বিভাগ: ইসলামের আলো

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ১৯৪৮-এর প্রস্তাবনাতে মানবাধিকারকে মানুষের সহজাত ও হস্তান্তরযোগ্য অধিকার হিসাবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, দ…ৎবপড়মহরঃরড়হ ড়ভ ঃযব রহযবৎবহঃ ফরমহরঃু ড়ভ ঃযব বয়ঁধষ ধহফ রহধষরবহধনষব ৎরমযঃং ড়ভ ধষষ সবসনবৎং ড়ভ ঃযব যঁসধহ ভধসরষু রং ঃযব ভড়ঁহফধঃরড়হ ড়ভ ভৎববফড়স, লঁংঃরপব ধহফ ঢ়বধপব রহ ঃযব ড়িৎষফ’’ ”গ. গড়ংশড়রিঃং, ঐঁসধহ জরমযঃং ধহফ ঃযব ড়িৎষফ ড়ৎফবৎ টঝঅ : ঙপপধহধ ঢ়ঁনষরপধঃরড়হ, ঘবি ণড়ৎশ, অঢ়ঢ়বহফরী ১. চ. ১৯৯” ঞযব ঝড়পরধষ ড়িৎশ উরপঃরড়হধৎু- এর মতে দদঐঁসধহ জরমযঃং ধৎব ঃযব ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃু ঃড় নব ধপপড়ৎফবফ ঃযব ংধসব ঢ়ৎবৎড়মধঃরাবং ধহফ ড়নষরমধঃরড়হং রহ ঝড়পরধষ ভঁষভরষষসবহঃ ধং ধৎব ধপপড়ৎফবফ ঃড় ধষষ ড়ঃযবৎং রিঃযড়ঁঃ ফরংঃরহপঃরড়হ ধং ঃড় ৎধপব, ংবী, ষধহমঁধমব ড়ৎ ৎবষরমরড়হ’’ দদজড়নবৎঃ খ. ইধৎশবৎ, ঞযব ঝড়পরধষ ডড়ৎশ উরপঃরড়হধৎু, ঘধংি চৎবংং. ৩ফ বফরঃরধ, ১৯৯৫, চ-১৭৩’’।
মানবাধিকার কেবল মানুষের মৌল-মানবিক চাহিদা (ইধংরপ যঁসধহ হববফং) এর পূরণই নয় বরং তা হচ্ছে মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন, প্রতিভার বিকাশ, চিন্তা (ঃযড়ঁমযঃং), বিশ্বাস (নবষরবাব), ও সৃজনশীলতার লালন। বলা হয়েছে “ঐঁসধহ ৎরমযঃং ধৎব পড়হপবৎহবফ রিঃয ঃযব ফরমহরঃু ড়ভ ঃযব রহফরারফঁধষ-ঃযব ষবাবষ ড়ভ ংবষভ-বংঃববস ধহফ ংবপধৎবং ঢ়বৎংড়হধষ রফবহঃরঃু ধহফ ঢ়ৎড়সড়ঃবং যঁসধহ পড়সসঁহরঃু “হাসান, ড. মোস্তফা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫”। সমকালীন বিশ্বে মানবাধিকার এর এই ধারণা বিকাশ লাভ করেছে প্রধানত পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্র ও সমাজনীতি এবং বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিকতাবাদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে জাতিসংঘের উদ্যোগে”।
মানবাধিকার ও তার পরিধি : মানবাধিকার বলতে মানুষের সেই সব স্বার্থকে বুঝায় যা অধিকারের নৈতিক বা আইনগত নিয়মনীতি দ্বারা সংরক্ষিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, রাষ্ট্র কর্তৃক এর নাগরিকদের জন্য স্বীকৃত ও প্রদত্ত কতিপয় সুযোগ-সুবিধাকে মানবাধিকার বলে যেগুলো ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য। “রেবা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ১”। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব হওয়ার কারণে তার পক্ষে বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন সম্ভব নয়। তাই সামাজিক জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতির ও বলিষ্ঠতার জন্য সমাজের এক সদস্যের প্রতি অন্য সদস্যের অনেকগুলো দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে। এই দায়িত্বই হচ্ছে মূলত অধিকার। সুতরাং মানুষের প্রতি মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহই হল মানবাধিকার। জাতিসংঘ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী মানবাধিকার হল মানুষের এমন কতগুলো জন্মগত অধিকার অনস্বীকার্য চাহিদা, যা মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তি ও বিবেককে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করার জন্য অতীব প্রয়োজন এবং সেগুলো মানুষের আত্মিক চাহিদা মেটায়। “জাতিসংঘ মানবধাকিার পঞ্চাশটি প্রশ্ন ও উত্তর ঢাকা : জাতিসংঘ তথ্য কেন্দ্র, পৃ. ০৫”। মূলত মানব পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সর্বজনীন, সহজাত, হস্তান্তরযোগ্য ও অলংঘনীয় অধিকার হল মানবাধিকার। এসব অধিকার তিনভাগে বিভক্ত-
এক : অর্থনৈতিক অধিকার, যথা- ভাত, কাপড়, বাসস্থান, চিকিৎসা, জীবিকা অর্জন, সম্পত্তির মালিকানা লাভ ও সংরক্ষণ, জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, যোগ্যতানুযায়ী কর্মসংস্থান এবং ধনীদের সম্পদে গরীব অনাথ ও নিরন্ন মানুষের অধিকার প্রভৃতি।
দুই : সামাজিক অধিকার, যথা- জাতি-ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সমঅধিকার, মতামত প্রকাশ, জান-মালের নিরাপত্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, রাজনৈতিক তথা-নাগরিক অধিকার, সভা-সমিতি, সংগঠন ও জনমত গঠনের অধিকার, অবাধে ধর্ম-কর্ম সম্পাদনের অধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার লাভের অধিকার এবং বিবাহ-তালাক ইত্যাদির অধিকার।
তিন : নৈতিক অধিকার, যথা-অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, শ্লীলতার প্রসার ও অশ্লীলতা প্রতিরোধ, সৎকর্মের বিকাশ ও অসৎকর্মের বিনাশ, পিতা-মাতা ও বয়ো: জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, ছোটদের প্রতি ¯েœহ মমতা প্রদর্শন, সমাজের দরিদ্র, অসহায়, বিধবা, ইয়াতীম, অধিকার বঞ্চিত- মজলুম মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন, অতিথি- মুসাফিরদের আদর-আপ্যায়ন এবং সকল মানুষের প্রতি সৌজন্য আচরণ ইত্যাদি। “রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, ইসলামে মৌলিক মানবাধিকার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩”। বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার বলতে সেই সব অধিকারকে বুঝায় যা ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণায় (ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং) উল্লেখ করা হয়েছে। ৩০টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত এই ঘোষণায় ২৫টি মানবাধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টি নাগরিক ও রাজনৈতিক এবং ৬টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। “আব্দুল কাদের, ড. আ.ক.ম. মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) প্রেক্ষিত বর্তমান বিশ্ব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯”।
বিশ্বপ্রেক্ষিত ও মানবাধিকার : ১৮শ শতকের ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাঁ রুশো বলেন, গধহ রং নড়ৎহ ভৎবব, নঁঃ বাবৎুযিবৎব যব রং রহ পযধরহ, অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃংখলাবদ্ধ। “প্রাগুক্ত”। যুগে যুগে দূর্বল শ্রেণীর মানুষের ওপর সবলদের নিয়ন্ত্রণ এবং মুষ্টিমেয় শাসক শ্রেণী কর্তৃক বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর উপর শাসন-শোষণের বন্ধনকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বহুবিধ নিয়ম-নীতি আরোপের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবের সাথে জড়িত অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল। ফলে মানবিক বিকাশের স্বাভাবিক ধারা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই মানুষকে সংগ্রাম করতে হয় শৃংখল মুক্তি তথা মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য।
“রাষ্ট্রের উৎপত্তির পূর্বেই কি অধিকারের জন্ম হয়েছে না কি রাষ্ট্রই অধিকার সৃষ্টি করেছে” রাজনীতি বিজ্ঞানের এটি বিতর্কিত বিষয়। ঔড়যহ খরপশব এর মতে, মানুষ স্বভাবতই কিছু অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার অধিকারসহ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার মানুষের অস্তিত্বের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। “প্রাগুক্ত”। আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের আগে প্রাক-রাষ্ট্রীয় যুগেও মানুষ কিছু প্রাকৃতিক অধিকার (ঘধঃঁৎধষ জরমযঃং) ভোগ করতো। পরবর্তীকালে রাষ্ট্র কেবল সেই সব অধিকারকে অনুমোদন, সংরক্ষণ ও ভোগের নিশ্চিয়তা দিয়েছে মাত্র। পক্ষান্তরে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রাকৃতিক অধিকার ভোগ করার এই ধারণার প্রতি তেমন গুরুত্ব দেন না। তাঁদের মতে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে মানুষের পক্ষে কোন অধিকার ভোগ করা সম্ভব নয়। কেননা, রাষ্ট্র অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা না দিলে সে অধিকার অর্থহীন। সুতরাং রাষ্ট্র তথা নাগরিকদের জন্য বহুবিধ রাষ্ট্রীয় আইনই অধিকার সৃষ্টি করে এবং তা ভোগ করার নিশ্চয়তা দেয়। “রহমান, মুহাম্মদ হাবীবুর, অধিকার, কর্তব্য ও উন্নয়ন’ মানবাধিকার ও উন্নয়ন সমীক্ষা, ঢাকা: ১৯৯১, পৃ. ৬৩-৬৪”। বস্তুত মানবাধিকার ব্যক্তির মর্যাদা সম্মানের সাথে জড়িত একটি বিষয় যা মানব সমাজের নৈতিক মানদন্ডকে প্রকাশ করে। অতএব এটি কেবল ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নয়, গোটা বিশ্ব সমাজের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যও প্রয়োজন। সুতরাং একে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব কেবল ব্যক্তির নয়, বিশ্বসমাজেরও। আর প্রতিটি রাষ্ট্র বিশ্বসমাজের এক একটি অঙ্গ হওয়ার কারণে এই মহান দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপরও বর্তায়।
মানবাধিকার আইন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : মানবাধিকারের ধারণা যেহেতু মানুষ অতি প্রাচীনকাল থেকেই পোষণ করে আসছে, তাই এটি সংরক্ষণের বিষয়েও বিশ্বসমাজ তাদের চিন্তায় ত্র“টি করেনি। অদ্যাবধি প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপিবদ্ধ আইন হল ব্যাবিলনের রাজা হাবুরাবী কর্তৃক প্রণীত “ব্যাবিলনীয় কোড” বা ‘হামুরাবী কোড’ “প্রণয়নকাল-আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২১৩০-২০৮৮ সাল)। লিখিত আইনের সূচনা হিসাবে এই কোড বিশেষ মূল্য বহন করে। এতে মানবাধিকার সংরক্ষণের কথা পাওয়া যায়। এছাড়াও প্রাচীন গ্রীস ও রোমের সরকার পরিচালনা, নির্বাচন, বিচার ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রেও নাগরিকদের অংশগ্রহণের অধিকার প্রয়োগের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। “বেরা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫”। খ্রিস্টীয় ৭ম শতকে মানুষের অধিকার সংরক্ষণে ইসলাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, মহানবী (সা.) এর সুন্নাহ ও হাদীস এবং “মদীনা সনদ” ও “বিদায় হজ্বে” প্রদত্ত মহানবী (সা.) এর ভাষণ মানবাধিকার তথা মানুষের অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করেছে।
কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ যখন ইসলাম এবং মহানবী (সা.) এর শিক্ষা ও আদর্শ হতে বিচ্যুত হয় এবং মানুষ যখন শাসক শ্রেণী হতে তাদের প্রাপ্য অধিকার হতে বঞ্চিত হয়, তখন তারা অধিকার আদায়ে সোচ্চার ও প্রতিবাদী হয়েছে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে শাসক শ্রেণীকে বাধ্য করেছে তাদের প্রাপ্য অধিকার করতে। ফলে শাসক শ্রেণী ও জনগণের মাঝে সম্পাদিত হয়েছে বিভিন্ন চুক্তি ও দলীল, যাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে মানুষের অধিকার। ১১৮৮ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়ান-ব-দ্বীপে সামন্ত প্রভু ও অভিজাত ব্যক্তিদের এক সভায় রাজা আলফসনের নিকট থেকে অভিজাত শ্রেণী ব্যক্তি স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা, জীবনের মর্যাদা, বাসস্থান ও সম্পদের অলংঘনীয়তা প্রভৃতি কিছু অধিকার আদায় করে নেয়। “প্রাগুক্ত”। হাঙ্গেরীর রাজা দ্বিতীয় এন্ড্রু ১২২২ খ্রিস্টাব্দে ‘স্বর্ণ আদেশ’ দ্বারা ঘোষণা দেন, তিনি আমীর ওমারা ও অভিজাত শ্রেণীর জন্য বেশ কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করবেন। তিনি অধিকারসমূহের এক দীর্ঘ তালিকা প্রণয়ন করেন এবং তা কার্যকর করার পদ্ধতিও ঘোষণা করেন। “প্রাগুক্ত”।
ইংল্যান্ডে মানবাধিকার বিকাশের ক্ষেত্রে ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা জন কর্তৃক সম্পাদিত গধমহধ ঈধৎঃধ কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীল হিসাবে গণ্য করা হয়। প্রাথমিকভাবে এই চুক্তি রাজা ও ব্যারনদের মাঝে সম্পাদিত হলেও ৬৩টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত এই দলীলকে পরবর্তীতে ঈযধৎঃবৎ ড়ভ ঊহমষরংয খরনবৎঃরবং এবং বর্তমানে মানবাধিকার ও মুক্ত সরকারের ইতিহাসে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। “ইধৎর, উৎ. গ. ঊৎংযধফঁষ, ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়হপবৎহ ভড়ৎ ঃযব চৎড়সড়ঃরড়হ ধহফ চৎড়ঃবপঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং, উযধশধ : উযধশ টহরাবৎংরঃু ঝঃঁফরবং চধৎঃ ঋ, ঠঙখ ওও (র) চ- ২১” সপ্তদশ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা কর্তৃক নাগরিকদের সনাতন অধিকার খর্ব করার প্রতিবাদে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় তারই ফলশ্র“তিতে প্রণীত হয় ১৬২৮ সালে ঞযব চবঃরঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ও ১৬৮৯ ঞযব ইরষষ ড়ভ জরমযঃং নামক দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলীল। মানবাধিকার সম্বলিত এ দু’টি দলীল একদিকে যেমন রাজার একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্ষমতাকে খর্ব করেছে, অপরদিকে পার্লামেন্ট ও আদালতের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে এই প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। খড়ৎফ ঈযধঃযধহ উক্ত গধমহধ ঈধৎঃধ, ঞযব চরঃরঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ঞযব ইরষষ ড়ভ জরমযঃং এই তিনটি দলীলকে ঞযব ইরনষব ড়ভ ঃযব ঊহমষরংয ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ নামে অভিহিত করেছেন। “রেবা মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬-৭”। ১৮শ শতকের বিভিন্ন দার্শনিকের লেখা ও রচনায় এবং ১৬৮৮ সালের ইংলিশ বিপ্লব ও এর ফসল ১৬৮৯ সালের ঞযব ইরষষ ড়ভ জরমযঃং উত্তর আমেরিকা ও ফ্রান্সে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রেরণা যোগাতে প্রভূতভাবে সাহায্য করে। ব্রিটিশ কলোনী আমেরিকায় ব্রিটিশ রাজার শাসন-শোষণ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের জয় লাভের ফলে আমেরিকাবাসী ১৭৭৬ সালের ১২ জুন ভার্জিনিয়াতে একটি ইরষষ ড়ভ জরমযঃং গ্রহণ করে, যার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়; “অষষ সবহ ধৎব নু হধঃঁৎব ভঁষষু ভৎবব ধহফ ওহফবঢ়বহবহঃ, ধহফ যধাব পবৎঃধরহ ওহযবৎবহঃ ৎরমযঃং, হধসবষু, ঃযব বহলড়ুসবহঃ ড়ভ ষরভব ধহফ ষরনবৎঃু, রিষষ ঃযব সবধহং ড়ভ ধপয়ঁরৎরহম ধহফ ঢ়ড়ংংবংংরহম ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ধহফ ড়নঃধরহহরহম যধঢ়ঢ়রহবংং.” ২৫ এর মাত্র ২১ দিন পর ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার ১৩টি কলোনীকে নিয়ে ঞযব উবপষধৎৎধঃরড়হ ড়ভ রহফবঢ়বহফবহপব তথা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণাপত্রের মুখবন্ধে মানবাধিকার প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়Ñ “ডব যড়ষফ ঃযবংব ঃৎঁঃযং ঃড় নব ংবষভ-বারফবহঃ, ঃযধঃ ধষষ সবহ ধৎব পৎবধঃবফ বয়ঁধষ, ঃযধঃ ঃযবু ধৎব বহফড়বিফ নু ঃযবরৎ ঈৎবধঃড়ৎ রিঃয পবৎঃধরহ রহ ধষরবহধনষব ৎরমযঃং, ঃযধঃ ধসড়হম ঃযবংব ৎরমযঃং ধৎব ষরভব, ষরনবৎঃু ধহফ ঢ়ঁৎংঁরঃ ড়ভ যধঢ়ঢ়রহবংং.” এতে আরো বলা হয়, এই সব অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য জনগণ যে সরকার তৈরি করে সেই সরকার যদি এই সব অধিকার খর্ব করে তবে সেই সরকার উৎখাত করে নতুন সরকার গঠন করা জনগণেরই অধিকার। “ইধৎর, উৎ. গ. ঊৎংযধফঁষ, ওনরফ, চ-২২,” । (অসমাপ্ত)

