বিভাগ: ইসলামের আলো

নারীর রূপসৌন্দর্য্যরে উৎপত্তি এবং বিকাশ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

পর্দা শব্দটি দীর্ঘকাল পর্যন্ত স্বয়ং মুসলমানদের জন্যেই অপরিচিত এবং অস্পষ্টবোধক ছিল। অবস্থা ও যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পর্দার বিভিন্ন অর্থ বের করা হয়। সুতরাং অনেক লোক বিভ্রান্তি বশতঃ পর্দার অর্থ বলতে নারীকে অন্ধকার ঘরে বসিয়ে রাখাকে বুঝিয়েছে, যেখান থেকে নারী যেন কোথাও আসতে বা যেতে না পারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ক্ষেত্রে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, বিয়ের পর মেয়েরা শুধু নিজের পিতৃগৃহ ছাড়া আর কোথাও যাতায়াত করতে পারতো না এবং স্বামীর গৃহ থেকেই শেষবারের মতো তার জানাযা বের হতো। এটাকে তারা তাদের পারিবারিক আভিজাত্যের প্রতীক মনে করতো এবং এটা ছিল তাদের কাছে বিশেষ প্রশংসনীয় বিষয়। এ ধরনের বিদঘুটে অবস্থায় নারী যদি কোন মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়তো তাহলে এমনকি ডাক্তারকে ও রুগিনীকে দেখার অনুমতি দেওয়া হতো না। কেবল মেয়ের পিতা, ভাই এবং শ্বশুর তাকে দেখার সুযোগ পেতো। এছাড়া রুগিনীকে কেউ দেখতেও পেত না, তা কেউ ডাক্তার হোক বা কোন নিকটাত্মীয়।
কোন কোন ক্ষেত্রে এই কড়াকড়ি কিছুটা কম ছিল। সেক্ষেত্রে মেয়ে নিকটাত্মীয়দের বাড়ী যাতায়াত করতে পারতো। তবে এই আসা যাওয়ার অনুমতি ছিল শুধু রাতের বেলায় কারণ তখন তার উপর পর-পুরুষের দৃষ্টি পড়ার আশঙ্কা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। আর ধনী পরিবারের মেয়েরা পালকি বা পশুচালিত যানবাহনে যাতায়াত করতো। কিন্তু এসব পালকি ও যানবাহনের দরজা জানালা খুব ভালো করে বন্ধ রাখা হতো। যদি দরজা জানালা না থাকতো তাহলে পুরো পালকি বা বাহনটিকে কাপড় দিয়ে মুড়ে দেওয়া হতো।
যাই হোক, পদব্রজে হোক বা যানবাহনে উভয় অবস্থাতেই নারীকে কড়া পর্দার বিশেষ ব্যবস্থা মেনে চলতে হতো। কাপড়ের উপর আরো কাপড় ঢেকে তার পুরো অস্তিত্বটাকে এমনভাবে ঢেকে দেওয়া হতো যে, আপাদমস্তক শরীরের সবকিছুই পুরু পর্দার অন্তরালে হারিয়ে যেতো এবং পর্দাটা এতই লম্বা হতো যে, তার একটি অংশ মাটিতেই লুটোপুটি খেতো। এই কঠোর পর্দা ব্যবস্থা আজও কোথাও কোথাও পরিলক্ষিত হয়। পর্দার এই স্ব-প্রবর্তিত ব্যবস্থা শহরের ও গ্রামের ধনী ও অভিজাত লোকদের একটি ফ্যাশনে পরিণত ছিল।
সুতরাং বিখ্যাত আধুনিকতাবাদী কাসেম আমীন বেগের মতো লোকেরা যখন নারী স্বাধীনতার পতাকা তোলেন তখন সমাজে পরিচালিত এ ধরনের কঠোর পর্দা ব্যবস্থারই সমালোচনা করে একে ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেন এবং এও বলেন, যে এটা ইসলামের নির্দেশিত মানবিক সাম্যের বিরোধী, কারণ এতে করে নারীর ব্যক্তিত্ব খর্ব হয়। এসব যুক্তির বুনিয়াদের উপর তাঁরা চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সমাজকে নিজেদের পক্ষে দলভুক্ত করেন।
উম্মুল মোমেনিনদের পর্দা :  সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, পুরো কোরআন শরীফে পর্দা সম্পর্কে একটিমাত্র আয়াত রয়েছে। আর এ আয়াত উম্মুল মোমেনিন অর্থাৎ প্রিয়নবীর (সা:) স্ত্রীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। এর পটভূমিতে রয়েছে সেই বিখ্যাত ঘটনা যা কোরআনের ব্যাখ্যাকাররা তাঁদের তফসীর গ্রন্থসমূহে উল্লেখ করেছেন। কোরআনের পর্দা সংক্রান্ত সেই আয়াতটি হচ্ছে- ‘হে ঈমানদারগণ! নবীর গৃহসমূহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো না, খাবার সময়ও উঁকি দিও না। তবে হ্যাঁ, তোমাদেরকে যদি খেতে ডাকা হয় তাহলে অবশ্যই আসবে। যখন খাবার খেয়ে নেবে তখন চলে যাবে। কথাবার্তায় লেগে থেকো না। তোমাদের এ সব ব্যবহার নবীকে দুঃখ দেয় কিন্তু তিনি লজ্জার কারণে কিছু বলেন না, আর আল্লাহ সত্যকথা বলতে লজ্জা করেন না। নবীর স্ত্রীদের কাছে যদি তোমাদের কিছু চাইতে হয় তাহলে পর্দার পেছন থেকে চেয়ে নিও। এটা তোমাদের এবং তাদের মনের পবিত্রতার জন্যে উত্তম পন্থা। তোমাদের জন্যে এটা কখনো বৈধ নয় যে, আল্লাহর রাসূলকে দুঃখ দেবে এবং তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীদের সাথে বিয়ে করাও বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে বিরাট পাপ। তোমরা কোন কথা প্রকাশ কর বা গোপন কর- আল্লাহ সব কথাই জানেন।” (আহ্যাব-৫৩)
এই আয়াতকেই পর্দার আয়াত বলা হয়। এই আয়াত অবতরণের অনেক আগেই শুধু ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ অনুধাবনের আলোকেই এবং আল্লাহর ওহীর সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই হযরত উমর উম্মুল মোমেনীনদের পর্দার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সুতরাং হযরত উমর একাধিকবার প্রিয়নবীর কাছে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ করেন যে, “ওগো আল্লাহর রাসূল (রা:)! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন যে তাঁরা যেন পর্দা করেন।” কিন্তু যেহেতু আইন প্রণয়নের ব্যাপারে তিনি স্বাধীন ছিলেন না, তাই তিনি এ ব্যাপারে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষা করেন। বোখারী-মুসলিমে হযরত আনাস বিন মালেকের বর্ণনা মওজুদ রয়েছে। তাতে রয়েছে, হযরত উমর প্রিয়নবীর সমীপে উপস্থিত হয়ে বললেন- “ওগো আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনার কাছে ভালমন্দ সব রকমের লোক আসে। হয়তো ভাল হবে, যদি আপনি আপনার লোক পবিত্র স্ত্রীদের পর্দা করার আদেশ দিয়ে দেন!” ‘সুতরাং এই পর্দার আয়াত নাজিল হয় এবং এর অবতরণ সেই প্রাতঃকালে হয় যেদিন প্রিয়নবী হযরত যয়নব বিনতে জায়েদকে বিয়ে করেন।
শুধু তাই নয়। অন্য এক বর্ণনা মোতাবেক হযরত উমর-এর অভিমত ছিল- এই পর্দা সে রকমের হবে যে, কেহ যেমন তাঁদের গৃহে যাবে না তেমনি তাঁরা নিজেরাও ঘর থেকে বেরুবেন না। এমনকি কেউ যেন তাঁদের দেখতে না পায়।
হাদীসের বর্ণনায় আরো একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তা হচ্ছে উম্মুল মো’মেনিন হযরত সাওদাহ বিনতে জামেয়া (রাঃ) এক রাতে নিজের কোন প্রয়োজনে পর্দা সহকারে বাইরে গিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে হযরত উমরের দৃষ্টি তাঁর উপর পড়ে। যেহেতু তিনি দীঘাকৃতির ছিলেন এজন্যে হযরত উমর তাঁকে চিনে নেন এবং বলেন; “খোদার শপথ হে সাওদা (রা:)! আপনি আমাদের দৃষ্টি থেকে লুকোতে পারেন না। দেখেই চেনা যায়, সুতরাং আপনি বাহিরে বের হবেন না।” একথা শুনে হযরত সাওদা (রা:) প্রিয়নবীর (সা:) কাছে উপস্থিত হন এবং পুরো ঘটনা খুলে বলেন- প্রিয়নবী (রা:) তখন হযরত আয়েশার গৃহে নৈশভোজ গ্রহণ করছিলেন। একথা শুনে প্রিয়নবী এলহামী অবস্থায় পড়েন এবং বলেন- “তোমাদের জন্যে এই অনুমতি রযেছে যে, তোমরা নিজেদের প্রয়োজনে বাইরে বেরুতে পারবো।” এই ঘটনা, ইমাম বোখারীর সহীহ হাদীস এবং তফসীরের বিভিন্ন গ্রন্থে যেমন তাবারী, ইবনে কাসীর এবং কুরতবীতে দেখা যেতে পারে। প্রামাণ্য দলিলের জন্যে ওসব গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করুন।)
হাফেয ইবনে হাযার ফতহুল বারীতে লিখেছেন- “পর্দার আয়াত অবতরণের পর হযরত উমর এ ব্যাপারে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন যে, পর্দাবৃতা কোন মহিলার ব্যক্তিত্ব যেন চেনা না যেতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করেন। তাঁকে এ ধরনের বাড়াবাড়ি করতে বারণ করে দেওয়া হয় এবং উম্মুল মো’মোনিনদেরকে নিজেদের প্রয়োজনে বাইরে বেরুবার অনুমতি দেওয়া হয় যেন তাঁরা কোন অসুবিধায় না পড়েন।” উপরের বিস্তারিত বিবরণ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, উম্মুল মো’মোনিনদের জন্যে যে ধরণের পর্দা ফরয করা হয়েছিল তা তাদের মুখমন্ডল এবং হাতের পর্দা ছিল। তা তাঁদের পর্দাবৃত ব্যক্তিত্বের পর্দা ছিল না।
বিখ্যাত ফকীহ্ কাজী আয়াম এ প্রসঙ্গে বলেন- “এ ব্যাপারে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে, উম্মুল মোমোনীনদের উপর যে ধরনের পর্দা করা ফরয করা হয়েছিল তাতে মুখমন্ডল ও হাত শামিল রয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রেও এসব খোলা রাখার অনুমতি ছিল না- তা স্বাস্থ্যের ব্যাপারই হোক বা অন্য কিছু।”
একই দেখাদেখি অভিজাত মহলের মহিলারাও নিজেদের জন্যেও সেই ধরনের পর্দা বেছে নেন যা আল্লাহ উম্মুল মোমেনিনদের জন্যে পছন্দ করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধু উত্তম ব্যবহার অনুসরণ করা। অতএব, প্রিয়নবীর (সা:) আমল থেকেই তার অনুসরণ চলছে। কিন্তু পরবর্তী যুগে পর্দার ব্যাপারে আরো অতিরিক্ত বিধিনিষেধ ও বাড়াবাড়ীর সমন্বয় ঘটে- যেমন আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। এভাবে পর্দার নামে কঠোর প্রথা সমাজে প্রচলিত হতে শুরু করে এবং এক শ্রেণীর লোক এটাকে তাদের পারিবারিক আভিজাত্যের অংশে পরিণত করে নেয়। এভাবে তাঁরা পর্দার ইসলামী উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকেই খর্ব করে। তাদের পর্দাটা ইসলামী না হয়ে একটা প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়ে গেছে। (সুতরাং কেউ বিয়ের পয়গাম দিয়েও নিজের হবু স্ত্রীকে দেখার অনুমতি পায় না। অথচ শরীয়তে তার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু শরীয়তের বিধানের দিকে তাদের দৃষ্টি কি থাকবে তারা তো সামাজিক প্রচলন নিয়েই বেশী মাথা ঘামায়।)
মুসলিম নারীর পর্দা : পর্দা মুসলিম নারীর সেই স্বতন্ত্র ভূষণ যা ইসলাম তার জন্যে নির্দ্ধারিত করেছে। ইসলাম পর্দার মাধ্যমে অন্ধকার যুগের অশ্লীলতা ও দেহপ্রদর্শনী প্রথার মূলোচ্ছেদ করেছে এবং পর্দাহীন সমাজে সৃষ্ট যাবতীয় বেলেল্লাপনা ও যৌন অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করে দেওয়ার কার্য্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এখানে ইসলামের মহৎ উদ্দেশ্য প্রমাণিত করার জন্যে এবং ইসলামী সমাজে নারীর মর্যাদা ও গুরুত্ব কার্যকরী করার জন্যে অন্ধকার যুগের কিছু ঘটনার উল্লেখ করা উচিত ছিল- যা থেকে এটা বুঝা যেতো যে, ইসলাম পর্দার ব্যবস্থা করে নারী জাতিকে কি দারুণ বিপর্যয় ও দুরবস্থা থেকে রক্ষা করেছে। এতে করে সে সব লোকদের মুখোশও উন্মোচিত হয়ে পড়তো যাঁরা নারীকে কেবল পাশবিক উল্লাসের সম্বল বলে মনে করে। কিন্তু সেসব ঘৃণ্য-জঘন্য-যৌন নোংরামীর বিস্তারিত বিবরণ পেশ করে আমরা আমাদের পাঠক-পাঠিকাদের পবিত্র মনকে তমসাচ্ছন্ন করতে চাই না। তবে অন্ধকার যুগের সামাজিক পরিবেশের একটা চিত্র তুলে ধরার জন্যে পবিত্র কোরআনে যে সব প্রয়োজনীয় আয়াত বর্ণিত হয়েছে তা অধ্যয়ন করার পরামর্শ আমরা অবশ্যই দেবো। পবিত্র-কোরআনের এসব আয়াতে অন্ধকার যুগের বিভিন্ন বদ-অভ্যাস, কুসংস্কার ও অশ্লীলতার নিন্দা ও সমালোচনা করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে প্রচলিত নোংরামীর জন্যে তাদের তিরস্কার ও ভৎর্সনা করা হয়েছে। সাথে সাথে এমন সব আইনবিধিও প্রণয়ন করা হয়েছে যার বাস্তবায়ন করে ঐসব অপরাধ প্রবণতা, নোংরামী ও অশ্লীলতা থেকে তারা মুক্তি পেতে পারে। এসব আয়াত অধ্যয়ন করলে বুঝা যাবে যে, অন্ধকার যুগে নারীর অবস্থা কত বেদনাদায়ক ছিল এবং ইসলাম কিভাবে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর আগে নারী ছিল শোষিতা, নিপীড়িতা, নির্যাতিতা। ইসলাম নারীকে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়ে অবনতির অতল তল থেকে উন্নতি ও মর্যাদার উচ্চতম পর্যায়ে এনে আসন দিয়েছে। ইসলাম নারীকে শিক্ষা দীক্ষায় ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সমুজ্জ্বল করে জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমনকি আধ্যাত্মিকভাবেও উচ্চতর মর্যাদা দান করেছে। আগে যেখানে নারীকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দিতেও সবাই অপ্রস্তুত ছিল, সেখানে ইসলামই শুধু তাকে পূর্ণ মানুষ বলে ঘোষণা করেছে এবং তাকে সেবা করা ও শ্রদ্ধা করাকে আল্লাহ ইবাদাতের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে।
নীচে আমরা ইসলামের এমন কিছু বিশেষ মূলনীতির উল্লেখ করবো যা সামষ্টিক ও মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে কোন সমাজের জন্যে অত্যন্ত মূল্যবান প্রমাণিত হবে।
(১) সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে যথার্থ সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইসলামের সব বিধি-বিধানে নারী-পুরুষ উভয়কে একই গুরুত্ব দিয়ে সম্বোধন করা হয়েছে। কোরআনে একদিকে যেমন বলা হয়েছে যে-“হে নবী! মুমিন নারীদের বলুন যে, তারা নিজেদের দৃষ্টি নীচে রাখবে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করবে।” সেখানে সাথে সাথে এও বলা হয়েছে যে- “হে নবী! মুমিন পুরুষদের বলুন যে, তারা নিজেদের দৃষ্টি নীচে রাখবে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করবে।” বলা বাহুল্য, পবিত্র কোরআনে নারী-পুরুষ উভয়কে একই বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিয়ে আহ্বান জানানো হয়েছে।
(২) ইসলাম, মন মগজের পরিচ্ছন্নতা, মানুষের আভ্যন্তরীণ অবস্থা গঠন, এবং সামাজিক পরিবেশকে অশ্লীলতা ও অপরাধ প্রবণতার যাবতীয় কার্যকলাপ থেকে মুক্ত করতে চায়। কারণ যাবতীয় পাপ, অপরাধ ও নোংরামীর উৎস মানুষের মন্দ কাজের সাথে সম্পৃক্ত। এক্ষেত্রে ইসলাম নারী ও পুরুষকে আলাদা আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না কারণ নারী ও পুরুষ উভয়ই সমাজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সুতরাং পবিত্র কোরআনে উভয়েরই সংশোধনের আইন জারী হয়েছে, যেমন আল্লাহ বলেছেন- “নবীর স্ত্রীদের নিকট হতে কিছু চাইতে হলে পর্দার আড়াল হ’তে চাও। তোমাদের ও তাঁদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটাই উত্তম পন্থা।” (আহযাব ঃ ৫৩)
এই আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে, নারী ও পুরুষ উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্য হচ্ছে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ের পরিশোধন করা। সুতরাং আয়াতের পরবর্তী বাক্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইসলামের আসল উদ্দেশ্য মানুষের হৃদয়কে সবরকমের কলুষতা থেকে মুক্ত রাখা এবং হৃদয়কে পুতঃ পবিত্র করে তোলা। ইমাম এই কোরআনী বাক্যের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন-“….এর অর্থ এই যে, চোখের মাধ্যমে পাপের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং দৃষ্টির উল্লেখ বিশেষভাবে এজন্যে করা হয়েছে যে, হৃদয়ের আবেগকে উত্তেজিত করার ক্ষেত্রে চোখ অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। পুরুষ হোক বা নারী- উভয়ই অতি সহজে ও অতি শিগগীর দৃষ্টির তীরে বিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মানুষ সব সময় নীচের দিকে দৃষ্টি রাখবে- উপরে তাকাবেই না! না তা নয়। যদি তাই হতো তাহলে এটা ভীষণ কষ্টকর হতো, কারণ মানুষ সমাজে থাকে, তাকে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে হয়। এখন যদি সব সময় নিচের দিকেই চেয়ে হাঁটতে হয় তাহলে নানারকম অসুবিধের সম্ভাবনা থাকে। তাই ইসলামের এই কথা যে “নীচের দিকে দৃষ্টি রেখো” তার আসল অর্থ হচ্ছে মনকে সেসব চিন্তা ও বাসনা থেকে মুক্ত রাখ যাতে মন কলুষ ভাবনায় জড়িয়ে পড়তে পারে। পবিত্র কোরআন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীকে এই শিক্ষা দেয় যে তারা যেন তাদের মন-মেজাজকে ভ্রান্ত বিষয়াবলিতে জড়িত না করে এমন সব কল্যাণমূলক কাজে মনোযোগ দেয় যাতে সমাজের উপকার ও উন্নতি হয়। তারা যেন এমন সব বিষয়াবলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে যাতে জীবনের উন্নত ও মহত্তম মূল্যবোধ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যায়, যেন নিজেকে নিজে চিনতে ও জানতে পারে। এসব বিষয় মানুষের সাহস ও উদ্যম বাড়ায়, চিন্তাকে সুদূর প্রসারী করে এবং হীন ও তুচ্ছ তৎপরতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। এসব আবেগ অনুভূতি নিয়ে ব্যক্তি যখন তার পরিবেশের দিকে তাকায় তখন তার মনে সাহস, উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনুভব করে। এরপর সে তুচ্ছ ব্যাপার সমূহের দিকে আকর্ষণ বোধ করে না। যেমন হঠাৎ কোন সুন্দরী রূপসী নারীর দিকে চোখ পড়লেও তার মনমেজাজ কোনরকম মন্দ ভাব জাগে না, সে তার দৃষ্টি ও চিন্তাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যেন কোন ব্যাপারটা কিছুই নয় এবং সে দেখা মাত্রই তার দৃষ্টিকে অন্যত্র ফিরিয়ে নেয়। একই অবস্থা একজন মো’মেনা নারীরও।
(৩) তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ইসলাম মানুষকে সৎ, পুতঃপবিত্র, নম্র ও ভদ্র করে গড়ে তোলে। অন্ধকার যুগে নরনারী যেমন অসংখ্য রকমের পাপাচার, কুপ্রথা ও কুকর্মে অভ্যস্থ ছিল তেমনি নৈতিক ও চারিত্রিকভাবেও তারা ছিল দেউলিয়া। সেই সমাজের নারী পুরুষ অবাধে অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত থাকতো।
অন্ধকার যুগের অসংখ্য কুপ্রথার মধ্যে একটি ছিল নারীদের সৌন্দর্য্য ও দেহপ্রদর্শনীর প্রথা। তারা পথ চলতে গিয়ে রূপের প্রদর্শনী করতো, কখনো চপলা, কখনো চঞ্চলা, কখনো থমকে থমকে, কখনো থেকে থেকে বিভিন্ন রকমের কসরৎ ও অভিনয় করে পথ চলতো। আর এভাবে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তারা লোকদের ব্যভিচারের জন্য উস্কাতো। ইসলাম অন্ধকার যুগের এই কুপ্রথা ও অশ্লীলতাকে উচ্ছেদ করে ঘোষণা করে যে- ‘বর্বর যুগের রূপচর্চা ও দেহপ্রদর্শনী করে ঘোরাফেরা করো না।” (আহযাব-৪)
অর্থাৎ তাদের আদেশ দেওয়া হলো যে, ইসলাম আবির্ভাবের আগে যেভাবে তোমরা রূপচর্চা ও প্রদর্শনীর যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দাও। প্রথমতঃ তোমরা বিনা দরকারে ঘর থেকেই বের হয়ো না। আর যদি দরকারবশতঃ বেরুতেই হয় তাহলেই এভাবে বের হবে যেন মর্যাদা ও শালীনতা ক্ষুণœ না হয়। আর তার উপায় হচ্ছে এই যে, তোমরা নিজেদের উপর চাদর ঢেকে পর্দা করা যেন মনে হয় যে তোমরা পুতঃপবিত্র এবং সভ্রান্ত মহিলা। যেমন আল্লাহ বলেছেন- “হে নবী! নিজের স্ত্রীদের এবং মেয়েদের এবং মুসলমান নারীদের বলে দাও যে, ‘তারা যেন নিজেদের উপর নিজেদের চাদরের ঘোমটা টেনে দেয়।’ এই ব্যবস্থায় একথা অধিকতর প্রত্যাশাযোগ্য যে, তাদের চিনে নেওয়া যাবে এবং তাদের বিরক্ত করা হবে না।” (আহযাব- ৫৯)
উল্লেখযোগ্য যে, চাদর এবং ঘোমটা টানার অর্থ এই হবে যে, নারীর সব গোপন অঙ্গ তাতে ঢাকা পড়ে যাবে। এ ব্যাপারে ইবনে কাসীর আকরামার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে- এর অর্থ হচ্ছে এমন চাদর যা তার মাথা, চুল এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ঢেকে নেয়। অন্ধকার যুগে আরেক নোংরামীর উল্লেখ করে ইবনে কাসীর বলেন- “রাত্রিবেলা শহরের গুন্ডা প্রকৃতির লোকেরা বিভিন্নস্থানে ওৎ পেতে বসে থাকতো এবং যাতায়াত কারিনী নারীদের উত্যক্ত করতো। কিন্তু কোন মহিলা যদি পর্দায় থাকতো তাহলে তাকে কোন রকমের বিরক্ত না করে নিরাপদে চলে যেতে দিতো।”
উপরের আয়াতের পরই এই নীচের আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এতে অসৎ লোকদের উদ্দেশ্য কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলা হয় যে, তারা যদি তাদের মন্দ কার্যকলাপ পরিত্যাগ না করে তাহলে তাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ বলেন- “যদি মুনাফেকরা এবং ওসব লোকেরা যাদের মনে মন্দ প্রবণতা রয়েছে এবং ওরা যারা মদীনায় উত্তেজনাকর গুজব ছড়াচ্ছে নিজেদের কার্যকলাপ থেকে যদি বিরত না হয় তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে তোমাদের দাঁড় করিয়ে দেবো, এর পর তারা এই শহরে খুব করেই তোমাদের সাথে অবস্থান করতে পারবে। তাদের উপর সব দিক থেকে অভিশাপের বৃষ্টি পড়বে, যেখানেই যাবে ধরা পড়বে এবং শোচনীয়ভাবে মারা পড়বে। (আহযাব- ৬০-৬১)
এই আয়াতে আল্লাহতাআলা উভয় শ্রেণীর অপরাধের মান একই রকম বর্ণনা করেছেন এবং তাদের জন্যে একই রকম শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। সাধারণতঃ নারীদের সাথে নোংরা আচরণকারীদের অপরাধ রাজনৈতিক চক্রান্তকারীদের অপরাধের তুলনায় অনেক হাল্কা মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে উভয় ধরনের অপরাধ একই শাস্তির আওতায় পড়ে এবং দুটি অপরাধই সমানভাবে জঘন্য। এক ধরনের লোক রাজনৈতিক বিশৃংখলার মাধ্যমে দেশ ও সরকারের ক্ষতি করলে অন্য ধরনের লোকেরা তার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের গোড়ায় কুঠারাঘাত হানে। (চলবে)

