বিভাগ: ইসলামের আলো

টেকসই উন্নয়নে বহির্বিশ্বের অংশীদারিত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
টেকসই উন্নয়নের মূলনীতি : টেকসই উন্নয়ন মূলত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি’র মতো জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত একটি উন্নয়ন পরিক্রমা, যা ২০১৫ সালের পর এমডিজি-র স্থলে প্রতিস্থাপিত হয়। ৩-১৪ জুন ১৯৯২ ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০-২২ জুন ২০১২ অনুষ্ঠিত হয়। রিও+২০ (জরড়+২০) বা আর্থ সামিট ২০১২ (ঊধৎঃয ঝঁসসরঃ ২০১২) সম্মেলন, যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল বিশ্ব টেকসই উন্নয়ন সম্মেলন বা ডড়ৎষফ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঈড়হভবৎবহপবং (ডঝউঈ) এ সম্মেলনে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং (ঝউএং) গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক কনফারেন্স-এ (রিও+২০) ৭৯ জন সরকার প্রধানসহ ১৯১ টি জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করে। কনফারেন্স এর ফলাফল সংবলিত দলিল ‘দি ফিউচার উই ওয়ান্ট’ এ টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয় এবং কীভাবে তা অর্জন করা যায় সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়। ১ জানুয়ারী ২০১৬ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া এসডিজি (ঝউএঝ) র লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২০৩০ সাল। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য পুরোপুরি দূর করা এবং এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য নতুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের খসড়া রোডম্যাপ ২ আগষ্ট ২০১৫ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশ দীর্ঘ তিন বছরের আলোচনা পর্যালোচনা শেষে ১৭ টি লক্ষ্য সামনে রেখে ৩০ পৃষ্ঠার এ খসড়া গ্রহণ করে। এর নামকরণ করা হয় ঞৎধহংভড়ৎসরহম ড়ঁৎ ডড়ৎষফ: ঞযব ২০৩০ অমবহফধ ভড়ৎ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ. ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত টেকসই উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের শীর্ষ নেতারা চরম দারিদ্র্যমুক্ত পরিবেশ সুরক্ষিত ও নিরাপদে বসবাসে উপযোগী বিশ্ব তৈরির উপরিউক্ত এজেন্ডা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে। ২০৩০ লক্ষ্যভেদী টেকসই উন্নয়নের রোডম্যাপ প্রধান লক্ষ্য ১৭টি: সূচক ৪৭টি ও সহযোগী লক্ষ্য ১৬৯টি। নিম্নে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করা হলো:
বেকারত্বের মতো দিকগুলো থেকে সমাজের প্রত্যেকের সুরক্ষা, সকলের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। মৌলিক সেবাসমূহ তথা শ্রম, ভূমি প্রযুক্তিতে স্বল্প পুঁজির লোকদের সম সুযোগ নিশ্চিতকরণে এবং তাদের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য যেসব সামাজিক নীতিমালা সহায়তা করে সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্টন নিশ্চিত করা। প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্যকরভাবে বেড়ে উঠার জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা, ক্ষুধা দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুষ্টি বাড়ানো এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতির প্রচলন। সব বয়সী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনমান নিশ্চিত করা এবং মরণঘাতী রোগ থেকে মুক্তা থাকা। সবার জন্য ন্যায্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সকলের জন্য সব বয়সে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সব নারী ও বালিকার ক্ষমতায়ন করা। সবার জন্য পানি ও পয়ঃব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও তার টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল এবং যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল এবং যথোপযুক্ত কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা। অবকাঠামো নির্মাণ, সবার জন্য ও টেকসই শিল্পায়ন গড়ে তোলা এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা। দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তদেশীয় বৈষম্য হ্রাস করা, বিশেষ করে দ্রুত ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল ভোগের জন্য দরিদ্রদের সহায়তায় প্রদান করা। নগর ও মানব বসতির স্থানগুলো সবার জন্য, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হয়। টেকসই ভোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা প্যাটান নিশ্চিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। ভূপৃষ্টের জীবন পৃথিবীর ইকোসিষ্টেম সুরক্ষা পূর্ণবহাল করা এবং এর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা করা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয়রোধ করা এবং জীব বৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন বন্ধ করা। টেকসই উন্নয়নের জন্য শন্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তি মূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, সবার ন্যায়বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অংশীদারিত্ব বাস্তবায়ন কৌশলগুলো আরো কার্যকর করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব পুনর্জাগরিত করা।
জাতীয় টেইসই উন্নয়ন কৌশলপত্র : ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (ঘঊঈ) এক সভায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিবেশ নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রথমবারে মতো ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র (ঘধঃরড়হধষ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঝঃৎধঃবমু-ঘঝউঝ) নামের একটি উন্নয়ন দলিল অনুমোদন দেয়া হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অবস্থিক জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন শীর্ষক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব সদস্য এ ধরণের টেকসই উন্নয়ন কৌশল অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এ কৌশল গ্রহণ করেছে। এ কৌশলপত্রের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১০-২০২১ সাল পর্যন্ত। দেশের উন্নয়ন যাতে স্থিতিশীল হয় সে জন্য এ কৌশলপত্র একটি রোডম্যাপ। কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য টেসকই উন্নয়ন। এতে দেশের সব খাতের সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
উৎপাদনশীল সম্পদের দীর্ঘস্থায়ী টেকসহিতা চ্যালেঞ্জার সমাধানসহ কৌশলপত্রে বিবৃত রূপকল্প অর্জনের জন্য এন এসডিএস (২০১০-২০২১) তিনটি পারস্পরিভাবে সম্পৃক্ত ক্ষেত্রসহ পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অব্যহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অগ্রাধিকার মূলক খতগুলোর উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। যে তিনটি পারস্পরিকভাবে যুক্ত বিষয়াবলি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকাগুলো টেকসই উন্নয়নে সহায়তা দান করবে সেগুলো হলো, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, ও জলাবায়ূ, সুশাসন এবং জেন্ডার। কৌশলগত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য শীর্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করবে টেকসই উন্নয়ন পরিবীক্ষণ পরিষদ (এসডিএমসি)।
অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি : পরিবেশগত টেকসহিত্বের প্রশ্নে কোন আপস ছাড়াই মধ্যম আয়ের মর্যাদায় অর্থনীতির রূপান্তরসহ উন্নতর জীবন মান দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন ও কর্মসৃজন নিশ্চিত করার জন্য ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধিতে প্রধান উন্নয়ন কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। অবকাঠামো কর্মসূচি, মানব সম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং তথ্য প্রযুুক্তিতে সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এবং বিনিয়োগ প্রণোদনা বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নসহ পিপিপি প্রবর্ধনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে, শিক্ষা ও দক্ষতা শিক্ষণের মানসহ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বৈদেশিক কর্ম সংস্থানের প্রসার, জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি প্রবর্ধনের মাধ্যমে অব্যাহত ও ত্বরান্বিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
অগ্রাধিকারমূলক খাত সমূহের উন্নয়ন : দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারমূলক খাতসমূহের মধ্যে রয়েছে, কৃষি শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন ও মানব সম্পদ উন্নয়ন। এ খাতগুলোর জন্য সুপারিশকৃত কৌশল অর্থনীতিকে সঠিক নির্দেশনা দানের উপর জোর দেয়া হয়েছে, কেননা এ খাতগুলোই আগামীতে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি থাকবে এবং দেশের টেসকই উন্নয়নে সহায়তা করবে।
নগর পরিবেশ : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যেহেতু দ্রুত নগরায়ন অপ্রতিরোধ্য, সুতরাং টেকসই নগর উন্নয়নের ওপর নানাদিক থেকেই দেশের টেকসই উন্নয়ন নির্ভরশীল। এই অংশে নগরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে পাঁচটি প্রধান বিষয়ে সমাধান অন্বেষন করা হয়েছে। সেগুলো হলো, নগর,গৃহায়ন , পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, দূষণ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিবহন এবং নগর ঝুঁকি হ্রাস।
সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা : টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে সকল নাগরিকের অনুকূলে মানসম্মত ও নূন্যতম মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবার অধিকার এবং সেই সাথে সেবা ও ইউলিটি সেবা তাদের জন্য সহজলভ্য করা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী, নারীদের অগ্রগতি ও অধিকার, শিশুদের অগ্রগতি ও অধিকার, বয়োবৃদ্ধ এবং অসমর্থ মানুষের জন্য বিশেষ সেবা দান, কর্মসংস্থানের সুযোগের বিস্তৃতি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও সুবিধাবলিতে অ্যাকসেস বৃদ্ধি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এগুলো সামাজিক উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বস্তুত সামাজিক উন্নয়ন টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিসমূহের অন্যতম।
পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা : এই কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত এলাকার প্রাথমিক উদ্দেশ্যবলির অন্যতম হলো, প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহারসমূহ এর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন যথাযথ গুরুত্ব দান সহ মানব, ইকোসিষ্টেম ও সম্পদের জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, পানি সম্পদ, বন ও জীববৈচিত্র্য ভূমি ও মাটি উপকূলীয় ও সামুদ্রিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিক দূযোর্গ ও জলবায়ূ পরিবর্তন এর আওতাভূক্ত।
পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এলাকা : জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্রের কৌশলগত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে সহায়তা দিতে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত এই এলাকাগুলি হলো, সুশাসন, জেন্ডার, এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, ও জলবায়ু পরিবর্তন। এটি প্রতীয়মান হয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা উপেক্ষা করে সামগ্রিক ভাবে টেসই উন্নয়ন কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়। (অসমাপ্ত)