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

সমগ্র বিশ্বব্যাপী আজ চলছে দানবীয় রাজত্ব। শৃংখলিত মানবতা প্রহর গুণছে মুক্তির। কিন্তু মুক্তি পরিবর্তে সৃষ্টি হচ্ছে নব নব সংকট। বাড়ছে অশান্তি। মরছে বনী আদম। ধ্বংস হচ্ছে জনপদ। ঠিক এমনি এক সমস্যা সংকুল পরিবেশে অজ্ঞানতা, অমানবিকতা, নির্লজ্জতা ও হিংস্রতার অক্টোপাশে আবদ্ধ মানব সভ্যতাকে রাহুমুক্ত করার এবং নতুন জীবনদানের অঙ্গীকার নিয়ে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে এ পৃথিবীতে এসেছিলেন বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)। তাঁর সম্পাদিত মহাবিপ্লব সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে আজও এক বিস্ময়। সমগ্র বিশ্বের অকৃত্রিম দরদীবন্ধু ও অভিভাবক- এ মহান ব্যক্তিত্বের অতুলনীয় দর্শনের স্পর্শে অভিভূত হয়েছিল সমকালীন সমাজ ও পৃথিবী। কুরআনের ভাষায় তার সূর্যের মত উজ্জ্বল এবং চন্দ্রের মত স্নিগ্ধ আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে স্থান-কাল নির্বিশেষে গোটা মানবসভ্যতা। অথচ পবিত্র কুরআনে মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে বহু আয়াত নাযিল হয়েছে। মহানবী (সা.) এর হাদীসে রয়েছে, মানবাধিকারের অসংখ্য উদাহরণ। ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রবন্ধে মানবাধিকারের পরিচয়, পরিধি, মহানবী (স.) এর গৃহীত পদক্ষেপ এবং বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকারের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকার ও প্রাসঙ্গিক কথা : আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার একটি বহুল আলোচিত বিষয়। মানবাধিকার বলতে সরলার্থে মানুষের সহজাত অধিকারই মানবাধিকার হিসেবে পরিচিত। যে সব মানবিক অধিকার ব্যতীত মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে মর্যাদাসহ জীবনধারণ করতে পারে না, মানবিক গুণাবলি ও বৃত্তির প্রকাশ ও বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয় না সাধারণত সেগুলোই মানবাধিকার হিসেবে গণ্য। “রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, “ইসলামে মৌলিক মানবাধিকার” ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল-জুন, ২০০৩, পৃ. ৩৩”। যুগে-যুগে দেশে-দেশে বিত্তবান, ক্ষমতাধর শাসক শ্রেণী কর্তৃক দুর্বল, ক্ষমতাহীন, বিত্তহীন জনগোষ্ঠী শোষিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে। এ শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত নিপীড়িত মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে আল্লাহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেন যাঁদের প্রত্যেকেই দানবরূপী শাসক শ্রেণী কর্তৃক অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আল্লাহর নবীগণের সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পরও স্বৈরাচারী, দাম্ভিক শাসক শ্রেণী সাধারণ জনগণের মৌলিক অধিকারে কুঠারাঘাত করছে, বিশ্বমানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করছে, নির্বাসিত করেছে শান্তি-সমৃদ্ধিকে। তাই চরম উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষগুলো বাধ্য হয়ে তাদের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।
মানবাধিকার সম্পর্কে তদানীন্তনকালের ব্যাবিলনের রাজা হামুরাবী সর্বপ্রথম খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ২১৩০-২০৮৮ সালে ‘ব্যাবিলনীয় কোড বা ‘হামুরাবী কোড’ এর মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিকে আইনগত রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। “রেবা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, মানবাধিকার আইন-সংবিধান ইসলাম, চট্টগ্রাম: ১৯৯৯, পৃ. ৪”। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে মহানবী (সা.) মানুষকে আল্লাহর খলীফা অভিধায় অভিহিত করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন অতঃপর তিনি আল-কুরআনের নির্দেশনা এবং স্বীয় বাণী, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বিশ্বেও ইতিহাসে তা বিরল। “ড. আ.ক.ম আব্দুল কাদের, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (স.) প্রেক্ষিত বর্তমান বিশ্ব, আত্-তাকবীর, চট্টগ্রাম: সীরাতুন্নবী সংখ্যা ৮, ২০০২, পৃ. ৪৭”।
মানবাধিকার ও শাব্দিক পরিচিত : ‘মানবাধিকার’ শব্দটি অধুনাবিশ্ব প্রেক্ষাপটে বহুল আলোচিত বিষয়। এটা একটি যৌগিক শব্দ যার ইংরেজী পরিভাষা হল “ঐঁসধহ জরমযঃং”. “ঐঁসধহ ৎরমযঃং” – এর পরিচয়ে কোথাও বলা হয়েছে- ঙহব ড়ভ ঃযব নধংরপ ৎরমযঃং ঃযধঃ বাবৎুড়হব যধং ঃড় নব ঃৎবধঃবফ ভধরৎষু ধহফ হড়ঃ রহ পৎঁধষ ধিু, বংঢ়বপরধষষু নু ঃযবরৎ মড়াবৎসসবহঃ দদঅ.ঝ ঐড়ৎহনু, ঙঢঋঙজউ অউঠঅঘঈঊউ খঊঅজঘঊজ’ঝ উওঈঞওঙঘঅজণ. খড়হফড়হ: ঙীভড়ৎফ টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ঝরীঃু ৎফ, ২০০২, ঢ়. ৬৩৫’’ এটি মূলত ফরাসী শব্দ হতে উৎপন্ন। অর্থ হল- মানুষের অধিকার “আব্দুন নূর, বিশ্বমানবাধিকার ঘোষণা, ইসলাম ও গণতন্ত্র, ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক ফোরাম কর্তৃক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ১৯৯৪ সালে আয়োজিত সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধ, পৃ. ১”। ঞযড়সধং চধরহব সর্বপ্রথম ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ কর্তৃক ১৭৮৯ সালে গৃহীত জরমযঃং ড়ভ গধহ ঘোষণার জন্য উৎড়রঃং ফব খ’যড়সব শব্দটি ব্যবহার করেন যা গৎং. ঊষপধহড়ৎ জড়ড়ংবাবষঃ- এর প্রস্তাব অনুযায়ী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহীত ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এ ঐঁসধহ জরমযঃং বা মানবাধিকার পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়। “ঞযড়সধং ড. ডরষংড়হ, অ ইবফৎড়পশ ঈড়হংবহংঁং ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃ’ং ওহ ঐ. ঐবহশরহ (বফ). ঐঁসধহ উরমহরঃু: ঞযব ওহঃবৎহধঃরড়হধষুধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃ: ১৯৭৯, চ.৪৮’’ যার আরবী পরিভাষা “ইক্ব বা হুকুক” যা কুরআন-সুন্নাহে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মানবাধিকার পরিভাষাটি কখনো ইধংরপ ঐঁসধহ জরমযঃং, কখনো ঋঁহফধসবহঃধষ জরমযঃং আবার কখনো ইরৎঃয জরমযঃং ড়ভ ঐঁসধহ নবরহম ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়। “ড.আ.ক.ম. আব্দুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮”।
মানবাধিকার-এর বিকাশ : মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি, ধন-সম্পদ, জেন্ডার নির্বিশেষে সমভাবে দেখে তার সহজাত ও ¯্রষ্টা প্রদত্ত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করাই হচ্ছে ‘মানব মর্যাদা’। মানুষের অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা রক্ষা, সহজাত ক্ষমতা ও প্রতিভার সৃজনশীল বিকাশ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপনের অধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য একান্তভাবে প্রয়োজনীয় কতিপয় অধিকার স্বত্বই হচ্ছে মানবাধিকার। “হাসান, ড. মোস্তফার, মানবাধিকার ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) একটি পর্যালোচনা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৪৭ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, এপ্রিল- জুন, ২০০৮, পৃ. ৪৪”। মানুষের এই অধিকার তার জন্মগত এবং মানবিক মূল্য মর্যাদার সাথে সংশ্লিষ্ট। ঊহপুপষড়ঢ়ধবফরধ ইৎরঃধহহরপধ- তে মানবাধিকারকে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত মানুষের জন্মগত অধিকার দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “জরমযঃং ঃযড়ঁমযঃ ঃড় নবষড়হম ঃড় ঃযব রহফরারফঁধষ ঁহফবৎ হধঃঁৎধষ ষধি ধং ধ ঈড়হংবয়ঁবহপব ড়ভ যরং নবরহম যঁসধহ’’ দদঞযব ঘবি ঊহপুপষড়ঢ়ঁবফরধ ইৎরঃঁহহরপধ, টঝঅ: ঋঁহফবফ রহ ১৭৬৮, ১৫ঃয বফরঃরস, ঠঙখ-৫, চ, ২০০’’। (সমাপ্ত)

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
দ্বিতীয়ত, পিতা মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন তখন তাদের মেজাজ কিছুটা খিটখিটে হয়ে যেতে পারে এবং বয়সের কারণে তাদের আচরণে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে থাকলে তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। তাদের কথা খুশীমনে মেনে নেয়া। তাদের কোন কথায় বিরক্ত হয়ে জবাবে উহ্ শব্দটি উচ্চারণ না করা অথবা তাদের সাথে এমন আচরণ না করা যাতে তারা উহ্ শব্দটি উচ্চারণ করেন। ধমকের সুরে বা উচ্চ কণ্ঠে বা কর্কশ ভাষায় তাদের সাথে কথা না বলা। আমাদের শৈশবকালের কথা স্মরণ করা যে, তারা আমাদের প্রতি কীরূপ অনুগ্রহ করেছেন।
তৃতীয়ত: পিতা মাতার মান সম্মানের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। কথা বলার সময় তাদের সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখা। বয়সের শেষ পর্যায়ে এসে যখন তারা দুর্বল হয়ে পড়েন তখন তাদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়া। বয়সের কারণে তাদের মান অভিমান অনুধাবন করা এবং বিরক্ত হয়ে তাদের সম্মুখে এমন কথা না বলা যা তাদের মান সম্মানের পরিপন্থি হয়।
চতুর্থত: আচার আচরণ ও ব্যবহারে তাদের সাথে বিনয়ী ও কোমল স্বভাবের আচরণ প্রকাশ করতে হবে। আনুগত্যের সাথে মাথা অবনত রাখা, তাদের নির্দেশ মনযোগ দিয়ে শ্রবণ করা এবং পালন করা। বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের খেদমতে নিয়োজিত থাকা; কিন্তু এক্ষেত্রে বিরক্তি, অহমিকা বা অনুগ্রহ প্রকাশ না পাওয়া উচিত। কেননা এ রকম সেবা ও পরিচর্যা আমাদের নিকট তাঁদের প্রাপ্য। তাদের সেবা ও পরিচর্যা করার সুযোগ লাভে আল্লাহর শোকর আদায় করা উচিত।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: আর আমি মানুষকে তার পিতা মাতার সাথে সদ্বব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছে। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। পিতা মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থাপন করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করবো। “আল কুরআন ৩৯:১৪-১৫।”
উপরোক্ত আয়াতের বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, প্রথমত আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াতে সন্তানের জন্য মায়ের কষ্টের বর্ণনা, বিশেষ করে তাকে কত কষ্টে তার মা গর্ভে ধারণ করেছেন তা বর্ণনা, সন্তানের প্রতি মায়ের অনুগ্রহ, সন্তানকে দুধ পান করানো ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াতে আমার প্রতি ও তোমার পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও’ দ্বারা আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পরপরই পিতা মাতার কৃতজ্ঞাতার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত: আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ পায় এমন কোন নির্দেশ পিতা মাতা প্রদান করলে তার আনুগত্য করা যাবে না। তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে সহঅবস্থানের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত প্রতিটি কাজের মধ্যেই সওয়াব ও কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহর অনুগত্যের মাধ্যমেই তার নৈকট্য অর্জন করা যায়। এত সব আমলের মধ্যে পিতা মাতার প্রতি সদাচরণকে রাসূলুল্লাহ (স.) আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল বলে ঘোষণা করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন আমি নবী (স.) কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বলেন: পিতা মাতার সাথে সদাচার। আমি বললাম তারপর কোনটি? তিনি বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি আমাকে এসব বিষয়ে বললেন। আমি আরো জিজ্ঞেস করলে তিনি অবশ্যই আমাকে আরো বলতেন। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ (অনুবাদ ও সম্পাদনা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৯৫ ঢাকা) অধ্যায়: শিষ্টাচার, অনুচ্ছেদ: আল বিররি ওয়াস সিলাহ, হাদীস নং-৫৪৩২,খ,৯.পৃ.৩৮৯, ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১ পৃ.৩৩।”
পিতা মাতার সাথে কোমল ব্যবহার এবং নম্র ভাষায় বিনয়ী হয়ে কথা বলার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হলো বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে তারা অনেক সময় স্বাভাবিক আচরণ নাও করতে পারেন। তখন তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে বা কোন বিষয়ে অধৈর্য হয়ে পড়তে পারেন। সেই অবস্থায়ও সন্তানকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং কোমল ভাষায় কথা বলতে হবে।
তায়সালা ইবনে মায়্যাস রহ. বলেন, আমি যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত ছিলাম। আমি কিছু পাপকাজ করে বসি, যা আমার মতে কবীরা গুনাহর শামিল। আমি তা ইবনে উমার রা. এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তা কী? আমি বললাম, এই ব্যাপার। তিনি বললেন, এগুলো কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। কবীরা গুনাহ নয়টি: (১) আল্লাহর সাথে শরীক করা, (২) নরহত্যা, (৩) জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন, (৪) সতী সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে যিনার মিথ্যা অপবাদ রটানো, (৫) সুদ খাওয়া, (৬) ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, (৭) মসজিদে ধর্মদ্রোহী কাজ করা, (৮) ধর্ম নিয়ে উপহাস করা, (৯) সন্তানের অসদাচরণ যা পিতা মাতার কান্নার কারণ হয়। ইবনে উমার রা. আমাকে বলেন, তুমি কি জাহান্নাম থেকে দূরে থাকতে ও জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও? আমি বললাম আল্লাহর শপথ! আমি তাই চাই। তিনি বলেন, তোমার পিতা মাতা কি জীবিত আছেন? আমি বললাম, আমার মা জীবিত আছেন। তিনি বলেন আল্লাহর শপথ! তুমি তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বললেও ভরণ পোষণ করলে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদি করীরা গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাকো। “ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: পিতা মাতার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলা, প্রগুক্ত হাদীস নং ৮পৃ.৩৫।”
পিতা মাতা সন্তানের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমতস্বরূপ। সন্তানের জন্য পিতা মাতার দু’আ কবুল হয়। তাই তাদের দু’আ নিতে হবে এবং বদদু’আ থেকে বাঁচতে হবে। বদদু‘আ থেকে বাঁচার উপায় হলো তাদের প্রতি অসদাচরণ না করা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: তিনটি দু‘আ অবশ্যই কবুল হয়, এতে কোন সন্দেহ নেই। (১) মজলুম বা নির্যাতিতের দু‘আ, (২) মুসাফিরের দু‘আ এবং (৩) সন্তানের জন্য পিতা মাতার দু‘আ। “ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ অনুচ্ছেদ: দা’ওয়াতিল ওয়ালিদাইন, প্রাগুপ্ত হাদীস নং ৩২.পৃ.৪৪।”
ইসলাম পিতা মাতার প্রতি আচরণকে এতই গুরুত্ব প্রদান করেছে যে, তাদের মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর তা হলো, তাদের জন্য দু‘আ করা, তাদের বৈধ ওসিয়ত পূর্ণ করা, তাদের বন্ধু-বান্ধবগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের দিক থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এমন আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।
উসাইদ (রা.) বলেন, আমরা নবী (স.) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার কোন অবকাশ আছে কি? তিনি বলনে: হ্যাঁ, চারটি উপায় আছে। (১) তাদের জন্য দু‘আ করা, (২) তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, (৩) তাদের প্রতিশ্র“তিসমূহ পূর্ণ করা এবং (৪) তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করা, যারা তাদের মাধ্যমে তোমার আত্মীয়। “ইমাম বুখারী, আল-আদাবুদ মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: বিররিল ওয়ালিদাইনি বা‘দা মাওতিহিমা, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৩৫, পৃ. ৪৬”।
ও.আই.সি-এর উদ্যোগে ১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই থেকে ৫ আগষ্ট পর্যন্ত ৬ দিন ব্যাপী ও.আই.সি. ভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের পররষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন মিসরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্টিত হয়। সম্মেলনের সর্বশেষ দিন ৫ আগষ্ট ঞযব ঈধরৎড় উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং ওহ ওংষধস” সর্বসম্মত মতের ভিত্তিতে অনুমোদন করা হয়। উক্ত ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ৭ এ সন্তান ও পিতা-মাতার অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ: ৭ (ক) জন্ম গ্রহণের প্রাক্কালে, প্রত্যেক শিশুর তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ হতে যথাযথ পরিচর্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত যতœ এবং নৈতিক তত্ত্বাবধান পাবার অধিকার রয়েছে। ভ্রƒণ এবং মা অবশ্যই সুরক্ষিত এবং বিশেষ যতেœ থাকবে। (খ) পিতা-মাতার বা দায়িত্বপ্রাপ্তদের অধিকার রয়েছে যে, তাদের ইচ্ছানুযায়ী সন্তানকে শিক্ষা প্রদান এবং ভবিষ্যতের জন্য গঠন করা নৈতিক মূল্যবোধ এবং শরী‘আহ- এর মূলনীতির আলোকে। (গ) পিতা-মাতা উভয়ই সন্তান-এর নিকট হতে অনুরূপ অধিকার রয়েছে এবং আত্মীয়দেরও তাদের পরম্পরের নিকট হতে শরী‘আহ্-এর আলোকে অধিকার রয়েছে।
ও.আই.সি.-ভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সম্মেলনে শিশুদের অধিকার বর্ণনা করা হয়েছে এবং সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্যও অনুরূপ অধিকার রয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের জন্য অধিকার রয়েছে তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের করা হয়েছে। শিশুদের জন্য অধিকার রয়েছে তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিকট হতে, অনুরূপভাবে পিতা-মাতার জন্যও তাদের নিকট হতে অধিকার রয়েছে। কেননা বিদ্যমান আইনে শুধু আর্থিক দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ৬ মাস বা ১ বছর কারাদন্ড অথবা আর্থিকনন্ড কিংবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আইনের ৫নং ধারার (১) উপধারায় “উক্ত অপরাধের জন্য ছয় মাস থেকে এক বছরের কারাদন্ড বা এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবে” সংযুক্ত করা যেতে পারে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনটির শিরোনাম “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ও সদাচরণ আইন” করা যেতে পারে, সদাচরণ এর সংজ্ঞায় “শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান প্রদর্শন, আনুগত্য করা, শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট না দেওয়া, উচ্চ স্বরে ও কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, যে কোন কথা বা কাজ দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কষ্ট না দেওয়া, তাদের প্রতি অবহেলা না করা”Ñ যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
বিদ্যমান আইনের ৩নং ধরার ৪নং উপধারা এর সাথে নিম্নোক্তভাবে সংযুক্ত করা যেতে পারে, ৩ (৪) “অথবা কোন সন্তান তার পিতা-মাতার প্রতি এমন আচরণ করবে না, যাতে পিতা বা মাতা বা উভয়ে স্বেচ্ছায় সন্তানের বাসস্থান থেকে আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য হন।” বিদ্যমান আইনের ৩নং ধারায় ৭নং উপধারায় বর্ণিত “সন্তান তার মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হইতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা উভয়কে প্রদান করবে” এর সাথে অন্য একটি উপধারা যুক্ত করে ‘যুক্তিসঙ্গত’ পরিমাণ অর্থ এর ব্যাখ্যা দেয়া যায় এভাবে যে, “যা দ্বারা তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যয় বহনের ন্যূনতম অর্থ সংকুলান হয়”। যে সকল পিতা-মাতার সন্তান নেই বা সন্তানের কর্মসংস্থান নেই বা সন্তান আয় রোজগার করতে অক্ষম বা বিকলাঙ্গ তাদের ভরণÑপোষণের দায়িত্ব সরকার কর্তৃক গ্রহণ করার জন্য বিধি প্রণয়ন করা।
সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্তরের পাঠ্যসূচিতে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব, নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণের ধর্মীয় নির্দেশনা, পরকালীন জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং উল্লিখিত বিষয়সমূহ সরকারের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও বেসরকারি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করার মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধিকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ। বিদ্যমান আইনের ৬নং ধারার আমলযোগ্যতা, জামিন যোগ্যতা ও আপোষযোগ্যতার ক্ষেত্রে নমনীয়তা পরিহার করে আরো কঠোরতা আরোপ করা এবং বিচারিক আদালতের পরিধি ১ম শ্রেণী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সীমাবদ্ধ না রেখে এর পরিধি বৃদ্ধি করা।
বিদ্যমান আইনের ৩নং ধারার উপধারা (৩) এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ সহায়ক আইন প্রণয়ন করা। যথা: সরকারি স্বায়ত্বশাসিত বা বেসরকারি কর্মক্ষেত্রসমূহের কর্মরতদের মধ্যে ক্ষেত্র অনুযায়ী তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাস বা চিকিৎসার সুবিধার্থে তাদের অনুকূল বিভাগ, জেলা, থানা বা কর্মস্থলে পদায়ন (চড়ংঃরহম)-এর বিধি প্রণয়ন করা।
সন্তানের জন্য পিতা-মাতার হলেন আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে সন্তানের লালন-পালন ও তাদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘পিতা-মাতার গুরুত্ব ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, বিনয়ী আচরণ ও তাদের জন্য ব্যয় করার বিষয়ে ইসলাম দিক নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষভাবে বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতি ভালো আচরণ, সেবা-যতœ, সময় দান করা এবং আল্লাহ্র নিকট তাদের জন্য দু‘আ করার শিক্ষা ইসলাম প্রদান করেছে। তবে ইসলাম তাদের প্রতি সদ্ব্যবহারের জন্য আইন নির্দিষ্ট করে দেয়নি। রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে প্রয়োজন অনুযায়ী পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ বাস্তবায়নের জন্য শরী‘আহ্সম্মত পদ্ধতিতে কুরআন ও সুন্নহ্র ভিত্তিতে বিধান প্রণয়ন করতে পারবে। ইসলামে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। মূলত পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ যতটা না আইনগত তার চেয়ে বেশি নৈতিক ও ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধ-এর সাথে সম্পৃক্ত। মৌলিক অবক্ষয়ে জর্জরিত ও নৈতিক স্খলনে পতিত কোন সমাজে আইন দিয়ে নৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য জনসাধারণকে বাধ্য করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অনুশীলন সামাজিক সচেতনতা। তাই আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের নৈতিক, ধমীয় মূল্যবোধ ও জবাবদিহিতার অনুশীলন প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে বিষয়টি পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্তকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা খুবই জরুরী। পাশাপাশি এ বিষয়ে আইনটি আরো সময়োপযোগী ও কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তাহলে সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত হবে, নির্বিঘœ হবে তাদের অধিকার প্রাপ্তি। (সমাপ্ত)