ইসলামের আলোকে ‘আখলাকে হাসানা’

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

ইসলাম সর্বকালের মানবকুলের জন্য একটি সামগ্রিক জীবন বিধান। আখলাকে হাসানা বা সচ্চরিত্র ব্যতিত এ জীবন বিধানের কল্পনাও করা যায় না। আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীর জন্য যেসব সৎ গুণাবলী প্রয়োজন তন্মধ্যে একটি হচ্ছে ‘আখলাকে হাসানা’। আখলাকে হাসানার সুন্দর কর্মকান্ডের উপরই ইসলামের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। পবিত্র কোরআনে তাকে ‘উস্ওয়াতুন হাসানা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে, ‘তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত’’ অর্থাৎ হে নবী! সুমহান চরিত্র গুণাবলী তোমার মধ্যে বিদ্যমান যা হেদায়াতের জন্য অতি প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে মহানবীর বাণী হচ্ছে ‘‘ঈমানদার লোকদের মধ্যে ঈমান ও বিশ্বাসের দিক থেকে ঐ ব্যক্তিই পূর্ণতা প্রাপ্ত যে তাদের মধ্যে নৈতিক চরিত্রের দিক থেকে উত্তম।’’ অপর এক বাণীতে তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মুমীনদের দাঁড়ি পাল্লায় উত্তম নৈতিক চরিত্র অপেক্ষা অধিক ভারী জিনিস অন্য কিছুই হবে না।’ অন্য এক রেওয়াতে বর্ণিত আছে যে, ‘উত্তম নৈতিকতার পরিপূর্ণ বিকাশের জন্যই আমার আগমন’। আখলাকে হাসানা বা সচ্চরিত্রের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান আনয়ন পূর্বক আল্লাহকে ভয় করা, আখিরাতকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করা এবং সর্বদা মিল্লাতে ইব্রাহিমের উপর চলা। ইসলাম পবিত্র ও নির্মল জীবন গঠনের প্রয়াসী। তাই ভাল কাজে সর্বদা নিয়োজিত থাকা, মন্দকাজ থেকে বিরত থাকা এমনকি মন্দ কাজ খোলে যেতে পারে এমন সব ধরণের কাজ থেকে বিরত থাকা হচ্ছে নৈতিকতার মূল চাবিকাঠি। তাক্বওয়া বা পরহেজগারী হচ্ছে নৈতিকতার ভূষণ। এ সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের ঘোষণা হচ্ছে ‘‘যদি তোমরা বড় বড় গুনাহ থেকে বিরত থাক, তবে ছোট ছোট গুনাহসমূহ আল্লাহপাক ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদিগকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাবেন।’’ নৈতিকতার উত্তম নিদর্শন সম্পর্কে বলতে গিয়ে মহানবী (সা:) বলেছেন, ‘‘কোন বান্দাহ মুত্ত্বাকি লোকদের মধ্যে থেকে ততক্ষণ গণ্য হতে পারবে না, যতক্ষণ সে কোন মন্দকাজ করার সাথে জড়িয়ে পড়ার আশংকায় সেসব জিনিসও পরিত্যাগ করবে যাতে কোন দোষ বা মন্দ নাই।’’ উল্লেখিত আলোচনার ভিত্তিতে প্রত্যেক মানুষের উচিত নৈতিকতার চর্চা করা। রূপচর্চা পরিহার করা। কারণ বর্তমান যুগে রূপ চর্চাকেই বেশী অগ্রাধিকার দেয়া হয়। তা না হলে দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য থেকে দূরে থেকে যাবে। মানুষের ভেবে দেখা উচিত যে, এ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। কিছুদিন বসবাস করার পর পরপারে চলে যেতে হবে। একমাত্র আখলাকে হাসানা অর্থাৎ সচ্চরিত্র ছাড়া আর কিছুই তার সঙ্গি হবে না। তার অর্জিত ধন- দৌলত, গাড়ি-বাড়ি, সন্তান-সন্ততি কিছুই সাথে যাবে না।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! এ পর্যায়ে আমি নৈতিক চরিত্র গঠনের উপায় ও উপকরণ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করবো। যা অনেক চেষ্টা সাধনার পর অর্জিত হয়। পরিশ্রম ও ব্যাপক অনুশীলনের মাধ্যমে তা অর্জনের জন্য সচেষ্ট হতে হয়। অভ্যাস মানুষের দাস। অভ্যাসকে সুন্নতের বশীভূত করতে পারলেই সাফলতা হাতের নাগালে আসবে। বিরামহীন সাধনা, লাগাতার প্রচেষ্টা ও গভীর মননশীলতা ছাড়া অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আর তা না হলে সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়া কল্পবিলাস ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের প্রিয় নবী (সা:) এ ব্যাপারে ‘তাক্বওয়া’ অবলম্বনের উপদেশ দিয়েছেন। এর দ্বারা নানা বিপত্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ উপদেশবাণী রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেন, ‘‘আল্লাহকে অধিকমাত্রায় স্মরণ করা তাঁর নৈকট্য লাভের একটি উত্তম পন্থা’’। মৃত্যুকে স্মরণ করা, কম হাসা, অধিক পরিমাণে কাঁদা, পরনিন্দা থেকে বিরত থাকা, আত্মসমালোচনায় নিয়োজিত থাকা, সু-শিক্ষা অন্বেষণ করা এবং তদানুযায়ী আমল করা, দ্বীনের প্রচারাভিযানে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া ইত্যাদি কাজ সমূহ যথারীতি পালনে সচ্চরিত্র সহজে অর্জিত হয়।
এ প্রসঙ্গে ইমাম গাজ্জালী রাহ.’র বর্ণনা বেশ প্রণিধানযোগ্য। তাঁর হিসেব অনুযায়ী বিশটি গুণ জেনে রাখা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য আবশ্যকীয়। গুণগুলো হচ্ছে- ১. গুণাহের কারণে অনুতাপ করা ২. বিপদে সবর করা ৩. আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ৪. নিয়ামতের শোকর আদায় করা ৫. ভয় ও আশার মধ্যে সমতা রক্ষা করা ৬. সংসারে অনাসক্তি প্রদর্শন করা ৭. আমলে ইখলাছ থাকা ৮. মানুষের সাথে সদাচারণ করা ৯. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য স্বীকার করা ১০. আল্লাহর সামনে একাগ্রতা ও নম্রতা প্রদর্শন করা ১১. কৃপণতা বর্জন করা ১২. অহংকার ত্যাগ করা ১৩. আত্মপ্রীতি পরিত্যাগ করা ১৪. কঠোরতা বর্জন করা ১৫. খাদ্য লোভ কম করা ১৬. অতিরিক্ত কামভাব না দেখানো ১৭. রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত না করা ১৮. হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ না করা ১৯. অর্থের লোভ থেকে মুক্ত থাকা ২০. জাঁকজমক থেকে বিরত থাকা। পরিশেষে আমি মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সবাইকে প্রিয়নবীর আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহ : উত্তরণ কোন পথে?

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

চারিদিকে আজ নির্যাতিত মুসলমানের কান্না শুনা যাচ্ছে। মুসলমানের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে পড়েছে। কি ব্যাপার? অধিক সংখ্যক মুসলমানের দেশে মুসলমানরা কেন নির্যাতিত। সত্যিই তো! এর কারণ কি? তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে শান্তির বার্তাবাহক মহানবি (সা.) বলেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন মুসলমানরা সংখ্যায় অধিক হবে, তদুপরি তারা কাফের-মুশরিক, নাস্তিক-মুরতাদ তথা বিধর্মী পরাশক্তির ফেলা জালে আবদ্ধ হয়ে নানা বিপদের সম্মুখীন হবে।’ এর কারণ হবে তারা ঐক্যের বন্ধনে থাকবে না।
ঐক্য। যার গুরুত্বের অন্ত নেই। অপরিসীম গুরুত্বের অধিকারি বিষয়টি হচ্ছে ঐক্য। মহান সৃষ্টিকর্তা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার তাগিদ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর, আর পরস্পর পৃথক হয়ো না।” (সূরাঃ আল্-ইমরান, আয়াতঃ ১০৩) হাদিস শরিফে মহানবি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) ইরশাদ করেন, অর্থাৎ  ‘আল্লাহর নুসরাত তথা সাহায্য দলবদ্ধ জামাতের উপর।’ যেখানে ঐক্য নেই সেখানে খোদায়ি সাহায্য আশা করা আকাশ কুসুম ছাড়া কিছুই নয়। এ থেকেই আমরা অনুভব করতে পারি মুসলমানদের অধঃপতনের পিছনে মূল রহস্য কী?
মুসলিম উম্মাহর পতনের কারণ :
হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ভবিষ্যতে মানুষের সামনে এমন একটা যুগ আসবে যখন নাম ব্যতিরেকে ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, আল-কোরআনের আক্ষরিক তেলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাদের মসজিদ গুলো হবে বাহ্যিক দিক দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হবে হেদায়াত শূন্য। আর তাদের আলেমগণ হবে আকাশের নিচে জমিনের উপরে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ তাদের মধ্য থেকে ইসলাম/দ্বীন সম্পর্কে ফিতনা প্রকাশ পাবে। অত:পর সে ফিতনা তাদের দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।” (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান অধ্যায়)
আলোচ্য হাদীসের ব্যাখ্যা :
এ হাদীসের মধ্যে রাসূল (সা.) মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিম্নোক্ত ভবিষ্যৎবাণী করেছেন।
১. ইসলামের নামটা ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকবে না :
রাসূল (সা.) এই পৃথিবীতে এসেছিলেন সকল মতবাদের উপরে ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আস-সফ, আয়াত ৯)
ইসলামকে বিজয়ী আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ অবর্ণনীয় কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।” (সূরা মায়েদা, আয়াতঃ ৩)
মানবতার কল্যাণে যে ইসলাম বা জীবন ব্যবস্থা পৃথিবীতে এসেছে সেই ইসলামের বাস্তব প্রতিফলন সমাজে থাকবে না। শুধু নামে থাকবে ইসলাম। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে দলে দলে বিভক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্কবাণী উল্লেখ পূর্বক খুবই সুক্ষèভাবে ঘোষণা করেছেন, “তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দ্বীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।” (সূরা মুমিনুন, আয়াতঃ ৫৩)। “যারা নিজদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না)। প্রত্যেক দলই নিজদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।” (সূরা আর-রূম, আয়াতঃ ৩২)
২. আল-কোরআনের আক্ষরিক তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না :
মহাগ্রন্থ কোরআনে কারিম বিশ্ব মানবতার হেদায়াতের একমাত্র গাইডলাইন। পৃথিবীর যে কেউ হেদায়াত পেতে চাইলে তাকে এর ছায়াতলে আসতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “নিশ্চয় এ কোরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মু’মিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত  ৯) আল্লাহ তা‘আলা আল-কোরআনে আরো বলেন, “অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।” (সূরা মায়েদা ১৫-১৬) এই কোরআনকে সম্পূর্ণভাবে মেনে চললে সকল সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, “আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।” (সূরা আন-নাহল ৮৯)। বর্তমান সময়ের মুসলমানগণ এই আল-কোরআনকে তেলাওয়াত সর্বস্ব কিতাবে পরিণত করেছে। এ কথার দ্বারা এটা মনে করার সুযোগ নেই যে, কোরআন তেলাওয়াত করা যাবে না। বরং আল-কোরআন  তেলাওয়াত করলে আপনি অবশ্যই প্রতি হরফে ১০টি করে নেকি পাবেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল কোরআন তেলাওয়াত করবে প্রতিটি হরফের তার জন্য রয়েছে ১০টি করে সওয়াব।” (আল-বুরহান ফি উলুমিল কোরআন) আল-কোরআনের হক হচ্ছে তাকে তেলাওয়াত করতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে, বাস্তব জীবনে কোরআনের বিধান মেনে চলতে হবে। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,-
“যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা পাঠ করে যথার্থভাবে। তারাই তার প্রতি ঈমান আনে। আর যে তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা বাকারা )কারণ এই আল-কোরআন কিয়ামতের দিন আপনার আমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “আল কোরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে।” (আহকামুশ-শরীয়াহ)
৩. হেদায়াতশূন্য জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদ :
রাসূল (সা.) এর জামানায় মসজিদ ছিলো সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু। সাড়ে নয় লক্ষ বর্গমাইলের প্রেসিডেন্ট রাসূল (সা.) তাঁর কোন রাজ সিংহাসন ছিলো না। ছিলো না গণভবন বা প্রেসিডেন্ট মহল। মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে অথবা বসে ইসলামী রাষ্ট্রের সকল কার্যাদি সম্পাদন করতেন। তখন রাষ্ট্রীয় সচিবালয় ছিলো মসজিদ। এখানে মানুষ নামাজ আদায় করত, খুৎবা/ভাষণ শুনতো, তালিম-তারবিয়াত হতো, পড়ালেখা হতো, বিচার-ফয়সালা করা হতো। কিন্তু আমাদের সমাজে নামাজ আদায় করা ছাড়া আর কোন কাজ করা হয় না।
মুসলিম জাতির আদর্শিক পিতা হযরত ইবরাহীমের (আ.)’র আদর্শ অনুসরণ করত: রাসূল (সা.) একটি সুসংগঠিত জাতি তৈরী করেছিলেন। আমরা আজ সে আদর্শে উদাসীন হয়ে নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। এ যেন নিম্নোক্ত হাদীসের জলন্ত প্রমাণ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “বনি ইসরাঈলরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিলো আর আমার উম্মতরা তেহাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। তন্মধ্যে একটি ছাড়া বাকিরা জাহান্নামে যাবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন সে দল কোনটি? রাসূল (সা.) বললেন, ‘আমি আমার সাহাবীদের নিয়ে যে কাজ করেছি এ কাজগুলো যারা করবে তারাই হবে জান্নাতি’। (সূনানে আত-তিরমিযি) এ সকল দলগুলো তৈরী হয়েছে খোলাফায়ে রাশেদীনের পর থেকে অদ্যাবধি সমাজের এক শ্রেণীর আলেমগণের মাধ্যেমে। রাসূল (সা.) প্রায় সাড়ে নয় লক্ষ বর্গমাইল এলাকার রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে একটি অবিভাজ্য দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাসূল (সা.)’র পর তাঁর উত্তরসূরী হযরত উমর (রা.) বারো লক্ষ বর্গমাইলের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অনুরূপ একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অথচ বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এটাই মুসলিম বিশ্বের পতনের বহুবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ। একজন মুসলমান আর একজন মুসলমানকে বরদাস্ত করতে পারে না। বাংলাদেশেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশী অনৈক্য, দলাদলি ও বিভেদ রয়েছে মুসলমানদের মধ্যে। এমতাবস্থায় আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে কোরআন-সুন্নাহ, রাসূল (সা.)’র সীরাত, ও সাহাবায়ে কেরামদের জীবনালেখ্য অধ্যয়ন করে সরাসরি আমল করতে হবে। এছাড়া আমাদের দেশের আলেমগণের পারস্পারিক বিরোধিতাপূর্ণ ফতোয়া দান বন্ধ করে, তাদের মধ্যকার ছোট-খাটো বিভেদ নিরসন মধ্যদিয়ে ভ্রাতৃত্বের সাঁকো তৈরী করে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যে জাতি পৃথিবীর বুক স্পেশাল এক পাওয়ার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতো। যে জাতির সাহসি হুংকারে বাতিলরা ভয়ে কাঁপতো। যে জাতির নাম শুনলে আবু জেহেল, উতবা, শাইবার মত শীর্ষ কাফের নেতারা লেজ গুটিয়ে পালাতো। যে জাতি পৃথিবীর অন্যান্য জাতির নেতৃত্ব দিত আজ সেই জাতি তার পুরনো ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জাতির বিবেক উলামায়ে কেরামই দায়ী। ছোট মুখে বড় কথা হলেও বলতে হবে। কেউ হয়তঃ আমায় বেয়াদব উপাধিতে ভূষিত করার কথা ভাবছেন। যে যাই বলুন না কেন? আমাকে আমার বাক স্বাধীনতায় বলতে দিন। কলমকে স্বাধীন ভাবে লিখতে দিন। এই দিশেহারা মুসলিম জাতির, সিরাতে মুস্তাক্বিম থেকে পথ বিচ্যুত জাতির, মুনিব ভোলা মুনিব জাতির, আত্মভোলা মুসলিম উম্মাহর, পরিচালনার গুরুদ্বায়িত্ব ধারাবাহিকতার পালাক্রমে উলামায়ে কেরামের উপরই অর্পিত হয়েছে। হাদিস শরিফে আপনাদেরকেই তো “ওরাসাতুল আম্বিয়া’’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তবে কেন আমাকে দোষারূপ! পঙ্গপালের মত ছোটাছুটি করছে জাতি, উত্থানের দেখা না পেয়ে অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে মুসলিম জাতি আপনাদের সামনে। এখনো কি নীরব বসে থাকবেন। এখনো কি মসজিদ-মাদ্রাসা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাবেন। এখনো কি দারস-তাদরিস, তালিম-তাআল্লুম নিয়ে দিবানিশী সময় পার করবেন। আপনাদেরকেই যে হাল ধরতে হবে জীর্ণ-শীর্ণ ঘূণে ধরা মুসলিম জাতির। বে-শক আপনারাই পারবেন এ জাতিকে অধঃপতনের রেল লাইন থেকে উদ্ধার করতে। তবে আর শংকা কীসের? আজই নেমে পড়–ন তাসবিহ হাতে ময়দানেতে।
পরিশেষে মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন মুসলিম উম্মাহকে সকল ইখতিলাফ আর বিবাদ ভুলে গিয়ে ঐক্যের প্লাটফর্মে হাজির হওয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