শাবানের মধ্যরাত

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

আমাদের সামনে এসে গেছে অতি ফযীলতের একটি মাস মাহে শা’বান। প্রিয় নবীজী এ মাসেও দোয়া করতেন, যেভাবে রজব মাসে দোয়া করতেন: ‘‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজব ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রামাদ্বান।’’ অর্থ: হে আল্লাহ আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদেরকে রামাদ্বান পাওয়ার তাওফিক দিন। আমীন।
শা’বান মাসে তিনি অনেকগুলো নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা:) বর্ণনা করেন: “আমি প্রিয় নবী (স:)কে রমাদ্বান ছাড়া আর কোন পূর্ণ মাসের রোযা রাখতে দেখিনি। আর শাবান মাস ছাড়া আর কোন মাসে এত অধিক পরিমাণ নফল রোজা রাখতে দেখিনি”।-(বোখারী ও মুসলিম) সাহাবী উসামা বিন যায়েদ (রা:) বর্ণনা করেন: আমি প্রিয় নবীজী (স:) কে জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ! (স:) শাবান মাসে আপনি যত নফল রোয়া রাখেন অন্য কোন মাসে আপনাকে এত নফল রোজা রাখতে দেখিনা। প্রিয় নবীজী (স:) এরশাদ করলেন: রজব ও রামাদ্বান, এ দুটো মাসের মাঝখানের এ মাসটি সম্পর্কে অনেকেই আসলে গাফেল হয়ে থাকেন। এ মাসে মানুষের আমলের (বার্ষিক রিপোর্ট) আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই আমার আমল যখন পেশ করা হয় আমি যেন তখন রোজার হালতে থাকি।-(আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে খোযাইমা)। তবে শাবান মাসের ১৫ তারিখে শুধু একটি রোজা রাখার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না। আর আমাদের সামনে আসছে মধ্য শাবানের রাতটি। যা অনেক দেশে শবে বরাত নামে পরিচিত। এ রাতের ফযীলত ও আমল সম্পর্কে অন্যান্য বৎসরের মত এবারও আপনাদের খেদমতে কিছু বিস্তারিত আলোচনা পেশ করতে চাই। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দিন। আমীন
প্রত্যেক মুসলমানই অবগত আছেন ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস দু’টি কুরআন ও হাদীস। কুরআন ও হাদীসে যে ইবাদতের যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে একটু বেশি বা কম গুরুত্ব দেয়ার কোন অধিকার কোন মুসলিমের নেই। শবে বরাত নামক বিষয়টি কুরআন করীমে আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। এটাই হচ্ছে উম্মতের মুহাক্বিক আলিম ও ইমামদের মতামত। কেউ কেউ দাবী করে থাকেন সূরা আদ্-দোখানে “লাইলাতুম্ মুবারাকাহ’’- বরকতময় রাত বলতে, শবে বরাতকেই বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তাফ্সীরে ইবনে কাছীর, কুরতুবী ইত্যাদির রেফারেন্সও দেয়া হয়্ আসুন আমরা চেক করে দেখি নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে এ ব্যাপারে কি বলা হয়েছে। লিখার কলেবর যাতে বৃদ্ধি না হয়ে যায়, সে জন্য যথাসম্ভব তাফ্সীরের সার সংক্ষেপ পেশ করা হচ্ছে: ইমাম ইবনে কাছীর (র:) বলেন, বরকতময় রাত বলতে সূরা দোকানে শবে ক্বদরকে বোঝানো হয়েছে। কারণ এখানে কুরআন নাযিলের কথা বলা হয়েছে। আর সেটা তো সূরা ক্বদর এ স্পষ্ট করেই বলা আছে। আর কুরআন রামাদ্বান মাসেই নাযিল হয়েছে সেটাও সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে সূরা বাকারায়। তিনি আরো বলেন, কেউ যদি বলে, বরকতময় রাত বলতে মধ্য শাবানের রাত বুঝানো হয়েছে যেমনটি ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, তাহলে সে প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলো। শবে বরাতে মানুষের হায়াত, মাউত ও রিযকের বার্ষিক ফায়সালা হওয়া সংক্রান্ত যে হাদীসটি উসমান বিন মুহাম্মদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, হাদীসটি মুরসাল। অর্থাৎ হাদীসের প্রথম বর্ণনাকারী হিসেবে যে সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স:) থেকে হাদীসটি শুনেছেন তার কোন উল্লেখ নেই। ফলে এমন দুর্বল হাদীস দিয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের অকাট্য বক্তব্যকে খন্ডন করা যায় না। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন- তাফসীর ইবনে কাছীর, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৩১৬১)।
ইমাম কুরতুবী ঃ ইমাম কুরতুবী বলেন, বরকতময় রাত্রি বলতে ক্বদরের রাতকে বোঝানো হয়েছে। যদিও কেউ বা বলেছেন সেটা হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত। ইকরিমাও বলেছেন সেটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত। তবে, প্রথম মতটি অধিকতর শুদ্ধ। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, আমি এ কুরআনকে লাইলাতুল ক্বদর এ নাযিল করেছি। এ প্রসঙ্গে মানুষের হায়াত, মাউত, রিযক ইত্যাদির ফায়সালা শবে বরাতে সম্পন্ন করা হয় বলে যে রেওয়ায়েত এসেচে, সেটাকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেন। তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, সহীহ শুদ্ধ কথা হচ্ছে এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর।
অত:পর তিনি প্রখ্যাত ফকীহ কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবীর উদ্ধৃতি পেশ করেন, ‘‘জমহুর আলিমদের মতামত হচ্ছে এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর। কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন এটা মধ্য শাবানের রাত। এ কথাটি একেবারেই বাতিল। কারণ আল্লাহ স্বয়ং তার অকাট্য বাণী কুরআনে বলেছেন, রামাদ্বান হচ্ছে ঐ মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। যেথায় তিনি মাস উল্লেখ করে দিয়েছেন। আর বরকতময় রাত বলে লাইলাতুল ক্বদরকে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ রাতটাকে রামাদ্বান থেকে সরিয়ে অন্য মাসে নিয়ে যায়, সে মূলত আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে বসে। মধ্য শাবানের রাতটির ফযীলত এবং এ রাতে হায়াত, মাউতের ফায়সালা সংক্রান্ত কোন একটি হাদীসও সহীহ এবং নির্ভরযোগ্য নয়। কাজেই কেউ যেন সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: তাফসীরে কুরতুবী ১৬শ’ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১২৬-১২৮)। ইমাম তাবারী তাফসীরে তাবারীতে বরকতময় রাতের তাফসীরে উল্লেখ করেন: কাতাদাহ (র:) বর্ণিত এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর এর রাত। প্রতি বৎসরের শাবানের মতামতটিও উল্লেখ করেন। পরিশেষে তিনি মন্তব্য করেন : লাইলাতুল ক্বদর এর মতটিই শুদ্ধ ও সহীহ। কারণ এখানে কুরআন নাযিলের কথা বলা হয়েছে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : তাফসীরে তাবারী ১১ খন্ড, পৃষ্ঠা: ২২১-২২৩)।
তাফসীরে আদওয়াউল বায়ান ঃ আল্লামা মুহাম্মদ আল আমীন আশ শিনকীতী (র:) সূরা দোখানের বরকতময় রাতের তাফসীরে বলেন, এটি হচ্ছে রামাদ্বান মাসের ক্বদরের রাত। মধ্য শাবানের রাত হিসেবে সেটিকে বোঝানো হয়েছে মনে করা, যেমনটি ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত রেওয়াতে বলা হয়েছে, একটি মিথ্যা দাবী ছাড়া আর কিছু নয়। কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী এ দাবীটি নি:সন্দেহে হকের বিপরীত যে কোন কথাই বাতিল। কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী যে হাদীসগুলো কেউ কেউ বর্ণনা করে থাকেন, যাতে বলা হয় এ রাতটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত, সে হাদীসগুলোর কোন ভিত্তি নেই। সেগুলোর কোনটার সনদই সহীহ নয়। ইবনুল আরাবী সহ অনেক মুহাক্বীক আইম্মায়ে কেরাম এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বলেছেন- বড়ই আফসোস ঐসব মুসলমানদের জন্য যারা কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধীতা করে কুরআন বা সহীহ হাদীসের দলিল ছাড়াই। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আদওয়াউল বায়ান, ৭ম খন্ড, পৃ: ৩১৯)। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতী শফী (র:) এ বিষয়ে মা’আরেফুল কুরআনে বলেন, বরকতময় রাত বলতে অধিকাংশ তাফসীরবিদদের মতে এখানে শবে ক্বদর বোঝানো হয়েছে যা রামাদ্বান মাসের শেষ দশকে হয়। কেউ কেউ আলোচ্য আয়াতে বরকতের রাত্রির অর্থ নিয়েছেন শবে বরাত। কিন্তু এটা শুদ্ধ নয়। কেননা, এখানে সর্বাগ্রে কুরআন অবতরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর কুরআন যে রামাদ্বান মাসে নাযিল হয়েছে, তা কুরআনের বর্ণনা দ্বারাই প্রমাণিত। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: মা’আরিফুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ১২৩৫)।
প্রিয় পাঠক, লক্ষ্য করুন প্রতিটি তাফসীরেই ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত শবে বরাতের বর্ণানাটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আর কুরআনের অন্যান্য আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত করা হয়েছে এটি হচ্ছে লাইলাতুল ক্বদর। কুরআন দিয়েই কুরআনের তাফসীর গ্রহণ করার সুযোগ থাকলে সেটাই গ্রহণ করতে হবে। এটাই ওলামায়ে উম্মতের এজমাহ। তারপরও কি এ বিষয়ে আর কোন বিতর্কের অবকাশ থাকে? কুরআনে শবে বরাতের কোন উল্লেখ নেই, এ বক্তব্যটি সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবার আমরা দেখি হাদীস শরীফে কি আছে। শবে বরাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো দু’প্রকার: প্রথমত: শবে বরাতে কত রাকাত নামায পড়তে হবে, সূরা ইখরাস, আয়াতুল কুরসী প্রতি রাতে কতবার পড়তে হবে ইত্যাদি এবং সে আমলগুলোর বিস্তারিত ছওয়াবের ফিরিস্তি সংক্রান্ত হাদীসগুলো একেবারেই জাল এবং বানোয়াট। আর দ্বিতীয় প্রকার হাদীস হলো এ রাতের ফযীলত, ইবাদতের গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ে। এসব হাদীসগুলোর কোনটাই সহীহ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। বরং সবগুলোই দ্বায়ীফ (দুর্বল)। তবে সবগুলোই মাউদু (জাল বা বানোয়াট নয়)
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। ছিহাহ্ ছিত্তা (ছয়টি গ্রন্থের) সবগুলো হাদীসই কি সহীহ? হাদীস বিশারদগণ প্রায় একমত যে বুখারী ও মুসলিম এ দুটো গ্রন্থের সবগুলো হাদীসই সহীহ পর্যায়ের। কোন দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীসের অবকাশ নেই এ দুটো গ্রন্থে। আর বাকী ৪টি গ্রন্থের অধিকাংশ হাদীসগুলো সহীহ। তবে, বেশ কিছু সংখ্যক দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীসও রয়েছে সেগুলোর মধ্যে। শবে বরাত সংক্রান্ত কোন একটি হাদীসও বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে আসেনি। আর বাকি ৪টি গ্রন্থে বা অন্যান্য আরও কিছু গ্রন্থে এ সংক্রান্ত যে হাদীসগুলো এসেছে, তার একটিও সহীহ হাদীসের মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শবে বরাত সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস হাদীস বিশারদদের মন্তব্য সহকারে উল্লেখ করা হলো : ১) আলী (রা:)’র বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (স:) এরশাদ করেছেন, ১৫ই শাবানের রাতে তোমরা বেশি বেশি করে ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। এ রাতে আল্লাহ তা’আলা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। বলতে থাকেন ঃ কে আছ আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইতে। আমি তাকে মাফ করতে প্রস্তুত। কে আছ ‘রিযক চাইতে’! আমি তোকে রিযক দিতে প্রস্তুত। কে আছ বিপদগ্রস্ত! আমি তাকে বিপদমুক্ত করতে প্রস্তুত। কে আছ… এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত।” ইবনে মাজাহ কর্তৃক হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদীসটি যে আদৌ সহীহ নয় সে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম হাফেয শিহাবুদ্দিন যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন হাদীসটির সনদ দ্বায়ীফ (দুর্বল)। কারণ অনির্ভরযোগ্য। এমন কি ইমাম আহমদ বিজন হাম্বল এবং প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইবনু মাঈন তার মাজাহ, মন্তব্য ও সম্পাদনা, মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বারী, পৃ: ৪৪৪)।
২) আয়েশা (রা:) বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি এক রাতে দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ (স:) আমার পাশে নেই। আমি উনার সন্ধানে বের হলাম। দেখি যে তিনি জান্নাতুল বাকী (কবর স্থানে) অবস্থান করছেন। ঊর্ধ্বাকাশের পানে তার মন্তক ফেরানো। আমাকে দেখে বললেন, আয়েশা, তুমি কি আশংকা করেছিলে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স:) তোমার প্রতি অবিচার করছেন। আয়েশা (রা:) বললেন, এমন ধারণা করিনি, তবে মনে করেছিলাম, আপনার অন্য কোন বিবির সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন কিনা! রাসূলুল্লাহ (স:) বললেন, আল্লাহ তা’আলা ১৫ই শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসে এবং কালব গোত্রের সমুদয় বকরীর সকল পশমের পরিমাণ মানুষকে মাফ করে দেন। (তিরমিযী/ ইবানে মাজাহ)। ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করে নিজেই মন্তব্য করেছেন, আয়েশা (রা:) বর্ণিত এ হাদীসটি হাজ্জাজ বিন আরতাআহ্ ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেছেন বলে জানা নেই।
ইমাম বোখারী বলেছেন, এ হাদীসটি দ্বায়ীফ (দুর্বল)। হাজ্জাজ বিন আরতাআহ্ বর্ণনা করেছেন ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাছীর থেকে। অথচ হাজ্জাজ ইয়াহ্ইয়া থেকে আদৌ হাদীস শুনেননি। ইমাম বোখারী আরও বলেছেন, এমন কি ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাছীর ও ওরওয়া থেকে আদৌ কোন হাদীস শুনেননি। (দেখুন জামে তিরমিযী, ছাওম অধ্যায়, মধ্য শাবানের রাত, পৃ: ১৬৮-১৬৫)।
৩) আবু মুছা আশআরী (রা:) থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (স:) বলেছেন, ১৫ই শাবানের রাতে আল্লাহ তা’আলা নীচে নেমে আসেন, বরং সকল মাফলুককেই মাফ করে দেন। তবে মুশরিক এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টিকারীকে মাফ করেন না- (ইবনে মাজাহ)। এ হাদীসটির ব্যাপারে হাফেয শিহাবুদ্দীন তাঁর যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এর সনদ দ্বাইফ (দুর্বল) একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আব্দুল্লাহ বিন লাহইয়াআহ নির্ভরযোগ্য নন। আরেকজন রাবী ওয়ালিদ বিন মুসলিম তাদলীছকারী (সনদের মধ্যে হেরফের করতে অভ্যস্ত) হিসেবে পরিচিত। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আছ্ছিন্দী বলেছেন, এ হাদীসের আরেকজন রাবী আদ্দাহ্হাক কখনো আবু মুছা থেকে হাদীস শুনেননি। শবে বরাত সংক্রান্ত বিষয়ে বর্ণিত সবগুলো হাদীসের সনদের মধ্যেই এ জাতীয় দুর্বলতা বিদ্যামান থাকার কারণে একটি হাদীস ও সহীহর’র মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। লিখার কলেবর বৃদ্ধি হওয়ার আশংকায় আমরা বাকি হাদীসগুলো বা তদসংক্রান্ত মন্তব্য উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছি।
এবার প্রশ্ন আসে দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীসের ভিত্তিতে কোন আমল করা যায় কি না? অধিকাংশ মুহাদ্দীসের মতে দ্বায়ীফ হাদীসের কোন আমলা করা শরীয়তে জায়েয নেই। অধিকাংশ ফোকাহা ও আইম্মায়ে কেরাম দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীস দ্বারা শর্ত সাপেক্ষে আমল করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন। সেগুলো নিম্নরূপ:  খুব বেশি দ্বায়ীফ (দুর্বল) পর্যায়ের না হওয়া,  শুধুমাত্র ফাযায়েল অধ্যায়ের হওয়া,  আমল করার সময় সহীহভাবে প্রমাণিত হওয়ার সুস্পষ্ট ধারণা না রাখা,  কুরআন ও সহীহ হাদীসের কোন বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া। বরং কুরআন বা সহীহ হাদীসের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হওয়া। উক্ত মূলনীতিগুলোর আলোকে শবে বরাতের আমল করা যেতে পারে অনেক ওলামায়ে কেরাম মতামত দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন আসে আমল করতে হলে কিভাবে করা যাবে।
প্রথমত: ব্যক্তিগতভাবে কিছু ইবাদত বন্দেগী করা যেতে পারে। সেজন্য মসজিদে সমবেত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করার জন্য ওয়ায, নসীহত, যিকির ইত্যাদির আয়োজন করা যাবে না (দেখুন-ফাতাওয়া শামীয়া, ইমাম বিন আবেদীন, পৃ: ৬৪২)। কারণ রাসূলুল্লাহ (স:) এবং সাহাবায়ে কিরামগণ এমনটি করেননি। তাই সে ত্বরীকার বাইরে ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা আবিষ্কার করলে সেটা হয়ে যাবে বিদ্আত।
দ্বিতীয়ত: হায়াত, মাউত, রিযক ইত্যাদির ফায়সালা এ রাতে হয়, এটা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, এসব ফায়সালা লাইলাতুল ক্বদরে হয়, তা সুস্পষ্টভাবে কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
তৃতীয়ত: আমাদের দেশে আলোকসজ্জা ও আতশবাজীর যে তামাশা করা হয়, তা স্স্পুষ্ট বিদ্আত। সে ধারণা থেকেই কোন কোন এলাকায় এ রাতের নাম হচ্ছে বাতির রাত। এসব ধারণা ইসলামী শরীয়তে হিন্দুদের দিওয়ালী অনুষ্ঠান থেকে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র:)। হালুয়া, রুটি, বিলি বন্টনের কার্যক্রমও বিদআত (দেখুন-ফাতওয়া শামীয়া, ইমাম বিন আবেদীন পৃ : ৬৪২)। ইবাদতের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এসব অনেক আমল শিয়াদের কাছ থেকে উপমহাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছেন বলে মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানী উল্লেখ করেছেন (দেখুন সাত মাসায়েল : শবে বরাতে শিয়াদের ভ্রষ্টতা, পৃ: ৩৯-৪২)।
চতুর্থত : নফল ইবাদতের জন্য সারা রাত মসজিদে এসে জেগে থাকা রাসূল (স:) এর সুন্নাত বিরোধী। তিনি নফল ইবাদত ঘরে করতে এবং ফরয নামায জামাআতের সাথে মসজিদে আদায় করতে তাগিদ করেছেন। আর সারারাত জেগে থেকে ইবাদত করাটাও সুন্নাত বিরোধী। প্রিয় নবীজী (স:) সব রাতেই কিছু অংশ ইবাদত করতেন, আর কিছু অংশ ঘুমাতেন। ওনার জীবনে এমন কোন রাতের খবর পাওয়া যায়না, যাতে তিনি একদম না ঘুমিয়ে সারা রাত জেগে ইবাদত করেছেন।
পঞ্চমত : শবে বরাতের দিনের বেলায় রোযা রাখার হাদীস একেবারেই দুর্বল। এর ভিত্তিতে আমল করা যায় না বলে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহ মুফতী মাওলানা তাকী উসমানী সাহেবের সুস্পষ্ট ফাতওয়া রয়েছে। শবে বরাতে কবর জিয়ারত সহ ইত্যাদি অনেকগুলো আমলের কোন সহীহ দলিল না থাকার কারণে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহ মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানী হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র:)’র সাথে বহু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র:) শেষের দিকে কিছু কিছু বিষয় অবশ্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
ষষ্ঠত : শবে বরাতের রোজার পক্ষে যেহেতু কোন মজবুত দলিল নেই, তাই যারা নফল রোজা রাখতে চান তারা আইয়ামে বীদ্বের তিনটি রোজা ১৩, ১৪ ও ১৫ রাখতে পারেন। এর পক্ষে সহীহ হাদীসের দলিল রয়েছে। শুধু একটি না রেখে এ তিনটি বা তার চেয়েও বেশি রোজা রাখতে পারলে আরও ভাল। কারণ, শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ (স:) সবচেয়ে বেশি পরিমাণ নফল রোজা রেখেছেন। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তাওফিক দিন-আমীন।

