কি আছে? তিনি বললেন, একটি লাঠি আছে, উহার উপর ভর দিয়া চলি এবং তাদ্বারা সর্প ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীকে আঘাত করি। একটি চামড়ার থলি আছে, উহাতে খাদ্য দ্রব্যাদি রাখি। একটি পাত্র আছে, উহাতে আহার্য রাখিয়া আহার করি, আবার প্রয়োজন হইলে উহাতে পানি মস্তক ও বস্ত্রাদি ধৌত করি। আর একটি ঘটি আছে, তাহাতে পানীয় রাখিয়া পান করি। আবার প্রয়োজনবোধে উহা দ্বারা উযু-গোসলও করিয়া থাকি। এই কয়েকটি পদার্থই আমার গৃহ-সামগ্রীর মধ্যে আসল। এতদ্ব্যতীত আর যে কয়েকটি পার্থিব সামগ্রী আমার অধিকারে রহিয়াছে তাহা ইহাদের আনুষঙ্গিক’’। ‘‘কিমিয়ায়ে সাআদাত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৪।’’ নবী করীম স. নিজ অধিকারে কোন স্বর্ণ-রৌপ্য রাখতেন না এবং যারা এসব অধিকারে রাখত, এমন কি নিজ সন্তান হলেও তা পছন্দ করতেন না। দরিদ্রদের মাঝে তা বিলিয়ে দিতেন এবং অপরকেও অনুরূপ করতে আদেশ করতেন। ‘‘প্রগুক্ত, পৃ. ৭৫’’। (অসমাপ্ত)

শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় রাসূলুল্লাহ (স.) এর পদক্ষেপ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সমাজের সকলের মাঝে সাম্য প্রতিষ্ঠা ঃ রাসূলুল্লাহ (স.) এর আগমনের সময় মানবজাতি বিভিন্ন শ্রেণী ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। এদের কেউ কেউ নিজেদের দেবতার বংশধর মনে করত, আবার কেউ কেউ মনে করত তাদের শরীরে রাজ-রাজাদের রক্তধারা প্রবাহিত। এক কারণে তারা নিজেদেরকে অন্য থেকে শ্রেয় মনে করত। আবার কাউকে মনে করত আল্লাহর মস্তকে থেকে সৃষ্ট। সে জন্য অন্যরা তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করত। অন্যদিকে কাউকে ভাবত আল্লাহর পদযুগল থেকে সৃষ্ট। এক কারণে তাকে অস্পৃশ্য ও কুলাঙ্গার হিসেবে গণ্য করত। সমাজের প্রভু শ্রেণীদের জন্য তাদের দাস-দাসীদের শাস্তি দেওয়া বা হত্যা করাকে বৈধ মনে করা হত। এ রকম একটি সমাজকে রাসূলুল্লাহ (স.) এমনভাবে পরিবর্তন করেন, যেখানে কোন মানবিক ভেদাভেদ ছিল না। সেখানে তিনি কোন ভাষাগত, দেশগত, শ্রেণিগত, বর্ণগত ও মর্যাদাগত বৈষম্যের চিহ্ন রাখেননি। এ ব্যাপারে তাঁর ঘোষণা ছিল- ওহে মানুষেরা! নিশ্চয় তোমাদের রব এক। তোমাদের পিতা এক। সাবধান! তাক্বওয়া ছাড়া কোন আরবের প্রাধান্য নেই আজমের উপর এবং আজমের উপর এবং আজমেরও প্রাধান্য নেই আরবের উপর। আর কোন লালের প্রাধান্য নেই কালোর উপর এবং কোন কালোর প্রাধান্য নেই লালের উপর। নিশ্চয় আল্লাহর দরবারে তোমাদের মধ্যে সেই সার্বোত্তম যে অধিক মুত্তাকী। সাবধান! আমি কি (রিসালাতের দায়িত্ব) পৌঁছিয়েছি? তাঁরা বললেন: অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল। তখন তিনি বললেন, সুতরাং যে উপস্থিত যে যেন অনুপস্থিতের কাছে পৌঁছে দেয়। রাসূলুল্লাহ (স.) শক্র-মিত্র, সমর্থক বা বিরোধী, মুসলিম বা অমুসলিম সবার সাথে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন। নিজের নিকট আত্মীয় হলেও কোন রকম পক্ষপাতমূলক বিচার করতেন না। একবার মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের জনৈকা মহিলা চুরি করল। উসামাহ (রা.) তার উপর আল্লাহর বিধান কার্যকর না করার সুপারিশ করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করছো? এরপর তিনি দাঁড়ালেন এবং লোকদের উদ্দেশ্য, “হে মানুষেরা তোমাদের পূর্ববর্তীরা এজন্য ধ্বংস হয়ে গেছে যে, যখন তাদের মধ্যে মর্যাদাশীল কেউ চুরি করত তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করত তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত আমি অবশ্যই আর হাত কেটে দিতাম। বানু নাযীর যখন বানু কুরাইয়ার কাউকে হত্যা করত তখন অর্ধেক রক্তমূল্য প্রদান করত, আর যখন বানু কুরাইযা যখন বানু নাযীরের কাউকে হত্যা করত তখন তাদেরকে পূর্ণ রক্তমূল্য পরিশোধ করতে হত। কিন্তু যখন আল-কুরআনের এই আয়াত নাযিল হলো- আর তারা যদি কখনো (কোন বিচার নিয়ে) তোমরা কাছে আসে তাহলে তুমি (চাইলে) তাদের বিচার করতে পারো কিংবা তাদের উপেক্ষা করো। যদি তুমি তাদের উপেক্ষা করো, তা হলে (নিশ্চিত থাকো), তারা তোমরা কোনই অনিষ্ট করতে পারবে না। তবে যদি তুমি তাদের বিচার-ফায়সালা করতে চাও, তাহলে অবশ্যই ইনসাফ সহকারে বিচার করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের মধ্যে সমান রক্তপণ ধার্য করেন। পৃথিবীর কোন বিচারক রাসূলুল্লাহ (স.) -এর মত ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। সত্য ও ন্যায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন একমাত্র তিনিই তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে করে দেখিয়েছেন।
সম্পদের সুষম বন্টনব্যবস্থা প্রবর্তন ঃ রাসূলুল্লাহ (স.) এর সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্যতম দিক ছিল ধন-সম্পদের সুষম বন্টনব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে তিনি বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদে পূর্ণ ব্যক্তিগত মালিকনার স্বীকৃতি দেন। সাথে সাথে মুসলিম সম্পদশালীদের যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করেন এবং তা অনাদায়ে শাস্তির নির্দেশ দেন। এছাড়া অমুসলিমদের ওপর জিয়ইয়া ধার্য করেন। এর পাশাপাশি ধন-সম্পদ যাতে কারো হাতে কুক্ষিগত হয়ে না থাকে সে জন্য তিনি মানুষদের ধন-সম্পদ দান করতে উৎসাহ দেন। সমাজের কল্যাণের স্বার্থে এবং সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য অকাতরে দান করতে অনুপ্রেরণা দান করেন। তিনি নিজেও কোন সম্পদ নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখতেন না। এ ব্যাপারে আবু যার আল-গিফারী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ (স.) এর সাথে মদীনার কঙ্করময় প্রান্তরে হেঁটে চলছিলাম। ইতোমধ্যে উহুদ আমাদের সামনে পড়ল। তখন তিনি বললেন, হে আবু যার! আমি বললাম, লাব্বাইক, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি বললেন, আমার নিকট এ উহুদ পরিমাণ সোনা হোক আর তা ঋণ পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে রেখে দেওয়া ব্যতীত একটি দীনার ও তা থেকে আমার কাছে জমা থাকুক আর এ অবস্থায় তিন দিন অতিবাহিত হোক, তা আমাকে আনন্দিত করবে না। তবে যদি তা আমি আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এভাবে তাকে ডানদিকে, বামদিকে ও পেছনের দিকে বিতরণ করে দেই তা স্বতন্ত্র। এরপর তিনি চললেন। কিছুক্ষণ পর আবার বললেন, জেনে রেখো, প্রাচর্যের অধিকারীই কিয়ামতের দিন স্বল্পাধিকারী হবে। অবশ্যই যারা এভাবে, এভাবে, এভাবে ডানে ও পেছনে ব্যয় করবে, তারা এর ব্যতিক্রম। তবে এ জাতীয় লোক অতি অল্পই। এমনকি বেশি মুনাফা করার আশায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দ্রব্য সামগ্রী আটকে রাখাকে তিনি অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য আটকিয়ে রাখল সে পাপী ও অপরাধী।
জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ঃ রাসূলুল্লাহ (স.) তার প্রতিষ্ঠিত সমাজে সকলের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। অপরের ধন সম্পদ জবর দখল, আত্মসাৎ ও লুন্ঠন করাকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। এটাকে অবৈধ বলে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যে অন্যায়ভাবে অপরের জমির এক বিঘত পরিমাণ অংশও জবর দখল করবে, তার গলায় সপ্ত যমীনের হার ঝুলিয়ে দেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, যে কোন মুসলমানের অধিকার কেড়ে নিবে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব করে দিবেন এবং জান্নাত হারাম করে দিবেন। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, প্রত্যেকে মুসলিমের জন্য অপর মুসলমানের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মানের উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ হারাম। এ কারণে অন্যের অধিকার আদায়ের বেলায় কোন রকম শৈথিল্য প্রদর্শন করতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রত্যেকে অপরের অধিকারের ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন থাকবে। উচু-নীচু, ধনী-গরীব, শ্রমিক-মজুরসহ সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের নিজ নিজ হকের ব্যাপারে যদি প্রত্যেক নজর রাখে তাহলে এক শান্তিময়, সৌহার্দ্যপূর্ণ সামাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আল্লাহর রাসূল (স.) বলেন আল্লাহ বলেছেন : কিয়ামতের দিনে আমি নিজ তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব। যে ব্যক্তি আমার নামে ওয়াদা ও চুক্তি করে তা ভঙ্গ করেছে, যে ব্যক্তি স্বাধীন মানুষ বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করেছে এবং যে ব্যক্তি কাউকে মজুর নিয়োগ করে সম্পূর্ণ কাজ আদায় করে নিয়েছে, কিন্তু তাকে মজুরী প্রদান করেনি। রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর সমাজে সকলের পূর্ণ মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করেন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সাদা-কালো নির্বিশেষে প্রত্যেককে তার মর্যাদা অনুযায়ী মূল্যায়ন করতেন। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করে কোন কথা বলতেন না এবং কেউ সেটা করলে তা অপছন্দ করতেন। এমনকি তিনি নিজের সম্পর্কে বলেন, আমাকে তোমরা সে রকম উচ্চ প্রশংসা করো না, যেমনটি খ্রিস্টানরা ঈসা ইব্ন র্মাইয়ামকে করেছিল। আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। “যুদ্ধবন্দী শক্রদেরকেও তিনি ন্যায়সঙ্গত মানবিক মর্যাদাদানের নির্দেশ দেন। অন্যায়ভাবে তাদের হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি যিম্মীদের কাউকে হত্যা করল সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ চল্লিশ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণও অবশ্যই পাওয়া যাবে। এছাড়া আল্লাহর রাসূল (স.) স্বয়ং সব সময় ভয়ে থাকতেন যে, কাউকে জুলুম করে বসেন কিনা। একবার এক মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স.) ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি জবাবে বলেন, ‘আমি যদি আল্লাহর অবাধ্য হই তবে কে তাঁর আনুগত্য করবে? (অসমাপ্ত)

শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় রাসূলুল্লাহ (স.) এর পদক্ষেপ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
অন্যদিকে ফিলিস্তিনের অবস্থা আরো ভয়াবহ। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা “ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব আর্থার জেম্স্ বেলফোর তাঁর দেশের ইহুদী নেতা ব্যারন রথচাইন্ডকে লিখিত এক পত্রের মাধ্যমে প্যালেস্টাইনের আরব ভূমিতে একটি ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্র“তি দেন। যাকে ঐতিহাসিক বেলফোর ঘোষণা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।” অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী ইঙ্গ-মার্কিন অন্যয়ভাবে অসহায় ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূখন্ড থেকে উৎখাত করে সেখানে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে আরবদের পরাজিত হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। ইসরাইল কর্তৃক একের পর এক ফিলিস্তিনি ভূখন্ড জোরপূর্বক দখলের মাধ্যমে বহু ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। এরপর প্রায় সাত দশক পেরিয়ে গেলেও উদ্ধাস্তু ফিলিস্তিনিরা আজো তাদের নিজ আবাসে ফিরতে পারেনি। বরং ইসরাইলের নির্যাতনে প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ, শিশু নিহত হচ্ছে। নির্বিচারে বর্ষিত বোমার আঘাতে তাদের ঘর-বাড়ি চূর্ণ-বিচূর্ণ হচ্ছে। ইসরাইলী দখলদার বাহিনী নানা অজুহাতে ফিলিস্তিনিদের তাদের আবাস থেকে উচ্ছেদ করছে। তাদের জায়গা-জমি দখল করছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয়সহ বহু পশ্চিমা দেশ নীরবে তাদের এসব অন্যায় কর্মকান্ডের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা অজুহাতে ইরাককে ধ্বংস করা হয়েছে। সেখানে নির্বিচারে হাজার হাজার নিবীহ ও নিরপরাধ নারী-পুরুষ, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধকে হত্যা করা হয়েছে। আফগানিস্তানও একই পরিণতি ভোগ করেছে। একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে গিয়ে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা হরা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে বহু জনপদ। বন্দী করা হয়েছে বহু মানুষকে। শুধু বন্দী করেই ক্ষান্ত দেয়া হয়নি। বন্দীদের উপর চালানো হয়েছে অমানবিক নির্যাতন। গুয়ানতানামো কারাগারের কথা আমরা জানি। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারাগার, যা বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত। এই কারাগারে বন্দীদের বিনাবিচারে আটক রাখা হয় এবং তথ্য আদায়ের লক্ষ্যে ওয়াটার বোর্ডিংসহ বিবিধ আইন বহির্ভূত উপায়ে নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের প্রকার ও মাত্রা এতই বেশি যে এই কারাগারকে মর্ত্যের নরক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন ও লিবিয়ার ন্যায় সিরিয়া, মিসর ও ইয়ামেনেও যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছে। অন্যায়-অত্যাচার ও জুলুম-নির্যাতনে সেখানের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। সেখানে অমুসলিমদের চেয়ে মুসলিমদের দ্বারাই অন্য মুসলিম নির্যাতিত হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর মুসলিমরা এ সব বন্ধে সেখানে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তারা পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলো দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে। মুসলিম নামধারী কিছু অত্যাচারী শাসক দ্বারা তারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা করছে অমুসলিমরা।
এছাড়া বর্তমানে সারা বিশ্বের অমুসলিম সমাজেও চরম অশান্তি বিরাজমান। বর্তমানের পরিবর্তিত ও কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষের বানানো বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদ মানুষের সামগ্রিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের সঠিক সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তাওহীদ ও আখিরাত বিমুখ কোন জড়বাদী নীতি কখনো সমাজে সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার ইনসাফপূর্ণ কোন কর্মসূচী নেই। এ কারণে আমরা দেখতে পাই, পাশ্চাত্যের পারিবারিক জীবন আজ হুমকির মুখে। সেখানে পিতা তার সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করছে না। একইভাবে সন্তানও পিতা-মাতার প্রতি যথাযথ কর্তব্য পালন করছে না। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের হক আদায় করছে না। ফলে সেখানে এক অশান্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এছাড়া পাশ্চাত্যের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নানাভাবে বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর তাদের অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। যে কারণে বিশ্বশান্তি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ (স.) ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ ধারণার শ্রেষ্ঠত্ব ঃ রাসূলুল্লাহ (স.) এর রিসালাতের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সকল স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে প্রত্যেককে তার পরিপূর্ণ হক দিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা’য়ালা (স.) কে অধিক গুরুত্বসহকারে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল-কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে-অতএব তুমি লোকদেরকে (সেই বিধানের দিকে) ডাকো এবং নিজে অটল থাকো যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছো। তাদের ইচ্ছার অনুসরণ করো না। বলো, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তা বিশ্বাস করেছি। আর আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ আমাদের প্রভু এবং তোমাদেরও প্রভু আমাদের জন্য আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। আমাদের এবং তোমাদের মাঝে কোনো বিবাদ নেই। আল্লাহ আমাদেরকে একত্রিত করবেন। তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। আল-কুরআনের আবেদন অনুসারে তিনি সকলকে এমন এক সমাজ ব্যবস্থার দিকে আহ্বান করেন যেটা পরিপূর্ণ ইনসাফভিত্তিক। এ জন্য তিনি সর্বপ্রথম নিজেকে সমস্ত ভাল গুণে গুণান্বিত করেন। ন্যায়বিচার, আমানতদারী, সত্যবাদিতা, ওয়াদা রক্ষা, ক্ষমা, বিনয় পভৃতি উত্তম মানবিক গুণাবলী ছোটকাল থেকেই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বিশেষ করে তৎকালীন আরব সমাজের নানা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা তাঁকে ব্যথিত করত। সে সময় গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত। তাদের মধ্যে কোন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্য বিদ্যমান ছিল না। সবলরা দুর্বলের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালাতো। সুদের যাঁতাকলে পিষ্ট হতো গরীবরা। আর ধনীরা অর্থনৈতিক নির্যাতনে গরীবদের নিঃস্ব করে দিত। চুরি-ডাকাতি, খুন-রাহাজানি ছিল আরবদের নিত্যদিনের ঘটনা। তাদের এই অবস্থার বর্ণনায় আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-বেদুঈনরা কুফরী ও মুনাফিকিতে অধিক পারদর্শী এবং আল্লাহ তাঁর রাসূসের ওপর যা নাযিল করেছেন তার সীমারেখা সম্বন্ধে তারা অধিকতর অজ্ঞ। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ।
সমাজের এই অশান্তিময় অবস্থা রাসূলুল্লাহ (স.)কে সারাক্ষণ কষ্ট দিত। তিনি সব সময় চিন্তা করতেন কিভাবে সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। এ কারণে আমরা দেখতে পাই নুবুওয়াতের আগেই যুবক মুহাম্মদ (স.) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুবকদের নিয়ে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। এর নামকরণের ব্যাপারে বলা হয়েছে-কেননা তাঁরা এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবে। তাঁদের কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তি কোন দুর্বল ব্যক্তির ওপর জুলুম করলে তা প্রতিহত করা হবে এবং কোন স্থানীয় লোক কোন বিদেশী অভ্যাগতের হক ছিনিয়ে নিলে তা ফিরিয়ে দেয় হবে। দাওয়াতী জীবনের প্রথম দিকে একবার রাসূলুল্লাহ (স.) বানূ হাশিম গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একটি বৈঠক আহবান করেন। সেখানে তিনি তাঁর দাওয়াতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন যে “আমি তোমাদের নিকট এমন দাওয়াত নিয়ে এসেছি, যে দাওয়াত দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করবে।” অর্থাৎ এর মাধ্যমে দুনিয়ার এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে কোন অকল্যাণ ও অশান্তি থাকবে না। আর এ দাওয়াত কবুল করলে আখিরাতেও সফল হওয়া যাবে। এর কিছুদিন পর তিনি কুরাইম প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনা করার সময় বলেন, “আমি যে দাওয়াত পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করো, তাহলে তাতে তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণ নিহিত আছে।