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের)
আইনের ৫নং ধারার ১নং উপধারায় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না করার দন্ড বর্ণনা করা হয়েছে। কোন সন্তান কর্তৃক ধারা ৩ এর যে কোন উপধারার বিধান কিংবা ৪নং বিধান লংঙ্ঘন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে বা উক্ত অর্থদন্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদন্ড ভোগের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের ৫নং-এর ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, কোন সন্তানের স্ত্রী বা ক্ষেত্র অনুযায়ী স্বামী কিংবা পুত্র কন্যা বা অন্য কোন নিকটাত্মীয়, পিতা-মাতা বা দাদাদাদী বা নানানানী ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করেন অথবা অসহযোগিতা করেন তিনিও অনুরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন বলে গণ্য হবে এবং উপধারা (১) এ উল্লিখিত দন্ডে দন্ডিত হবেন। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৫”।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন অনুযায়ী পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না দিলে অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকার অর্থদন্ড বা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শাস্তি প্রয়োগের দ্বারা অপরাধের জাগতিক প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে; কিন্তু তাতে পিতা-মাতার অসহায়ত্বের প্রতিবিধানের কোন ব্যবস্থা নেই।
ইসলামে পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে বড় পাপ ও কবীরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পিতা-মাতার অবাধ্যতার জন্য কোন শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। তবে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী শাস্তির বিধান প্রণয়ন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আলিমদের সমন্বয়ে গঠিত শরী‘আহ্ কাউন্সিল কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে তা প্রণয়নের পরামর্শ দিতে পারেন।
পিতা-মাতার অবাধ্য হলে তারা কষ্ট পাবেন। তাদের কষ্ট দেয়া হারাম। এজন্য তাদের বৈধ আদেশ যা শরী‘আহ্ পরিপন্থী নয় তা মান্য করা সন্তানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু তাদের আনুগত্য করতে গিয়ে যদি আল্লাহর অবাধ্যতার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তা পালন করা যাবে না।
আবু বকরা (রা.) বলেন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন: আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মকগুলো সম্পর্কে অবহিত করবো না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। উত্তরে সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন: আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ করা। তিনি হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন: এবং মিথ্যা বলা। তিনি এ কথাটি বারবার বলছিলেন। আমি মনে মনে বললাম, আহা! তিনি যদি ক্ষান্ত হতেন। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, হাদীস নং-৫৪৩৮”।
ইসালামে আনুগত্য প্রাপ্তির অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ আল্লাহর নির্দেশেরই আনুগত্য। তাই পিতা-মাতার অবাধ্যতা প্রকারান্তরে আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘনেরই নামান্তর। পিতা-মাতার বদদোয়া সন্তানের জন্য দুনিয়াতেই কার্যকর হয়ে যায়। আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেছেন: পিতা-মাতার আবাধ্যতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি দুনিয়াতে অন্যান্য পাপের চেয়ে দ্রুত অপরাধীর উপর কার্যকর হয়। পরকালের শাস্তি তো আছেই। ইমাম বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: উকুবাতি উক্কূকিল ওয়ালিদাইন, হাদীস নং-২৯, পৃ.৪৩”।
পিতা-মাতাকে কাঁদানোর অর্থ তাদের সাথে অন্যায় আচরণ করে তাদের মনে কষ্ট দিয়ে তাঁদের কাঁদানো। পবিত্র কুরআনে তাই তাঁদের সম্মুখে উহ্ শব্দটি উচ্চারণ করতে বারণ করা হয়েছে। তায়সালা (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি ইবনে উমার (রা.) কে বলতে শুনেছেন: পিতা-মাতাকে কাঁদানো তাদের অবাধ্যাচরণ ও কবীরা গুনাহ সমূহের শামিল। “ইমামা বুখারী, আলÑআদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: বুকা-ইল ওয়ালিদাইন, হাদীস নং-৩১, পৃ.৪৩”।
আইনের ৬নং ধারায় উল্লিখিত অপরাধকে আমলযোগ্য (ঈড়মহরুধনষব) জামিনযোগ্য (নধরষধহষব) এবং আপোষযোগ্য (ঈড়সঢ়ড়ঁহফধনষব) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইনের ৬নং ধারায় উক্ত অপরাধের আমলযোগ্যতা, জামিনযোগ্যতা ও আপোষযোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে। এ আইনের অধীন অপরাধ আমলযোগ্য (ঈড়হমহরুধনষব), জামিনযোগ্য (নধরষধনষব) ও আপোষযোগ্য (ঈড়সঢ়ড়ঁহফধনষব) হবে। এতে লক্ষণীয় যে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের বিষয়টি নমনীয়ভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আরো কিছুটা কঠোরতা আরোপ করা প্রয়োজন ছিল।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার কার্য পরিচালনার বিষয়ে ৭নং ধারার ১ উপধারায় বল হয়েছে ঈড়ফব ড়ভ ঈৎরসরহধষ চৎড়পবফঁৎব ১৮৯৮ (ধপঃ ড়ভ ১৮৯৮) এ যা কিছু থাকুক না কেন এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রাপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে। একই ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত কোন আদালত তা আমলে গ্রহণ করবে না। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৭”।
আইনের ৭নং ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছৈ, কোন আদালত এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমলে গ্রহণ করবেন না। অর্থাৎ আইনী প্রতিকারের জন্য লিখিত অভিযোগের শর্তারোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পিতা-মাতার প্রতি অসদাচরণের অধিকাংশ পিতা-মাতা তা নীরবে সহ্য করেন বা মনোঃকষ্ট নিয়ে জীবন অতিবিহিত করেন। লিখিত অভিযোগ দায়ের করে আইনী প্রতিকার পাওয়ার মানসিকতা অধিকাংশ পিতা-মাতার থাকে না। সেক্ষেত্রে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের যেসব কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাতৃ ও শিশুদের খোঁজ খবর নেন, তাদেরকে প্রতি তিন মাস অন্তর নিজস্ব এলাকার প্রধানদের অবস্থা সস্পর্কে প্রতিবেদন দেয়ার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তা হলে সরকারের কাছে অতি সহজেই প্রবীণদের সার্বিক অবস্থার একটা রির্পোট সংগৃহীত হবে এবং সে মতে পদক্ষেপ ও প্রতিকার বিধান করতে সুবিধা হবে। তা ছাড়া ইউনিয়ন, পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার ও কাউন্সিলরদের এই দায়িত্বে নিয়োজিত করা যেতে পারে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে পারে।
আলোচ্য আইনে বিষয়টি আপোষ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনের ৮নং ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন প্রাপ্ত অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রমত, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর কিংবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট আদালত প্রেরণ করতে পারবে। ৮নং ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে, উক্ত আইনের অধীন কোন অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ প্রদান করবেন এবং বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন এবং এরূপ নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে। “পিতাÑমাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৮”। ৯নং ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।
আইনের ৮নং ধারার ১নং উপধারায় উক্ত বিষয়ে অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রমত সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর অথবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করার কথা বলা হয়েছে। এখানে চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র বা কাউন্সিলর একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলেও ‘অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তি’র বিষয়টি স্পষ্ট নয়। গ্রামের মোড়ল বা মাতব্বরগণ অনেক সময় গ্রামের সালিশ পরিচালনা করে থাকেন; কিন্তু তাদের যোগ্যতা, জ্ঞান, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পাওয়া যায়। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে তাদেরকে দায়িত্ব প্রদান করলে তারা কতটুকু সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি করতে পারবেন তা নিশ্চত নয়। তা ছাড়া আইনের ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, কোন অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে তা নিষ্পত্তি করবেন, যা আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত বলে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে আদালতের সমপর্যায়ের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
ইসলামের বিধান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পর ‘উলিল আমর’- এর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং তাদের আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:- হে ঈমানদারগণ! তোমার আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর তাদের তারপর যদি তোমার কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পণ কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর ও পরিণতির দিক থেকে উত্তম। “আল-কুরআন, ৪:৫৯”।
উলিল-আমর’ আভিধানিক অর্থে সে সমস্ত লোককে বলা হয়, যাদের হাতে কোন বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত থাকে। সে কারণেই ইবনে আব্বাস রা. মুজাহিদ ও হাসান বসরী রহ. প্রমুখ মুফাসসিরগণ আলিম ও ফকীহ সম্প্রদায়কে ‘উলিলÑআমর’ সাব্যস্ত করেছেন। তাঁদের হাতেই দীনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত। মুফাসসিরীনের অপর একদল, যাদের মধ্যে আবু হুরায়রা (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে কিরামও রয়েছেন, তারা বলেছেন যে, ‘উলিল-আমর’- এর অর্থ হচ্ছে, সে সমস্ত লোক যাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত। এছাড়া তফসীরে ইবনে কাসীর এবং তফসীরে মাযহারীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ শব্দটির দ্বারা (আলিম ও শাসক) উভয় শ্রেণীকেই বোঝায়। কারণ, নির্দেশ দানের বিষয়টি তাঁদের উভয়ের সাথেই সম্পর্কিত। “মুফতী মুহাম্মদ শাফী, তাফসীর মা‘আরেফুল ক্বোরআন, পৃ.২৬০”।
মাতা-পিতার ভরণÑপোষণ আইন, ২০১৩ পর্র্যালোচনায় বলা যায়, সন্তান ও পিতা-মাতার সম্পর্ক খুবই আন্তরিক ও গভীর। ধর্মীয় দিক থেকে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও সদাচরণ- এর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছৈ। আইনী প্রতিকারের মাধ্যমে শ্রদ্ধাবোধ, মর্যাদা ও সদাচরণ আদায় করার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। মূলত পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক এমন নয় যে, পিতা-মাতা তার ভরণ-পোষণ ও সদাচরণ প্রাপ্তি মামলা বা অভিযোগ দাখিল করে তা সন্তানের নিকট থেকে আদায় করবেন। বিষয়টি যতটুকু না আইনী তার চেয়ে অনেক বেশি নৈতিক ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত। বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে এমন আইন ছিল না। বর্তমান সমাজের অবক্ষয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের স্থলনের ফলে এ জাতীয় বিষয়ে আইন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে আইনটি প্রণয়ন করা হয়। সমাজের সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষার অনুশীলন ও চর্চা, নৈতিকতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধসহ চরিত্র বিরাজমান থাকলে এ আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হতো না। তাই পিতা মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, তাদের প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব এবং ইহকালীন ও পরকালীন প্রতিদান ও শাস্তি এবং সার্বিক মূল্যায়ন সমাজের প্রত্যেক স্তরে বিকাশ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি আইনটিকে আরো গঠনমূলক ও কার্যকর করার মাধ্যমে পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব বোধ সৃষ্টি করা সম্ভব।
আল্লাহ তা’আলার ইবাদতের পরপরই পিতা মাতার প্রতি সদ্ব্যব্যহারের প্রতি পবিত্র কুরআনে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পিতা মাতার মাধ্যমেই মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে এ কারণে সন্তানের জীবনে পিতা মাতার অবদান অতুলনীয়। হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক আদায়ের পর বান্দার হকের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বান্দার হকের মধ্যে পিতা মাতার হক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পিতা মাতার মর্যাদা অনেক উঁচু, যা পবিত্র কুরআনের বর্ণনা থেকে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। কেননা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি পিতা মাতার অধিকারের বিষয়ে বলা হয়েছে এবং আল্লাহ তা’আলার কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পিতা মাতার মর্যাদা ও সদাচরণের বিষয়ে আলোচনা করা হলো:
পিতা মাতার প্রতি আচরণ ও ব্যবহারে বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা;য়ালা বলেন: তোমার রব ফয়সালা করে দিয়েছেন তোমরা তাঁর ইবাদত ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত কর না, পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার কর। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদেরকে “উহ” পর্যন্তও বল না এবং তাদেরকে ধমকের জবাব দিও না বরং তাদের সাথে সম্মান ও মর্যাদার সাথে কথা বল। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাক এবং দু’আ করতে থাকো এই বলে “ হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর,যেমন তারা (দয়া, মায়া, মমতা সহকারে) শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন। আল কুরআনুল কারীমের উপরোক্ত আয়াত দুটি থেকে এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
প্রথমত, আল্লাহ তা’আলার হক আদায়ের পর মানুষের উপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো পিতা মাতার প্রতি সদাচরণ করা। কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহর একত্বের পর সর্বপ্রথম নির্দেশই পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার এর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। (অসমাপ্ত)