পবিত্র শাবান মাসের ফজিলত ও ইবাদত

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী

ই সলাম ধর্মে চন্দ্রমাসের মধ্যে শাবান মাস হলো বিশেষ ফজিলত পূর্ণ। এ মাসে রয়েছে লাইলাতুল বরাতের মতো অত্যন্ত বরকতময় রজনী। যাকে বলা হয় মাহে রমজানের আগমনী বার্তা। শাবান মাস মূলত পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতির মাস। প্রতিবারের মতো শাবান মাস মুসলমানদের কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত রমজান মাসের সওগাত নিয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি বেশি নফল রোজা, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও নামাজ আদায় করে মাহে রমজানের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন।
উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘নবী করিম (সা.) কখনো নফল রোজা রাখতে শুরু করলে আমরা বলাবলি করতাম, তিনি বিরতি দেবেন না। আর রোজার বিরতি দিলে আমরা বলতাম যে তিনি মনে হয় এখন আর নফল রোজা রাখবেন না। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা পালন করতে দেখিনি। কিন্তু শাবান মাসে তিনি বেশি নফল রোজা রেখেছেন।’ (মুসলিম)। অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘শাবান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এত অধিকহারে নফল রোজা আদায় করতেন না।’ (বুখারি)
নবী করিম (সা.) হিজরি সালের শাবান মাসের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও তাৎপর্যের বিবেচনায় এ মাসে অধিক হারে নফল ইবাদত-বন্দেগি করতেন। মাহে রমজানের মর্যাদা রক্ষা এবং হক আদায়ের অনুশীলনের জন্য রাসুলূল্লাহ (সা.) শাবান মাসে বেশিবেশি রোজা রাখতেন। এ সম্পর্কে হযরত আনাস (রা.) বলেছেন, নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনার কাছে মাহে রমজানের পর কোন্ মাসের রোজা উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘রমজান মাসের সম্মান প্রদর্শনকল্পে শাবানের রোজা উত্তম।’ (তিরমিযি)। মাহে রমজানে দীর্ঘ ৩০টি রোজা পালনের কঠিন কর্মসাধনা সহজ ও নির্বঘেœ আদায় করার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে শাবান মাসের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় মাসের একটি হলো শাবান। এ মাসে নফল রোজা আদায় করেই তিনি মাহে রমজানের রোজা পালন করতেন।’(আবু দাউদ)।
মানব জীবনের সব কালিমা দূর করার বিশেষত্ব নিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাস রমজানুল মোবারক আসে শাবান মাসের সমাপ্তির পরই। তাই এ গুরুত্ববহ মাস সারাবিশ্বের মুসলমানদের সুদীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। তাই আসন্ন মাহে রমজানের মূল সিয়াম শুরু করার আগে শাবান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কিছু নফল রোজা রাখা দরকার, যাতে করে মাহে রমজানের রোজা পালন সহজ হয় এবং লক্ষ্যও ঠিকমতো অর্জিত হয়। যারা শাবান মাসে নফল রোজা রাখতে চান, তাদের মধ্যভাগেই শেষ করে ফেলা উচিত। শাবান মাসের অর্ধেকের পর বেশি রোজা আর না রাখাই ভালো। মাহে রমজানের প্রস্তুতিকল্পে ইসলামে শাবান মাসকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের চাঁদের কথা অধিক যতেœর সঙ্গে স্মরণ রাখতেন, যা অন্য মাসের বেলায় হতো না।’ (মুসনাদে আহমাদ)। দেখা যায়, বেশ কয়েকটি হাদিসে শাবান মাসের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ বিধৃত হয়েছে। হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে শাবান মাসে অন্যান্য মাস অপেক্ষা বেশি নফল রোজা রাখতে দেখি।’ এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এ মাস অনেকেই খেয়াল করেনা। এটি এমন একটি মাস, যে মাসে মানুষের সব কর্মকান্ড আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হয়। তাই আমি চাই এমন সময়ে আমার কর্মকান্ডের খতিয়ান আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করা হোক, যখন আমি রোজা অবস্থায় রয়েছি।’ (নাসাঈ ও আবু দাউদ)।
একটি হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত আগমন করে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের দিকে মনোযোগ দেন এবং মুমিনবান্দাদের ক্ষমা করেন, আর হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেন (যতক্ষণ না তারা তওবা করে সুপথে ফিরে আসে)’ (বায়হাকি)।
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রজনীতে তার সৃষ্টির (বান্দাদের) প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন, তবে তারা ব্যতীত যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করে এবং অপরকে ক্ষতি সাধনের বাসনা পোষণ করে।’ (ইবনে হিব্বান)।
শাবান মাসে শবে বরাত নামে বিশেষ একটি রজনী আছে, যে রজনীতে বান্দার সারা বছরের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং আগামী এক বছরের জন্য বান্দার হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত ইত্যাদির নতুন বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। যে কারণে শাবান মাসকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ মাসে মুসলমানদের আমল-আখলাক যেন সুন্দর হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) সেদিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
শাবান মাসে ভারসাম্যপূর্ণ নেক আমলের তাগিদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সাধ্যানুযায়ী আমল করবে, কেননা আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল তা-ই যা সর্বদা পালন করা হয়।’ (বুখারি)। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায় গোটা শাবানে নফল রোজা পালন করতেন এবং অন্যদেরও বিশেষভাবে আমল করার উৎসাহ দিতেন। তাই বলা হয়, ‘রজব মাসে শস্য বপন করা হয়, শাবান মাসে ফসল কাটা হয় এবং রমজান মাসে ফসল কর্তন করা হয়।’
শাবান মাসের ফজিলত সম্পর্কে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস।’ শাবান মাসকে রমজান মাসের প্রস্তুতি ও সোপান মনে করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশেষ দোয়া করতেন এবং অন্যদের তা শিক্ষা দিতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে শাবান মাসের মর্যাদা এতই বেশি যে, যখন তিনি এ মাসে উপনীত হতেন, তখন মাহে রমজানকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে অধিক হারে এই বলে প্রার্থনা করতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসের বিশেষ বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন।’ (মুসনাদে আহমাদ)। মহানবী (সা.)-এর এ দোয়ার মাধ্যমে সবার কাছে শাবান মাসের ফজিলত প্রতীয়মান হয়।
অতএব, পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টি লাভের আকাক্সক্ষায় শাবান মাসব্যাপী অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক পরিমাণে ইবাদত-বন্দেগি ও মধ্য শাবানের রজনীতে তওবা- ইস্তেগফার করে অতীতের সব গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান আদর্শ অনুসরণে নিজেদের জীবন পরিচালনার দৃঢ় প্রত্যয় ও শপথ গ্রহণ করা উচিত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ছুম্মা আমিন।

ইসলামে সম্পদ উপার্জনে সফলতা-ব্যর্থতা প্রসঙ্গ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

প্রত্যেক ব্যক্তির জীবিকার জন্য প্রয়োজন কর্মের। প্রতিটি মানুষই তার যোগ্যতানুযায়ী কাজ করে। সকল মানুষেরই জন্মগতভাবে কমবেশি কর্মদক্ষতা ও প্রতিভা আছে। আল্লাহ্ প্রদত্ত এ যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতাকে অকর্মণ্য, নিষ্ক্রিয় ও অকেজো করে রাখার অধিকার কারো নেই। নবী-রাসূলগণকেও জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুসমূহ অর্থ ছাড়া অর্জন করা যায় না। অর্থসম্পদ উপার্জনে ইসলাম সকল মানুষকে উৎসাহিত করে। উপার্জনকারী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। জীবন এবং সম্পদ একটি অপরটির পরিপূরক। সম্পদ ছাড়া যেমন জীবনধারণ সম্ভব নয়, তেমনি প্রাণহীন ব্যক্তির জন্য অর্থেরও কোন মূল্য নেই। অর্থসম্পদ মানুষের কল্যাণের জন্য কিন্তু এ সম্পদই আবার কখনোও কখানোও অকল্যাণের কারণ হয়ে থাকে। বিত্ত-বৈভব যেমন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে অনুরূপভাবে তা আবার মানুষের ক্ষতিকর কাজেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইসলাম ছাড়া সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে যে সকল রীতিনীতি অনুসৃত হচ্ছে, তার সবগুলোই সম্পদ সঠিক ব্যবহার ও সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সকল মানুষের সার্বিক কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পেরেছে এমনটি জোর দিয়ে বলা যায় না। অত্র প্রবন্ধে সম্পদ-এর পরিচয়, সম্পদ উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা বিশেষত বৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সম্পদ-এর পরিচয় : জাস্টিনিয়ান তাঁর ইনস্টিটিউটস্ এ রেসকে (জবং) দ্বিতীয় শ্রেণীর আইন হিসেবে অভিহিত করেছেন। রেস শব্দটির প্রতিশব্দ হলো বস্তু। এর দু’টি অর্থ রয়েছে। সাধারণ অর্থে যে সকল বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোই রেস; যেমন: টেবিল, চেয়ার, বাড়ি, একখন্ড জমি ইত্যাদি। তবে আইনবিদদের মতে রাস্তায় চলার অধিকার ও দেনা ইত্যাদিও বস্তুর মধ্যে গণ্য। এ প্রসঙ্গে রোমান আইনে সম্পদ শব্দের অর্থ (গবধহরহমং ড়ভ ঃযব ঃবৎস ‘চৎড়ঢ়বৎঃু’) সকল আইনগত অধিকার, মালিকী অধিকার, সর্বজন স্বীকৃত মালিকী অধিকার ইত্যাদি।
সম্পদ উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা : সাধারণভাবে উপার্জনের অনেক প্রকার থাকতে পারে, তবে মৌলিক দিক থেকে মানুষের উপার্জনকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ক. বৈধ পন্থায় উপার্জন এবং খ. অবৈধ পন্থায় উপার্জন। নিম্নে এসম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো-
বৈধ পস্থায় উপার্জন : বৈধ পন্থায় উপার্জনের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম শর্ত হলো, বান্দার হালাল উপার্জন। কেননা রিযিক যদি হালাল পন্থায় উপার্জিত না হয় তাহলে তার কোনো দুআ কিংবা ইবাদত কোনটাই কবুল হয় না। আল্লাহ্ আমাদেরকে হালাল রিযিক দিয়ে জীবনধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘আমি তোমাদের জন্য যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু তোমরা ভক্ষণ কর।’’ আর বৈধ পেশায় নিয়োজিত থেকে সম্পদ উপার্জনের জন্য পবিত্রতম ও হালাল বস্তুর খোঁজ করার নির্দেশও আল্লাহ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! জুমুআর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয় হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। সালাত শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও। যখন তারা দেখল ব্যবসায় ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ান অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। বল, আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।’’
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘‘পৃথিবী মিষ্ট ও শ্যামল। এখানে যে ব্যক্তি হালাল সম্পদ উপার্জন করবে এবং ন্যায়সংগত পথে তা ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে ব্যক্তি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করবে এবং অন্যায় পথে ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে অপমানজনক স্থানে নির্বাসিত করবেন। আর যারা হারাম সম্পদ হস্তগতকারী, কিয়ামতের দিন তারা আগুনে জ্বলবে।’’ এভাবে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং হালাল পন্থায় উপার্জনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিুে বৈধ পন্থায় উপার্জনের কতিপয় মাধ্যম উপস্থাপন করা হলো-
চাকরি : সম্পদ উপার্জনের জন্য মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে তা আহরণ করতে হয়। আল্লাহ্ বনী ইসরাঈলের জন্য যেমন মান্না “ ‘মান্না’ এক ধরনের সুস্বাদু খাবার, যা শিশিরের মত গাছের পাতায় ও ঘাসের উপর জমে থাকত। আল্লাহ্ বিশেষভাবে তা বনী ইসরাঈলের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। ‘সালওয়া’ পাখির গোশ্ত জাতীয় এক প্রকার খাদ্য, যা আল্লাহ্ বনী ইসরাঈলের জন্য বিশেষভাবে প্রেরণ করেছিলেন।” নাযিল করতেন তেমনটি এ যুগে আর হবার সম্ভবনা নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন : ‘আর আমি তোমাদের উপর মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি নাযিল করলাম ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’। তোমরা সে পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর, যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি। মুসলিম উম্মাহকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জনের শিক্ষা রসূলুল্লাহ্ (স.) দিয়েছেন। এজন্য মানুষকে পরিশ্রমের জন্য নিত্য নতুন উপায় বের করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তন্মধ্যে একটি হলো চাকরি করা এবং নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে তা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা। চাকুরীর ক্ষেত্র হালাল হতে হবে। হারাম কোনো কাজে চাকরি নিয়ে তার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করলে তা কখনই হালাল হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আর মানুষ প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুই অর্জন করতে পারে না।’’ আর এই যে মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়। আর এই যে, তার প্রচেষ্টার ফল শীঘ্রই তাকে দেখানো হবে। তারপর তাকে পূর্ণ প্রতিফল প্রদান করা হবে।’’ এ আয়াতের প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘‘নিজ হাতের উপার্জন মানুষের উত্তম খাদ্য। আর সন্তান মানুষের নিজ হাতের উপার্জনের অন্তর্ভূক্ত।’’
কৃষি কাজ : সাওয়াব লাভের জন্য যেমন সৎ কাজ ও সাধনা জরুরী, তেমনি সম্পদ লাভের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ জরুরী। এ জন্য নিজের ভাগ্যকে নিজে গড়ার লক্ষ্যে মানুষকে কষ্ট করে রিযিকের ব্যবস্থা করতে হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’’
উপার্জনের অন্য আরেকটি মাধ্যম হলো কৃষি কাজ। আদম আ. এ কৃষি কাজ করেছেন। এটি একটি উন্নত পেশা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে নিয়ে ফসলহীন উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করলাম, হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিযিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে।’’
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘‘তিনি সেই সত্তা, যিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন, যাতে রয়েছে তোমাদের জন্য পানীয় এবং তা থেকে হয় উদ্ভিদ, যাতে তোমরা জন্তু চরাও। তার মাধ্যমে তিনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন ফসল, যায়তুন, খেজুর গাছ, আঙ্গুর এবং সকল ফল-ফলাদি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে’’।
এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কোন মুসলমান যখন কোন কিছু রোপণ করে অতঃপর তা থেকে কোন মানুষ অথবা কোন চতুষ্পদ জন্তু কোন কিছু ভক্ষণ করে তা রোপণকারীর জন্য সদকার সমতুল্য সাওয়াব হয়।’’
আবূ আইউব আল-আনসারী (রা.) বলেন, রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি কোন বৃক্ষ রোপণ করলো আল্লাহ্ তার জন্য একটি প্রতিদান নির্ধারণ করে রেখেছেন সে গাছ থেকে ফল বের হোক বা না হোক।’’
হাদীসের অপর এক বর্ণনায় কৃষি কাজকে সদকায়ে জারিয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রা.) বলেন; রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: সাতটি বিষয়ে আমলের প্রতিদান মৃত ব্যক্তির কবরেও প্রদান করা হবে। তা হল, জ্ঞান শিক্ষা দেয়া, নদী ও কূপ খনন করা, খেজুর গাছ গালানো, মসজিদ নির্মাণ করা, বই-পুস্তক রেখে যাওয়া এবং এমন সন্তান দুনিয়ায় রেখে যাওয়া যে সন্তান ঐ ব্যক্তির ইন্তিকালের পর তার জন্য দুআ করবে।’’ এভাবে কুরআন ও হাদীসে কৃষিকাজকে একটি উন্নত পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
শ্রম : সম্পদ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে শ্রম। কুরআন মাজীদেও এ মাধ্যমটির উল্লেখ করা হয়েছে। এটাকে অবলম্বন করে মানুষ কোন রকম পুঁজি ছাড়াই নিজের জীবিকা অর্জন করতে পারে। কুরআনে দু’জন নবীকে শ্রমিক-মালিক হিসেবে পেশ করা হয়েছে। মূসা (আ.) মহরের বিনিময়ে তাঁর স্ত্রীর বকরী চরিয়েছিলেন বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাআলা শুআইব (আ.) এর বক্তব্যের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন: ‘‘আমার একান্ত ইচ্ছা, আমার এই কন্যা দু’টির একটিকে বিবাহ দেব তোমার সাথে এ শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করে দেবে, আর যদি দশ বছর পুরো করে দাও, তবে সেটা হবে তোমার অনুগ্রহ।’’
এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় ইব্নে কাছীর (র.) বলেন, মূসা বললেন: আমার ও আপনার মাঝে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হল যে, আট বছর ও দশ বছর এ দু’টির যে কোন একটি সময় আমি পূরণ করব। আর এটা আমার ইচ্ছাধীন। আট বছর পূরণ করার পর আমার উপর আপনি অতিরিক্ত পরিশ্রম চাপিয়ে দিতে পারবেন না।’’ আর আমাদের এ পারস্পরিক আলোচনায় আল্লাহকে আমরা সাক্ষী হিসেবে স্বীকার করছি। তিনিই আমাদের কার্যনির্বাহী। আমার পক্ষে আট বছরের স্থানে দশ বছর মজুরী করা যদিও মুবাহ, তা পূর্ণ করা জরুরী নয়। (অসমাপ্ত)

সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামে নির্দেশনা

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সন্ত্রাস প্রতিরোধে তরুণ বয়সে মুহাম্মদ (সা.) যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার বাস্তবায়ন তার সমগ্র জীবনে পরিলক্ষিত হয়। তিনি নবুওয়াত পাওয়ার পরেও এই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলেননি। তিনি নবুওয়াত প্রাপ্তির পর কোন একদিন বলেন: “আজও যদি কোন উৎপীড়িত ব্যক্তি “হে ফুযুল প্রতিজ্ঞার ব্যক্তিবর্গ’ বলে ডাক দেয়, আমি অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেব। কারণ, ইসলাম এসেছে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং উৎপীড়িত, অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে। এভাবে মহানবী (সা.) মক্কানগরী থেকে অন্যায়, অত্যাচার ও সন্ত্রাস দূর করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সন্ত্রাস প্রতিরোধের আদর্শ রেখে গিয়েছেন।
রাসূল (সা.) নবুওয়াত লাভের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অহীভিত্তিক ফর্মূলা অনুযায়ী বিশ্বকে গড়ে তোলার জন্য সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস কোন সাফল্যজনক পদ্ধতি হতে পারে না। বিশেষ করে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে-যেমনটি মহানবী (সা.) এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবে হয়েছিল, তাহলে সন্ত্রাস নির্মূলে সন্ত্রাসী নির্মূলের নির্বুদ্ধিতাগত নীতির ফলে পুরো সমাজটাকেই প্রায় নির্মূল করে ফেলতে হবে। আবার সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকলে সন্ত্রাস ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। উভয় অবস্থায়েই সমাজের সর্বনাশ অনিবার্য। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে মধ্যপন্থা গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে তথায় শান্তি স্থাপনের চেষ্টায় মহানবী (সা.) তাঁর সমগ্র নবুওয়াতী জীবন ব্যয় করেছিলেন। সন্ত্রাস প্রতিরোধ বা নির্মূলে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদক্ষেপ অগণিত। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-
নবুওয়াতের দ্বাদশ বছর হজ্ব উপলক্ষে মক্কায় আগত লোকদের মধ্যে ১২ জন রাসূল (সা.) এর সাথে আকাবা নামক স্থানে সাক্ষাৎ করলে তারা তাঁর নিকট ইসলাম গ্রহণ পূর্বক অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করার অঙ্গীকার করলেন। এই অঙ্গীকার গ্রহণ অনুষ্ঠানকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। এই বাইআতে সাহাবাগণ যে বিষয়গুলোর উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তার বিবরণ দিয়ে বাই’আতের অন্যতম সদস্য উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) বলেন : “আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার (শরীক) করবো না, চুরি-ডাকাতি করবো না, ব্যভিচার করবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবো না এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যাপারে রাসূল সা. এর অবাধ্যতা করবো না। অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন: “এসব অঙ্গীকার পূরণ করলে তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। আর এর কোন একটি ভঙ্গ করলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইচ্ছে করলে মাফ করে দিবেন, ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দিবেন। এই প্রতিজ্ঞার বিষয়াবলীর সবগুলোই প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে সর্বপ্রথম তার সাহাবাদেরকে সকল সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, যার ফলে পরবর্তীকালে মক্কা-মদীনাসহ সমগ্র ইসলামী বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল হয়েছিলো।
কাফির-মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় স্থায়ীভাবে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে মদীনায় বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত ইয়াহুদীদের সাথে তিনি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন, যা ইতিহাসে মদীনার সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গধফরহধ) নামে খ্যাত। নবী করীম (সা.) এর পক্ষ থেকে কুরাইশী, মদীনাবাসী, তাদের অধীনস্থ এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্টদের এবং জিহাদে অংশগ্রহণকারী মু‘মিন ও মুসলিমদের মধ্যে সম্পাদিত এ অঙ্গীকারনামায় সন্ত্রাস প্রতিরোধক যে ধারাগুলো ছিলো তা নিম্নরূপ: যারা বাড়াবাড়ি করবে, সকল সত্যানিষ্ঠ মুসলিম তাদের বিরোধিতা করবে। ঈমানদারদের মধ্যে যারা জুলুম অত্যাচার, পাপ, দাঙ্গা-হাঙ্গমা বা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে, সকল মু‘মিন তাদের বিরোধিতা করবে। মু‘মিনরা সম্মিলিতভাবে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে থাকবে। অন্যায়কারী কোন মু‘মিনের সন্তান হলেও এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না। কোন ব্যক্তি যদি কোন মু‘মিনকে হত্যা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এর পরিবর্তে তার কাছ থেকে কিসাস আদায় করা হবে। অর্থাৎ হত্যার অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তাকেও হত্যা করা হবে। তবে যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে হত্যাকারী ক্ষতিপূরণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে কিসাস করা হবে না। কোন হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী বা বিদ’আতীকে সাহায্য করা মু‘মিনের জন্য বৈধ বিবেচিত হবে না। অশান্তি সৃষ্টিকারী কোন ব্যক্তিকে কেউ আশ্রয় দিতে পারবে না। যদি কেউ আশ্রয় দেয় বা সাহায্য করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। ইহলৌকিক জীবনে তার ফরজ ও নফল ইবাদাত কোনটাই কবুল হবে না।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা.) সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। কারণ তিনি জানতেন সন্ত্রাসকে অঙ্কুরেই নির্মূল করা না হলে তা ক্রমেই সমাজ-রাষ্ট্র ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌছবে। তখন ইচ্ছা হলেই তা আর নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যেমন অবস্থা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। তাই দূরদর্শী বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে সন্ত্রাসকেই সমূলেই নির্মূল করেছিলেন। নিম্নের ঘটনাটি এর উজ্জল দৃষ্টান্ত: “উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে) মদীনায় এলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী (সা.) তাদেরকে (সদকার) উটের নিকট যাওয়ার এবং পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। অতঃপর তারা যখন (উটের পেশাব ও দুধ পান করে) সুস্থ হলো তখন নবী (সা.) এর রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এ সংবাদ দিনের প্রথম ভাগেই (তাঁর নিকট) এসে পৌছল। তারপর তিনি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বাড়লে তাদেরকে পাকড়াও করে আনা হলো। অতঃপর তাঁর আদেশে তাদের হাত পা কেটে দেয়া হলো। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুটিয়ে দেয়া হলো এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদের নিক্ষেপ করা হলো। এমতাবস্থায় তারা পানি প্রার্থনা করছিল কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। আবূ কিলাবাহ (র.) বলেন, এরা চুরি করেছিল, হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, ঈমান আনার পর কুফরী করেছিল এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল”।
দেশ থেকে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাস নির্মূলের প্রয়োজনের মহানবী (সা.) কখনও সন্ত্রাসীদেরকে গোষ্ঠীসহ উৎখাত করেছিলেন। ইয়াহুদী গোত্র বানূ নাযীর মহানবী (সা.) কে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পর মহানবী (সা.) তাদেরকে তাদের আবাসস্থল থেকে উৎখাত করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মদীনাকে সন্ত্রাসমুক্ত করেন। ঘটনাটির বিবরণ হলো: “সাহাবী আমর ইবনে উমায়্যা আদ-দামরী (রা.) বানূ ‘আমিরের দু’জন লোককে ভুলবশত শত্র“পক্ষ মনে করে হত্যা করেন। প্রকৃত ব্যাপার হল, বানূ ‘আমিরের সাথে মহানবী (সা.) এর মৈত্রীচুক্তি ছিল। ফলে মহানবী (সা.) তাদেরকে ‘রক্তপণ’ দিতে মনস্থ করেন। আর এ কাজে সহযোগিতা ও মধ্যস্থতা করার জন্য তিনি ইয়াহুদীদের সবচেয়ে বড় গোত্র বানূ নাযিরের নিকট যান। তাদের ব্যবসা ছিল মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে উপকণ্ঠে। বানূ ‘আমিরের সাথে বানূ নাযীরেরও মৈত্রীচুক্তি ছিল। বানূ নাযিরের লোকজন মহানবী সা. কে দেখে আনন্দ প্রকাশ করে বরং তাঁর সাথে প্রথমত খুবই ভাল ব্যবহার করে। তারা এ ব্যাপারে তাঁকে সহযোগিতার পূর্ণ আশ্বাস দেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। মহানবী (সা.) তাদের একটি দেয়াল ঘেঁষে বসে ছিলেন, তাঁর সাথে আবূ বকর, ওমর ও আলী (রা.) প্রমুখ দশজন সাহাবীও ছিলেন। বানূ নাযীরের লোকজন নিজেদের মধ্যে সলা-পরামর্শ করতে লাগলেন যে, এমন মোক্ষম সুযোগ আমরা আর কখনো পাব না। আমাদের কেউ যদি ঘরের ছাদে উঠে তাঁর মাথার উপর একটি ভারী পাথর ছেড়ে দেয় তাবে আমরা চিরতরে তার হাত থেকে নি®কৃতি পাব। আমার ইবন জাহহাশ ইবন কা’ব নামে তাদের এক লোক বলল, আমি এ কাজের জন্য প্রস্তুত। এই বলে সে ঠিকই মহানবী (সা.) এর উপর পাথর ছেড়ে দেয়ার জন্য সবার অলক্ষ্যে ঘরের ছাদে উঠে গেল। তখনই মহান আল্লাহ মহানবী (সা.) কে ওহী মারফত এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানবী (সা.) সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং কাউকে কিছু না বলে সোজা মদীনায় চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা সাহাবীগণও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। অতঃপর মদীনা থেকে আগত এক ব্যক্তিকে পেয়ে তাকে মহানবী (সা.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলল, আমি তাঁকে মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। অতঃপর তাঁরা মদীনায় এসে মহানবী সা. এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি তাদেরকে ইয়াহুদীদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানালেন এবং সকলকে রণপ্রস্তুতি নিয়ে তাদের মুকাবিলা করার জন্য বের হবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) কে মদীনার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে তিনি সেনা সমভিব্যবহারে বানু নাযীরের বসতিতে পৌঁছেন। সেখানে পৌঁছে তিনি তাদেরকে চর্তুদিকে থেকে অবরোধ করেন। ছয়দিন অবরোধ করার পর তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য তাদের খেজুর গাছ কেটে ফেলেন এবং বাগান জ্বালিয়ে দেন।” তখন মহানবী (সা.) এর সমর্থনে আয়াত নাযিল হয়। তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ এবং যেগুলো কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; তা এজন্য যে, আল্লাহ পাপচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন”। (অসমাপ্ত)

সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামে নির্দেশনা

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আল-কুরআনে প্রথমত সাধারণতভাবে সন্ত্রাসের কারণ সৃষ্টি হওয়ার ছিদ্রপথ বন্ধ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ ও অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ করতে নিষেধ প্রদান করে আল-কুরআনে নির্দেশনা এসেছে যে, “আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালঙ্ঘন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।” সন্ত্রাস মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনের ফলেই সৃষ্ট। তাই জীবনের সকল ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন, বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করে আল-কুরআনে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ বলেন: “বল, হে কিতাবীগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি কর না; এবং যে সম্প্রদায় ইত:পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে ও সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।” অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; কিন্তু সীমালঙ্ঘন কর না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না।” উপরোক্ত প্রথম আয়াতে আহলে কিতাবদের উদ্দেশ্য করে এবং দ্বিতীয় আয়াতে সশস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রের প্রসঙ্গ বর্ণিত হলেও অন্যান্য আয়াত ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ি মুসলিমদের জন্যও সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। সন্ত্রাস নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাই সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে বা অন্য কোনভাবে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আল-কুআনে নির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ বলেন: “দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর তোমরা তাতে বিপর্যয় ঘটাইও না, তাঁকে ভয় ও আশার সাথে ডাকবে। নিশ্চয় আল্লাহর অনুগ্রহ সৎকর্মপরায়ণদের নিকবর্তী।”
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্বখ্যাত মুফাসসির হাফিয ইবনে কাছীর (র.) বলেন, “শান্তি স্থাপনের পর ভূ-পৃষ্ঠে বিপর্যয় ও যে সকল কর্মকান্ড পৃথিবীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কেননা যখন কাজ-কারবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যথাযথভাবে চলতে থাকে, তখন যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়, তবে তা হবে বান্দার জন্য বেশী ক্ষতিকর। এজন্য আল্লাহ এরূপ করতে নিষেধ করেছেন।” ইমাম কুরতুবী (র.) বলেন, স্বল্প-বিস্তর যতটুকুই হোক শান্তি স্থাপনের পর আল্লাহ পৃথিবীতে কম বা বেশি যাই হোক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন।” অনর্থ বিপর্যয় সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হতে নিষেধ করে আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যাহা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না, আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।” সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করো না।” আদম সন্তানকে সম্মানিত ঘোষণা করে আল্লাহ বলেন: “আমি তো আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদেরকে উত্তম রিয্ক দান করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” এত মর্যাদাবান ও অনুগ্রহপুষ্ট শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী সমগ্র মানবজাতির কোন এক সদস্যের প্রাণহাণী ঘটানোকে সমগ্র মানবজাতির প্রাণহানী ঘটনার সাথে তুলনা করে আল্লাহ বলেন: “এই কারণেই বনী ইসরাঈলের প্রতি এই বিধান দিলাম যে, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা ব্যতীত কেউ কাউকেও হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করল।” অন্য আয়াতে আল্লাহ ইচ্ছাকৃত কোন মু‘মিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত (অভিশাপ) করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য অর্জনে আত্মঘাতি হামলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই হামলার মাধ্যমে সন্ত্রাসী তার নিজে জীবনকে ধ্বংস করে ফেলে। অথচ আল-কুরআনে নিজেকে ধ্বংস করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মঘাতি হামলা আত্মহত্যার শামিল, আর উভয়ই স্পষ্ট হারাম। আল্লাহ বলেন: “নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কর না। তোমরা সৎকাজ কর, আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণ লোকেদের ভালবাসেন।” এভাবে আল-কুরআনুল কারীমে অসংখ্য আয়াতে অন্যায়ভাবে মানব হত্যা, আহত করা, আত্মহত্যা করা, অন্যের সম্পদ লুট করা, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা, বিশৃঙ্খলা ঘটানোসহ সন্ত্রাসের বিভিন্ন রূপ, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট, পরিণাম, প্রতিরোধ, শাস্তি সম্পর্কে নির্দেশনা এসেছে। এসব আয়াতের ব্যাখ্যা হিসাবে রাসূল সা. এর হাদীসে এ প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে আল-কুরআনে বর্ণিত নির্দেশনার আলোকে আল-হাদীসেও ব্যাপক নির্দেশনা এসেছে। প্রাসঙ্গিক কারণে কিছু হাদীস নিম্নে পেশ করা হলো- রাসূল (সা.) বলেন: “বিবাহিতা ব্যভিচারী, হত্যার বদলে হত্যা এবং দ্বীন (ইসলাম) ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অপরাধ ব্যতীত ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল’ এ সাক্ষ্য দানকারী কোন অমুসলিমের রক্ত বৈধ নয়।” সন্ত্রাস অর্থই হচ্ছে ত্রাস, ভয় আতঙ্ক সৃষ্টি করা, অন্যকে আতংকিত করা। কিন্তু আল-হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোন মুসলিমকে আতংকিত করা বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেন: “কোন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিম ভাইকে আতংকিত বা সন্ত্রস্ত করা বৈধ নয়। সন্ত্রাস একটি অন্যায় কর্ম। যে কোন অন্যায় কর্ম দেখে তা প্রতিরোধ করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। সাধ্যানুযায়ী প্রতিরোধ প্রচেষ্টা পরিচালিত করার নির্দেশনা প্রদান করে রাসূল (সা.) বলেন: “তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি অন্যায় করতে দেখবে, সে যেন তাঁকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি সম্ভব না হয় তাহলে কথা দ্বারা প্রতিবাদ করবে, তাও সম্ভব না হলে অন্তর দ্বারা প্রতিবাদ করবে। এটিই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।” সন্ত্রাস সম্পর্কে উল্লেখিত আলোচনা থেকে স্পষ্টতই প্রমাণ হয় যে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ইসলাম সমর্থ নেতো করেই না, বরং তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যারা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে কিংবা ভীতি প্রদর্শন করে তারা প্রকৃত পক্ষে মুসলিম নয়। তারা ইসলামের তথা কুরআন ও হাদীসের রীতিনীতি ও নির্দেশনাকে বিসর্জন দিয়েছে। তেমনি বর্তমানে যারা ধর্মের নামে বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা করে নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে এবং বিভিন্ন ধরণের হুমকি দিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে তারা মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। তাদেরকে ইসলামী দলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে তাদের কোনো সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমরা সৎ ও তাকওয়াভিত্তিক কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।” বরং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে।
মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে অশান্ত ও বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে শান্তি, শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ : “আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণা করেছি।” এজন্য তিনি সর্বদাই বিশ্বে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতন ও তৎপর ছিলেন এবং সন্ত্রাস, অন্যায়, অনাচার, অত্যাচার প্রতিরোধে সমগ্র জীবন বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। রাসূল (সা.) একদিকে ছিলেন শান্তিস্থাপনকারীদের জন্য সুসংবাদদানকারী অপরদিকে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের জন্য ছিলেন সতর্কবাণী। আল্লাহ বলেন: “হে নবী! আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।”
উজ্জ্বল প্রদীপরূপী রাসূল (সা.) তাঁর সমগ্র জীবনে যে আদর্শ বাস্তবায়িত করেছেন, তা অনুসরণের মাধ্যমে আজো পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আদর্শ অনুকরণীয় হিসেবে রাসূল (সা.) কেই গ্রহণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূল (সা.) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” সামাজিক বন্ধনহীন পরিস্থিতি, অস্থির ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ, বলগাহীন নেতৃত্ব, শঠতা, প্রবঞ্চনা, হত্যা, লুটতরাজ প্রভৃতি অকল্যাণকর কার্যকরণের ফলশ্র“তিতে আরবের গোত্রে গোত্রে কলহ বিবাদ, যুদ্ধ বিগ্রহ সর্বত্র স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। মানুষের শান্তিময় জীবন মারাত্মকভাবে লংঘিত হতে থাকলে জনসাধারণ এই অশান্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। উদ্বিগ্ন মানুষের উদ্বেগকে দূর করার জন্য রাসূল (সা.) যে কার্যক্রমসমূহ গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে সর্বপ্রথম ছিল “হিলফুল ফুযুল” নামক চুক্তি সম্পাদন। রাসূল (সা.) এর বয়স যখন ১৫ বছর, এই যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী হাশিম সম্প্রদায়ের নেতা আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র জুবাইরের প্রস্তাবে মক্কার আব্দুল্লাহ ইবনে জাদ’আনের বাসভবনে বনী হাশিম, বনী যুহরা, বনী তাঈম, বনী মুত্তালিব, বনী আসাদ গোত্রের সকললে সম্মিলিতভাবে অন্যায়, অত্যাচার, সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে ঐকমত্যে উপনীত হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। মুহাম্মাদ (সা.) এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেন। চুক্তিটিকে ইতিহাসে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে অভিহিত করা হয়। এই চুক্তিতে আবদ্ধ গোত্রসমূহ যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার সারমর্ম হলো: আমরা দেশের অশান্তি দূর করার নিমিত্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করব। বিদেশী লোকদের ধন-প্রাণ ও মান-সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। দরিদ্র ও অসহায় লোকদের সহায়তা করতে আমরা কখনই কুণ্ঠিত হবো না। অত্যাচারী ও তার অত্যাচারকে দমাতে ও ব্যাহত করতে এবং দুর্বল দেশবাসীদেরকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করব। এই প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী হিলফুল ফুযুলের সদস্যগণ বহুদিন যাবৎ কাজ করতে থাকেন। এই সেবা- সংঘের প্রচেষ্টায় দেশের অত্যাচার অবিচার বহুলাংশ হ্রাস পেলো, রাস্তাঘাট নিরাপদ হয়ে উঠল। রাসূল (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত হিলফুল ফুযুল সংঘ ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ইসলামের আগমনের পর এই সেবা সংঘ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ল। কারণ, সকল প্রকার অন্যায়, অমঙ্গল ও পাপের মূলোৎপাটন করার এবং সর্বাধিক ন্যায়, মঙ্গল ও পুণ্য সাধনের দায়িত্ব নিয়ে যখন ‘ইসলাম’ আত্মপ্রকাশ করল তখন আর উক্ত সেবাসংঘের কোন প্রয়োজনই রইল না। (অসমাপ্ত)

সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামে নির্দেশনা

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ইসলামী আইনের দ্বিতীয় উৎস আল-হাদীসের সন্ত্রাস শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত না হলেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিভিন্ন দিক বুঝাতে বেশ কিছু পরিভাষার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। সেসব পরিভাষার অন্যতম হলো, আল-কতলু বা হত্যা, আয-যুলম বা অত্যাচার, আত-তারভী, বা ভয় প্রদর্শন, হামলুছ ছিলাহ বা অস্ত্র বহন করা, আল-ইশারাতু বিছ-ছিলাহ বা অস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত করা ইত্যাদি। তবে এসব পরিভাষা ছাড়াও বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে সন্ত্রাসীদের কর্মকান্ডকে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ বুঝাতে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার কয়েকটি নিম্নে উদাহরণ হিসেবে পেশ করা হলো। একে অপরের প্রতি অত্যাচার করা নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন: “হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার জন্য অত্যাচার হারাম করেছি এবং তা তোমাদের জন্যও হারাম করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর অত্যাচারে লিপ্ত হয়ো না।” স্বাভাবিকভাবে একজনের রক্ত, সম্পদ, সম্মান হানী করা অপরজনের জন্য হারাম। রাসূল (সা.) বলেন: তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য ঐরূপ হারাম যে রূপ হারাম তোমাদের এই শহর, তোমাদের এই মাস এবং তোমাদের এই দিন কোন মুসলিমকে আতঙ্কিত করা অবৈধ। রাসূল (সা.) বলেন: “কোন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিম ভাইকে আতঙ্কিত বা সন্ত্রস্ত করা বৈধ নয়।” কোন মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণকারী ব্যক্তি মুসলিম উম্মাহর সদস্য নয়। এ মর্মে রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি তোমাদের (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” কোন মুসলিমে অস্ত্র দ্বারা হুমকি দেয়া নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) বলেন: “তোমাদের মাঝে কেউ যেন তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র দ্বারা হুমকি না দেয়। কেননা হতে পারে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও শয়তান তার হস্তদ্বয় আঘাত হানার ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটবে; অতঃপর সে এ অপরাধের কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে”। রাসূল (সা.) বলেন: “কোন ব্যক্তি যদি লোহা দ্বারা তার ভাইকে হুমকি দেয় তবে তা থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত ফিরিশতাগণ তার প্রতি অভিশাপ করতে থাকেন যদিও হুমকি প্রদানকৃত ব্যক্তি তার সহোদর ভাই হয়।” আত্মঘাতি হামলার মাধ্যমে আত্মহত্যাও হারাম। রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নিজেকে কোন বস্তু দ্বারা হত্যা করবে কিয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে।” রাসূল (সা.) আরো বলেন: “যে ব্যক্তি নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করবে তাকে জাহান্নামে অনুরূপভাবে শাস্তি দেয়া হবে। যে ব্যক্তি নিজেকে আঘাত করে আত্মহত্যা করবে তাকেও জাহান্নামে অনুরূপভাবে আঘাত করা হবে।”
শুধু মুসলিম ব্যক্তি নয়, কোন চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমে হত্যা করাও নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি মুসলিম জনপদে বসবাসকারী চুক্তিবদ্ধ কোন অমুসলিমকে হত্যা করবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব হতেও তার সুগন্ধ পাওয়া যাবে।” সন্ত্রাসীর অন্তরে দয়ামায়া থাকে না, তাই সে হতভাগা। রাসূল (সা.) বলেন: “একমাত্র দুর্ভাগা ব্যক্তি হতেই দয়া ছিনিয়ে নেয়া হয়”। ইচ্ছাকৃত কোন মু‘মিনকে হত্যা করা বড় গুনাহসমূহের অন্যতম যার গুনাহ আল্লাহ মা‘ফ করবেন না। রাসূল (সা.) বলেন: “আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপনকারী ও ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু‘মিন ব্যক্তিকে হত্যার গুনাহ ব্যতীত অন্য যে কোন গুনাহকে আল্লাহ হয়তো ক্ষমা করে দিবেন।” অন্যায়ভাবে মু‘মিনকে হত্যাকারীর কোন ইবাদত কবুল করা হবে না। রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোন মু‘মিন ব্যক্তিকে হত্যা করবে আল্লাহ তার কোন নফল ও ফরয ইবাদত কবুল করবেন না।” নিষিদ্ধ পন্থায় অপরের রক্তপাত ঘটানো মু‘মিনকে উচ্চ মর্যাদা থেকে স্খলিত করে। রাসূল (সা.) বলেন: “মু‘মিন ব্যক্তি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জীবন-যাপন করতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত হারাম পন্থায় অন্যের রক্তপাত না ঘটাবে।” কোন মুসলিমকে হত্যা করা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার থেকেও গুরুতর। রাসূল (সা.) বলেন: “আল্লাহর নিকট সারা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার চেয়েও গুরুতর হচ্ছে কোন মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা।” নিরাপত্তা প্রদানকৃত যে কোন ধর্মাবলম্বীকে হত্যাকারীর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। রাসূল (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি নিরাপত্তা প্রদানকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করে আমার সাথে ঐ হত্যাকারীর কোন সম্পর্ক থাকবে না, যদিও নিহত ব্যক্তি কাফির হয়।”
আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম। আল্লাহ বলেন: “নিঃসন্দেহে ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন। অন্য স্থানে আল্লাহ বলেন, “কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনও কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” ইসলাম শব্দের ব্যুপত্তিগত অর্থই শান্তি। এ জীবনব্যবস্থার এরূপ নামকরণই প্রমাণ করে যে, মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার চিন্তা ইসলামের সামগ্রিক প্রকৃতি ও মৌল দৃষ্টিকোণ হতে উৎসারিত। তাই ইসলামের প্রতিটি আদেশ-নিষেধ, বিধি-বিধান থেকে শান্তির ফল্গুধারা নিঃসৃত হয়। শান্তিময় পরিবেশের স্থায়িত্ব বজায় রাখার শান্তি বিঘিœত করে এমন সকল কর্মকান্ড প্রতিরোধ অপরিহার্য। তাই যৌক্তিকভাবেই ইসলাম শান্তি প্রতিষ্ঠা ও এর স্থায়িত্ব বজায় রাখার স্বার্থে সকল ধরণের সন্ত্রাসকে প্রতিরোধে ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্র্মূল করার নির্দেশনা দান করে। ইসলাম বলতে প্রথমত ও প্রধানত কুরআন ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ বা হাদীসকেই বুঝায়। রাসূল (সা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে গেলাম, এই দু‘টি জিনিসকে যতক্ষণ আঁকড়ে ধরে রাখবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, সে দু‘টি জিনিস হলো আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনও তঁর রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ তথা হাদীস।” তাই সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা বলতে সন্ত্রাস প্রতিরোধে কুরআন ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহতে বর্ণিত নির্দেশনাসমূহ বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য যে, সন্ত্রাস প্রতিরোধক আয়াত, হাদীস ও রাসূল (সা.) এর আদর্শ এত বেশি যে, তার সবগুলো এই স্বল্প পরিসরে উল্লেখ করা অসম্ভব। তাই এ ব্যাপারে ঐ তিন উৎসের মৌলিক নির্দেশনাসমূহ নিম্নে পেশ করার প্রয়াস পাচ্ছি। (অসমাপ্ত)

সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামে নির্দেশনা

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে প্রতিযোগিতা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে সন্ত্রাস। সন্ত্রাস একদিকে যেমন বিশ্ব শান্তিকে হুমকির মুখে দাঁড় করে দিয়েছে অন্যদিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে সভ্যতার সৌধকে। বর্তমান বিশ্বে ইসলামকে সন্ত্রাসের সাথে একাকার করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ মানবসভ্যতার শুরুতেই সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সন্ত্রাসের সাথে ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে, এর দ্বারা ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠিকে আতঙ্কিত করে তোলা হচ্ছে এবং বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি করা হচ্ছে। অত্র প্রবন্ধে সন্ত্রাস এর সংজ্ঞা, কুরআন ও হাদীসে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ, সন্ত্রাস প্রতিরোধে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা ও মহানবী (সা.) এর কার্যক্রম বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
সন্ত্রাস একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ বর্তমান মতবিরোধপূর্ণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একপ্রকার অসম্ভবই বটে। কারণ ব্যক্তি বা গোষ্ঠির দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা যে কোন বিষয় বা মতবাদের সংজ্ঞার ভিন্নতা নির্দেশ করে। তাই তো দেখা যায়, এক গোষ্ঠির দৃষ্টিতে যে কর্মকান্ড সন্ত্রাসের মতো নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত কর্ম, অপর গোষ্ঠির দৃষ্টিতে সে কর্মকান্ডই স্বাধীনতা কিংবা স্বাধিকার আদায় সংগ্রামের মতো মহৎ ও প্রশংসনীয় কর্ম। সন্ত্রাসের সংজ্ঞায়নে বিতর্ক থাকলেও বক্ষ্যমান আলোচনার উদ্দেশ্য অর্জনের প্রয়োজনে সন্ত্রাসের একটি সু-নির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ আবশ্যক।
সন্ত্রাস শব্দটি বাংলা ‘ত্রাস’ শব্দ উদ্ভূত। যার অর্থ ভয়, ভীতি, শঙ্কা। আর সন্ত্রাস অর্থ হলো, মহাশঙ্কা, অতিশয় ভয়, কোনো উদ্দেশ্যে মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা, অতিশয় শঙ্কা বা ভীতি, অতিশয় ত্রাস বা ভয়ের পরিবেশ, ভীতিজনক অবস্থা, রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য অত্যাচার, হত্যা প্রভৃতি হিংসাত্মক ও ত্রাসজনক পরিবেশ। সন্ত্রাস এর সমার্থক শব্দ হিসাবে সন্ত্রাসবাদ, আতঙ্কবাদ, বিভীষিকাপন্থা, সহিংস আন্দোলন, উগ্রপন্থা, উগ্রবাদ, চরমপন্থা ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে সন্ত্রাস কোন বিচ্ছিন্ন কর্মকান্ড নয়। বর্তমানে এটি একটি মতবাদে পরিণত হয়েছে। তাই সন্ত্রাস ভিত্তিক বা কেন্দ্রিক মতবাদ ও কর্মকান্ডকে বুঝাতে সন্ত্রাসবাদ শব্দটি বহুল প্রচলিত। অভিধানে “সন্ত্রাসবাদ” অর্থ লেখা হয়েছে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য হত্যা অত্যাচার ইত্যাদি কার্য অনুষ্ঠাননীতি, রাজনীতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য পীড়ন, হত্যা প্রভৃতি হিংসাত্মক ও ত্রাসজনক কর্ম অবলম্বন করা উচিত- এই মত। ইংরেজীতে সন্ত্রাস অর্থ বুঝাতে ঞবৎৎড়ৎ: মৎবধঃ ভবধ/ধষধৎস বীঃৎবসব ভবধৎ, ঃযব ঁংব ড়ভ ড়ৎমধহরুবফ রহঃরসরফধঃরড়হ ঃবৎৎড়ৎংস [নধংবফ ড়হ ষধঃরহ ঃবৎৎবৎব ড়ঃড় ভৎরমযঃবহ”, শব্দসমূহ ব্যবহৃত হয়।
আধুনিক আরবি ভাষায় সন্ত্রাস শব্দের প্রতিশব্দ হলো (ইরহাব)। এ শব্দটি এসেছে (রাহবুন) থেকে যার অর্থ (খাফ) ভীত হলো, ভয় পেলো ইত্যাদি। আর (ইরহাব) অর্থ হলো (তাখভীফ) ও (তাফযী), তথা ভীতিপ্রদর্শন, শঙ্কিতকরণ, আতঙ্কিতকরণ। সন্ত্রাস এর শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থের ব্যাপারে মতানৈক্য তেমন না থাকলেও এর পারিভাষিক সংজ্ঞা নির্ধারণে যথেষ্ট মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। আর এই মতানৈক্যের কারণেই আজ পর্যন্ত সন্ত্রাস এর সর্বসম্মত কোন পারিভাষিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক এষড়নধষ ঃবৎৎড়ৎরংস এর উপর প্রকাশিত ধহহঁধষ ৎবারবি ২০০০ এ বলা হয়েছে যে, ঘড় ড়হব ফবভরহধঃরড়হ ড়ভ ঃবৎৎড়ৎরংস যধং মধরহবফ ঁহরাবৎংধষ ধপপবঢ়ঃধহপব অর্থাৎ সন্ত্রাসের কোন সংজ্ঞা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। প্রত্যেক মতবাদীরাই নিজ নিজ বিশ্বাস দৃষ্টিভঙ্গির ভিএি সন্ত্রাসের সংজ্ঞা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র, দেশীয়, আঞ্চলিসক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ সন্ত্রাসের সংজ্ঞায়নে চেষ্টা অব্যহত রেখেছে। বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাস কেন্দ্রিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুইটি প্রধান দর্শন। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের সমন্বয়ে গঠিত পাশ্চাত্য দর্শন। অপরটি ইসলামী দর্শন। তাই সন্ত্রাস এর সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ উভয় দর্শন থেকে প্রদত্ত সংজ্ঞাসমূহ উল্লেখ করা হলো।
যায়েদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনে হাদী আল-মাদখালী বলেন, ‘ইরহাব (সন্ত্রাস) এমন একটি শব্দ বিভিন্ন আঙ্গিকে যার অনেক অর্থ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে- নিরপরাধ অন্যায়ভাবে নির্দোষ মানুষকে ভয় দেকানো ও শঙ্কিত করা। কখনো নিরীহ ব্যক্তিবর্গকে হত্যার সীমাহীন ভীতি প্রদর্শন, সুরক্ষিত সম্পদ বিনষ্ট বা লুট, সতী-সাধবী নারীর সম্ভ্রমহানি করা। আল-মাওসূ’আহ আল-আরাবিয়্যাহ আল-‘আলামিয়্যাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ইরহাব (সন্ত্রাস) হচ্ছে ভীতি সঞ্চারের জন্য বল প্রয়োগ করা অথবা বল প্রয়োগের মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শন করা। রাবিত্বাতুল আলামিল ইসলাম’ পরিচালিত ‘ইসলামী ফিক্বহ কাউন্সিল’ ১৪২২ হিজরীতে মক্কায় অনুষ্ঠিত ১৬তম অধিবেশনে সন্ত্রাসের নিম্নোক্ত সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র কোন মানুষের ধর্ম, বুদ্ধিমত্তা, সম্পদ ও সম্মানের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে যে শত্র“তার চর্চা করে তাকে সন্ত্রাস বলে”। এ সংজ্ঞা সব ধরণের নীতিবহির্ভূত ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন, ক্ষতিসাধন, অন্যায় ও বিচার বহির্ভূত হত্যা, অপরাধমূলক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার লক্ষ্যে একক ও সমষ্টিগতভাবে পরিচালিত যে কোন ধরণের অন্যায় কর্ম, সশস্ত্র হামলা, চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, রাহাজানি, ভীতিকর ও হুমকিপূর্ণ কাজ এবং এবং লোকজনের জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তাকে বিঘিœত করে, জনজীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে এমন কর্মকান্ডকে শামিল করে। তাছাড়া পরিবেশে বিপর্যয় সৃষ্টি, ব্যক্তিগত ও জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট বা প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করাও সন্ত্রাস হিসাবে গণ্য হবে। ১৯৮৯ সালে আরব দেশসমূহের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ প্রদত্ত সংজ্ঞা হচ্ছে- সহিংসতা সৃষ্টিকারী বা হুমকি-ধমকি প্রদানকারী এমন সব কাজ যা দ্বারা মানবমনে ভীতি-আতঙ্ক, ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি হয়। তা হত্যাকান্ড, ছিনতাই, অপহরণ, গুপ্তহত্যা, পণবন্দী, বিমান ও নৌজাহাজ ছিনতাই বা বোমা বিস্ফোরণ প্রভৃতির যে কোনটির মাধ্যমে হোক না কেন। এছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংঘটিত যেসব কাজ ভীতিকর অবস্থা ও পরিবেশ, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে (তাও সন্ত্রাস)”। ইৎরঃধহহরপধ জঊঅউণ জঊঋঊঘঈঊ ঊঘঈণঈখঙচঊউওঅ তে সন্ত্রাস- এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ঞবৎৎড়ৎরংস ঃযব ংুংঃবসধঃরপ ঁংব ড়ভ ারড়ষবহপব ঃড় পৎবধঃব ধ মবহবৎধষ পষরসধঃব ড়ভ ভবধৎ রহ ধ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ধহফ ঃযবৎবনু ঃড় নৎরহম ধনড়ঁঃ ধ ঢ়ধৎঃরপঁষধৎ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ড়নলবপঃরাব. একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনগণের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করার সুসংগঠিত পন্থাই হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ”। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ঋইও সন্ত্রাসকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, ঞযব ঁহষধভিঁষ ঁংব ভড়ৎপব ধহফ াধষবহপব ধমধরহংঃ ঢ়বৎংড়হং ড়ভ ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ঃড় রহঃরসরফধঃব ড়ৎ পড়বৎপব ধ মড়াবৎহসবহঃ, ঃযব পরারষরধহ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ, ড়ৎ ধহু ংবমসবহঃ ঃযবৎবড়ভ, রহ ভঁৎঃযবৎধহপব ড়ভ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ড়ভ ংড়পরধষ ড়নলবপঃরাবং (২৮. ঈ.ঋ.জ. ঝবপঃরড়হ ০.৮৫) অর্থাৎ- সামাজিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কোন সরকার, বেসকারি জনগণ বা অন্য যে কোন অংশকে ভীতি প্রদর্শন বা দমনের জন্য ব্যক্তিবর্গ বা সম্পদের উপর অবৈধ শক্তি প্রয়োগ বা সহিংস ব্যবহারকে সন্ত্রাস বলা হয়। যে কর্মকান্ড সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, জান-মালের ক্ষতি সাধন, দেশ ও সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, শান্তি ও নিরাপত্তা ক্ষুণœ, স্থাপনা ও স্থাপত্য ধ্বংস এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের আতঙ্কিত করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির সম্মুখীন করে তাকে বলা হয় সন্ত্রাস। মোটকথা যে কর্মকান্ড জনগণের মাঝে ভয়-ভীতি ও আতংকের সৃষ্টি করে এবং জানমালের ক্ষতি সাধন করে তাই সন্ত্রাস এবং যে বা যারা এসকল কর্মকান্ডের সাথে জড়িত তারাই সন্ত্রাসী।
ইসলামী আইনের প্রধান উৎস আল-কুরআনুল কারীমে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ দুইভাবে এসেছে: শাব্দিক অর্থে ও পারিভাষিক অর্থে। সন্ত্রাস-এর আরবী প্রতিশব্দ ‘ইরহাব’ কে ভিত্তি ধরে শাব্দিক অর্থ হলো- প্রথমত: আল্লাহকে ভয় করা অর্থে এর শব্দমূলের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। যেমন: আল্লাহ বলেন: “মূসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হলো তখন সেগুলো তুলে নিলো। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য তাতে যা লিখিত ছিল মধ্যে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত।” অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন: “হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ কর যা দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছি এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।” আল্লাহ অপর এক আয়াতে উল্লেখ আছে, “আল্লাহ বললেন, তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ কর না; তিনিই তো একমাত্র ইলাহ। সুতরাং আমাকেই ভয় কর”। (অসমাপ্ত)