ইসলামী চিন্তা-গবেষণার গুরুত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সাম্প্রতিক সমস্যা সমাধানে ফিকহী কায়িদা প্রয়োগের দৃষ্টান্ত :
ক. যে ব্যক্তিকে ওঈট তে খরভব ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ দিয়ে রাখা হয়েছে তার ব্যাপারে শরঈ বিধান কী হবে? এ সম্পর্কে যে ফিকহী কায়িদা প্রয়োগ করা যায় তাহল, “কৃত্রিম জীবন অস্তিত্বহীনের মত।” “আল-মুকরী, মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ, আল-কাওয়াদে, বিশ্লেষণ: ড. আহমদ ইবনে হুমাইদ, মক্কা: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, তা. বি. খ. ২ পৃ. ৪৮২।
খ. একজন রোযাদার এক দেশ থেকে সাহরী করে বিমান যোগে অন্য দেশে গেলেন যেখানে তার ইফতারের সময়ের ব্যবধান কয়েক ঘন্টা। তিনি কখন ইফতার করবেন? মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এর সমাধানে “বাহ্যিক অনুধাবনের ভিত্তিতে বিধান নির্ধারিত হয় অজ্ঞাত বাস্তবতা গ্রাহ্য নয়। এ ফিকহী কায়িদাটি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯১।
৩. তাখরীজ ফিকহীর মাধ্যমে বিধান নির্ণয়: তাখরীজ ফিকহীর সংজ্ঞা তাখরীজ ফিকহীর সংজ্ঞা বর্ণনায় ইবনে ফারহুন মালিকী বলেন, “নসভিত্তিক কোন মাসআলার বিধানকে (সাদৃশ্যপূর্ণ) মাসআলার বিধান নির্গমন। “আল-মালিকী, ইবনে ফারহুন, কাশফুন নিকাব আল-হাজির ফী মুসতালিহ ইবনুল হাজির, বিশ্লেষণ: হামযাহ আবু ফারিস ও আব্দুস সালাম শরীফ, বৈরূত: দারুল গারব আল-ইসলামী, ১৯৯০, পৃ. ১০৪। শায়খ আলভী আসসাক্কাফ বলেন, মাযহাবের ফকীহগণ কর্তৃক কোন বিষয়ে তাদের ইমামের বর্ণিত বিধানের অনুরূপ বিধান অন্য বিষয়ের জন্য নির্ধারণ করাকে তাখরীজ ফিকহী বলা হয়। “আসসাক্কাফ, আলুভী, আল-ফাওয়ায়িদ আল-মাক্কীয়াহ, বৈরূত: মাকতাবাহ আল-বাবী আল-হালবী, তা. বি. পৃ. ৪২। আহমদ ইবনে তাইমিয়া বলেন, “কোন মাসআলার বিধানকে তার অনুরূপ মাসআলার জন্য বহন করা এবং এ বিষয়ে উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধান করা।” “ইবনে তাইমিয়া, আহমাদ ইবনে আব্দুল হালীম, আল-মুসাওয়াদাহ, বিশ্লেষণ: মুহাম্মদ মহীউদ্দীন আব্দুল হামীদ, বৈরূত: দারুল কিতাবিল আরাবী, তা. বি. পৃ. ৫৩৩। এককথায়, মাযহাবের ইমামগণের মতামত ও নীতিমালার আলোকে শরঈ প্রয়োগিক বিধান বা বিধানের নীতিমালা নির্ণয় করাকে ফিকহী তাখরীজ বলে।
ফিকহী তাখরীজের মাধ্যমে বিধান নির্ণয়ের নীতিমালা: ১. কোরআন সুন্নাহ’র নস বর্তমান থাকা অবস্থায় ইমামগণের আলোকে বিধান নির্ণয় না করা। ২. বিধান নির্ণয়কারীকে মাযহাবের নীতিমালা ও তার শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা থাকতে হবে। ৩. বিধান নির্ণয়কারীকে ব্যাপকার্থে উসূলে ফিকহ ও বিশেষভাবে কিয়াস বিষয়ে জ্ঞানবান হতে হবে। ৪. বিধান নির্ণয়কারীকে মাযহাবী উসূলের সাথে ফুরুয়ের সংযোগ স্থাপন ও উৎস অবগত হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে, যাকে উসূলবিদগণ স্বভাবজাত ফকীহ নামে অভিহিত করেছেন। ৫. উদ্ভূত বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধকতা ও ফিকহী শাখা-প্রশাখার পার্থক্য সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে। ৬. ইমামগণের মতামত যা আলিমগণের নিকট গ্রহণযোগ্য উৎসে বর্ণিত হয়েছে তার ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়। “কাহতানী, ড. মুফসির, মানহাজু ইসতিখরাজ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৫৪৩-৫৫৩।
তাখরীজের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের উদাহরণ:
বাণিজ্যিক বীমা: ফকীহগণ তাদের তাখরীজের ভিত্তিতে এর বিধান নির্ণয়ের ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। একদল গবেষক জুয়ার সাথে তুলনা করে ও গারাবের সাদৃশ্যতার কারণে একে হারাম বলেছেন। অন্যদিকে একদল একে তাবারুর সাথে তুলনা করে বা আকীলা চুক্তির ভিত্তিতে বৈধ বলেছে। “যারকা, ড. আনাস, আত তামীন ওয়ান মাকওকাফুশ শরীআহ আল-ইসলামীয়াহ মিনহু, বৈরূত: মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪১৫ হি. পৃ. ৩০-৩২।
গ্রন্থস্বত্ব: এ আধুনিক বিষয়টির বিধান বর্ণনা করতে যেয়ে বর্তমান যুগের আলিমগণ তাদের তাখরীজের ভিন্নতার কারণে মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ গ্রন্থকে উৎপন্নদ্রব্য (চৎড়ফঁপঃ) বিবেচনা করে গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত রাখা বৈধ বলেছেন। আবার কেউ কেউ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান একটি নির্দিষ্ট গন্ডিতে আবদ্ধ হয়ে যায় বিধায় গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ বৈধ নয় বলেছেন। “উসমানী, মুহাম্মদ তাকী, বুহুস ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ, কুয়েত: দারুল কলম, ১৪১৯ হি. পৃ. ১১৯।
মাকাসিদে শরীআহ’র শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্য-এর ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়ন মাকাসিদে শরীআহ প্রাচীন ও আধুনিক উভয় যুগের আলিমগণের নিকট অতি পরিচিত একটি পরিভাষা। কিন্তু পূর্ববর্তী আলিমগণ এর কোন সংজ্ঞা প্রদান করেননি। এমনকি ইমাম শাতেবীও না, যিনি এ বিষয় সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। এক কথায় বান্দার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ বাস্তবায়নের জন্য শরীয়াত প্রণেতা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ ও বিশেষ যে উদ্দেশ্য গ্রহণ করেছেন তাকে বলা হয় মাকাসিদে শরীআহ। “রায়সূনী, ড. আহমদ, নাজরিয়্যাতুল মাকাসিদ ইনদাল ইমাম আশশাতিবী, ওয়াশিংটন: আইআইআইটি, ১৪১২ হি. পৃ. ৭। এ পরিভাষাটি বুঝানোর জন্য অন্যান্য কিছু শব্দও ব্যবহৃত হয়। যেমন- মাসলাহা, হিকমাহ, ইল্লাত ইত্যাদি।
মাকাসিদের প্রকারভেদ : বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মাকাসিদে শরীআহ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত “প্রকারভেদগুলোর বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: কাহতানী, ড. মুফসির, মানহাজু, ইসতিখরা, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৫৯১- ৬০৮।
১. যেসব কল্যাণ সংরক্ষণের জন্য ইসলামী আইন প্রণীত হয়েছে সে দৃষ্টিতে মাকাসিদে তিন প্রকার: ক. অত্যাবশ্যকীয়, খ. প্রয়োজনীয় (পরিপূরক), গ. উন্নতিবাচক। ২. মর্যাদাগত দিক থেকে দুই প্রকার: ক. মৌলিক খ. সম্পূরক ৩. ইসলামী বিধান অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে তিন প্রকার: ক. সাধারণ উদ্দেশ্য (সামগ্রিক) খ. বিশেষ উদ্দেশ্য (অধ্যায় ভিত্তিক) গ. গৌণ উদ্দেশ্য (নির্দিষ্ট বিষয়)। মাকাসিদে শরীআহ’র ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে করণীয়- প্রথমত: মাকাসিদে শরীআহ’র পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন।
ইমাম শাতিবী শরঈ বিধান উদ্ভাবক বা মুজতাহিদের জন্য দু’টি শর্ত প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি দু’টি বৈশিষ্ট্য অর্জন করবেন তিনি ইজতিহাদের যোগ্য হবেন। একটি হল, পূর্ণভাবে মাকাসিদে শরীআহ অনুধাবন এবং অন্যটি হল, উক্ত অনুধাবনের ভিত্তিতে বিধান উদ্ভাবন। “আশশাতিবী, ইবরাহীম ইবনে মুসা, আল-মুআফাকাত, বিশ্লেষণ: আবু উবায়দা ইবনে হাসান, রিয়াদ: দারু আফফান, ১৪১৭ হি. খ. ৫, পৃ. ৪১।
দ্বিতীয়ত: মাকাসিদে শরীআহ অবগত হওয়ার পদ্ধতি: ক. ইস্তিকরা অর্থাৎ শরীয়াতের নস, বিধিবিধান, কারণ (ইল্লাত) ইত্যাদি সম্পর্কে অনুসন্ধ্যান। খ. আদেশ- নিষেধের কারণ। গ. কল্যাণ- অকল্যাণের বিশ্লেষণ। “রায়সুনী, ড. আহমদ, নাজরিয়্যাতুল মাকাসিদ ইনদাল ইমাম আশশাতিবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭১।
তৃতীয়ত: মাকাসিদে শরীআহ’র চারটি শর্ত: ক. কল্যাণের বিষয় অকাট্য হবে। এ কারণে পালকপুত্র প্রথা ইসলাম রহিত করেছে। খ. প্রকাশ্যমান হবে। যেমন- বিবাহের উদ্দেশ্য বংশ রক্ষা করা। গ. দু’টি বিষয়কে সংযুক্ত করা হলেও উদ্দেশ্য একটি হতে হবে। যেমন- মদ হারাম হওয়া ও এর সাথে সাথে শাস্তি নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য একটিই তা হল, বুদ্ধির সংরক্ষণ। ঘ. ব্যাপক, সামগ্রিক ও শাশ্বত হওয়া। “আয-যুহায়লী, ড. ওহাবাহ, উসুলুল ফিকহ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১০১৯।
চতুর্থত: কল্যাণ নির্ণয় পদ্ধতি: এ কথা অনস্বীকার্য যে, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার কল্যাণেই শরীয়াত প্রবর্তন করেছেন। এই কল্যাণের কাজই হল শরীয়াতের উদ্দেশ্য সংরক্ষণ করা। ইমাম রাযী বলেন, কল্যাণ-অকল্যাণ বিবেচনায় মানুষের কর্মকান্ড ছয় ধরণের হয়ে থাকে- ১. যাতে শুধু কল্যাণ রয়েছে। অকল্যাণ বলতে কিছু নেই। এ কাজটি শরীয়াত সম্মত হওয়া নিশ্চিত। ২. যাতে কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়ই রয়েছে। তবে কল্যাণ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এটিও শরীয়াত সম্মত হওয়া উচিত। কেননা সামান্য অকল্যাণের জন্য অনেক কল্যাণ পরিত্যাগ করা দূষণীয়। ৩. যাতে কল্যাণ- অকল্যাণ সমান। এটি একটি নিরর্থক কাজ। যা শরীয়াত সম্মত না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ৪. যাতে কল্যাণ- অকল্যাণ কোনটিই নেই। এটিও একটি নিরর্থক কাজ। অতএব তাও শরীয়াত সম্মত হতে পারে না। ৫. এককভাবে অকল্যাণ নিহিত। নিশ্চিতভাবে এটি শরীয়াত সম্মত হবে না। ৬. যাতে কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়ই রয়েছে তবে অকল্যাণই অগ্রগণ্য। এটিও শরীয়ত সম্মত না হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা অকল্যাণ দূরীভূত করা আবশ্যক। “আল-রাযী, ফখরুদ্দীন ইবনে উমর, আল-মাহসুল, বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪০৮ হি. খ. ২ পৃ. ৫৮০। ইমাম গাযালী মাকাসিদে শরীআহ ভিত্তিতে বিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত প্রদান করেছেন- আল-গাযালী, আল-মুস্তাসফা, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৯৬।
১ম, কল্যাণ অত্যাবশ্যক হওয়া। ২য়, কল্যাণ সামগ্রিক হওয়া, গৌণ না হওয়া। ৩য়, কল্যাণ অকাট্য হওয়া, ধারণাপ্রসূত না হওয়া। ইমাম শাতেবী মাসালিহে মুরাসালাহর ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত প্রদান করেছেন-
১. কল্যাণ চিন্তা ও শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা। শরীয়াতের কোন মূলনীতি বা কোন দলীলের সাথে এটা সাংঘর্ষিক হবে না। ২. সত্তাগতভাবে বিষয়টি জ্ঞান-বিবেকসম্মত হওয়া। কোন জ্ঞানী ব্যক্তির সামনে যখন সেটা উপস্থাপিত হবে তখন সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি যেন তাকে সমর্থন করে। ৩. তা গ্রহণের ক্ষেত্রে শর্ত হল, এর দ্বারা যেন নিশ্চিত কোন সংকটের অবসান হয় এবং যদি এটা গ্রহণ করা না হয় তবে মানুষের চরম সংকটের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। “আশ-শাতেবী, ইমাম ইবরাহীম ইবনে মুসা, আল-ইতিসাম, বৈরূত: দারুল মা’আরিফা, ১৪০২ হি. খ. ২, পৃ. ১২৯।
পঞ্চমত: মাকাসিদ সংক্রান্ত কায়িদার মূলনীতি ও প্রয়োগ আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের ও অন্যান্য উসূলে ফিকহের গ্রন্থসমূহে মাকাসিদ সংক্রান্ত বিভিন্ন ফিকহী কায়িদা উল্লেখ করা হয়েছে। মাকাসিদের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ে আগ্রহী গবেষককে যার প্রতি দৃষ্টি প্রদান করা একান্ত কর্তব্য।
উপসংহার: ইসলাম একটি গতিশীল জীবনব্যবস্থা। মানুষের জীবনের নতুন নতুন বিষয়ে ইসলামী বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি তাই এ ব্যবস্থায় বিদ্যমান। মহানবী (সা.) এর সময়ে মহান আল্লাহর কোরআন অবতীর্ণের মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিধান জানিয়ে দিতেন অথবা রাসূল (সা.) নিজ ইজতিহাদের মাধ্যমে তার সমাধান করতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। বর্তমান সময়ে রিসালাতের ধারা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপরোক্ত পদ্ধতিগুলোর অবর্তমানে কীভাবে সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয় করা যায়।
উপরোক্ত তথ্য-উপাত্তের মূল্যায়ন করে আমরা নিম্নোক্ত ফলাফল অর্জন করতে পারি- ১. যুগ পরিক্রমায় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে ইসলামের গতিশীলতা স্থবির হয় না। ২. যেসব নতুন নতুন আবিষ্কার বা সমস্যার কোন ইসলামী সমাধান নেই তাকে আমরা সাম্প্রতিক বিষয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। ৩. ইসলামের গতিশীল প্রমাণ, মুসলমানদের সমস্যা দূরীকরণ, ইজতিহাদের ধারা চলমান রাখাসহ বিভিন্ন কারণে সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের গবেষণা করা প্রয়োজন। ৪. সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একজন গবেষককে গবেষণার পূর্বে বিষয়টি অনুধাবন ও এ সংশ্লিষ্ট খুঁটিনাটি বিষয় এবং জীবনের সাথে এর ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হতে হবে। ৫. এ বিষয়ে গবেষণার সময়ে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। ৬. শরীআহ অভিযোজন মানুষের নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা এর মাধ্যমে মানুষের জন্য অকল্যাণকর নয় এমন বিষয়কে বৈধতা দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়। ৭. আধুনিক সমস্যার সমাধানের সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি শরঈ দলীল। এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান দেয়া হলে অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করার প্রয়োজন হয় না। ৮. শরঈ দলীলের ভিত্তিতে আধুনিক বিষয়ের সমাধান না হলে দ্বিতীয়ত আমাদেরকে দৃষ্টি দিতে হবে ফিকহী কায়িদার উপর। ফিকহী কায়িদা মূলত শরঈ দলীল থেকে ফিকহবিদগণের গবেষণালব্ধ নীতিমালা, যা প্রত্যেক যুগের আলিমগণ প্রয়োগ করেছেন। ৯. শরঈ দলীল ও ফিকহী কায়িদার অবর্তমানে আধুনিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের জন্য আমাদেরকে মাযহাবের নীতিমালার আশ্রয় নিতে হবে। মাযহাবের ইমামগণের গবেষণালব্ধ বিধানের সাদৃশ্য বিধান সমজাতীয় বিষয়ের উপর প্রয়োগ করা যেতে পারে। ১০. সর্বশেষ আমরা মাকাসিদে শরীআহ’র মাধ্যমে বিধান নির্ণয়ের পন্থা অবলম্বন করতে পারি। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই মাকাসিদ সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে গবেষকের পূর্ণ দক্ষতা থাকতে হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট। (সমাপ্ত)