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘নাফাকাতুন’ পরিভাষাটির সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পরিভাষা হলো ‘আল-‘আতা’ অর্থাৎ বৃত্তি, অনুদান। রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হতদারদের জন্য বায়তুলমাল থেকে যা নির্ধারণ করেন তাকে আলÑ‘আতা বা বৃত্তি বলা হয়। ‘নাফাকাহ’ ও ‘আতা’Ñ এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ‘নাফকাহ’ শরী‘আহ কর্তৃক র্ধায হয়, আর ‘বৃত্তি’ রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কর্তৃক ধার্য হয়। “আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ.১০৪”। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ তাকেযা দান করেছেন তা হতে দান করবে। “আলÑকুরআন, ৬৫:০৭”। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা। “আলÑকুরআন, ০২:২৩৩”।
আইনের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতাÑমাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোন পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে তারা আলোচনার মাধ্যমে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিশ্চিত করবেন এবং তা নিশ্চিত করার জন্য সন্তানদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে একসঙ্গে এবং একস্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৩”।
আইনের ৩নং ধারার (৪) এ বলা হয়েছে, পিতা-মাতাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাসে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না কিংবা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। ধারা ৩ (৪) নং উপধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তান তাঁর পিতাÑমাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করবে। ৩নং ধারার (৬)নং উপধারায় বলা হয়েছে, পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তান থেকে পৃথক বসবাস করলে সেক্ষেত্রে তাদের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতে হবে।
আইনের ৩নং ধারা এর (৭) নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, পিতা-মাতা সন্তানদের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তান তার মাসিক বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা ক্ষেত্র হিসেবে উভয়কে নিয়মিতভাবে প্রদান করবে।
উল্লিখিত আইনের ৩ নং ধারায় ১ থেকে ৭ পর্যন্ত মোট সাতটি উপধারায় ভরণ-পোষণের বিস্তারিত দিক নির্দেশনা ও ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যথা পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা, একাধিক সন্তানের ক্ষেত্রে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা, বৃদ্ধ নিবাসে বসবাসে বাধ্য না করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করা এবং মাসিক আয় থেকে অর্থ প্রদান করা।
৩নং উপধারায় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চত করার জন্য সন্তানকে পিতাÑমাতার সাথে একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙ্গে একক পরিবার প্রথা গড়ে ওঠছে। কর্মসংস্থানের তাগিদে গ্রাম অঞ্চল থেকে মানুষ শহরমুখী হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এ দিক নির্দেশনা অনুপস্থিত। এছাড়া কর্মজীবী সন্তানদের তাদের পিতাÑমাতার সাথে একই স্থানে বসবাস করার বিধান বাধ্যতামূলক করা হলে তা নতুন জটিলতা তৈরি করবে। উপেক্ষা নয়; সম্মান ও সহানুভূতি বজায় রেখে পিতাÑমাতাকে তাদের পছন্দনীয় আবাসস্থলেই রাখা বেশি কল্যাণজনক হবে।
৭নং উপধারায় বলা হয়েছে, পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তানের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে সে ক্ষেত্রে সন্তান তার দৈনন্দিন আয় রোজগার বা মাসিক আয় বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা-মাতাকে প্রদান করবে। এ ধারায় ‘যুক্তিসঙ্গত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে; কিন্তু এর সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ২নং ধারায় ‘ভরণ-পোষণ’ বলতে খাওয়-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধার কথা বলা হয়েছে। ৭নং উপধারায় বর্ণিত ‘যুক্তিসঙ্গত’ অর্থ দ্বারা ২নং ধরার ‘ভরণ-পোষণ’ সম্পন্ন হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ দ্বারা ভরণ-পোষণ সম্ভব না হলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে অথবা সন্তানের আয় দ্বারা তার নিজেরই খরচ সংকুলান না হলে অথবা সন্তান নিজেই যদি পিতা-মাতার উপর বোঝা হয়ে থাকেন তাহলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এর দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করা হয়নি।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি মানুষদের এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তার মা কষ্ট করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট করেই তাকে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধপান করাতে ত্রিশ মাস লেগেছে। এমন কি যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছেছে এবং তারপর চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হয়েছে তখন বলেছে: “হে আমার রব, তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে যেসব নিয়ামত দান করেছো আমাকে তার শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দাও। আর এমন সৎ কাজ করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ করো। আমার জন্য আমার সন্তানদেরকে সৎ বানিয়ে আমি তোমার কাছে তাওবা করছি। আমি নির্দেশের অনুগত (মুসলিম) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। “আল-কুরআন, ৪৬;১৫”।
আলোচ্য আয়াতে ওসিয়ত শব্দের অর্থ তাকীদপূর্ণ নির্দেশ এবং ইহসান অর্থ সদ্ব্যবহার। এর মধ্যে সেবা-যতœ, আনুগত্য, সম্মান ও সস্ত্রম প্রদর্শনও অন্তর্ভুক্ত। ‘কুরহুন’ শব্দের অর্থ সে কষ্ট যা মানুষ কোন কারণবশত সহ্য করে থাকে অথবা যে কষ্ট সহ্য করতে অন্য কেউ বাধ্য করে। এ বাক্যটি প্রথম বাক্যেরই তাকীদ। “মুফতী মুহাম্মদ শাফী রহ. তাফসীরে মা‘আরেফুল কুরআন, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (মদীনা মুনাওওয়ারাহ: বাদশাহ ফাহাদ মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩ হি.), পৃ. ১২৪৯”। অর্থাৎ পিতা-মাতার সেবা-যতœ ও আনুগত্য জরুরী হবার কারণ এই যে, তারা তোমাদের জন্য অনেক কষ্টই সহ্য করেছেন। এই আয়াতে আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইংগিত রয়েছে, তা হলো মাতার হক পিতার অপেক্ষা বেশি, যা আমরা হাদীস থেকে প্রমাণ পাই। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স.) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার উত্তম সাহচর্যের অধিকতর হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে পুনরায় বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরেও তোমার মা। সে বলল, অত:পর কে? তিনি বললেন, অত:পর তোমার পিতা। “ইমাম বুখারী, আল জামি‘ আস সহীহ, কিতাবুল আদব, বাবু মান আহাক্কান নাসি বিহুসনিস সুহবাহ, হাদীস নং ৫৬২৬”।
পিতা-মাতার সেবা করা এবং তাদের অনুগত হওয়ার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, যার মাধ্যমে জান্নাতের পথ সুগম হয়। অন্যদিকে তাদের অধিকার পদদলিত কিংবা অবহেলিত হলে তাদের অসন্তুষ্টির কারণে জাহান্নামের রাস্তাও খুলে যেতে পারে। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ। তাদের আনুগত্য করলে আল্লাহর নির্দেশ পালন করা হয়। এর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক কল্যাণ ও সওয়াব রয়েছে। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের ইহকালীন ও পরকালীন উভয় গুরুত্ব রয়েছে। এ জন্য রাসূলুল্লাহ (স.) এর একটি হাদীসে এসেছে, ইবনে উমার (রা.) বলেন, (কারো প্রতি তার) পিতা সন্তুষ্ট থাকলে প্রভুও তার প্রদি সন্তষ্ট থাকেন এবং তার পিতা অসন্তুষ্ট থাকলে প্রভুও অসন্তষ্ট থাকেন। “ ইমাম বুখারী. আল-আদাবুল মুফরাদ, অনুবাদ: মুহাম্মদ মূসা (ঢাকা: আহসান পাবলিকেশন্স, ২০০১), অনুচ্ছেদ: কওলুহু তা‘য়ালা: ওওয়াস-সাইনাল ইনসারনা বি ওয়লিদাইহি ইহসানা, পৃ.৩৩, হাদীস নং ২”।
আইনের ৪ নং ধারায় পিতার অবর্তমানে দাদাদাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানানানীকে ভরণÑপোষণের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের এই ভরণ-পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসেবে গণ্য হবে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৪”।
আইনের ৪নং ধারায় পিতার অবর্তমানে দাদাদাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানানানীকে ভরণ-পোষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোন সন্তানের পিতা ও দাদা একইসাথে বর্তমান থাকাবস্থায় পিতা অক্ষম বা অবসর জীবনযাপন করলে কিংবা পিতা আয় করতে সক্ষম না হলে উক্ত সন্তানের উপরই তার পিতা ও দাদার দায়িত্ব একই সাথে বর্তাব্ েকিনা তা বলা হয়নি। আর যদি এ অবস্থায় পিতা ও দাদার দায়িত্ব বর্তায় তাহলে তার উপর একাধিক দায়িত্ব বর্তাবে। তা পালনে সে সক্ষম না হলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।
জমহুর ফকীহ (হানাফী, শাফিঈ, হাম্বলী)Ñএর মতে, পৌত্র ও পৌত্রির উপর দাদার ভরণ-পোষণ দেয় ওয়াজিব। তিনি পিতার দিক থেকে (দাদা) হোন কিংবা মাতার দিক থেকে (নানা)। ওয়ারিস সহ বা না হন এবং অন্য ধর্মের অনুসারী হলেও। যেমন পৌত্র মুসলিম ও দাদা কাফির অথবা দাদা মুসলিম ও পৌত্র কাফির। কেননা আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ “আলÑকুরআন, ৩১:১৫”। তাদের প্রয়োজন পূরণ করা সদ্ভাবে জীবনযাপনের অংশ। হাদীসে এসেছে, ‘নিশ্চই তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের সর্বোত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমাদের সন্তানদের উপার্জন ভক্ষন করো। “আবু দাউদ (সম্পা.ইজ্জত উবাইদ দা‘আস) খ.৩, পৃ.৮০১, ইবনে মাজাহ (সম্পা.আলা হালাবী)( খ.২, পৃ.৭৬৯, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা-এর হাদীস থেকে উদ্ধৃত করেন। আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১, পৃ.৯৮”। উপরন্ত, দাদা পিতার সাথে সংযুক্ত, যদিও তিনি পিতা শব্দের আওতাভুক্ত নন। আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১, পৃ.৯৮”। (অসমাপ্ত)

 

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে পিতা-মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনায় পিতাÑমাতা তিলে তিলে নিজের জীবন ও সামর্থ্যকে ক্ষয় করে এক সময় বার্ধক্যে উপনীত হন, কর্মক্ষম হাত পাগুলো নিশ্চল হয়ে পড়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন সন্তানের উপর। তাই সন্তান যখন সামর্থ্যবান হবে, তখন পিতাÑমাতার সার্বিক ভরণ-পোষণ তাদের দায়িত্ব ও আবশ্যকীয় কর্তব্য। আইনটি এ বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম আইন। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক মুসলিম। ইসলামে ও পিতা-মাতার সার্বিক সেবাযতেœর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত আইনটির পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে। প্রবন্ধটি প্রণয়নে বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও সমালোচনামূলক গবেষণা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এ মাধ্যমে অত্র আইনের অনুষঙ্গের ইসলামী দৃষ্টিকোণ অবগত হওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ক ইসলামী আইনের সাথে তুলনা করা সম্ভব হবে।
মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তাঁর খলীফা হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন এবং তার জীবন পরিচালনার জন্য পথ দেখিয়েছেন। এজন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে মানব জতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। মানুষের পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যম হলো তার পিতা-মাতা। পৃথিবীতে একজন মানব সন্তান আগমনের পূর্বে ও পরে পিতা-মাতা তার জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের লালন পালন করেন। পিতা-মাতার মাধ্যমেই পৃথিবীতে মানুষের বিস্তার ও বংশ পরিক্রমা নির্ধারিত হয়। পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখার সৌভাগ্য মানুষ পিতা-মাতার মাধ্যমেই পেয়ে থাকে। তাই মানুষের জীবনে পিতা-মাতার স্থান ও অধিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথেই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনের বিভিন্ন স্থান আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি পিতা-মাতার অধিকারের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। সন্তানের নিকট থেকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সদাচরণ পাওয়া পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার। বিশেষভাবে তারা যখন বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হন এবং কর্মক্ষম থাকেন না, তখন তারা ভরণÑপোষণ ও সেবা-যতœ পাওয়ার জন্য সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সন্তানের কর্তব্য, তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ- এর দায়িত্ব গ্রহণ করা, অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদেরকে সঙ্গ দেয়া এবং তাদের মনে কষ্ট পাবার মতো কোন ব্যবহার না করা।
সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩ শিরোনামে একটি আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত আইনটি ২৭ অক্টোবর ২০১৩/১২ কার্তিক ১৪২০ তারিখ রবিবার রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর আইন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রাণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিস কর্র্র্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।
‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ’ আইনটি প্রণয়নের কারণ বা ব্যাখ্যা গেজেটে উল্লেখ করা হয়নি। তবে আইনে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীণ ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।’ মূলত বাংলাদেশের বর্তমান সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের স্খলনের কারণে পারিবারিক বন্ধন ও দায়িত্ববোধে শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। পিতা-মাতাসহ সমাজের বৃদ্ধ ও প্রবীণ শ্রেণীর দায়িত্ব পালন ও তাঁদের প্রতি গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে প্রায়ই পিতা-মাতার প্রতি অসদারচণের সংবাদ পরিলক্ষিত হয়, এ দেশের নব্বই শতাংশ লোক মুসলিম হলেও পরিপূর্ণ ইসলামী শিক্ষার অনুপস্থিতিতে মুসলিম সমাজে ইসলামী অনুশাসনের যথাযথ চর্চা নেই এবং ইসলামের শিক্ষা, বিধি-বিধান ও আইন পরিপালনে শিথিলতা লক্ষণীয়। এ প্রেক্ষিতে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রণীত এটিই প্রথম আইন। সাধারণ মানুষের মধ্যে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। নিম্নে আইনটির পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনা করা হলো:
“পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩” শিরোনামে আইনটি ২০১৩ সনের ৪৯নং আইন, যা সংসদ কর্তৃক গৃহীত ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মতি লাভ করেছে। উক্ত আইনে ধারা ২(ক) তে পিতা বলতে সন্তানের জনককে বুঝানো হয়েছে।
‘ভরণ-পোষণ’ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং সঙ্গ প্রদানকে বুঝানো হয়েছে। ‘সন্তানের মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণী এবং ‘সন্তান’ বলতে পিতার ঔরসে ও মাতার গর্ভে জন্ম গ্রহণকারী সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে বুঝানো হয়েছে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩, বাংলাদেশ গেজেট, রেজিস্টার্ড নং ডি, এ-১ বাংলাদেশ সরকারী মুদ্রণালয় কর্তৃক মুদ্রিত ও বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিস, তেজগাঁও, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত। আইন নং ৪৯, ধারাÑ২”
উল্লিখিত আইনে ভরণ-পোষণ অর্থ খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদানকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ, শ্রদ্ধাবোধ, কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, কষ্ট না দেয়া, তাদের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা, তাদের আনুগত্য স্বীকার করা ইত্যাদি বিষয়কে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক সময় শারীরিকভাবে কষ্টের মতোই মানসিক কষ্টও পীড়াদায়ক এবং নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে।
আইনের ২নং ধারার (ঘ) অনুচ্ছেদে ‘সন্তান’ বলতে পিতার ঔরসে এবং মাতার গর্ভে জন্ম নেয়া সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু ‘সক্ষম’ ও ‘সামর্থ্যবান’Ñএর কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। আমাদের সমাজে শিক্ষিত অনেক বেকার রয়েছেন, যারা যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। এ ছাড়া পিতা-মাতার সন্তান যদি বেকার থাকে অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরি না পায়, তাহলে এ আইনের আলোকে সে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে তার বিকল্প কোন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি। ‘সক্ষম’ ও ‘সামর্থ্যবান’-এর বয়স নির্ধারিত নেই এবং সংজ্ঞাও দেয়া হয়নি।
আইনটির ২নং ধারার আলোকে বলা যায়, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে সমান ভাবে দায়িত্ব পুরুষ ও নারীর উপর সমানভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় আর্থিক সংগতি ও দায় দায়িত্ব পুরুষ ও নারীর উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হতে দেখা যায় না। আর্থিক বিষয়ে সামর্থ্য ও দায়িত্ব পুত্র বা পুরুষগণ বেশি পালন করে থাকেন। কন্যা বা নারীগণ বিবাহ-পরবর্তী জীবনে স্বামীর সংসারের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় নারীদের কোন নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা থাকে না এবং আর্থিক সক্ষমতা সমান না হওয়া সত্ত্বেও সমান দায়িত্ব পাল কতটুকু সম্ভব তা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। যা উক্ত আইনে সুস্পষ্ট নয়।
‘পিতা ও মাতা’Ñএর সংজ্ঞায় ইসলামী ফিক্হ বিশ্বকোষ ‘আলÑমাওসূ‘আতুল ফিকইহয়্যাহতে বলা হয়েছে, পিতা এর অর্থ জন্মতাদা, যার বীর্য থেকে আরেকজন মানুষ জন্মগ্রহণ করে। এর আরবী প্রতিশব্দ হল ‘আব’। ‘আব’ শব্দটির কয়েকটি বহুবছন রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হলো ‘আবা’। পরিভাষায়, এমন ব্যক্তিকে পিতা বলা হয়, সরাসরি যার শরীয়তসম্মত স্ত্রীর সাথে যৌন সংসর্গের ভিত্তিতে আরেক মানুষ জন্মগ্রহণ করে। যে নারী অপরের সন্তানকে দুধ পান করায়, সাধারণত তার স্বামীকেও দুধপানকারীর পিতা বলা হয়। “আব্দুল মান্নান তালিব (প্রধান সম্পা.) আল-মাওসূ‘আতুল ফিকইহয়্যাহ, ইসলামের পরিবারিক আইন(ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিচার্স এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার, ২০১২), খ.১, পৃ.৯১”। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: মুহাম্মাদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী। “আল-কুরআন, ৩৩:৪০”।
অভিধানে কোন কিছুর মূলকে উম্মুন বা মাতা বলা হয়। ‘উম্মুন’ অর্থ মাতা; জননী। আরবীতে শব্দটির বহুবচন ‘উম্মাহাত’ ও ‘উম্মাত’। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম শব্দটি মানজাতির জন্য এবং দ্বিতীয় শব্দটি জীবজন্তুর জন্য ব্যবহৃত হয়। ফকীহগণ বলেন, যে নারীর গর্ভ থেকে মানুষ জন্মলাভ করে তিনি সেই মানুষের প্রকৃত মাতা। আর যে নারীর সন্তান কাউকে জন্ম দেয় সেই নারীও রূপকার্থে তার মাতা। পিতার মা হলে তিনি দাদী এবং মায়ের মা হলে তিনি নানী। যে মহিলা কোন শিশুকে দুধ পান করান, অথচ তাকে গর্ভে ধারণ করেননি, তিনি তার দুধমাতা। “আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, পৃ.৮৪” পবিত্র কুরআনে এ শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আর আমি মূসা-এর মায়ের প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম যে, তাকে দুধ পান করাতে থাক। “অলÑকুরআন, ২৮:০৭”
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্মদান করেছেন। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মার্জনাকারী ও ক্ষমাশীল। “আল-কুরআন, ৫৮:০২”। আরবীতে জন্মদাতা ও জন্মদাত্রীকে যাথাক্রমে ওয়ালিদ ও ওয়ালিদাহ বলা হয়। অতএব পিতা-মাতার সংজ্ঞা ক্ষেত্রে এ আইন ও ফকীহগণের মতামতের মধ্যে পার্থক্য নেই।
‘ভরণ-পোষণ’ শব্দটির আরবী প্রতিশব্দ হলো নাফাকাতুন। এর অর্থ হলো খরচ, ব্যয়, জীবন নির্বাহের ব্যয়, খোরপোষ। পরিভাষায়, ‘নাফাকাহ’ বা খোরপোষ হলো অপচয় ছাড়া যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ জীবনধারাণ করে। “আলÑমাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ,১০৩”। অর্থাৎ যা জীবন ধারণের ভিত্তি। সুতরাং জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদাসমূহ তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বল, ‘তোমরা যে সম্পদ ব্যয় করবে, তা পিতা-মাতা, আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য। আর যে কোন ভাল কাজ তোমরা কর, নিশ্চয় সে ব্যাপারে আল্লাহ সুপরিজ্ঞাত। “আল-কুরআন ০২:২১৫”। (অসমাপ্ত)

