বিভাগ: সাহিত্য

রোহিঙ্গা

মীর মামুন হোসেন

হায়রে মানুষ হায়রে বিবেক
হায়রে তামাম বিশ্ব
দেখেও তোদের মন কাঁদে না
এমন করুণ দৃশ্য।

জ্বলছে আগুন পুড়ছে রোহিঙ্গা
এ কোন অত্যাচার
আমরা অধম দেখছি চেয়ে
বসে নির্বিকার।

মারনা লাথি জোড়া পায়ে
খিড়কিতে দ্বার বন্ধ
লাভ কি বল সে চোখ রেখে
থেকেও যে চোখ অন্ধ ।

মোড়ল সেজে মোড়ার উপর
আছে তো বেশ বসে
নেতাগিড়ি ছুটে যাবে
পড়লে জনরোষে।

নিজেরই মধ্যে

শরীফ আহমাদ

নিজেরই মধ্যে সৃষ্টি আমার নিজেরই মধ্যে ক্ষয়
নিজেরই মধ্যে জন্ম আমার নিজেরই মধ্যে লয়।

নিজেরই মধ্যে ছুটছি কেবলই বিশ্বজগৎময়
নিজেরই মধ্যে ডুবছি কেবলই অতলসিন্ধুজয়।

নিজেরই মধ্যে নিঃস্ব হচ্ছি পুণ্য হতেছে শূন্য
নিজেরই মধ্যে বিশ্ব গড়ছি আসলে সকলই ক্ষুণœ।

নিজেরই মধ্যে আয়ুর শিকড় কাটছি কেবলই কাটছি
নিজেরই মধ্যে বাহন ফেলে যে অন্ধ পথেই হাঁটছি।

নিজেরই মধ্যে যুদ্ধ আমার সকল অষ্টপ্রহরে
নিজেরই মধ্যে বিজয়ী, বিজীত, শহীদ, ভন্ড স্বকরে।

নিজেরই মধ্যে স্বর্গ আমার প্রতি পলে পলে গড়ছি
নিজেরই মধ্যে নরকে পুড়ছি,নিজেকে নিঃস্ব করছি।

নিজেরই মধ্যে দেখছি নিজেকে বিষের বৃক্ষ যেন সে
নিজেরই মধ্যে ফুল যে ফোটাই কাঁটায় কাঁটায় ভরা যে।

নিজেরই মধ্যে রক্তক্ষরণ  পান্ডু হচ্ছে এ হৃদয়।
নিজেরই মধ্যে নিজেই সেবক নিজেকে করছি শুধু ক্ষয়।

নিজেরই মধ্যে পুড়ছি নিজেকে অঙ্গ হচ্ছে কালোময়
নিজেরই মধ্যে উড়ছি শূন্যে পাখার পালক শুধু ক্ষয়।

নিজেরই মধ্যে স্রষ্টা সাজাই ভ্রষ্ট সকল প্রহরে
নিজেরই নিজেকে গড়ছি ভুলেই পড়ছি অতল গহ্বরে।

মা

মোছা: সীমা আক্তার

মাগো আমি ধন্য হলাম
তোমার গর্ভে এসে
দশ মাস দশ দিন কষ্ট করলে
কত রাত দিন জেগে।

সময় বদলায় দিন বদলায়
বদলাও না শুধু তুমি
চোখ বুঝলে শুধু দেখি
তোমারি মুখখানি।

আজও কষ্ট করছো মাগো
দেখিনি শুধু আমি
তোমার কষ্ট শেষ কবে হবে
মাগো, বলবে কী তুমি ?
তোমার ছায়ায় বড় হবো
তোমারি হাত ধরি (মা)।

হারানো মন

সাইয়িদ রফিকুল হক

সোনার চেয়ে দামি জিনিস
পাবে তুমি খুঁজে
হারিয়ে যদি যায়,
কিন্তু তোমার মন হারালে
এমন জিনিস
খুঁজে পাওয়া দায়!
অনেক সাধের মনটাকে তাই
ধরে রেখো স্বপ্নজালে,
আঁধার রাতে জ্বলবে তারা
অনেক সুখে ভালে।
মন হারালে পাবে কোথায়?
কোথায় মনের দেখা?
ভুল করে তাই
ধরবে নাকো কুহক-মায়ার
অচিন পথের রেখা।
হারানো মন খুঁজলে তুমি
পাবে শুধুই ব্যথা,
মন হারালে মন মেলে না
মনে রেখো কথা।