যৌতুক নির্মূল : প্রয়োজন ধমীর্য় অনুশাসন

আফতাব চৌধুরী

মানব জাতি হচ্ছে আল্লাহতা’লার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি এবং বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সা:)-এর উম্মতরা হচ্ছেন শ্রেষ্ঠতম উম্মত। প্রত্যেক ইমানদার মানুষ একথা বিশ্বাস করেন যে, হাসরের কঠিন প্রান্তরে সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহপাকের সম্মুখে প্রত্যেক প্রাণীকে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে এবং ভয়ানক ওইদিনে বিশ্বনবীর সুপারিশ ব্যতীত মুক্তিলাভের কোনো উপায় নেই। ইসলাম জন্ম থেকে কবরে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কাজের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে যেগুলো অনুসরণ করলে প্রতিটি কাজে অসংখ্য নেকি পাওয়া যায়, অপব্যয় করার পাপের সম্ভাবনা থাকে না এবং সামাজিক সমস্যা সৃষ্টিরও সম্ভাবনা থাকে না। বিবাহ হচ্ছে নবীজীর সুন্নত এবং নবীজি বলেন, ‘যে আমার সুন্নতকে প্রত্যাখ্যান করবে সে আমার উম্মত নয়।’ মোহর ছাড়া বিবাহ হতে পারে না এবং ওই মোহর স্ত্রীদের প্রাপ্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মুসলমান পুরুষ যখন মোহরের টাকা অথবা অলঙ্কার প্রদানে অসমর্থ বলে সময়মতো বিয়ে করতে পারছেন না, সেখানে আমাদের দেশে প্রচলিত বাকি মোহর সিস্টেমে খেয়ালখুশিমতো বিশাল পরিমাণ মোহর কাবিনের কাগজে লিখে রেগুলার বিয়ে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তালাক হয়ে গেলে বাকি মোহর আদায়ের জন্য আদালতের দরজায় জীবনের অনেক মূল্যবান বছর নষ্ট করতে হচ্ছে। ইদানিং অন্যধর্মী সমাজের অনুকরণে মুসলিম সমাজেও হারাম যৌতুক প্রথার ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বিবাহে অপ্রয়োজনীয় খরচের বহর বেড়েছে বহুগুণ। ইসলাম বলেছে, অপচয় খরচকারী শয়তানের ভাই এবং শয়তান অভিশপ্ত। অনাড়ম্বরভাবে সম্পন্ন বিবাহকে আল্লহপাক ভালোবাসেন। আজকাল বিবাহের কথাবার্তায় স্ত্রীলোকের মোহরানার কথা বাদ দিয়ে বরের মোটর সাইকেল, গাড়ি এবং নগদ টাকার দাবি নিয়ে নির্লজ্জভাবে কথা বলছে। এক মুসলমান আরো এক কন্যাদায়গ্রস্ত মুসলমান ভাইকে বিপদগ্রস্ত করতে লজ্জাবোধ করছে না। আগে যেখানে মোহরানা নির্ধারণের পর পাত্রপক্ষ পাত্রীপক্ষকে এবং পাত্রীপক্ষ পাত্রপক্ষকে সাধ্যমতো দান-মান করার দায়িত্ব সমঝে নিত, আজকাল ঘটকেরা কমিশনের বিনিময়ে প্রকাশ্যে দরদাম করছে। পাত্র যদি নামমাত্র চাকুরিজীবী অথবা ব্যবসায়ী হয়, তবে সে নিজে নতুবা তার মা-বাবা সম্ভাব্য পাত্রীর মা-বাবাকে যৌতুকের নামে নাজেহাল করে ছাড়ে। অনেক উপার্জনশীল পাত্রের বাবা পুত্রের বিবাহের যৌতুকস্বরূপ পাত্রীর মা-বাবার কাছ থেকে বাংলাদেশের কোরবানির বাজারে বিশাল সাইজের বলদের মালিকের মতো আকাশচুম্বী মূল্য দাবি করছে। আজকাল কন্যাদায়গ্রস্ত মুসলিম পরিবারগুলোতে যৌতুকের মোটরসাইকেল/গাড়ির আতঙ্ক ভূতের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। অত্যন্ত যতœ এবং আদরের সঙ্গে বহু অর্থ খরচ করে লালন-পালন করার পর বিবাহের বয়সে উপনীত হওয়ার পর পাত্রীর সৌন্দর্য, শিক্ষাদীক্ষা, বংশমর্যাদা কিংবা দ্বীনদারীকে প্রধান্য না-দিয়ে লোভী শয়তানরা নগদ টাকা এবং বহুমূল্য জিনিসপত্র দাবি করে পাত্রীর অভিভাবকদের রাতের ঘুম হারাম করে ছাড়ছে। একাধিক মেয়ে থাকা পরিবার প্রথম মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে আকণ্ঠ ঋণে ডুবে যাচ্ছে অথচ ইসলামি নিয়মনুসারে বিয়ে হলে দশ মেয়ের বাবাকেও চিন্তায় চুল ছিঁড়তে হতো না। মুসলিম সমাজের কলঙ্ক, মেরুদণ্ডহীন, নির্লজ্জ একশ্রেণীর যুবকের মাথায় হেরোইনের নেশার মতো মোটর সাইকেলের নেশা চেপেছে। কেবলমাত্র মোটর সাইকেলের জন্য অন্তিম পর্যায়ে অনেক বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। অনেক পয়সাওয়ালা লোক বেছে বেছে ধনী লোকদেরকে দাওয়াত দিয়ে হোটেলে বিয়ের পার্টি দিচ্ছে। বিশ্বনবী বলেছেন, ‘যে ওয়ালিমায় শুধু ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয় কিন্তু গরিব-ফকিরদের দাওয়াত দেওয়া হয় না, সে ওয়ালিমা সবচেয়ে নিকৃষ্ট।’
বিবাহের ভোজসভায় ব্যাপক হারে খাদ্যবস্তুর অপচয়ের গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করুন। বরের জন্য নির্দিষ্ট খাবারের থালায় খাদ্যবস্তু দ্বারা মুরগির মূর্তি নির্মাণ বন্ধ করুন। পান বাটার নামে থার্মোকলের বিশাল দামি অপ্রয়োজনীয় বাটার পরিবর্তে পত্রিকার কাগজ ব্যবহার করে প্রচুর টাকা সাশ্রয় করুন। কিছুসংখ্যক লোকের আবিষ্কার ‘বিয়ের মচা’ দেয়ার প্রথাকে অংকুরে বিনষ্ট করুন। লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে অহেতুক খরচ করে দুনিয়া এবং আখেরাতে বিপদগ্রস্ত হওয়া বোকামি ছাড়া কিছু নয়। গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার কন্যাদায়গ্রস্ত, অভাবগ্রস্ত এবং ঋণভারে জর্জরিত মুসলমান ভাইদের ব্যাপারে একটি বার ভেবে দেখুন-কিভাবে একেকটা সামাজিক কু-প্রথা প্রতিটি পরিবারের আর্থিক মেরুদন্ড ভেঙে দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো যৌতুক, ইফতারি, চুঙাপিঠা এবং খৈ-চিড়ার চাপে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। অবৈধভাবে অর্থ-অর্জিত লোকরা নিজের মেয়ে অথবা বোনের বিয়েতে মোটর সাইকেল অথবা গাড়ি উপহার দিয়ে গ্রামের অন্য দশজনের জন্য বিপদ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে জমি-জমা বিক্রয় করে, বন্ধক রেখে অথবা সুদে টাকা নিয়ে বরের জন্য মোটর সাইকেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। জায়েজ উপহার এবং চাপ দিয়ে আদায় করা হারাম যৌতুকের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। যৌতুকের অভিশপ্ত মোটর সাইকেল নিয়ে অনেক নির্লজ্জ বর বাস-ট্রাকের নিচে ঢুকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। অনেকের হাড়গোড় ভেঙেছে, কেউ কেউ ফ্রি মোটর সাইকেলের আনন্দে বিভোর হয়ে স্ত্রীকে বেমালুম রাস্তায় ফেলে বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে, টের পায়নি।
মুসলিম সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যুবক সমাজ এবং সম্মানিত আলেমসমাজকে নিতে হবে। ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সাংবাদিক বন্ধুরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখুন। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে, প্রতিটি মহল্লায় মসজিদে শুক্রবার জুম্মার নামাজে, পবিত্র ঈদের দিনে ঈদগাহ’র বিশাল জনসমাবেশে, ওয়াজের মাহফিলে আলোচনা করুন। পেশাদার ঘটক যারা ঘুষের বিনিময়ে মেয়েদের অভিভাবককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বিবাহে যৌতুক এবং নগদ টাকার প্রচলন ঘটাচ্ছে, অবিলম্বে এ মানুষ গুলোকে পশুগুলোকে শনাক্ত করে যথোপযুক্ত চিকিৎসা (?) করুন। এই অবস্থা বেশিদিন চললে মানুষ কন্যা সন্তানকে আপদ হিসেবে মনে করে চূড়ান্ত অনাদর করবে যা ইসলামে নিষিদ্ধ। বিশ্বনবী নিজের কলিজার টুকরো কন্যা হযরত ফাতেমাকে (রা.) যিনি বেহেশতে সমস্ত নারীদের সর্দারনি হবেন, অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে বিবাহ দিয়েছেন।
আজ যারা নিজের বিয়েতে নির্লজ্জের মতো যৌতুক দাবী করেছে, নিজের মেয়ের বিয়েতে মোটর সাইকেল দেয়ার মতো সামর্থ্য ভবিষ্যতে থাকবে বলে গ্যারান্টি দিতে পারবে কি? নিজের বৈধ উপার্জন থেকে ক্রয় করা মোটর সাইকেলে চেপে স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বুঝুন সম্মান বলতে কি বোঝায়?
আইনের মাধ্যমে যৌতুক প্রথা নির্মূল অসম্ভব। আজকাল পত্রপত্রিকায় যৌতুকের বলি মুসলিম রমণীদের ফটোসহ মৃত্যুসংবাদ দেখেও আমাদের অন্তর আল্লাহর আজাবের ভয়ে প্রকম্পিত হয় না। হাসরের ফাইনালের আগে কবরের কথা একবার চিন্তা করুন। ছবাহি মক্তব স্তর থেকে বাচ্চাদেরকে যৌতুক প্রথার কুফল সম্পর্কে অবহিত করুন এবং নিজের অথবা ছেলের বিয়ের সময় জিহ্বা লম্বা না করে কেবলমাত্র সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে যথাযথভাবে ইসলামী পদ্ধতি অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। মানুষের সমালোচনার ভয় করবেন না। কারণ, সমাজে মানুষ নামধারী প্রাণীর অভাব নেই কিন্তু পরকাল ভয়কারী প্রকৃত মানুষের সংখ্যা একেবারে নগণ্য। আসুন, আমরা সবাই মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি, যৌতুক বর্জন করি।

সিলেটে ৩৬০ আউলিয়া ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যবাদের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন

॥ মনির উদ্দিন মাষ্টার ॥

শেষ হয়ে গিয়েছে ওরস। প্রতিবারের ন্যায় এবারও অনেক ভক্ত ভিড় জমান। নাচ, গান, দোয়া, দরূদ সবই হয়েছে। দেশ-বিদেশ হতে ভক্তবৃন্দ এসেছিলেন। হিন্দু কি মুসলিম বৌদ্ধ কি খৃষ্টান কোন বাছ বিচার নেই। এখানে নানা জাতি ধর্মের লোক সবসময় সমবেত হন। নারী, পুরুষ, কোনো ভেদাভেদ নাই। এভাবে প্রায় ৭ শত বছর ধরে মানুষ ধরে রেখেছেন তাদেরকে। তাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন তারা নয়। কিন্তু প্রেম ও আত্মত্যাগকে মানুষ স্মরণ করে যাচ্ছেন। মানুষ, পশু, জীব-জন্তুর প্রেমে শাহজালাল (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়া তাদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাই আজ পর্যন্ত মানুষ ভুলে যাননি তাদের প্রিয় নেতাদেরকে। বিপদে আপদে জাতি, ধর্ম, নির্বিশেষে প্রাণ দিয়ে স্মরণ করে যাচ্ছেন। তারা মানুষের কাছে অমর হয়ে আছেন। এখনো প্রতিটি মাজারে মানুষ তাদের মুশকিল, আছান খোঁজছেন কিন্তু বর্তমানে গ্রাম দেশের অনেক মাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ধর্ম প্রচারের ফলে। কোনো কোনো জায়গায় মানুষে মানুষে মারধর করে মরছেনও। ৩৬০ আউলিয়া যারা কোনো ধর্ম প্রচার করেননি। তারা গোপনে ধর্মের কাজ করতেন, মানুষ দেখানো কোন কাজ তারা করতেন না। তাদের মধ্যে ধর্মীয় গৌরব ছিল না। তারা ধর্ম নিয়ে বড়াই করতেন না। শুধু তারা অত্যাচারী রাজা বাদশার বিরুদ্ধে ছিলেন। তারা রাজা গৌড় গোবিন্দকেও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন নি। ধর্ম প্রচারও করেননি, কোনো মসজিদ মাদ্রাসাও তৈরী করেননি। তারা কোনো ওয়াজ নছিহতও করেননি। জলসা করেননি। মানুষকে দাওয়াতও দেননি। কোনো জাতের পশু মেরে মেজবানীও করেননি। তারা শুধু মানবতাবাদ বিরোধীকে ঘৃণা করতেন। তারা পানি ও মাটির মত ধর্ম নিরপেক্ষ ছিলেন। তবুও অনেক মানুষ এমনিতে মুসলমান হয়েছিলেন। তাদের চরিত্র গুণ ছিল মহামানবতা সম্পন্ন। রাজা মেরে, রাজা-বাদশা হতে যাননি তারা। তারা কোনো চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, মন্ত্রী হতে যাননি। তারা ঝুপড়িতে, বনে, জঙ্গলে বাস করতেন। তারা ছিলেন সংসার ত্যাগী। তারা কোনো ঘর বাড়ি সম্পত্তির তোয়াক্কা করেননি। বনের পশুরাও তাদেরকে মানত। তারা সকল মানুষ ও পশুর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তারা মানুষের উপকারে জীবন কাটাতেন। তারা নিজ হাতে কাজ করে সামান্য আহার, নিরামিশ খেতেন। তারা ছিলেন মানুষের মত মানুষ। তারা চাঁদা তুলে ধর্মের কাজ করেননি। অপরের হাতের কাজের ফসল হারাম তারা খাননি। কাউকে কোনো কটু কথাও বলেননি। তারা যে, খুব জ্ঞানী তাও জাহির করেননি। কেউ গালি গালাজ করলে মুখে হাত বোলাতেন। তারা কোনো পান্ডিত্য জাহির করেননি। তারা কোনো দল করে দল নেতা হয়ে ব্যক্তি সম্পদ বানিয়ে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতেও চান নাই। তারা বিবাহ করে বংশ বিস্তার করে স্মরণীয় হয়ে থাকারও চেষ্টা করেননি। সে সময়েও অনেক অত্যাচারী লোক ছিল, মানুষের জিহ্বা কেটে ফেলত অনেকে। ধর্ম সে সময়ও ছিল কিন্তু তারা ধর্মের প্রতি অন্ধ ছিলেন না। তারা ছিলেন একেবারে নিরপেক্ষ, ধর্ম পক্ষপাতি কাজ তারা সহ্য করতেন না। তারা প্রকৃতির সহিত মিলে গিয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহিত বন্ধুত্ব বন্ধনেও আবদ্ধ হতেন। কোনো ধর্মকে তারা আঘাত দেননি। যার যার ধর্ম ও মানবতা এক, সর্বেসর্বা মনে করতেন। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায় মানুষ মারা, ফাঁসি দেওয়া তো দূরের কথা তরা ঐ ধর্ম খারাপ আর আমার ধর্ম একেবারে ভাল তাও তারা গুণগান গাইতেন না। কেউ কোনো দিন তাদের কাছে গেলে হিংসা করতেন না। পানির মত চলতেন, মানবতা বুকে ধারণ করে। তারা ত্যাগী মানুষকে ভালবাসতেন। হিন্দু মুসলিম ধার ধারতেন না। তারা কোনো ধর্মকে ঘৃণা করেন নি। আবার কেউ কোনো ধর্ম না মানলেও তাকে জোরে মানাতে যেতেন না। ধর্ম নাই, সৃষ্টিকর্তা নাই বললেও তারা তাদের বিরুদ্ধে কটুক্তি করতেন না। তারা সব মানুষের মনের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলেন। তারা ছিলেন গণতন্ত্রের উজ্জ্বল প্রেরণা। তাই মানুষ তাদের প্রেমে পাগল হয়ে ঘুরে ঘুরে মুসলমান হয়েছিলেন, কিন্তু তাদের মত মানুষ হতে পারিনি আমরা। আমরা সামান্য কারণে, অকারণে, লাঠালাঠি করে মানুষকে বিগড়িয়ে দেই। তাদের দেশপ্রেম ও মানব প্রেমে বা ধর্ম প্রেমে কোনো স্বার্থ ছিলনা। মানুষ বহুরূপী তা তারা বুঝতেন, কেউ কিছু বললেই ধর্ম যায় না, ধর্ম এত পাতলা নয় যে ধর্ম উড়ে যাবে। সৃষ্টিকর্র্তা সৃষ্টিকে ভালোবেসেই সৃষ্টি করেছেন তা তারা বুঝতেন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রেমে তারা মত্ত ছিলেন। স্রষ্টার সৃষ্টবস্তু তুচ্ছ হলেও তারা তা ধ্বংস করতেন না। ১টি পিপিলিকা হতে শুরু করে ১টি বনের ক্ষুদ্র চারা গাছও ধ্বংস হতে দিতেন না। তারা আস্তে আস্তে পা ফেলে হাঁটতেন। সব মানুষের মনকে জয় করেই তারা অনন্তকাল অমর হয়ে আছেন। তাদের ধৈর্যের বাঁধ কেউ ভাঙ্গতে পারেনি। স্রষ্টার সৃষ্টি প্রকৃতি, তার সাথে তাদের জীবনকে সাজিয়ে ছিলেন বলে তারা আজ এত সম্মানী। তারা ছিলেন আলো, বাতাস, মাটি, পানি, পাহাড়, পর্বত ও শিশুর মত নিরপেক্ষ সাম্যবাদ ছিল তাদের প্রাণশক্তি। তারা ইচ্ছা করলে বড় বড় জমিদার হতে পারতেন। তারা ব্যক্তি সম্পত্তি চাননি। তারা নিজেরা প্রভাব বিস্তার করেননি। তারা বড় বড় বক্তব্য দিয়ে ধর্ম গুরু হতেও চাননি। তাদের কী সম্মান কম?
কত লাঠালাঠি হলো নেতাদের নামে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য। কিন্তু হযরত শাহজালাল (রহ.) এর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করায় আন্দোলন থেমে গেল। জিয়া বিমান বন্দরকে শাহজালাল বিমান বন্দর নাম দেওয়ায় সবই চুপচাপ হয়ে গেলেন। তাদের ওফাতের ৭শ’ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও মানুষ তাদের স্মরণ করে, সম্মান করে এবং শ্রদ্ধার সাথে ভক্তি করেন। তারা সম্পূর্ণভাবে সংসার ত্যাগী ছিলেন। প্রকৃতির লীলা সৌন্দর্যে তারা মুগ্ধ থাকতেন। মানুষের জীবনের গান, বাজনায় সুখে, দুখে তারা মুগ্ধ থাকতেন। তাদের আচার-আচরণ ছিল সম্পূর্ণ রূপে মানবিক। প্রকৃতির বিচিত্রকে তারা ধ্বংস করতে যাননি। তারা উগ্র ধার্মিক ছিলেন না। ধর্ম রক্ষায় মানুষ হত্যার মতো ঘৃণিত কাজ তারা করতেন না। তারা সামান্য আহার করতেন। তারা শোষণ করতেন না। কারো সম্পদ কেড়ে নিয়ে হজ্ব, যাকাত ও দান, খয়রাত করতেন না। তারা হারাম টাকা চাঁদা তুলে ধর্মের বড় বড় কাজ করেননি, ধর্ম প্রচারও করেননি। যারা ধর্ম মানে না, তাদেরকে কাতল করেননি, দেশ ছাড়াও করেননি। তারা শুধু অত্যাচারী শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিলেন। আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর নিয়ে বা শিয়া-সুন্নি কুর্দি নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেননি। তারা সৃষ্টিকে মেনে, সৃষ্টিকর্তার সব প্রাণীকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। তারা সৃষ্টিকূলে বিভাজন সৃষ্টি ও মারধর লাগাতেন না। তারা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট জীবদের ভালবাসতেন। কোনো মতবাদ নিয়ে ঝগড়া সৃষ্টি করেননি। তারা প্রকৃতির মত সব সৃষ্ট বস্তুর উপকারে দিন কাটাতেন। তাই শাহজালাল (রহ.) নাকি বাঘের বিচারও করতে পেরেছিলেন। সবই তাঁর আত্মত্যাগের ফসল ও পরোপকারীতার নিদর্শন। সাম্যবাদকে জীবনের সবচেয়ে মোক্ষম গুণ মনে করতেন। তারা সিলেট দখল করেননি। তারা কাউকেও কাফের নাস্তিক-মুরতাদ বলেননি।
তাই বিভিন্ন দেশেই তারা দয়ার সাগর হয়ে যান। তারা ধর্মীয় উগ্রতা মোটেই দেখাতে যাননি। তাদের সঠিক ধর্ম ছিল মানবতা ও জীবে প্রেম করা। তারা ছিলেন জীবপ্রেমের ঈশ্বর। তারা বলতেন হাজার এবাদত এক আদালত। কেউ ধর্ম না করলে আল্লাহর কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু তার সৃষ্ট বস্তুর ক্ষতি তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করেন বলে তারা জানতেন। কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক বেশ্যা মেয়ে পার পেয়েছিলেন বলে তারা জানতেন। তারা সৃষ্টিকর্তার মত সাম্যবাদী প্রেমিক ছিলেন। তাই তারা সমস্ত মানুষের মন জয় করার কারণে প্রতিদিন মানুষ দেশ-বিদেশ হতে এসে ভিড় জমান তাদের মাজারে। যে কাজ করলে একজন মানুষ মনে কষ্ট পাবে সে কাজ করেন নি তারা। তারা মনে করতেন সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষকে আঘাত দিলে সে আঘাতের জবাব সৃষ্টিকর্তার কাছে দিতে হবে। কেহ ধর্মের কাজ না করলেও তাকে ঘৃণা করতেন না। একটু তেড়া চোখে তাকানো মহাপাপ মনে করতেন। কারণ প্রতিটি মানুষের সহিত সৃষ্টিকর্তা বিরাজমান। সৃষ্টিকর্তা কোনো মানুষকে প্রাণে মারা বা প্রকৃতি পশু-পাখি বধ করার ক্ষমতা দেননি। দুনিয়াবী আইনেও পাপ প্রমাণ হলে প্রাণদন্ড নিশ্চিত। সৃষ্টিকর্তার খুশীর জন্য যারা ধর্মে হাজারও মানুষ হত্যা করেছেন তারাও কোন মানুষ নয়, পাশবিক বলে পীর আউলিয়ারা মনে করতেন। তারা স্রষ্টার বস্তুভান্ডারই মূল্যবান মনে করতেন। স্রষ্টার বা সৃষ্টির কোনো জাত ধর্ম নাই তারা তা জানতেন। প্রাণ আছে এমন বস্তু পশুই ছিল তাদের কাছে বড়। বর্তমান স্রোতের টানে তারা চলতেন না। তারা জীবনের গভীরে কাল কাটাতেন। তারা ছিলেন বস্তুবাদী। তারা মনে করতেন সৃষ্টির প্রেমে মুগ্ধ হয়ে সব বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন। কোনো ধর্ম বলে তা ধ্বংস করার অর্থাৎ তাকে অমান্য করা পাপ মনে করতেন। কিন্তু এখন দেখা যায় ধর্মাশ্রয়ীরা মানুষ মেরে ধর্ম রক্ষায় ব্যস্ত। আল্লাহর এক ধর্ম জীবে প্রেম। তাই দিবারাত্রি আলো, বাতাস ও আহার দিয়ে বস্তু জগৎকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। যে কাজ করলে ব্যাপক মানুষের মধ্যে উত্তেজনা আসবে সে কাজ বা সে ধর্ম তারা করতেন না।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাহজালাল সাহেবের মাজারে ওরস ও নাচ গান, বাদ্যযন্ত্র বন্ধ করার জন্য কতেক মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক বড় আন্দোলন শুরু করেন, লাঠালাঠিও হয় কিন্তু যারা ইনকামে শরিক তারা কিন্তু তাদের সাথে ছিলেন না। সে সময়ে মুক্তিযোদ্ধা নেতা ও স্বেচ্ছাসেবকের কাছে বিচার আসলে বৈঠক হয়, তখন বিচারীরা উভয়ের ভাব বুঝে যারা মোকামের ইনকামে শরিক তাদেরকে দাওয়াত করা হলো। ধর্ম রক্ষার্থে নাচ গান বাজনা কি বন্ধ করা হবে? তখন তারা বলেছিলেন হাজার বছর ধরে নাচ, গান, বাজনা চলছে ওরস হচ্ছে মেয়েছেলে সবাই আসছে। শাহজালাল তো জিন্দাপীর তারা যখন বাধা দিচ্ছেন না তাহলে বন্ধের কি আছে? তাহলে দেখা যায় শরিক হলে যাইজ, আর শরিক না হলে না জায়েজ বলে সব ধর্মের কার্যক্রম চলছে। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে কেউ নাই। কিন্তু পীর আউলিয়ারা কি এমন ছিলেন? তাই তারা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। বস্তু প্রেমিকরা জাতি, ধর্ম কখনো মানেন নি। তাদের মধ্যে ধর্মের গন্ধ পাওয়া যায় না। আমাদের গোয়াইনঘাট রাতারগুল সুন্দর বনের নিকট দুইজন পীর আউলিয়া ছিলেন তাদের মধ্যে একজন মুসলমান, অন্যজন হিন্দু ছিলেন। আজ পর্যন্ত তারা তো ধর্মান্ধ হয়ে আলাদা হননি মটরঘাটের মোকামে।
প্রকৃতি ও পাহাড় পর্বতের মত ছিল তাদের ধর্ম নিরপেক্ষতা। ধর্ম ছিল তাদের মানবতা। তারা মানুষের মন জয় করে অমর হয়ে আছেন। বন-জঙ্গল, মানুষ, বৃক্ষ, পশু-পাখি, পোকা মাকড় তো একই সৃষ্টির লীলা তা সৃষ্টিকর্তা পালন করে যাচ্ছেন সমভাবে। তাতে অন্য মানুষ মতবাদ দিয়ে কেন ঝগড়া লাগাবে? তাদের স্বার্থ কোথায়? সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু জীবকে শিকার ধরার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছেন মহান প্রকৃতি। কোনো স্কুল মাদরাসায় তো জীব-জন্তু প্রাণীকে পড়তে হয়না। পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্র তো প্রাণী কুলের। আজকে সাম্প্রদায়িক বিশ্ব কি স্রষ্টার তৈরী? মানুষ কি ভিন্ন ভিন্ন রক্ত নিয়ে জন্মেছেন? সাদা কালো সব মানুষতো এক, সুখ-দুঃখ, রোগজরা চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে আছেন। বিশ্বে যারা রাষ্ট্রনায়ক তারা কি বোঝেন না প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ এক ও অভিন্ন জাতি? মানুষের অধিকার কি মানুষ দেবে না? আজকে দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ ফিলিস্তিনীকে অধিকার বঞ্চিত রাখা কি উচিত? বিশ্বের দেশে দেশে ধর্মকে নিয়ে এত উগ্র হয় কেন মানুষ? তা কি স্বার্থ রক্ষা নয়? মানুষ বিভাজনের সকল কার্যকলাপ কি বন্ধ করা যায় না? ধর্ম, বর্ণ নিয়ে রাজনীতি কেন হবে? ধর্ম তো যার যার ব্যাপার, পীর ফকিরদের কাছ হতে কি শিক্ষা নেওয়া যায় না? মুসলিম বিশ্ব, হিন্দু-খৃষ্টান বিশ্ব বলতে কি লজ্জা হয় না? সকল মানুষের বিশ্ব কী সৃষ্টিকর্তা করেন নাই? মানবতা বিসর্জন দিয়ে যারা ধর্ম কোন্দল করে তারা স্বীয় সৃষ্টি মানে না। তারা পক্ষপাতিত্ব করে বিশ্ব ধ্বংস করছে। তারা ধ্বংসকারী নাস্তিকতাবাদী। যারা দুনিয়ার সকল প্রাণীকুলকে ধ্বংস করে তারাই নাস্তিক। আর যারা জীব জগৎকে ধরে রাখতে চায়, তারাই আস্তিক। কিন্তু আজ উল্টো চলছে জনস্রোত।
মহান ব্যক্তিরা যে, মানবতায় প্রেম করেছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমি বালাগঞ্জের সিকন্দরপুর গিয়ে পেয়েছিলাম। একদিন মখতার খান লন্ডনী সাহেব আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তার মেজরটিলা দীপিকায় আমি ভাড়া থাকতাম। সে সুবাদে আমি তার গ্রামে গিয়ে দেখতে পাই একটি বড় মাজার। তখন আমি সেই মাজারে গিয়ে দেখি আরো একটি মাজার পাশে। তখন জনগণকে জিজ্ঞাসা করলাম ওই দুটি মাজার কার কার? তখন লোকজন বললেন, একটি সিকন্দর শাহ মাজার আর অপরটি তার জানের দোস্ত ঠাকুর কলমন্দর আলীর। তিনি ছিলেন হিন্দু। আমি আরো জানতে পারলাম ওই মাজারে প্রতি বছর ওরস হয়। কিন্তু বন্ধ করা হয়না। কারণ সিকন্দর শাহ নাকি আদেশ দিয়ে গিয়েছেন বদ্ধ না করার জন্য। কারণ তার দোস্ত হিন্দু। তিনির মনে আঘাত পাবেন তাই। তারা দশ গ্রামের লোক প্রতি বছর তোষা ও গুড়ের শিরণী করে থাকেন। এত বছর ধরে সিলেটের এই সিকন্দরপুরে ধর্ম নিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তকে ধরে রেখেছেন তা আমরা জানি? এক কথায় মহান ব্যক্তিরা একটি মানুষের মনকে একটি ভুবন মনে করতেন। ধর্ম নামধারীরা নিজ স্বার্থে হানাহানী করে বিশ্ব ধ্বংস করছেন।
আমরা মানুষ হয়ে কি পাশবিকতা করছিনা? মানুষ রাষ্ট্র ক্ষমতা পেল কোথায়? ধর্ম, জাত, পাত, বর্ণবাদ কি মানুষের তৈরী নয়? সৃষ্টিকর্তার আরাধনা কি মানুষ হত্যা, বোমাবাজি, ধ্বংসলীলা, প্রতিহিংসা? মানুষ বিভাজননীতি কি স্রষ্টার কাম্য? মানুষ কি সৃষ্টিকর্তার তৈরী নয়? সৃষ্টি যাই হোক, তা কি মানুষের শত্র“? কখনো না। সৃষ্টি বা প্রকৃতি আদিকাল হতে যেভাবে মানুষ, পশু, গাছ-পালা, ফল-মূল, জীব বৈচিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সক্রিয় দেখতে পাওয়া যায়, তা কি সত্য নয়? গবেষণা করে সৃষ্টির ও প্রকৃতির কার্যকলাপ থেকে কি মানুষের শিক্ষা নেওয়া উচিত নয়? মানুষ আমরা যতই হিংস্র হচ্ছি তা কি সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য? ধর্মীয় কোন্দল করে মানুষ নিধন কি সৃষ্টির ইচ্ছা। সৃষ্টিকর্তা কি কোনো ধর্ম বিভাজন চান? ধর্ম বিভাজন, জাত, পাত, মানুষের মধ্যে পুঞ্জিভূত শুধু পুঁজিবাদ রক্ষার জন্য। যারা পুঁজিবাদ তারা সকল জাত, পাত, বিরোধী। হাওয়া বাতাসে, আলো-আঁধারে, মাটি, পানিতে তো কোনো ধর্মীয় উগ্র ভ্রান্ত ধারণা নাই? মানুষ কেন সৃষ্টিকে নিয়ে ঝগড়া করে, বিবাদ করে? এ পৃথিবীর মানুষের জন্য একই ধর্ম মানবতা। আজ যে রাষ্ট্রনায়করা বিভিন্ন ধর্মে রাষ্ট্র ভাগ করে যাচ্ছেন তা কি মানবতা? মানুষের রাষ্ট্র একটাই তা কি আমরা মানুষ বুঝিনা? সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষ কোন ধর্ম নাই। তিনি সকলের পালনকর্তা। সকল জীব-জন্তুর প্রতি তার সমান আচরণ। তাই বিশ্বের মানুষকে চিন্তা করে প্রকৃতির শিক্ষায় এগিয়ে যেতে হবে এবং বিশ্বকে অস্থিরতা হতে রক্ষা করতে হবে। তাছাড়া কোন উপায় নেই। রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ করা উচিত। যার যার ধর্ম যার যার বিশ্বাস মতো পালন করেই পার পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট।