রামাদান মাসের ফযীলত আদায়ে সঠিক নিয়ম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত উসিলার শিরক ও লক্ষ্য করা যায় যেখানে এখনও অনেক মুসলিম বিশ্বাস করেন আল্লাহ তা’য়ালাকে পেতে হলে মাধ্যম ধরা লাগে, গবফরধ লাগে। এটা একটি শিরিকী বিশ্বাস, কুফুরী বিশ্বাস, কাফের মুশরিকদের বিশ্বাস যে আল্লাহকে পেতে হলে গবফরধ লাগবে, মাধ্যম লাগবে। মক্কার কাফের-মুশরেকরাও মূর্তির উপাসনা করতো এজন্যে যে, এ সকল মূর্তির মাধ্যমে তারা আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য হাছিল করবে। সূরা আয যুমারের ৩ নং আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “জেনে রাখো! আল্লাহ তা’য়ালার জন্যেই একমাত্র ইবাদত। আর যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যেই তাদের (মূর্তিগুলোর) ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ তা’য়ালার নিকটবর্তী করে দিবে”। আল্লাহ তা’য়ালাকে পাবার জন্যে কোন মিডিয়ার প্রয়োজন নাই, তিনি সরাসরি দেখেন, সরাসরি শুনেন ও সরাসরি জানেন। আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে আল্লাহ বলে ডাক দিব সাথে সাথে আল্লাহ তা’য়ালা আরশে আযীম থেকে বান্দাহ বলে জবাব দিবেন। সূরা মুমিন এর ৬০ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “আর তোমাদের বর বলছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব”। সরাসারি আল্লাহর সাথে ঈড়হহবপঃরড়হ, মাঝখানে কোন পি. এস. আল্লাহ পাক রাখেন নাই। সূরা আল বাক্বারার ১৮৬ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “যখন আমার বান্দাহ আমার সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তার অতি নিকটে। আহ্বানকারী যখন আহ্বান করে তার আহ্বানে সাড়া দিই”। এখনও আমরা মুখ থেকে আল্লাহ শব্দ বের করি নাই অন্তরে শুধু কল্পনা করছি তখনও আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের নিকটে। সুতরাং এত নিকটে আল্লাহ তা’য়ালা থাকা সত্ত্বেও সেই আল্লাহ তা’য়ালাকে পাবার জন্যে, সে আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করার জন্যে কোন মাধ্যম কোন উসিলার দরকার নাই। এ উসিলার ধারণা মক্কার কাফের-মুশরেকদের ধারণা। কিন্তু এ উসিলার পিছনে পড়ে আমাদের দেশের অসংখ্য মুসলিম লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন শুধু আল্লাহ তা’য়ালাকে পাবার জন্যে অথচ এটা একটি শিরকি কার্যক্রম।
তারপর শুভ-অশুভ কুলক্ষণে বিশ্বাস করা আমাদের দেশের কিছু মুসলিমদের চিরাচরিত অভ্যাস। শনিবারে, মঙ্গলবারে কোন ভাল কাজ করা যাবে না, এ দিনগুলো ভাল না, অমুক দিন বিয়ে-সাদি করা যাবে না, অমুক মাসে এটা করা যাবে না, জন্ম মাসে এটা করা যাবে না, অমুক দিন গাছ কাটা যাবে না, অমুক দিন ওটা করা যাবে না, এভাবে অসংখ্য বিষয় রয়েছে, এ সবই শির্কী বিশ্বাস। গণকের কাছে যাওয়া, গণকের বিশ্বাসও মুশরিকদের একটা কাজ। আমাদের দেশের অনেক মুসলিম এখনও গণকে, রাশিতে বিশ্বাস করেন, বিভিন্ন তারকাপূজারীদের কথাবার্তা বিশ্বাস করেন। শুধু তাই না, এদেশের অসংখ্য মুসলিমদের গলায়, হাতে, কোমরে তাবিজ-তুমার পাওয়া যায়। এই তাবিজ-তুমার গলায়, হাতে, কোমরে নিয়ে রামাদান মাসে যত রোযা পালন করেন, যত তারাবীহ্ আদায় করেন, যত লাইলাতুল ক্বদর করেন কিছুই আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে ফায়দা আসবে না। কোরআনুল কারীম দিয়েও তাবিজ ব্যবহার করা যাবে না। কোরআন আল্লাহ তা’য়ালা তাবিজ-তুমারের জন্যে নাযিল করেন নাই। নবী (সাঃ) এর পুরো জিন্দিগীতে তাঁর হাত মোবারক দিয়ে বা কোন সাহাবীর হাত দিয়ে একটি কোরআনের আয়াতও লিখে কাউকে দেন নাই যে, তুমি এ আয়াতটি হাতে বেঁধে রাখো, গলায় বেঁধে রাখো, গলায় ঝুলে রাখো, কোমরে বেঁধে রাখো। এ রকম তথ্য কোন একটা জাল হাদিসেও আসে নাই। তাহলে যে কোরআনুল কারীমকে নবী (সাঃ), সাহাবায়ে কেরাম এ কাজে ব্যবহার করেন নাই সে কোরআনকে এ কাজে ব্যবহার করা শিরক। এরপর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা করা শিরক। আমাদের দেশে অনেক কবরের কাছে গেলে দেখা যায় মানুষ ঐ কবরে সেজদা করছে। মান্নত করছে বিভিন্ন কবরের উদ্দেশ্যে, মাজারের উদ্দেশ্যে। সন্তান চাচ্ছে, বিপদ আপদ থেকে মুক্তি চাচ্ছে, এটা সেটা চাচ্ছে, এ সবই শির্কী কার্যক্রম। এ শির্কী কার্যক্রম যাদের মাঝে আক্বীদাগত ও আমলগত থাকবে তারা যতই সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদত করুক নবী (সাঃ) বলেন, আল্লাহ পাক তাদের কোন গুনাহ মাফ করবেন না।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলোঃ এহতেছাবের সাথে সিয়াম (রোজা) পালন করতে হবে। কোরআন ও সুন্নায় এহতেছাব তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম অর্থটি হলো, আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি এবং রহমত পাবার উদ্দেশ্যে যে কোন ইবাদত, যে কোন আমল করতে হবে, অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকা যাবে না। এটাকে বলা হয় এহতেছাব। সূরা আল বাকারার ২০৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “মানুষের মধ্যে এমনও কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদেরকে তাঁর কাছে বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ পাক এ ধরনের বান্দাদের প্রতি স্নেহশীল”।
নিজের যত কষ্ট হোক, নিজের কষ্টকে কষ্ট মনে না করে আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমের সামনে নিজেকে মাথা নত করে দেয়া। সূরা আল বাকারার ২১৮নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরত করেছে ও যারা আল্লাহ তা’য়ালার রাস্তায় জিহাদ করেছে এ মানুষগুলো আল্লাহ তা’য়ালার রহমতের প্রত্যাশা করে। এ মানুষগুলোর প্রতি আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। তাহলে ঈমান আনা, হিজরত করা, জিহাদ করা, আমলে সালেহ করা, সিয়াম পালন করা, কিয়াম করা, লাইলাতুল ক্বাদর করা, সমস্ত ইবাদত করতে হবে আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, অন্য কোন উদ্দেশ্যে করা যাবে না, এটার নাম হলো এহতেছাব। এহতেছাবের আরেকটা অর্থ হলো আল্লাহ তা’য়ালাকে একমাত্র সাহায্যকারী হিসাবে যথেষ্ট মনে করা। সূরা আল আনফালের ৬৪ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “হে নবী, আপনার জন্যে এবং আপনাকে যেসকল মু’মীনেরা অনুসরণ করেন তাদের সকলের জন্যে আমি আল্লাহ তা’য়ালাই যথেষ্ট”। এ আয়াত থেকে বুঝা যায় মু’মীনদের মধ্যে সবাই নবীর অনুসরণ করেন না, এজন্যে বলা হয়েছে মু’মীনদের মধ্য থেকে যারা আপনার অনুসরণ করে তাদের জন্যে আমি আল্লাহ তা’য়ালাই যথেষ্ট। তাই আল্লাহ তা’য়ালাকে যথেষ্ট মনে করা এটি হলো এহতেছাব। সূরা আত্ তাওবার ১২৯নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “যদি তারা আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আপনি বলুন, আমার জন্যে আল্লাহ তা’য়ালাই যথেষ্ট”। এহতেছাবের আরেকটা অর্থ হলো কষ্টের মধ্যে, বিপদের মধ্যে সবর ধৈর্যধারণ করা। রামাদান মাসের সিয়াম পালন করা এটা কিন্তু স্বাভাবিকভাবে একটা কষ্টের বিষয়। কিন্তু ঈমানের কারণে আমাদের কাছে কষ্ট লাগে না, বরং মজা লাগে, ভাল লাগে। কিন্তু যাদের ঈমানের দুর্বলতা আছে, ঈমানে গন্ডগোল আছে তাদের জন্যে কিন্তু এ রোযা পালন করা, এ ক্বিয়াম করা, এ লাইলাতুল ক্বাদর করা অনেক কষ্টকর। এজন্যে রামাদান আসার পরে প্রথম ৪/৫ দিন তারাবীহ এর নামাযে আমাদের দেশের মসজিদগুলিতে জায়গা হয় না। কিন্তু ৫/৭ দিন অতিবাহিত হবার পর দেখা যায় মসজিদগুলি আস্তে আস্তে খালি হতে থাকে। আবার দেখা যায় রমাদানের শেষের দিকে ২৬/২৭ তারিখে তারা মসজিদে আসেন। মাঝখান দিয়ে থাকতে না পারার কারণ হলো এহতেছাব নাই, সবর নাই, কষ্টের মাঝেও এ ইবাদত করার মত ধৈর্য নাই। এই সবরের নাম হলো এহতেছাব। সূরা বাক্বারার ১৫৩নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “হে মু’মিনগণ, ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”। সূরা বাক্বারার ১৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। অতএব, (হে নবী) তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও”।
তৃতীয় শর্তটি শুধু সিয়ামের সাথে সম্পৃক্ত নয় এটা সকল ইবাদত কবুল হওয়ার জন্যে শর্ত আর তা হলো হালাল রিযিক তথা হালাল উপার্জন। রিযিক হালাল না করে, সুদ-ঘুষ না ছেড়ে রামাদান মাসে সিয়াম, কিয়াম ও লাইলাতুল ক্বাদর করলে তা কোন কাজে আসবে না। পরিবার পরিজনের জন্যে যে আয় করা হচ্ছে এবং যা ব্যয় করা হচ্ছে তা বৈধ পন্থায় অর্জিত হচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে। ঈদের সময় কেনাকাটার জন্যে যে টাকা পয়সা খরচ করা হচ্ছে সেসব টাকা পয়সা কোন পন্থায় অর্জিত হচ্ছে তা দেখতে হবে। এটা না করে রামাদান মাসে যত সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদর, হাজার হাজার মানুষকে ইফতার করানো হোক না কেন, যাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করা হোক না কেন আল্লাহ তা’য়ালা এর মাধ্যমে বিন্দুমাত্র ফায়দা দিবেন না। সহীহ আল মুসলিমের হাদিসে নবী (সাঃ) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ “আল্লাহ তা’য়ালা পূতপবিত্র, হালাল রিযিক ছাড়া কোন ব্যক্তির ইবাদত তিনি কবুল করেন না”। হালাল রিযিক অন্বেষণ করা থেকে কোন নবী রাসূলকেও আল্লাহ তা’য়ালা মুক্তি দেন নাই। সূরা আল মুমিনুনের ৫১ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “হে রাসূল! হালাল রিযিক খাও, তারপর আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করো”। যেসব নবী রাসূল মা’সুম বেগুনাহ, যাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুনাহসমূহ আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষমা করে দিয়েছেন তাদেরকেও হালাল রিযিক খাওয়ার জন্যে আল্লাহ তা’য়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ আগে হালাল রুজির ব্যবস্থা করে তারপর আমলে সালেহ তথা ভাল আমল করতে হবে। এজন্যে নবী রাসূলেরা প্রত্যেকে কেউ কামারের পেশা, কেউ কুমারের পেশা, কেউ দর্জির পেশা, কেউ ছাগল চরানোর পেশা, ইত্যাদি সব পেশা নবী রাসূলরা গ্রহণ করে হালাল রিযিকের ব্যবস্থা করে আল্লাহ তা’য়ালার দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। সহীহ আল মুসলিমে বর্ণিত হাদিস, নবী (সাঃ) বলেন, “কোন মোসাফির মরুভূমির রাস্তা দিয়ে হাটছেন, তার জামা-কাপড় ময়লা, তার দাড়ি উস্ক খোস্ক হয়ে আছে, এমন অবস্থায় আছে যে, সে আল্লাহ তা’য়ালাকে আল্লাহ বলে ডাক দিবার আগেই আল্লাহ তা’য়ালা বলেন বান্দাহ আমি হাজির। এ রকম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে থাকা সত্ত্বেও নবী (সাঃ) বলছেন, “এ লোক বলছেন, হে আমার রব! হে আমার রব! কিন্তু তার খাবার হারাম, তার পানীয় হারাম, তার গেজা হারাম, কেমন করে আল্লাহ তা’য়ালা তার ডাকে সাড়া দিবেন”? এরকম দোয়া কবুলের ঘনিষ্টতম মুহূর্তে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তা’য়ালা তার ডাকে সাড়া দেন না। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদিস হযরত ইউসুফ বিন আসবাত (রাহঃ) বলেন, কোন যুবক যখন ইবাদতে মনোনিবেশ করে, তখন শয়তান নিজের সহকর্মীদেরকে বলে, খোঁজ নাও লোকটি কী খায়! সে যদি হারাম খায়, তাহলে সে যত ইচ্ছা ইবাদত করে ক্লান্ত হোক, বাধা দিও না। কেননা সে নিজেই নিজের ইবাদত ধ্বংসের জন্যে যথেষ্ট। হারাম খাওয়া অব্যাহত রেখে ইবাদত তার কোন কাজে আসবে না।” সুতরাং এ রামাদান মাসের ফযিলত, রহমত, বরকত, মাগফিরাত লাভ করতে হলে আমাদের রিযিক হালাল করতে হবে। প্রয়োজনে হালাল রিযিকের মাধ্যমে আমাদের যতটুকু খাবার অর্জিত হয় তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, হারাম বর্জন করতে হবে।
প্রসঙ্গত : রামাদান মাসের কিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহ নামাযের রাকাতের সংখ্যা নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু বিতর্ক লক্ষ্য করা যায়। এ বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার বড় কারণ হলো তারাবীহ নামায সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা। ক্বিয়ামুল লাইল বা তারাবীহ এর নামায নবী (সাঃ) রাত্রির প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগে আদায় করতেন। নবী (সাঃ) এশার নামাজের পরে রামাদান মাসে অল্প কিছুক্ষণ সময় ঘুমাতেন, এরপর উঠে তিনি ক্বিয়ামে রমাদান/ক্বিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহ এর নামাজ আদায় শুরু করতেন। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ আল মুসলিমে বর্ণিত যে হাদিসটি ইমাম বুখারী (রাহঃ) তারাবীহ নামাযের অধ্যায়ে বর্ণনা করেন, হযরত আবু সালামাহ ইবনু আব্দুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) রামাদানে ও রামাদানের বাইরে জীবনে কোন দিন ১১ রাকাতের বেশী ক্বিয়ামুল লাইল নামাজ আদায় করেন নাই। কিন্তু নবী (সাঃ) এর এ ১১ রাকাত কেমন ছিল, কত সুন্দর ছিল সে সম্পর্কে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, “নবী (সাঃ) এর এ নামাজ কত সুন্দর ও কত লম্বা হতো সে সম্পর্কে তুমি আমাকে প্রশ্ন করো না”। অর্থাৎ নবী (সাঃ) এর এ ১১ রাকাত নামায এত লম্বা সময় ধরে আদায় করতেন যা শেষ হতে প্রায় ফজর ওয়াক্ত হয়ে যেত। এশার নামাজের ১ বা ২ ঘণ্টা পরে শুরু করতেন, শেষ হতে ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যেত, সাহরীর সময়ের শেষ দিকে চলে যেত, তিনি ফজরের পূর্ব মুহূর্তে তাড়াতাড়ি সাহরী খেতেন। এর আগ পর্যন্ত নবী (সাঃ) ক্বিয়ামে রামাদান আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরামের সময় এশার পরে ক্বিয়ামে রমাদান শুরু হয়ে সেই ফজর পর্যন্ত সারা রাত চলতো এই ক্বিয়ামে রমাদান। এরপর তাবেয়ীনের কেরামের আমলেও এ রকম তারাবীহ নামাযে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে কষ্ট হতো। হাদিসের মধ্যে এসেছে এত লম্বা কেরাত পড়া হতো যে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না, তখন অনেকে হাতের মধ্যে লাঠি নিয়ে তার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে এ তারাবীর নামাজ আদায় করতেন।
পরবর্তীতে মক্কা মোকাররমায় যে সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন, তাবেয়ীনে কেরাম ছিলেন তাঁরা চিন্তা করলেন এভাবে আট রাকাতে এ রকম লম্বা কেরাতে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর। আট রাকাতে যদি ৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাহলে প্রতি রাকাতে প্রায় ৪৫ মিনিট। তাই তাঁরা গবেষণা (ইজতেহাদ) করলেন যে, নবী (সাঃ) তো আমাদেরকে বলেন নাই যে আমি আট রাকাত তারাবীহ এর নামাজ পড়ি তোমদেরকেও আট রাকাত পড়তে হবে। নবী (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি রমাদান মাসে ক্বিয়াম (তারাবীহ) করবে, কয় রাকাত পড়বে তা নির্দিষ্ট করেন নাই। তখন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা এর রাকাতের সংখ্যা বাড়িয়ে দিই, ৬ ঘণ্টাই তারাবীহ হবে, তবে ৬ ঘণ্টায় ৮ রাকাতের পরিবর্তে ২০ রাকাত তারাবীহ পড়বো। মক্কা মোকাররামার সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনে কেরাম তাঁরা এই তারাবীহ এর আট রাকাতকে বৃদ্ধি করে ২০ রাকাতে করে নিলেন যাতে ১ রাকাতে ৪৫ মিনিটের পরিবর্তে ১ রাকাতে ২০ মিনিট দাঁড়াবেন বা ২৫ মিনিট দাঁড়াবেন যাতে এর রাকাতের সংখ্যা বেড়ে যায় মাঝখানে একটু উঠানামা করলে দাঁড়াতে কষ্টটা কম হবে। এজন্যে মক্কা মোকাররামায় তারাবীহকে পরবর্তীতে ২০ রাকাতে বাড়ানো হলো। আর মদীনা মুনাওয়ারাতে যে সকল সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীনে কেরাম ছিলেন তাঁরা বললেন না, ২০ রাকাতেও কষ্ট হয়। তাই মদীনা মুনাওয়ারাতে এটাকে ৪০ রাকাতে বৃদ্ধি করা হলো। ইমাম মালেক (রাহঃ) মাসজিদে নববীর যখন ইমাম ছিলেন তখন তিনি ৩৮ রাকাত তারাবীহ পড়াতেন এবং ৩ রাকাত বিতর পড়াতেন, অর্থাৎ মাসজিদে নববীতে সর্বমোট ৪১ রাকাত তারাবীহ ও বিতর পড়াতেন। তাই তারাবীহ এর নামাজ ৮ রাকাত থেকে শুরু করে ৩৮ রাকাত বা ৪০ রাকাত পর্যন্ত পড়ার হাদীস পাওয়া যায়। অর্থাৎ ক্বিয়ামে রামাদান (তারাবীহ) কত রাকাত হবে এটা নবী (সাঃ) নির্দিষ্ট করেন নাই, আল্লাহ তা’য়ালা ও নির্দিষ্ট করেন নাই।
কয় রাকাত তারাবীহ আদায় করা হলো এটা মুখ্য বিষয় না, মুখ্য বিষয় হলো তিনি কতক্ষণ সময় ধরে তারাবীহ আদায় করলেন। তিনি কি ক্বিয়ামে রামাদান ৫ ঘণ্টা যাবৎ আদায় করলেন, ৩ ঘণ্টা যাবৎ আদায় করলেন নাকি ২ ঘণ্টা যাবৎ আদায় করলেন? এটাই হলো আল্লাহ তা’য়ালার নিকট মুখ্য বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায় ঐটা বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিষ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করেন যা শয়তানের ওয়াছওয়াছা, শয়তানের কাজ। এটা কোন জরুরী কোন বিষয় না যে, তারাবীহ ৮ রাকাত হবে নাকি ২০ রাকাত হবে। কিন্তু তারাবীহ ৪০ রাকাত হবে এটা নিয়ে কেউ বিতর্ক করেন না, কথাবার্তাও বলেন না, এবং এটা আমরা অনেকে শুনিও নাই যে তারাবীহ ৪০ রাকাত পড়া যায়, অথচ মাসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনে কেরাম ৪০ রাকাত পর্যন্ত তারাবীহ আদায় করেছেন। তাহলে ২০ রাকাত কেন আমরা ৪০ রাকাত তারাবীহ ও পড়তে পারি। কিন্তু শর্ত হলো আমরা যেভাবে দ্রুতগতিতে তারাবীহ পড়ি এভাবে পড়া যাবে না। তারাবীর নামাজ আদায় করতে হবে কোরআনে কারীমের তেলাওয়াত সহীহ তাজবীদ সহকারে স্পষ্ট করে উচ্চারণের মাধ্যমে। আমাদের দেশে যেভাবে দ্রুতগতিতে তারাবীর নামাজ আদায় করা হয়, কিছুই বুঝা যায় না কী তেলাওয়াত হচ্ছে? একটা শব্দ, একটা বাক্য সুন্দর করে বুঝা যাচ্ছে না, যেখানে টানার কখা সেখানে টান নাই, যেখানে টানার দরকার নাই সেখানে লম্বা টান। আমাদের দেশে তারাবীর নামাযের তেলাওয়াতের মধ্যে শেষে লম্বা টান শুনা যায়, মাঝখানে আর কোন লম্বা টান শুনা যায় না, অথচ মাঝখানে ৪ আলিফ, ৩ আলিফের অনেক টান আছে কিন্তু এ টান আর শোনা যায় না। শেষে ৭ আলিফ, ১০ আলিফ পর্যন্ত একটা লম্বা টান দিয়ে রুকুতে চলে যায়। আমাদের দেশে যে হাফেজ সাহেব যত তাড়াতাড়ি তারাবীহ পড়াতে পারেন ঐ হাফেজ সাহেবের পদবীও তত বেশী যে ওনি খুব ভাল হাফেজ, একেবারে আধা ঘণ্টায় তারাবীহ শেষ করে ফেলেন, খুব গরম হাফেজ। অথচ তিনি কোরআনুল কারীমকে ধ্বংস করলেন, ইসলামকে ধ্বংস করলেন। এজন্যে তারাবীহ নামাজের ক্ষেত্রে কত রাকাত পড়া হচ্ছে, কত পারা তেলাওয়াত হয়েছে এটা মুখ্য বিষয় না, মুখ্য বিষয় হলো কতক্ষণ সময় ধরে এই কিয়ামে রামাদান আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আদায় করা হলো, এটাই হলো আল্লাহ তা’য়ালার নিকট মুখ্য বিষয়।
নবী (সাঃ) ক্বিয়ামে রামাদানের শুধু ফযিলত বর্ণনা করতেন, নির্দেশ দিতেন না। কারণ তিনি নির্দেশ দিলে সেটা আদায় করা উম্মতের জন্যে ওয়াজিব হয়ে যাবে এ আশংকায়। নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে নিয়মিত জামায়াতের সাথে তারাবীহ এর নামায আদায় করতেন না। কারণ তিনি আশংকা করতেন আল্লাহ তা’য়ালা যদি আমার এ উম্মতের উপর ক্বিয়ামে রামাদানকে ফরজ করে দেন তাহলে আদায় করা উম্মতের কষ্ট হবে।
রাসূল (সাঃ) হলেন উম্মতের জন্যে রাহমাতুল্লিল আলামীন, রাউফুর রাহীম। তিনি সর্বদা চিন্তা করতেন এ উম্মতের জন্যে দ্বীনকে/ শরীয়তকে কত সহজ করা যায়, কত হালকা করা যায়। যেসকল শ্রমিক ভায়েরা রামাদান মাসে রোজা রেখে দিনের বেলায় কাজ করেন, রিকশা চালান, ইট ভাঙ্গেন, কঠিন পরিশ্রমের কাজ করেন, আল্লাহ তা’য়ালা যদি এ রকম উম্মতের জন্যেও যদি ক্বিয়ামে রামাদান (তারাবীহ) আদায় করা ফরজ করে দেন তাহলে উম্মতের কষ্ট হবে। দিনের বেলায় কষ্ট করে রোজা রেখে রাতের বেলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারাবীহ আদায় করা তাদের জন্যে কষ্টকর। এজন্যে নবী (সাঃ) নিয়মিত সাহাবাদেরকে নিয়ে জামায়াতের সাথে তারাবীহ এর নামাজ আদায় করেন নাই। জামে আত তিরমীযিতে পাওয়া যায় মাত্র ৩ দিন বা ৪ দিন নবী (সাঃ) মাসজিদে নববীতে সাহাবাদেরকে নিয়ে জামায়াতের সাথে তারাবীহ আদায় করেছিলেন। (সমাপ্ত)