আমি রোহিঙ্গা-১

শাহানাজ সুলতানা

আমাকে নিয়ে ভেবনা বন্ধু, আমি এক রোহিঙ্গা
হ্যাঁ আমি মায়ানমার থেকেই বলছি,
আমি তোমারই মত এক মানব সন্তান
বলতে পারো আমি তোমাদের কন্যা-জায়া ভাই, ভগ্নি
আমারও স্বপ্ন আছে বাঁচার সাধ আছে
তবু আজ  আমি এক নিপীড়িত জন,
কখনও নির্যাতিত;
কখনও আবার অপহৃত ধর্ষিতা।

কখনও  আমি  নাফ নদীতে
পানা হয়ে ভেসে যাওয়া লাশের স্তুপ,

শুনতে চাও বন্ধু কে আমি! আমি এক রোহিঙ্গা।
হা হা হা বন্ধু আজ আমি বড় অসহায়
তাই কোথাও আমার প্রবেশ রুদ্ধ,
কোথাও আমার অধিকারগুলো অস্বীকৃত।
কোথাও বৈষম্যের যন্ত্রণায় দগ্ধ আমার হৃদয়,
কোথাও বা আমার অধিকারের স্বপ্ন শুধুই মরীচিকা।
না, তাই বলে ভেঙ্গে আমি পড়িনি
আমি দুর্বিনীত, দুরন্ত দুর্বার হয়ে ছুটছি নিশি-দিন
আমি পেরিয়ে চলেছি অচেনা সীমান্ত,
কখনো বা সেখান থেকেও আমি বিতাড়িত হচ্ছি ।
কখনো আমি পরিণত হচ্ছি
উত্তাল উন্মত্ত সাগরের উদরে  নির্মম আহারে,
কখনো আমিও পাচার হয়ে চলেছি অজানা অচেনা কোন ঠিকানায়।
হা হা হা বন্ধু ! আমি এক রোহিঙ্গা

কখনো আমি ক্যাম্পে আটকে পড়া নিপীড়ন
আমার কোন খাবার নেই;
আমার মাংস পোড়া গন্ধে ভারি আকাশ-বাতাস
কোথাও একটু দাঁড়াবার জায়গা পেলাম
তো ক্ষণেক বাদেই আবার বাস্তুহারা।

মায়ের স্বপ্ন

রুনা লায়লা

হতাম যদি প্রজাপতি
ঘুরতাম ফুলে ফুলে ;
তুমি-আমি উড়ে যেতাম
মনে স্বপ্ন দুলে।

রঙিন পাখায় বসে খোকা
দূর আকাশে যেতে
চাঁদের বুড়ি তোমায় দিত
দুধ-কলা -ভাত খেতে।

মিষ্টি হাসি দেখে তোমার
মনে পুলক জাগে
পাখির আগে জাগতে তুমি
আমার সুন্দর বাগে।

দেশ মাটি মায়ের সমান

মোঃ সানাউল্লাহ্

আকাশে লেগেছে মেঘ, অগোচরে বয়ে যায় বেলা,
জমে গেছে মাঠে ঘাটে আবার নতুন করে
রাজনীতি রাজনীতি খেলা।

কে করে নতুন আশা, কার কাছে আছে পাশা
এমন করে আর চেলো না গুটির চাল;
সকলেরই তরে হবে সর্বনাশা!

বরষায় ভাসে দেশ, বাঁচিবার তরে গড়ে ভেলা,
ত্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি, অগোচরে বিকিকিনি;
কেউ করে আনন্দ মেলা!

প্রলাপে-বিলাপে শুনি, মুখে মুখে অশালীন ভাষা,
পোশাকে-আসাকে দেখি, ছিমছাম পরিপাটি;
চমকে-ঠমকে সব ঠাসা!

দশ বার ভাবো আগে, ক্ষেপোনা কখনও রাগে,
হয়ে গেলে বড় ভুল, ছিড়বে মাথার চুল;
সকলেরই হবে শেষে সাজা!