ইসলামী চিন্তা-গবেষণার গুরুত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দানে তাবিঈগণের পদ্ধতি: সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দানের ক্ষেত্রে তাবিঈগণের যুগে নতুন কোন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়নি। বরং তারা সাহাবীগণের পদ্ধতিই অনুসরণ করতেন। তবে এ যুগে ইজতিহাদ ও কিয়াসের ব্যাপক প্রচলন ছিল। যুক্তি দর্শন ভিত্তিক এ পদ্ধতির গোড়াপত্তন মূলত ইবরাহীম নাখয়ীর হাতে হয়, যিনি আলকামা নাখয়ীর ছাত্র ছিলেন। আর আলকামা নাখয়ী সরাসরি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে ফিকহ শিক্ষা করেন। সাহাবীগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) অধিক হারে রায় ও কিয়াস প্রয়োগের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ছিলেন। “ইবনে কাইয়্যিম, ইলামুল মুয়াক্কিইন, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৬০-৬১। এ সময়কালে যুক্তি ও দর্শন নির্ভর এ পদ্ধতি উদ্ভাবের কারণ এ সময়ে ইসলামী সম্রাজ্য সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহণের ফলে অধিক হারে নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হয় যার কোন সমাধান সরাসরি কোরআন, সুন্নাহ বা পূর্বের আইনী উৎসে বিদ্যমান ছিলনা। এ সময়ে ইরাক ছিল সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। এ কারণেই ইসলামী বিধান নির্ণয়ের এ পদ্ধতিটিও এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল। “ইবনে খালদুন, মুকাদ্দামা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১৬।
তাবিঈগণের পরবর্তী যুগ অর্থাৎ তাবে-তাবিঈগণের যুগে এ বিষয়ক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সোনালী অধ্যায় রচিত হয়। এই যুগেই প্রধান চার মাযহাবের প্রকাশ ও তাদের ফিকহ সংকলন সম্পন্ন হয়। ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল বর্তমান সময়ে এসে তাকে আমরা নিম্নোক্ত চারটি পদ্ধতি সীমাবদ্ধ করতে পারি: ১. ‘শরঈ দলীল’ শরীয়াতের মূলনীতি ২. ‘ফিকহী কায়িদা’ ফিকহের মূলনীতি ৩. ‘তাখরীজ ফিকহী’: ফিকহী বিশ্লেষণ ৪. ‘মাকাসিদ শরীআহ’ : শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্য।
১. ‘শরঈ’ দলীলের মাধ্যমে বিধান নির্ণয়: শরঈ দলীল অর্থাৎ ইসলামী আইনের উৎস কয়টি সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম তুফী তার রিসালাহ ফী রিআতুল মাসলাহা’ গ্রন্থে ইসলামী আইনের ১৯টি উৎ সের বর্ণনা দিয়েছেন। উক্ত গ্রন্থের ভাষ্যকার ড. আহমদ আব্দুর রহীম সায়েঈ এছাড়া আরও ২৬টিসহ মোট ৪৫টি উৎসের উল্লেখ করেছেন। “তুফী, ইমাম, রিসালাহ ফী রিআয়াতুল মাসলাহা, বিশ্লেষণ: ড. আব্দুর রহমান সায়েঈ, বৈরূত: দারুল মিসরিয়্যাহ লিবনানিয়্যাহ, ১৪১৩ হি. পৃ. ১৩-২১। ফকীহগণ শরীয়াতের দলীলসমূহ দু’ভাগে ভাগ করেছেন-
প্রথম ভাগ: যেসব উৎসের ব্যাপারে আলিমগণ একমত হয়েছেন। এর মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহ, ব্যাপারে সকলেই একমত। জমহুর ফকীহগণ ইজমা ও কিয়াস শরীয়াতের উৎস হওয়ার ব্যাপারে একমত। মুতাযিলা মতাদর্শী নাজ্জাম ও খারিজীগণ ইজমা এবং জাফিরিয়্যাহ ও জাহিরিয়্যাহ সম্প্রদায় কিয়াসের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। “আল-হাজুরী, মুহাম্মদ ইবনে হাসান, আল-ফিকরুস সামী ফী তারিখিল ফিক্হ আল-ইসলামী, বৈরূত: দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যা, ১৪১৬ হি. খ. ৩, পৃ. ৩০।
দ্বিতীয় ভাগ: যেসব দলীলের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, ইমাম কারাফী তার সংখ্যা বলেছেন ১৫। ড. আবদুর রহীম সায়েঈ এর বর্ণনা অনুযায়ী ৪১। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা ও ফকীহগণের মতামতের ভিত্তিতে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৮।
১. ইস্তিহসান, ২. ইস্তিসহাব, ৩. মাসালিহ, ৪. উরফ, ৫. সাদ্দুজ জারাঈ, ৬. সাহাবীগণের ফাতওয়া, ৭. মদীনাবাসীর কর্মকান্ড ও ৮. পূর্ববর্তী শরীয়াত।
শরঈ দলীলের ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়ের নীতিমালা শরঈ দলীলের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ নীতিমালা রয়েছে, যা অনুসরণ করা জরুরী।
প্রথম: নস অনুধাবনের ক্ষেত্রে শব্দের দালালাত বা শব্দার্থতত্ত্বকে গুরুত্ব দেয়া নসে বর্ণিত শব্দের প্রকৃত অর্থ জ্ঞাত হওয়া ব্যতীত গবেষক কোনক্রমেই তা থেকে বিধান উদ্ভাবন করতে পারবেন না। এ কারণে ইমাম গাযালী শব্দার্থ তত্ত্বকে উসূলে ফিকহের মূলস্তম্ভ গণ্য করেছেন। “আল-গাযালী, আল-মুস্তাসফা, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৩১৫। একই কারণে আধুনিক অনেক উসূলবিদ দালালাত তথা শব্দার্থতত্ত্ব অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন “দলীল থেকে বিধান উদ্ভাবনের পদ্ধতি বা নীতি’’। আবু যাহরা, উসূলুল ফিকহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৫, আয-যুহায়লী, উসূলুল ফিকহ, প্রাগুক্ত, খ-১, পৃষ্ঠা-১৯৭’’।
দ্বিতীয়ত: নসকে খারাপ উদ্দেশ্যে ও বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তার প্রকাশ্য রূপ থেকে বের না করা বাতিনী সম্প্রদায় যেমনটি করে থাকে। আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম বলেন, মুফতি মুজতাহিদ বা গবেষক কোরআনের আয়াতের অথবা রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ’র ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তার উচিত নয় যে, নিজের কুপ্রবৃত্তির চাহিদার্থে বিকৃত এমন করে তবে তার ফাতওয়া বা ইসলামী বিধানের ভাষ্য দেয়ার অধিকার রহিত হবে এবং তাকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে। “ইবনে কাইয়্যিম, ইলামুল মুকিঈন আন-রব্বিল আলামীন, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৮৯।
তৃতীয়ত : বিধানের ফলে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া সম্পর্কে সচেতন হওয়া অর্থাৎ সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পরে যাতে এর সাথে শরঈ কোন দলীলের বৈপরিত্য সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া।
চতুর্থত : নস অথবা শব্দতত্ত্বের মধ্যে বৈপরিত্যের ক্ষেত্রে এর মধ্যে সমন্বয়, ধারাবাহিকতার পদ্ধতি অবগত হওয়া।
উসূলবিদগণের শর্তানুযায়ী যদি এসবের মধ্যে বৈপরিত্য থাকে তবে সেক্ষেত্রে করণীয়। ‘‘বারযানজী, আব্দুল লতীফ, আত্তাআরুদ, ওয়াত তারজীদ, বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪১৩ হি. খ-২, পৃ. ১২৮-১৩৪’’।
১. উভয়ের মধ্যে সমন্বয় করা ২. সমন্বয় সম্ভব না হলে একটিকে অগ্রাধিকার দেয়া ৩. অগ্রাধিকার সম্ভব না হলে ইখতিয়ার প্রদান।
পঞ্চমত: নস বুঝার ক্ষেত্রে আকলে সালীম (সুস্থ বিবেক) কাজে লাগানো।
আলিমগণ একমত যে, সুস্থ বিবেক সহীহ বর্ণনামূলক দলীলের বিরোধী নয়। তারপরেও যদি সহীহ বর্ণনার সাথে আকলের সংঘাত হয় সেক্ষেত্রে বর্ণনাকেই গ্রহণ করতে হবে ও আকল পরিত্যাগ করতে হবে। ‘‘ইব্নে, তাইমিয়া, তকী উদ্দীন, নাজমু আল-ফাতওয়া, বিশ্লেষণ: আনওয়ার আল-বায ও আমের আল-জাযযার, আল-কাহেরা: দারুল ওফা, ১৪২৬ হি. খ, ১৬, পৃ. ৪৪৪’’।
২. ফিকহী কায়িদায় মাধ্যমে বিধান নির্ণয়: ফিকহী কায়িদা মুজতাহিদ, গবেষক ফকীহ, মুফতী, বিচারক ও শাসকের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শরঈ ইলম। ফিক্হী কায়িদার সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে ফকীহগণ দুটি মতামতে বিভক্ত হয়েছেন। প্রথম মত অনুযায়ী এটি এমন এক সামগ্রিক বিষয় যা তার অধীনস্থ বিধান বা অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়, সামগ্রিক নয় যা অধিকাংশ শাখার বিধান নির্ণয়ের জন্য প্রয়োগ করা হয়। ‘‘আল-জুরজানী, আলী ইবনে আহমদ, আত্-তারিফাত, বিশ্লেষণ: ইবরাহীম আল-আবয়ারী, বৈরূত: দারুল কিতাব আল-আরাবী, ১৪১৩ হি. পৃ. ২১৯।’’ দ্বিতীয় মত অনুযায়ী এটি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধান বা অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়, সামগ্রিক নয় বা অধিকাংশ শাখার বিধান নির্ণয়ের জন্য প্রয়োগ করা হয়। ‘‘কাহতানী, ডা. মুফসির, মানহাজু ইসতিখরাজ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৭৭’’।
ফিক্হী কায়িদা ও উসূলের কায়িদার মধ্যে পার্থক্য : ফিকহ ও উসূল মূলত একটি গাছের দুটি শাখা স্বরূপ। একজন ফকীহকে যেমন-উসূলে পারদর্শী হতে হয়, একইভাবে একজন উসূলবিদকে ফিকহে পারদর্শী হতে হয়। তবুও উভয়টি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে উভয় কায়িদার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান।
ইমাম কারাফী সর্বপ্রথম এ দুই শ্রেণীর কায়িদার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেন। তিনি তাঁর আল-ফুরুক গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, মুহাম্মদ (সা.) এর শরীয়ত উসূল ও ফুরু এ দু’টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে। আর এ উসূল দু’ভাগে বিভক্ত-
প্রথম: উসূলে ফিকহ যার মধ্যে বিশেষত আরবী শব্দতত্ত্বের ভিত্তিতে উদ্ভাবিত বিধান সমূহের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: সামগ্রিক ফিকহী কায়িদা, যার মধ্যে শরীয়াতের বিধান প্রবর্তনের গুঢ়রহস্য বর্ণিত হয়েছে। যার কোন কিছুই উসূলে ফিকহে বর্ণিত হয়নি। “কারাফী, শিহাবুদ্দীন আহমদ, আল-ফুরুক, বৈরূত: আলিমুল কুতুব, তা. বি. খ. ১, পৃ. ২। অতএব বলা যায়, ফিকহী কায়িদা এমন এক বিধান যার অধীনে ফিকহের অসংখ্য গৌণ বিষয় একত্র হয়। আর উসূলের কায়িদাক মূলত এমন নীতিমালাকে বলা হয় যা একজন ফকীহকে শরঈ দলীল থেকে বিধান নির্ণয়ের পন্থা বাতলে দেয়।
ফিকহী জাবিত (বিধি) ও ফিকহী কায়িদার (মূলনীতি) মধ্যে পার্থক্য: ফিকহী জাবিত বলা হয় এমন এক সামগ্রিক বিধানকে যা ফিকহের একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়ের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার উপর প্রয়োগ করা হয়। “কাহতানী, ড. মুফসির, মানহাজু ইসতিখরাজ, প্রগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৮৬। উপরিউক্ত সংজ্ঞা থেকেই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয় যে, কায়িদা বা মূলনীতি এমন এক সামগ্রিক বিষয় যা বিভিন্ন অধ্যায়ের বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন মাসআলার ওপর প্রয়োগ করা হয়। পক্ষান্তরে জাবিত শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অধ্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
উদাহরণ (উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে বিধান নির্ধারিত হয়) কায়িদাটি ফিকহের বিভিন্ন অধ্যায় যেমন- তাহারাত, সালাত, যাকাত, সাওম, নিকাহ, তালাক ইত্যাদি বিষয়ের উপর প্রয়োগ করা যায়। এমনকি ইমাম শাফিঈ থেকে বর্ণিত হয়েছে, এটি সত্তরটি অধ্যায় প্রবিষ্ট হয়। “সুয়ূতী, জালালুদ্দীন, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ের, প্রাগুক্ত, পৃ.৪৩। কিন্তু জাবিত শুধু একটি অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। যেমন-‘মৃতব্যক্তি ব্যতীত যার উপর গোসল ফরয তার ওপর অযুও ফরয’ এটি শুধু তাহারাতের অধ্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করে। “কাহতানী, ড. মুফসির, মানহাজু ইসতিখরাজ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৮৭।
কায়িদার মাধ্যমে বিধান নির্ণয়ের শর্ত : ১. যে কায়িদাটি প্রয়োগ করা হবে সে কায়িদা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শর্ত বাস্তবে থাকা। যেমন- ‘‘কষ্ট সহজিকরণকে টেনে আনে’’ “সুয়ূতী, জালালুদ্দীন, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়েয, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০: ইবনে নুজায়েম, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়েয, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৪। ‘‘কষ্ট সহজিকরণকে টেনে আনে’ এ কায়িদাটি বাস্তবায়নের জন্য যেসব শর্ত রয়েছে তা হল। “আল-কারফী, আল-ফুরুক, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১১৮।
ক. কষ্ট বা ক্লেশ বাস্তবেই বর্তমান থাকা। খ. কষ্ট বা ক্লেশ স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া। গ. উক্ত কষ্ট প্রদান শরীয়াত প্রণেতার উদ্দেশ্য না হওয়া। ঘ. কায়িদাটি প্রয়োগ করলে যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছু ছুটে না যায়।
২. কায়িদা সংশ্লিষ্ট বিধান তার চেয়ে শক্তিশালী দলীল বা কায়িদা বিরোধী না হওয়া। যেমন- “ফিকহের মূলনীতি হলো সকল মৃত জীব হারাম” “সুয়ূতী, জালালুদ্দীন, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৮৪। কিন্তু এটি মাছের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে না। কেননা মৃত মাছ খাওয়ার বৈধতার ব্যাপারে মহানবী (সা.) এ থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। “বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, অধ্যায়: আত-তাহারাত, অনুচ্ছেদ: হুত ইয়ামুতু ফীল মায়ি ওয়াল জারাদাহ, খ. ১, পৃ. ২৫৪,
৩. যে বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের জন্য কায়িদা প্রয়োগ করা হবে বিষয়ে কোরআন সুন্নাহ, ইজমার কোন নস বর্ণিত না থাকা। অন্যান্য কায়েদার ক্ষেত্রে একই ধরণের সতর্কতা নিতে হবে।          (চলবে)