এখানে দুনিয়ার কল্যাণ বলতে দুনিয়ার সামগ্রিক কল্যাণকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবন সর্বাঙ্গীন সুন্দর হবে। সমাজব্যবস্থা নিষ্কলুষ ও নিখুঁত হবে স্থায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। রাসূলুল্লাহর (স.) উদ্দেশ্য ছিল সমাজের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে সেখানে ন্যায়-নীতি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এ কারণে কুরাইশদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি আবার আহ্বান করেন এভাবে যে, একটি মাত্র কথা যদি তোমরা আমাকে দাও, তবে তা দ্বারা তোমরা সমগ্র আরব জাতির ওপর আধিপত্য লাভ করবে এবং যত অনারব আছে তারা তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে। মাক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (স.) ও তাঁর সাহবীরা যখন প্রচন্ড বিবোধিতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, তখন সাহাবীরা একবার রাসূলুল্লাহর (স.) কাছে তাঁদের নির্যাতনের কথা বলে এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দু’আ চাইলেন। তখন তিনি সাহাবীদের সুসংবাদ শুনিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ এ দীনকে একদিন অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন। (ফলে সর্বত্রই নিরাপদ ও শান্তিময় অবস্থা বিরাজ করবে)। এমনকি তখনকার দিনে একজন উষ্ট্রারোহী একাকী সান’আ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত নিরাপদে সফর করবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয়ে সে ভীত থাকবে না, এমনকি তার মেসপালের ব্যাপারে নেকড়ে বাঘের আশঙ্কাও তার থাকবে না। কিন্তু তোমরা (ঐ সময়ের অপেক্ষা না করে) তাড়াহুড়া করছো। এখানে রাসূলুল্লাহ (স.) এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিলেন, যেটা সম্পূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিময়। যেখানে কোন চুরি-ডাকাতি, খুন-রাহাজানি ও লুন্ঠন থাকবে না। কেউ অন্যের জান-মাল, ইজ্জত, সম্ভ্রম অন্যায়ভাবে স্পর্শ করার সাহস করবে না। বাস্তবিকই রাসূল (স.) এ রকম এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
হিজরতের পর আদী ইব্ন হাতিম (রা.) রাসূলুল্লাহ (স.) এর কাছে এসে তাঁকে নানাভাবে পরখ করতে লাগলেন। এ সময় রাসূল (স.) আগন্তুকের চিন্তাধারার সাথে সঙ্গতি রেখে অনেক কথাই বললেন। এক পর্যায়ে তিনি ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন-অচিরেই তুমি শুনবে, এক মহিলা সুদূর কাদিসিয়া থেকে একাকী তার উটে সওয়ার হয়ে এ মসজিদ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে এবং সম্পূর্ণ নির্ভয়ে এসে পৌঁছেছে। সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি হিজরতের পরে মদীনার জীবনের প্রথমেই মদীনায় বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীদের সাথে এক ঐতিহাসিক চুক্তি করেন। যেটি হতিহাসে ‘মদীনার সনদ’ হিসেবে স্বীকৃত। এ সন্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সেখানে এক শান্তিময় ঐক্য গড়ে তোলেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (স.) এর সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রধান দিকসমূহ ঃ মাক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (স.) যেমন মনে-প্রাণে কামনা করতেন সকল অন্যায়-অবিচারহীন একটি শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণের, তেমনি মদীনায় গিয়ে তাঁর প্রধান লক্ষ্যই ছিল সমস্ত অন্যায়-অবিচার দূর করে সাম্যের ভিত্তিতে এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। প্রকৃত অর্থেই মদীনায় রাসূল (স.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ তার সমস্ত সামাজিক সম্পর্কসহ এমনভাবে সংশোধিত হয়েছিল, যার ফলে সমাজের সকল স্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। সেখানে কেউ অন্যায়ভাবে অন্যের হক নষ্ট করত না। প্রত্যেকে নিজ নিজ অধিকার ভোগ করত। কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হত না। বিশেষ করে ওহুদ যুদ্ধের পর নাযিলকৃত সূরা আন-নিসা এবং আল-মা’ইদাতে বর্ণিত ইসলামের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন নিয়ম-নীতি, বিধি-বিধান রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেছিলেন। জীবন, জগৎ ও মানুষের মাঝে যে মূলগত ঐক্য বিদ্যমান তার ভিত্তিতে সাম্য ও ইনসাফপূর্ণ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল রাসূলের (স.) মূল লক্ষ্য তবে এই সাম্য মানুষের ব্যক্তিগত যোগ্যতা অনুসারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে কোন রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, বরং যোগ্যতামাফিক প্রত্যেক তার সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করত। আর এ সব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গৃহীত রাসূলুল্লাহ (স.) এর সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রধান যে দিকসমূহ লক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে-
আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব ও একত্ব প্রতিষ্ঠা করা ঃ রাসূলুল্লাহ (স.) এর সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রধান ভিত্তিই ছিল আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর একত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কারণ আল্লাহ তা’য়ালাকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে মেনে নেয়া ছাড়া সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আসমান-যমীন ও এখানে যা কিছু আছে সবই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, অতি মহান ও শ্রেষ্ঠ তিনি যাঁর হাতে রয়েছে সমগ্র বিশ্ব-জাহানের কর্তৃত্ব। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতা রাখেন। অন্যত্র বলা হয়েছে। যিনি পৃথিবী ও আকাশের রাজত্বের মালিক, যিনি কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি, যার সাথে রাজত্বে কেউ শরীক নেই, যিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন তারপর তার একটি তাকদীর নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এছাড়া আল-কুরআনে আরো বহু আয়াত বিদ্যমান, যেখানে পৃথিবীতে একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার সার্বভৌম ক্ষমতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (স.) সকলকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছিলেন। তাঁকে এ ব্যাপারে আদেশ দিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- বলো, হে কিতাবধারীগণ! তোমরা আমাদের ও তোমাদের মাঝে একটা অভিন্ন কথায় আসো যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করবো না, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না এবং আল্লাহর পরিবর্তে কেউ কাউকে প্রভু বানাবো না। আসলে আল্লাহর যমীনে আল্লাহকে রব, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, পালনকর্তা ও বিধানদাতা হিসেবে স্বীকার করে সেই অনুযায়ী গোটা সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনা না করলে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর জাতিকে সর্বপ্রথম এ দিকে আহ্বান করেন। আর আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর একত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন। (অসমাপ্ত)

শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় রাসূলুল্লাহ (স.) এর পদক্ষেপ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