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।’’ ‘‘আল-কুরআন, ১১:১১৫’’। আর তাই হাত পা গুটিয়ে বসে কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকার মানসিকতা ত্যাগ করে হালাল কর্মের মাধ্যমে নিজ দারিদ্র্য মোচনের চেষ্টায় ধৈর্য্য ধারণ করলে আল্লাহ্ সহায় হন।
ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন ও সংহতকরণ: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘বল, হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্! তুমি যাহাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর এবং যাহার নিকট হইতে ইচ্ছা ক্ষমতা কাড়িয়া লও; যাহাকে ইচ্ছা তুমি পরাক্রমশালী কর, আর যাহাকে ইচ্ছা তুমি হীন কর। কল্যাণ তোমার হাতেই। নিশ্চয় তুমি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩:২৬’’। সুতরাং সার্বভৌম ক্ষমতা কেবল আল্লাহর হাতেই কেন্দ্রীভূত এবং সংহত, মানুষের হাতে নয়। কিন্তু আমরা যা দেখি তা হলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা জনগণের নামে মুষ্টিমেয় ক্ষমতাশালী লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং সংহত হয়, যাদের আর্থ-সামাজিক সিদ্ধান্ত প্রায়শ: দরিদ্রজনগণের স্বার্থের পরিপন্থী। আল্লাহ্র বক্তব্য হচ্ছে: ‘‘যাহারা তাহাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে এবং তাহাদিগকে আমি যে রিযক দিয়াছি তাহা হইতে ব্যয় করে’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪৪:৩৮’’। তারাই সফলকাম হয়। এখানে উত্তরাধিকার’’ ‘‘আল-কুরআন, ৪:১১-১২’’ ও যাকাতের ‘‘আল-কুরআন, ২:৪৩’’ শরীয়তি বিধান মেনে সম্পদের ন্যায্য ব্যয় ও বণ্টনের মাধ্যমে দরিদ্রদের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে, যা বিত্তশালীরা এড়িয়ে চলে। আল্লাহ্ ন্যায়বিচারক, তাই তিনি বলেন: ‘‘তিনিই তোমাদিগকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করিয়াছেন। সুতরাং কেহ কুফরী করিলে তাহার কুফরীর জন্য সে নিজেই দায়ী হইবে। কাফিরদের কুফরী কেবল উহাদের প্রতিপালকের ক্রোধই বৃদ্ধি করে এবং কাফিরদের কুফরী উহাদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩৫:৩৯’’। একমাত্র আল্লাহ্ ও তাঁর দেয়া বিধানকে সকল ক্ষমতার উৎস ও কেন্দ্র বিবেচনা করে দরিদ্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে সমাজ ও রাষ্ট্রকে ক্ষমতা ও বিত্তের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। কেননা আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তোমার প্রতিপালক এইরূপ নহেন যে, তিনি অন্যায়ভাবে জনপদ ধ্বংস করিবেন অথচ উহার অধিবাসীরা পুন্যবান’’। ‘‘আল-কুরআন, ১১:১১৭’’। অতএব, দারিদ্র্যমুক্ত পুণ্যবান জাতি হিসেবে ইহলোকে ও পরলোকে আত্মরক্ষা ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে ইসলামের আলোকে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের কল্যাণে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া জরুরি।
রিবা: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘মানুষের ধনে বৃদ্ধি পাইবে বলিয়া তোমরা যে সুদ দিয়া থাক, আল্লাহ্র দৃষ্টিতে তাহা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তষ্টি লাভের জন্য যে যাকাত তোমরা দিয়া থাক তাহাই বৃদ্ধি পায়; উহারাই সমৃদ্ধিশালী’’ ‘‘আল-কুরআন, ৩০:৩৯’’। আল্লাহ আরো বলেন: ‘‘ভাল ভাল যাহা ইয়াহুদীদের জন্য বৈধ ছিল আমি তাহা উহাদের জন্য অবৈধ করিয়াছি তাহাদের সীমালংঘনের জন্য এবং আল্লাহ্র পথে অনেককে বাধা দেওয়ার জন্য, এবং তাহাদের সুদ গ্রহণের জন্য, যদিও উহা তাহাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল; এবং অন্যায়ভাবে লোকের ধন-সম্পদ গ্রাস করার জন্য’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪:১৬০-১৬১’’। ‘‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন’’। ‘‘আল-কুরআন, ২:২৭৬’’। এর অর্থ এই যে, জনগণের দারিদ্র্য মোচনের ক্ষেত্রে সুদ কোন কাজেই আসে না বরং এর মাধ্যমে দরিদ্রের ধন-সম্পদ সুকৌশলে আত্মসাৎ ও গ্রাস করে কতিপয় বিত্তশালী আরো ধনী হয় আর জনগণের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করিও না।’’ ‘‘আল-কুরআন, ৪:২৯’’। তাই ইহকাল ও পরকালে সফলতা অর্জনের জন্য আল্লাহ্ বিত্তশালীদেরকে সুদে দরিদ্রদের ঋণ দেয়ার বদলে দান করার কাজে উৎসাহিত করেন। আল্লাহ্ সুদকে নিরুৎসাহিত করে উপদেশ দেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং সুদের যাহা বকেয়া আছে তাহা ছাড়িয়া দাও যদি তোমরা মুমিন হও’’। ‘‘আল-কুরআন, ২:২৭৮’’। যুগে যুগে প্রমাণিত হয়েছে সুদী ব্যবসা ব্যাপক জনগণের দারিদ্র্যের মূল; মুষ্টিমেয় লোক এতে উপকৃত হয় এবং সমাজে দারিদ্র্য, পাপ ও বৈষম্য বাড়ে। ‘‘কযধষবফ, ঝধৎধিৎ গফ. ঝধরভঁষষধয, ঋষধংি ড়ভ ঃযব চৎবাধরষরহম গরপৎড়-পৎবফরঃ ঋরহধহপরহম ঝুংঃবস ধহফ ঝবধৎপয ভড়ৎ ধহ ওংষধসরপ অষঃবৎহধঃরাব, উযধশধ, ঞযড়ঁমযঃং ড়হ ঊপড়হড়সরপং, ওংষধসরপ ঊপড়হড়সরপং জবধংবধৎপয ইঁৎবধঁ, ঠড়ষ. ২১, ঘড়. ০২, অঢ়ৎরষ-ঔঁহব ২০১১, চঢ়, ২৭-৫০.’’
দুর্নীতির প্রভাব: আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করিও না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দংশ জানিয়া শুনিয়া অন্যায়রূপে গ্রাস করিবার উদ্দেশ্যে উহা বিচারকগণের নিকট পেশ করিও না’’। ‘‘আল-কুরআন, ২:১৮৮’’। সমাজের প্রভাবশালীদের অনেকেরই আল্লাহর এ নির্দেশ উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করার হীন প্রচেষ্টা প্রায়শ: আমাদের চোখে পড়ে। এ জাতীয় দুর্নীতির প্রভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র আরো দরিদ্র এবং ক্ষেত্র বিশেষে নি:স্ব হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও ঘুষ, প্রতারণা, জুয়া, মাদক, বাজারে পণ্যাদির ব্যাপারে ভুয়া প্রচারণা ও ওজনে কম দেয়া ইত্যাদি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মহল বিশেষ অন্যায়ভাবে নিরীহ ও দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের ঠকিয়ে থাকে। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা উহা বর্জন কর যাহাতে তোমরা সফলকাম হইতে পার’’। ‘‘আল-কুরআন, ৫:৯০’’। আল্লাহ্ আরো বলেন: ‘‘তোমরা মাপ ও ওজন ঠিকভাবে দিবে, লোকদিগকে তাহাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিবে না এবং দুনিয়ায় শান্তিস্থাপনের পর বিপর্যয় ঘটাইবে না; তোমরা মুমিন হইলে তোমাদের জন্য ইহা কল্যাণকর’’। ‘‘আল-কুরআন, ৭:৮৫’’। শ্রমিকের পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রেও দেখা যায় ধনীক শ্রেণী শ্রমিককে পূর্ণমাত্রায় খাটিয়েও তার পারিশ্রমিক ন্যায্য ও সঠিক পরিমাণে নিয়মিত দেয় না, এবং প্রভাবশালীরা লোকদের নিকট থেকে তাদের প্রাপ্য পুর্ণমাত্রায় আদায় করে কিন্তু অপরের প্রাপ্য সঠিকভাবে পরিশোধ করে না। এ বিষয়ে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা মাপে কম দেয়, যাহারা লোকের নিকট হইতে মাপিয়া লইবার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাহাদের জন্য মাপিয়া অথবা ওজন করিয়া দেয়, তখন কম দেয়। উহারা কি চিন্তা করে না যে, উহারা পুনরুত্থিত হইবে মহাদিবসে’’? ‘‘আল-কুরআন, ৮৩:১-৫’’। মহাপ্রভু সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ মানুষের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে ন্যায়ের পক্ষে এবং যাবতীয় দুর্নীতির বিপক্ষে।
উপসংহার ঃ এ দুনিয়ায় ধনী দরিদ্রের বৈষম্য মানুষেরই সৃষ্টি। এ পৃথিবীর যাবতীয় নেয়ামত আল্লাহ্ তাআলা সকল মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। এর মধ্যে কিছু নেক বান্দা আছেন যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য অতি সাধারণ ও পার্থিব লোভ-লালসাহীন সৎ জীবন যাপন করতে ভালবাসেন এবং তাতেই অভ্যস্ত ও সন্তুষ্ট। আপাত দৃষ্টিতে বৈষয়িক লোকের কাছে তাঁদের দরিদ্র মনে হলেও প্রকৃত অর্থে আধ্যাত্মিক বিবেচনায় তাঁরা এতটাই উন্নত ও সমৃদ্ধ যে, এ পৃথিবীর ধন-দৌলতের প্রতি তাঁদের কোন লোভ বা মোহ নেই। এ লক্ষ্যে তাঁরা নিজের বিপুল অর্থ-সম্পদও নির্দ্বিধায় অভাবী জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে নিজের জন্য তেমন কিছুই রাখেন না। তাঁদের পার্থিব দৃষ্টিভঙ্গি আল্লাহভীতি এবং ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ নির্ভর। সাধারণ সংসারাসক্ত লোকের কাছে তাঁদের বৈষয়িক আচরণ বোধগম্য না হলেও তাঁরা আল্লাহকে বুঝেন এবং আল্লাহ্ও তাঁদের বুঝেন। এতেই তাঁরা সন্তুষ্ট। ইসলামী পরিভাষায় এঁদের যাহিদ বলা হয়েছে।
এ থেকে এমন অনুমান করার কোন সুযোগ নেই যে, ইসলাম সংসার ধর্ম বর্জনকে আদর্শায়িত করে। এ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবী করীম স. সংসার জীবন যাপন, রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ধর্ম প্রচার-সবই করেছেন। তবে যেটা মনে রাখা দরকার তা হলো এ সবই তিনি করেছেন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য। তিনি আদর্শ মানুষ ছিলেন, আদর্শ স্বামী ছিলেন এবং সমগ্র মানব জাতির সামনে তাঁর জীবন সর্বকারীন আদর্শ এবং অনুকরণীয়। তিনি দারিদ্র্যকে অপছন্দ করতেন ঠিকই কিন্তু দরিদ্রদের ভালবাসতেন বলে দরিদ্র্যের মতো জীবন যাপন করতেন। তাঁর সাহাবীরাও তাই করতেন। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যে কেহ পার্থিব জীবন ও উহার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি উহাদের কর্মের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেথায় তাহাদিগকে কম দেওয়া হইবে না। উহাদের জন্য আখিরাতে অগ্নি ব্যতীত অন্য কিছুই নাই এবং উহারা যাহা করে আখিরাতে তাহা নিষ্ফল হইবে এবং উহারা যাহা করিয়া থাকে তাহা নিরর্থক’’। ‘‘আল-কুরআন, ১১:১৫-১৬। আর তাই আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যাহারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাহাদিগকে দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে আল্লাহ্ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখিবেন এবং যাহারা যালিম আল্লাহ্ উহাদিগকে বিভ্রান্তিতে রাখিবেন। আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা করেন’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৪:২৭,’’।
আমরা উপরে উল্লেখ করেছি দুনিয়াতে পার্থিব আয় বণ্টনের ব্যাপারে ইসলাম শরীয়াভিত্তি ন্যায্য সমবণ্টনে বিশ্বাসী। তাই আল্লাহ্ মানবজাতিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন: ‘‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে। কিয়ামতের দিন তোমাদিগকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হইবে। যাহাকে অগ্নি হইতে দূরে রাখা হইবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হইবে সে-ই সফলকাম এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়। তোমাদিগকে নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হইবে’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩:১৮৫-১৮৬’’। পার্থিব জীবনে যাবতীয় ভোগ-বিলাস-ব্যসন, দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার, ব্যভিচার হতে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহ্ নির্দেশিত পথে সংযমী জীবন যাপন করে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই মানব জীবনের লক্ষ্য বলে ইসলাম বিবেচনা করে।
আজ কাল কেউ কেউ মনে করেন, ‘‘কুরআনের সামাজিক বিষয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর মধ্যে অবশ্যই একটি পার্থক্য নিরূপণ করতে হবে। প্রথমটি যেহেতু সপ্তম শতকের আরবের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রদত্ত হয়েছে, সেহেতু বর্তমান যুগ-সমস্যার প্রেক্ষিতে তা অসঙ্গতিপূর্ণ; অতএব তা পরিত্যাজ্য এবং কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক অনুশাসনগুলোই চিরন্তন সত্য রূপে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। তাঁরা এ বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। তাঁরা এটাও ভুলে যান যে, পাশ্চাত্যজগত এ যাবৎ যত অবদান পেশ করেছে, ইসলামের সৌন্দর্য ও অবদান সে তুলনায় অপরিসীম ও অতুলনীয়’’। ‘‘জামিলা, মরিয়ম, পাশ্চাত্য জড়বাদের দার্শনিক ভিত্তি: ইসলামী দর্শন, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৪:১৫০-১৫১’’। ইসলামী বিধি-বিধানের এ জাতীয় পছন্দ ও সুবিধা মাফিক ব্যবহার আল্লাহ্ পছন্দ করেন না এবং তিনি বলেন, “যাহারা আল্লাহকে অস্বীকার করে ও তাঁহার রাসূলদিগকেও এবং আল্লাহে ও তাঁহার রাসূলের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে তারতম্য করিতে চাহে এবং বলে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি ও কতককে অবিশ্বাস করি আর তাহারা মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করিতে চাহে, ইহারাই প্রকৃত কাফির এবং কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রাখিয়াছি”। “আল-কুরআন, ৪:১৫০-১৫১” এ কথা মনে রাখা দরকার যে, ইসলামকে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনে প্রসাধন হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগ নেই, গ্রহণ করতে হবে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল জীবন বিধান হিসেবে। (সমাপ্ত)