ইসলাম ও পরিবেশে হেমন্তের উৎসব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

বাংলাদেশের সর্বত্র সবুজ ধানের ক্ষেতে হলুদ আভার হাতছানি। একই সাথে শীতের আগমনী গান বাজছে প্রকৃতিতে। শিশির বিন্দু সাজিয়ে দিচ্ছে ধানের শীষকে। প্রকৃতি সেজেছে যেন নতুন রূপে। অগ্রহায়ণ ধান কাটার মৌসুম। সর্বত্র পাকা ধানের মৌ মৌ ঘ্রাণ। দিগন্ত জোড়া পাকা ধানের হলুদ হাসি দেখে কৃষকের মনও আনন্দে নেচে ওঠে। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সারা বছর যে পরিশ্রম করেছে মাঠভরা ফসলের দৃশ্য দেখে সে কষ্ট নিমেষেই ভুলে যায় কৃষক। বাংলার গ্রামে গ্রামে ধান কাটার ধুম পড়ে এ মাসে। দল বেঁধে কৃষকরা রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কেটে করে ঘরে ফিরে। ধান ভানার গান ভাসে বাতাসে। ঢেঁকির তালে মুখরিত হয় বাড়ির আঙিনা। অবশ্য যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় ঢেঁকির শব্দ কিছুটা কমে গেলেও এখনো হারিয়ে যায়নি বটে। অগ্রহায়ণে বাংলার অপরূপ রূপে মাতোয়ারা হয়ে কবি জীবনানন্দ দাস লিখেন তার অমর পঙতি, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ির তীরে এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়তো শঙ্খচিল শালিকের বেশে/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে। অগ্রহায়ণ মাসে শুরু হয় বাঙালির প্রাণের নবান্ন উৎসব। নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে কৃষকের আঙিনা। কৃষাণীর কাজের কোন শেষ নেই। ধান মাড়াই করা, সিদ্ধ করা বা রোদে শুকানো। দিন-রাত কাজ। কিন্তু কোন ক্লান্তি নেই। অভিযোগ নেই। বরং আনন্দের হিল্লোল সবার মনে।
নতুন ধান ঘরে ওঠার পর শুরু হয় নবান্ন উৎসব। নতুন ধানের পিঠা উৎসব বসে ঘরে ঘরে। পাকন, চিতুই, ভাপা, পাটি সাপটাসহ বিচিত্র সব নকশি পিঠা তৈরি হয় গ্রামে গ্রামে। নতুন চালের সাথে খেজুর রস মিশিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু পায়েস। নবান্নের সময় বাড়ির জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়। মেয়েকেও বাপের বাড়িতে ‘নাইওর’ আনা হয়। নতুন ধানের ভাত মুখে দেয়ার আগে মিলাদ পড়ানো হয়। মসজিদে শিন্নি দেয়ার রেওয়াজও আছে গ্রামে। হিন্দু পরিবারে চলে পূজোর আয়োজন। সর্বত্র ধ্বনিত হয়, ‘আজ নতুন ধানে হবে রে নবান্ন, সবার ঘরে ঘরে।’
কীভাবে এলো অগ্রহায়ণ? অঘ্রান বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির অংশ। ‘অগ্র’ অর্থ প্রথম আর ‘হায়ণ’ অর্থ মাস। আবুল ফজলের আইন ই আকবরী থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালে যখন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন তখন অগ্রহায়ণই ছিল প্রথম মাস। ধান কাটার মধ্যদিয়েই বাঙালি জাতি তাদের বছর শুরু করতো। পরবর্তীকালে হিজরী সালের সাথে বাংলা সালের মিল রাখতে গিয়ে বৈশাখ মাসকে প্রথম মাস ধরা হয়। হিজরী সাল শুরু হয় মহররম মাস দিয়ে। সে সময়টাতে বাংলায় হয় বৈশাখ।
এভাবে মাসের পরিবর্তন হলেও বাঙালির সত্যিকার বর্ষবরণের শুরু হয়; কিন্তু অগ্রহায়ণেই। কারণ, তখন কৃষকের ঘরে থাকে প্রাচুর্য-সুখ। নবান্ন উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন হলো মেলা। হরেকরকম দোকান নিয়ে বসে গ্রামীণ মেলা। শুধু গ্রামের নয়, শহরেও ব্যাপকভাবে আয়োজন হয় মেলার। এই মেলায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি, সন্দেশ, খেলনা পুতুল, মাটির জিনিসপত্র। কৃষক মেলা থেকে ফসল বিক্রির টাকায় বউয়ের জন্য তাঁতের শাড়ি, মেয়ের জন্য আলতা আর ছেলের জন্য কেনে বাঁশি। সেই সাথে মুড়ি-মুড়কি, সন্দেশ-মুড়ালি কেনা হয়। মেলাকে ঘিরে গ্রাম-গঞ্জে সব শ্রেণীর মানুষের ঢল নামে। মানুষে মানুষে মুখরিত হয় মেলাঙ্গন। দৃঢ় হয় মানুষের বন্ধন।
মজার ব্যাপার হলো, এতো কাল অগ্রহায়ণ ছিল গ্রামের উৎসব। কৃষকের উৎসব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নগর সংস্কৃতিতেও নিজের শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে অগ্রহায়ণ। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে এখন বেশ জাঁকজমকের সাথে নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। প্রতিবছর দেশের প্রথমসারির সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো একত্রে জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপন পর্ষদের ব্যানারে আয়োজন করে নবান্ন উৎসব। মেলা বসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায়। বাঙালির পল্লীগীতি আর দেশজ গানের সুরে সুরে শিল্পীরা মাতিয়ে তোলে শহুরে শ্রোতাদের। চারুকলায় বসে পিঠামেলা। হরেক রকম পিঠা চেখে দেখে শহরের সংস্কৃতিমোদি নাগরিকরা। এভাবে অগ্রহায়ণ বিনি সুতোর মালা গেঁথে শহর আর গ্রামের মানুষকে নিয়ে আসে একই বৃত্তে। সবার প্রাণে ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির মাহাত্ম্য। একই সুর বাজে সবার মনে। ঐক্যের চেতনায় দীপ্ত হয় বাঙালির চিত্ত।
অগ্রহায়ণে কৃষকের গোলা ভরে উঠবে আমন, আউশ আর ইরি ধানে। নতুন হৈমন্তিক ধানের গন্ধে মৌ মৌ করা চারপাশে কেমন উৎসবের আমেজ। বাড়ি বাড়ি নতুন চালের পিঠা। রাত জেগে মা-চাচিদের উঠোন আলো করে পিঠা বানানোর আয়োজন। বাংলার প্রধান কৃষিজ ফসল কাটার ক্ষণ হেমন্ত। কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম। নবান্ন মানে নতুন অন্ন। অঘ্রাণে আমন ধান পাকার পর সাধারণত এ উৎসব পালন করা হয়। নবান্ন হেমন্তের প্রাণ। স্মরণাতীতকাল থেকে ১ অগ্রহায়ণকে বলা হয়ে থাকে ‘বাৎসরিক সুদিন’। ‘অগ্র’ অর্থ প্রথম। আর ‘হায়ণ’ অর্থ মাস। এ থেকেই ধারণা করা হয়, এক সময় অগ্রহায়ণই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস। ইসলাম অবশ্য আমাদের শিখিয়েছে, আল্লাহ তায়ালার দেয়া প্রতিটি দিনই সুদিন। সময়ের কোনো ভালো-মন্দ নেই। ভালো-মন্দ আমাদের কর্মে।
অঘ্রাণ এলেই বাড়ির জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়। মেয়ে বাপের বাড়িতে ‘নাইওর’ আসে। ঘরে ঘরে পিঠা, পুলি, পায়েস, ক্ষীর এবং আরও হরেক ধরনের মিষ্টান্নের মেজবানি। কুটুম আসে। এবাড়ি-ওবাড়ি পিঠা দেয়া-নেয়া হয়। উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা এ সময় পুরো গ্রামবাংলা। নতুন চালের ভাত মুখে দেয়ার আগে মসজিদে দোয়ার অনুষ্ঠান করা হয়। শিরনি হাতে বাড়ি ফেরে গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবাই। প্রতিবেশীকে মিষ্টিমুখ করিয়ে নির্মল আত্মতৃৃপ্তিতে ভরে ওঠে কৃষকের মন। ইসলামে যে অতিথি আপ্যায়ন ও প্রতিবেশী তুষ্ট করার শিক্ষা দিয়েছে- এ যেন তারই প্রায়োগিক রূপ। নবান্নের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন মেলা। এ সময় গ্রামে গ্রামে মেলা বসে। ছেলে-বুড়ো সবাই দল বেঁধে মেলায় যান। দাদা-নানার হাত ধরে অঘ্রাণের গ্রামীণ মেলায় যাওয়ার স্মৃতি আমাদের অনেকেরই আছে। এসব মেলায় নানা ধরনের নকশা করা পিঠা, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, মন্ডা-মিঠাই, সন্দেশ, নাড়ু, তক্তি, নারিকেলসহ কত কী যে পাওয়া যায়, তার ইয়ত্তা নেই। শখের মৃৎশিল্প; মাটির তৈরি তৈজসপত্র, কাঠ-বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প কেনার হিড়িক পড়ে মেলাজুড়ে। নবান্নের মেলা গ্রামের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের পদভারে মুখরিত হয়।
নবান্ন আমাদের ঐতিহ্যের শস্যোৎসব। আল্লাহর নেয়ামত ভোগের উৎসব। আল্লাহর বাণী আমাদের স্মরণীয়, ‘হে আদম সন্তান, তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় সাজসজ্জা গ্রহণ করো আর খাও এবং পান করো। তবে অপব্যয় করো না, তিনি অপব্যয়ীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আরাফ : ৩১)। তেমনি হেমন্ত আমাদের অনুভবের ঋতু। এ সময় আল্লাহর নেয়ামত উপলব্ধি করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞচিত্ত হতে হবে। তার নির্দেশানুযায়ী জীবন পরিচালনার শিক্ষা ও প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। সব কিছুর নিপুণগ্রষ্টা দাতা ও দয়ালু আল্লাহ বলেন, ‘অতএব, আল্লাহ তোমাদের যেসব হালাল ও পবিত্র বস্তু দিয়েছেন, তা তোমরা আহার করো এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদতকারী হয়ে থাকো।’ (সূরা নাহল : ১১৪)।
১২ মাসের ছয় ঋতু নিয়ে আমাদের এ বাংলাদেশ। কালের আবর্তনে, প্রকৃতির বিবর্তনে সবুজের চাদরে নেমে আসে ষড়ঋতুর অনুপম রূপবৈচিত্র্য। ছয়টি প্রকৃতির ক্যানভাসে ভেসে ওঠে ছয়টি অনিন্দ্য শিল্পকর্ম। সুন্দরপিয়াসী মনে নিয়ে আসে চঞ্চলতা। বোধের দিগন্তে হেসে ওঠে অনন্ত রূপের আধার ও রূপ-রস-ছন্দ-আনন্দের মালিকের অলোক সক্ষমতা। ঘোরলাগা অনুভবে ভাবুকের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, ‘তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর/না জানি তাহলে তুমি কত সুন্দর…’
এ সময়ের পালাবদলে প্রকৃতিতে আসে হেমন্তকাল। হেমন্ত হলুদের কাল, সবুজের কাল, মৌ মৌ আমন ধানের আগমনীর কাল। হলুদ চাদরে ঢাকা প্রকৃতির কাল। প্রভাতে সূর্যের কিরণে ধান গাছের সুচালো অগ্রে শিশির নামা হিরক দানার আনন্দ কাল। মায়াবি প্রকৃতির মনোলোভা রূপে পৃথিবীর সজীবতার কাল। ছয় ঋতুর অন্যতম সুন্দর ও আরামদায়ক একটি হলো হেমন্ত। কবির ভাষায় ঋতুরানী। শুভ্র শরতের পরেই প্রকৃতিকে দৃষ্টিসুখ আনন্দে হাসাতে মাটির প্রতিবেশে জেগে ওঠে সরষে হলুদ হেমন্ত। কার্তিক আর অগ্রহায়ণের এ সময় দিনের সূর্য ঢেলে দেয় মায়াবি রোদ। রাতের আকাশে শুভ্রসজাগ থাকে রূপালি তারকারাজি। শুক্লপক্ষের চাঁদের নীলাভ জোছনা দেয় মন ভালো করা অনুভূতি। পূর্ণিমা হয়ে ওঠে শিশির ধোয়া রূপার থালা। মৃদু ছন্দ তুলে শিশির নেমে আসে ঘাসের ডগায়। সবুজ ধানের ক্ষেতে শুরু হয় শিশির আর দুধ-সাদা জোছনার মাখামাখি ভালোবাসা। প্রভুর প্রেমিক পুরো প্রতিবেশে শুনতে পায় রব্বে আলার গুণগান। শিশিরের ছন্দ-শব্দে মূর্ত হয় সুরেলা জিকির। আল্লাহর গোলাম ছুটে যায় জায়নামাজে। অবনত কপাল নেমে আসে তাঁর উদ্দেশে শুকরিয়া সেজদায়। প্রশংসার অনিন্দ্য সঙ্গীত সুর তোলে যায় ইন্দ্রীয় থেকে ইন্দ্রিয়ান্তরে।
প্রভাতি সমিরণে শীতের আগমন ধ্বনি। ঘাসের ডগায় শিশিরকণা মুক্তাদানা হয়ে হেসে ওঠে। সবুজ ধানের ক্ষেত কুয়াশা স্পর্শে হয়ে ওঠে আরও সজীব সুন্দর। রকমারি ধানের নানা ঘ্রাণে মনের ভেতর শুরু হয় মোহঘোর আন্দোলন। পোলাও ধানের ক্ষেতের আলে দাঁড়ালেই পেটের ক্ষুধা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কৃতজ্ঞ বান্দার মুখে ও মনে অজান্তেই উচ্চারিত হয় ‘আলহামদুলিল্লাহ’। মাঠের পর মাঠ সরিষার হলুদ ফুল দেখে মনে হয় প্রকৃতি তার হলুদ আঁচলের আদরে ঢেকে দিয়েছে পুরো বাংলাদেশ। সবুজ ধান আর সরষে হলুদ দিয়ে শুরু হওয়া হেমন্ত এক সময় হয়ে ওঠে ঐশ্বর্যের সোনালি রঙ সোপান। ধনী-গরীব সবার মুখে লেগে থাকে অকৃত্রিম হাসি। বাংলাদেশ জুড়ে নেমে আসে এক ঐশী সুখের সুবাতাস।
হেমন্তের শেষের দিনগুলোয় সবুজ মাঠ ক্রমে সোনালি রঙে আর হলুদ সরষে ধূসর রঙে বদল হতে থাকে। কাঁচা সবুজ ধান ও হলুদ সরিষার ফুলে ভর করে রিজিক। ধানের পেটে চালের বেড়ে ওঠা আর সরিষার পেটে তেলের বেড়ে ওঠায় কৃষকের আকর্ণ হাসির আড়ালে জেগে ওঠে মহামহিমের কৃতজ্ঞতা। কাস্তে হাতে কৃষকের ধান কাটার অপরূপ দৃশ্যে ছবি হয়ে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে সুবাসিত হয়ে ওঠে চারপাশ। বাদামি খড়ের বিচালিতে পথ-ঘাট-মাঠ হয়ে ওঠে কুদরতের বিছানা। আমনের ফলনে রিজিকের ফয়সালা হয় মানুষ, পশু আর পাখির। ভোরের নাশতায় হেসে ওঠে শুভ্র খই। সেই সঙ্গে খেজুর গুড় ও রসের শুরু হয় আগমনী গান।
হেমন্তের আবহাওয়া থাকে নাতিশীতোষ্ণ। শেষের দিকে শুরু হয় শীতের আগমন। রাত হতে থাকে দীর্ঘ। প্রেমিক বান্দার ঘুম ভেঙে যায় রাতের শেষে। গ্রীষ্মকালে রাত ছোট থাকায় অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন না। হেমন্ত আসতেই রাত দীর্ঘ হতে শুরু করায় তাহাজ্জুদের সুবর্ণ সুযোগ এটি। সমগ্র ভালোবাসার নৈবেদ্য নিয়ে হাজির হয় প্রভুর দরবারে। চোখের জলে নেমে যায় পাপের অতীত। মহান আল্লাহ বান্দাকে এমন নাতিশীতোষ্ণ প্রকৃতি দেয়ার একটা উদ্দেশ্য, বান্দা শান্তি ও আরামের সঙ্গে মশগুল হবে ইবাদতে।
যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করেন, কোরআন তাদের মুহসেন ও মুত্তাকি নামে অভিহিত করে। তাদের আল্লাহর রহমত এবং আখেরাতে চিরন্তন সুখ সম্পদের অধিকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুত্তাকি লোক বাগ-বাগিচায় এবং ঝরনার আনন্দ উপভোগ করতে থাকবে এবং যে নিয়ামত তাদের পরোয়ারদিগার তাদের দিতে থাকবেন, সেগুলো তারা গ্রহণ করবে। (কারণ) নিঃসন্দেহে তারা এর আগে (দুনিয়ার জীবনে) বড় পুণ্যবান ছিল। তারা রাতের খুব অল্প অংশেই ঘুমাত এবং শেষ রাতে এস্তেগফার করত। (কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে মাগফিরাত চাইত)’। (সূরা জারিয়াত : ১৫-১৮)।
রাসূল (সা.) বলেছেন, রাতের শেষ সময়ে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার দিকে নাজিল হন এবং বলেন, ‘ডাকার জন্য কেউ আছে কি, যার ডাক আমি শুনব; চাওয়ার জন্য কেউ আছে কি, যাকে আমি দেব; গোনাহ মাফ চাওয়ার কেউ আছে কি, যার গোনাহ আমি মাফ করব?’ (বোখারি)।
হেমন্তের আগমনধ্বনি যখনই নেমে আসে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে, তখনই অতিথি পাখিরাও আসতে থাকে। হাজার মাইল দূরের সেই পাখিদের আগমনীতে প্রতিভাত হয় আল্লাহর অনন্যতা। তিনি প্রকৃতিতে নিয়ে আসেন নানা অবস্থা। আবার সে অবস্থায় নিজের জীবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করে দেন তিনিই। তাই পাখিরাও তীব্র শীত থেকে বাঁচতে কম শীতের বাংলাদেশে চলে আসে। মুখর হয়ে ওঠে বাংলার বিল-ঝিল-সরোবর। ঋতুর পালাবদলে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ, প্রাণী, পশুপাখির জীবনযাত্রায় আসে পরিবর্তন। এসব পরিবর্তনের একমাত্র ক্ষমতা মহান আল্লাহর হাতে। তিনি এসব পরিবর্তনের মধ্যেই বান্দার জন্য রাখেন প্রভূত কল্যাণ আর ইতিবাচক শিক্ষা। বান্দার অভিব্যক্তি হিসেবে ভাষা পায় তা কোরআনে করিমে, ‘আপনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান।’ (সূরা আলে ইমরান : ২৭)। কালের এমন বিবর্তনের ব্যাপারে আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয় আসমানগুলো ও জমিনের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের বিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বিবেকসম্পন্নদের জন্য বহু নিদর্শন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯০)।
হেমন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে শুরু হয় ওয়াজ মাহফিল। প্রতি রাতেই কোথাও না কোথাও বসে ইসলামী আলোচনার আসর। সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পরপরই শুরু হয় হালকা গরম কাপড় কাঁধে বয়স্কদের মাহফিলের দিকে হেঁটে চলা। চলতে থাকে কিশোর-যুবারাও। বৃষ্টি ও ঝড়ের সম্ভাবনা না থাকায় এ সময়ই আমাদের দেশে বসে নানা আনন্দ-উৎসবও। হেমেন্তের সমাপনী দিনগুলোতে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নেমে আসে নবান্ন উৎসবের আনন্দ। রকমারি পিঠার আয়োজনে মেতে ওঠে পুরো দেশ। আল্লাহর গোলাম এসব আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে যায়। সেজদায় অশ্র“পাতে দেয় শুকরিয়ার নজরানা। ষড়ঋতুর অন্যতম এ হেমন্ত আরাম-শান্তি-সুখ আর ইবাদতের ঋতু হয়ে ওঠুক আমাদের সবার মনে-অন্দরে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