বর্তমান পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যেককে তার হক বা প্রাপ্য অংশ পরিপূর্ণভাবে দিয়ে দেয়া। এ ক্ষেত্রে ধনী-গরীব, উঁচু-নিচু, সাদা-কালো আরব-অনারব, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু, দল-মত নির্বিশেষে কেউ কোন রকম অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-নির্যাতনের শিকার হবে না। পৃথিবীতে নবী ও রাসূলগণের প্রধান কাজ ছিল আল্লাহর বিধানের আলোকে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক রাসূলুল্লাহ (স.) সামাজিক ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, সম্পদের সুষম বন্টন, জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সমাজের সকলের মাঝে প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কার্যাবলির মাধ্যমে তিনি এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এর জন্য তিনি শরীয়তের বিধান যেমন কার্যকর করেন, তেমনি সকলকে আখিরাতমুখী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করেন। আখিরাতের কঠিন জবাবদিহিতার ব্যাপারে সকলকে সতর্ক করেন। এভাবে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এমন এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন, যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আধুনিক বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (স.) এর সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকে লক্ষ্য করতে হবে এবং এর থেকে শিক্ষা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে মানবরচিত মতবাদের মাধ্যমে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনো সম্ভব না। এ সব বিষয়ে আলোচনাই বক্ষ্যমান প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিয়য়।
বিশ্ব-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, চারিদিকে অশান্তি ও নৈরাজ্যকর পরিবেশ বিরাজমান। এ অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ মানুষের সার্বিক জীবন ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের অভাব। মুসলিম বিশ্ব এবং তথাকথিত প্রগতিশীল পাশ্চাত্য সমাজ কেউই এ অশান্তি থেকে মুক্ত নয়। বিশ্ব-মুসলিম আজ একদিকে যেমন দ্বীনের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত, অন্যদিকে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, সামাজিক আচার-আচরণ, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এবং পরিবর্তিত বিশ্ব-পরিস্থিতির মোকাবেলা করাসহ দুনিয়াবী বহুক্ষেত্রে তারা ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ করতে ব্যর্থ, সামাজিক নিরাপত্তা, সাধারণ সামগ্রীর সহজলভ্যতা এবং জাতি, গোত্র নির্বিশেষে সকলের মাঝে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা এক কথায় ‘সামাজিক ন্যায়চিার’ বলতে সমাজের এমন অবস্থাকে বুঝায়, যেখানে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, গোত্র, জাতি, রাষ্ট্র ও বর্ণভেদে প্রত্যেক মানুষ তার পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে। সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্য রাষ্ট্র প্রত্যেককে যোগ্যতা অনুযায়ী তার প্রাপ্য অংশ প্রদান করবে। এক্ষেত্রে সে কোন ধরনের জুলুমের শিকার হবে না।
এটি ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ ধারণার সামগ্রিক রূপ। আর ইসলামে এটিকে আরো ব্যাপক পরিসরে ব্যাখ্যা করা হয়। এর মধ্যে তাওহীদ, সৃষ্টিজগৎ এবং মানুষের সার্বিক জীবন সম্পৃক্ত। কারণ ইসলাম একটি অবিভাজ্য পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন। এর প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখা একটির সাথে অপরটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্রষ্টা, সৃষ্টিজগৎ, মানুষ, ব্যক্তি, সমষ্টি, রাষ্ট্র-সব কিছুই সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা’য়ালা সৃষ্টিজগৎ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করেন। সৃষ্টি জগৎ সুন্দররূপে পরিচালনা করার জন্য প্রত্যেকটি বস্তুর একটি পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন আমি সবকিছু নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি। আর আল্লাহর এই সৃষ্টির প্রতিটি জিনিস একটির সাথে আরেকটি নিগূঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যখন পরস্পরের এই সম্পর্কে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তখন সৃষ্টি জগতেও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সকলের পারস্পরিক সম্পর্কে যখন ন্যায়বিচারের ঘাটতি হয় তখন সৃষ্টিজগৎ অশান্তি ও নৈরাজ্যে ভরে যায়। এজন্য ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচার বলতে এটাই বুঝানো হয়েছে যে, প্রত্যেককে তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে দিয়ে দেয়া এবং এর মাধ্যমে সমগ্র সৃষ্টিজগতের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ন্যায়বিচার-এর গুরুত্ব ঃ আগেই বলা হয়েছে, ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচারের লক্ষ্যই হলো প্রত্যেককে তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে দিয়ে দেয়া। সমাজের প্রত্যেকে যদি তার প্রাপ্য অংশ পায়, তবে সেখানে কোন রকম ঝগড়া-ফাসাদ, অশান্তি ও হানাহানি থাকে না। এ কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়। পৃথিবীতে সবচেয়ে শান্তিময় সমাজ ছিল নবী-রাসূলগণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমাজ। আর তাঁদের প্রতিষ্ঠিত সমাজের প্রধান ভিত্তিই ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করা। এটা তাঁদের দায়িত্ব ছিল। আর এ দায়িত্ব নির্ধারণ করেছিলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন’। আল্লাহ তা’য়ালা আল-কুরআনের বহু স্থানে নবী ও রাসূলগণকে সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলিসহ পাঠিয়েছি এবং তাঁদের ওপর কিতাব ও মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানবজাতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করে। আমি লোহাও নাযিল করেছি, যার মধ্যে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের অনেক কল্যাণ আছে, এ জন্য যে, আল্লাহ জানতে চান, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহয্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী। সামাজিক ন্যয়বিচার’ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সৎকাজ ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও অবাধ্যতা নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে সুপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। এছাড়া যারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না তাদেরকে আল-কুরআন কাফির হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
আল-কুরআনে আরো বলা হয়েছে- ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো! আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাক্ষীরূপে তোমরা অবিচল থেকো। কোন সম্প্রদায়ের শক্রতা যেন তোমাদেককে ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করবে। এটা তাক্বওয়ার অধিকতর কাছাকাছি। আর আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ নিশ্চয়ই তার খবর রাখেন। এ আয়াতের তাফসীরে ‘আল্লামা হাফিয ইবন কাছীর রহ. বলেন, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর মুমিন বান্দাদের ন্যায়ে অবিচল থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তারা ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হয়ে ডানে বা বামে যেতে পারবে না। তাদেরকে আল্লাহর বিধান বান্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন নিন্দুকের নিন্দা প্রভাবিত করবে না। কোন বাধাদানকারী বিরত রাখতে পারবে না। আর তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য পরস্পর পরস্পরকে সাহায্যে-সহযোগিতা করবে। যে বান্দা তার ¯্রষ্টার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করে, মানসিক প্রশান্তিতে জীবন কাটানো তার জন্য অনেক সহজ হয়। পরিবারের প্রত্যেকে যদি অন্যের হক ঠিকমত আদায় করে, তাহলে সে পরিবার সুখ ও শান্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। একইভবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেকে যদি অন্যের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন থাকে, কেউ কাউকে যদি বঞ্চিত ও জুলুম না করে, তাহলে সে সমাজ ও রাষ্ট্র শান্তিময় সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিণত হয়। আর এর বিপরীত হলে সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এ দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-মানুষের স্বহস্ত উপার্জনের দরুন জল-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে তাদেরকে তাদের কিছু কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করানো হবে, যাতে তারা বিরত হয়। এ জন্য বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান অনুযায়ী ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরী। আল্লাহ তা’য়ালা সমস্ত পৃথিবী পরিচালনা করেন। পৃথিবীর কল্যাণের জন্য তিনি সকল কিছুর সুন্দর ব্যবস্থাপনা করেন। তিনি বলেন-তিনি সব কিছুর ব্যবস্থাপনা করেন আর তাঁর আয়াতসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। সুতরাং তাঁরই নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী পৃথিবী চললে সেখানে অবশ্যই শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। এছাড়া মানব রচিত কোন পন্থায়, অন্যের উপর জুলুম করে, জোর করে অন্যের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনো সম্ভব নয়।