দেশ, মাটি, মা সমান, সকলেরই আছে দান
সকলেই ভাই ভাই, কেউ নয় প্রজা;
থাকে না চিরদিন একজনই রাজা।

মা জননী

মোঃ ফিরোজ হোসেন

জানো মা ! তোমার কথা মনে হলে
কেমন যেন শিশু হয়ে যাই আজও
যদিও আমি আয়ুরেখা ধরে হেঁটেছি অনেকটা পথ
এখনও যেন স্বপ্নের মতো
গলা জড়িয়ে তোমার বুকে লেপটে থাকি
শিশুর মতো এখনও জমতে থাকে শত শত আবদার
বায়নাগুলো তোমাকে জানাবো বলে মুখিয়ে থাকি সদাই
ছোট্ট বেলার হারিয়ে যাওয়া ক্ষণগুলি
মনের গভীরে দোলা দেয় বারবার
কপোল গড়ানো চোখের জল ঝরে পড়ে জমিনে ।

মনে পড়ে কী মা !
মিশু, করিম কিংবা বাসুদের বাবারা যখন
হরেক রকম খাবার হাতে বাড়ি ফিরতো
এক দৌড়ে চলে আসতাম তোমার কাছে
গলা জড়িয়ে ধরে বলতাম
মা ! আমার বাবা কোথায় ?
বাবা কেন আমাদের কাছে আসেনা ?
নির্বাক হতে ক্ষণকাল
আর্দ্র চোখে আঁচলে মুখ ঢাকতে
মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে
স্বাধীনতার লড়াইয়ের সময়
যেখানে ব্যবসা করত তোমার বাবা
সেখান থেকে একদিন দুষ্টু লোকেরা
একটা লোককে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল
তাকে রক্ষা করতে রাত হয়ে যায় তোমার বাবার
সেই রাতে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর পৃষ্ঠদেশে
বাইশটি কোপ দিয়েছিল খুনীরা
রাগ করে তাই
আল্লাহর কাছে চিরতরে চলে গেলেন
সেই থেকে তুমি শুধু আমাদের মা নও
বাবাও হয়ে উঠলে, হয়ে উঠলে একমাত্র অবলম্বন
বড় হয়ে জেনেছি
বাবার খুনীরা ছিল বিচারবোধহীন “নকসাল” ।

তুমি সেই জননী, সংগ্রামী মা !
মহাযোদ্ধার মতো শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে
ছায়ার মতো আগলে রাখতে সর্বক্ষণ
তিলে তিলে গড়ে তুললে আমাদের
মনে আছে মা !
খাবার সময় হলে প্রায়ই দুধ-ভাতের বায়না ধরতাম
আর কাঁদতে থাকতাম অবিরত
ভারী অসহায় হয়ে পড়তে অসামর্থ্যরে কারণে
শেষেমেশ পানি-লবণ দিয়ে মেখে দিতে ভাত
খেতে খেতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়তাম ।

আমরা ভাই-বোনেরা ছিলাম বেশ ঠাণ্ডা-প্রকৃতির
ভারী চঞ্চল ছিল বড়ভাইটি কেবল
বড়ভাইকে পিটুনি দেয়ার কথা মনে আছে মা !
বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বেশ রাত করেই
একবার বাড়ি ফিরেছিলাম আমি ও বড়ভাই
তোমার সে কী রাগ, শাসন !
কেন সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরা হয়নি ?
কেন সময় মত পড়তে বসা হয়নি ?
ভয় পেয়ে বড়ভাই পালালো, সারারাত বাড়ি ফেরেনি
মাঝে মাঝে এমনিকরে ঘর-পালাতো বড়ভাই
কী নিদারুণ অস্থির ছিলে সে রাতে !
এখানে সেখানে রাতভর খোঁজাখুঁজি
ভোরবেলা ঘুমন্ত আবিষ্কার করলে বড়ভাইকে
প্রতিবেশীর ক্ষেত পাহারা দেবার টঙঘরে
ভয়ঙ্কর অগ্নিমূর্তি দেখেছিলাম সেদিন তোমার
শশা-মাচার খুঁটি দিয়ে কী পিটুনিটাই দিলে
সেই থেকে বড়ভাই
ছেড়ে দিল ঘর-পালানোর বদঅভ্যাস ।