বাক স্বাধীনতা ও ইসলাম বিদ্বেষ

ওলীউর রহমান

বাকস্বাধীনতা একটি স্বাধীন দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু অধিকাংশ স্বাধীন দেশের মানুষ সে অধিকার থেকে এখন বঞ্চিত। তবে ‘বাকস্বাধীনতাকে’ ইসলামের বিপক্ষে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে ইঙ্গ মার্কিন এবং তাদের দোসর ইসলাম বিদ্ধেষী নাস্তিকরা। ‘মুসলমানদের স্বাধীনতা থাকতে নেই’ এই পুড়া মাটি নীতি যেসব দেশে ইঙ্গ মার্কিনীরা প্রয়োগ করতে পারছেনা অথবা যেসব দেশে সরাসরি কাস্টার বোমা ফেলা যাচ্ছেনা সেসব দেশে বাকস্বাধীনতাকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের সেই কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে তাদের খরিদ করা কিছু সেবাদাস। এই সেবাদাসগুলোর অধিকাংশ আবার পিতৃ পরিচয়ে মুসলমান, পিতৃপ্রদত্ত্ব ইসলামী নাম ধারন করেই নাস্তিকতার পোশাক পরে ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় কটুক্তি করে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে কিছু লোক আছে যারা ইসলাম ধর্মের কোরআন হাদীস, নবী রাসূল, নামাজ, পর্দা, পরকাল, হজ্ব, তাবলীগ এমনকি মহান আল্ল¬াহ সম্পর্কেও আজে বাজে কথা বলে। এই শ্রেণীর লোকেরা নিজেদেরকে মুক্ত চিন্তার অধিকারী, অতি আধুনিক ও প্রগতিশীল হিসাবে জাহির করতে গিয়ে আঘাত করে ইসলামকে। আর আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থাও হলো যে, ইসলাম সম্পর্কে কিছু উল্টা পাল্টা কথা বলতে পারলেই একে আধুনিক ও প্রগতিশীল মনে করা হয়। অথচ এদেশের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান এবং ধর্মপ্রাণ। ইসলামকে মনে প্রাণে এরা ভালবাসেন। এদের বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে তাওহীদ বা একত্ববাদ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের এ ভূখন্ডে প্রায় তিন লক্ষ মসজিদ রয়েছে। প্রতিটি মসজিদের মিনার থেকে রোজানা পাঁচ বার দরাজ কন্ঠে আযান দেয়া হয়। ফজরের মনমুগ্ধকর আযানের সুরেই এদেশের মুসলমানদের ঘুম ভাঙ্গে। মসজিদ, মাদরাসা, আযান, ইকামত ইত্যাদি হচ্ছে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ। এদেশের মানুষের কাছে কোরআন, হাদীস, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় গ্রন্থাদি, ধর্মীয় পোশাক সম্মানের পাত্র। ধর্মীয় ব্যক্তি, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও কৃষ্টি কালচারের প্রতি রয়েছে সীমাহীন শ্রদ্ধা ও ভক্তি। ধর্মীয় অনুভূতির বিশেষ একটি প্রভাব রয়েছে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও। সঙ্গত কারণেই ইসলাম সম্পর্কে যখনই কোন কটুক্তি বা কটাক্ষ করা হয় এবং দেশের নব্বই ভাগ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি এবং বিশ্বাসে আঘাত হানা হয় তখন গোটা দেশ আন্দোলিত হয়ে উঠে, হরতাল, অবরোধ, মিছিল, মিটিং ইত্যাদির আহবান করা হয়। জাতীয় সংকট সৃষ্টি হয়। অথচ বার বার গায়েপড়ে ইসলাম সম্পর্কে কটুক্তি করা হচ্ছে, ধৃষ্টতা দেখানো হচ্ছে এবং দেশে সমস্যা সৃষ্টি করা হচ্ছে? আর বহির্বিশ্বেও আমাদের ধর্মীয় ভাবমূর্তিকে কলুষিত করা হচ্ছে। এসব কেন করা হচ্ছে?
১৯৭৪ সালে দাউদ হায়দার ইসলামকে কটাক্ষ করে কবিতা লিখলে গোটা দেশ জুড়ে তাওহিদী জনতাা ফুঁসে উঠে। অবশেষে দাউদ হায়দার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় এবং এখনো তিনি নির্বাসিত অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। বিগত দুই দশক ধরে এদেশে ইসলাম বিদ্বেষ প্রবণতা আশংকা জনক ভাবে বেড়ে চলেছে। এর একটা কারণও আছে। ১৯৯৩ সালে আমেরিকান প্রফেসর স্যামুয়েল হান্টিংটন “তার সভ্যতার সংঘাত” (ঈষধংয ড়ভ ঈরারষরুধঃরড়হং) তত্ত্বে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, “পৃথিবীকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে ইসলামী সভ্যতার জগৎ এবং অপরটি হচ্ছে অন্য সব সভ্যতার জগৎ। আর সভ্যতার সংঘাত এড়াতে হলে কোন সভ্যতাকেই প্রধান্য দেয়া যাবে না।” অর্থাৎ তিনি তার এই থিওরীতে ইঙ্গ-মার্কিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইসলাম বিদ্বেষী অক্ষ শক্তিকে একথা বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, এই মুহূর্তে যদি ইসলামী সভ্যতাকে কোনভাবে দমন ও প্রতিহত করা না যায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে গোটা দুনিয়া ইসলামী সভ্যতার ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে যাবে। এর পর থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলাম বিদ্বেষ প্রবণতা নতুন মাত্রা লাভ করে। আফগানিস্তান ও ইরাকে অন্যায় অভিযান চালিয়ে ইঙ্গ-মার্কিনীরা দেশ দুটির লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে সভ্যতার লীলাভূমিকে তারা বধ্যভূমিতে পরিণত করে। এভাবে আরো বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এ সময়ে ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, সুইডেন ইত্যাদি দেশে ইসলাম বিদ্বেষীরা রীতিমত উন্মাদের মত আচরণ শুরু করে। সেই সাথে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশেও তসলিমা নাসরিন ইসলাম সম্পর্কে কটুক্তি করে। যার ফলে  সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। তখন বিএনপি সরকার ছিল। বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালালে কিশোর গঞ্জের স্কুলছাত্র আরমান আহমদ শাহাদত বরণ করে। অবশেষে দাউদ হায়দারের মত তসলিমাও দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ২০০৫ সালে ডেনমার্কের একটি পত্রিকা মহানবী (সা.) সম্বন্ধে আপত্তিকর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে। ২০০৭ সালে সুইডেনের একটি পত্রিকা হযরত মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অনুরূপ একটি আপত্তিজনক ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশ করে। এর প্রতিবাদে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে বিক্ষোভ শুরু হয়। এ ঘটনার মাত্র একমাস পরেই বাংলাদেশের ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা এবং সাপ্তাহিক ২০০০ হযরত মোহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে আপত্তিকর ব্যঙ্গ কার্টুন প্রকাশ করে। আর এভাবেই বাংলাদেশে স্যামুয়েল হান্টিংটনের “সভ্যতার সংঘাত” ফর্মূলার চর্চা শুরু হয়।
চলমান শতাব্দির দ্বিতীয় দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে ইসলাম বিদ্বেষ প্রবণতা বিপদজনক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন সময় ইসলাম সম্পর্কে যেসব লাগামহীন কথাবার্তা ও মন্তব্য করেছেন তা বার বার ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে আঘাত করেছে এবং ইসলাম বিদ্বেষ প্রবণতাকে উস্কে দিয়েছে। ২০০৯ সালে ২৮ মার্চ দেশের সর্ববৃহৎ সরকারী ইসলামী প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি শামীম আফজাল ইসলাম সম্পর্কে জঘন্যতম কটুক্তি করেন। তিনি একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, পৃথিবীতে যত সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ রয়েছে, তার সবই ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে (!)। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কোন জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়। এই শামীম আফজাল ২০১০ সালে আরেকটি ঘৃণিত কাজ করেন। এ বছরের নভেম্বর মাসে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি ইমাম সম্মেলনে আমেরিকান তরুণ তরুণীদের দিয়ে অশ্লীল ব্যালে নৃত্য পরিবেশন করেন। দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন সব বক্তব্য শুধু দুঃখজনক নয় বরং জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কলঙ্কজনকও বটে। শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং ২০১০ সালের আগষ্ট মাসে পবিত্র কোরআনের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছে। আর সেই মামলা দায়ের করেছিল বিশ্ব শান্তি পরিষদের সভাপতি দেবনারায়ণ মহেশ্বর। সে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত পরিবর্তন করে দেয়ার জন্য আদালতের কাছে প্রার্থনা করেছিল। অবশ্য আদালত তার রিট খারিজ করে দিলে তার এ ধৃষ্টতার জন্য উপস্থিত আইনজীবীরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন। অতঃপর পুলিশ প্রহরায় তাকে নিারাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে আর কোন প্রকার বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। শুধু এ ঘটনা নয় বরং এরূপ আর যতগুলো ইসলাম বিদ্বেষের ঘটনা ঘটছে কোন ঘটনারই সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা না করায় একের পর এক নাস্তিক মুরতাদদের আবির্ভাব ঘটছে এবং এরা তাদের প্রভুদের খুশি করার জন্য ইসলামকে নিয়ে রীতিমত খেল তামাশা শুরু করেছে।
আজ কলেজ ইউনিভার্সিটিগুলোতে কোন ছাত্র বা ছাত্রী নিয়মিত নামাজ পড়লে, টুপি বা বোরকা পরলে, দাড়ি রাখলে, ইসলামী বই সাথে রাখলে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ করা হয়, সন্দেহ করা হয় এবং জঙ্গী মৌলবাদী ইত্যাদি তকমা দিয়ে গ্রেফতার বা হয়রানী করা হয়। ্এসব ইসলাম বিরোধী তৎপরতা এবং বক্তব্যের নগদ ফলাফল হিসেবে আমরা ২০১৩ সালে শাহবাগে চরম ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকতার নগ্ন উন্মাদনা দেখেছি। ২০১৩ সালে আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ কে কেন্দ্র করে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল জানিনা ইতিহাস এই জাগরণকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে কিন্তু এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্লগাররা ইসলাম সম্পর্কে যেসব কটুক্তি করেছে ইসলামপূর্ব জাহিলিয়াতের বর্বর সমাজেও এরূপ ইসলাম বিদ্বেষের নজীর পাওয়া যায়না। আরবের জাহিলী বর্বর সমাজের লোকেরা ইসলামের প্রচন্ড বিরোধীতা করা এবং মুসলমানদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানোর পরও তারা হজ্ব, কাবাশরীফ, মহান আল্ল¬াহ এবং মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর চরিত্র নিয়ে কটুক্তি করে নাই। অথচ বাংলাদেশের মত একটি দেশে এই ঘৃণিত কাজগুলো অহরহ সংঘটিত হচ্ছে। সর্বশেষ লতিফ সিদ্দিকী টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী থাকা অবস্থায় একটু বেশি নগ্নভাবে ইসলামের উপর আক্রমণ করেছেন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়ের্কে একটি অনুষ্ঠানে তিনি হজ্ব, তাবলীগ জামাত এবং মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে কটুক্তি করে বক্তব্য দিয়েছেন। অবশ্য তিনি এর আগে ২০০৯ সালে তৎকালীন পাটমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বলেছিলেন, ধর্ম মদ ও তামাকের মত একটি নেশা। তার আপত্তিকর বক্তব্যে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হয়েছেন। যার দরুণ তাকে মন্ত্রীত্ব সহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি এখন আমেরিকা থেকে দেশে না এসে শুনা যাচ্ছে তসলিমা নাসরিনের মত ভারতে অবস্থান করছেন।
তসলিমা নাসরিন ও লতিফ সিদ্দিকী সহ যারা ইসলাম সম্পর্কে কটুক্তি করেছেন তাদের অধিকাংশ পিতৃ পরিচয়ে মুসলিম এবং পিতৃপ্রদত্ত ইসলামী নাম ধারণ করেই ইসলাম সম্পর্কে কটাক্ষ করে চলেছেন। তাদের সকলের মধ্যে মতাদর্শগত একটা মিল থাকা সত্ত্বেও তারা কেবল বাক স্বাধীনতার খাতিরেই ইসলাম সম্পর্কে কটুক্তি করছেন তা নয় বরং তারা সবাই একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে চলেছেন। আর তা হচ্ছে মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে দুর্বল করে ধর্মহীনতার ব্যাপক প্রসার ঘটানো। একাজে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মিডিয়া তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও চেতনাকে ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করানো এবং ইসলামের বিভিন্ন প্রতীক যেমন টুপি, দাঁড়ি, পাঞ্জাবী, বোরকা ইত্যাদিকে কলুষিত করে যুব সমাজের কাছে উপস্থাপন করার জন্য এদেশের কিছু কিছু মিডিয়া আদাজল খেয়ে লেগেছে। ইসলামপন্থীদের ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, জঙ্গি ইত্যাদি বলে নানা অপপ্রচার চালিয়ে ইসলামকে কলুষিত করার কাজে নিয়েজিত আছে এই মিডিয়াগুলো। আর এরূপ নানা রকমের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এদেশের জনগণের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের ধর্ম বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়া হয়েছে। ফলশ্র“তিতে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এভাবে স্যামুয়েল হান্টিংটনের “সভ্যতার সংঘাত” তত্ত্বের কোন পরিকল্পনা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না এটাই হলো আশংকার বিষয়। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নাস্তিকতা এবং ইসলাম বিদ্বেষ প্রবণতা বন্ধ করা প্রয়োজন এবং এ সংক্রান্ত যে আইন রয়েছে এই আইনকে যুগোপযোগী এবং আর কঠোর করা প্রয়োজন।