বর্তমান বিশ্বে শান্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার পরিস্থিতির স্বরূপ ঃ আজকের বিশ্ব-পরিস্থিতির দিকে তাকালে আমরা যে চিত্র দেখতে পাই তা সত্যিই হতাশাজনক। বিশ্বশান্তি আজ হুমকির মুখে। সামাজিক ন্যায়বিচার এখানে সুদূর পরাহত। জাহেলী যুগের মত ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এই নীতিই যেন সারা বিশ্বে বিরাজমান। ব্যক্তি জীবন, সামাজিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন, আন্তর্জাতিক অঙ্গন-সকল ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের অনেক অভাব। অনেক মারাত্মক অপরাধী ক্ষমতার বলে শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। আবার দুর্বল হওয়ার কারণে লঘু অপরাধে অনেকে গুরুতর শাস্তি ভোগ করছে। এমনকি অনেক নিরাপরাধ ব্যক্তিকেও দেয়া হচ্ছে মারাত্মক শাস্তি। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করছে। তাদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধ্য করছে। সহজে তা মেনে না নিলে শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি কখনো কখনো অন্যায়ভাবে তাদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। মিথ্যা অজুহাতে গোটা দেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মুসলিমদের ও মুসলিম দেশগুলোর অবস্থা আরো ভয়ানক। সারা পৃথিবীতে আজ তারা নানা জুলুম-নির্যাতনের শিকার। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলায় তারা জর্জরিত। ইসলাম বিদ্বেষী সম্প্রদায় মুসলিম ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ওপর নানামুখী নির্যাতন চালাচ্ছে। কোথাও তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে, কোথাও আবার পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে। কোথাও আবার প্ররোচনা দিয়ে মুসলিমদের বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত করছে। এর মধ্যে কোন এক দলকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে অন্য দলের ওপর লেলিয়ে দিচ্ছে। অবশ্য মুসলিম সম্প্রদায়ও এক্ষেত্রে কম দোষী নয়। তারা আজ ইসলামের শিক্ষা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। সঠিক ইসলাম থেকে তারা বিচ্যুত। তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি, হানাহানিতে লিপ্ত। আল-কুরআনের এই শিক্ষা তারা নিজেদের সমাজে বাস্তবায়ন করতে পারছে না। আল্লাহ বলেছেন-যদি মুমিনদের দুটি দল মারামারি করে তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিও। অতঃপর যদি তাদের এক দল অন্য দলের উপর বাড়াবাড়ি করে তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি করবে তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়বে, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে তোমরা উভয়ের মাঝে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করে দিবে এবং সুবিচার করবে। আল্লাহ তো সুবিচারকারীদেরকেই ভালবাসেন। এ কারণে বর্তমানে বিশ্বে দেখা যায়, বেশিরভাগ অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সংঘটিত হচ্ছে হয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর, না হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম শাসিত এলাকায়। আমরা যদি মিয়ানমারের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় সংখালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগত গুদ্ধি অভিযানের নামে গত পঞ্চাশ বছর ধরে অমানবিক জুলুম-নির্যাতন পরিচালনা করছে। মুসলিমদের ব্যাপারে তারা যেন গৌতম বুদ্ধের বাণী ‘প্রাণী হত্যা মহা পাপ’ এবং জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ ভুলে গেছে। তারা সেখানে মুসলিম নারী, পুরুষ, শিশু, যুবক, বৃদ্ধসহ সকল মুসলিমদের নির্বিচারে হত্যা করছে। ধ্বংস করছে তাদের ঘর-বাড়ী। অন্যায়ভাবে তাদের সম্পদ দখল করে নিচ্ছে। সামাজিক ন্যায়বিচার বলতে তেমন কিছু যেন অবশিষ্ট নেই। ক্ষমতা থাকলে সবকিছু করা বৈধ মনে করা হচ্ছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্ব-নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীসমূহ সেখানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। জোর করে সেখানে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উৎখাত করা হচ্ছে। (অসমাপ্ত)

মাওলানা হাবিব উল্লাহ (রহ.) ॥ বহুমুখী প্রতিভাবান আলেম ও সাধক

॥ শাহিদ হাতিমী ॥

গুণীজনদের সম্মান জানাতে হয়। গুণীদের জীবনেতিহাস থেকে পথচলার পাথেয় পাওয়া যায়। যে জাতি গুণীজনদের সম্মান দিতে জানে না, সে জাতির মধ্যে গুণীজন জন্মায় না। আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট জেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি জনপদ জৈন্তাপুর উপজেলা। যুগে যুগে অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী, ওলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ ও বিশিষ্টজনের জন্ম হয়েছে এ জনপদে। ইসলামী শিক্ষা বিস্তারেও বৃহত্তর জৈন্তার অবদান অনেক বেশি। ঐতিহ্যবাহী এ জনপদের একজন মহান ব্যক্তিত্ব, প্রবীণ আলেমেদীন, যাঈমুল ক্বওম মাওলানা শাহ হাবিব উল্লাহ শায়খে ভিতরগ্রামী (রহ.)। ৮ এপ্রিল ১৯২৭ ঈসায়ী, ২৫শে চৈত্র ১৩৩৩ বাংলা মোতাবেক ১৭ই জামাদিউল উখরাহ ১৩৪৬ হিজরীর শুক্রবার এ বসুন্ধরায় জন্মগ্রহণ করেন। ভিতরগ্রামী (রহ.) এর পিতার নাম হাজী মরহুম শাহ ইসমাইল আলী ও মাতার নাম মরহুমা জরিনা বিবি। তার পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদ থেকে আগত, মরহুম সোনা খাঁ ছিলেন স্বাধীন জৈন্তা রাজ্যের সেনাপতি।
শিক্ষা জীবনে আপন চাচা মাওলানা শাহ ইউসুফ আলীর কাছে কায়দায়ে বোগদাদী-কুরআন শরীফ পাঠ গ্রহণের সাথে খরিলহাট প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক পড়া-লেখা সম্পন্ন করেন। এরপর ইলমেদীনের অন্বেষায় মদিনাতুল উলূম খরিলহাট জৈন্তাপুর মাদরাসায় ভর্তি হয়ে মিজান জামাত (৮ম) পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। গাছবাড়ী জামিউল উলূম কানাইঘাট মাদরাসায় ভর্তি হয়ে আরো কিছুদিন পড়া লেখা করেন। এরপর একবছর রামপুর মাদরাসায় পড়া-লেখার পর উচ্চ শিক্ষা লাভে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ, দারুল উলূম দেওবন্দ ভারতে ভর্তি হন। শরহে জামী কিতাব থেকে স্টাডি শুরু করে তাকমীল ফিল হাদীস পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ বছর অধ্যয়ন করেন। ১৯৫১ ইংরেজিতে তাকমিল ফিল হাদীসের (মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ক্লাস মাষ্টার্স) ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই শায়খুল ইসলাম মাদানী (রহ.) এর নেক নজরে পড়ে যান মাওলানা হাবিবুল্লাহ (রহ.)। তালিম, তারবিয়্যাত, তাযকিয়্যাহ ও বিশেষ করে রাজনীতির দ্বীক্ষা গ্রহণ করতে হাবিবুল্লাহ মাদানী (রহ.) এর একান্ত সান্নিধ্যে থাকতেন। শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান (রহ.) গোটা মুসলিম দুনিয়াকে বৃটিশ বেনিয়াদের কবলমুক্ত করার জন্য গঠন করেছিলেন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক একটি সংগঠন। যার নাম ছিল “মুসলিম র‌্যাডিক্যাল সোস্যালিষ্ট ব্লক” (মুসলমানদের সমাজতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার আদায়ের সংগঠন)। সংগঠনটির প্রধান ছিলেন শায়খুল হিন্দ (রহ.) এবং জিএস ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্দী (রহ.)। শায়খুল হিন্দ (রহ.)’র ইন্তেকালের পর এই সংগঠনের প্রধান হন সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)। মাদানীর একান্ত আস্থাভাজন হওয়ায় মাদানী (রহ.) হাবিবুল্লাহকে সংগঠনটির সদস্য করেন। কিছুদিন অতিবাহিত হতে না হতেই মাওলানা হাবিবুল্লাহ‘র যোগ্যতা, দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে এক সভায় শায়খুল ইসলাম মাদানী (রহ.) তাকে ‘যাঈমুল ক্বওম’ (জাতির সরদার) উপাধিতে ভূষিত করেন।
রাজনৈতিক জীবনে যাঈমুল ক্বওম (রহ.) শায়খুল হিন্দ রাহ’র রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালান। তখনকার দিনে জমিয়তের রাজনৈতিক কার্যক্রম (বিশেষ কারণে কিছুদিন) নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলাম, দেশ ও জাতির কল্যাণের কার্যক্রম কি দমিয়ে রাখা যায়? কিছুদিন যেতেই মাওলানা হাবিব উল্লাহ ও ডা. মর্তুজা চৌধুরীর চেষ্টায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রবীণ উলামায়ে কেরাম পরামর্শ করেন জমিয়তের কাজকে পুনরায় চালুর জন্য। সবাইকে সংগঠিত করার চেষ্টা চালালেন। তিনি পাকিস্তান আমলে তথা একটি সূত্রমতে ১৯৬৭ সন থেকে জৈন্তাপুর থানা জমিয়তের সেক্রেটারি ও পরে সভাপতির দায়িত্ব দীর্ঘদিন পালন করেন। বেশ ক’বছর সিলেট জেলা জমিয়তের সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ২০০৩ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি সিলেট জেলা জমিয়তের সভাপতি মনোনীত হন। ২০১১ সালের পর বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি সভাপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিলেও জেলা জমিয়তের উপদেষ্টা পদে আসীন ছিলেন ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত। আধ্যাত্মিক ময়দানে শায়খুল ইসলাম মাদানী (রহ.) ইন্তেকালের পর খলীফায়ে মাদানী মাওলানা আব্দুল মতিন চৌধুরী শায়খে ফুলবাড়ি রহ. যাঈমুল ক্বওম মাওলানা শাহ হাবিবুল্লাহ ভিতরগ্রামীকে খেলাফত প্রদান করেন। সবার সাথে ছিল তার নম্র ব্যবহার। কোন দুনিয়াদারকে তোষামুদি করতেন না। অন্যায়ের প্রতি ছিলেন আপোষহীন। তা ছাড়াও তিনি আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)’র একান্ত আস্থাভাজন ছিলেন। আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) রচিত রাজনৈতিক কিতাব “ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন নাবিয়্যিল আমীন” কিতাবের সম্পাদনা ও ছাপার কাজে দায়িত্ব পালন করেন যাঈমুল ক্বওম (রহ.)