হাদীস সম্রাট ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল বুখারী

(১৯৪-২৫৬ হিজরী)
শাহিদ হাতিমী

দিনটি ছিল শুক্রবার। ক্যালেন্ডার অতিক্রম করছিল ১৯৪ হিজরীর ১৩ই শাওয়াল। বুখারা শহরে এক স্বর্ণশিশুর জন্ম হল। কে জানতো সেই শিশুই একদিন হয়ে ওঠবে জগতসেরা মনীষী? শিশুটির নাম রাখা হল মুহাম্মাদ। জানতো কি কেউ একদিন বুখারার ছোট্ট মুহাম্মাদের নাম নেবে বিশ^বাসী? তাঁর পরিচিতি হবে সূর্যের মতো বিস্তৃত? মানুষ সগৌরবে ডাকবে ইমাম বুখারী? হাদীসশাস্ত্রের সূর্যমানব ইমাম বুখারীর আসল নাম ছিল মুহাম্মাদ। তিনি পরিচিত ছিলেন আবু আবদুল্লাহ নামে। পিতার নাম ইসমাঈল, দাদার নাম ইবরাহীম, প্রপিতামহের নাম মুগীরা। তাঁর পূর্বপুরুষগণ পারস্যের অধিবাসী ছিলেন। প্রপিতামহ মুগীরা পারস্য হতে খোরাসানের বুখারা শহরে এসে বসবাস আরম্ভ করেন। ইমাম বুখারীর বাল্যকালেই তার পিতা মারা যান। তিনি মাতার নিকটই প্রতিপালিত হন। আহমদ নামে তার এক ভাই ছিলেন। ইমাম বুখারীর পিতাও আলেম-মুহাদ্দিস ছিলেন।
বাল্যকাল হতেই ইমাম বুখারীর উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত ছিল। বুখারী (রহ.) শৈশবে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তার মাতার সে কী পেরেশানী? আল্লাহর দরবারে দু’আ করতেন। একদিন তার মাতা ইবরাহীম (আ.) কে স্বপ্নে দেখলেন। তিনি বলছেন, তোমার কান্নাকাটির দরুন আল্লাহ তোমার ছেলের চক্ষু ভাল করে দিয়েছেন; নিদ্রাভঙ্গের পর স্বপ্নকে সত্যরূপে দেখতে পেলেন বুখারীর আম্মা।
ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেছেন-আমি লেখাপড়া আরম্ভ করার পর দশবছর বয়সে আমার অন্তর তাগদা দিল যে, আমি যেন হাদীস কণ্ঠস্থ করার জন্য তৎপর হই। তখন থেকেই আমি সবকিছু ছেড়ে হাদীস শিক্ষার প্রতি নিমগ্ন হলাম। হাদীস শিক্ষার জন্য সিরিয়া, মিশর, আল-জাযায়ের, বছরা, বাগদাদ, হেজাজ ইত্যাদি দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করলাম। ১৮ বৎসর বয়সে আমি বিধি গ্রন্থ সংকলনে ব্যাপৃত হই এবং মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) এর রওজা পাকের নিকটবর্তী স্থানে বসে হাদীসের সাক্ষ্যদাতা বা রাবীগণের জীবনেতিহাস রচনায় একখানা কিতাব সংকলন করি। ইমাম বুখারী (রহ.) ৫৬ বছর বয়সে নিশাপুর নামক স্থানে কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখানে তিনি হাদীসের দরস বা শিক্ষা দান করতেন। দেশময় সকল লোক তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠল; এতে তথাকার কোন কোন মানুষের মধ্যে একটি রেশারেশি ভাব উদিত হল। তখন তিনি নিশাপুর ত্যাগ করে বুখারার দিকে ফিরে আসলেন। দেশের জনগণ ইমামকে পুনরায় স্বদেশে পেয়ে আনন্দে আবেগে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তার সাথে রাজ্যের শাসনকর্তার মনোমালিন্যের সৃষ্টি হলো।
ঘটনা এই ছিল যে-খালেদ ইবনে আহমদ নামক বুখারার তৎকালিন শাসনকর্তা ইমাম বুখারীর নিকট সংবাদ পাঠালেন, স্বয়ং তিনি বা তার পুত্রদ্বয় ইমাম বুখারীর সংকলিত কিতাব অধ্যয়ন করতে চান। ইমাম বুখারী (রহ.) যেন সেই শাসনকর্তা-আমীরের বাসভবনে উপস্থিত হয়ে এ কাজ সমাধা করেন। কিন্তু বুখারী (রহ.) পরিষ্কার ভাষায় জানালেন-“দেখুন, আমি কখনও এলেমকে অপমাণিত ও হেয় প্রতিপন্ন করতে পারবো না। (লক্ষ লক্ষ গরীব জনসাধারণকে উপেক্ষা করে)” এ মহান রতœ ইলমকে আমীর-ওমারাদের দরোজার প্রত্যাশী বানাতে পারবো না। অতএব আমীর সাহেব যদি ইলমের প্রতি অনুরাগী ও আকৃষ্ট হয়ে থাকেন, তবে তিনি যেন আমার মসজিদ বা বাড়ীতে উপস্থিত হন। আর যদি তিনি আমার এ ব্যবস্থা অবলম্বনে অসন্তুষ্ট হন এবং আমার শিক্ষা দান কর্মসূচিতে বাধা প্রদানের ইচ্ছা করেন, তবে আমি সে বিষয়ে আদৌ শংকিত নই। কারণ, তার দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে যদি আমার এই কাজ বন্ধ হয়ে যায় তবে আমি কেয়ামতের দিন আলাহ তা’আলার নিকট এই বলে ক্ষমাগণ্য হতে পারবো যে, আমি স্বেচ্ছায় ইলমচর্চা- হাদিস শিখা বন্ধ করে দেই নি।
শাসনকর্তা আমীর এ নিতান্ত স্বাভাবিক ঘটনার দ্বারা সুফল লাভ না করে কুফলের দিকেই অগ্রসর হলেন এবং শুধু নিজেই নয়, বরং বুখারাবাসীরদের দুর্ভাগ্য টেনে আনলেন। তিনি ইমাম বুখারীর এ ন্যায় সঙ্গত উত্তরে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন, এমনকি বিভিন্ন ছলাকলার আশ্রয় গ্রহণ করে বুখারী (রহ.) কে দেশ ত্যাগে বাধ্য করলেন।
হাদীসে কুদসীতে আছে-আল্লাহর ঘোষণা, ‘‘যে ব্যক্তি আমার কোন প্রিয় পাত্রের সহিত শত্র“তা পোষণ করে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করি” এখানে ঠিক তাই হলো-ইমাম বুখারীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই কিছু দিনের মধ্যে আল্লাহর অভিশাপে পতিত হল। কিন্তু ইমাম বুখারী (রহ.) আর দেশে রইলেন না। তিনি বুখারা হতে বাইকান্ধা নামক স্থানে চলে গেলেন। এ সময় সমরকন্দের লোকেরা ইমাম বুখারীকে সমরকন্দ আগমনের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানালেন। সে মতে তিনি সমরকন্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু কররেন। এমতাবস্থায় সংবাদ পেলেন যে, তার আগমন সম্পর্কে সমরকন্দবাসীদের মধ্যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ সংবাদে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত হলেন এবং যাত্রা ভঙ্গ করে দিলেন।
ইমাম বুখারী (রহ.) উল্লিখিত ঘটনা সমূহে ব্যথিত হয়ে দুনিয়ার প্রতি ভিতশ্রদ্ধরূপে একদা তাহাজ্জুদ নামাযের পর এই বলে আল্লাহ তা’আলাকে ডাকলেন-“হে আল্লাহ! এই সুপ্রশস্ত জগৎ আমার জন্য সঙ্কীর্ণ হয়ে উঠেছে, অতএব হে প্রভু! তুমি আমাকে আপন কোলে উঠিয়ে নাও।” আল্লাহ তা’আলা স্বীয় মাহবুব ইমাম বুখারীর এ ডাক ব্যর্থ হতে দিলেন না। তার আবদার পূরণ করা হলো। এক মাসের মধ্যেই হাদীস শাস্ত্রের এই দীপ্ত সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়ে গেল।
আবদুল ওয়াহেদ ইবনে আদম নামক এক বিশিষ্ট ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন-এক রাত্রে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি স্বীয় সাহাবীগণের এক জামাত সহ একস্থানে অপেক্ষমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে সালাম করে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈলের অপেক্ষা করছি। স্বপ্ন বর্ণনাকারী বলেন, কিছু দিন পরে যখন আমি ইমাম বুখারীর মৃত্যু সংবাদ পেলাম তখন হিসাব করে দেখলাম, আমি যে সময় স্বপ্ন দেখেছিলাম ঠিক সে সময়ই ইমাম বুখারীর মৃত্যু হয়েছিল। এ স্বপ্নের দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইমাম বুখারীর পবিত্র আত্মা ইহকাল ত্যাগ করে পরকালের অতিথি হলে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীগণকে নিয়ে এই অতিথির অভ্যর্থনা করেন। হাদীসে আছে-হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-যে ব্যক্তি স্বপ্নে আমাকে দেখে, সে বস্তুত: আমাকেই দেখে থাকে, কেননা শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না।
গালেব ইবনে জিব্রিল নামক খরতঙ্গ গ্রামবাসী ইমাম বুখারী (রহ.) যার আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন, তিনি বর্ণনা করেছেন-ইমাম বুখারীকে কবরের মধ্যে রাখা মাত্রই কবরের চতুস্পার্শ্বে মেশকের ন্যায় সুঘ্রাণ ও সুবাস ছড়াতে লাগল এবং ঐ সুবাস বহুদিন স্থায়ী ছিল। দেশ-বিদেশের লোক জিয়ারতের জন্য এসে তথাকার মাটি নেওয়া আরম্ভ করল। অবশেষে ঐ কবরকে মজবুত বেষ্টনী দ্বারা রক্ষা করতে হলো।
ইমাম বুখারী (রহ.) স্বয়ং বর্ণনা করেছেন, যৌবনের প্রারম্ভে একদা স্বপ্নে দেখলাম-আমি একটি পাখা হাতে নিয়ে হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট দাঁড়িয়ে আছি এবং ঐ পাখার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে মশা মাছি ইত্যাদি তাড়িয়ে দিচ্ছি। ভাল একজন তা’বীর বর্ণনাকারীর নিকট এ স্বপ্ন ব্যক্ত করলে তিনি আমাকে বললেন-তুমি এমন কোন কাজ করবে যদ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি মৌজু’ বা জাল ও মিথ্যা হাদীসের সম্বন্ধ করার মূল উৎপাটিত হয়ে যাবে। এ কথা শুনে আমার মনে প্রেরণা জাগল যে, আমি এমন এক কিতাব লিখব যার মধ্যে সন্দেহমুক্ত সহীহ হাদীস থাকবে। যে হাদীস সম্বন্ধে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ থাকবে তা গ্রহণ করবো না। এরূপ মনস্ত করে আমি পবিত্র মক্কা শরীফের মসজিদে হারামে বসে এ কিতাব লিখতে আরম্ভ করি।
তিনি আরও বর্ণনা করেছেন, আমি এ কিতাবের মধ্যে প্রতিটি হাদীস এতটুকু সতর্কতার সাথে গ্রহণ করেছি যে, আল্লাহ প্রদত্ত স্বীয় ক্ষমতা, জ্ঞান, ইলম ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রতিটি হাদীসকে সূক্ষরূপে বাছাই ও পরখ করে নেয়ার পরেও প্রত্যেকটি হাদীস লেখার পূর্বে গোছল করতঃ দু’রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহ তা’আলার নিকট এস্তেখারা করার পর যখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে এই হাদীসটি সন্দেহের লেশহীন ও সহীহ, তখনই আমি একে আমার এ কতাবের অন্তর্ভূক্ত করেছি; এর পূর্বে নয়। এ েিকতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ পবিত্র মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) এর রওজা পাকের নিকটবর্তী বসে সাজিয়েছি এবং প্রতিটি পরিচ্ছেদ লিখতে দু দু রাকাত নামায পড়েছি। এরূপে আমি স্বীয় কন্ঠস্থ ছয় লক্ষ হাদীস হতে বেছে ষোল বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ কিতাবটি সংকলন করেছি-এ আশায় অনুপ্রাণিত হয়ে যে, আমি যেন এ কিতাবকে নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারি।
নজম ইবনে ফোজাইল নামক বিশিষ্ট মোহাদ্দেস বর্ণনা করেছেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম-হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় রওজা শরীফ হতে বাইরে এসেছেন এবং বুখারী রহ. তার পিছনে হাঁটছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) যে যে স্থানে পা রেখে হাটছেন ইমাম বুখারী (রহ.) ঠিক ঐ স্থানে পা রেখে হাঁটছেন। বুখারা নিবাসী আবু হাতেম নামক বিশিষ্ট ব্যক্তিও এরূপ স্বপ্ন দেখেছেন বলে বর্ণনা আছে।
ইমাম বুখারী (রহ.)’র একজন বিশিষ্ট শার্গেদ বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে স্বপ্নে দেখলাম, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমি আরজ করলাম, মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈলের নিকট যাচ্ছি। হযরত (সা.) বললেন, তাকে আমার সালাম বলবে।
২৫৬ হিজরী ১লা শাওয়াল শনিবার (শুক্রবার দিবাগত রাতে) সমরকান্দের অন্তর্গত খরতঙ্গ নামক গ্রামে ইহজগত হতে বিদায় গ্রহণ করেন। পরদিন (ঈদের দিন) জোহরের নামাযান্তে সেই গ্রামেই সমাহিত হন। তার বয়স তখন ১৩ দিন কম ৬২ বছর ছিল। মৃত্যুকালে তিনি কোন পুত্র সন্তান রেখে যান নি।