রামাদান মাসের ফযীলত আদায়ে সঠিক নিয়ম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এখানে আমাদের মৌলিক সমস্যা হয় দুটি বিষয়ের ঈমানের ক্ষেত্রে, একটা হলো আল্লাহ তা’য়ালার ক্ষেত্রে, আরেকটা হলো তাক্বদীরের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিম আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ও তাক্বদীরের প্রতি ঈমানের মর্মার্থ বুঝেন না বা জানেন না। অমুসলিমদেরও আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস আছে। একজন অমুসলিমকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনাকে সৃষ্টি করেছেন কে? উত্তরে তিনি যে নামেই বলুক, তিনি কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালাকেই বুঝাবেন। তাহলে তিনিও আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন। তাহলে ঐ ব্যক্তি ঈমানদার না কেন? আমরা তাকে মু’মিন বলি না কেন? তাই বুঝা গেল তাদের ঈমান আর আমাদের ঈমান এক জিনিস না। তাদের ঈমান হলো আল্লাহ তা’য়ালা আছেন এটা তারা বিশ্বাস করেন, কিন্তু আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করি তাওহীদের ভিত্তিতে। তাদের ও আমাদের আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমানের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো তাওহীদ। আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করি একত্ববাদের ভিত্তিতে, আর তারা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন বহুত্ববাদের ভিত্তিতে। যেমন হিন্দু সমাজ আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন, পাশাপাশি সরস্বতীর, দুর্গার, শ্রীকৃষ্ণের, কালির, ইত্যাদিসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও মা’বুদের পূজা করেন। কিন্তু আমরা এ সবগুলোকে বাদ দিয়ে খালেছভাবে কেবল আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করি। সূরা ফতিহার ৪ নং আয়াতে নামাযের প্রতি রাকাতে সে ঘোষণাই আমরা দিই, “(হে আল্লাহ) আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য চাই”, তাদের ও আমাদের মাঝে ঈমানের পার্থক্য হলো এই জায়গায়। এজন্যে নবী (সাঃ) আরেকটি হাদিসে বলেনঃ “ইসলাম ৫টি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তন্মধ্যে প্রথমটি হলো আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া সত্যিকারের আর কোন মা’বুদ নাই এবং মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহ তা’য়ালার রাসূল”। তাই এই স্বীকৃতিটা দিতে হবে তাওহীদের ভিত্তিতে, আল্লাহ তা’য়ালার একত্ববাদের ভিত্তিতে, শিরক মুক্ত হয়ে, তাঁর কোন শরীক নেই এই ভিত্তিতে।
একজন হিন্দু যেমন বিশ্বাস করেন আল্লাহ তা’য়ালা সমস্ত জ্ঞানের মালিক, কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালা নিজে জ্ঞান বন্টন করেন না, স্বরস্বতিকে দায়িত্ব দিয়েছেন জ্ঞান বন্টন করার জন্যে। সুতরাং জ্ঞান পাবার জন্যে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সরাসরি যাওয়ার দরকার নেই, সরস্বতির কাছে গেলেই জ্ঞান পাওয়া যাবে। তাই হিন্দুরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বাদ দিয়ে সরস্বতির পূজা করেন জ্ঞান লাভ করার জন্যে। তারা বিশ্বাস করেন সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেন আল্লাহ তা’য়ালা, কিন্তু সম্পদ দিবার ক্ষমতা আল্লাহ তা’য়ালা দুর্গাকে দিয়েছেন। তাই তারা আল্লাহ তা’য়ালাকে বাদ দিয়ে দুর্গার পূজা করেন সম্পদ লাভের জন্যে। এভাবে তাদের বিশ্বাস বিভিন্ন দেব-দেবীকে বিভিন্ন ক্ষমতা ও দায়িত্ব আল্লাহ তা’য়ালা দিয়েছেন যার কারণে তারা সে সকল দেব দেবীর পূজা করেন। এসব দেব-দেবী কিন্তু কোন খারাপ মানুষের নামে দেব দেবী না, হয় কোন ফেরেশতার নামে, হয় কোন নবী রাসূলের নামে, হয় কোন অলী আওলিয়ার নামে। এ রকম মূর্তির ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু দায়িত্ব তাদেরকে দেয়া হয়েছে সুতরাং এদেরকে ধরলে, এদের পূজা করলে, এদের কাছে গেলে ঐ সকল জিনিস পাওয়া যাবে।
একইভাবে আমরা মুসলিম সমাজেও দেখি কিছু মুসলিম বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু তাঁর নবী রাসূল (সাঃ) কে দিয়েছেন, কিছু অলী আউলিয়াদেরকে দিয়েছেন, কিছু বিশেষ বিশেষ বান্দাদেরকে দিয়েছেন, কিছু ফেরেশতাদেরকে দিয়েছেন, কিছু জিবরাঈলকে দিয়েছেন, কিছু মালাকুল মাউতকে দিয়েছেন ইত্যাদি। এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ শিরক যেটা ঐ হিন্দু সমাজের বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়। তাই কোন জায়গায় যদি শুনা যায় যে, এখানে আল্লাহ তা’য়ালার একজন অলীর কবর আছে, শুধু তাই না কুকুর একটা জবাই করে যদি কবর দিয়ে লিখে দেয়া হয় অমুক শাহ্ এর মাজার, অমুক আউলিয়ার মাজার, তখন মুসলিমেরা ওখানে টাকা ফালাচ্ছে, তারপর নজর-নেওয়াজ, মান্নত, গরু, ছাগল, খাসী, ইত্যাদি নিয়ে দৌড়া-দৌড়ি শুরু করে দেয়। কেন দৌড়াচ্ছে? মূল উদ্দেশ্য হলো ঐ কবরে যে কুকুর, যে মানুষ, যে অলী শায়িত আছেন ঐ কবরওয়ালাকে ঐ মানুষটাকে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, নাউযুবিল্লাহ। তাই সেখানে টাকা-পয়সা, গরু-ছাগল, মান্নত করলে ঐ কবরওয়ালা আমাকে দিতে পারবেন। সে মরার পরও কবরে বসে বসে এগুলো ঈড়হঃৎড়ষ করছেন, আল্লাহ তা’য়ালার নিয়ে সে বসে আছেন। একজন হিন্দুর যে মানের ঈমান, ঠিক একই মানের ঈমান হয়ে গেছে আমাদের কিছু মুসলিমের। তাহলে এ আক্বীদার অধিকারী, এ বিশ্বাসের অধিকারী মুসলিম রামাদান মাসে যত রোজা, যত তারাবীহ্, যত লাইলাতুল ক্বদর পালন করুক না কেন নবী (সাঃ) বলেন, এ রকম মুসলিম কোন ধরনের ফায়দা, কোন ধরনের সাওয়াব পাবেন না। এজন্যেই নবী (সাঃ) হাদিসে শর্ত দিয়েছেন ঈমান ও এহতেছাবের। আগে ঈমান ঠিক করতে হবে। রোজার চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব বেশী। রোজার কারণে যদি কেউ জাহান্নামে যায়, সে জাহান্নামে স্থায়ীভাবে থাকবে না, এক সময় জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর তিনি জান্নাতে যাবেন। কিন্তু ঈমানের কারণে যদি জাহান্নামে যায় তাহলে এ লোক জান্নাতে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরের চেয়ে ও ঈমানের গুরুত্ব বেশী। তাই আগে ঈমান শিখতে হবে, ঈমান জানতে হবে।
মক্কায় রাসূল (সাঃ) যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতেন আবু জেহেল, আবু লাহাবেরাও আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করতো। কিন্তু তারা বিশ্বাস করতো আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু কিছু মানুষকে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালার ঘরে তাওয়াফ করার সময় আমরা বলি, “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাকা।” আল্লাহ তা’য়ালা এই তালবিয়্যাহ আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু সহীহ মুসলিমে এসেছে মক্কার মুশরেকেরা, আবু জেহেল, আবু লাহাবেরা যখন আল্লাহ তা’য়ালার ঘর তাওয়াফ করতো তখন তারা বলতো “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা ইল্লা শারিকান হুয়া লাকা তামলিকুহু ওমা মালাকা” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তোমার ঘরে আমরা হাজির। তোমার সাথে কোন শরীক নাই, তবে ঐ সমস্ত শরীক আছে যাদেরকে তুমি নিজেই ক্ষমতাবান বানিয়েছ”। মক্কার কাফের-মুশরেকরাও কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁর সাথে আরো কয়েকজনকে শরীক করে নিয়েছেন। তাদের মতে, আমরা কিন্তু কোন শরীক বানাই নাই, আমাদের কোন দোষ নাই, আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই তাদেরকে শরীক বানিয়েছেন, তাঁর কিছু ক্ষমতা, কিছু কার্যকলাপ পরিচালনা করার জন্যে তাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এ রকম বিশ্বাস ওয়ালা মুসলিম রামাদান মাসে সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদত করলে কোন ফায়দা হবে না। কেননা নবী (সাঃ) শর্ত দিয়েছেন ঈমান ও এহতেছাব। এজন্যে ঈমানের সাথে কোন শিরক মিশ্রিত রাখা যাবে না, র্শিক থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সূরা আন্ নিসার ৪৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। র্শিক ছাড়া অন্যান্য পাপ আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছা করলে যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহ তা’য়ালার সাথে শিরক করে সে অবশ্যই মহা পাপ রচনা করে”। সূরা আল মায়েদায় আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার সাথে কাউকে শরীক করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম”। আল্লাহ তা’য়ালার স্পষ্ট ঘোষণা শিরক করলে সে গুনাহ আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না । শিরক বাদে যত গুনাহই হোক আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। (অসমাপ্ত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সিয়াম-সাধনার মাসে মুমিনের করণীয়