। শিক্ষকতা জীবনে ১৯৫১ সনে সর্বপ্রথম খরিলহাট মাদরাসায় সদরুল মুদাররীসিন হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৯ সনে কোনোও কারণে তিনি খরিলহাট থেকে অব্যাহতি নেন। এ সময় তিনি শায়খে কৌড়িয়ার পরামর্শে সিলেট শহরের জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদ্রাসায় যোগ দেন এবং সেখানে ৩ বছর শিক্ষাসচিবের দায়িত্বও পালন করেন। কাজির বাজার মাদরাসায় থাকাকালীন বিলপার জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন। বলা বাহুল্য যে, বর্তমান কাজিরবাজার মাদরাসার জমি সরকারি অনুমোদন লাভের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রাহমান মাদরাসার জমি বন্দোবস্তের দলিল সিলেট সার্কিট হাউসে এসে মাওলানা হাবিবুল্লাহ (রহ.)’র হাতে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে এলাকাবাসী ও পরিবারের অনুরোধে আবারও খরিলহাট মাদরাসায় যোগদান করে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত মুহতামিমের দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে উলামায়ে কেরামের অবদান কোনো অংশে কম নয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন যাঈমূল ক্বওম (রহ.) পাক হানাদারদের নির্যাতন থেকে এলাকাবাসীকে রক্ষায় এগিয়ে আসেন। দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন তিনি মুক্তিকামী জনতাকে। অসহায় হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছিলেন পরম মমতায়। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে কয়েকবার আটক হয়েও আল্লাহর অশেষ রাহমতে প্রাণে বেঁচে যান। যাঈমুল ক্বওম মাওলানা হবিবুল্লাহ (রহ.) দীর্ঘ ৮ মাস ৯ দিন কারাভোগ করেন। জেলখানায় বন্দীদেরকে তিনি কুরআনে কারীমের তা’লীম দিতেন। নামাজ ও মাসনুন দোয়া শিক্ষা দিতেন। জৈন্তা অঞ্চলে যাঈমুল ক্বওম (রহ.) সর্বপ্রথম বিভিন্ন এলাকায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। যাঈমুল ক্বওম (রহ.) যে সকল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, তার মধ্যে অন্যতম জামেয়া কোরআনীয়া সারিঘাট, রামপ্রসাদ ইসলামিয়া মাদরাসা, দরবস্ত আল মনসূর মাদরাসা, ছাতারখাই কৌমি মাদরাসা, রাওজাতুল ইসলাম চাক্তা কওমী মাদরাসা, মানিকপাড়া এহইয়াউল উলুম মাদরাসা, ভাইটগ্রাম হোসাইনিয়া মাদরাসা, ফাতিমাতুয যুহরা মহিলা মাদরাসা, আহলিয়া কৌমি গর্দনা মাদরাসা। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত এ সকল মাদরাসার সদর অথবা ছরপরস্ত হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৮৫ ঈসায়ী সনে হযরত যাঈমূল ক্বওম (রহ.) পবিত্র হজ্ব পালন করেন। হজ্বের সফরে হযরতের উল্লেখযোগ্য সফর সাথী ছিলেন মৌলভী মুসলিম আলী বারইকান্দি ও হাজী ইউসুফ মিয়া ডেমা। ২০০৬ সালে হযরত যাঈমুল ক্বওম (রহ.) ছেলে স্বেচ্ছাসেবক জমিয়তের সেক্রেটারী মাওলানা ছফিউল্লাহ মাসউদকে নিয়ে পবিত্র রমজান শরীফে ওমরা পালন করেন। ওমরাতে যাওয়ার আগে শরীর দুর্বল ছিল। দীর্ঘদিন থেকে বসে নামাজ আদায় করতেন। আল্লাহপাকের রহমতে ১৬ রমজান তিনি ওমরা পালন করেন। দ্বিতীয় দিন মসজিদে হারামে দীর্ঘ ২০ রাকাত তারাবীহ নামাজ দাঁড়িয়ে আদায় করলেন। যেন সুস্থ সবল একজন যুবক। তারপর মদিনা মনওয়ারায় ইতেকাফ করেন। নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনেও ভুমিকা রাখেন। দেশের হক্কানী উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে মুরতাদ দাউদ হায়দার, তাসলিমা নাসরিনসহ সকল নাস্তিক মুরতাদ, কাদিয়ানী, শিয়া, ভ্রান্ত মতবাদ বিরোধী যত আন্দোলন হয়েছে সকল আন্দোলন সংগ্রামে যাঈমুল ক্বওম (রহ.)’র অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মুরতাদ ভসানী (যগন্দু দরবস্ত) যখন নিজেকে মুরতাদ ঘোষণা দিল। তখন তিনি জৈন্তার উলামায়ে কেরাম ও এলাকার মুরব্বীয়ানদের সাথে পরামর্শ করে যগন্দুকে তওবার আহ্বান জানান। হযরতের ইন্তেকালের পূর্বে জুম্মার দিন সকাল বেলা ছেলেকে বলতেছেন আমার মাউতের খবর সবাইকে জানিয়েছ কি? এটা নিশ্চয় তাঁর মতো একজন কামিল বুজুর্গের কারামত। এমন কথায় ছেলে কান্নায় ভেংগে পড়লে হযরত বললেন, আল্লাহর ফায়সালায় খুশি থাকতে হয়। দিনের বেলা ছেলে-মেয়ে, আহলিয়া ও পুত্রবধুসহ সবাইকে ডেকে অসিয়ত ও দোয়া করলেন। অবশেষে ৭ ছেলে ও ২ মেয়েসহ অসংখ্য ভক্ত-ছাত্র রেখে ৩ মার্চ ২০১৪ ঈসায়ী, ১লা জুমাদাল উলা ১৪৩৫ হিজরী মোতাবেক ১৯ ফাল্গুন ১৪২০ বাংলা সোমবার মধ্যরাতে সিলেট নগরীর শিবগঞ্জস্থ নিজ বাসায় ইন্তেকাল করেন। পরদিন বাদ যোহর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন হযরতের ছেলে মাওলানা ছফিউল্লাহ মাসউদ। খরিলহাট মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে তার দাফন সমাধিস্থ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতবাসী করুন-আমীন।

ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
১. কুরআন অধ্যয়ন : কুরআন হচ্ছে মুমিনের গাইড লাইন, জীবন বিধান। এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা মানুষের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছেন। সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলার জন্য সবার আগে তাই কুরআন অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। কুরআন অধ্যয়ন বলতে শুধু দেখে তিলাওয়াত বুঝায় না। বরং কুরআন অধ্যয়ন হলো এর মমার্থ, তাৎপর্য, তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করে পড়া। শুধু দেখে দেখে কুরআন তেলাওয়াত করলে চরিত্রের উপর তার সর্বব্যাপক প্রভাব পড়বে না। তাই সুন্দর চরিত্র গড়ে তুলতে হলে বুঝে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। বুঝে কুরআন তিলাওয়াত না করে শুধু দেখে তিলাওয়াত করলে সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু তাতে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য হল, কুরআনকে চরিত্রে পরিণত করা। যেমন আল্লাহর রাসূল (সা.) এর ইন্তিকালের পর সাহাবীগণ যখন তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আয়িশা (রা.) বিনা দ্বিধায় বলে দিলেন। অর্থাৎ তোমরা যে কুরআন পড় সে কুরআনই তাঁর চরিত্র। একজন ব্যক্তি যদি দাবি আদায় করে আল-কুরআন তিলাওয়াত করেন, তাহলে কুরআনই তাকে পথ দেখিয়ে দেবে। আর কুরআন মাজীদের শিক্ষা ব্যক্তির আত্মিক-আচরণিক ও বৈষয়িক উন্নতিতে সন্দেহাতীতভাবে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে।
২. হাদীস অধ্যয়ন : আল-কুরআনের ব্যাখা হলো হাদীস। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা যে কোনো হুকুমের মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সে মূলনীতি বাস্তবায়নের পথনির্দেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে থেকে কোনো কথা বা তত্ত্ব হাদীসের মাধ্যমে পেশ করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন। আর তিনি (মুহাম্মাদ সা.) নিজে প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। তাঁর নিকট প্রেরিত ওহী ছাড়া এগুলো আর কিছু নয়। অন্যত্র সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়েছেন। রাসূল তোমাদেরকে যা দেন (অর্থাৎ যা করতে নির্দেশ দেন) তা গ্রহণ করো আর যা থেকে তিনি বিরত থাকতে বলেন, তা থেকে বিরত থাকো। তাই কুরআন মাজীদের বিধি ও অনুশাসন সঠিকভাবে মেনে চলার জন্য হাদীস অধ্যয়ন করতে হবে। হাদীস অধ্যয়নও ব্যক্তির সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
৩. সত্য বলা : সত্য কথা বলা সুন্দর চরিত্রের শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ। সত্যবাদী হওয়া ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না। ইসলাম সত্য, বাকী সবকিছু মিথ্যা। এখন কেউ যদি সত্যকে ধারণ করে সে ধারণ করবে ইসলামকে। আর কেউ যদি মিথ্যা বলার অভ্যাস করে, সে অবশ্যই ইসলাম বর্জনকারী হবে। সত্য মানুষকে সততার পথে পরিচালিত করে, আর মিথ্যা পাপের পথে পরিচালিত করে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- নিশ্চয়ই সত্য মানুষকে সততার পথ দেখায়, আর সততা জান্নাতের পথ দেখায় এমনকি কোন ব্যক্তি সত্য বলতে বলতে আল্লাহর নিকট সিদ্দীক বা পরম সত্যবাদী হিসাবে লিখিত হয়, আর মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের পথ দেখায়, আর পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়, এমনকি কোন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে বলতে আল্লাহর নিকট কাযযাব বা চরম মিথ্যাবাদী হিসাবে লিখিত হয়। সত্যবাদীগণ আল্লাহ তাআলার পরম সন্তোষ ও সাফল্য লাভ করে থাকেন। যেমন, আল্লাহ বলেন, এটা তো সেদিন, যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যবাদিতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাত যার নিচ দিয়ে ঝর্ণাসমূহ বয়ে যায়, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটাই তো মহাসাফল্য। সত্য বলার অভ্যাস মানুষের ব্যক্তিত্বকে এমন উন্নত করবে যে, সে সকলের বিশ্বাসভাজন হবে।