ইসলামী চিন্তা-গবেষণার গুরুত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সামাজিক প্রথা ও প্রচলনের প্রতি দৃষ্টিদান : ফকীহগণ ইসলামী আইন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রথা ও প্রচলনকে গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করেছেন, যার দৃষ্টান্ত অসংখ্য যেমন-রজ:স্রাব ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময়কাল, গর্ভধারণের মেয়াদ, যেসব অপবিত্রতাকে ক্ষমা করা হয়েছে, শপথ, অঙ্গীকার, অসীয়ত ইত্যাদি। ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রথার গুরুত্ব প্রমাণিত হয় ফিকহী মূলনীতি ‘রীতি ও বিবেচ্য বিধান’ থেকে যা মূলত ইবনে মাসউদ (রা.) এর উক্তি-“মুসলমানগণ যা ভালো মনে করেন আল্লাহর কাছেও তা ভালো। আর তারা যা খারাপ মনে করেন তা আল্লাহর কাছেও খারাপ”। “ইবনে হাম্বল, আহমদ, ইমাম, আল-মুসনাদ, বিশ্লেষণ: শুয়াইব আরনোট ও অন্যান্য, বৈরূত: মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪২০ হি. পৃ. ৮৪। এর আলোকে প্রণীত। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞগণ ৪টি বিশেষ শর্ত প্রদান করেছেন। “ইবনে নুজাইম, যয়নুদ্দীন ইবনে ইবরাহীম, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়েয, বিশ্লেষণ: মুহাম্মদ সুয়ূতী, জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, বৈরূত: দারুল কিতাব আল-আরাবী, ১৪০৭ হি. পৃ. ১৯২-১৯৩।
১. সামাজিক প্রথাটি ব্যাপক সমাদৃত থাকা। ২. প্রথাটি প্রচলনের শুরু থেকে অদ্যাবধি অবিকৃত অবস্থায় থাকা। ৩. উক্ত প্রথার বিপরীতে ভিন্ন কোন প্রথা চালু না থাকা। ৪. প্রথাটি শরীয়াতের স্পষ্ট বিধান বিরোধী না হওয়া।
শরীআহ অভিযোজন (ঝযধৎরযধ অফধঢ়ঃধঃরড়হ) : শরীআহ অভিযোজন বর্তমান সময়ে ব্যাপক ব্যবহৃত একটি ফিকহী পরিভাষা। প্রাচীন ফিকহের কিতাবে এ পরিভাষার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না, তবে কাছাকাছি কিছু পরিভাষা আছে, আধুনিক সময়ে আলিমগণ বিভিন্নভাবে এই পরিভাষাটি সংজ্ঞায়িত করেছেন। ড. ইউসুফ আল-কারযাভী বলেন, শরীআহ অভিযোজন অর্থ উদ্ভূত পরিস্থিতির উপর শরঈ নস প্রয়োগ। “কারযাভী, ড. ইউসুফ আব্দুল্লাহ, আল-ফাতওয়া বাইনাল ইনদিবাত ওয়াত তাসঈব, কুয়েত: দারুল কালাম, ১৪০২ হি, পৃ. ৭২’’। কোন মাসআলার শরীআহ অভিযোজন অর্থ উক্ত মাসআলাটিকে (শরীআহ বিরোধী বিধান থেকে) মুক্তকরণ ও তাকে নির্দিষ্ট গণ্য দলীলের সাথে সম্পৃক্তকরণ। “কুলআহ, ড. মুহাম্মদ রিওয়াস ও কুনাইবী, ড. হামিদ সাদিক, মুজামু লুগাতিল ফুকাহা, বৈরুত: দারুন্ নাফাইস, ১৪০৮ হি. পৃ. ১৪৩। এক কথায়, সাম্প্রতিক কোন বিষয়কে শরীআহ’র রঙে রঙিন করাকে বলা হয় শরীআহ অভিযোজন। অর্থাৎ, যেসব বিষয়ে শরীআহ’র সাথে সাংঘর্ষিক কিছু নেই তাকে শরীআহ’র বিধানের সাথে খাপ খাওয়ানো বা শরীয়াতের বিধানের সাথে তার যোগসূত্র স্থাপন।
শরীআহ অভিযোজনের গুরুত্ব : আধুনিক সময়ের ফকীহগণের নিকট দু’টি কারণে শরীআহ অভিযোজন শব্দটি বিশেষ গুরুত্ববহ। প্রথমত, সাম্প্রতিক বিষয়গুলো সমকালীন সর্বশেষ অবস্থাসমৃদ্ধ। পূর্ববর্তী ফিকহের কিতাবে যে সম্পর্কে কোন আলোচনা বিদ্যমান নেই। আবার বিষয়গুলো জটিল, দুর্বোধ্য অথচ জীবনঘনিষ্ঠ। এ কারণে এর বিধান নির্ণয় কষ্টসাধ্য। কেননা এক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা প্রয়োজন। অতএব শরীআহ অভিযোজন উক্ত পরিক্রমার একটি পদক্ষেপ ও পর্যায়। “আল-আওদাহ, সালমান ইবনে ফাহাদ, জাওয়াবিতুত দিরাসাত আল-ফিকহিয়্যাহ, তা. বি. পৃ. ৮৯।
দ্বিতীয়ত, বিগত কয়েক যুগে সভ্যতার উন্নতি ও সমাজব্যবস্থার যে পরিবর্তন হয়েছে ইতিহাসে এর কোন দৃষ্টান্ত নেই। এসব উন্নতি ও পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সে সম্পর্কিত বিধান গবেষণা করার মত ‘মুজতাহিদ মুতলাক’ (স্বাধীন ও স্বতন্ত্র চিন্তার অধিকারী শরীআহ উদ্ভাবক) এর অভাব এবং মাযহাবী মুজতাহিদের সংখ্যাধিক্যের কারণে শরীআহ অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা সাম্প্রতিক বিষয়ে বৈশিষ্ট্য, এর গুণাগুণ বিবেচনা ও তাকে রূপায়নের ক্ষেত্রে এর স্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
শরীআহ অভিযোজনের সময় লক্ষণীয় : ক. শরীআহ অভিযোজন শরীআহ’র মূলনীতির ভিত্তিতে শুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে হতে হবে। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিকটতম মূলনীতির মাধ্যমে অভিযোজনক করা যাতে ঐ মূলনীতির বিধানকে উক্ত বিষয়ের বিধান হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এতে কোন জটিলতা নেই। বরং জটিলতা তখনই দেখা দেবে যদি অসামঞ্জস্য মূলনীতির মাধ্যমে অভিযোজন করা হয়। খ. পরিস্থিতিকে শুদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ রূপায়নের জন্য সাধনা করা। বিষয়টি গবেষক, বিচারক ও আইন বিশ্লেষকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কিছু বিধান উক্ত বিষয়ের রূপায়ণেরই একটি অংশ। অতএব যে ব্যক্তি সাম্প্রতিক বিষয় রূপায়ণ করবে তার উচিত এর পূর্ণ ও শুদ্ধ রূপায়ণ করা এবং ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবস্থা, শাখা-প্রশাখা, মূলনীতি ইত্যাদি অবগত হওয়া। গ. মুজতাহিদকে মাসআলা উপস্থাপন ও মূলনীতির সাথে একীভূতকরণের ফিকহী যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। “কাহতানী, ড. মুফসির, মানহাজু ইসতিখরাজ আল-আহকাম আল-ফিকহিয়্যাহ লিন নাওয়াযিল আল-মুআসারাহ, মক্কা: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০০, খ. ১, পৃ. ৩৯৭-৪০৪ (সংক্ষিপ্ত)।
সম্মিলিত ইজতিহাদ: ইসলামী আইন গবেষণার ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইজতিহাদ একটি নতুন মাত্রা। ইসলামের প্রাথমিক যুগসমূহে মুসলিম পন্ডিতগণের অক্লান্ত পরিশ্রম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাদের পারদর্শিতার ফলে ব্যক্তিগত বা একক গবেষণার মাধ্যমে সফলতার সাথে তৎকালীন বিভিন্ন বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয় সম্ভব হলেও বর্তমান সময়ে তা কষ্টসাধ্য। কোরআন-সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ’র দুর্বল অবস্থানের কারণে শেষের শতাব্দীগুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার সেই সোনালী সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। যার প্রেক্ষিতে সঠিক ইজতিহাদ করার মত প্রজ্ঞাবান আলিম এর ব্যাপক অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে বর্তমানে একক গবেষণার সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের যোগ্যতাসম্পন্ন গবেষকের অভাব মুসলিম বিশ্বের প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। পক্ষান্তরে বর্তমান সময়ে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, চিন্তা-চেতনার জগতে বিরাট বিপ্লব সাধিত হওয়ায় জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন দিক নিয়ে ইজতিহাদ করার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহ সম্মিলিত ইজতিহাদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।
সম্মিলিত ইজতিহাদ কী? : সম্মিলিত ইজতিহাদ একটি আধুনিক ফিকী পরিভাষা। পূর্ববর্তী উসূলের কিতাবসমূহে এ বিষয়ক স্বতন্ত্র কোন অধ্যায় পাওয়া যায় না। সম্মিলিত ইজতিহাদের পরিচয়ের জন্য ইজতিহাদের সংজ্ঞা আবশ্যক। বিভিন্ন গ্রন্থে ইজতিহাদের অসংখ্য সংজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা ইমাম ফাতুহী র. এর সংজ্ঞাটিকে অধিকতর প্রণিধানযোগ্য সাব্যস্ত করতে পারি। তিনি বলেন ‘কোন বিষয়ের শরঈ বিধান অর্জনের জন্য ফকীহ কর্তৃক তার শক্তি ব্যয় করা।’ “ফাতহী, ইবন নাযযার, শারহু আল-কাওকাব আল-মুনীর, বিশ্লেষণ: ড. মুহাম্মদ আল-যুহাইলী ও ড. নাযিয়াহ আল-হাম্মাদ, মক্কা: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪১৩ হি. খ. ৪, পৃ. ৪৫৮। বর্তমান সময়ের কেউ কেউ সামষ্টিক ইজতিহাদের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যেমন- * ড. আব্দুল মাজীদ শারফী বলেন, বিধান উদঘাটনের পদ্ধতির আলোকে কোন বিষয়ের শরঈ বিধান সম্পর্কে ধারণা অর্জনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহ কর্তৃক চেষ্টা সাধনা এবং পরামর্শের পর উক্ত বিধানের উপর তাদের সকলের বা অধিকাংশের ঐক্যমত। “শারফী, ড. আব্দুল মাজীদ, আল-ইজতিহাদ আল-জামায়ী ফীত তাশরীঈ আল-ইসলামী, মক্কা: কুতুবুল উম্মাহ সিরিজ- ৬২, ১৪১৮ হি. পৃ. ৪৬। * ড. আল-আবদু খলীল বলেন, কোন বিষয়ের শরঈ বিধানের উপর কোন যুগের উম্মতে মুহাম্মাদীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুজতাহিদের ঐক্যমত। “খলীল, ড. আল-আবদু, আল-ইজতিহাদ আল-জামায়ী ফী হাজাল আসর, জর্ডান: জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজ, সংখ্যা-১০, ১৯৮৭, পৃ. ২১৫। প্রকৃতপক্ষে সম্মিলিত ইজতিহাদ হচ্ছে- কোন বিষয়ের শরঈ বিধান নির্ণয়ের জন্য একদল আলিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং পারস্পরিক পরামর্শ ও পর্যালোচনান্তে উক্ত বিষয়ের উপর ঐক্যমত্য স্থাপন করাকে সম্মিলিত ইজতিহাদ বলা হয়। যেমন ইসলামিক ফিকহ একাডেমী জিদ্দায় করা হয়ে থাকে।
বর্তমান সময়ে সম্মিলিত ইজতিহাদের গুরুত্ব: এ কথা অনস্বীকার্য যে, কোন বিষয়ে একক কোন ব্যক্তির চিন্তা- চেতনা ও মতামতের চেয়ে উক্ত বিষয়ে একদল মানুষের চিন্তা-চেতনা ও গবেষণার সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সহায়ক। তা ছাড়া পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সঠিক বিষয়টিই বেরিয়ে আসা স্বাভাবিক। এ কারণেই শূরা (পরামর্শ) থেকে নির্গত ফলাফল অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “সকল কাজে তাদের সাথে পরামর্শ করে, অত:পর যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর তখন আল্লাহর উপর ভরসা কর।” আল কোরআন, ৩: ১৫৯।
যেসব কারণে বর্তমান সময়ে সম্মিলিত ইজতিহাদ গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে রয়েছে-
ক. একক গবেষণার তুলনায় সম্মিলিত গবেষণা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা সমকালীন বড় বড় আলিম, গবেষক, বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে সামগ্রিক দিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্মিলিত ইজতিহাদ সম্পন্ন হয়। খ. সম্মিলিত ইজতিহাদ ইজতিহাদকে চলমান রাখে এবং তা বন্ধ হওয়া রোধ করে। ইজতিহাদ ইসলামী আইনের একটি মৌলিক বিষয় ও ইসলামের গতিশীলতা প্রমাণের প্রধান অবলম্বন। গ. সম্মিলিত ইজতিহাদ মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্যের পথ সুগম করে। কারণ মুসলিম উম্মাহ’র আলিমগণ একত্রিত হয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা সমাধানে ব্রতী হয়। আর জনসাধারণ তাদের নির্ণীত বিধানের সাথে একমত হয়ে অনুসরণ করেন। যার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্য ফুটে ওঠে।
সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইজতিহাদের গুরুত্ব বর্ণনা করে ড. ইউসুফ আল-কারযাভী বলেন, আধুনিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ইজতিহাদকে সামষ্টিক ইজতিহাদের উন্নীত করতে হবে। যে পদ্ধতিতে আলিমগণ উক্ত উত্থাপিত বিষয়ে বিশেষত সাধারণ জনগণ যার অনুসরণ করবে সে বিষয়ে পরামর্শ ও পর্যালোচনা করবেন। নিশ্চয় একক মতামতের চেয়ে একদল মানুষের চিন্তা-গবেষণা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর উপযোগী। “আল-কারযাভী, ড. ইউসুফ আব্দুল্লাহ, আল-ইজতিহাদ ফীশ শরীআহ আল-ইসলামিয়্যাহ, কুয়েত: দারুল কলম, ১৪১০ হি, পৃ. ১৮২।
ড. মুফসির কাহতানী তার গ্রন্থে শেখ মোস্তফা আল-যারকাহ এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, অতীতে ব্যক্তিগত ইজতিহাদের প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে তা বরং ক্ষতিকর, যা হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে ভয়ঙ্কর রূপে প্রকাশিত হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মাযহাবের ফকীহগণ ইজতিহাদের দরজা রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সমসাময়িক সমস্যা সমাধানের একমাত্র অবলম্বন ইজতিহাদ এক্ষেত্রে আমাদেরকে ইজতিহাদের নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। আর তাহল ব্যক্তিগত ইজতিহাদের পরিবর্তে সম্মিলিত ইজতিহাদ এবং এর মাধ্যমে আমরা ইজতিহাদের প্রথম পথ চলা অর্থাৎ আবু বকর ও উমর (রা.) এর যুগে ফিরে যাব। “কাহতানী, ড. মুফসির, মানহাজু ইসতিখরাজ, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৭৮ (সংক্ষিপ্ত)।
সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি: সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি অবগত হতে হলে আমাদেরকে ইতিহাসের ক্রমধারায় এ সংক্রান্ত পদ্ধতিগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। ইসলামী আইনের প্রাথমিক যুগগুলোতে কীভাবে সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হত নিম্নে সংক্ষেপে তা বিধৃত হল- সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তদানে মহানবী সা. এর পদ্ধতি মহানবী (সা.) এর সময়ে সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তদান মূলত দু’টি বিষয়নির্ভর ছিল।
১. ওহী মাতলু বা কোরআন: পবিত্র কোরআন সাধারণত সাম্প্রতিক অবস্থার বিশ্লেষণ, মুসলমানদের করণীয় বা তৎসংশ্লিষ্ট বিধান নিয়ে অবতীর্ণ হতো, যাকে উক্ত অংশ অবতরণের কারণ বা ‘শানে নুযুল’ বলা হয়। অতএব কোরআন অবতরণের সময়কালে উদ্ভূত যে কোন পরিস্থিতির বিধান সরাসরি কোরআন থেকে পাওয়া যেত।
২. ওহী গায়র মাতলু বা সুন্নাহ: যাকে রাসূল (সা.) এর বাণীমূলক, কর্মসূচক ও মৌনসম্মতিমূলক সুন্নাহ বলা হয়। “ইবনে খালদুন, আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ, মুকাদ্দামাহ, ব্যাখ্যা ও ভূমিকা: ড. মুহাম্মদ আল-ইসকিন্দারানী, বৈরূত: দারুল কিতাব আল-আরাবী, ১৪১৭ হি. পৃ. ৪১৮-৪১৯। সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দানের ক্ষেত্রে ওহী গায়র মাতলুর যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করা হত তার মধ্যে রয়েছে-
ক. রাসূল (সা.) কোরআনের ব্যাখ্যা করতেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন: ‘আপনার প্রতি আমি স্মরণিকা অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি লোকদের সামনে ঐসব বিষয় ব্যাখ্যা করেন, যেগুলো তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। “আল-কোরআন, ১৬: ৪৪। এ কারণে মহানবী (সা.) কোরআনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রদান করতেন, এর বিধান বাস্তবায়ন করতেন, এর আলোকে বিভিন্ন বিধান প্রয়োগ করতেন। এমন কি ক্ষেত্র বিশেষে কোন কোন বিধান রহিত করতেন। খ. উদ্ভূত বিষয়ের বিধান তিনি নিজেই প্রদান করতেন। বিশেষত যেসব বিষয়ের কোন বিধান কোরআনে আসেনি। রাসূল (সা.) এর ঘোষিত বিধানের মধ্যে রয়েছে দাদীর উত্তারধিকার, যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা, বিতরের সালাত ইত্যাদি। “ইবনে খালদুন, মুকাদ্দামাহ, প্রগুক্ত, পৃ. ৪১৮। গ. উদ্ভূত বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের জন্য মহানবী সা. সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করতেন। যেমন- বদরের যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে তিনি এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। “মুসলিম, ইমাম, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, অধ্যায়: আল জিহাদ, জিহাদ ওয়াস সিয়ার, অনুচ্ছেদ: ইমদাদ বিল মালাইকাতি ফী গাযওয়াতে বদর, তা. বি. খ. ৫, পৃ. ১৫৬। সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তদানে সাহাবীগণের পদ্ধতি মহানবী (সা.) এর ইন্তিকালের পর সাহাবীগণ সাম্প্রতিক বিষয়ের সিদ্ধান্তদানের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ’র পাশাপাশি আরো কিছু নতুন পদ্ধতি যুক্ত করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
ক. ইজমা বা সম্মিলিত ইজতিহাদ: সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিটি মহানবী (সা.) এর ইন্তিকালের পরপরই প্রয়োগ শুরু হয়। যার মাধ্যমে আবু বকর (রা.) কে খলিফা নির্বাচন করা হয়। এ পদ্ধতির আলোকে সাহাবীগণ যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিধান নির্ণয় করেছিলেন তার মধ্যে রয়েছে- “আল-মারাগী, আব্দুল্লাহ মুস্তফা, আল-ফাতহুল মুবীন ফী তাবাকাতিল উসূলিয়্যিন, বৈরূত: মুহাম্মদ আমীন দামিজ, ১৩৯৪ হি. খ. ১, পৃ. ১৯, ২১।
১. আবু বকর (রা.) কে খলীফা নির্বাচন। ২. কোরআন সংকলনের অপরিহার্যতা। ৩. যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ৪. মদ্যপের শাস্তি ৮০ বেত্রাঘাত নির্ধারণ।
খ. কিয়াস: সাহাবীগণের যুগে এ পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। এমনকি সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি ছিল কোরআন ও সুন্নাহ থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ের বিধানের আলোকে নতুন বিষয়ের বিধান উদ্ভাবন করা। বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবীগণের কৃত কিয়াসের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করতে যেয়ে অনেক উলূসবিদ তাদের গ্রন্থে এ সংক্রান্ত পৃথক অধ্যায়ের অবতারণা করেছেন। “ইবনে কাইয়্যিম, ইলামুল মুয়াক্কিইন, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২০১৩-২০৫, ইবনে খালদুন, মুকাদ্দামা, প্রাগুক্ত। গ. সাহাবীগণের অভিমত: সাহাবীগণ বিশেষত উমর (রা.) অন্য সাহাবীগণের বাণীর ভিত্তিতে অনেক নতুন বিষয়ের সমাধান দিতেন। বর্ণিত আছে, তাঁর সামনে নতুন কোন বিষয় উপস্থাপিত হলে তিনি আগে দেখতেন এর বিধান কোরআন ও সুন্নাহর রয়েছে কিনা। যদি না থাকত তবে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, আবু বকর কি এ জাতীয় কোন বিষয় ফয়সালা করেছিলেন? যদি আবু বকর (রা.) কৃত এমন কোন ফসালা থাকত তবে তিনি তার অনুসরণ করতেন। “বায়হাকী, আহমদ ইবন হুসাইন, আস-সুনান আল-কুবরা, বিশ্লেষণ: মুহাম্মদ আব্দুল কাদির আতা, মক্কা: মাকতাবাহ দারুল বায়, ১৪১৪ হি. অধ্যায় আদাবুল কাযী, অনুচ্ছেদ: মা ইকদী বিহিল কাযী ওয়া মা ইফতি বিহিল মুফতী, খ. ১০, পৃ. ১১৪। এছাড়াও অনেক সাহাবীর ব্যাপারে প্রসিদ্ধ বর্ণনা রয়েছে যে, তাঁরা বড় বড় সাহাবীর মতামত অনুকরণ করে ফয়সালা করতেন। “ইবনে কাইয়্যিম, ইলামুল মুয়াক্কিইন, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৪-২২। এ যুগে কিয়াসের মাধ্যমে নতুন বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দু’টি নতুন বিষয়কে বিবেচনায় আনা হয়েছিল। “আল-কারাফী, শিহাবুদ্দীন আবুল আব্বাস ইবনে ইদরীস শারহু তানকীহুল ফুসুল ফী ইখতিসারিল মাহসুল ফী উসূল, বিশ্লেষণ: তাহা আব্দুর রউফ সায়াদ, কায়রো: দারুল ফিকর, ১৩৯৩ হি, পৃ. ৪৪৬। আর তা হল, মাসালিহ মুরাসালাহ “মাসালিহ মুরাসালা’’ বলা হয়, শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্যের অনুরূপ কার্য সম্পাদন যা গৃহীত বা বাতিলকৃত হওয়ার ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট বিধান পাওয়া যায় না। ‘‘আবু যাহরা, ইমাম মুহাম্মদ, উসূল আল-ফিকহ, আল-কাহেরা: দারুল কিতাব আল- আরাবী, ১৯৫৭ পৃ. ২৬১। ও সাদ্দুজ জারাঈ “যেসব উপায়-উপকরণ ক্ষতিকর ও শান্তি বিঘœকারী নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনে প্রলুদ্ধ করে সেসব কর্মের পথ রূদ্ধ করার নাম সাদ্দুজ জারাঈ। আয-যুহায়লী, ড. ওহাবাহ, উসূল আল-ফিকহ, দামিশক: দারুল ফিকর, ১৪০৬ হি. খ. ২, পৃ. ৮৭৪’’। (চলবে)