মা ! একবার দেখে যাও
স্মৃতির আয়নায় ছবির মতো ভেসে উঠছে
কৈশোরে মাছ ছাড়া ভাত খেতে কষ্ট হতো
দুবেলা ডাল-ভাত জোটানো যেখানে কষ্টকর
সেখানে মাছের জোগাড় !
তোমার অসহায়ত্ব ভারী প্রকট হয়ে উঠতো
বৃষ্টি দেখে দুচোখে সে কী খুশির ঝিলিক !
বৃষ্টির জল আটকে রাখতাম
তারপর নালা কেটে জোড়াপুকুরে ছেড়ে দিতাম
জলের স্রোত ধরে নালা বেয়ে নানা পদের মাছ
যেমনঃ পুঁটি, কৈ, শিং, টেংরা উঠে আসতো
সেই মাছগুলো খুব সুন্দরভাবে রান্না করে দিতে
ভীষণ মজা করে খেতাম আমরা
জানো মা !
তোমার হাতের রান্না খেতে এখনও খুব ইচ্ছা জাগে ।

একটু একটু বড় হতে থাকলাম
মা, নির্ভার হবার সময় হলো বুঝি
কিন্তু হায় ! দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ে না
আল্লাহর ইচ্ছা বুঝি ভিন্ন ?
হঠাৎ তুমি চলে গেলে না ফেরার দেশে
যারা বড় যোদ্ধা হয়
তাদের বুঝি বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই ?
কর্তব্য শেষে তাদের বুঝি চিরবিদায় নিতে হয় ?
মা জননী আমার !
এখনও আমি শিশুর মতো খুবই অসহায়
তোমার আঁচলের ছায়ায়
আজও আশ্রয় খুঁজে ফিরি নিয়ত।

ছলনাময়ী

মামুন রশীদ

মেয়ে স্বপ্ন যদি দেখালে,
তবে কেন দুঃখের সাগরে ভাসালে।
মেয়ে ছেড়েই যদি যাবে,
কেন হাত ধরেছিলে।
মেয়ে ভালোবেসে কেন,
বিরহের অনলে পুড়ালে।
মেয়ে প্রেম নিয়ে কেন
ছলনা করিলে।
মেয়ে মনটা যদি ভেঙ্গে দিবে
কেন হৃদয় দিয়েছিলে।
মেয়ে জোছনায় জড়িয়ে,
আমায় অমাবস্যায় ডুবালে।
মেয়ে বুকে জড়িয়ে কেন,
বিষের কাঁটা বিধালে।
মেয়ে তুমি ছলনাময়ী,
জীবনে এসেছিলে বলেই
আমায় নিঃস্ব করে গেলে।

মামার বিয়ে

তানিয়া সরকার

চোখে চশমা গায়ে লাল জামা
সে কি বিষাদে ! এসে কয় মামা –
“বুঝলি তানিয়া  এবার হোক বিয়েটা
ঘেঁটে-ঘুঁটে দ্যাখ তুই ম্যাটরিমনিটা ।

সেই কবে মাঘে হেসেছিল রাই
হৃদয় দিয়েছে ভেবেছিনু তাই
রাত জেগে মন ভরে আহ্লাদে লিখেছিনু ফিরিস্তি
অন্যহাতে সঁপে ছিল বজ্জাত মইদুল মিসতিরি ।

পাশের বাড়ির  ও বসুমতির ভাই
পথে ঘাটে দ্যাখা হলে খালি ধমকায় !
বছর দশেক চোখে নাই ঘুম-
বুঝেছি ,খেলেছে তবে মোর সাথে বেমালুম ;

তাড়াতাড়ি কর দেখি ডেটিং ফিক্স
বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে হাঁকাবো সিক্স !

বলে দেবো তার ঐ গুন্ডা ভায়েরে –
যেন সে পাঙ্গা না নেয় আগ বাড়িয়ে ।
ক্যারাটের কত মারপ্যাঁচে ফাঁদে ফেলে
একেবারে সব নক্সা দেবো  বদলে ।”

হেসে কই মামারে –“ তার মেজদা  থাকে বনগাঁ ,
লোকে বলে বদরাগী সে মস্ত বড়ো দারোগা ।”
শুনে মামা চুপচাপ মুখ করে ফ্যাকাশে
অবশেষে শুয়ে গেল মুখ গুঁজে বালিশে !

তারপর খোলেনি সে ম্যাটরিমনিটা
থেমে আছে আজও যে মামার বিয়েটা ।