৪. সবর : সবর বা ধৈর্য ধারণ করা সুন্দর চরিত্রের একটি অনিবার্য দিক। ধৈর্যধারণ ছাড়া সুন্দর চরিত্র সার্থক ও অর্থবহ হয় না। সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হতে হলে তাই ধৈর্যের অনুশীলন করতে হবে। কুরআন মাজীদে এসেছে, আল্লাহ তা’আলা ভালোবাসেন ধৈর্যশীলদের। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন ধৈর্যশীলদের সাথে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সবর বা ধৈর্যের বিনিময় হলো জান্নাত। ধৈর্যশীল মানুষ নিঃসন্দেহে অনন্য গুণের অধিকারী। মানবকে সম্পদে পরিণত করার অন্যতম মৌলিক এ গুণটি অর্জন করা ইসলাম মুমিনের জন্য আবশ্যিক করেছে।
৫. কৃতজ্ঞতা : আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নিআমাত দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার এ নিআমতসমূহের বিনিময়ে তাঁর আদেশ পালন করা হলো কৃতজ্ঞতা জানানো। আল্লাহ তাআলার আদেশ মেনে চললে মানুষ কোনো খারাপ কাজ করতে পারবে না। ফলে তার চরিত্র সুন্দর হবে। আল্লাহ তাঁর নিআমত আরো অধিকাহারে শোকরকারীকে দান করবেন। যেমন তিনি বলেছেন, যদি তোমরা শোকর করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের নিআমত বাড়িয়ে দেববো। যারা আল্লাহ তাআলার নিআমতের শোকর করে তাদের পক্ষেই অন্যান্যদের উপকার স্বীকার করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব। কৃতজ্ঞ মানুষকে আল্লাহ তাআলা যেমন ভালবাসেন তেমনি মানুষও কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য আরও কিছু করার আগ্রহ পোষণ করে থাকেন। ইসলামের শিক্ষা মানুষকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে অভ্যস্ত করে তোলে। এতে ব্যক্তি সর্বজনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠে।
৬. আমানত সুরক্ষা : মানুষের নৈতিক উন্নয়নের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ আমানতদারিতা। আমানতদারিতা এক মহান নৈতিক গুণ। এ গুণ মানুষের কাছে মানুষকে বিশ্বাসভাজন ও ভালোবাসার পাত্র করে তুলে। মানুষ অবলীলায় তার কথা শোনে। তার কাছে তাদের সম্পদ এমনকি সম্মান পর্যন্ত আমানত রাখতে দ্বিধাবোধ করে না। ঈমান ও আমানতদারিতা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই। আল্লাহ তাআলা আমানত সুরক্ষাকে ফরয করেছেন। কুরআন মাজীদে এসেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে। মানবসম্পদ উন্নয়নে গৃহীত বিপুল কর্মসূচি, বিস্তারিত কর্মশালা দিয়ে ব্যক্তির ভেতর আমানতদারিতা তৈরির নিরন্তর চেষ্টা পরিচালনা করতে দেখা যায়। অথচ ঈমান ও ইসলামের শিক্ষা ব্যক্তিকে আখিরাতে জবাবদিহিতার চেতনায় স্বভাবতই আমানতদার করে তুলে।
৭. ওয়াদা পালন : ওয়াদা এক ধরনের আমানত। কাউকে কথা দিলে তা রাখতে হয়। ওয়াদা করলে তা পালন করতে হয়। আল্লাহ তাআলা ওয়াদালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না। তিনি ওয়াদা পালনের আদেশ দিয়ে বলেন, মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে ওয়াদা রক্ষা করেছেন। তাঁর সাহাবীগণ এ ব্যাপারে তাঁকে পুরোপুুরি অনুসরণ করেছেন। ওয়াদা পালন প্রতিশ্র“তি রক্ষা মানবিক উন্নয়নের অন্যতম দৃষ্টান্ত। ঈমান আনার সাথে সাথে ব্যক্তি প্রতিশ্র“তি পালনেও প্রত্যয় গ্রহণ করে।
৮. হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকা : সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হওয়ার প্রধান উপায় হলো হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করা। হিংসা, অহঙ্কার, ঘৃণা, নিজেকে বড় এবং অন্যকে নীচ মনে করার হীনমানসিকতা সুন্দর চরিত্রের সম্পূর্ণ বিরোধী বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) হিংসা-অহঙ্কারকে পুণ্য ধ্বংসের কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা আগুন যেমন কাঠ ভস্মীভূত করে, হিংসা-বিদ্বেষও তেমনি সৎ আমল নষ্ট করে। হিংসা-বিদ্বেষ মানবিক গুণ বিরোধী। এটি মানুষকে দাম্ভিক করে। এমন ব্যক্তি কোন কাজে সফল হতে পারে না। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাই হিংসা-বিদ্বেষ থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত করার কথা বলা হয়ে থাকে। ঈমান এমন একটি অনন্য প্রশিক্ষণ, যা মানুষকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে রেখে সকলের নিকট প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় করে তুলে।
৯. ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা : মানবসম্পদ ধ্বংসের ক্ষেত্রে ধূমপান ও মাদকাসক্তির কুপ্রভাব অত্যন্ত কার্যকর। ইসলাম তাই ধূমপান ও মাদকাসক্তি ত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছে। ধূমপানে অর্থ-সম্পদের অপচয় হয়, ব্যক্তির নিজের ও অন্যের ক্ষতি হয়। আল্লাহ তাআলা এসবই হারাম ঘোষণা করে বলেছেন: আর কোনোক্রমেই অপচয় করবে না। নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।
অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা মাদক সেবনকে সরাসরি হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর অবশ্যই শয়তানের অপবিত্র ও ঘৃণ্য কাজের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই তোমরা তা বর্জন করো, তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে। বিভিন্ন সংস্থা এবং দেশ এমনকি আন্তর্জাতিক নানা সংঘ ধূমপান ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও তেমন কোন সুফল অর্জন করতে পারেনি। ফলে এর ক্ষতি থেকে মানবজাতিকে সঠিকভাবে রক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অথচ ইসলামের ঘোষণা ও শিক্ষা এক্ষেত্রে মুমিনকে ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে প্রকৃতার্থেই দূরে রাখতে সক্ষম।
১০. কথা ও কাজে মিল রাখা : কথায়-কাজে মিল রাখা সুন্দর চরিত্র অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা কথা-কাজের অমিলকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা করো না? আল্লাহর নিকট এটা অত্যন্ত অপ্রিয় যে, তোমরা যা বলো তা করো না। মানবসম্পদের প্রকৃত উন্নয়ন সাধনের জন্য কথা ও কাজের মিল থাকা আবশ্যক। কারণ কথা ও কাজের বৈপরীত্য থাকলে মানুষকে প্রকৃত মানুষ বলা চলে না। এমন মানুষকে কেউ ভালোবাসে না। বিশ্বাসও করে না। কথা ও কাজের মিল প্রতিষ্ঠাকে ঈমানের অনিবার্য শর্ত করে দিয়ে ইসলামে মানবসম্পদ উন্নয়নের ঈমানী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
উপসংহার : বস্তুত মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন, মানবিক ও নৈতিক গুণে বিভূষিত হওয়া, মানুষকে আত্মিক ও বাহ্যিক দিক থেকে সত্যিকার গুণ ও আচরণে সমৃদ্ধ সম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত সকল চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সে কারণে তথাকথিত সভ্য সমাজে, অফিসে, দেশে, পরিবারে মানুষের কাছে মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মানুষই মানুষের সম্পদ, সম্মান ও জীবনের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। মানুষের আচরণ স্বার্থপরতা, হীনতা ও পাশবিকতায় ভরে ওঠেছে। এ অবস্থা নির্মূল করে মানুষকে সত্যিকারার্থে সম্পদে পরিণত করার জন্য ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার অনুশীলন অনিবার্যÑআলোচ্য নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য, প্রমাণ ও বিশ্লেষণ এ বিষয়টির অবিসংবাদিত প্রমাণ। এ কারণে মানবসম্পদের চিরস্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুশীলন অনিবার্য। (সমাপ্ত)

ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
কর্তব্য পালন : ইসলাম সাধারণভাবে সকল মানুষকে কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সকলের জন্য অর্পিত কর্তব্য পালন আবশ্যিক করেছে এবং এ ক্ষেত্রে যে কোন অবহেলাকে আল্লাহ তাআলার নিকট জবাবদিহিতার বিষয় বলে সতর্ক করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব, ইমাম বা নেতা, যিনি জনগণের ওপর দায়িত্ববান-তিনি তার অধীনদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন। আর ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল- সে তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী দায়িত্বশীল তার স্বামীর পরিবারের সদস্যদের ও সন্তান-সন্ততির। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর দাস ব্যক্তি তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল এবং সে এই সম্পদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কাজেই সতর্ক হও! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে (পরকালে আল্লাহর নিকট) জিজ্ঞাসিত হবে। ইসলাম একন্তভাবে মানুষকে এ শিক্ষা দিয়েছে, কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।
আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন, যারা সরল-সঠিক পথে পরিচালিত হবে নিশ্চয় তারা তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই সঠিক পথে পরিচালিত হবে। আর যারা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হবে তারা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হবে তাদের নিজেদের ধ্বংসের জন্যই। কেউ কারো কাজের দায় বহন করবে না। আর আমি রাসূল পাঠিয়ে সতর্ক করা ছাড়া কাউকে শাস্তি দেই না। ইসলামের এ নীতি একান্তভাবে দায়িত্ব সচেতন করে এবং দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। এ নীতি মানুষকে এমনভাবে ভাবতে শেখায় যে, কেউ অন্য কারো কবরে যাবে না। কেউ অন্য কারো কাজের জবাবদিহিতা করবে না। সাধারণভাবে কেউ অন্য কারো কাজের সুফল বা দায় ভোগ করবে না। বরং প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের সুফল বা কুফল ভোগ করতে হবে। এ শিক্ষার ফলে মানুষ নিজেকে দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে গড়ে তোলে। এটি তার ব্যক্তি সত্তার উন্নতি বিধান করে।