আতিকুর রহমান নগরী

প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য চেষ্টা করতে হয়। চেষ্টা-সাধনা ছাড়া কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব হয় না। ঠিক তেমনিভাবে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্যও প্রয়োজন যথাসাধ্য প্রচেষ্টা। এজন্য মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কতিপয় কাজ নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং কেবল তাঁর ইবাদতের আদেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বিশেষ ইবাদত হ’ল রামাযানের সিয়াম, যা আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর ফরয করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হল, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে
পার’ (বাক্বারাহ ১৮৩)। রমজানের সিয়াম আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের জন্য একটি বিশেষ নেয়ামত। আর তা পালনের অফুরন্ত প্রতিদানও মহান আল্লাহর নিকটে রয়েছে। হাদীছে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘সিয়াম স্বতন্ত্র, তা আমারই জন্য। আর আমিই তার প্রতিদান দিব’। তাই রহমত, বরকত ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ এ মাসে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে। মাহে রমজানের কার্যাবলীকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন- ১. আত্মিক কার্যাবলী ২. বাহ্যিক কার্যাবলী। নিম্নে এগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হল- ১. আত্মিক কার্যাবলী : (ক) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাক্সক্ষা : প্রত্যেক ছায়েমের উচিত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সিয়াম পালন করা। কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
করা না হ’লে তা কবুল হবে না। রমজানের সিয়াম পালন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাধনা। কেননা এ ইবাদতে লোক দেখানোর অহেতুক অভিলাষ থাকে না। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করার মাধ্যমেই বান্দা তার কাক্সিক্ষত পুরস্কার লাভ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, করার জন্য একদিন সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ
জাহান্নামকে তার নিকট হত একশত বছরের পথ দূরে সরিয়ে দিবেন’। (খ) আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টা : রমজান মাস হচেছ আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাস। সকল পাপাচার- অনাচার দূরে ঠেলে দিয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করার মাধ্যমে নেকী অর্জনের মাস। কেননা মাহে রামযানের মূল আবেদনই হল সর্বোত্তমভাবে আল্লাহমুখী হওয়া। তাই প্রত্যেক ঈমানদারের অবশ্য কর্তব্য হ’ল এ মাসে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতি অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার’ (বাক্বারাহ ১৮৩)। রমজান মাস হচ্ছে অধিক নেকী অর্জনের মাস। তাই প্রত্যেক ঈমানদারের উচিত এ মাসে বেশী বেশী নফল গালাত আদায় করা এবং পুণ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। কেননা মানবজাতি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ইবাদতে অত্যন্ত গাফেল থাকে; কিন্তু এ মাসে শয়তান মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে না। কারণ আল্লাহ এ মাসে শয়তানকে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের আগমন ঘটলে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়’। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্যই কর্তব্য এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ মাসে বেশী বেশী নফল সালাত আদায় করা ও নিজের জন্য জান্নাতের দ্বার খুলে নেয়া। পবিত্র কুরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে শ্রেষ্ঠ উপহার। এটি নাযিল হয়েছে রমজান মাসে। ফলে রমজান মাস বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি রমজান মাসে কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানব জাতির হিদায়াতের জন্য ’ (বাক্বারাহ ১৮৫) । তাই কুরআন নাযিলের মাস হিসাবে সকলের উচিত এ মাসে বেশী বেশী কুরআন তেলাওয়াত করা।
রজব-শাবান থেকে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে বরকত কামনা করে আমরা মুসলিম উম্মাহর ইবাদতের বসন্তকাল পবিত্র মাহে রমজানে পৌছেছি। ফরজ-নফল ইবাদতে মনোনিবেশের পাশাপাশি সেহরি-ইফতারও আমরা সেই পালনকর্তার হুকুম পালনার্থে তাঁর দেয়া রিযিক দ্বারা সেরে থাকি। সাহরি ও ইফতার রমজানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সাহরি ও ইফতার রমজানের আবহ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি এক বিশেষ নিয়ামত। এটি পালন শুধু কর্তব্য নয়, আনন্দও বটে। এতে আল্লাহর প্রতি বান্দাহর আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। সাহরি ও ইফতারের আনুগত্যের এ দৃষ্টান্ত সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে সাহরি ও ইফতার কোনোটিই মানুষের মনগড়া বিধান নয়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এর যথেষ্ট তাকিদ রয়েছে। সাহরি খাওয়া প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা রাতের অন্ধকার প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত পানাহার কর।’ (বাকারা-১৮৭) সাহরি চৈন্তিক দৃষ্টিতেই কেবল গুরুত্বের দাবি রাখে না, বরং তা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সুন্নত। এতে বরকত রয়েছে, রয়েছে অনেক ফজিলতও। সাহরি খাওয়া সম্পর্কে হযরত রাসূলে করিম (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরি খাওয়ার মধ্যে রয়েছে বরকত।’ হোক না সামান্য একটু পানি, রুটি, খেজুর কিংবা শরবত। তবুও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ মহান সুন্নত থেকে বিমুখ না হওয়ার তাকিদ এসেছে। এমনকি
কেউ যদি যেকোনো কারণে সময়মত উঠে সাহরি না খেতে পারে তার জন্যও রাসূল (সা.)-এর বাণী, ‘তোমাদের কেউ যখন ফজরের আজান শোনে, আর এ সময় তার হাতে খাদ্যের পাত্র থাকে, সে যেন আজানের কারণে খাদ্যগ্রহণ বন্ধ না করে, যতক্ষণ না সে স্বীয় প্রয়োজন পূর্ণ করে।’ (আবু দাউদ) রোজাদারদের প্রতি আল্লাহতায়ালা কঠিন কোনো নীতি গ্রহণ করেননি। বরং রোজাদারদের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য তিনি দেরি করে সাহরি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করার নির্দেশ করেছেন। ইফতার রোজাদারের জন্য একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। ইসলামি পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থেকে সূর্যাস্তের পর কিছু খেয়ে বা পান করে রোজা সমাপ্ত করার নামই ইফতার। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করা সুন্নত। এর আগমুহূর্তে খাবার সামনে নিয়ে বসে থাকাও মুস্তাহাব। তবে সময় হয়ে গেলে দেরি না করে দ্রুত ইফতার গ্রহণ করাই উত্তম। খেজুর বা খোরমা দিয়ে ইফতার করা সুন্নত। না হলে অন্য কোনো ধরনের মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য বা শুধু পানি দিয়ে হলেও ইফতার করা যায়। এর ফজিলত ও তাকিদ দিয়ে রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ দ্রুততার সীমা রক্ষা করে ইফতার করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।’ অন্য হাদিসে তিনি বলেন, মানুষ ততদিন কল্যাণের পথে থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।’ (বুখারি)
সাহরি দেরিতে করা উত্তম। নবী করিম (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামেরও এমনটিই আদত-অভ্যাস ছিল। যদি কেউ আগেভাগে সাহরি খেয়ে ফেলে তবে সে নিজের পক্ষ থেকেই রোজার সময় বাড়িয়ে নিল। এতে তার অনেক কষ্টও হতে পারে। অবশ্য আল্লাহতায়ালা এমনটি নির্দেশ দেননি। তার এ মনগড়া অভ্যাসের জন্য সে গুনাহগার হবে। ইফতারের এ বিধান ইসলাম ধর্মেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য। ইফতারের এ আনন্দ, তৃপ্তি ও পরম সুখ অনুভব অন্য যেকোনো ধর্মের জন্য ঈর্ষণীয় ব্যাপার। ইফতারে ভ্রাতৃত্ববোধ, অন্তরনিঃসৃত ভালোবাসার ছোঁয়া এবং আধ্যাত্মিক ভাবের যে প্রতিফলন ঘটে, তা
সত্যিই প্রশংসনীয়। ইসলামে রোজার জন্য ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটা সময়সীমা বাধা আছে। কেউ যদি বেশি ফজিলত পাবার আশায় বিলম্বে ইফতার করে, তবে সে ভুল করবে। কেননা বিলম্ব করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ইফতার করে ইহুদি-খ্রিস্টানরা। এজন্য তারা বঞ্চিত হয়েছে ইফতারের বরকত ও আল্লাহর রহমত থেকে। কেননা সাহরির মতো ইফতারেরও অনেক ফজিলত রয়েছে, এমনকি অন্যকে ইফতার করানোর মধ্যেও রয়েছে সীমাহীন পুণ্য। ইফতারের আগমুহূর্তে আল্লাহতায়ালা মানুষের দোয়া কবুল করেন। তাই এ সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করে উভয় জাহানের কল্যাণ অর্জনের বিকল্প নেই।

রামাদ্বান দ্বারপ্রান্তে যা যা করণীয়

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

প্রকৃত মু’মিন আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও সর্বাত্মকভাবে তাঁর আনুগত্যে নিজের জীবন অতিবাহিত করে। শেষ নিঃশ্বাস অবধি এ ধারা অব্যাহত রাখে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: (হে নবী) ইয়াক্বীন (মৃতু) আসা পর্যন্ত আল্লাহর বন্দেগীতে অব্যাহত থাকুন। এছাড়াও আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিশেষ বিশেষ কিছু সময় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে দান করেছেন, যাতে করে সে সময়গুলোতে একটু অতিরিক্ত নেক আমল করে আমাদের ছওয়াবের পরিমাণকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারি। নেকী অর্জনের এমনি ধরনের এক গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হচ্ছে রামাদ্বানুল মোবারক। এ গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমটি পদার্পণ করছে আমাদের দারপ্রান্তে। মহা সম্মানিত এ মেহমানকে স্বাগত জানাতে আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রিয় নবী (সাঃ) প্রায় দু’মাস পূর্ব থেকে এ মেহমানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিতেন। রজব মাস এলেই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকতেন: “হে আল্লাহ আমাদেরকে রজব ও শাবানের মধ্যে বরকত দান করুন, আর রামাদ্বান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন।”-(তাবারানী)
জীবনে আরেকটি রামাদ্বান পাওয়া কতই না সৌভাগ্যের ব্যাপার। গত বছর অনেকে রামাদ্বানে আমাদের আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে রমাদ্বান রেখেছিলাম। আজ আমাদের মাঝে অনেকেই নেই। আগামী রমাদ্বান আমাদের পাওয়ার সৌভাগ্য হবে কি? এটা আল্লাহই ভালো জানেন। আর যদি আল্লাহপাকের একান্ত দয়ায় পেয়ে যাই, তাহলে তার জন্য আমরা কি প্রস্তুতি গ্রহণ করছি? প্রিয় নবী (সাঃ) একবার শাবানের শেষ প্রান্তে এসে বিশেষভাবে সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রামাদ্বানের গুরুত্ব, ফযীলত ও আমল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন :
“হে জনতা! একটি পবিত্র মাস তোমাদের দ্বারপ্রান্তে সমাগত। এমন মাস যাতে রয়েছে লাইলাতুল ক্বাদর। হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ মাসটির দিনে রোযা রাখাকে আল্লাহ ফরয করে দিয়েছেন। আর রাতের বেলায় ইবাদত বন্দেগী করাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছেন। কেউ এ মাসে যে কোন ভাল কাজ করলে তার সওয়াব হবে অন্য মাসের ফরযের সমান।আর একটি ফরয আঞ্জাম দিলে তার সওয়াব হবে অন্য মাসের ৭০টি ফরযের সওয়াব। এটি হচ্ছে সবরের মাস। আর সবরের পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। এটি সমবেদনার মাস। এ মাসে রিযিক বাড়িয়ে দেয়া হয়। কেউ এ মাসে রোযাদারকে ইফতার করালে তা তার গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়া ও জাহান্নাম থেকে তার গর্দান মুক্ত হওয়ার কারণ হয়ে যাবে। এবং রোযাদারের সমপরিমাণ সওয়াব হবে, তবে এতে রোজাদারের তার নিজের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সবার যে রোযাদারকে ইফতার করানোর সক্ষমতা নেই। তিনি বললেন, এমন বিপুল সওয়াব সে ব্যক্তিকেও দান করা হবে, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে দুধ, খেজুর এমনকি শুধু পানি দিয়ে হলেও ইফতার আপ্যায়ন করাবে। যে ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত রোজাদারকে ইফতারের সময় পানি পান করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাওযে (কাওছার) থেকে এমন পানীয় পান করাবেন, যার ফলে জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে আর কোনদিন তৃষ্ণার্ত হবে না। কেউ যদি এ মাসে তার ক্রীতদাস (এমনকি কর্মচারী/চাকর)-এর কাজ কমিয়ে দেয় আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেবেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেবেন। এ মাসের প্রথম হচ্ছে রহমত। মধ্যখানে রয়েছে মাগফিরাত। আর শেষ দিকে রয়েছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি। এ মাসটিতে তোমরা ৪টি কাজে বেশি বেশি অভ্যস্ত হতে সচেষ্ট হও। প্রথম দুটোর মাধ্যমে তোমাদের প্রভু সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আর শেষ দুটো না করে তোমাদের কোন উপায় নেই। যে দু’অভ্যাস দিয়ে তোমাদের প্রভুকে সন্তুষ্ট করবে তা হচ্ছে ১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহের সাক্ষ্য দেয়া আর ২. আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করতে থাকা। আর যে দুটো না করে তোমাদের কোন উপায় নেই তা হচ্ছে ৩. আল্লাহর কাছে জান্নাতের আবেদন করতে থাকা এবং ৪. জাহান্নাম থেকে পানাহ চাইতে থাকা। (সাহাবী সালমানের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন বায়হাকী ও ইবনে খোযাইমা)
এমন মহান একটি মাস আমাদের দ্বারে সমাগত। এ মাসের অফুরন্ত ফায়দা নেয়ার জন্য আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দুনিয়াবী ব্যস্ততা যতদূর পারা যায় কিছু কমিয়ে দিতে হবে। নবী কারীম (সাঃ) রামাদ্বান এলে প্রাত্যহিক সাংসারিক ও দুনিয়াবী ঝামেলা কমিয়ে দিতেন, যাতে বেশি বেশি করে ইবাদত করার সুযোগ পাওয়া যায়। সলফে সালেহীনও তা-ই করেছেন। ইমাম যুহরী (রঃ) বলেছেন, “রামাদ্বান আসা মানেই হলো বেশি বেশি তেলাওয়াতে কুরআন ও অন্যকে খাওয়ানোর প্রচেষ্টা।” অনেকেই মসজিদে বসে থাকতেন আর বলতেন, রোজাকে পাহারা দেই, বাইরে গিয়ে কারো গীবত চর্চায় ব্যস্ত হওয়া থেকে। রোযা আসলে আমরাও কিছুটা প্রস্তুতি নেই। তবে, আমাদের প্রস্তুতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের। আমাদের অনেকেই দেখা যায়, রোজার প্রারম্ভে খাদ্য সম্ভারের সমাহারে ঘর ভর্তি করে নেয়া। এমনকি দোকানপাট পর্যন্ত খালি হয়ে যায়। সারা দিনের অভুক্ত থাকার বদলা নেয়ার জন্য ইফতারে রাতের বেলায় এবং সেহরীতে দ্বিগুণ তিনগুণ উদরস্থ করার মানসিকতা। রামাদ্বান এসেছে খাওয়া কমাতে, অথচ আমাদের কেনাকাটা দেখলে মনে হয় রামাদ্বান যেন এসেছে খাবার বাড়িয়ে দিতে। আর এ সুযোগে আমাদের দেশে তো ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে গরীবের নাভিশ্বাস সৃষ্টি করে দেয়। রামাদ্বান আসে মু’মিনকে ঘুমকমিয়ে সদা তৎপর হতে সাহায্য করতে। অথচ অনেকেই দিনের অর্ধবেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে অলসভাবে কাটিয়ে দেন। মূল্যবান সময়গুলো যদি ঘুমেই কেটে যায়, তাহলে কি পাবো রামাদ্বানের নেয়ামত থেকে। তাই, আসুন আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করি, কিভাবে আগত রামাদ্বানের সদ্ব্যবহার করে আমাদের নেকীর পরিমাণ বাড়িয়ে নিতে পারি। আল্লাহপাক আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।
রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের সুবাস নিয়ে বছর ঘুরে আবারো আমাদের নিকট এসেছে মাহে রামাদ্বান। বেশি বেশি করে ইবাদাত করা আর গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার আর একটা সুযোগ পেয়েছি আমরা। এরপর আর একটা সুযোগ কি আসবে আমাদের জীবনে? এমনতো হতে পারে যে এটা আমাদের জীবনের শেষ রামাদ্বান। তাহলে আসুন পরিকল্পনা গ্রহণ করি কিভাবে এবারের রামাদ্বানে সর্বোচ্চ ফায়দা অর্জন করতে পারি। অন্তরে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার জন্য প্রথমে আবারো চোখ বুলিয়ে নেই রোজা ও রামাদ্বানের ফযীলত ও গুরুত্ব সংক্রান্ত কিছু হাদীসের উপর। রাসুলে কারিম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, আদম সন্তান প্রতিটি ভাল কাজের প্রতিদান দশগুণ থেকে সাত শতগুণ পর্যন্ত বর্ধিত হয়। আল্লাহতাআলা বলেছেন, “তবে রোজা, সেটা তো আমার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তার প্রতিদান আমি নিজেই দিব। আমার (সন্তুষ্ট হাসিলের) উদ্দেশ্যে রোজাদার পানাহার থেকে বিরত থেকেছে… রোযাদারের মুখ থেকে নির্গত দুর্গন্ধ আল্লাহপাকের নিকট মিশকের সুগন্ধের চেয়েও প্রিয়-(বুখারী)। একমাসের সিয়াম সাধনের মত এক নাগাড়ে এত দীর্ঘ ইবাদাতের সুযোগ আমাদের জীবনে আর দ্বিতীয়টি নেই। দিনের বেলায় সিয়াম সাধনা। আর রাতের বেলায় কেয়ামুল্লাইল অর্থাৎ নামাযে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কুরআন তেলাওয়াতের সুযোগ নিয়ে রামাদ্বান আসে বার বার আমাদের কাছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন “রাসূল করিম সাঃ) ইরশাদ করেছেন রোযা এবং আল কুরআন উভয়ে বান্দার জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। রোযা বলবে হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো থেকে নিবৃত্ত রেখেছি। আল কুরআন বলবে হে প্রভু, আমি তাকে রাতের বেলা ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। উভয়ে বলবে, হে প্রভু তার ব্যাপারে আমাদের সুপারিশ কবুল করুন। আল্লাহপাক তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করে নিবেন”-(আহমদ)। আবু সাইদ আল খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন, “কেউ যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি রোযা সম্পন্ন করে, সে একটি দিনের কারণে আল্লাহ তার চেহারা থেকে জাহান্নামে’র আগুনকে সত্তর বছর দূরে নিয়ে যান”।-(আহমদ) সহুল বিন সা’দ (রাঃ) বর্ণনা করেন, “রাসূল কারিম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, জান্নাতে একটি বিশেষ ফটক রয়েছে, তার নাম হচ্ছে রাইয়ান। সেখানে থেকে ডাক দেয়া হবে। রোজাদারগণ কোথায়? সর্বশেষ রোযাদারের প্রবেশ সম্পন্ন হলে ফটকটি বন্ধ করে দেয়া হবে।-(বুখারী ও মুসলিম)।
আল্লাহর কাছ থেকে কতনা অবারিত সুসংবাদের সুবাস নিয়ে হাযির হয় রামাদ্বান প্রতিবার আমাদের কাছে। আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার রামাদ্বান মাসের আগমন হলে নবীজি আমাদের লক্ষ্য করে বলেন, “বরকতময় একটি মাস তোমাদের নিকট এসে গেছে, যে মাসে সিয়াম সাধনা তোমাদের উপর ফরয করে দেয়া হয়েছে। এ মাসটিতে জান্নাতের প্রবেশ দ্বারগুলো খুলে রাখা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলোকে বন্ধ করে রাখা হয়, শয়তানগুলোকে শিকল দিয়ে বন্দি করে রাখা হয়। এ মাসে রয়েছে এমন একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত, সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত”।-(আহমদ, নাসাঈ, বায়হাকি) অন্য হাদীসে এসেছে, রামাদ্বানের আগমন ঘটার সাথে সাথে একজন ফেরেশতা ডাকতে থাকে হে সুকর্ম সন্ধানী, সুসংবাদ গ্রহণ করো। আর হে দুষ্কৃতি সন্ধানী বিরত হও। রামাদ্বান শেষ হওয়া পর্যন্ত এ ডাক চলতে থাকে-(তিরমিযী, ইব্ন্ মাজাহ, ইবন্ খোযাইমাহ)।
রামাদ্বানের উদ্দেশ্য ও তাহা হাসিলের উপায়? সিয়াম সাধনার প্রক্রিয়া, প্রবৃত্তির চাহিদা ও রিপু দমনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যে আত্ম সংশোধনের সৃষ্টি হয় তা একজন মু’মিনকে মুত্তাক্কী পর্যায়ে উন্নত করে। আর এই তাক্কওয়া অর্জন সিয়াম সাধনার প্রকৃত উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাক্কারার ১৮৩ নং আয়াতে রোজার নির্দেশ করে বলেছেন, “আশা করা যায় এর মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে তাক্কওয়া সৃষ্টি হবে”। বছরের পর বছর যদি আমরা রোজা রাখতেই থাকি কিন্তু আমাদের মধ্যে তাক্কওয়া অর্জন হয়না তাহলে রোজার মূল উদ্দেশ্য থেকে আমরা বঞ্চিতই থেকে যাব। আংশিক ছওয়াব পেলেও আমরা পুরো ছওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকবো। শুধু পানাহার আর সহবাস থেকে বিরত থাকলেই প্রকৃত রোযা হয়না। প্রকৃত রোজা হচ্ছে নিজের নফস্ ও শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় পরিচালিত করা। যাবতীয় গুনাহ বা অন্যায়ের কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে মিথ্যা কথা, অন্যায় কাজ ও জাহেলী তৎপরতা থেকে নিজেকে বিরত রাখেনা, আল্লাহর কোন দরকারই নেই সে শুধু খানাপিনা থেকে বিরত থাকবে। (বুখারী) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, কিছু রোজাদার এমন রয়েছে যে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছাড়া তাদের রোজার আর কিছুই নেই-(আহমদ)। এমনকি নিজে তো মিথ্যা, অন্যায় এবং এ জাতীয় গুনাহ থেকে বিরত থাকবেই, অন্য কেউও যদি তাকে অন্যায়ভাবে প্ররোচিত করে, সেখানেও তাকে আত্মসংযমের পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে। তিনি এরশাদ করেছেন আরেকটি হাদীসে, ‘তোমাদের কেউ যেদিন রোযা রাখে সেদিন যে কোন মন্দ কথা উচ্চারণ না করে, গালমন্দ না করে, আর কেউ যদি তাকে অন্যায় কথা বলে বা গালমন্দ করে সে যেন বলে দেয় আমি রোজাদার-(বুখারী)। এ আত্মসংযমই হচ্ছে রোযার মূল শিক্ষা। সাহাবায়ে কেরাম এভাবেই রোজার মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন। হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “তুমি যখন রোজা রাখবে, তখন যেন তোমার কর্ণ ও চক্ষু রোজা রাখে, তোমার কণ্ঠও যেন রোজা রাখে মিথ্যা এবং যাবতীয় গুনাহ থেকে। প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকো। রোজার দিনটিতে তুমি ভাবগম্ভীর ও প্রশান্ত থাকার চেষ্টা কর। রোজার দিনটি এবং রোজা ছাড়া দিনটি যেন তোমার একই রকম না হয়ে যায়”।
মোদ্দাকথায়, দেহ এবং আত্মা উভয়ে মিলে যে রোযা রাখে সেটাই হচ্ছে প্রকৃত রোজা। সে রোজার মাধ্যমেই আল্লাহর কাছ থেকে অর্জিত হবে অফুরন্ত মাগফিরাতের সুসংবাদ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রামাদ্বান মাসের রোজা রাখে তার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রামাদ্বান মাসে রাতে ইবাদতে মশগুল থাকে, তার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।-(বুখারী/মুসলিম)
ঈমান ও ইহতিসাব দ্বারা বুঝানো হয়েছে-রোজাকে আল্লাহ যে ফরয করেছেন তার সতেজ উপলব্ধি সহকারে তা পালন করা। আল্লাহর কাছ থেকে অফুরন্ত পুরস্কারের প্রবল আকাংখা সহকারে পালন করা। রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছার কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকা। শুধু গৎ বাঁধা অভ্যেস হিসেবে নয়, বা সবাই যেহেতু রোজা রাখবে কাজেই আমারও না রেখে গতি নেই। অথবা পেট উপোষ রাখলে স্বাস্থ্যবিদদের দৃষ্টিতে অনেক ফায়দা আছে- এসব কিছুর কারণে নয়, সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হুকুম পালনের পরাকাষ্ঠা নিয়ে। সিয়াম সাধনার এ নির্ভেজাল রূপটির নাম হচ্ছে ঈমান ও ইহতিসাব। ক্বিয়ামুল্লাইল অর্থাৎ তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদও অনুরূপভাবে ঈমান ও ইহতিসাবের সহিত আদায় করতে হবে। ঘন ঘন করে কতকগুলো রুকু সিজদা দিয়ে অনেকগুলো রাকয়াতের ফিরিস্তি তৈরী করা ক্বিয়ামুল্লাইলের সার্থকতা নয়। সার্থকতা হচ্ছে খুশু খুযুসহ ভাবগম্ভীর পরিবেশে দীর্ঘ ক্বিয়ামে লম্বা কিরাত ও সময় নিয়ে ধীর স্থিরভাবে রুকু সিজদা করে আল্লাহর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের সুযোগ গ্রহণ করা। খতম তারাবীহ হলেই হবে না। কুরআনকে অবশ্যই তাজবীদ সহকারে হৃদয়ঙ্গম করে তিলাওয়াত করতে হবে। চাই খতম হোক আর না হোক। রকেটের গতিতে কুরআন খতম এবং খতম তারাবীর এ নি®প্রাণ রেওয়াজ অনেকের কাছে একটা ঠুনকো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ক্বিয়ামুল্লাইলের প্রাণ এবং আল্লাহর কালামের তেলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য তাতে হারিয়ে গেছে। মযলুম তেলাওয়াতের শিকার এ কুরআন কিয়ামতের দিন সুপারিশ করা তো দূরে, বরং তেলাওয়াতকারীর বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করে বসবে।
আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের প্রত্যাশায় রামাদ্বানের রোযা, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ এবং কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি আরেকটি নেক আমলকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আদায় করতে হবে। আর সেটি হচ্ছে দান খয়রাত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ আমলটিকে রামাদ্বানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “নবীজী (সাঃ) ছিলেন সবচেযে বেশি দানশীল”। আর রামাদ্বান মাস এলে হযরত জিবরাঈল (আঃ) যখন তাঁর সাথে দেখা করতে আসতেন, তাঁকে নিয়ে কুরআন পাঠের অনুশীলন করতেন, তখন তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) রামাদ্বানের প্রতিটি রাতেই নবীজি (আঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন। কুরআন পাঠের অনুশীলন করতেন। জিবরাঈল (আঃ)র সাথে সাক্ষাতের সময়গুলোতে তিনি মেঘবাহী বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। অন্য রেওয়াতে এসেছে, কেউ কিছু চাওয়ামাত্র তিনি তা দান করে দিতেন-(আহমদ), কারণ জান্নাতের আকাক্সক্ষা থাকলে অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় অবারিতভাবে দান করতে হবে। আলী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, “জান্নাতে এমন কিছু প্রাসাদ রয়েছে যেগুলো এত সুন্দর করে তৈরী করা হয়েছে যে সেগুলোর বাইরে থেকে ভিতরের সবকিছু দেখা যাবে এবং ভিতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখা যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, কাদের জন্য সে সুযোগ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)? তিনি বললেন, ঐসব লোকদের জন্য যারা মিষ্টভাষী, অন্যদেরকে আহার সরবরাহ করে, সর্বদা রোজা পালন করে আর রাতের অন্ধকারে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে নামাযে দাঁড়িয়ে যায়”। (আহমদ/ইবনে হাব্বান/বায়হাকী)
রামাদ্বানে উপরোল্লিখিত নেক আমলগুলোর পাশাপাশি আরোও যে আমলটার সুযোগ বেশি করে নিতে হবে সেটা হচ্ছে তাওবা এবং ইস্তেগফার। রোযা ও অন্যান্য নেক আমলের কারণে এ মাসে বান্দার প্রতি আল্লাহর করুণা অনেক বেড়ে যায়। বান্দাও এ মাসে তুলনামূলকভাবে গুনাহ কম করে এবং বেশি করে নেক আমলের কারণে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলে অনেকখানি এগিয়ে যায়। আর এটাই মোক্ষম সময় আল্লাহর কাছে তাওবাহ করার, গুনাহসমূহ ছেড়ে দেয়ার খাঁটি অঙ্গীকার করে অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর মাফ চাওয়ার। রামাদ্বানের প্রথম বিশ দিনের তুলনায় শেষের দশ দিনের আমলকে আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। দশ দিনের ঐ বিশেষ সুযোগের মধ্যেই নিহিত রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও সেরা লাইলাতুল ক্বদরে রাতটি। যা লুকিয়ে রয়েছে পাঁচটি বেজোড় রাতের যে কোন একটি রাতে। তাই ঐ পাঁচটি রাতের আমল অবশ্যই অন্য রাতের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত। আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রামাদ্বানের শেষ দশটি দিন এলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কোমরে কাপড় বেঁধে নামতেন, রাতে ইবাদতে মশগুল হয়ে েেতন, পরিবারের অন্যান্যদেরকেও জাগিয়ে দিতেন।-(বুখারী/মুসলিম)
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, তিনি এ দশদিনে এত বেশি আমল করতেন যা তিনি অন্যান্য সময় করতেন না।-(মুসলিম) লাইলাতুল ক্বাদরকে পাওয়ার জন্যই এ দশদিনে ইতিফাক করতেন এবং এত আমল করতেন। তিনি এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিছাবের সাথে লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদত করবে তার অতীত গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী/মুসলিম) আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমি যদি লাইলাতুল ক্বাদর পাই তাহলে কোন দোয়া বেশি পড়বো? বিললেন, বলো, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী।-(তিরমিযী) অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি খুবই পছন্দ করেন, অতএব আমাকে মাফ করে দিন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রামাদ্বানের এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।