যোগ্যতা অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধি : ইসলাম মানুষে মানুষে মানবিক কোন ব্যবধান বা বৈষম্য স্বীকার করেনি। মানবিক মর্যাদায় সাধারণভাবে সকলকে সমান মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদান করেছে। মানুষের উৎস ও বিস্তার সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টি নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন সে ব্যক্তি থেকে তার জোড়া, আর তাদের দুজন থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য পুরুষ ও নারী। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অন্যের নিকট কিছু চাও। আর তোমরা আত্মীয়দের (হক আদায় ও সম্পর্ক অটুট রাখার) ব্যাপারে সতর্ক হও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে মানবজাতি! সাবধান! নিশ্চয় তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতাও একজন। সতর্ক হও! কোন আরবের উপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোন কালোর উপর সাদার কিংবা সাদার উপর কালোর তাকওয়া ব্যতীত কোন মর্যাদা নেই। সাধারণভাবে সকল মানুষকে এভাবে সমান ঘোষণার পর কুরআন ও হাদীসে মানুষের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের জন্য বিশেষ যোগ্যতা অর্জনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।
পরকালীন সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠি : নিঃসন্দেহে মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের সবচেয়ে বড় প্রেরণা এর পরকাল বিষয়ক মূল্যবোধ ও নীতিমালা। দুনিয়াতে একজন লোক যদি আর্থিক বা শারীরিক কিংবা সামাজিক দিক থেকে গ্রহণীয় হয় অথবা কেউ যদি সকল দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হয় তাহলে দুনিয়ার বিচারে লোকটির জীবন সফল হয়েছে বা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। কিন্তু আখিরাতে ব্যক্তির সফলতা নির্ভর করে একান্তভাবে ব্যক্তির সঠিক বিশ্বাস, সৎকর্ম, সৎচিন্তা ও সৎ জীবনযাপনের উপর। এর অর্থ হল ব্যক্তি যদি সমাজের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য বা সমাজে সম্মানিত হওয়ার জন্য এমন কোন কাজ করে ইসলামের দৃষ্টিতে যা সম্মানজনক নয় তাহলে আখিরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না। আবার বাহ্যত অসম্মানজনক বা নিপীড়নমূলক প্রমাণ হলেও আখিরাতে হয়তো কাজটি অত্যন্ত সম্মানের হতে পারে। এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দুনিয়ায় লাভ-লোকসানের বিবেচনা ছাড়া একজন মানুষ আখিরাতে সফল হওয়ার জন্য ভেতরে-বাহিরে সৎ জীবন-যাপন করার চেষ্টা করে। কাউকে দেখানোর কারো মনোঃতুষ্টির আকাক্সক্ষা সে একেবারেই পোষণ করে না। সে দুনিয়াকে ততটুকুই গুরুত্ব প্রদান করে যতটুকু গুরুত্ব প্রদানের নির্দেশ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন : তোমরা কি আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অত্যন্ত কম। অন্যত্র তিনি বলেন, আখিরাত তো নিশ্চয় শ্রেষ্ঠতম পর্যায় এবং মর্যাদায় মহত্তম। দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার্থে আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর, তবে তোমার দুনিয়ার অংশ ভুলে যেয়ো না।
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে কেবল সৎকাজ করতেই উদ্বুদ্ধ করে না; বরং কাজটি একান্তভাবে আল্লাহ তাআলার জন্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে সৎকাজ করা হলে তা পুরস্কারযোগ্য হয় না। তাও শাস্তিযোগ্য আমলে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : কিয়ামাতের দিন মানুষের মধ্যে প্রথম যার বিচার হবে সে হবে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময়ে কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে- আমি তোমার পথে যুদ্ধ করেছি; এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এ জন্যে যুদ্ধ করেছো যেনো তোমাকে বীরপুরুষ বলা হয়। আর তা তোমাকে বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুড় করে টেনে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
দ্বিতীয়ত যার বিচার হবে সে হবে একজন আলিম। সে নিজে শিক্ষা লাভ করেছে, অপরকে তা শিখিয়েছে এবং কুরআন পড়েছে। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময় কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে, দুনিয়াতে আমি শিক্ষা লাভ করেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করছি। আল্লাহ বলবেন- তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এ জন্যে জ্ঞান অর্জন করেছিলে যেনো তোমাকে জ্ঞানী বলা হয়। কুরআন মাজীদ এ জন্যে তিলাওয়াত করেছি যেনো তোমাকে কারী বলা হয়। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুড় করে টেনে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
তৃতীয়ত যার বিচার হবে সে হবে একজন সম্পদশালী ব্যক্তি। আল্লাহ তাকে সচ্ছল করেছেন এবং বিপুল সম্পদ দিয়েছেন। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময়ে কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে, যে পথে খরচ করলে তুমি খুশি হও, সে জাতীয় সব পথেই তোমার সন্তুষ্টির জন্য আমি খরচ করেছি। আল্লাহ বলবেনÑ তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমিতো এগুলো এ জন্যে করেছো যেনো তোমাকে দানবীর বলা হয়। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুর করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সংক্ষেপে কিন্তু স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করেছেন, কাজেই ধ্বংস সেই সকল সালাত আদায়কারীর জন্য, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য সালাত আদায় করে। বস্তুত আখিরাতে সফলতা লাভই মুমিনের মূল লক্ষ্য। এ কারণে ইসলামে বিশ্বাসী একজন লোক দুনিয়ার সকল কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টি জন্য করেন। যে কারণে তার মধ্যে লোক দেখানোর বিষয়টি একেবারেই থাকে না। ফলে মানসিক দিক থেকে তিনি পরম উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হন। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ বা প্রেম তাকে কোনক্রমেই মন্দ কাজে নিয়োজিত করতে পারে না।
নৈতিক উন্নয়ন : নৈতিক উন্নয়ন ছাড়া যে কোন উন্নয়নই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি প্রেরিত হয়েছি সুমহান নৈতিক গুণাবলির পূর্ণতা সাধনের জন্য। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন কাজ অধিকাংশ লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি উত্তরে বলেছেন, কিয়ামাতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি হবে তা হল ‘তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র। রাসূলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, কিয়ামতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি হবে তা হল উত্তম চরিত্র। নাওয়াস ইবনে সামআন আল-আনসারী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে বির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘সুন্দর ব্যবহারই পুণ্য। তিনি সত্যিকার ও পূর্ণ মুমিন হিসেবে সে ব্যক্তিকেই অভিহিত করেছেন যার চরিত্র সুন্দর। তিনি বলেছেন, চরিত্রের বিচারে যে উত্তম মুমিনদের মধ্যে সেই পূর্ণ ঈমানের অধিকারী। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে ছিলাম। এমন সময় জনৈক আনসারী ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (রা.) কে সালাম করলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ মুমিনদের মধ্যে সর্বোত্তম কে? তিনি জবাব দিলেন, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো সেই ব্যক্তি যার চরিত্র সর্বোত্তম। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা মুমিনের অসংখ্য নৈতিক গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন : নিশ্চয় মুমিনগণ সফল, যারা তাদের সালাতে ভীত ও বিনয়ী, যারা নিজেদেরকে অর্থহীন কাজ থেকে বিরত রাখে, যারা যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে কর্মতৎপর হয় এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গ হিফাযত করে। বস্তুত ইসলাম যে বিষয়গুলোকে চরিত্রের সুন্দর দিক এবং অবশ্য অর্জনীয় গুণ হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলোকে আত্মার গুণ হিসেবে আত্মস্থ করা, নৈতিক বৈশিষ্ট্যের পরিণত করা এবং জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা গেলে স্বভাবতই মানুষ সম্পদে পরিণত হবে। যে সম্পদ দুনিয়ায় ব্যক্তির নিজের এবং অপরাপর সকলের কল্যাণ ও মুক্তি নিশ্চিত করবে। প্রসঙ্গত নৈতিক উন্নয়নে ইসলামের কিছু নির্দেশনা উল্লেখ করা যায়। যেমন- (অসমাপ্ত)